Economics & Islamic Economics (Code: 201106) – ২০২৩ প্রশ্ন ও উত্তর
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৩ এর আল-কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অর্থনীতি ও ইসলামি অর্থনীতি (الاقتصاد والاقتصاد الإسلامي) বিষয়ের সম্পূর্ণ উত্তরমালা।
বিঃদ্রঃ পরীক্ষার্থীদের সুবিধার্থে মূল প্রশ্নপত্রের ইংরেজি প্রশ্নসহ ক-বিভাগ (রচনামূলক) এবং খ-বিভাগ (সংক্ষিপ্ত) এর সবগুলো প্রশ্নের ১০০% নির্ভুল উত্তর দেওয়া হলো।
ক বিভাগ — রচনামূলক প্রশ্ন (মান—১৫x৪=৬০)
[ যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও ]
১। অর্থনীতি বলতে কী বোঝায়? অর্থনীতির পরিধি ও বিষয়বস্তু বর্ণনা কর।
[What do you mean by Economics? Discuss the scope and subject-matter of Economics.]
অর্থনীতি বলতে কী বোঝায়:
‘Economics’ বা অর্থনীতি হলো সমাজবিজ্ঞানের এমন একটি অন্যতম প্রধান শাখা, যা মানুষের অসীম অভাব এবং বিকল্প ব্যবহারযোগ্য সসীম বা সীমিত সম্পদের মধ্যে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে কীভাবে সর্বোচ্চ তৃপ্তি বা কল্যাণ লাভ করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করে।
অধ্যাপক এল. রবিন্স-এর মতে, “অর্থনীতি হলো এমন একটি বিজ্ঞান, যা অসীম অভাব ও বিকল্প ব্যবহারযোগ্য দুষ্প্রাপ্য সম্পদের মধ্যে সম্পর্কবিষয়ক মানবীয় আচরণ নিয়ে আলোচনা করে।”
অর্থনীতির পরিধি ও বিষয়বস্তু:
অর্থনীতির পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক। মানবজীবনের অর্থনৈতিক কার্যাবলির সব অংশই এর অন্তর্ভুক্ত। অর্থনীতির প্রধান বিষয়বস্তুগুলো নিচে বর্ণনা করা হলো:
- উৎপাদন (Production): মানুষের অভাব মেটানোর জন্য নতুন উপযোগ সৃষ্টি করাকে উৎপাদন বলে। কীভাবে ভূমি, শ্রম, মূলধন ও সংগঠন—এই চারটি উপকরণ ব্যবহার করে দক্ষতার সাথে পণ্য উৎপাদন করা যায়, তা অর্থনীতির অন্যতম আলোচ্য বিষয়।
- বিনিময় (Exchange): মানুষ তার নিজের প্রয়োজনীয় সব দ্রব্য নিজে উৎপাদন করতে পারে না। তাই নিজের উদ্বৃত্ত দ্রব্য দিয়ে অন্যের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় দ্রব্য সংগ্রহ করতে হয়। উৎপাদিত পণ্য কীভাবে বাজারে কেনাবেচা হবে, দ্রব্যের মূল্য কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং অর্থের ব্যবহার ইত্যাদি নিয়ে অর্থনীতি আলোচনা করে।
- বণ্টন (Distribution): উৎপাদনের উপকরণগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টায় যে সম্পদ বা জাতীয় আয় সৃষ্টি হয়, তা উৎপাদনের উপকরণগুলোর মধ্যে (ভূমির খাজনা, শ্রমের মজুরি, মূলধনের সুদ এবং উদ্যোক্তার মুনাফা হিসেবে) কীভাবে সুষমভাবে বণ্টিত হবে, তা অর্থনীতি নির্ধারণ করে।
- ভোগ (Consumption): মানুষের অর্থনৈতিক সকল কর্মকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য হলো ভোগ। মানুষ কীভাবে তার সীমিত আয় দিয়ে অভাব পূরণের জন্য দ্রব্য ভোগ করে সর্বোচ্চ তৃপ্তি লাভ করবে, তা অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
- সরকারি অর্থব্যবস্থা (Public Finance): সরকারের আয়ের উৎস, ব্যয়ের খাত, কর ব্যবস্থা এবং বাজেট প্রণয়ন ইত্যাদি বিষয় অর্থনীতির আওতাভুক্ত।
- সামষ্টিক অর্থনীতি (Macroeconomics): ব্যক্তিগত আলোচনার বাইরে গিয়ে দেশের সামগ্রিক জাতীয় আয়, কর্মসংস্থান, মুদ্রাস্ফীতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়েও অর্থনীতি আলোচনা করে।
২। চাহিদা ও যোগান কী? চাহিদা ও যোগানের সনাতন তত্ত্বটি বর্ণনা কর।
[What is demand and supply? Discuss the conventional theory of demand and supply.]
চাহিদা (Demand) কী:
সাধারণ অর্থে চাহিদা বলতে কোনো কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে বোঝায়। কিন্তু অর্থনীতিতে চাহিদা হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত পূরণ হতে হয়: ১. কোনো দ্রব্য পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, ২. তা ক্রয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বা সামর্থ্য এবং ৩. অর্থ ব্যয়ের সদিচ্ছা। অর্থাৎ, কোনো নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট দামে একজন ক্রেতা একটি দ্রব্যের যে পরিমাণ ক্রয় করতে প্রস্তুত থাকে, তাকেই চাহিদা বলে।
যোগান (Supply) কী:
যোগান বলতে কোনো দ্রব্যের মজুতকে বোঝায় না। অর্থনীতিতে যোগান হলো—কোনো নির্দিষ্ট সময়ে এবং নির্দিষ্ট দামে বিক্রেতাগণ বা উৎপাদকগণ কোনো দ্রব্যের যে পরিমাণ বাজারে বিক্রি করতে বা সরবরাহ করতে প্রস্তুত থাকে, তাকে যোগান বলে।
চাহিদা ও যোগানের সনাতন তত্ত্ব (Theory of Demand and Supply):
চাহিদা ও যোগানের তত্ত্বটি মুক্তবাজার অর্থনীতির মূলভিত্তি। এই তত্ত্বটি তিনটি প্রধান বিষয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে:
- চাহিদা বিধি (Law of Demand): এই বিধি অনুযায়ী, অন্যান্য অবস্থা (যেমন- ভোক্তার আয়, রুচি) অপরিবর্তিত থাকলে, কোনো দ্রব্যের দাম কমলে তার চাহিদা বাড়ে এবং দাম বাড়লে চাহিদা কমে। অর্থাৎ দাম ও চাহিদার মধ্যে বিপরীতমুখী সম্পর্ক বিদ্যমান। এ কারণে চাহিদা রেখা সাধারণত ডানদিকে নিম্নগামী হয়।
- যোগান বিধি (Law of Supply): এই বিধি অনুযায়ী, অন্যান্য অবস্থা (যেমন- উৎপাদনের খরচ, প্রযুক্তি) অপরিবর্তিত থাকলে, কোনো দ্রব্যের দাম বাড়লে যোগান বাড়ে এবং দাম কমলে যোগান কমে। অর্থাৎ দাম ও যোগানের মধ্যে সমমুখী সম্পর্ক বিদ্যমান। বিক্রেতা বেশি লাভে বেশি বিক্রি করতে চায়। এ কারণে যোগান রেখা ডানদিকে ঊর্ধ্বগামী হয়।
- ভারসাম্য দাম নির্ধারণ (Equilibrium Price): বাজারে ক্রেতারা চায় সবচেয়ে কম দামে দ্রব্য কিনতে (চাহিদা), আর বিক্রেতারা চায় সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি করতে (যোগান)। চাহিদা ও যোগানের এই পারস্পরিক ঘাত-প্রতিঘাত বা দরকষাকষির একপর্যায়ে এমন একটি দাম নির্ধারিত হয়, যে দামে ক্রেতার চাহিদার পরিমাণ এবং বিক্রেতার যোগানের পরিমাণ পরস্পর সমান হয়। এই দামকেই ‘ভারসাম্য দাম’ বলে। সনাতন তত্ত্ব অনুযায়ী, মুক্তবাজারে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই এই ভারসাম্য বিন্দু নির্ধারিত হয়।
৩। উৎপাদন কাকে বলে? উৎপাদনের উপকরণসমূহের বর্ণনা দাও।
[What is production? Describe the factors of production.]
উৎপাদন (Production) কাকে বলে:
সাধারণ অর্থে উৎপাদন বলতে কোনো নতুন কিছু সৃষ্টি করাকে বোঝায়। কিন্তু অর্থনীতিতে মানুষ কোনো নতুন পদার্থ সৃষ্টি বা ধ্বংস করতে পারে না। মানুষ কেবল প্রকৃতির দেওয়া বস্তুর আকার, রূপ বা স্থান পরিবর্তন করে তাতে নতুন ‘উপযোগ’ (Utility) সৃষ্টি করতে পারে, যা মানুষের অভাব মেটাতে সক্ষম। প্রকৃতির বস্তুকে মানুষের ব্যবহারোপযোগী করে এই নতুন উপযোগ সৃষ্টি করাকেই অর্থনীতিতে উৎপাদন বলে। যেমন: জঙ্গল থেকে কাঠ এনে তা দিয়ে চেয়ার তৈরি করা হলো উৎপাদন।
উৎপাদনের উপকরণসমূহ (Factors of Production):
যেকোনো জিনিস উৎপাদনের কাজ পরিচালনার জন্য মূলত ৪টি প্রধান উপকরণের প্রয়োজন হয়। এগুলো নিচে বর্ণনা করা হলো:
- ভূমি (Land): সাধারণ অর্থে ভূমি বলতে শুধু মাটিকে বোঝায়। কিন্তু অর্থনীতিতে ভূমি বলতে প্রকৃতির দেওয়া সব ধরনের মুক্ত দানকে বোঝায়, যা উৎপাদনে সাহায্য করে। যেমন- উর্বর মাটি, জলবায়ু, খনিজ সম্পদ, বনজ সম্পদ, নদ-নদী, সূর্যের আলো ইত্যাদি। ভূমি প্রকৃতির দান হওয়ায় এর উৎপাদন খরচ নেই। ভূমি ব্যবহারের বিনিময়ে এর মালিককে ‘খাজনা’ (Rent) দেওয়া হয়।
- শ্রম (Labour): উৎপাদন কাজে নিয়োজিত মানুষের শারীরিক ও মানসিক সব ধরনের পরিশ্রম বা প্রচেষ্টাকে শ্রম বলে। যেমন- কৃষকের চাষাবাদ থেকে শুরু করে একজন ডাক্তারের চিকিৎসাসেবা—সবই শ্রম। শ্রমিকের এই শ্রমের বিনিময়ে তাকে ‘মজুরি’ (Wage) প্রদান করা হয়।
- মূলধন (Capital): মূলধন বলতে সাধারণত টাকাপয়সাকে বোঝায়। তবে অর্থনীতিতে মূলধন হলো মানুষের উৎপাদিত সম্পদের সেই অংশ, যা সরাসরি ভোগের জন্য ব্যবহৃত না হয়ে পুনরায় উৎপাদনের কাজে নিয়োজিত হয়। যেমন- কারখানার যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল, রাস্তাঘাট ইত্যাদি। মূলধন ব্যবহারের বিনিময়ে মূলধনের মালিককে ‘সুদ’ (Interest) দেওয়া হয়।
- সংগঠন (Organization): ভূমি, শ্রম ও মূলধন—এই তিনটি উপকরণকে একত্রে সংগ্রহ করে, সঠিক অনুপাতে মিশিয়ে এবং ভবিষ্যতের ঝুঁকি গ্রহণ করে উৎপাদন কাজ পরিচালনা ও সমন্বয় করাকে সংগঠন বলে। যিনি এই কাজের দায়িত্ব নেন তাকে সংগঠক বা উদ্যোক্তা (Entrepreneur) বলে। উৎপাদন শেষে সংগঠক নিজের জন্য যে উদ্বৃত্ত অংশ লাভ করেন, তাকে ‘মুনাফা’ (Profit) বলে।
৪। বাজার কাকে বলে? একচেটিয়া বাজার ও পূর্ণপ্রতিযোগিতামূলক বাজারের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা কর।
[What is Market? Discuss the characteristics of monopoly market and perfect competitive market.]
বাজার (Market) কাকে বলে:
সাধারণ অর্থে বাজার বলতে কোনো নির্দিষ্ট স্থান বা জায়গাকে বোঝায় যেখানে কেনাবেচা হয় (যেমন: চকবাজার)। কিন্তু অর্থনীতিতে বাজার বলতে কোনো নির্দিষ্ট স্থানকে বোঝায় না, বরং বাজার বলতে কোনো একটি দ্রব্য বা সেবাকে বোঝায়, যা ক্রেতা ও বিক্রেতার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ দরকষাকষির মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট দামে কেনাবেচা হয়। যেমন: পাটের বাজার, শেয়ার বাজার, স্বর্ণের বাজার। এখানে ক্রেতা-বিক্রেতা অনলাইনেও দরকষাকষি করতে পারে।
একচেটিয়া বাজার (Monopoly Market)-এর বৈশিষ্ট্য:
যে বাজারে কোনো একটি দ্রব্যের কেবল একজন মাত্র বিক্রেতা বা উৎপাদক থাকে এবং তার কোনো প্রতিযোগী থাকে না, তাকে একচেটিয়া বাজার বলে। এর বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
- একক বিক্রেতা: এই বাজারে সমগ্র যোগানের ওপর একজন মাত্র বিক্রেতা বা ফার্মের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে।
- বিকল্প দ্রব্য নেই: উৎপাদিত দ্রব্যটির কোনো নিকট বা ঘনিষ্ঠ বিকল্প দ্রব্য (Substitute goods) বাজারে থাকে না।
- প্রবেশে বাধা: এই বাজারে নতুন কোনো ফার্ম বা উৎপাদক চাইলেই সহজে প্রবেশ করতে পারে না। আইনগত বা প্রযুক্তিগত বাধা থাকে।
- দাম নির্ধারক (Price Maker): বিক্রেতা নিজেই দ্রব্যের দাম নির্ধারণ করে থাকে, সে বাজারের ওপর নির্ভরশীল নয়।
পূর্ণপ্রতিযোগিতামূলক বাজার (Perfect Competitive Market)-এর বৈশিষ্ট্য:
যে বাজারে অসংখ্য ক্রেতা ও অসংখ্য বিক্রেতা একটি সমজাতীয় দ্রব্য নিয়ে পূর্ণ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে দরকষাকষি করে একটি নির্দিষ্ট দামে ক্রয়-বিক্রয় করে, তাকে পূর্ণপ্রতিযোগিতামূলক বাজার বলে। এর বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
- অসংখ্য ক্রেতা ও বিক্রেতা: বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতার সংখ্যা এত বেশি থাকে যে, কেউই এককভাবে বাজারের দামকে প্রভাবিত করতে পারে না।
- সমজাতীয় দ্রব্য (Homogeneous Product): বাজারে বিক্রেতাদের সবার কাছে রক্ষিত দ্রব্যগুলো গুণ, মান, আকার ও রঙে সম্পূর্ণ সমজাতীয় বা একই রকম হয়।
- অবাধ প্রবেশ ও প্রস্থান: যেকোনো নতুন বিক্রেতা বা ফার্ম স্বাধীনভাবে বাজারে প্রবেশ করতে পারে এবং লোকসান হলে পুরোনো বিক্রেতা চলে যেতে পারে।
- দাম গ্রহীতা (Price Taker): বাজারের সামগ্রিক চাহিদা ও যোগানের ভিত্তিতে যে দাম নির্ধারিত হয়, বিক্রেতা ও ক্রেতা উভয়কেই সেই দাম মেনে নিতে হয়।
- পূর্ণ জ্ঞান: বাজারের দাম ও অবস্থা সম্পর্কে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়েরই পূর্ণ জ্ঞান থাকে।
৫। আধুনিক অর্থব্যবস্থার সাথে ইসলামি অর্থব্যবস্থার তুলনামূলক বর্ণনা কর।
[Discuss a comparative study between Islamic economic system and modern economic system.]
উত্তর: আধুনিক অর্থব্যবস্থা বলতে মূলত পুঁজিবাদী (Capitalism) এবং সমাজতান্ত্রিক (Socialism) অর্থব্যবস্থাকে বোঝায়। এর বিপরীতে ইসলামি অর্থব্যবস্থা কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে পরিচালিত একটি ঐশী ও ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা। এদের মধ্যকার তুলনামূলক আলোচনা নিচে দেওয়া হলো:
- মূল ভিত্তি ও উৎস: ইসলামি অর্থব্যবস্থার মূল উৎস ও ভিত্তি হলো পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস। এর প্রধান বিশ্বাস হলো সকল সম্পদের প্রকৃত মালিক মহান আল্লাহ এবং মানুষ কেবল এর আমানতদার বা প্রতিনিধি। অন্যদিকে আধুনিক অর্থব্যবস্থা সম্পূর্ণ মানবসৃষ্ট দর্শন বা মতবাদের ওপর নির্ভরশীল, যেখানে মানুষ নিজেকেই সম্পদের একচ্ছত্র মালিক বা রাষ্ট্রকে মালিক মনে করে।
- সুদ ও মুনাফা: ইসলামি অর্থনীতিতে ‘সুদ’ (Riba) সম্পূর্ণরূপে হারাম বা নিষিদ্ধ এবং এর বিপরীতে ব্যবসায়ের ‘মুনাফা’কে হালাল করা হয়েছে। কিন্তু আধুনিক পুঁজিবাদী অর্থনীতি সম্পূর্ণ সুদের ওপর ভিত্তি করেই দাঁড়িয়ে আছে এবং এখানে সুদকে পুঁজির পুরস্কার হিসেবে বৈধ মনে করা হয়।
- সম্পদের মালিকানা: ইসলামি অর্থনীতিতে ব্যক্তি মালিকানার স্বীকৃতি আছে, তবে তা লাগামহীন নয়; বরং শরিয়তের সীমারেখার মধ্যে হালাল উপায়ে সম্পদ অর্জন করতে হয়। অন্যদিকে পুঁজিবাদে ব্যক্তি মালিকানা সম্পূর্ণ স্বাধীন ও লাগামহীন; আর সমাজতন্ত্রে ব্যক্তি মালিকানা নেই বললেই চলে, সব রাষ্ট্রীয় মালিকানায় থাকে।
- হালাল-হারাম বিবেচনা: ইসলামি অর্থনীতিতে মদ, জুয়া, লটারি, শূকরের মাংস ইত্যাদি সমাজের জন্য ক্ষতিকর বা হারাম জিনিসের উৎপাদন ও ব্যবসা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু আধুনিক অর্থনীতিতে নৈতিকতার স্থান নেই; কোনো জিনিসে মানুষের চাহিদা থাকলে এবং তা লাভজনক হলে তার ব্যবসাই বৈধ বলে গণ্য হয়।
- সম্পদ বণ্টন ও সামাজিক নিরাপত্তা: ইসলামি অর্থনীতিতে ধনী-গরিবের বৈষম্য দূর করার জন্য জাকাত, ফিতরা, সাদাকাহ ও মিরাস (উত্তরাধিকার আইন) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা একটি শক্ত সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করে। কিন্তু আধুনিক অর্থনীতিতে এমন কোনো বাধ্যতামূলক ধর্মীয় বা নৈতিক বণ্টন ব্যবস্থা নেই, ফলে পুঁজিবাদে গরিব আরও গরিব হয় এবং ধনী আরও ধনী হয়।
৬। ভোগ বলতে কী বোঝ? ভোগ সম্পর্কে ইসলামি অর্থনীতির দৃষ্টিভঙ্গি বর্ণনা কর।
[What do you mean by consumption? Discuss the views of Islamic Economics regarding consumption.]
ভোগ (Consumption) বলতে কী বোঝায়:
সাধারণ অর্থে ভোগ বলতে শুধু কোনো কিছু খাওয়াকে বোঝায়। কিন্তু অর্থনীতিতে ‘ভোগ’ বলতে মানুষের অভাব পূরণের উদ্দেশ্যে কোনো দ্রব্যের উপযোগ (Utility) ব্যবহার করা বা নিঃশেষ করাকেই ভোগ বলে। যেমন- ভাত খাওয়া, কাপড় পরা, কলম দিয়ে লেখা, ডাক্তারের সেবা নেওয়া ইত্যাদি সবই অর্থনীতির ভাষায় ভোগ। মানুষের সকল অর্থনৈতিক প্রচেষ্টার চূড়ান্ত লক্ষ্যই হলো ভোগ করা।
ভোগ সম্পর্কে ইসলামি অর্থনীতির দৃষ্টিভঙ্গি:
সাধারণ অর্থনীতিতে মানুষের ভোগের কোনো নির্দিষ্ট সীমা বা নৈতিক বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু ইসলামি অর্থনীতিতে ভোগের একটি সুনির্দিষ্ট ও নৈতিক কাঠামো রয়েছে:
- হালাল ও পবিত্র বস্তু ভোগ: আল্লাহ পৃথিবীতে যেসব জিনিস হালাল ও পবিত্র (তাইয়িবাত) করেছেন, কেবল সেগুলোই ভোগ করার অনুমতি ইসলাম দিয়েছে। হারাম বা ক্ষতিকর বস্তু (যেমন- মদ, মৃত প্রাণী, শূকর, রক্ত) ভোগ করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেন, “হে মানুষ! পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র, তা থেকে তোমরা আহার কর।”
- অপচয় ও অপব্যয় রোধ (ইসরাফ ও তাবযির): ইসলামে বৈধ জিনিস ভোগের অনুমতি থাকলেও তা প্রয়োজনের অতিরিক্ত অপচয় করা (ইসরাফ) বা অনর্থক ও হারাম কাজে ব্যয় করা (তাবযির) কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ কুরআন মাজিদে অপচয়কারীকে শয়তানের ভাই বলে আখ্যায়িত করেছেন।
- কৃপণতা পরিহার: ইসলাম যেমন অপচয় নিষেধ করেছে, তেমনি সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখা এবং কৃপণতা করাকেও তীব্র নিন্দা করেছে। নিজের ও পরিবারের বৈধ ও প্রয়োজনীয় অভাব মেটানোর ক্ষেত্রে কৃপণতা করা ইসলামি দৃষ্টিতে একটি গর্হিত কাজ।
- মধ্যমপন্থা বা ভারসাম্য (اعتدال): ভোগের ক্ষেত্রে ইসলাম সবসময় মধ্যমপন্থা বা ভারসাম্য বজায় রাখার নির্দেশ দেয়। আয় বুঝে ব্যয় করা এবং আড়ম্বরপূর্ণ, অহংকারী ও বিলাসী জীবনযাপন পরিহার করে সাদাসিধা জীবনযাপনকে উৎসাহিত করা হয়েছে।
- অন্যের অধিকার রক্ষা: নিজের ভোগের পাশাপাশি সমাজের অসহায় ও গরিব মানুষের অধিকার (জাকাত ও সাদাকা) আদায় করার প্রতি ইসলামি অর্থনীতি জোর দেয়। প্রতিবেশীকে অভুক্ত রেখে নিজে পেটপুরে ভোগ করাকে ইসলাম সমর্থন করে না।
৭। ইসলামি ব্যাংক কী? ইসলামি ব্যাংকের কার্যাবলি বর্ণনা কর।
[What is Islamic Bank? Discuss the functions of Islamic Bank.]
ইসলামি ব্যাংক (Islamic Bank):
ইসলামি ব্যাংক হলো এমন একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা ব্যাংক ব্যবস্থা, যা ইসলামী শরিয়াহর নীতি এবং কুরআন-সুন্নাহর বিধিবিধানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। এই ব্যাংক প্রচলিত সুদের (Riba) পরিবর্তে লাভ-ক্ষতির অংশীদারিত্বের (Profit and loss sharing) ভিত্তিতে এবং হালাল ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে তাদের যাবতীয় আর্থিক লেনদেন ও ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করে।
ইসলামি ব্যাংকের কার্যাবলি:
একটি ইসলামি ব্যাংক মূলত নিচের কার্যাবলি সম্পাদন করে থাকে:
- আমানত গ্রহণ: ইসলামি ব্যাংক দুটি প্রধান পদ্ধতিতে আমানত গ্রহণ করে। আল-ওয়াদিয়াহ (চলতি হিসাব) পদ্ধতিতে আমানতকারীর টাকা নিরাপদে রাখে। আর মুদারাবা (সঞ্চয়ী ও মেয়াদি হিসাব) নীতির ভিত্তিতে ব্যাংক আমানতকারীর টাকায় ব্যবসা করে এবং শরিয়তসম্মত উপায়ে অর্জিত লাভের একটি অংশ আমানতকারীকে প্রদান করে।
- বিনিয়োগ ও ঋণ প্রদান: প্রচলিত ব্যাংকের মতো এরা সুদের বিনিময়ে ঋণ দেয় না। বরং মুদারাবা (অংশীদারিত্ব), মুশারাকা (যৌথ মূলধনি কারবার), মুরাবাহা (লাভের চুক্তিতে পণ্য কিনে বিক্রি), বাই-মুয়াজ্জাল (বাকিতে বিক্রি) ও ইজারা (লিজ বা ভাড়ায় দেওয়া) পদ্ধতিতে বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাকে হালাল বিনিয়োগ প্রদান করে।
- কল্যাণমূলক কার্যাবলি: প্রচলিত ব্যাংকের মতো কেবল সর্বাধিক মুনাফা অর্জনই এদের একমাত্র লক্ষ্য নয়; বরং সামাজিক কল্যাণে এরা জাকাত তহবিল গঠন করে, করজে হাসানা (সুদমুক্ত ঋণ) প্রদান করে এবং গরিব শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদানের মতো জনকল্যাণমূলক কাজ করে।
- হালাল ব্যবসায় উৎসাহ: ইসলামি ব্যাংক কখনোই এমন কোনো ব্যবসায় অর্থায়ন বা বিনিয়োগ করে না, যা শরিয়তে হারাম বা সমাজের জন্য ক্ষতিকর (যেমন: তামাক, মদ, সিনেমা হল বা জুয়ার ব্যবসা)।
- বৈদেশিক বাণিজ্য ও অন্যান্য সেবা: আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এলসি (LC) খোলা এবং হালাল পণ্যের আমদানি-রপ্তানিতে এরা আর্থিক সহায়তা প্রদান করে থাকে। এছাড়া লকার সার্ভিস, রেমিট্যান্স আনাসহ অন্যান্য বৈধ ব্যাংকিং সেবাও এরা দেয়।
৮। তাকাফুল কী? প্রচলিত বিমা ও ইসলামি বিমার মধ্যে পার্থক্য বর্ণনা কর।
[What is Takaful? Discuss the difference between conventional insurance and Islamic insurance.]
তাকাফুল (Takaful) কী:
‘তাকাফুল’ একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ হলো পারস্পরিক দায়িত্ব গ্রহণ, একে অপরের জিম্মাদার হওয়া বা যৌথ গ্যারান্টি। ইসলামি অর্থনীতিতে তাকাফুল হলো শরিয়াহ সম্মত ‘ইসলামি বিমা’ ব্যবস্থা। এটি এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে একদল মানুষ নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার উদ্দেশ্যে একটি তহবিল বা ফান্ড গঠন করে এবং সেই ফান্ড থেকে চুক্তিবদ্ধ কোনো সদস্যের নির্দিষ্ট ক্ষতি বা বিপদে (যেমন- দুর্ঘটনা বা মৃত্যু) তাকে আর্থিকভাবে সাহায্য করা হয়।
প্রচলিত বিমা ও ইসলামি বিমার (তাকাফুল) মধ্যে পার্থক্য:
- ভিত্তি ও উদ্দেশ্য: প্রচলিত বিমার ভিত্তি হলো বাণিজ্যিক ঝুঁকি গ্রহণ এবং কোম্পানির মুনাফা অর্জন। অন্যদিকে ইসলামি বিমা বা তাকাফুলের ভিত্তি হলো ‘তাবাররু’ বা অনুদান এবং পারস্পরিক সহযোগিতা ও ভাইচারা।
- সুদ (রিবা): প্রচলিত বিমা কোম্পানিগুলো গ্রাহকদের প্রিমিয়ামের টাকা থেকে অর্জিত তহবিল সুদি ব্যাংকে বা সুদি বন্ডে বিনিয়োগ করে। কিন্তু তাকাফুল কোম্পানি সম্পূর্ণ সুদমুক্ত এবং হালাল লাভ-ক্ষতির (মুদারাবা) ভিত্তিতে তাদের তহবিল বিনিয়োগ করে।
- জুয়া বা অনিশ্চয়তা (গারার ও মাইসির): প্রচলিত বিমায় গ্রাহক দীর্ঘকাল প্রিমিয়াম দিয়েও কোনো ক্ষতি না হলে টাকা ফেরত পায় না (যেমন- সাধারণ বিমায়) বা কোম্পানির লাভে অংশ পায় না, যা ইসলামে জুয়া বা মাইসিরের শামিল। কিন্তু তাকাফুলে তহবিলের উদ্বৃত্ত টাকা বা লাভ চুক্তির ভিত্তিতে সদস্যদের মাঝে বণ্টন করে দেওয়া হয়।
- মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা: প্রচলিত বিমায় গ্রাহক প্রিমিয়াম দেওয়ার পর ওই টাকার একচ্ছত্র মালিক হয়ে যায় কোম্পানি। কিন্তু তাকাফুলে প্রিমিয়ামের ফান্ডের প্রকৃত মালিক গ্রাহকরা বা সদস্যরাই থাকেন, কোম্পানি শুধু ‘মুদারিব’ (ব্যবস্থাপক) হিসেবে কাজ করে এবং ফান্ড পরিচালনার জন্য একটি নির্দিষ্ট ফি (ওয়াকালা ফি) বা লভ্যাংশ পায়।
- শরিয়াহ বোর্ড: তাকাফুল কোম্পানির কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি বাধ্যতামূলক শরিয়াহ বোর্ড থাকে, যা প্রচলিত বিমা কোম্পানিতে থাকে না।
খ বিভাগ — সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্ন (মান—৫x৪=২০)
[ যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও ]
৯। ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক অর্থনীতির মধ্যে পার্থক্য বর্ণনা কর।
[Discuss the difference between micro and macro Economics.]
উত্তর: ব্যষ্টিক (Micro) ও সামষ্টিক (Macro) অর্থনীতির প্রধান পার্থক্যগুলো হলো:
১. অর্থের দিক থেকে: গ্রিক শব্দ ‘Mikros’ অর্থ ক্ষুদ্র এবং ‘Makros’ অর্থ বৃহৎ বা সামগ্রিক।
২. আলোচনার পরিধি: ব্যষ্টিক অর্থনীতিতে সমগ্র অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বা পৃথক অংশ নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে আলোচনা করা হয় (যেমন: একজন ব্যক্তির আয়, একটি ফার্মের উৎপাদন বা একটি দ্রব্যের দাম)। অন্যদিকে সামষ্টিক অর্থনীতিতে দেশের সমগ্র অর্থনীতিকে একত্রে নিয়ে সামগ্রিকভাবে আলোচনা করা হয় (যেমন: দেশের মোট জাতীয় আয়, মোট কর্মসংস্থান, মোট বিনিয়োগ)।
৩. মূল্য নির্ধারণ: ব্যষ্টিক অর্থনীতির মূল আলোচ্য বিষয় হলো নির্দিষ্ট কোনো দ্রব্যের আপেক্ষিক দাম নির্ধারণ। অন্যদিকে সামষ্টিক অর্থনীতির মূল বিষয় হলো দেশের সাধারণ মূল্যস্তর বা মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে আলোচনা।
১০। নিরপেক্ষ রেখা কী?
[What is Indifference Curve?]
উত্তর: অর্থনীতিতে নিরপেক্ষ রেখা (Indifference Curve) হলো এমন একটি রেখা বা বক্ররেখা, যে রেখার ওপর অবস্থিত প্রতিটি বিন্দুতে দুটি দ্রব্যের বিভিন্ন সংমিশ্রণ প্রকাশ পায়, যা থেকে একজন ভোক্তা সর্বদা সমান পরিমাণ তৃপ্তি বা উপযোগ লাভ করে। যেহেতু এই রেখার যেকোনো বিন্দুতে অবস্থান করলেও ভোক্তার মোট তৃপ্তির পরিমাণের কোনো পরিবর্তন হয় না বা সমান থাকে, তাই ভোক্তা কোন সংমিশ্রণটি বেছে নেবে সে বিষয়ে সে সম্পূর্ণ ‘নিরপেক্ষ’ (Indifferent) বা উদাসীন থাকে। এই রেখাটি সাধারণত মূল বিন্দুর দিকে উত্তল (Convex) হয়।
১১। ভোক্তার উদ্বৃত্ত বলতে কী বোঝ?
[What do you mean by consumer surplus?]
উত্তর: ভোক্তার উদ্বৃত্ত (Consumer Surplus) বলতে বোঝায়, একজন ভোক্তা কোনো একটি দ্রব্য কেনার জন্য সর্বোচ্চ যে দাম দিতে প্রস্তুত থাকে এবং বাস্তবে বাজারে সে ওই দ্রব্যের জন্য যে প্রকৃত দাম প্রদান করে—এই দুইয়ের মধ্যকার পার্থক্য।
অধ্যাপক মার্শালের মতে, “কোনো জিনিস থেকে বঞ্চিত হওয়ার চেয়ে ভোক্তা ওই জিনিসের জন্য যে দাম দিতে প্রস্তুত থাকে এবং প্রকৃতপক্ষে সে যে দাম দেয়, এ দুইয়ের পার্থক্যই হলো ভোক্তার উদ্বৃত্ত।”
সূত্র: ভোক্তার উদ্বৃত্ত = (ভোক্তার প্রত্যাশিত সর্বোচ্চ দাম) – (প্রকৃত প্রদত্ত দাম)।
১২। অর্থ বলতে কী বোঝ?
[What do you mean by Money?]
উত্তর: অর্থনীতিতে ‘অর্থ’ বা ‘মুদ্রা’ (Money) বলতে এমন একটি বস্তুকে বোঝায়, যা বিনিময়ের মাধ্যম, মূল্যের পরিমাপক, সঞ্চয়ের ভাণ্ডার এবং স্থগিত লেনদেনের মানদণ্ড হিসেবে সমাজের সকলের কাছে সর্বজনীনভাবে গ্রহণযোগ্য। সহজ কথায়, সরকার কর্তৃক আইনগতভাবে স্বীকৃত যেকোনো বস্তু (যেমন- কাগজী নোট বা ধাতব মুদ্রা), যা দিয়ে মানুষ অবাধে ও নিশ্চিন্তে যেকোনো দ্রব্য বা সেবা ক্রয়-বিক্রয় করতে পারে এবং একে অপরের দেনা-পাওনা মেটাতে পারে, তাকেই অর্থ বলে।
১৩। শ্রম বিভাগ কী?
[What is division of labour?]
উত্তর: শ্রম বিভাগ (Division of Labour) বলতে উৎপাদনের একটি সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াকে কোনো একজন শ্রমিকের ওপর ন্যস্ত না করে, কাজটিকে বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত করে প্রত্যেক শ্রমিকের দক্ষতা, যোগ্যতা ও রুচি অনুযায়ী তাদের মধ্যে কাজগুলো ভাগ করে দেওয়াকে বোঝায়। এতে একজন শ্রমিক একটি নির্দিষ্ট কাজেই বারবার নিয়োজিত থাকে, ফলে কাজে তার গতি আসে এবং তার দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। যেমন- তৈরি পোশাক কারখানায় একজন কেবল কাপড় কাটে, একজন সেলাই করে, আর একজন শুধু বোতাম লাগায়।
১৪। কর ও যাকাতের মধ্যে পার্থক্য কর।
[Distinguish between Tax and Zakat.]
উত্তর: কর (Tax) ও যাকাতের মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলো হলো:
১. উদ্দেশ্য ও বাধ্যবাধকতা: কর আদায়ের মূল উদ্দেশ্য হলো রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যয় নির্বাহ করা এবং এটি একটি আইনি বা রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতা। অন্যদিকে যাকাতের মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও নিজের সম্পদকে পবিত্র করা এবং এটি একটি অবশ্য পালনীয় ধর্মীয় ফরজ ইবাদত।
২. ব্যয়ের খাত: সরকার রাষ্ট্রের যেকোনো উন্নয়ন, সামরিক বা প্রশাসনিক খাতে করের টাকা ব্যয় করতে পারে। কিন্তু যাকাতের টাকা কেবল পবিত্র কুরআনে বর্ণিত সুনির্দিষ্ট ৮টি খাতেই (যেমন- ফকির, মিসকিন, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি ইত্যাদি) ব্যয় করতে হয়।
৩. নিসাব: কর প্রদানের ক্ষেত্রে সরকার প্রতি বছর আয়ের সীমা বা হার পরিবর্তন করতে পারে। কিন্তু যাকাতের ‘নিসাব’ (সম্পদের পরিমাণ) এবং হার (২.৫%) রাসূল (সা.) কর্তৃক নির্ধারিত, যা চিরকাল অপরিবর্তনীয়।
১৫। ইসলামে ব্যক্তি মালিকানা বলতে কী বোঝায়?
[What is the sense of ownership in Islam?]
উত্তর: ইসলামে ব্যক্তি মালিকানা বলতে কোনো ব্যক্তির হালাল উপায়ে অর্জিত সম্পদের ওপর শরিয়তের সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকে তার আইনগত অধিকার ও নিয়ন্ত্রণের স্বীকৃতিকে বোঝায়। ইসলাম বিশ্বাস করে, পৃথিবীর সকল সম্পদের চূড়ান্ত মালিক একমাত্র মহান আল্লাহ; মানুষ কেবল তার প্রতিনিধি বা ট্রাস্টি হিসেবে সাময়িক সময়ের জন্য এই সম্পদের অধিকারী হয়। তাই মানুষ হালাল পথে সম্পদ অর্জন করতে পারবে এবং নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী তা ভোগ ও দান করতে পারবে। তবে সে ওই সম্পদ হারাম কাজে বা অপচয় করতে পারবে না এবং ওই সম্পদে গরিবের হক (যাকাত) আদায় করতে বাধ্য থাকবে।
১৬। মুদারাবা কী?
[What is ‘Mudaraba’?]
উত্তর: মুদারাবা (Mudaraba) হলো ইসলামি অর্থব্যবস্থায় পরিচালিত এক ধরনের অংশীদারিত্বমূলক চুক্তি বা বিনিয়োগ কারবার। এই চুক্তিতে একজন ব্যক্তি ব্যবসায়ের সম্পূর্ণ মূলধন বা পুঁজি সরবরাহ করেন (যাঁকে ‘রাব্বুল মাল’ বা সাহেবুল মাল বলা হয়) এবং অপর ব্যক্তি নিজের দৈহিক শ্রম, মেধা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে ওই ব্যবসা পরিচালনা করেন (যাঁকে ‘মুদারিব’ বলা হয়)। ব্যবসা শেষে চুক্তির শর্ত বা আনুপাতিক হার অনুযায়ী উভয় পক্ষ অর্জিত মুনাফা ভাগ করে নেয়। কিন্তু ব্যবসায় কোনো আর্থিক ক্ষতি হলে তা সম্পূর্ণ মূলধন সরবরাহকারী বহন করেন, আর শ্রমদানকারীর ক্ষতি হলো তার শ্রম ও সময়ের অপচয়।






