Al Madkhal ila Ulumil Quran (আল-মাদখাল ইলা উলুমিল কুরআন) 201101 – Fazil Hons Al Quran 1st Year 2020 QnA

Join Our Telegram Channel
দ্রুত নতুন বই পেতে যুক্ত থাকুন
Join Now
admin
al madkhal ila ulumil quran 201101 fazil hons al quran 1st year 2020
Join Our WhatsApp Channel
দ্রুত নতুন বই পেতে যুক্ত থাকুন
Join Now
📋 সূচিপত্র (Table of Contents)

আল-মাদখাল ইলা উলুমিল কুরআন (Code: 201101) – ২০২০ প্রশ্ন ও উত্তর

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২০ এর আল-কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের আল-মাদখাল ইলা উলুমিল কুরআন বিষয়ের সম্পূর্ণ এবং বিস্তারিত উত্তরমালা।

ক অংশ (রচনামূলক প্রশ্ন) – যেকোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও

۱- عرّف القرآن الكريم- ثم اكتب أسمائه وأوصافه في ضوء القرآن والسنة-
১. কুরআন কারীমের পরিচয় দাও। অতঃপর কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এর নাম ও বিশেষত্বসমূহ আলোচনা কর।

ভূমিকা:

মহাগ্রন্থ আল-কুরআন মহান আল্লাহ তায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ আসমানি কিতাব, যা বিশ্বমানবতার মুক্তির সনদ হিসেবে সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর দীর্ঘ ২৩ বছরে অবতীর্ণ হয়েছে। এর ভেতরে রয়েছে মানবজীবনের সকল সমস্যার নিখুঁত সমাধান।

আল-কুরআনের আভিধানিক পরিচয়:

‘কুরআন’ (قرآن) শব্দটি আরবি ভাষার ‘কারআ’ (قرأ) মূলধাতু থেকে নির্গত। এর আভিধানিক অর্থ হলো- পড়া, পঠিত, জমা করা বা একত্রিত করা ইত্যাদি। যেহেতু পৃথিবীতে এই গ্রন্থটি সবচেয়ে বেশি পঠিত হয় এবং এর মধ্যে পূর্ববর্তী সকল আসমানি কিতাবের নির্যাস একত্রিত করা হয়েছে, তাই একে কুরআন বলা হয়।

আল-কুরআনের পারিভাষিক পরিচয়:

ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় আল-কুরআনের চমৎকার একটি সংজ্ঞা প্রদান করেছেন উসূলবিদগণ:

كَلَامُ اللهِ الْمُعْجِزُ، الْمُنَزَّلُ عَلَى مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، الْمَكْتُوبُ فِي الْمَصَاحِفِ، الْمَنْقُولُ بِالتَّوَاتُرِ، الْمُتَعَبَّدُ بِتِلَاوَتِهِ.

অর্থ: “আল-কুরআন হলো মহান আল্লাহর এমন মুজিজাপূর্ণ বাণী, যা হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর অবতীর্ণ হয়েছে, যা মাসহাফসমূহে (গ্রন্থে) লিপিবদ্ধ রয়েছে, যা মুতাওয়াতির বা ধারাবাহিক সূত্রে আমাদের পর্যন্ত পৌঁছেছে এবং যার তিলাওয়াত করা একটি স্বতন্ত্র ইবাদত।”

কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে আল-কুরআনের নামসমূহ:

আল-কুরআনের বহু নাম রয়েছে, তবে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ কয়েকটি নাম নিচে আলোচনা করা হলো:

  1. আল-কুরআন (القرآن): এটি সবচেয়ে প্রসিদ্ধ নাম। আল্লাহ বলেন:
    إِنَّ هَذَا الْقُرْآنَ يَهْدِي لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ

    অর্থ: “নিশ্চয় এই কুরআন এমন পথপ্রদর্শন করে যা সর্বাধিক সঠিক।” (সূরা বনী ইসরাঈল: ৯)

  2. আল-কিতাব (الكتاب): অর্থ লিখিত গ্রন্থ। আল্লাহ বলেন:
    ذَلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ فِيهِ

    অর্থ: “এটি এমন একটি কিতাব যাতে কোনো সন্দেহ নেই।” (সূরা বাকারা: ২)

  3. আল-ফুরকান (الفرقان): অর্থ সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী। আল্লাহ বলেন:
    تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَى عَبْدِهِ

    অর্থ: “বরকতময় তিনি যিনি তাঁর বান্দার ওপর ফুরকান অবতীর্ণ করেছেন।” (সূরা ফুরকান: ১)

  4. আয-যিকর (الذكر): অর্থ উপদেশ বা স্মরণিকা। আল্লাহ বলেন:
    إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ

    অর্থ: “নিশ্চয় আমিই যিকর অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষক।” (সূরা হিজর: ৯)

আল-কুরআনের বিশেষত্বসমূহ (خصائص القرآن):

  • রাব্বানিয়াত (ربانية) বা ঐশী গ্রন্থ: এটি মানুষের রচিত নয়, বরং সম্পূর্ণ আল্লাহর বাণী।
  • সর্বজনীনতা (عالمية): এই কিতাব নির্দিষ্ট কোনো দেশ বা জাতির জন্য নয়, বরং কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য অবতীর্ণ।
  • অপরিবর্তনীয়তা (حفظ): আল্লাহ তায়ালা নিজে এর সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন। ফলে এর একটি হরফ বা জের-যবরও পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
  • ইজাজ বা মুজিজা (إعجاز): কুরআনের ভাষা, শৈলী ও তথ্য এতই অনন্য যে, জিন ও মানবজাতি মিলেও এর একটি সূরার সমকক্ষ কিছু তৈরি করতে অক্ষম।
  • মুখস্থ করার সহজলভ্যতা (يسر الحفظ): এটি পৃথিবীর একমাত্র গ্রন্থ যা কোটি কোটি মানুষ সম্পূর্ণ মুখস্থ করে বুকে ধারণ করে রেখেছেন। আল্লাহ বলেন: “আমি কুরআনকে উপদেশ গ্রহণের জন্য সহজ করে দিয়েছি।”

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, কুরআন কেবল একটি ধর্মগ্রন্থ নয়, বরং মানবজীবনের এক পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। এর প্রতিটি নাম ও বিশেষত্ব এর ঐশ্বরিকতা ও অনন্যতার অকাট্য প্রমাণ বহন করে।

۲- ما معنى الوحي؟ ولم يحتاج إليه الإنسان؟ بين شبهات الجاحدين للوحي مع الرد عليهم-
২. ওহী অর্থ কী? মানুষের জন্য কেন ওহীর প্রয়োজন? ওহী অস্বীকারকারীদের কতিপয় সন্দেহ উত্তরসহ বর্ণনা কর।

ভূমিকা:

সৃষ্টির সূচনা থেকে মানুষকে হেদায়াতের পথ দেখানোর জন্য আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন এবং তাঁদের মাধ্যমে ঐশী দিকনির্দেশনা বা ‘ওহী’ পাঠিয়েছেন। ওহী হলো স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম এবং শরিয়তের মূল ভিত্তি।

ওহীর অর্থ ও পরিচয়:

আভিধানিক অর্থ: ‘ওহী’ (وحي) শব্দটির আভিধানিক অর্থ হলো- الإشارة السريعة الخفية (দ্রুত ও গোপনীয় ইঙ্গিত)। এছাড়া এর অর্থ ইশারা করা, গোপনে কথা বলা, ইলহাম বা অন্তরে প্রক্ষিপ্ত করা ইত্যাদিও হতে পারে।

পারিভাষিক অর্থ: ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় ওহী বলা হয়-

كَلَامُ اللهِ تَعَالَى الْمُنَزَّلُ عَلَى نَبِيٍّ مِنْ أَنْبِيَائِهِ لِبَيَانِ الْحَقِّ وَالْهُدَى.

অর্থ: “সত্য ও হেদায়াতের বর্ণনার উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহ তাঁর কোনো নবীর প্রতি যে বাণী অবতীর্ণ করেছেন, তাকেই ওহী বলা হয়।”

মানুষের জন্য ওহীর প্রয়োজনীয়তা:

মানুষের জীবনকে সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার জন্য ওহীর প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। প্রধান কয়েকটি কারণ নিচে দেওয়া হলো:

  • বুদ্ধির সীমাবদ্ধতা: মানুষের বিবেক বা বুদ্ধি একটি শক্তিশালী উপাদান, তবে এর একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। পঞ্চইন্দ্রিয়ের বাইরের জগৎ বা গায়েব (অদৃশ্য) সম্পর্কে মানুষ নিজ বুদ্ধিতে জানতে পারে না। যেমন: আখেরাত, জান্নাত, জাহান্নাম। এসব বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের একমাত্র উপায় হলো ওহী।
  • স্রষ্টার সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টি জ্ঞান: আল্লাহ কিসে খুশি হন এবং কিসে অসন্তুষ্ট হন, তা কোনো মানুষের পক্ষে গবেষণা করে বের করা সম্ভব নয়। ওহীর মাধ্যমেই আল্লাহ তাঁর পছন্দ-অপছন্দের কথা মানুষকে জানিয়েছেন।
  • পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান লাভ: মানুষের সমাজ, অর্থনীতি, রাষ্ট্র ও পারিবারিক জীবন কীভাবে পরিচালিত হবে তার একটি নির্ভুল সংবিধান প্রয়োজন। মানুষের তৈরি আইনে ভুলভ্রান্তি থাকে, কিন্তু আল্লাহর পাঠানো ওহী সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত।

ওহী অস্বীকারকারীদের কতিপয় সন্দেহ এবং তার খণ্ডন (উত্তর):

যুগে যুগে বিভ্রান্ত লোকেরা ওহী ও নবীজির রিসালাতকে অস্বীকার করার জন্য বিভিন্ন সন্দেহ বা অপবাদ ছড়ানোর চেষ্টা করেছে। প্রধান কয়েকটি সন্দেহ এবং এর দাঁতভাঙ্গা জবাব নিচে দেওয়া হলো:

সন্দেহ-১: ওহী বা কুরআন মুহাম্মদ (সা.)-এর নিজস্ব চিন্তা ও বুদ্ধিমত্তার ফসল।

উত্তর: এই দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কারণ, রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন ‘উম্মী’ বা নিরক্ষর। তিনি কারো কাছে পড়ালেখা শেখেননি। একজন নিরক্ষর মানুষের পক্ষে এমন সাহিত্যসমৃদ্ধ, বিজ্ঞানময় এবং ভূত-ভবিষ্যতের নির্ভুল তথ্য সম্বলিত গ্রন্থ রচনা করা অসম্ভব। তাছাড়া কুরআন মক্কাবাসীকে চ্যালেঞ্জ করেছিল এর একটি সূরার মতো সূরা বানিয়ে আনার জন্য, কিন্তু আরবের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকরাও তাতে ব্যর্থ হয়েছিল।

সন্দেহ-২: ওহী অবতীর্ণ হওয়ার সময় নবীজির যে ঘাম বা শারীরিক পরিবর্তন হতো, তা মূলত মৃগীরোগ (Epilepsy) বা স্নায়বিক অসুস্থতা ছিল (নাউযুবিল্লাহ)।

উত্তর: চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, মৃগীরোগে আক্রান্ত ব্যক্তি অজ্ঞান হয়ে পড়ে এবং জ্ঞান ফেরার পর সে কী প্রলাপ বকেছে তার কিছুই মনে রাখতে পারে না। অন্যদিকে, নবীজি (সা.) ওহী নাযিলের সময়কার কঠিন অবস্থা কেটে যাওয়ার পর অত্যন্ত সাবলীলভাবে, চমৎকার ও উচ্চাঙ্গের সাহিত্যিক ভাষায় আল্লাহর বাণী হুবহু তিলাওয়াত করে শোনাতেন, যা ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল আইন ও জ্ঞানে পরিপূর্ণ। এটি কখনোই কোনো অসুস্থ ব্যক্তির প্রলাপ হতে পারে না।

সন্দেহ-৩: নবীজি (সা.) অন্য কোনো মানুষের (যেমন: ওয়ারাকা বিন নওফল বা মক্কার কোনো অনারব দাস) কাছ থেকে এসব শিখেছেন।

উত্তর: ওয়ারাকা বিন নওফলের সাথে নবীজির সাক্ষাৎ হয়েছিল মাত্র একবার নবুওয়াতের একদম শুরুর দিকে এবং অল্প কিছুদিন পরই ওয়ারাকা ইন্তেকাল করেন। দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে নাযিল হওয়া এত বিশদ আইন-কানুন তার কাছ থেকে শেখার সুযোগই নেই। আর মক্কার যে দাসের কথা বলা হয়, সে ছিল অনারব, সে ভালো আরবিই বলতে পারত না। আল্লাহ কুরআনেই এর চমৎকার জবাব দিয়েছেন:

لِسَانُ الَّذِي يُلْحِدُونَ إِلَيْهِ أَعْجَمِيٌّ وَهَذَا لِسَانٌ عَرَبِيٌّ مُبِينٌ

অর্থ: “তারা যার প্রতি ইঙ্গিত করে তার ভাষা তো আরবি নয়, অথচ এটি (কুরআন) হলো সুস্পষ্ট আরবি ভাষা।” (সূরা নাহল: ১০৩)

উপসংহার: ওহী হলো মানবজাতির জন্য স্রষ্টার এক অমূল্য নিয়ামত। ওহী অস্বীকারকারীদের সকল সন্দেহ ও অপবাদ কেবল তাদের অজ্ঞতা ও হঠকারিতারই প্রমাণ বহন করে।

۳- عرّف القرآن الكريم والحديث القدسي والحديث النبوي بين الفرق بين هذه الثلاثة مع ذكر الأمثال-
৩. আল-কুরআন, হাদিসে কুদসী ও হাদিসে নববীর সংজ্ঞা দাও। অতঃপর উদাহরণসহ এ তিনটির মধ্যকার পার্থক্য বর্ণনা কর।

আল-কুরআন, হাদিসে কুদসী ও হাদিসে নববীর সংজ্ঞা:

১. আল-কুরআন: আল-কুরআন হলো মহান আল্লাহর মুজিজাপূর্ণ বাণী, যার শব্দ ও অর্থ উভয়ই সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর অবতীর্ণ হয়েছে এবং যা মুতাওয়াতির সূত্রে প্রমাণিত।

২. হাদিসে কুদসী (الحديث القدسي): যে হাদিসের অর্থ ও ভাবমালা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ইলহাম বা স্বপ্নের মাধ্যমে নবীজির অন্তরে প্রক্ষিপ্ত হয়েছে, কিন্তু শব্দ ও ভাষা নবীজি (সা.) নিজের পক্ষ থেকে দিয়েছেন, তাকে হাদিসে কুদসী বলা হয়। মুহাদ্দিসীনদের পরিভাষায়-
مَا رَوَاهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ رَبِّهِ تَبَارَكَ وَتَعَالَى.
অর্থাৎ, নবীজি (সা.) যা তাঁর রবের পক্ষ থেকে বর্ণনা করেছেন।

৩. হাদিসে নববী (الحديث النبوي): নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর নিজস্ব কথা, কাজ বা মৌন সম্মতিকে হাদিসে নববী বলা হয়। এর শব্দ ও অর্থ উভয়ই নবীজির নিজস্ব (তবে তা ওহী গায়রে মাতলু বা প্রচ্ছন্ন ওহীর সমর্থনপুষ্ট)।

তিনটির মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য (উদাহরণসহ):

পার্থক্যের বিষয় আল-কুরআন হাদিসে কুদসী হাদিসে নববী
১. শব্দ ও অর্থ শব্দ ও অর্থ উভয়ই সম্পূর্ণ আল্লাহর। অর্থ আল্লাহর, কিন্তু শব্দ নবীজির। শব্দ ও অর্থ উভয়ই নবীজির।
২. মুজিজা (ইজাজ) এটি মুজিজা, মানুষ এর মতো বানাতে অক্ষম। এটি মুজিজা নয়। এটিও মুজিজা নয়।
৩. তিলাওয়াত ও সালাত এর তিলাওয়াত ইবাদত। সালাতে পড়া ফরজ। এর তিলাওয়াত স্বতন্ত্র ইবাদত নয়। সালাতে পড়া জায়েজ নয়। সালাতে তিলাওয়াত করা যায় না।
৪. পবিত্রতা (ওজু) স্পর্শ করতে ওজু বা পবিত্রতা ফরজ। পবিত্রতা শর্ত নয়, তবে উত্তম। পবিত্রতা শর্ত নয়।
৫. সূত্র (সনদ) সবগুলোই মুতাওয়াতির বা অকাট্য। সহিহ, জয়িফ বা মাওজু হতে পারে। সহিহ, হাসান, জয়িফ ইত্যাদি হতে পারে।

উদাহরণ:
কুরআন: الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ (সকল প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর)।
হাদিসে কুদসী: আল্লাহ বলেন, يَا عِبَادِي إِنِّي حَرَّمْتُ الظُّلْمَ عَلَى نَفْسِي (হে আমার বান্দাগণ! আমি আমার নিজের ওপর জুলুমকে হারাম করেছি)।
হাদিসে নববী: নবীজি (সা.) বলেন, إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ (সকল কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল)।

٤- اكتب حكمة وفوائد نزول القرآن الكريم منجماً ومفرّقاً-
৪. ধীরে ধীরে ও বিক্ষিপ্তভাবে কুরআন নাযিল হওয়ার হিকমত ও উপকারিতা লিপিবদ্ধ কর।

ভূমিকা:

তাওরাত, যবুর ও ইঞ্জিল কিতাবগুলো একবারে সম্পূর্ণ অবতীর্ণ হয়েছিল। কিন্তু আল-কুরআন দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে প্রয়োজন ও প্রেক্ষাপট অনুযায়ী ধীরে ধীরে (منجماً) অবতীর্ণ হয়েছে। এর পেছনে মহান আল্লাহর অসংখ্য হিকমত (প্রজ্ঞা) ও উপকারিতা নিহিত রয়েছে।

ধীরে ধীরে কুরআন নাযিল হওয়ার হিকমত ও উপকারিতা:

  1. নবীজির অন্তরকে সুদৃঢ় করা (تثبيت فؤاد النبي):
    মক্কার কাফিরদের অব্যাহত নির্যাতন এবং নবীজির দুঃখ-কষ্টের মুহূর্তে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য একটু একটু করে ওহী নাযিল হতো। এটি নবীজির অন্তরকে প্রশান্ত করত। আল্লাহ বলেন:

    وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَوْلَا نُزِّلَ عَلَيْهِ الْقُرْآنُ جُمْلَةً وَاحِدَةً كَذَلِكَ لِنُثَبِّتَ بِهِ فُؤَادَكَ

    অর্থ: “কাফিররা বলে, তার ওপর সমগ্র কুরআন একবারে অবতীর্ণ হলো না কেন? এমনিভাবে অবতীর্ণ করেছি আপনার অন্তরকে সুদৃঢ় করার জন্য।” (সূরা ফুরকান: ৩২)

  2. কুরআন মুখস্থ করা ও বোঝা সহজতর করা (تيسير الحفظ والفهم):
    নবীজি (সা.) এবং তৎকালীন আরবরা নিরক্ষর ছিলেন। একবারে পুরো কিতাব নাযিল হলে তা মুখস্থ করা তাদের জন্য কঠিন হতো। তাই অল্প অল্প করে নাযিল হওয়ায় তা মুখস্থ করা এবং এর অর্থ অনুধাবন করা সাহাবিদের জন্য অত্যন্ত সহজ হয়ে যায়।
  3. আইন-কানুন প্রবর্তনে পর্যায়ক্রমিক নীতি (التدرج في التشريع):
    মানুষের দীর্ঘদিনের বদভ্যাস (যেমন- মদ্যপান, সুদ, ব্যভিচার) একদিনে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তাই আল্লাহ তায়ালা ধীরে ধীরে মানুষের মনমানসিকতা প্রস্তুত করে পর্যায়ক্রমে আইনগুলো নাযিল করেছেন। যেমন মদের নিষেধাজ্ঞা তিনটি ধাপে নাযিল হয়েছিল।
  4. ঘটনাপ্রবাহ ও নতুন পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য রাখা (مسايرة الأحداث):
    ২৩ বছরের নবুওয়তি জীবনে মুসলমানদের অনেক যুদ্ধ, সন্ধি এবং নতুন নতুন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। কাফির ও ইহুদিরা বিভিন্ন জটিল প্রশ্ন করত। পরিস্থিতি ও ঘটনার সাথে সাথে আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী নাযিল হয়ে তাৎক্ষণিক সমাধান দেওয়া হতো।
  5. কুরআনের ঐশ্বরিক উৎসের অকাট্য প্রমাণ (الدلالة على المصدر الرباني):
    কোনো মানুষ যদি দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে একটু একটু করে কোনো বই লেখে, তবে তার শুরুতে ও শেষে চিন্তাধারার বৈসাদৃশ্য দেখা যায়। কিন্তু কুরআন ২৩ বছর ধরে বিক্ষিপ্তভাবে নাযিল হওয়ার পরও এর ভাষা, ছন্দ ও অর্থে বিন্দুমাত্র বৈসাদৃশ্য বা অসামঞ্জস্য নেই। এটি প্রমাণ করে যে, কুরআন কোনো মানুষের রচনা নয়।

٥- ما معنى إعجاز القرآن الكريم؟ تحدث عن وجوه إعجازه بالإيضاح-
৫. ইজাজুল কুরআন বলতে কী বোঝায়? কুরআন কারীমের ইজাজের বিভিন্ন দিক বিশদভাবে আলোচনা কর।

ইজাজুল কুরআন-এর অর্থ:

আভিধানিক অর্থ: ‘ইজাজ’ (إعجاز) শব্দটি আরবি الفَوْتُ وَالسَّبْقُ বা عَجْزٌ থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো- অক্ষম করা, অপারগ করা বা হার মানানো।

পারিভাষিক অর্থ: আল-কুরআনের এমন অতীন্দ্রিয় ও অতুলনীয় বৈশিষ্ট্য, যা এর সমকক্ষ বা অনুরূপ কোনো কিছু তৈরি করতে সমগ্র মানব ও জিন জাতিকে চরমভাবে অক্ষম ও অপারগ প্রমাণ করে। সহজ কথায়, আল-কুরআন যে আল্লাহর বাণী এবং মানুষ যে এর মতো একটি গ্রন্থ বা সূরা রচনা করতে সম্পূর্ণ অক্ষম, তা অকাট্যভাবে প্রমাণ করাই হলো ‘ইজাজুল কুরআন’। আল্লাহ বলেন:

قُلْ لَئِنِ اجْتَمَعَتِ الْإِنْسُ وَالْجِنُّ عَلَى أَنْ يَأْتُوا بِمِثْلِ هَذَا الْقُرْآنِ لَا يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِيرًا

অর্থ: “বলুন, যদি মানব ও জিন জাতি এই কুরআনের অনুরূপ কোনো কিছু আনার জন্য একত্রিত হয়, তবুও তারা এর অনুরূপ কিছু আনতে পারবে না, যদিও তারা একে অপরের সাহায্যকারী হয়।” (সূরা বনী ইসরাঈল: ৮৮)

কুরআন কারীমের ইজাজের বিভিন্ন দিক (وجوه الإعجاز):

আল-কুরআন বিভিন্ন দিক থেকে এক মহা মুজিজা। এর উল্লেখযোগ্য দিকগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

  • ১. ভাষাগত ও সাহিত্যিক ইজাজ (الإعجاز اللغوي والبياني):
    তৎকালীন আরবরা ছিল সাহিত্য, কবিতা ও বাগ্নিতায় জগৎসেরা। কিন্তু কুরআনের শব্দচয়ন, উপমা, বাক্য গঠন ও অলংকার শাস্ত্রের অতুলনীয় প্রয়োগ দেখে তাদের বড় বড় কবি-সাহিত্যিকরাও স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। কুরআনের সাহিত্যিক মান এতই উচ্চাঙ্গের যে, এর সমকক্ষ ভাষা তৈরি করা মানুষের সাধ্যের বাইরে।
  • ২. অদৃশ্য বা গায়েবের সংবাদ প্রদান (الإعجاز الغيبي):
    কুরআনে হাজার হাজার বছর আগের নবী ও জাতিদের এমন সব নিখুঁত ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে, যা নবীজি (সা.)-এর জানার কথা ছিল না। তাছাড়া কুরআন ভবিষ্যতের অনেক ঘটনার নিখুঁত ভবিষ্যদ্বাণী করেছে। যেমন, রোমানদের বিজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী:
    غُلِبَتِ الرُّومُ ٭ فِي أَدْنَى الْأَرْضِ وَهُمْ مِنْ بَعْدِ غَلَبِهِمْ سَيَغْلِبُونَ
    (রোমানরা পরাজিত হয়েছে পার্শ্ববর্তী এলাকায় এবং তারা তাদের পরাজয়ের পর শিগগিরই বিজয়ী হবে)। বাস্তবে ঠিক তা-ই ঘটেছিল।
  • ৩. বৈজ্ঞানিক ইজাজ (الإعجاز العلمي):
    আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে কুরআন বিজ্ঞান, মহাকাশ, চিকিৎসা ও ভ্রূণবিদ্যা সম্পর্কে এমন সব নিখুঁত তথ্য দিয়েছে, যা আধুনিক বিজ্ঞান মাত্র কয়েক দশক আগে আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছে। যেমন- মানুষের সৃষ্টিপ্রক্রিয়া, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ, পাহাড়ের পেরেকস্বরূপ অবস্থান ইত্যাদি।
  • ৪. আইনগত ও বিধানগত ইজাজ (الإعجاز التشريعي):
    কুরআনের প্রবর্তিত আইন, রাষ্ট্রনীতি, সমাজনীতি ও অর্থনীতি মানবজাতির জন্য সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ। এর বিধানাবলি এতটাই নিখুঁত যে, যুগ যুগ ধরে এর কোনো আইনের পরিবর্তন বা সংশোধনের প্রয়োজন হয়নি এবং এতে জাগতিক ও আধ্যাত্মিকতার এক অপূর্ব সমন্বয় রয়েছে।
  • ৫. অন্তরের ওপর প্রভাব (التأثير في القلوب):
    কুরআন তিলাওয়াত করলে বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী উভয়ের অন্তরে এক অলৌকিক প্রভাব ও ভয় সৃষ্টি হয়। কুরআনের এই সম্মোহনী শক্তির কারণেই উমর (রা.)-এর মতো পাষাণ হৃদয়ের মানুষও কেঁদে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

٦- عرّف التفسير والتأويل مع ذكر الفرق بينهما-
৬. পার্থক্য উল্লেখসহ তাওয়ীল ও তাফসীর এর সংজ্ঞা বর্ণনা কর।

তাফসীর (التفسير)-এর পরিচয়:

আভিধানিক অর্থ: তাফসীর শব্দটি الفَسْرُ বা تَفْسِيرَة মূলধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ উন্মোচন করা, ব্যাখ্যা করা বা স্পষ্ট করা (الكشف والبيان)।

পারিভাষিক অর্থ: আল্লামা যুরকানী (রহ.)-এর মতে- “তাফসীর এমন একটি ইলম বা শাস্ত্র, যার মাধ্যমে কুরআনের আয়াতসমূহের শান-এ-নুযুল, মাক্কী-মাদানী, মুহকাম-মুতাসাবিহ, নাসিখ-মানসুখ এবং এর অর্থ ও বিধানাবলি আলোচনা করা হয়।” মূলত কোনো শব্দের সরাসরি বা বাহ্যিক অর্থ প্রকাশ করাকেই তাফসীর বলে।

তাওয়ীল (التأويل)-এর পরিচয়:

আভিধানিক অর্থ: তাওয়ীল শব্দটি الاَوْلُ মূলধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ প্রত্যাবর্তিত হওয়া, ফিরে যাওয়া, শেষ পরিণতি বা তাৎপর্য (الرجوع والمصير)।

পারিভাষিক অর্থ: শরিয়তের কোনো অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে কোনো শব্দের বাহ্যিক বা সরাসরি অর্থ গ্রহণ না করে তার ভেতরের গূঢ় অর্থ বা সম্ভাবনাময় রূপক অর্থ গ্রহণ করাকে তাওয়ীল বলে। অর্থাৎ-
صَرْفُ اللَّفْظِ عَنْ ظَاهِرِهِ إِلَى مَعْنًى مَرْجُوحٍ بِدَلِيلٍ.

তাফসীর ও তাওয়ীলের মধ্যকার পার্থক্য:

  1. ক্ষেত্রগত পার্থক্য: তাফসীর প্রধানত শব্দের বাহ্যিক অর্থ, শান-এ-নুযুল বা শাব্দিক ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অন্যদিকে তাওয়ীল হলো আয়াতের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বা গূঢ় অর্থ (بواطن الأمور) বের করা।
  2. প্রমাণগত পার্থক্য: তাফসীর সাধারণত রিওয়ায়াত বা বর্ণনানির্ভর (নবীজি ও সাহাবিদের উক্তির ওপর নির্ভরশীল)। কিন্তু তাওয়ীল হলো দিরায়াত বা প্রজ্ঞানির্ভর (গভীর জ্ঞানসম্পন্ন আলেমদের গবেষণার ফল)।
  3. সুনিশ্চিত ও সম্ভাবনাময়: তাফসীর হলো অকাট্য ও সুনিশ্চিত (قطعي)। মুফাসসির নিশ্চিতভাবে বলেন যে, এর দ্বারা এটাই উদ্দেশ্য। অন্যদিকে তাওয়ীলের অর্থ হলো সম্ভাবনাময় (ظني)। গবেষক বলেন যে, আয়াতের এই অর্থ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
  4. প্রয়োগ: তাফসীর করা হয় একটি একক শব্দের (مفردات), আর তাওয়ীল করা হয় পুরো একটি বাক্যের বা প্রসঙ্গের (جمل)।

খ অংশ (সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন) – যেকোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও

۷- بين الفرق بين الآية والسورة-
৭. আয়াত ও সূরার মধ্যকার পার্থক্য বর্ণনা কর।

আয়াত ও সূরা আল-কুরআনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা। এদের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য নিচে দেওয়া হলো:

  • পরিচয়: ‘আয়াত’ (آية) হলো আল-কুরআনের একটি বাক্য বা বাক্যাংশ, যার একটি নির্দিষ্ট শুরু এবং শেষ রয়েছে। এটি মূলত সূরার একটি ক্ষুদ্র অংশ। অন্যদিকে ‘সূরা’ (سورة) হলো আল-কুরআনের একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ অধ্যায়, যা নির্দিষ্ট সংখ্যক আয়াতের সমন্বয়ে গঠিত।
  • পরিমাণ: কুরআনে মোট ১১৪টি সূরা রয়েছে। কিন্তু আয়াতের সংখ্যা ছয় হাজারেরও বেশি (যেমন- ৬২৩৬টি বা মতান্তরে ৬২০০ এর কিছু বেশি)।
  • গঠন: একটি সূরা গঠিত হতে ন্যূনতম তিনটি আয়াতের প্রয়োজন হয় (যেমন- সূরা কাওসার)। কিন্তু একটি আয়াত এক বা একাধিক শব্দ এমনকি একটি অক্ষর (যেমন- ن, ق) নিয়েও হতে পারে।

۸- تحدث عن الكتاب “الفوز الكبير في أصول التفسير”-
৮. ‘আল-ফাউযুল কাবীর ফী উসূলিত তাফসীর’ সম্পর্কে আলোচনা কর।

‘আল-ফাউযুল কাবীর ফী উসূলিত তাফসীর’ (الفوز الكبير في أصول التفسير) হলো তাফসীর শাস্ত্রের মূলনীতি বা উসূলুল কুরআন বিষয়ক একটি বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ।

  • রচয়িতা: এই মহামূল্যবান গ্রন্থটি রচনা করেছেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও মুজাদ্দিদ শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী (রহ.)। তিনি মূলত এটি ফারসি ভাষায় রচনা করেছিলেন, যা পরবর্তীতে আরবিতে অনূদিত হয়।
  • মূল আলোচ্য বিষয়: এই কিতাবে আল-কুরআনের প্রধান পাঁচটি আলোচ্য বিষয় (যাকে লেখক ‘উলূমুল খামসা’ বা পাঁচটি বিদ্যা বলেছেন) অত্যন্ত চমৎকারভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া কুরআনের শান-এ-নুযুল, নাসিখ-মানসুখ এবং কুরআনের আপাত বিরোধপূর্ণ আয়াতের চমৎকার সমাধান দেওয়া হয়েছে।
  • গুরুত্ব: কুরআন অনুধাবনের জন্য এই বইটি একটি মাস্টারপিস এবং বিশ্বের প্রায় সকল শীর্ষস্থানীয় মাদরাসায় এটি পাঠ্যবই হিসেবে পড়ানো হয়।

۹- ما النسخ؟ وما أركانه؟
৯. নাসিখ কাকে বলে? এর রোকনসমূহ কী কী?

নাসিখ (الناسخ): নাসিখ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো- রহিতকারী, বিলুপ্তকারী বা স্থানান্তরকারী। উসূলের পরিভাষায় নাসিখ হলো এমন শরিয়ি দলিল বা প্রমাণ, যা পূর্ববর্তী কোনো শরিয়ি হুকুম বা বিধানকে রহিত করে দেয়। (الدليل الرافع للحكم السابق)। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তায়ালাই হলেন আসল ‘নাসিখ’, কারণ তিনিই বিধান রহিত করেন। তবে যেই আয়াতের মাধ্যমে রহিত করা হয়, রূপকার্থে তাকেও নাসিখ বলা হয়।

নসখ (نسخ) বা রহিতকরণের রোকনসমূহ: উসূলবিদদের মতে নসখের রোকন বা স্তম্ভ হলো ৪টি:

  1. নাসিখ (الناسخ): রহিতকারী সত্তা (আল্লাহ) অথবা রহিতকারী দলিল/আয়াত।
  2. মানসুখ (المنسوخ): যেই পূর্ববর্তী হুকুম বা বিধানটি রহিত করা হয়েছে।
  3. মানসুখ আনহু (المنسوخ عنه): যার ওপর বিধানটি আরোপিত ছিল অর্থাৎ মুকাল্লাফ বা শরীয়তের আদিষ্ট ব্যক্তিরা।
  4. নসখ (النسخ): রহিতকরণ প্রক্রিয়া বা বিধানটি রহিত করার নির্দেশ।

۱۰- اكتب مميزات “الإتقان في علوم القرآن”-
১০. ‘আল-ইতকান ফী উলূমিল কুরআন’ কিতাবের বৈশিষ্টসমূহ আলোচনা কর।

‘আল-ইতকান ফী উলূমিল কুরআন’ (الإتقان في علوم القرآن) হলো উলূমুল কুরআন বা কুরআনিক সায়েন্স বিষয়ক সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ও প্রামাণ্য বিশ্বকোষ। এর রচয়িতা হলেন প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ হাফেজ জালালুদ্দীন আস-সুয়ূতী (রহ.)।

বইটির বৈশিষ্টসমূহ:

  • বিশাল ব্যাপ্তি: ইমাম সুয়ূতী (রহ.) এই গ্রন্থে উলূমুল কুরআনের প্রায় ৮০টি প্রকার বা বিষয় (انواع) নিয়ে অত্যন্ত বিশদভাবে আলোচনা করেছেন।
  • সমন্বয় ও সংকলন: তিনি পূর্ববর্তী অনেক গবেষকের (যেমন- ইমাম যারকাশি) তথ্যভাণ্ডারকে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে এই গ্রন্থে সংকলন করেছেন।
  • প্রামাণ্যতা: প্রতিটি বিষয়ের আলোচনায় তিনি নির্ভরযোগ্য হাদিস ও সাহাবি-তাবেয়িদের আসার (উক্তি) সনদসহ পেশ করেছেন।
  • মৌলিক গ্রন্থ: পরবর্তীকালে যত পণ্ডিত বা গবেষক উলূমুল কুরআন নিয়ে কাজ করেছেন, তারা সকলেই এই গ্রন্থটিকে মৌলিক রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

۱۱- بين الإعجاز العلمي في القرآن الكريم-
১১. কুরআন কারীমে ‘ইজাজুল ইলমী’ বর্ণনা কর।

ইজাজুল ইলমী (الإعجاز العلمي) বলতে আল-কুরআনের বৈজ্ঞানিক মুজিজা বা অলৌকিকতাকে বোঝায়। আল-কুরআন বিজ্ঞানের কোনো বই নয়, তবে এতে এমন সব বৈজ্ঞানিক তথ্য ও ইঙ্গিত রয়েছে যা ১৪০০ বছর পূর্বের আরবের কোনো নিরক্ষর মানুষের পক্ষে জানা সম্পূর্ণ অসম্ভব ছিল।

আধুনিক বিজ্ঞান উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাত্র কয়েক দশক আগে যা আবিষ্কার করেছে, কুরআন শত শত বছর আগে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তা বলে দিয়েছে। এটি কুরআনের ঐশ্বরিক হওয়ার অকাট্য প্রমাণ।

উদাহরণ: মাতৃগর্ভে মানব ভ্রূণ সৃষ্টির পর্যায়গুলো (এমব্রায়োলজি) কুরআন খুব নিখুঁতভাবে বর্ণনা করেছে:

ثُمَّ خَلَقْنَا النُّطْفَةَ عَلَقَةً فَخَلَقْنَا الْعَلَقَةَ مُضْغَةً فَخَلَقْنَا الْمُضْغَةَ عِظَامًا فَكَسَوْنَا الْعِظَامَ لَحْمًا

অর্থ: “অতঃপর আমি শুক্রবিন্দুকে রক্তপিণ্ডে পরিণত করি, এরপর রক্তপিণ্ডকে মাংসপিণ্ডে পরিণত করি, এরপর মাংসপিণ্ডকে হাড়ে রূপান্তর করি, অতঃপর হাড়কে মাংস দ্বারা আবৃত করি…” (সূরা মুমিনুন: ১৪)। আধুনিক বিজ্ঞান ঠিক এই পর্যায়গুলোকেই সমর্থন করে।

۱۲- اكتب أدب المفسر-
১২. মুফাস্সিরের আদাবগুলো লিখ।

যিনি কুরআনের তাফসীর করেন তাকে মুফাসসির বলা হয়। কুরআনের সঠিক মর্ম উদ্ধারের জন্য একজন মুফাসসিরের বেশ কিছু আদব বা শিষ্টাচার থাকা অপরিহার্য। প্রধান কয়েকটি আদব হলো:

  1. বিশুদ্ধ নিয়ত (حسن النية): তাফসীর রচনার একমাত্র উদ্দেশ্য হতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও দ্বীনের খিদমত। কোনো জাগতিক লাভ বা সুখ্যাতি অর্জনের নিয়ত থাকলে তাফসীরে বরকত থাকে না।
  2. উত্তম চরিত্র (حسن الخلق): মুফাসসিরকে উত্তম চরিত্র, তাকওয়া ও পরহেজগারির অধিকারী হতে হবে। অন্যথায় তার কথা মানুষের অন্তরে প্রভাব ফেলবে না।
  3. সত্যের অনুসরণ (إيثار الحق): নিজের ব্যক্তিগত মতাদর্শ, মাযহাব বা দলের প্রতি অন্ধভক্তি পরিহার করে, অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে যা সত্য তা-ই অকপটে প্রকাশ করার সৎসাহস থাকতে হবে।
  4. সুন্নাহর অনুসরণ (اتباع السنة): তাফসীর করার ক্ষেত্রে নবীজি (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের মানহাজ বা তরিকা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে।
  5. বিনয় ও নম্রতা (التواضع): অহংকার মুক্ত হয়ে বিনয়ের সাথে কাজ করা। কোনো আয়াতে সন্দেহ থাকলে বা বুঝতে না পারলে সদম্ভে নিজের মনগড়া ব্যাখ্যা না দিয়ে ‘আল্লাহু আলাম’ (আল্লাহই ভালো জানেন) বলার মানসিকতা থাকা।
Follow Our Facebook Page
দ্রুত নতুন বই পেতে যুক্ত থাকুন
Follow Now