তাজভিদুল কুরআনিল কারীম (Code: 201102) – ২০২০ প্রশ্ন ও উত্তর
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২০ এর আল-কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের তাজভিদুল কুরআনিল কারীম ওয়া হিফজুহু ওয়া তারজামাতু মা’আনিহী বিষয়ের সম্পূর্ণ উত্তরমালা।
مجموعة (أ) ক অংশ
১. নিচের যেকোনো দুটি প্রশ্নের উত্তর দাও: (أجب عن اثنين من الأسئلة التالية)
(أ) عرف علم التجويد- وما غرضه وموضوعه ونشأته وتطوره؟ بين بالإيضاح-
(ক) ইলমুত তাজভিদ এর সংজ্ঞা দাও। এর উদ্দেশ্য, আলোচ্য বিষয়, উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ বিশদভাবে আলোচনা কর।
ইলমুত তাজভিদ-এর পরিচয়:
আভিধানিক অর্থ: ‘তাজভিদ’ (تجويد) শব্দটি جَوَّدَ থেকে এসেছে। এর অর্থ হলো সুন্দর করা, অলংকৃত করা বা উত্তমরূপে পাঠ করা (التحسين والإتقان)।
পারিভাষিক অর্থ: ইলমুত তাজভিদ হলো এমন একটি শাস্ত্র যার মাধ্যমে আরবি হরফসমূহের সঠিক উচ্চারণস্থান (মাখরাজ) এবং তাদের বৈশিষ্ট্যসমূহ (সিফাত) বজায় রেখে সঠিকভাবে তিলাওয়াত করার নিয়মাবলি জানা যায়। এককথায়-
إِعْطَاءُ كُلِّ حَرْفٍ حَقَّهُ وَمُسْتَحَقَّهُ مِنَ الْمَخَارِجِ وَالصِّفَاتِ
অর্থাৎ, প্রতিটি হরফকে তার মাখরাজ ও সিফাত অনুযায়ী তার প্রাপ্য পূর্ণ হক প্রদান করে উচ্চারণ করাই হলো তাজভিদ।
উদ্দেশ্য (غرضه):
ইলমুত তাজভিদের মূল উদ্দেশ্য হলো মহান আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করার সময় জিহ্বাকে ভুল-ভ্রান্তি বা ‘লাহন’ (اللحن) থেকে রক্ষা করা। এর মাধ্যমে পবিত্র কুরআনের অর্থ বিকৃতি থেকে বেঁচে থাকা যায় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব হয়।
আলোচ্য বিষয় (موضوعه):
তাজভিদ শাস্ত্রের মূল আলোচ্য বিষয় হলো আল-কুরআনের শব্দাবলি এবং এর হরফসমূহ (الكلمات القرآنية)।
উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ (نشأته وتطوره):
ব্যবহারিক উৎপত্তি: তাজভিদের ব্যবহারিক দিকটি সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে। হযরত জিবরাঈল (আ.) নবীজি (সা.)-কে যেভাবে তাজভিদসহ কুরআন শিখিয়েছেন, নবীজি সেভাবেই সাহাবিদের শিখিয়েছেন। এটি বংশ পরম্পরায় আমাদের কাছে পৌঁছেছে।
তাত্ত্বিক বা শাস্ত্রীয় উৎপত্তি: ইসলামের প্রথম যুগে মানুষের ভাষা বিশুদ্ধ হওয়ায় আলাদা করে তাজভিদ শাস্ত্রের প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু পরবর্তীতে অনারবদের ইসলাম গ্রহণের ফলে কুরআনের তিলাওয়াতে ভুল পরিলক্ষিত হতে থাকে। তখন আলিমগণ তাজভিদের তাত্ত্বিক নিয়মাবলি লিপিবদ্ধ করেন। হিজরি তৃতীয় শতাব্দীর শেষদিকে সর্বপ্রথম আবুল আসওয়াদ আদ-দুয়ালি, খলিল ইবনে আহমদ ফারাহিদি প্রমুখ ভাষাবিদরা এর নিয়মকানুন সূত্রবদ্ধ করেন। এরপর ইমাম আবু উবায়দ কাসিম বিন সাল্লাম এবং আবু মুযাহিম আল-খাকানি তাজভিদ বিষয়ে স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করে এই শাস্ত্রের ব্যাপক প্রসার ঘটান। পরবর্তীতে আল্লামা জাযারি (রহ.) এই শাস্ত্রে অসামান্য অবদান রাখেন।
(ب) اكتب أهمية تلاوة القرآن الكريم بالتجويد مستدلاً من القرآن والسنة-
(খ) কুরআন ও হাদিসের দলিল উল্লেখপূর্বক তাজভিদ সহকারে বিশুদ্ধভাবে কুরআন তেলাওয়াতের গুরুত্ব লিখ।
পবিত্র কুরআন নাজিল হয়েছে অত্যন্ত সাবলীল ও বিশুদ্ধ আরবি ভাষায়। তাই এর তিলাওয়াতও সেই বিশুদ্ধ পদ্ধতি তথা তাজভিদ অনুসারে হওয়া অপরিহার্য। তাজভিদ ছাড়া কুরআন তিলাওয়াত করলে অর্থের বিকৃতি ঘটে এবং সাওয়াবের পরিবর্তে গুনাহ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কুরআনের আলোকে গুরুত্ব:
মহান আল্লাহ তায়ালা নবীজি (সা.) ও মুমিনদেরকে তাজভিদসহ কুরআন তিলাওয়াতের স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন। আল-কুরআনে এরশাদ হয়েছে:
অর্থ: “এবং কুরআন তিলাওয়াত করুন ধীর-স্থির ও সুস্পষ্টভাবে (তাজভিদ সহকারে)।” (সূরা মুযযাম্মিল: ৪)
হযরত আলী (রা.) এই আয়াতের ‘তারতীল’-এর ব্যাখ্যায় বলেছেন: التَّرْتِيلُ هُوَ تَجْوِيدُ الْحُرُوفِ، وَمَعْرِفَةُ الْوُقُوفِ (তারতীল হলো হরফসমূহকে তাজভিদের সাথে উচ্চারণ করা এবং ওয়াকফ সম্পর্কে জ্ঞান রাখা)।
হাদিসের আলোকে গুরুত্ব:
বিশুদ্ধ তিলাওয়াতকারীর মর্যাদার কথা উল্লেখ করে রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন:
অর্থ: “কুরআন তিলাওয়াতে যে ব্যক্তি পারদর্শী (অর্থাৎ যে তাজভিদসহ বিশুদ্ধ তিলাওয়াত করে), কিয়ামতের দিন সে সম্মানিত পুণ্যবান ফেরেশতাদের সাথে থাকবে।” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
শরয়ি হুকুম:
তাজভিদের নিয়মকানুন তত্ত্বগতভাবে মুখস্থ করা ‘ফরযে কিফায়া’, কিন্তু কুরআন পড়ার সময় তাজভিদের নিয়মগুলো বাস্তবে প্রয়োগ করে বিশুদ্ধভাবে তিলাওয়াত করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর ওপর ‘ফরযে আইন’। আল্লামা জাযারি (রহ.) বলেছেন: وَالْأَخْذُ بِالتَّجْوِيدِ حَتْمٌ لَازِمٌ ٭ مَنْ لَمْ يُجَوِّدِ الْقُرْآنَ آثِمٌ (তাজভিদ সহকারে পড়া চূড়ান্ত আবশ্যকীয় বিষয়। যে ব্যক্তি তাজভিদ ছাড়া কুরআন পড়বে, সে গুনাহগার হবে)।
(ج) عرف المخرج- ثم اكتب مخارج الحروف العربية موضحاً-
(গ) মাখরাজ এর পরিচয় দাও। অতঃপর আরবি হরফের মাখরাজসমূহ বিশদভাবে লিখ।
মাখরাজের পরিচয়:
আভিধানিক অর্থ: ‘মাখরাজ’ (مَخْرَج) শব্দটি خرج থেকে এসেছে, যার অর্থ বের হওয়ার স্থান (محل الخروج)।
পারিভাষিক অর্থ: আরবি হরফ উচ্চারণের সময় মানুষের মুখের ভেতর কণ্ঠনালি থেকে শুরু করে ঠোঁট পর্যন্ত যে নির্দিষ্ট স্থান থেকে হরফটি উচ্চারিত হয় বা যেখানে আওয়াজ গিয়ে থেমে যায়, সেই স্থানটিকেই উক্ত হরফের ‘মাখরাজ’ বলা হয়।
আরবি হরফের মাখরাজসমূহ:
আল্লামা ইবনুল জাযারি এবং অধিকাংশ তাজভিদবিদের মতে আরবি হরফের মাখরাজ মোট ১৭টি। এগুলো মানুষের মুখের ৫টি প্রধান অংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। যথা:
- আল-জাওফ (الجوف): মুখের ভেতরের ফাঁকা স্থান। এখান থেকে ১টি মাখরাজ।
– মাখরাজ ১: মদের ৩টি হরফ (আলিফ, ওয়াও, ইয়া) উচ্চারিত হয়। - আল-হালক (الحلق): কণ্ঠনালি বা গলা। এখান থেকে ৩টি মাখরাজ (৬টি হরফ)।
– মাখরাজ ২: কণ্ঠনালির নিচের অংশ (আকসাল হালক) থেকে (ء, هـ)।
– মাখরাজ ৩: কণ্ঠনালির মাঝখান (ওয়াসাতুল হালক) থেকে (ع, ح)।
– মাখরাজ ৪: কণ্ঠনালির উপরের অংশ (আদনাল হালক) থেকে (غ, خ)। - আল-লিসান (اللسان): জিহ্বা। এখান থেকে ১০টি মাখরাজ (১৮টি হরফ)।
– মাখরাজ ৫: জিহ্বার গোড়া ও ওপরের তালু (ق)।
– মাখরাজ ৬: জিহ্বার গোড়া থেকে একটু আগে ও তালু (ك)।
– মাখরাজ ৭: জিহ্বার মধ্যখান ও তালু (ج, ش, ي)।
– মাখরাজ ৮: জিহ্বার কিনারা ও ওপরের মাড়ির দাঁত (ض)।
– মাখরাজ ৯: জিহ্বার অগ্রভাগের কিনারা ও সামনের দাঁতের মাড়ি (ل)।
– মাখরাজ ১০: জিহ্বার অগ্রভাগ ও তালু (ن)।
– মাখরাজ ১১: জিহ্বার অগ্রভাগের পিঠ ও তালু (ر)।
– মাখরাজ ১২: জিহ্বার অগ্রভাগ ও সামনের ওপরের দুই দাঁতের গোড়া (ط, د, ت)।
– মাখরাজ ১৩: জিহ্বার অগ্রভাগ ও সামনের নিচের দুই দাঁতের পেট (ص, ز, س)।
– মাখরাজ ۱۴: জিহ্বার অগ্রভাগ ও সামনের ওপরের দুই দাঁতের আগা (ظ, ذ, ث)। - আশ-শাফাতান (الشفتان): দুই ঠোঁট। এখান থেকে ২টি মাখরাজ (৪টি হরফ)।
– মাখরাজ ১৫: নিচের ঠোঁটের পেট ও সামনের ওপরের দুই দাঁতের আগা (ف)।
– মাখরাজ ১৬: দুই ঠোঁট থেকে (و, ب, م)। - আল-খাইশুম (الخيشوم): নাকের বাঁশি। এখান থেকে ১টি মাখরাজ।
– মাখরাজ ১৭: নাসিক্যধ্বনি বা গুন্নাহ এখান থেকে উচ্চারিত হয়।
(د) اذكر أحكام النون الساكنة والتنوين ممثلاً-
(ঘ) নূন সাকিন ও তানভীনের বিধানসমূহ উদাহরণসহ বর্ণনা কর।
নূন সাকিন (যে নূনের ওপর জযম বা সাকিন থাকে) এবং তানভীন (দুই জবর, দুই জের ও দুই পেশ)-এর বিধান মূলত একই। এদের হুকুম বা বিধান ৪টি:
- ইযহার (الإظهار): অর্থ স্পষ্ট করা। নূন সাকিন বা তানভীনের পর যদি হালকী হরফ বা কণ্ঠনালির ৬টি হরফের (ء, هـ, ع, ح, غ, خ) কোনো একটি আসে, তবে গুন্নাহ ছাড়া স্পষ্ট করে পড়তে হয়। একে ইযহারে হালকী বলে।
উদাহরণ: مِنْ خَوْفٍ (মিন খাওফ), سَمِيعٌ عَلِيمٌ (সামিয়ুন আলীম)। - ইদগাম (الإدغام): অর্থ মিলিয়ে পড়া। নূন সাকিন বা তানভীনের পর যদি يَرْمَلُون (ي, ر, م, ل, و, ن) এই ৬টি হরফের কোনো একটি আসে, তবে মিলিয়ে পড়তে হয়। এর দুটি ভাগ রয়েছে:
– ইদগামে বা-গুন্নাহ (গুন্নাহসহ): ي, م, و, ن আসলে গুন্নাহর সাথে মেলাতে হয়। উদাহরণ: مَنْ يَّعْمَلْ (মায়ঁ ইয়া’মাল)।
– ইদগামে বিলা-গুন্নাহ (গুন্নাহ ছাড়া): ل, ر আসলে গুন্নাহ ছাড়া মেলাতে হয়। উদাহরণ: مِنْ رَّبِّهِمْ (মির রব্বিহিম)। - ইকলাব (الإقلاب): অর্থ পরিবর্তন করা। নূন সাকিন বা তানভীনের পর যদি (ب) হরফটি আসে, তবে নূন সাকিন বা তানভীনকে ছোট একটি মীম (م) দ্বারা পরিবর্তন করে গুন্নাহর সাথে পড়তে হয়।
উদাহরণ: مِنْ بَعْدِ কে পড়তে হবে مِمْ بَعْدِ (মিম বা’দি)। - ইখফা (الإخفاء): অর্থ গোপন করা। ইযহার, ইদগাম ও ইকলাবের মোট ১৩টি হরফ বাদে আরবি বর্ণমালার বাকি ১৫টি হরফের কোনো একটি যদি নূন সাকিন বা তানভীনের পর আসে, তবে গুন্নাহর সাথে নাকের বাঁশিতে লুকিয়ে উচ্চারণ করতে হয়। একে ইখফায়ে হাকিকি বলে।
উদাহরণ: مِنْ قَبْلُ (মিং ক্ববলু), أَنْزَلَ (আংযালা)।
২. নিচের যেকোনো দুটি প্রশ্নের উত্তর দাও: (أجب عن اثنين من الأسئلة التالية)
(أ) عرف الوقف واكتب علاماته-
(ক) ওয়াকফ এর পরিচয় দাও। এর আলামতসমূহ লিপিবদ্ধ কর।
ওয়াকফ (الوقف)-এর পরিচয়:
আভিধানিক অর্থ: ‘ওয়াকফ’ শব্দের অর্থ হলো থামা, বিরতি দেওয়া, নিবৃত হওয়া বা বিরত থাকা (الحبس বা الكف)।
পারিভাষিক অর্থ: কুরআন তিলাওয়াত করার সময় শ্বাস গ্রহণের উদ্দেশ্যে তিলাওয়াত পুনরায় শুরু করার নিয়তে কোনো শব্দের শেষে আওয়াজ ও শ্বাস সাময়িকভাবে বন্ধ করাকে ‘ওয়াকফ’ বলে।
قَطْعُ الصَّوْتِ عَلَى الْكَلِمَةِ الْقُرْآنِيَّةِ زَمَنًا يَتَنَفَّسُ فِيهِ عَادَةً بِنِيَّةِ اسْتِئْنَافِ الْقِرَاءَةِ.
ওয়াকফের আলামতসমূহ (علامات الوقف):
তিলাওয়াতকারীর সুবিধার্থে কুরআনের আয়াতগুলোর মাঝে থামার কিছু সংকেত বা আলামত ব্যবহার করা হয়। আল্লামা সাজাওয়ান্দি (রহ.) সর্বপ্রথম এই আলামতগুলো নির্ধারণ করেন। উল্লেখযোগ্য আলামতগুলো হলো:
- (م) ওয়াকফে লাযিম: এখানে অবশ্যই থামতে হবে। না থামলে অর্থ মারাত্মকভাবে বিকৃত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
- (ط) ওয়াকফে মুতলাক: এখানে থামা উত্তম। এর মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ বাক্য শেষ হয়।
- (ج) ওয়াকফে জায়িয: এখানে থামা এবং মিলিয়ে পড়া—উভয়টিই জায়েজ। তবে থামা ভালো।
- (ز) ওয়াকফে মুজাওওয়ায: এখানে না থামা উত্তম, তবে থামার অনুমতি রয়েছে।
- (ص) ওয়াকফে মুরাখখাস: এখানে না থেমে মিলিয়ে পড়া উত্তম। তবে শ্বাস ছোট হলে থামার অবকাশ আছে।
- (لا) ওয়াকফে মামনু: এখানে থামা সম্পূর্ণ নিষেধ। থামলে অর্থ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তবে আয়াতের শেষে গোল চিহ্নের () ওপর ‘লা’ থাকলে সেখানে থামা যাবে।
- (قلى) আল-ওয়াকফু আওলা: এখানে মিলিয়ে পড়ার চেয়ে থামা উত্তম।
- (صلى) আল-ওয়াসলু আওলা: এখানে থামার চেয়ে মিলিয়ে পড়া উত্তম।
- (∴ ∴) মু’আনাকা বা মুরাকাবা: কাছাকাছি দুটি স্থানে তিনটি করে ফোঁটা থাকে। এর নিয়ম হলো যেকোনো এক স্থানে থামতে হবে, উভয় স্থানে থামা বা উভয় স্থানে মিলিয়ে পড়া জায়েজ নয়।
(ب) اكتب أنواع صفات الحروف بالإيجاز-
(খ) সিফাতুল হুরুফ এর প্রকারসমূহ সংক্ষেপে লিখ।
সিফাত (الصفات) অর্থ বৈশিষ্ট্য বা গুণাগুণ। হরফ উচ্চারণের সময় মাখরাজ থেকে যে বিশেষ অবস্থায় বা বৈশিষ্ট্যে আওয়াজ বের হয়, তাকে সিফাত বলে।
তাজভিদবিদদের মতে সিফাত প্রধানত ২ প্রকার:
১. সিফাতে লাযিমাহ (الصفات اللازمة):
যেসব সিফাত হরফের সত্তার সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত থাকে, যা বাদ পড়লে হরফের অস্তিত্ব বা উচ্চারণ সম্পূর্ণ বিকৃত হয়ে যায়, তাকে সিফাতে লাযিমাহ বলে। (যেমন- কলকলা, ইস্তিলা)। এই সিফাতগুলোকে আবার ২ ভাগে ভাগ করা যায়:
- সিফাতে মুতাযাদ্দাহ (পরস্পর বিপরীতমুখী সিফাত): এগুলো জোড়ায় জোড়ায় থাকে। একটির বিপরীতে আরেকটি থাকে। এই সিফাত ৫ জোড়া বা মোট ১০টি। (মাঝখানে ‘তাওয়াসসুত’ যুক্ত করলে ১১টি)। যেমন:
- জাহর (আওয়াজ শক্ত) — হামস (আওয়াজ নরম/বাতাস জারি)।
- শিদ্দাহ (আওয়াজ বন্ধ) — রিখওয়াহ (আওয়াজ জারি)।
- ইস্তিলা (জিহ্বা ওপরে ওঠা) — ইস্তিফাল (জিহ্বা নিচে থাকা)।
- ইত্ববাক (জিহ্বা তালুর সাথে মেলা) — ইনফিতাহ (জিহ্বা আলাদা থাকা)।
- ইযলাক (দ্রুত উচ্চারণ) — ইসমাত (জোর দিয়ে উচ্চারণ)।
- সিফাতে গায়রে মুতাযাদ্দাহ (বিপরীতবিহীন সিফাত): এদের কোনো বিপরীত সিফাত নেই। এগুলো মোট ৭টি: সফীর, কলকলা, লীন, ইনহিরাফ, তাকরীর, তাফাশশী এবং ইস্তিতালাহ।
২. সিফাতে আরিজাহ (الصفات العارضة):
যেসব সিফাত হরফের সত্তার সাথে সর্বদা যুক্ত থাকে না, বরং অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কখনো আসে এবং কখনো বিলুপ্ত হয়, সেগুলোকে সিফাতে আরিজাহ বলে। যেমন: তাফখিম (মোটা করা), তারকীক (পাতলা করা), ইদগাম, ইখফা, ইযহার, মদ বা গুন্নাহ ইত্যাদি। এগুলো মূলত তাজভিদের আনুষঙ্গিক নিয়ম।
(ج) اكتب أحكام اللحن ممثلاً-
(গ) লাহান এর হুকুমসমূহ উদাহরণসহ লিখ।
লাহান (اللحن) অর্থ হলো কুরআন তিলাওয়াতে ভুল করা। লাহান প্রধানত ২ প্রকার এবং এদের হুকুমও ভিন্ন ভিন্ন:
১. লাহনে জলী (اللحن الجلي – প্রকাশ্য ভুল):
হরফ উচ্চারণ বা হরকতের ক্ষেত্রে এমন সুস্পষ্ট ভুল করা, যার কারণে শব্দের অর্থ বা আরবি ব্যাকরণ চরমভাবে বিকৃত হয়ে যায়।
হুকুম (বিধান): লাহনে জলী করা হারাম (حرام) বা কবিরা গুনাহ। নামাজরত অবস্থায় এমন ভুল করলে নামাজ বাতিল হয়ে যায়।
উদাহরণ:
- হরফ পরিবর্তন: الحمد (সকল প্রশংসা) এর জায়গায় الهمد (মৃত্যু) পড়া। ح এর জায়গায় هـ পড়া।
- হরকত পরিবর্তন: সূরা ফাতিহার أَنْعَمْتَ (আপনি নেয়ামত দিয়েছেন)-এর (ত)-এর ওপর যবর না পড়ে أَنْعَمْتُ (আমি নেয়ামত দিয়েছি) পড়া। এতে অর্থের মারাত্মক বিকৃতি ঘটে।
২. লাহনে খফী (اللحن الخفي – অপ্রকাশ্য বা সূক্ষ্ম ভুল):
তাজভিদের সিফাত বা আনুষঙ্গিক নিয়মে এমন ভুল করা, যার কারণে শব্দের অর্থ বিকৃত হয় না, তবে তিলাওয়াতের সৌন্দর্য ও পূর্ণতা নষ্ট হয়।
হুকুম (বিধান): লাহনে খফী করা মাকরুহ (مكروه)। এতে নামাজ বাতিল হয় না, তবে তিলাওয়াতের পূর্ণ সওয়াব থেকে বঞ্চিত হতে হয়।
উদাহরণ:
- যেখানে গুন্নাহ করা ওয়াজিব, সেখানে গুন্নাহ না করা। (যেমন: مِنْ يَّقُولُ ইদগাম না করে পড়া)।
- মদ বা টান দেওয়ার জায়গায় টান না দেওয়া, অথবা মোটা হরফ পাতলা করে পড়া।
(د) تحدث عن أحكام الراء موضحاً-
(ঘ) রা (الراء) এর বিধানসমূহ বিশদভাবে আলোচনা কর।
কুরআন তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে ‘রা’ (ر) হরফটি উচ্চারণের তিনটি বিধান রয়েছে: তাফখিম (মোটা করে পড়া), তারকীক (পাতলা করে পড়া) এবং জাওযুল ওয়াজহাইন (উভয়টি জায়েজ)।
১. তাফখিম (التفخيم) বা মোটা করে পড়া:
- রা-এর ওপর জবর বা পেশ থাকলে। যেমন: رَحْمَةٌ ، رُزِقُوا
- রা-সাকিন হলে এবং তার আগের হরফে জবর বা পেশ থাকলে। যেমন: مَرْيَمَ ، قُرْآنٌ
- রা-সাকিন এবং তার পূর্বে আরিজী (অস্থায়ী) জের থাকলে। যেমন: ارْجِعِي
- রা-সাকিন, তার পূর্বে আসলী (স্থায়ী) জের, কিন্তু রা-এর পর একই শব্দে ইস্তিলার (মোটা) হরফ থাকলে। যেমন: مِرْصَادٌ ، فِرْقَةٍ
২. তারকীক (الترقيق) বা পাতলা করে পড়া:
- রা-এর নিচে জের থাকলে। যেমন: رِجَالٌ
- রা-সাকিন এবং তার আগের হরফে আসলী (স্থায়ী) জের থাকলে এবং পরে ইস্তিলার হরফ না থাকলে। যেমন: فِرْعَوْنَ ، مِرْيَةٍ
- ওয়াকফের কারণে রা-সাকিন হলে এবং তার পূর্বে ইয়া-সাকিন (يْ) থাকলে। যেমন: خَيْرٌ ، قَدِيرٌ
৩. জাওযুল ওয়াজহাইন (جواز الوجهين) বা উভয় নিয়মে পড়া জায়েজ:
- যদি রা-সাকিনের পূর্বে আসলী জের থাকে এবং রা-সাকিনের পরে ইস্তিলার হরফ থাকে, আর সেই ইস্তিলার হরফটির নিচে জের থাকে। তখন মোটা বা পাতলা উভয়ভাবে পড়া জায়েজ (তবে পাতলা পড়া উত্তম)।
উদাহরণ: সূরা শুয়ারার ৬৩ নং আয়াত- فِرْقٍ (ফিরকিন)।
مجموعة (ب) খ অংশ
৩. নিচের যেকোনো দুটি সূরা মুখস্থ লিখ: (اكتب من حفظك اثنين من السور التالية)
পরীক্ষার্থীদের সুবিধার্থে এখানে চারটিরই উত্তর দেওয়া হলো:
(أ) سورة العلق (সূরা আলাক)
اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ كَلَّا إِنَّ الْإِنْسَانَ لَيَطْغَى أَنْ رَآهُ اسْتَغْنَى إِنَّ إِلَى رَبِّكَ الرُّجْعَى أَرَأَيْتَ الَّذِي يَنْهَى عَبْدًا إِذَا صَلَّى أَرَأَيْتَ إِنْ كَانَ عَلَى الْهُدَى أَوْ أَمَرَ بِالتَّقْوَى أَرَأَيْتَ إِنْ كَذَّبَ وَتَوَلَّى أَلَمْ يَعْلَمْ بِأَنَّ اللَّهَ يَرَى كَلَّا لَئِنْ لَمْ يَنْتَهِ لَنَسْفَعًا بِالنَّاصِيَةِ نَاصِيَةٍ كَاذِبَةٍ خَاطِئَةٍ فَلْيَدْعُ نَادِيَهُ سَنَدْعُ الزَّبَانِيَةَ كَلَّا لَا تُطِعْهُ وَاسْجُدْ وَاقْتَرِبْ ۩
(ب) سورة الانفطار (সূরা ইনফিতার)
إِذَا السَّمَاءُ انْفَطَرَتْ وَإِذَا الْكَوَاكِبُ انْتَثَرَتْ وَإِذَا الْبِحَارُ فُجِّرَتْ وَإِذَا الْقُبُورُ بُعْثِرَتْ عَلِمَتْ نَفْسٌ مَا قَدَّمَتْ وَأَخَّرَتْ يَا أَيُّهَا الْإِنْسَانُ مَا غَرَّكَ بِرَبِّكَ الْكَرِيمِ الَّذِي خَلَقَكَ فَسَوَّاكَ فَعَدَلَكَ فِي أَيِّ صُورَةٍ مَا شَاءَ رَكَّبَكَ كَلَّا بَلْ تُكَذِّبُونَ بِالدِّينِ وَإِنَّ عَلَيْكُمْ لَحَافِظِينَ كِرَامًا كَاتِبِينَ يَعْلَمُونَ مَا تَفْعَلُونَ إِنَّ الْأَبْرَارَ لَفِي نَعِيمٍ وَإِنَّ الْفُجَّارَ لَفِي جَحِيمٍ يَصْلَوْنَهَا يَوْمَ الدِّينِ وَمَا هُمْ عَنْهَا بِغَائِبِينَ وَمَا أَدْرَاكَ مَا يَوْمُ الدِّينِ ثُمَّ مَا أَدْرَاكَ مَا يَوْمُ الدِّينِ يَوْمَ لَا تَمْلِكُ نَفْسٌ لِنَفْسٍ شَيْئًا وَالْأَمْرُ يَوْمَئِذٍ لِلَّهِ
(ج) سورة الضحى (সূরা দোহা)
وَالضُّحَى وَاللَّيْلِ إِذَا سَجَى مَا وَدَّعَكَ رَبُّكَ وَمَا قَلَى وَلَلْآخِرَةُ خَيْرٌ لَكَ مِنَ الْأُولَى وَلَسَوْفَ يُعْطِيكَ رَبُّكَ فَتَرْضَى أَلَمْ يَجِدْكَ يَتِيمًا فَآوَى وَوَجَدَكَ ضَالًّا فَهَدَى وَوَجَدَكَ عَائِلًا فَأَغْنَى فَأَمَّا الْيَتِيمَ فَلَا تَقْهَرْ وَأَمَّا السَّائِلَ فَلَا تَنْهَرْ وَأَمَّا بِنِعْمَةِ رَبِّكَ فَحَدِّثْ
(د) سورة الليل (সূরা লাইল)
وَاللَّيْلِ إِذَا يَغْشَى وَالنَّهَارِ إِذَا تَجَلَّى وَمَا خَلَقَ الذَّكَرَ وَالْأُنْثَى إِنَّ سَعْيَكُمْ لَشَتَّى فَأَمَّا مَنْ أَعْطَى وَاتَّقَى وَصَدَّقَ بِالْحُسْنَى فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْيُسْرَى وَأَمَّا مَنْ بَخِلَ وَاسْتَغْنَى وَكَذَّبَ بِالْحُسْنَى فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْعُسْرَى وَمَا يُغْنِي عَنْهُ مَالُهُ إِذَا تَرَدَّى إِنَّ عَلَيْنَا لَلْهُدَى وَإِنَّ لَنَا لَلْآخِرَةَ وَالْأُولَى فَأَنْذَرْتُكُمْ نَارًا تَلَظَّى لَا يَصْلَاهَا إِلَّا الْأَشْقَى الَّذِي كَذَّبَ وَتَوَلَّى وَسَيُجَنَّبُهَا الْأَتْقَى الَّذِي يُؤْتِي مَالَهُ يَتَزَكَّى وَمَا لِأَحَدٍ عِنْدَهُ مِنْ نِعْمَةٍ تُجْزَى إِلَّا ابْتِغَاءَ وَجْهِ رَبِّهِ الْأَعْلَى وَلَسَوْفَ يَرْضَى
مجموعة (ج) গ অংশ
৪. নিচের যেকোনো দুটি কুরআনের নস (আয়াত) অনুবাদ কর এবং সংলগ্ন প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
(أ) والعصر- ان الانسان لفي خسر- إلا الذين أمنوا وعملوا الصلحت وتواصوا بالحق- وتواصوا بالصبر-
(ক) সূরা আল-আসর এর অনুবাদ, তাফসির এবং তাহকীক।
সরল অনুবাদ:
কসম যুগের (সময়ের), নিশ্চয় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ততায় নিপতিত, তবে তারা ছাড়া যারা ঈমান এনেছে, সৎকাজ করেছে, পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দিয়েছে এবং পরস্পরকে ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে।
(1) “ان الانسان لفي خسر” আয়াতের তাফসির:
এই আয়াতে মহান আল্লাহ সময়ের শপথ করে একটি শাশ্বত সত্য ঘোষণা করেছেন। ‘আল-ইনসান’ (الإنْسَان) শব্দের আলিফ-লাম দ্বারা সমগ্র মানবজাতিকে বোঝানো হয়েছে এবং ‘খুসর’ (خُسْر) অর্থ ধ্বংস, লোকসান বা ক্ষতি। অর্থাৎ, স্বভাবগতভাবেই পৃথিবীর সমস্ত মানুষ চরম ক্ষতি ও বিনাশের মধ্যে ডুবে আছে, কারণ তাদের জীবনের মহামূল্যবান সময় বরফের মতো গলে গলে শেষ হয়ে যাচ্ছে। তবে পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ ৪টি গুণাবলি সম্পন্ন মানুষদের এই ক্ষতির হাত থেকে ব্যতিক্রম ঘোষণা করেছেন— ১. ঈমান আনা, ২. নেক আমল করা, ৩. অন্যকে সত্যের দাওয়াত দেওয়া এবং ৪. দীনের ওপর ধৈর্য ধারণ করা।
(2) শব্দগুলোর তাহকীক (حقق كلمات الآتية):
- خسر (খুসর): এটি اِسْم مَصْدَر (ইসমে মাসদার)। মূলক্ষর: خ – س – ر। অর্থ: ক্ষতি, লোকসান।
- عملوا (আমিলু): صِيغَة (সিগাহ)- জমা মুযাক্কার গায়িব। بَحْث (বহস)- ইসবাত ফেলে মাজি মারুফ। بَاب (বাব)- سَمِعَ (সামি’আ)। মূলক্ষর: ع – م – ل। অর্থ: তারা সৎকাজ করেছে।
- تواصوا (তাওয়াসাও): صِيغَة (সিগাহ)- জমা মুযাক্কার গায়িব। بَحْث (বহস)- ইসবাত ফেলে মাজি মারুফ। بَاب (বাব)- تَفَاعُل (তাফা’উল)। মূলক্ষর: و – ص – ي। অর্থ: তারা পরস্পরকে উপদেশ দিয়েছে।
- الحق (আল-হাক্ক): صِيغَة (সিগাহ)- ওয়াহিদ বা একবচন। মূলক্ষর: ح – ق – ق। অর্থ: সত্য, ন্যায়।
(ب) انا انزلنه في ليلة القدر- وما ادرك ما ليلة القدر- ليلة القدر خير من الف شهر- تنزل الملائكة والروح فيها باذن ربهم من كل امر- سلم هي حتى مطلع الفجر-
(খ) সূরা আল-কদর এর অনুবাদ, তাফসির এবং লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব।
সরল অনুবাদ:
নিশ্চয় আমি একে (কুরআন) মহিমান্বিত রজনীতে অবতীর্ণ করেছি। আপনি কি জানেন মহিমান্বিত রজনী কী? মহিমান্বিত রজনী হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। সে রাতে ফেরেশতাগণ ও রুহ (জিবরাঈল) তাদের রবের অনুমতিক্রমে সকল সিদ্ধান্ত নিয়ে অবতরণ করেন। শান্তিময় সেই রাত, ফজরের উদয় পর্যন্ত।
(1) “تنزل الملائكة والروح فيها باذن ربهم من كل امر” আয়াতের তাফসির:
এই আয়াতে শবে কদর বা লাইলাতুল কদরের এক অভাবনীয় দৃশ্যের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এই বরকতময় রাতে পৃথিবীতে অসংখ্য রহমতের ফেরেশতা নেমে আসেন। ‘রুহ’ (الرُّوْح) বলতে এখানে ফেরেশতাদের সরদার হযরত জিবরাঈল (আ.)-কে বোঝানো হয়েছে। তাঁরা আল্লাহর নির্দেশে আগামী এক বছরের জন্য মানুষের রিজিক, হায়াত-মউত এবং ভাগ্য সংক্রান্ত যাবতীয় ফয়সালা (كُلِّ أَمْرٍ) নিয়ে পৃথিবীতে অবতরণ করেন এবং মুমিনদের ওপর রহমত ও শান্তি বর্ষণ করতে থাকেন।
(2) লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব (أهمية ليلة القدر):
- হাজার মাসের চেয়ে উত্তম: এই এক রাতের ইবাদত এক হাজার মাস (প্রায় ৮৩ বছর ৪ মাস) ইবাদত করার চেয়েও বেশি সওয়াবপূর্ণ।
- কুরআন নাজিলের রাত: এই রাতেই লওহে মাহফুজ থেকে প্রথম আসমানে পবিত্র কুরআন একসঙ্গে অবতীর্ণ করা হয়েছে। তাই এই রাত এতো মহিমান্বিত।
- গুনাহ মাফ হওয়ার রাত: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরে রাত জেগে ইবাদত করবে, তার অতীতের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।” (বুখারি ও মুসলিম)
- শান্তি ও রহমতের রাত: এই রাতে ফেরেশতারা পৃথিবীতে ঘুরে ঘুরে মুমিনদের সালাম ও শান্তি প্রদান করেন, যা ফজর পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।
(ج) والليل اذا يغشى- والنهار اذا تجلى- وما خلق الذكر والانثى- ان سعيكم لشتى- فاما من اعطى واتقى- وصدق بالحسنى- فسنيسره لليسرى-
(গ) সূরা আল-লাইল এর অনুবাদ, বৈশিষ্ট্য ও তাহকীক।
সরল অনুবাদ:
শপথ রাতের, যখন সে আচ্ছন্ন করে। শপথ দিনের, যখন সে আলোকিত হয়। শপথ তাঁর, যিনি নর ও নারী সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় তোমাদের কর্মপ্রচেষ্টা বিভিন্ন প্রকৃতির। অতঃপর যে দান করে এবং তাকওয়া অবলম্বন করে। এবং উত্তম বিষয়কে সত্য মনে করে। আমি তার জন্য সহজ পথ (জান্নাত) সুগম করে দেব।
(1) রাত ও দিনের বৈশিষ্ট্যাবলি:
কুরআনের বর্ণনানুযায়ী রাতের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি তার অন্ধকার দিয়ে সমগ্র জগতকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, যা মানুষের বিশ্রাম ও প্রশান্তির জন্য আল্লাহ নির্ধারণ করেছেন। অন্যদিকে দিনের বৈশিষ্ট্য হলো এটি আলোর ঝলকানি নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে, অন্ধকার দূর করে এবং মানুষকে তাদের জীবিকা অন্বেষণ ও কাজ করার সুযোগ করে দেয়। এই দুই বিপরীতমুখী অবস্থাই মহান আল্লাহর অসীম ক্ষমতার নিদর্শন।
(2) শব্দগুলোর বিশ্লেষণ বা তাহকীক (حلل الكلمات الآتية):
- يغشى (ইয়াগশা): صِيغَة- ওয়াহিদ মুযাক্কার গায়িব। بَحْث- ইসবাত ফেলে মুযারি মারুফ। بَاب- فَتَحَ (ফাতাহা)। অর্থ: সে ঢেকে নেয় / আচ্ছন্ন করে।
- تجلّى (তাজাল্লা): صِيغَة- ওয়াহিদ মুযাক্কার গায়িব। بَحْث- ইসবাত ফেলে মাজি মারুফ। بَاب- تَفَعُّل (তাফা’উল)। অর্থ: সে আলোকিত হয় / প্রকাশ পায়।
- لشتّى (লাশাত্তা): এখানকার ‘লাম’ (لَ) টি তাকীদ বা নিশ্চয়তা প্রদানের জন্য এসেছে। شَتَّى শব্দটি شَتِيت এর বহুবচন। অর্থ: বিভিন্ন, বিক্ষিপ্ত বা নানা প্রকৃতির।
- واتقى (ওয়াত্তাক্বা): صِيغَة- ওয়াহিদ মুযাক্কার গায়িব। بَحْث- ইসবাত ফেলে মাজি মারুফ। بَاب- اِفْتِعَال (ইফতি’আল)। মূলক্ষর: و – ق – ي। অর্থ: সে তাকওয়া অবলম্বন করেছে / ভয় করেছে।
(د) قل يايها الكفرون- لا اعبد ما تعبدون- ولا انتم عبدون ما اعبد- ولا انا عابد ما عبدتم- ولا انتم عابدون ما اعبد- لكم دينكم ولي دين-
(ঘ) সূরা আল-কাফিরুন এর অনুবাদ, শানে নুযুল এবং তাফসির।
সরল অনুবাদ:
বলুন, হে কাফিররা! আমি তার ইবাদত করি না যার ইবাদত তোমরা কর। এবং তোমরাও তাঁর ইবাদতকারী নও যাঁর ইবাদত আমি করি। এবং আমি ইবাদতকারী নই তার যার ইবাদত তোমরা করেছ। এবং তোমরাও তাঁর ইবাদতকারী নও যাঁর ইবাদত আমি করি। তোমাদের দীন তোমাদের জন্য, আর আমার দীন আমার জন্য।
(1) সূরাটি নাযিল হওয়ার প্রেক্ষাপট (خلفية نزول هذه السورة):
মক্কার কুরাইশ নেতারা (যেমন- ওয়ালিদ বিন মুগিরা, আস বিন ওয়ায়িল, উমাইয়া বিন খালাফ প্রমুখ) যখন দেখল যে কোনো বাধাই ইসলামের প্রচার ঠেকাতে পারছে না, তখন তারা নবীজি (সা.)-এর কাছে একটি আপস বা সন্ধির প্রস্তাব নিয়ে এলো। তারা বলল, “হে মুহাম্মদ! আসুন আমরা একটি সমঝোতায় আসি। আপনি এক বছর আমাদের মাবুদদের (মূর্তিদের) ইবাদত করবেন, আর আমরা এক বছর আপনার রবের ইবাদত করব।” শিরকের সাথে তাওহিদের এই ধরনের হাস্যকর ও অসম্ভব আপস প্রস্তাবকে চিরতরে বাতিল করে দিয়ে এবং কাফিরদের সাথে সম্পূর্ণ সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা দিয়ে মহান আল্লাহ এই সূরাটি নাযিল করেন।
(2) “لكم دينكم ولي دين” আয়াতের তাফসির:
আয়াতের অর্থ: “তোমাদের দীন (ধর্ম) তোমাদের জন্য, আর আমার দীন আমার জন্য।” এটি কোনোভাবেই অন্য ধর্মকে স্বীকৃতি দেওয়া বা সকল ধর্ম সমান—এমন অর্থ বহন করে না। বরং এটি হলো কুফর ও শিরকের সাথে ইসলামের চূড়ান্ত সম্পর্কচ্ছেদের বা বারা’আত (البراءة) এর ঘোষণা। অর্থাৎ, তোমরা যদি তোমাদের বাতিল ও শিরকি ধর্মে অটল থাকতে চাও, তবে তার পরিণতি তোমরাই ভোগ করবে। আমি কোনো অবস্থাতেই আমার সত্য দীন ‘ইসলাম’ ছেড়ে তোমাদের মূর্তিপূজায় শরিক হবো না। তাওহিদ ও শিরক কখনোই এক হতে পারে না।






