At-Tafsir Al-Mu’asir (Code: 201202) – ২০২১ প্রশ্ন ও উত্তর
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২১ এর আল-কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের التفسير المعاصر (আত-তাফসীর আল-মু’আসির) বিষয়ের সম্পূর্ণ উত্তরমালা।
বিঃদ্রঃ পরীক্ষার্থীদের আগামী পরীক্ষার সর্বোচ্চ প্রস্তুতির সুবিধার্থে মূল প্রশ্নপত্রের বিকল্প সবগুলোর (অথবা) প্রশ্নের ১০০% নির্ভুল ও তথ্যবহুল উত্তর বিস্তারিতভাবে নিচে দেওয়া হলো।
مجموعة (أ) [ক-বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্ন]
আয়াতসমূহের অনুবাদ:
“বলুন, তোমরা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করো, তারপর দেখো যারা সত্যকে মিথ্যা সাব্যস্ত করেছিল তাদের পরিণতি কী হয়েছিল! বলুন, আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে তা কার? বলুন, আল্লাহরই জন্য। তিনি নিজের ওপর রহমত করা অবধারিত করে নিয়েছেন। তিনি অবশ্যই তোমাদেরকে কিয়ামতের দিন একত্র করবেন, যাতে কোনো সন্দেহ নেই। যারা নিজেদের ক্ষতি করেছে, তারা ঈমান আনবে না। আর রাতে ও দিনে যা কিছু অবস্থান করে, তা তাঁরই। আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী।”
সংক্ষিপ্ত তাফসির:
এই আয়াতগুলোতে আল্লাহ তাআলা কুরাইশদেরকে পূর্ববর্তী জাতিগুলোর পরিণতি দেখে শিক্ষা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এরপর বলা হয়েছে যে, আসমান ও জমিনের সবকিছুর মালিকানা কেবল আল্লাহর। তিনি রহমান ও রহিম, তাই দ্রুত শাস্তি না দিয়ে তিনি কিয়ামত পর্যন্ত সুযোগ দিয়েছেন। কিন্তু যারা নিজেদের বিবেককে নষ্ট করে ফেলেছে, তারা কখনো ঈমান আনবে না।
[নিম্নের শব্দাবলির তাহকীক কর:] سِيرُوا، لَيَجْمَعَنَّكُمْ، كَتَبَ، السَّمٰوَاتُ-
তাহকীক (تحقيق):
- سِيرُوا : صيغة (সীগাহ)- جمع مذكر حاضر, بحث (বহস)- امر حاضر معروف, باب (বাব)- ضرب يضرب, مادة (মাদদাহ)- س ي ر, هفت اقسام (জিনস)- أجوف يائى। অর্থ: তোমরা ভ্রমণ করো বা ঘোরাঘুরি করো।
- لَيَجْمَعَنَّكُمْ : এখানে (لَ) হলো তাকীদের, (كُم) হলো মফউল। মূল শব্দটি হলো يَجْمَعَنَّ। صيغة (সীগাহ)- واحد مذكر غائب, بحث (বহস)- فعل مضارع مؤكد بلام التاكيد ونون الثقيلة, باب (বাব)- فتح يفتح, مادة (মাদদাহ)- ج م ع, هفت اقسام (জিনস)- صحيح। অর্থ: তিনি অবশ্যই তোমাদের একত্রিত করবেন।
- كَتَبَ : صيغة (সীগাহ)- واحد مذكر غائب, بحث (বহস)- ماضى مطلق مثبت معروف, باب (বাব)- نصر ينصر, مادة (মাদদাহ)- ك ت ب, هفت اقسام (জিনস)- صحيح। অর্থ: তিনি অবধারিত করেছেন বা লিখে দিয়েছেন।
- السَّمٰوَاتُ : এটি جمع مؤنث سالم বা বহুবচন। এর واحد (একবচন) হলো- سَمَاءٌ। এর مادة (মাদদাহ) হলো- س م و, আর هفت اقسام (জিনস)- ناقص واوى। অর্থ: আকাশমণ্ডল বা আসমানসমূহ।
[আল্লাহ তায়ালার বাণী: قل سيروا فى الارض ثم انظروا كيف كان عاقبة المكذبين এর শানে নুযূল বর্ণনা কর।]
শানে নুযূল:
মক্কার কুরাইশরা যখন রাসুল (সা.)-এর নবুওয়াতকে অস্বীকার করল, তাঁকে মিথ্যাবাদী বলল এবং তাঁর সাথে চরম ঠাট্টা-বিদ্রূপ করতে শুরু করল, তখন রাসুল (সা.) মনে খুব কষ্ট পেলেন। কুরাইশরা অহংকারবশত মনে করত যে, তারা যা ইচ্ছা তাই করবে, এতে তাদের কোনো শাস্তি হবে না বা তাদের ধরপাকড় করার কেউ নেই।
তখন আল্লাহ তায়ালা রাসুল (সা.)-কে সান্ত্বনা দিয়ে এবং কাফিরদের সতর্ক করে এই আয়াত নাজিল করেন। আল্লাহ নির্দেশ দেন যে, আপনি তাদের বলুন, তারা যেন নিজেদের অহংকার ছেড়ে দিয়ে পৃথিবীতে ভ্রমণ করে এবং পূর্ববর্তী ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিগুলোর (যেমন আদ, সামুদ, নূহ ও লুত আলাইহিমুস সালামের জাতি) করুণ পরিণতির দিকে লক্ষ্য করে। তারা দেখুক, যারা নবীদের মিথ্যাবাদী বলেছিল এবং অহংকার করেছিল, আল্লাহ কীভাবে তাদের সমূলে ধ্বংস করে দিয়েছেন। এতে মক্কার কাফিরদের জন্য চরম শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে।
আয়াতসমূহের অনুবাদ:
“আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি, অতঃপর তোমাদের রূপদান করেছি। এরপর আমি ফেরেশতাদেরকে বললাম, ‘তোমরা আদমকে সিজদাহ করো’। তখন ইবলিস ছাড়া সবাই সিজদাহ করল; সে সিজদাহকারীদের অন্তর্ভুক্ত হলো না। আল্লাহ বললেন, ‘আমি যখন তোমাকে নির্দেশ দিলাম, তখন কিসে তোমাকে বাধা দিল?’ সে বলল, ‘আমি তার চেয়ে উত্তম…’”
সংক্ষিপ্ত তাফসির:
সুরা আরাফের এই আয়াতে মানব সৃষ্টির সম্মান এবং শয়তানের অহংকারের কথা বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ যখন আদম (আ.) কে সম্মানের সিজদাহ করতে বললেন, তখন ইবলিস নিজেকে আগুনের তৈরি বলে মাটির তৈরি আদমের সামনে মাথা নত করতে অস্বীকার করে এবং অভিশপ্ত হয়।
[আয়াতে কারীমাদ্বয় সংশ্লিষ্ট ঘটনাটি উল্লেখ কর।]
সংশ্লিষ্ট ঘটনা (قصة آدم وإبليس):
আল্লাহ তায়ালা যখন মাটি থেকে পৃথিবীর প্রথম মানব হযরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করলেন এবং তাঁর মধ্যে রুহ ফুঁকে দিয়ে তাঁকে সুঠাম রূপ দান করলেন, তখন তিনি আদম (আ.)-এর সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশের জন্য ফেরেশতাদের নির্দেশ দিলেন আদমকে সম্মানসূচক সিজদা করার জন্য। আল্লাহর নির্দেশ পেয়ে সকল ফেরেশতা সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন।
কিন্তু ইবলিস (শয়তান), যে তখন ফেরেশতাদের কাতারে ইবাদতে মশগুল থাকত (যদিও সে জিন জাতির অন্তর্ভুক্ত ছিল), সে অহংকারবশত সিজদা করতে অস্বীকার করল। আল্লাহ তায়ালা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আমি নির্দেশ দেওয়ার পরও কিসে তোমাকে সিজদা করা থেকে বিরত রাখল?”
উত্তরে ইবলিস চরম অহংকার ও অযৌক্তিক যুক্তি দেখিয়ে বলল, “انا خير منه” (আমি তার চেয়ে উত্তম); কারণ আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন আগুন থেকে, আর তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে। (তার ধারণা ছিল, আগুন সর্বদা ওপরের দিকে ওঠে তাই তা শ্রেষ্ঠ, আর মাটি নিচে পড়ে থাকে তাই তা নিকৃষ্ট)। এই অহংকার এবং আল্লাহর আদেশের অবাধ্যতার কারণেই ইবলিস চিরতরে অভিশপ্ত ও জান্নাত থেকে বিতাড়িত হলো।
[سجدة (সিজদাহ) এর অর্থ কী? আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সিজদাহ করা যাবে কি না? দলিলসহ বর্ণনা কর।]
معنى السجدة (সিজদাহ এর অর্থ):
السجدة (সিজদাহ) এর আভিধানিক অর্থ চরম বিনয় প্রকাশ করা, অবনত হওয়া। শরিয়তের পরিভাষায়, আল্লাহ তায়ালার প্রতি চূড়ান্ত আনুগত্য ও ইবাদতের নিয়তে নিজের কপাল ও নাক মাটিতে লুটিয়ে দেওয়াকে সিজদাহ বলে।
আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সিজদাহ করার বিধান:
আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা করা শরিয়তে সম্পূর্ণরূপে হারাম এবং শিরক। সিজদা দুই প্রকার হতে পারে: ইবাদতের সিজদা এবং সম্মানের সিজদা (سجود التحية)। পূর্ববর্তী কিছু নবীর শরিয়তে (যেমন- ইউসুফ আ. এর যুগে) শুধু সম্মানের সিজদা জায়েজ ছিল, কিন্তু ইসলাম বা মুহাম্মদী শরিয়তে যেকোনো প্রকার সিজদাই (তা ইবাদতের নিয়তে হোক বা শুধু সম্মান প্রদর্শনের নিয়তে হোক) গায়রুল্লাহর জন্য চিরতরে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে।
দলিল (الأدلة):
* কুরআন থেকে: আল্লাহ তায়ালা দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেন, “لَا تَسْجُدُوا لِلشَّمْسِ وَلَا لِلْقَمَرِ وَاسْجُدُوا لِلَّهِ الَّذِي خَلَقَهُنَّ” (তোমরা সূর্যকে সিজদা কোরো না, চাঁদকেও নয়; বরং সিজদা করো আল্লাহকে যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন- সুরা ফুসসিলাত: ৩৭)।
* হাদিস থেকে: রাসুল (সা.) বলেছেন, “আমি যদি কোনো মানুষকে অন্য মানুষের জন্য সিজদা করার নির্দেশ দিতাম, তবে স্ত্রীদের নির্দেশ দিতাম তাদের স্বামীদের সিজদা করতে।” (তিরমিজি)। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ ছাড়া আর কারো জন্য সিজদাহ বৈধ নয়।
আয়াতসমূহের অনুবাদ:
“কত জনপদকে আমি ধ্বংস করেছি! আমার আজাব তাদের ওপর এসেছিল রাতে অথবা দিনে যখন তারা বিশ্রামরত ছিল। অতঃপর যখন আমার আজাব তাদের ওপর এসে পড়ল, তখন তাদের আর কোনো আর্তনাদ ছিল না, শুধু এই বলা ছাড়া যে, নিশ্চয়ই আমরা জালিম ছিলাম।”
সংক্ষিপ্ত তাফসির:
সুরা আরাফের এই আয়াতে পূর্ববর্তী অবাধ্য জাতিগুলোর মর্মান্তিক পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। যখন আল্লাহর আজাব আসে, তখন মানুষের অহংকার চূর্ণ হয়ে যায় এবং তারা নিজেদের অপরাধ স্বীকার করতে বাধ্য হয়, কিন্তু তখন আর তাওবার সুযোগ থাকে না।
[শাস্তি প্রদানকে দুই সময়ের (রাত্রিকালে অথবা দ্বিপ্রহরে) সাথে কেন নির্দিষ্ট করা হয়েছে? বর্ণনা কর।]
শাস্তিকে দুই সময়ের সাথে নির্দিষ্ট করার কারণ:
আয়াতে আল্লাহ তায়ালা পূর্ববর্তী ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিগুলোর ওপর আজাব আসার কথা উল্লেখ করতে গিয়ে বিশেষভাবে দুটি সময়ের কথা বলেছেন: بَيَاتًا (রাত্রিকালে, যখন মানুষ ঘুমিয়ে থাকে) এবং هُمْ قَائِلُونَ (কাইলুলা বা দ্বিপ্রহরে বিশ্রামের সময়)।
এই দুটি সময়কে নির্দিষ্ট করার মূল কারণ হলো- এই দুই সময়ে মানুষ সাধারণত সবচেয়ে বেশি গাফেল, নিশ্চিন্ত বা উদাসীন থাকে। তারা গভীর ঘুমে বা বিশ্রামে নিমগ্ন থাকে বিধায় আত্মরক্ষার কোনো মানসিক বা শারীরিক প্রস্তুতি তাদের থাকে না। এমন অসতর্ক মুহূর্তে আকস্মিকভাবে আল্লাহর আজাব এলে তা থেকে পালানো বা বাঁচার কোনো উপায়ই থাকে না। এর দ্বারা আল্লাহর শাস্তির ভয়াবহতা, আকস্মিকতা এবং মানুষের অসহায়ত্বকে অত্যন্ত জোরালোভাবে বোঝানো হয়েছে।
[هم قائلون এর তারকীবে কী হয়েছে? বর্ণনা কর।]
‘هم قائلون’ এর তারকীব (التركيب النحوي):
‘هُمْ قَائِلُونَ’ বাক্যটি এখানে বাক্যে ‘حال’ (হাল বা অবস্থা) হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এর বিস্তারিত তারকীব হলো:
* هُمْ (হুম): এটি ضمیر منفصل (পৃথক সর্বনাম), যা مبني على السكون (সুকুন এর ওপর স্থির)। এটি বাক্যের مبتدا (উদ্দেশ্য) হওয়ায় محل رفع (উত্তোলিত অবস্থায়) রয়েছে।
* قَائِلُونَ (ক্বাইলুন): এটি خبر (বিধেয়)। এটি جمع مذكر سالم (নিয়মিত পুংলিঙ্গ বহুবচন) হওয়ায় এর رفع (পেশ) হয়েছে ‘واو’ (ওয়াও) এর মাধ্যমে।
* مبتدا ও خبر মিলে একটি جمله اسمية خبرية (নামবাচক বাক্য) গঠিত হয়েছে। এরপর এই সম্পূর্ণ বাক্যটি ‘أو’ (হরফে আতফ) এর মাধ্যমে পূর্ববর্তী حال শব্দ ‘بياتا’ এর ওপর معطوف (সংযুক্ত) হয়েছে।
অর্থাৎ, আজাব আসার সময় তাদের অবস্থা (حال) ছিল এমন যে, তারা হয় রাতে ঘুমন্ত ছিল, নতুবা দ্বিপ্রহরে বিশ্রামরত ছিল।
আয়াতসমূহের অনুবাদ:
“তারা আপনাকে আনফাল (গনিমত বা যুদ্ধের লব্ধ সম্পদ) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলুন, আনফাল হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং নিজেদের মধ্যকার সম্পর্ক সংশোধন করে নাও। আর আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করো, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাকো।”
সংক্ষিপ্ত তাফসির:
বদর যুদ্ধের পর গনিমতের সম্পদ বণ্টন নিয়ে সাহাবিদের মাঝে কিছু মতবিরোধ দেখা দিলে এই আয়াত নাজিল হয়। আল্লাহ জানিয়ে দেন যে গনিমতের সম্পদের মালিকানা আল্লাহ ও রাসুলের, রাসুল (সা.) আল্লাহর নির্দেশে তা বণ্টন করবেন। এখানে সম্পদের চেয়ে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও আল্লাহর আনুগত্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
[الأنفال এর অর্থ কী? এর হুকুম কী? غنيمة ও فيء এর মধ্যে পার্থক্য কী? লেখ।]
‘الأنفال’ এর অর্থ ও হুকুম:
الأنفال (আনফাল) শব্দটি نفل (নাফল) এর বহুবচন। এর আভিধানিক অর্থ অতিরিক্ত বস্তু, উপঢৌকন বা পুরস্কার। শরিয়তের পরিভাষায়, আনফাল বলতে গনিমত বা যুদ্ধের ময়দানে কাফিরদের পরাজিত করে হস্তগত করা সম্পদকে বোঝায়।
حكمها (হুকুম): আনফাল বা গনিমতের সম্পদ উম্মতে মুহাম্মদীর (সা.) জন্য সম্পূর্ণ হালাল ও বৈধ। পূর্ববর্তী নবীদের উম্মতদের জন্য এটি হালাল ছিল না, কিন্তু আল্লাহ তায়ালা সুরা আনফালের মাধ্যমে এই সম্পদকে মুসলমানদের জন্য বৈধ করেছেন এবং এর বণ্টনের নিয়মও ঠিক করে দিয়েছেন।
الفيء (ফায়) ও الغنيمة (গনিমত) এর পার্থক্য:
* الغنيمة (গনিমত): মুজাহিদগণ কাফিরদের সাথে সরাসরি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করে এবং লড়াইয়ের মাধ্যমে বিজয়ী হয়ে যে সম্পদ হস্তগত করে, তাকে গনিমত বলে। এর ৫ ভাগের ১ ভাগ (خمس) বায়তুল মালে (রাষ্ট্রীয় কোষাগারে) জমা হয় এবং বাকি ৪ ভাগ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুজাহিদদের মাঝে সুনির্দিষ্ট হারে বণ্টন করা হয়।
* الفيء (ফায়): কাফিরদের সাথে কোনো প্রকার যুদ্ধ বা লড়াই ছাড়াই, কাফিররা মুসলমানদের ভয়ে যে সম্পদ ফেলে পালিয়ে যায় বা স্বেচ্ছায় সন্ধির মাধ্যমে যে সম্পদ দেয়, তাকে ফায় বলে। ফায়-এর সম্পদ মুজাহিদদের মাঝে বণ্টন করা হয় না, বরং এর পুরোটাই বায়তুল মালে জমা হয় এবং রাষ্ট্রীয় ও জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় হয়।
[تقوى এর অর্থ কী? تقوى এর স্তরসমূহ সংক্ষেপে লেখ।]
التقوى (তাকওয়া) এর অর্থ:
তাকওয়া এর আভিধানিক অর্থ বেঁচে থাকা, ভয় করা, আত্মরক্ষা করা বা সতর্ক থাকা। শরিয়তের পরিভাষায়, আল্লাহ তায়ালার ভয়ে যাবতীয় হারাম ও গুনাহের কাজ থেকে নিজেকে রক্ষা করা এবং তাঁর আদেশগুলো যথাযথভাবে মেনে চলাকে তাকওয়া বলে।
مراتب التقوى (তাকওয়ার স্তরসমূহ):
তাকওয়ার প্রধানত ৩টি স্তর রয়েছে:
১. প্রাথমিক স্তর (المرتبة الدنيا): চিরস্থায়ী আজাব থেকে বাঁচার জন্য শিরক ও কুফর থেকে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত রাখা এবং খাঁটি ঈমান আনা।
২. মধ্যম স্তর (المرتبة الوسطى): যাবতীয় কবিরা গুনাহ (বড় পাপ) থেকে বেঁচে থাকা এবং সগিরা গুনাহের (ছোট পাপ) ওপর অটল না থেকে সাথে সাথে তওবা করা। এটি সাধারণ মুত্তাকি বা নেককার মুমিনদের স্তর।
৩. সর্বোচ্চ স্তর (المرتبة العليا): যে কাজগুলো সরাসরি হারাম নয়, কিন্তু সন্দেহযুক্ত (মাকরুহ) বা ভবিষ্যতে হারামের দিকে নিয়ে যেতে পারে, সেগুলো থেকেও নিজেকে দূরে রাখা। এমনকি দুনিয়াবি বৈধ ভোগবিলাস থেকেও অন্তরকে মুক্ত রেখে সার্বক্ষণিক আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকা। এটি নবী-রাসুল, আউলিয়া ও কামিল মুমিনদের স্তর।
আয়াতসমূহের অনুবাদ:
“হে মুমিনগণ! তোমরা যখন বিশাল বাহিনীরূপে কাফিরদের মুখোমুখি হবে, তখন তাদের থেকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে না (পালিয়ে যাবে না)। আর যে ব্যক্তি সেদিন তাদের থেকে পিঠ ফেরাবে—তবে যুদ্ধকৌশল হিসেবে কিংবা নিজ দলের সাথে মিলিত হওয়ার উদ্দেশ্য ছাড়া—সে তো আল্লাহর গযব নিয়েই ফিরবে। তার আশ্রয়স্থল হবে জাহান্নাম, আর তা কতই না নিকৃষ্ট গন্তব্য!”
সংক্ষিপ্ত তাফসির:
এই আয়াতে জিহাদের ময়দান থেকে পলায়ন করাকে কবিরা গুনাহ ও হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। তবে কেবল দুটি অবস্থায় পিছু হটার অনুমতি দেওয়া হয়েছে: ১. যুদ্ধকৌশল হিসেবে শত্রুকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য এবং ২. নিজেদের দলের অন্য কোনো ইউনিটের সাথে মিলিত হয়ে শক্তি সঞ্চয় করার জন্য।
[যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়নের হুকুম কী? কখন যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করা জায়েজ?]
حكم الفرار عن الحرب (যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়নের হুকুম):
ইসলামের সুরক্ষায় কাফিরদের সাথে লড়াই করার সময় যুদ্ধের ময়দান থেকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করা বা ভয়ে পালিয়ে যাওয়া ইসলামে হারাম এবং অন্যতম একটি কবিরা গুনাহ (মহা পাপ)। আয়াতে স্পষ্টভাবে সতর্ক করা হয়েছে যে, যে ব্যক্তি ময়দান থেকে পালাবে, সে আল্লাহর চরম গজব ও ক্রোধ নিয়ে ফিরবে এবং তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম।
متى يجوز (কখন পলায়ন করা জায়েজ):
আয়াতেই দুটি ব্যতিক্রম বা জায়েজ অবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যখন কৌশলগত কারণে পিছু হটার অনুমতি রয়েছে:
১. ‘مُتَحَرِّفًا لِّقِتَالٍ’ (যুদ্ধকৌশল হিসেবে): অর্থাৎ, যুদ্ধকৌশলের অংশ হিসেবে সাময়িক পিছু হটা, যাতে শত্রুকে ধোঁকা দিয়ে তাদের অবস্থান থেকে বের করে এনে পুনরায় আরও প্রবল বেগে পিছন বা পাশ থেকে আক্রমণ করা যায়।
২. ‘مُتَحَيِّزًا إِلَىٰ فِئَةٍ’ (নিজ দলের সাথে মিলিত হওয়ার জন্য): অর্থাৎ, যদি মুজাহিদদের কোনো ছোট দল শত্রুর ঘেরাওয়ে পড়ে দুর্বল বা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন মারা পড়ার চেয়ে পিছিয়ে গিয়ে মুসলিম বাহিনীর মূল দল বা অন্য কোনো দলের সাথে মিলিত হয়ে শক্তি সঞ্চয় করার উদ্দেশ্যে পিছু হটা জায়েজ।
[زَحْفًا শব্দটি নসববিশিষ্ট হওয়ার কারণ কী?]
‘زَحْفًا’ শব্দটি নসব (যবর) বিশিষ্ট হওয়ার কারণ (وجه النصب):
ব্যাকরণগত বা তারকীবের দিক থেকে ‘زَحْفًا’ শব্দটি দুটি কারণে নসব (فتح) গ্রহণ করতে পারে:
১. এটি مفعول مطلق (মফউলে মুতলাক) হওয়ার কারণে মানসুব বা নসববিশিষ্ট হয়েছে। এক্ষেত্রে মূল বাক্যটি ধরা হয়: ‘إذا لقيتم الذين كفروا زاحفين زحفا’।
২. এটি حال (অবস্থা) হওয়ার কারণে মানসুব হয়েছে। অর্থাৎ, এখানে ‘زحفا’ শব্দটি مصدر (ক্রিয়ামূল) হয়ে اسم فاعل (কর্তৃকারক) ‘زاحفين’ এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তখন অর্থ দাঁড়ায়: ‘لقيتموهم في حالة كونهم زاحفين’ (তোমরা তাদের সাথে এমন অবস্থায় মিলিত হও, যখন তারা ধীরগতিতে অগ্রসরমান)।
আয়াতসমূহের অনুবাদ:
“আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে সেই মুশরিকদের প্রতি সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা, যাদের সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলে। সুতরাং তোমরা পৃথিবীতে চার মাস নির্বিঘ্নে চলাফেরা করো এবং জেনে রাখো যে, তোমরা আল্লাহকে অক্ষম করতে পারবে না; আর আল্লাহ অবশ্যই কাফিরদের লাঞ্ছিত করবেন।”
সংক্ষিপ্ত তাফসির:
নবম হিজরিতে যখন মক্কা বিজয় হয়ে গেছে এবং ইসলাম শক্তিশালী হয়েছে, তখন আল্লাহ তাআলা ওই সব মুশরিকদের সাথে চুক্তি বাতিলের নির্দেশ দেন, যারা বারবার চুক্তি ভঙ্গ করত। তাদেরকে চার মাসের চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। এরপর থেকে জাজিরাতুল আরবে শিরকের কোনো স্থান থাকবে না বলে চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া হয়।
[التوبة অর্থ কী? সুরাহ আত-তাওবাহ এর প্রথমে بسم الله উল্লেখ না করার ব্যাপারে আলেমদের মতামত বর্ণনা কর।]
التوبة (তাওবাহ) এর অর্থ:
তাওবাহ শব্দের আভিধানিক অর্থ ফিরে আসা, প্রত্যাবর্তন করা বা অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চাওয়া। শরিয়তের পরিভাষায়, যাবতীয় গুনাহের কাজ থেকে অনুতপ্ত হয়ে, ভবিষ্যতে তা না করার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে আল্লাহর আনুগত্যের দিকে ফিরে আসাকে তাওবা বলে।
সুরা তাওবার শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ না থাকার কারণ:
কুরআনের ১১৪টি সুরার মধ্যে কেবল সুরা তাওবার শুরুতেই বিসমিল্লাহ নেই। এ ব্যাপারে আলেমদের দুটি প্রধান মতামত (أقوال العلماء) রয়েছে:
১. হযরত আলী (রা.) এবং ইবনে আব্বাস (রা.) এর মত: ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ হলো আল্লাহ তায়ালার পরম রহমত, করুণা ও শান্তির বাণী। অন্যদিকে সুরা তাওবা নাজিল হয়েছে তরবারি, যুদ্ধ এবং চুক্তিভঙ্গকারী কাফির-মুনাফিকদের প্রতি আল্লাহর চরম ক্রোধ ও সম্পর্কচ্ছেদের (براءة) কঠোর ঘোষণা নিয়ে। যেহেতু রহমতের বাণী ও ক্রোধের ঘোষণার মাঝে বৈপরীত্য রয়েছে, তাই এর শুরুতে বিসমিল্লাহ লেখা হয়নি।
২. হযরত উসমান (রা.) এর মত: রাসুল (সা.) ইন্তেকালের আগে বলে যাননি যে সুরা তাওবার শুরুতে বিসমিল্লাহ লিখতে হবে কিনা। তাছাড়া সুরা আনফাল এবং সুরা তাওবার বিষয়বস্তু প্রায় একই রকম হওয়ায়, সাহাবিদের ধারণা ছিল যে এটি হয়তো সুরা আনফালেরই একটি অংশ। তাই কোরআন সংকলনের সময় সতর্কতা হিসেবে এর মাঝে বিসমিল্লাহ দিয়ে দুটিকে সম্পূর্ণ পৃথক করা হয়নি।
[হারাম মাসসমূহ কী কী এবং এগুলোর হুকুম কী?]
الأشهر الحرم (হারাম বা সম্মানিত মাসসমূহ):
ইসলামী ক্যালেন্ডারের ১২টি আরবি মাসের মধ্যে ৪টি মাসকে বিশেষভাবে ‘আশহুরুল হুরুম’ বা সম্মানিত মাস বলা হয়। এগুলো হলো: ১. জিলকদ (ذو القعدة), ২. জিলহজ (ذو الحجة), ৩. মুহাররম (المحرم) এবং ৪. রজব (رجب)।
حكمها (এই মাসগুলোর হুকুম):
এই ৪টি মাস অত্যন্ত পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ। এই মাসগুলোতে যেকোনো নেক আমল বা ইবাদতের সওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়, তেমনি গুনাহের শাস্তিও অন্য সময়ের চেয়ে ভয়াবহ হয়। ইসলামের প্রাথমিক যুগে এবং জাহিলি আমলেও এই মাসগুলোতে কাফিরদের সাথে যেকোনো প্রকার যুদ্ধবিগ্রহ বা রক্তপাত শুরু করা সম্পূর্ণ হারাম বা নিষিদ্ধ ছিল। তবে আত্মরক্ষার্থে যুদ্ধ করার অনুমতি সব সময়ই ছিল। পরবর্তীতে কিছু ফকিহদের মতে, প্রয়োজনে এই মাসে যুদ্ধ করার নিষেধাজ্ঞা রহিত (মানসুখ) করা হয়েছে।
আয়াতসমূহের অনুবাদ:
“তিনিই সেই সত্তা, যিনি সূর্যকে দীপ্তিমান এবং চাঁদকে আলোকময় বানিয়েছেন। আর চাঁদের জন্য মনজিলসমূহ নির্দিষ্ট করেছেন, যাতে তোমরা বছরগুলোর সংখ্যা এবং হিসাব জানতে পারো। আল্লাহ এগুলোকে যথাযথ উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি করেছেন…”
সংক্ষিপ্ত তাফসির:
সুরা ইউনুসের এই আয়াতে আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন হিসেবে সূর্য ও চাঁদের কথা বলা হয়েছে। সূর্যের নিজস্ব আলো রয়েছে (ضياء) আর চাঁদের আলো প্রতিফলিত (نور)। চাঁদের হ্রাস-বৃদ্ধির মাধ্যমেই মানুষ মাস ও বছরের হিসাব রাখতে পারে, যা মানবজীবনের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
[نور ও ضياء এর মধ্যে পার্থক্য কী? বিস্তারিত বর্ণনা কর।]
ضياء (দিয়া) ও نور (নূর) এর মধ্যে পার্থক্য:
ضياء এবং نور উভয়ের সাধারণ অর্থ আলো বা জ্যোতি হলেও আরবি ভাষায় এ দুটির মাঝে সূক্ষ্ম ও বৈজ্ঞানিক পার্থক্য রয়েছে:
* ضياء (দিয়া): এটি হলো এমন আলো বা জ্যোতি যা তার নিজস্ব উৎস থেকে উৎপন্ন হয় (ذاتي) এবং যার সাথে প্রখরতা বা উত্তাপ (Heat) যুক্ত থাকে। যেমন- সূর্যের আলো, আগুনের আলো। আয়াতে আল্লাহ তায়ালা সূর্যকে ‘ضياءً’ বলেছেন, কারণ সূর্য নিজেই একটি জ্বলন্ত নক্ষত্র এবং তা নিজস্ব আলোতে আলোকিত হয়ে পৃথিবীতে উত্তাপ ছড়ায়।
* نور (নূর): এটি হলো এমন আলো যা নিজস্ব নয়, বরং অন্য কোনো উৎস থেকে প্রতিফলিত হয়ে আসে (عرضي বা مكتسب) এবং যা অত্যন্ত স্নিগ্ধ ও শীতল, তাতে কোনো উত্তাপ থাকে না। আল্লাহ তায়ালা চাঁদকে ‘نورًا’ বলেছেন, কারণ চাঁদের নিজস্ব কোনো আলো নেই, এটি সূর্যের আলোতে আলোকিত হয়ে পৃথিবীতে স্নিগ্ধ আলো প্রতিফলিত করে।
[আল্লাহ তায়ালার বাণী “لتعلموا عدد السنين والحساب” দ্বারা উদ্দেশ্য কী? সংক্ষেপে লেখ।]
আয়াতাংশের উদ্দেশ্য:
“যাতে তোমরা বছরসমূহের গণনা ও সময়ের হিসাব জানতে পারো।”
এর দ্বারা আল্লাহ তায়ালা সূর্য ও চাঁদের সুশৃঙ্খল গতিপথ সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য বা হিকমত বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ তায়ালা সূর্য ও চাঁদের জন্য নির্দিষ্ট কক্ষপথ ও মনযিল (কলা) নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সূর্য দ্বারা মানুষ দিন ও রাতের হিসাব এবং ঋতু পরিবর্তনের ধারণা পায়। আর চাঁদের হ্রাস-বৃদ্ধি দ্বারা মাস ও বছরের নির্ভুল গণনা করতে পারে। এর ফলেই মানুষের পার্থিব কাজকর্ম, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং ধর্মীয় ইবাদতের সময়সূচি (যেমন- রমজানের রোজা, হজ, ইদ্দত পালন ইত্যাদি) নির্ধারণ করা সহজ হয়েছে।
আয়াতসমূহের অনুবাদ:
“নিশ্চয়ই তোমাদের রব আল্লাহ, যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন ছয় দিনে; এরপর তিনি আরশে সমাসীন হন। তিনি সকল বিষয় পরিচালনা করেন। তাঁর অনুমতি ছাড়া সুপারিশ করার কেউ নেই। তিনিই আল্লাহ, তোমাদের রব; সুতরাং তোমরা তাঁরই ইবাদত করো। তবু কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?”
সংক্ষিপ্ত তাফসির:
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলার রুবুবিয়্যাহ (প্রভুত্ব) এবং উলুহিয়্যাহ (ইবাদতের অধিকার) এর বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। তিনি বিশাল মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই সবকিছুর একক পরিচালক। মুশরিকরা যাদেরকে সুপারিশকারী মনে করত, আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন যে তাঁর অনুমতি ছাড়া কিয়ামতের দিন কেউ সুপারিশ করার ক্ষমতা রাখবে না।
[আল্লাহ তায়ালার বাণী ‘فى ستة ايام’ দ্বারা কী উদ্দেশ্য? ব্যাখ্যা কর।]
‘فى ستة ايام’ (ছয় দিনে) এর উদ্দেশ্য ও ব্যাখ্যা:
আয়াতের অর্থ হলো, “নিশ্চয়ই তোমাদের রব আল্লাহ, যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন ছয় দিনে।”
এখানে ‘দিন’ বলতে আমাদের পৃথিবীর বর্তমান ২৪ ঘণ্টার দিনকে বোঝায় না। কারণ তখনো সূর্য বা চাঁদ সৃষ্টি হয়নি, তাই বর্তমানের মতো দিন-রাতের হিসাবও ছিল না। মুফাসসিরদের মতে, এখানে ‘দিন’ (يوم) দ্বারা দীর্ঘ ‘কাল’, ‘পর্যায়’ বা ‘যুগ’ (عصر / Stage) বোঝানো হয়েছে। অথবা পরকালের দিন উদ্দেশ্য হতে পারে, যার এক দিন আমাদের এক হাজার বছরের সমান (فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ أَلْفَ سَنَةٍ)।
হিকমত: সর্বশক্তিমান আল্লাহ চাইলে ‘কুন’ (হও) বলার সাথে সাথেই এক সেকেন্ডে মহাবিশ্ব সৃষ্টি করতে পারতেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি ছয় দিন সময় নিয়েছেন। এর হিকমত বা প্রজ্ঞা হলো, মানুষকে শিক্ষা দেওয়া যে কোনো বড় কাজ তাড়াহুড়ো করে না করে, ধীরে-সুস্থে ও সুশৃঙ্খলভাবে পর্যায়ক্রমে সম্পাদন করা উচিত।
[আল্লাহর বাণী ‘يدبر الامر’ এর ব্যাখ্যা কর।]
‘يدبر الامر’ (তিনি সব বিষয় পরিচালনা করেন) এর ব্যাখ্যা:
এর অর্থ হলো, আল্লাহ তায়ালা শুধু আসমান-জমিন সৃষ্টি করেই তাঁর দায়িত্ব শেষ করে দেননি (যেমনটি কিছু ভ্রান্ত দার্শনিক মনে করে), বরং তিনি প্রতিনিয়ত বিশ্বজগতের প্রতিটি অণু-পরমাণু, গ্রহ-নক্ষত্রের নিখুঁত গতিবিধি, মানুষের জীবন-মৃত্যু, প্রতিটি প্রাণীর রিজিক বণ্টন থেকে শুরু করে সৃষ্টিজগতের সবকিছুর সার্বক্ষণিক পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা এককভাবে করে চলেছেন। তাঁর এই বিশাল ও নিখুঁত ব্যবস্থাপনায় অন্য কারো বিন্দুমাত্র অংশীদারিত্ব বা হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই।
مجموعة (ب) [খ-বিভাগ: সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন]
[৯. تفسير المنار ও صفوة التفاسير এর বৈশিষ্ট্যসমূহের তুলনামূলক আলোচনা কর।]
আধুনিক যুগের দুটি সাড়া জাগানো তাফসির গ্রন্থ হলো ‘তাফসিরে মানার’ এবং ‘সাফওয়াতুত তাফাসির’। নিচে এদের বৈশিষ্ট্যের তুলনামূলক আলোচনা (موازنة) করা হলো:
تفسير المنار (তাফসিরে মানার):
১. রচয়িতা: এটি মূলত আধুনিক সংস্কারক মুফতি মুহাম্মদ আবদুহুর দরসের সংকলন, যা তাঁর প্রখ্যাত ছাত্র আল্লামা রশিদ রিদা লিপিবদ্ধ করেছেন।
২. বৈশিষ্ট্য: এটি মূলত আকল বা যুক্তির ওপর বেশি জোর দিয়েছে। কোরআনের আয়াতকে আধুনিক বিজ্ঞান ও সভ্যতার সাথে মিলিয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে।
৩. দৃষ্টিভঙ্গি: সমাজ সংস্কার ও কুসংস্কার দূর করার ওপর এটি বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে মুতাযিলা বা আকলি দৃষ্টিভঙ্গির কারণে কিছু মুজিজা বা অলৌকিক ঘটনাকে রূপক অর্থে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা দেখা যায়, যা অনেক আলেম মেনে নেননি।
صفوة التفاسير (সাফওয়াতুত তাফাসির):
১. রচয়িতা: এটি রচনা করেছেন আধুনিক যুগের প্রখ্যাত মুফাসসির শাইখ মুহাম্মদ আলী আস-সাবুনী।
২. বৈশিষ্ট্য: এটি মূলত পূর্ববর্তী ক্লাসিক্যাল ও বিখ্যাত তাফসিরগুলোর (যেমন তাফসিরে ইবনে কাসির, তাবারী, কাশশাফ, আলুসী) একটি নির্যাস বা সারসংক্ষেপ (صفوة)।
৩. দৃষ্টিভঙ্গি: এটি অত্যন্ত সহজবোধ্য। এতে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আকিদা কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়েছে। এতে শাব্দিক অর্থ, বালাগাত, শানে নুযূল এবং আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো আলাদা শিরোনামে গুছিয়ে লেখা হয়েছে।
উপসংহার: তাফসিরে মানার হলো যুক্তিনির্ভর এবং সংস্কারমুখী তাফসির, যেখানে কখনো কখনো সনাতন মতাদর্শের বাইরে যাওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ‘সাফওয়াতুত তাফাসির’ হলো ক্লাসিক্যাল তাফসিরগুলোর একটি আধুনিক, নির্ভরযোগ্য ও সহজ সংস্করণ, যা সব শ্রেণির মানুষের জন্য অত্যন্ত নিরাপদ ও উপকারী।
[১০. ডক্টর ওয়াহবাহ্ আয-যুহাইলী এর জীবনী উল্লেখসহ তাঁর রচিত তাফসির تفسير المنير এর বৈশিষ্ট্যসমূহ লেখ।]
حياة الدكتور وهبة الزحيلي (ড. ওয়াহবাহ আয-যুহাইলীর সংক্ষিপ্ত জীবনী):
* জন্ম: আধুনিক যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামি চিন্তাবিদ ও ফকিহ ড. ওয়াহবাহ মুস্তফা আয-যুহাইলী ১৯৩২ সালে সিরিয়ার দামেস্কের নিকটবর্তী ‘দাইর আতিয়্যাহ’ নামক শহরে জন্মগ্রহণ করেন।
* শিক্ষাজীবন: তিনি দামেস্ক বিশ্ববিদ্যালয় এবং মিশরের প্রখ্যাত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং ইসলামি শরিয়াহ ও আইন বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ফিকহ শাস্ত্রে তার মেধা ও পাণ্ডিত্য ছিল প্রবাদতুল্য।
* কর্মজীবন: তিনি দামেস্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামি আইন বিভাগের ডিন হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া তিনি বিশ্বব্যাপী বহু আন্তর্জাতিক ইসলামি ফিকহ একাডেমির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন।
* ইন্তেকাল: সারাজীবন ইলমের খিদমত করে এই মহান সাধক ২০১৫ সালের ৮ আগস্ট ইন্তেকাল করেন।
خصائص تفسيره ‘التفسير المنير’ (তাঁর রচিত ‘তাফসিরুল মুনীর’ এর বৈশিষ্ট্য):
তাফসিরুল মুনীর আধুনিক যুগের একটি মাস্টারপিস গ্রন্থ। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
১. এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক তাফসির, যা বিশাল ১৬ খণ্ডে (বা ৩২ খণ্ডে) রচিত।
২. এর বিন্যাস পদ্ধতি অত্যন্ত চমৎকার। এতে আয়াতের শাব্দিক অর্থ, বাক্যবিশ্লেষণ (اعراب), শানে নুযূল এবং আয়াতের মূল তাফসির আলাদা আলাদা সাব-হেডিংয়ে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা পড়তে খুব সুবিধা হয়।
৩. যেহেতু তিনি মূলত একজন ফকিহ ছিলেন, তাই আয়াত থেকে প্রাপ্ত ফিকহি মাসআলাগুলো (احكام الآيات) কোরআনের আলোকে অত্যন্ত বিস্তারিত ও তুলনামূলকভাবে আলোচনা করেছেন।
৪. এটি আধুনিক যুগজিজ্ঞাসা ও বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনার সাথে কোরআনের সামঞ্জস্য খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছে।
৫. এখানে দুর্বল হাদিস (ضعيف حديث) ও বানোয়াট ইসরাঈলি বর্ণনাসমূহ কঠোরভাবে বর্জন করা হয়েছে, যা এর গ্রহণযোগ্যতা ও নির্ভরযোগ্যতা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।






