Ulumul Quran (Code: 201205) – ২০২৩ প্রশ্ন ও উত্তর
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২৩ এর আল-কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের علوم القرآن (উলুমুল কুরআন) বিষয়ের সম্পূর্ণ উত্তরমালা।
বিঃদ্রঃ পরীক্ষার্থীদের আগামী পরীক্ষার সর্বোচ্চ প্রস্তুতির সুবিধার্থে মূল প্রশ্নপত্রের বিকল্প সবগুলোর (অথবা) প্রশ্নের ১০০% নির্ভুল ও তথ্যবহুল উত্তর আরবি দলিল ও অর্থসহ বিস্তারিতভাবে নিচে দেওয়া হলো।
الملاحظة: أجب عن أربعة من مجموعة (أ) (যেকোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও)
[১. উলুমুল কুরআন দ্বারা উদ্দেশ্য কী? উলুমুল কুরআন সংকলনের ইতিহাস বিস্তারিতভাবে বর্ণনা কর।]
উলুমুল কুরআন-এর পরিচয়:
‘উলুম’ (علوم) শব্দটি ‘ইলম’ (علم)-এর বহুবচন, যার অর্থ জ্ঞান বা বিদ্যা। আর ‘কুরআন’ (القرآن) হলো আল্লাহ তা’আলার সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাব। সুতরাং ‘উলুমুল কুরআন’ (علوم القرآن) বলতে এমন সব জ্ঞান বা বিদ্যাকে বোঝায়, যা পবিত্র কুরআনের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।
পারিভাষিক অর্থে, যেসব শাস্ত্রের মাধ্যমে কুরআনুল কারিম নাযিল হওয়া, শানে নুযূল, মাক্কি ও মাদানি সূরা, নাসিখ-মানসুখ, মুহকাম-মুতাশাবিহ, কুরআনের সংকলন, তিলাওয়াতের নিয়মাবলি, তাফসির ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়, তাকে ‘উলুমুল কুরআন’ বলা হয়। আল্লামা যুরকানি (রহ.) বলেন, “এটি এমন একটি শাস্ত্র যা কুরআনের সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করে।”
উলুমুল কুরআন সংকলনের ইতিহাস:
উলুমুল কুরআন কোনো একদিনে বা এক যুগে রচিত হয়নি। যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন আলিম ও গবেষকদের নিরলস পরিশ্রমে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ শাস্ত্রে রূপ নিয়েছে। এর ইতিহাসকে কয়েকটি যুগে ভাগ করা যায়:
১. রাসুলুল্লাহ (স.) ও সাহাবাদের যুগ:
নবিজি (স.)-এর যুগে উলুমুল কুরআনের কোনো লিখিত রূপ ছিল না, কারণ তখন সাহাবিরা সরাসরি রাসুল (স.)-এর কাছ থেকে কুরআন বুঝতেন। তাদের মাতৃভাষা ছিল বিশুদ্ধ আরবি। এই যুগে সাহাবাদের মধ্যে চার খলিফা, ইবনে আব্বাস (রা.), ইবনে মাসউদ (রা.) ছিলেন উলুমুল কুরআনের প্রধান ধারক।
২. তাবিঈদের যুগ:
সাহাবাদের পর তাবিঈদের যুগে কুরআনের বিভিন্ন শাখা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। মুজাহিদ, কাতাদা, ইকরিমা প্রমুখ তাবিঈগণ তাফসির ও শানে নুযূল নিয়ে আলোচনা করতেন, তবে তা তখনও নির্দিষ্ট শাস্ত্র হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়নি।
৩. গ্রন্থ রচনার যুগ (২য় ও ৩য় হিজরি):
এই যুগে উলুমুল কুরআনের বিভিন্ন শাখা নিয়ে পৃথক পৃথক গ্রন্থ রচিত হতে থাকে। যেমন—
– ইয়াহইয়া বিন ইয়ামার (মৃ. ১২৯ হি.) ‘কুরআনের নুকতা ও হরকত’ নিয়ে বই লেখেন।
– ইমাম শাফেয়ী (মৃ. ২০৪ হি.) ‘আহকামুল কুরআন’ রচনা করেন।
– আবু উবায়দ কাসিম বিন সাল্লাম (মৃ. ২২৪ হি.) ‘নাসিখ-মানসুখ’ ও ‘কিরাআত’ শাস্ত্রের ওপর গ্রন্থ লেখেন।
৪. পূর্ণাঙ্গ রূপদানের যুগ (৪র্থ ও ৫ম হিজরি):
এই যুগে উলুমুল কুরআনের সব বিষয়কে একত্রিত করে ‘উলুমুল কুরআন’ নামে পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচনার সূচনা হয়। যেমন—
– আবু বকর আল-বাকিয়ানি (মৃ. ৪০৩ হি.) রচনা করেন ‘ইজাযুল কুরআন’।
– আবুল হাসান আল-আশআরী রচনা করেন ‘আল-মুখতাযান ফি উলুমিল কুরআন’।
৫. উৎকর্ষের যুগ (ষষ্ঠ থেকে নবম হিজরি):
এই যুগে উলুমুল কুরআনের ওপর সবচেয়ে বিখ্যাত ও কালজয়ী গ্রন্থগুলো রচিত হয়। যেমন—
– আল্লামা বদরুদ্দীন যারকাশি (রহ.) রচনা করেন অমর গ্রন্থ ‘আল-বুরহান ফি উলুমিল কুরআন’।
– হাফিজ জালালুদ্দীন সুয়ূতি (রহ.) রচনা করেন যুগান্তকারী গ্রন্থ ‘আল-ইতকান ফি উলুমিল কুরআন’, যা আজও এই শাস্ত্রের সবচেয়ে প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত।
[২. শানে নুযূল এর সংজ্ঞা দাও। শানে নুযূল জানার উপকারিতা ও গ্রহণযোগ্য হওয়ার শর্ত সম্পর্কে বিশদভাবে আলোচনা কর।]
শানে নুযূল এর সংজ্ঞা:
‘শানে নুযূল’ (سبب النزول) দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। ‘শান’ বা ‘সবব’ অর্থ কারণ বা প্রেক্ষাপট, আর ‘নুযূল’ অর্থ অবতীর্ণ হওয়া।
পারিভাষিক অর্থে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে সংঘটিত এমন কোনো ঘটনা বা জিজ্ঞাসিত এমন কোনো প্রশ্ন, যার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনের কোনো আয়াত বা সূরা অবতীর্ণ করেছেন, তাকে সেই আয়াত বা সূরার ‘শানে নুযূল’ বা অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট বলা হয়।
শানে নুযূল জানার উপকারিতা (فوائد معرفة سبب النزول):
আল্লামা সুয়ূতি ও যারকাশি (রহ.) শানে নুযূল জানার অনেক উপকারিতা বর্ণনা করেছেন:
১. আয়াতের সঠিক অর্থ অনুধাবন: শানে নুযূল জানা ছাড়া অনেক আয়াতের প্রকৃত অর্থ বোঝা অসম্ভব। ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, “কারণ জানলে কারণের ফলে সৃষ্ট বিষয় জানা সহজ হয়।”
২. সন্দেহ দূরীকরণ: শানে নুযূল জানলে আয়াতের অর্থ নিয়ে সৃষ্ট সন্দেহ ও বিভ্রান্তি দূর হয়।
৩. বিধানের হিকমত জানা: আল্লাহ তা’আলা কী কারণে এবং কোন প্রেক্ষাপটে একটি বিধান দিয়েছেন, তা শানে নুযূলের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়।
৪. নাসিখ ও মানসুখ নির্ধারণ: শানে নুযূলের মাধ্যমে জানা যায় কোন আয়াতটি আগে অবতীর্ণ হয়েছে আর কোনটি পরে, যা রহিত (মানসুখ) বিধান চিনতে সাহায্য করে।
৫. আয়াত নির্দিষ্টকরণ: আয়াতটি কার সম্পর্কে বা কাদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়।
শানে নুযূল গ্রহণযোগ্য হওয়ার শর্ত (شروط قبول سبب النزول):
যেকোনো ঘটনাকেই শানে নুযূল হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। এর জন্য কিছু কঠিন শর্ত রয়েছে:
১. সাহাবির প্রত্যক্ষ বর্ণনা: শানে নুযূল অবশ্যই এমন কোনো সাহাবি থেকে বর্ণিত হতে হবে, যিনি ঘটনাটি নিজের চোখে দেখেছেন এবং আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন।
২. বিশুদ্ধ সনদ: বর্ণনাকারীর সনদ (সনদ পরম্পরা) অবশ্যই সহিহ (বিশুদ্ধ) হতে হবে। দুর্বল বা জাল বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে শানে নুযূল নির্ধারণ করা যায় না।
৩. ঘটনা ও আয়াতের মধ্যে সামঞ্জস্য: বর্ণিত ঘটনার সাথে নাযিলকৃত আয়াতের অর্থের পূর্ণ সামঞ্জস্য থাকতে হবে।
৪. সুনির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহার: সাহাবি বর্ণনার সময় সুস্পষ্টভাবে বলতে হবে যে, “এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আয়াতটি নাযিল হয়েছে” (فنزلت الآية)। যদি সাহাবি বলেন, “আমার মনে হয় এই আয়াতটি ওই ব্যাপারে নাযিল হয়েছে”, তবে তা চূড়ান্ত শানে নুযূল হিসেবে গণ্য হবে না, বরং তা আয়াতের তাফসির হিসেবে গণ্য হবে।
[৩. আল-জাদাল এর আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা দাও। কুরআনের মুনাযারার প্রকারগুলো বিস্তারিতভাবে বর্ণনা কর।]
আল-জাদাল এর আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা:
আভিধানিক অর্থ: ‘জাদাল’ (الجدل) আরবি শব্দ, যার অর্থ হলো— বিতর্ক করা, যুক্তিতর্ক করা, ঝগড়া করা বা প্রমাণ উপস্থাপন করে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করা।
পারিভাষিক অর্থ: উলুমুল কুরআনের পরিভাষায়, ‘জাদাল’ বা ‘মুনাযারা’ বলতে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত ওইসব অকাট্য যুক্তিতর্ক ও প্রমাণকে বোঝায়, যার মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা কাফির, মুশরিক, ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুনাফিকদের ভ্রান্ত বিশ্বাস খণ্ডন করেছেন এবং তাওহিদ, রিসালাত ও আখিরাতের সত্যতা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন:
وَجَادِلْهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ
অর্থ: “এবং তাদের সাথে বিতর্ক করুন উত্তম পন্থায়।” (সূরা নাহল: ১২৫)
কুরআনের মুনাযারার প্রকারভেদ:
কুরআনুল কারিমে বিভিন্ন ধরনের যুক্তিতর্ক বা মুনাযারা ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলোকে প্রধানত পাঁচটি ভাগে ভাগ করা যায়:
১. আল-কিয়াসুল খলফি (القياس الخلفي):
প্রতিপক্ষের ভুল দাবির ওপর ভিত্তি করে এমন একটি অবাস্তব বা অসম্ভব ফলাফল তুলে ধরা, যাতে প্রতিপক্ষ নিজের ভুল বুঝতে বাধ্য হয়। যেমন— মুশরিকরা বলত পৃথিবীতে একাধিক ইলাহ আছে। কুরআন এর উত্তরে বলে:
لَوْ كَانَ فِيهِمَا آلِهَةٌ إِلَّا اللَّهُ لَفَسَدَتَا
অর্থ: “যদি আকাশ ও পৃথিবীতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ থাকত, তবে উভয়ই ধ্বংস হয়ে যেত।” (সূরা আম্বিয়া: ২২)
২. আদ-দালিলুল ইস্তিকরায়ি (الدليل الاستقرائي):
জগতের দৃশ্যমান নিদর্শনাদির ওপর চিন্তা-গবেষণা করার মাধ্যমে স্রষ্টার অস্তিত্ব ও একত্বের প্রমাণ দেওয়া। যেমন:
أَفَلَا يَنظُرُونَ إِلَى الْإِبِلِ كَيْفَ خُلِقَتْ
অর্থ: “তারা কি উটের দিকে লক্ষ করে না যে, কীভাবে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে?” (সূরা গাশিয়া: ১৭)
৩. আল-মুনাযারাতুত তারিকিয়্যাহ (المناظرة التاريخية):
অতীতের অহংকারী জাতিগুলোর ধ্বংসের ঐতিহাসিক প্রমাণ দিয়ে বর্তমানের অবাধ্যদের সতর্ক করা। যেমন— আদ, সামুদ ও ফিরাউনের ঘটনা বর্ণনা করে মক্কার কাফিরদের ভয় দেখানো হয়েছে।
৪. আল-ইলযাম বা বাধ্য করা (الإلزام):
প্রতিপক্ষের স্বীকৃত কোনো কথার মাধ্যমেই তাদের মিথ্যা প্রমাণ করা। যেমন— কাফিররা মানত যে আসমান-যমিন আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন, কিন্তু তারা মূর্তিপূজা করত। কুরআন তাদের প্রশ্ন করে:
وَلَئِن سَأَلْتَهُم مَّنْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ ۚ قُلْ أَفَرَأَيْتُم مَّا تَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ
অর্থ: “যদি আপনি তাদের জিজ্ঞেস করেন আসমান ও যমিন কে সৃষ্টি করেছে? তারা অবশ্যই বলবে, ‘আল্লাহ’। বলুন, তবে আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদের ডাকো তাদের ব্যাপারে ভেবে দেখেছ কি?” (সূরা যুমার: ৩৮)
৫. আস-সিবর ওয়াত-তাকসিম (السبر والتقسيم):
সম্ভাব্য সব কারণ উল্লেখ করে সেগুলোর বাতিল হওয়া প্রমাণ করে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করা। যেমন— মৃত্যুর পর পুনরুত্থানকে যারা অস্বীকার করে, তাদের উদ্দেশে বলা হয়েছে:
أَمْ خُلِقُوا مِنْ غَيْرِ شَيْءٍ أَمْ هُمُ الْخَالِقُونَ
অর্থ: “তারা কি স্রষ্টা ছাড়া এমনিই সৃষ্টি হয়েছে, নাকি তারা নিজেরাই নিজেদের স্রষ্টা?” (সূরা তূর: ৩৫)
[৪. মফহুমুল মুয়াফাকা ও মফহুমুল মুখালাফা এর সংজ্ঞা দাও। উভয়ের প্রকারগুলো উদাহরণসহ বিস্তারিত বর্ণনা কর।]
মফহুমুল মুয়াফাকা ও মফহুমুল মুখালাফা-এর সংজ্ঞা:
ইসলামি শরিয়তের উসুল বা মূলনীতি শাস্ত্রে কোনো বাক্যের অর্থ বোঝার জন্য ‘মফহুম’ (মর্মার্থ) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি প্রধানত দুই প্রকার:
১. মফহুমুল মুয়াফাকা (مفهوم الموافقة):
কোনো বাক্যের উচ্চারিত শব্দের বিধান যা হবে, অনুচ্চারিত বিষয়ের বিধানও যদি যুক্তির নিরিখে হুবহু একই হয় বা তার চেয়েও তীব্র হয়, তবে তাকে মফহুমুল মুয়াফাকা বলে। অর্থাৎ এখানে উচ্চারিত ও অনুচ্চারিত বিষয়ের হুকুম বা বিধান একে অপরের সাথে ‘মুয়াফাকা’ (মিল) রাখে।
প্রকারভেদ ও উদাহরণ: মফহুমুল মুয়াফাকা দুই প্রকার:
ক. ফাহওয়াল খিতাব (فحوى الخطاب): যখন অনুচ্চারিত বিষয়ের কারণ উচ্চারিত বিষয়ের চেয়ে অধিক প্রবল হয়।
উদাহরণ: আল্লাহ বলেন, فَلَا تَقُل لَّهُمَا أُفٍّ অর্থ: “পিতামাতাকে ‘উফ’ শব্দটি পর্যন্ত বোলো না।” (সূরা বনি ইসরাইল: ২৩)।
এখানে শুধু ‘উফ’ বলতে নিষেধ করা হয়েছে (উচ্চারিত শব্দ)। কিন্তু এর ‘মফহুমুল মুয়াফাকা’ হলো, পিতামাতাকে প্রহার করা বা গালি দেওয়া আরও বড় অপরাধ (অনুচ্চারিত), যা এই আয়াতের মাধ্যমে হারাম হয়ে গেছে।
খ. লাহনুল খিতাব (لحن الخطاب): যখন উচ্চারিত ও অনুচ্চারিত উভয় বিষয়ের কারণ সমান হয়।
উদাহরণ: কুরআনে এতিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। এর মফহুমুল মুয়াফাকা হলো, এতিমের সম্পদ পুড়িয়ে নষ্ট করাও হারাম, কারণ উভয় ক্ষেত্রেই এতিমের ক্ষতি সমপর্যায়ের।
২. মফহুমুল মুখালাফা (مفهوم المخالفة):
কোনো বাক্যের উচ্চারিত শব্দে যে বিধান দেওয়া হয়েছে, সেই শব্দের বিপরীত বা অনুচ্চারিত অবস্থায় বিধানটি সম্পূর্ণ বিপরীত হবে বলে ধরে নেওয়াকে মফহুমুল মুখালাফা বলে। অর্থাৎ উচ্চারিত বিষয়ের বিপরীত অবস্থা হলে হুকুমও ‘মুখালাফাত’ (বিপরীত) হয়ে যাবে।
প্রকারভেদ ও উদাহরণ: মফহুমুল মুখালাফার কয়েকটি প্রকার রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
ক. মফহুমুস সিফাত (مفهوم الصفة): গুণের বিপরীত অবস্থা।
উদাহরণ: “মুমিন দাসী বিবাহ করা উত্তম।” এর মফহুমুল মুখালাফা হলো, কাফির দাসী বিবাহ করা উত্তম নয়।
খ. মফহুমুশ শারত (مفهوم الشرط): শর্তের বিপরীত অবস্থা।
উদাহরণ: وَإِن كُنَّ أُولَاتِ حَمْلٍ فَأَنفِقُوا عَلَيْهِنَّ “তালাকপ্রাপ্তা নারী যদি গর্ভবতী হয়, তবে সন্তান প্রসব পর্যন্ত তাদের ব্যয়ভার বহন করো।” (সূরা তালাক: ৬)। এর মফহুমুল মুখালাফা হলো, গর্ভবতী না হলে দীর্ঘ মেয়াদে ব্যয়ভার বহন করা আবশ্যক নয়।
গ. মফহুমুল গায়াহ (مفهوم الغاية): সীমানার বিপরীত অবস্থা।
উদাহরণ: وَلَا تَقْرَبُوهُنَّ حَتَّىٰ يَطْهُرْنَ “ঋতুবতী স্ত্রীর নিকটবর্তী হবে না, যে পর্যন্ত না তারা পবিত্র হয়।” (সূরা বাকারা: ২২২)। এর মফহুমুল মুখালাফা হলো, পবিত্র হয়ে গেলে তাদের নিকটবর্তী হওয়া জায়েজ।
[৫. কসম কাকে বলে? কুরআনের মুকসাম বিহী ও মুকসাম আলাইহি এর অবস্থা সম্পর্কে বিশদভাবে আলোচনা কর।]
কসম বা আল-কাসাম (القسم)-এর পরিচয়:
‘কসম’ (القسم)-এর আভিধানিক অর্থ হলো— শপথ করা, হলফ করা বা কসম খাওয়া।
পারিভাষিক অর্থে, কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে শ্রোতার অন্তরে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করানোর জন্য এবং বিষয়ের প্রতি জোর দেওয়ার জন্য শপথবাচক শব্দ (যেমন: ওয়াও, বা, তা) ব্যবহার করে কোনো মহান সত্তা বা বস্তুর নামে শপথ করাকে ‘কসম’ বলা হয়। আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে অনেক বিষয়ের ওপর কসম খেয়েছেন।
মুকসাম বিহী (المقسم به) এবং মুকসাম আলাইহি (المقسم عليه):
কসমের দুটি প্রধান অংশ থাকে:
১. মুকসাম বিহী (المقسم به):
যার নামে বা যে বস্তুর নামে কসম খাওয়া হয়, তাকে ‘মুকসাম বিহী’ বলে।
কুরআনে মুকসাম বিহীর অবস্থা:
কুরআনে আল্লাহ তা’আলা তাঁর নিজের পবিত্র সত্তার নামে কসম করেছেন। যেমন:
فَوَرَبِّكَ لَنَسْأَلَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ
অর্থ: “সুতরাং আপনার রব্বের কসম! আমি তাদের সবাইকে অবশ্যই জিজ্ঞাসাবাদ করব।” (সূরা হিজর: ৯২)
এছাড়া আল্লাহ তা’আলা তাঁর সৃষ্টিজগতের অনেক বিস্ময়কর বস্তুর নামে কসম করেছেন। যেমন: সূর্য, চন্দ্র, দিন, রাত, ডুমুর, যয়তুন, মক্কা নগরী ইত্যাদির কসম। যেমন:
وَالشَّمْسِ وَضُحَاهَا
অর্থ: “কসম সূর্যের এবং তার কিরণের।” (সূরা শামস: ১)
নোট: সৃষ্টির জন্য আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে কসম করা হারাম। কিন্তু আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির মাহাত্ম্য বা বিশালতা বোঝানোর জন্য যেকোনো সৃষ্টির নামে কসম করতে পারেন।
২. মুকসাম আলাইহি (المقسم عليه):
যে বিষয়ের সত্যতা প্রমাণের জন্য বা যে কথার ওপর জোর দেওয়ার জন্য কসম খাওয়া হয়, তাকে ‘মুকসাম আলাইহি’ বা ‘জওয়াবুল কসম’ বলে।
কুরআনে মুকসাম আলাইহির অবস্থা:
কুরআনে সাধারণত তাওহিদ (একত্ববাদ), নবুওয়াত, কিয়ামত, মানুষের কর্মফল ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রমাণের জন্য কসম করা হয়েছে। যেমন:
وَالْعَصْرِ ۙ إِنَّ الْإِنسَانَ لَفِي خُسْرٍ
অর্থ: “সময়ের কসম! (মুকসাম বিহী) নিশ্চয়ই মানুষ চরম ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত। (মুকসাম আলাইহি)” (সূরা আসর: ১-২)
কখনো কখনো মুকসাম আলাইহি এতই সুস্পষ্ট হয় যে, তা বাক্যে উহ্য (লুক্কায়িত) রাখা হয়। যেমন: ‘সাদ, কসম উপদেশপূর্ণ কুরআনের!’ এখানে মুকসাম আলাইহি উহ্য রয়েছে, যার অর্থ— “নিশ্চয়ই আপনি সত্য নবি।”
[৬. আমছাল এর আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা দাও। কুরআনের আমছাল কত প্রকার? উদাহরণসহ বিস্তারিত বর্ণনা কর।]
আমছাল (الأمثال)-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা:
আভিধানিক অর্থ: ‘আমছাল’ শব্দটি ‘মাছাল’ (مثل)-এর বহুবচন, যার অর্থ হলো— উপমা, দৃষ্টান্ত, প্রবাদ বা উদাহরণ।
পারিভাষিক অর্থ: উলুমুল কুরআনের পরিভাষায়, কোনো অদেখা, বিমূর্ত বা জটিল বিষয়কে মানুষের মনের মণিকোঠায় সহজে বোধগম্য করার জন্য একটি দেখা, মূর্ত ও পরিচিত বিষয়ের সাথে তুলনা করে দৃষ্টান্ত বা উপমা পেশ করাকে কুরআনের ‘আমছাল’ বলা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন:
وَتِلْكَ الْأَمْثَالُ نَضْرِبُهَا لِلنَّاسِ ۖ وَمَا يَعْقِلُهَا إِلَّا الْعَالِمُونَ
অর্থ: “আমি মানুষের জন্য এসব উপমা দিয়ে থাকি; তবে শুধু জ্ঞানীরাই তা বুঝতে পারে।” (সূরা আনকাবুত: ৪৩)
কুরআনের আমছাল-এর প্রকারভেদ ও উদাহরণ:
কুরআনুল কারিমে আমছাল বা উপমা প্রধানত তিন প্রকার:
১. আল-আমছালুল মুসাররাহা (الأمثال المصرحة):
যে উপমায় স্পষ্টভাবে ‘মাছাল’, ‘কা’, ‘মিছলু’ (مثل, كـ) ইত্যাদি উপমাবাচক শব্দ উল্লেখ করে সরাসরি দৃষ্টান্ত দেওয়া হয়।
উদাহরণ: মুনাফিকদের উদাহরণ দিতে গিয়ে আল্লাহ বলেন:
مَثَلُهُمْ كَمَثَلِ الَّذِي اسْتَوْقَدَ نَارًا…
অর্থ: “তাদের উপমা ওই ব্যক্তির মতো, যে আগুন জ্বালাল, কিন্তু যখন আলো তার চারপাশ আলোকিত করল, তখন আল্লাহ তাদের আলো কেড়ে নিলেন।” (সূরা বাকারা: ১৭)
২. আল-আমছালুল কামিনাহ (الأمثال الكامنة):
যে আয়াতে সরাসরি উপমাবাচক কোনো শব্দ থাকে না, কিন্তু আয়াতের অর্থটি একটি সুন্দর ও বাস্তব উপমা বা প্রবাদের অর্থের সাথে হুবহু মিলে যায় (লুক্কায়িত উপমা)।
উদাহরণ: আরবদের একটি প্রবাদ আছে— ‘خير الأمور أوساطها’ (মধ্যম পন্থাই সর্বোত্তম)। কুরআনে সরাসরি এই প্রবাদটি নেই, তবে একই অর্থে আল্লাহ বলেছেন:
وَالَّذِينَ إِذَا أَنفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَٰلِكَ قَوَامًا
অর্থ: “এবং তারা যখন ব্যয় করে, তখন অপব্যয় করে না এবং কার্পণ্যও করে না; বরং তারা এ দুয়ের মাঝামাঝি (মধ্যম পন্থা) অবলম্বন করে।” (সূরা ফুরকান: ৬৭)
৩. আল-আমছালুল মুরসালাহ (الأمثال المرسلة):
কুরআনের এমন সব আয়াত, যা উপমা হিসেবে নাযিল হয়নি, কিন্তু সেগুলোর অর্থ এতই ব্যাপক ও প্রজ্ঞাপূর্ণ যে, মানুষ বাস্তব জীবনে সেগুলোকে প্রবাদ বাক্য হিসেবে ব্যবহার করে থাকে।
উদাহরণ:
هَلْ جَزَاءُ الْإِحْسَانِ إِلَّا الْإِحْسَانُ
অর্থ: “উত্তম কাজের প্রতিদান উত্তম ছাড়া আর কী হতে পারে?” (সূরা রহমান: ৬০)
لَيْسَ لَهَا مِن دُونِ اللَّهِ كَاشِفَةٌ
অর্থ: “আল্লাহ ছাড়া এ বিপদ দূরকারী আর কেউ নেই।” (সূরা নাজম: ৫৮)
[৭. মুহকাম ও মুতাশাবিহ কাকে বলে? মুতাশাবিহ এর জ্ঞান অর্জন করা কি সম্ভব? পূর্ববর্তী ও পরবর্তী আলিমগণের মতামত দলিলসহ বর্ণনা কর।]
মুহকাম ও মুতাশাবিহ কাকে বলে?
পবিত্র কুরআনের আয়াতসমূহকে অর্থগত স্পষ্টতার দিক থেকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে— মুহকাম ও মুতাশাবিহ। আল্লাহ বলেন:
هُوَ الَّذِي أَنزَلَ عَلَيْكَ الْكِتَابَ مِنْهُ آيَاتٌ مُّحْكَمَاتٌ هُنَّ أُمُّ الْكِتَابِ وَأُخَرُ مُتَشَابِهَاتٌ
অর্থ: “তিনিই আপনার প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করেছেন, এর কিছু আয়াত ‘মুহকাম’, যা কিতাবের মূল, আর অন্যগুলো ‘মুতাশাবিহ’।” (সূরা আলে-ইমরান: ৭)
মুহকাম (محكم): যে আয়াতের অর্থ সম্পূর্ণ সুস্পষ্ট, যাতে কোনো জটিলতা নেই এবং একাধিক অর্থ করার সুযোগ নেই। শরিয়তের হালাল-হারাম, ফরজ-ওয়াজিব নির্দেশকারী আয়াতগুলো মুহকাম।
মুতাশাবিহ (متشابه): যে আয়াতের অর্থ অস্পষ্ট বা রূপক, যার প্রকৃত অর্থ আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নিশ্চিতভাবে জানে না। যেমন: হুরূফে মুকাত্তাআত (আলিফ-লাম-মীম), আল্লাহর হাত (يَدُ اللَّهِ), আল্লাহর চেহারা (وَجْهُ اللَّهِ) ইত্যাদি।
মুতাশাবিহ আয়াতের জ্ঞান অর্জন করা কি সম্ভব? (আলিমগণের মতামত):
মুতাশাবিহ আয়াতের প্রকৃত অর্থ মানুষ জানতে পারে কি না, এ বিষয়ে পূর্ববর্তী (সালাফ) ও পরবর্তী (খালাফ) আলিমগণের মধ্যে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। এর মূল কারণ হলো সূরা আলে-ইমরানের ৭নং আয়াতের বিরামচিহ্ন (ওয়াকফ) কোথায় হবে তা নিয়ে মতভেদ:
১. সালাফ বা পূর্ববর্তী আলিমগণের মতামত (ওয়াকফে লাযিম):
অধিকাংশ সাহাবি, তাবিঈ এবং ইমাম মালিক (রহ.) সহ সালাফগণের মতে, মুতাশাবিহ আয়াতের অর্থ আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। তারা وَمَا يَعْلَمُ تَأْوِيلَهُ إِلَّا اللَّهُ (এর ব্যাখ্যা শুধু আল্লাহই জানেন) অংশে ওয়াকফ (থামা) করেন।
তাদের দলিল ও অবস্থান: তারা এসব আয়াতের প্রতি পূর্ণ ঈমান রাখেন, কিন্তু এর প্রকৃত অর্থ ও ধরন আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেন। তারা এর কোনো ব্যাখ্যা (তাউয়িল) করেন না। ইমাম মালিক (রহ.)-কে আল্লাহর ‘আরশে সমাসীন হওয়া’ (استواء) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন: “ইস্তিউয়া জানা বিষয়, কিন্তু এর ধরন অজানা; এর প্রতি ঈমান আনা ওয়াজিব, আর এ নিয়ে প্রশ্ন করা বিদআত।”
২. খালাফ বা পরবর্তী আলিমগণের মতামত (ওয়াকফে আত্বফ):
ইমাম মুজাহিদ, ইমাম রাযি (রহ.) সহ পরবর্তী যুগের আলিমদের (খালাফ) মতে, সুগভীর জ্ঞানের অধিকারী আলিমগণও (راسخون في العلم) মুতাশাবিহ আয়াতের ব্যাখ্যা করতে পারেন। তারা إِلَّا اللَّهُ وَالرَّاسِخُونَ فِي الْعِلْمِ (আল্লাহ এবং গভীর জ্ঞানের অধিকারীরা জানে) পর্যন্ত পড়ে ওয়াকফ করেন।
তাদের দলিল ও অবস্থান: যখন অন্য ভাষাভাষী ও বিভ্রান্ত সম্প্রদায়গুলো মুতাশাবিহ আয়াত নিয়ে সাধারণ মুসলমানদের ঈমান নষ্ট করতে শুরু করল, তখন খালাফ আলিমগণ আল্লাহর শানের সাথে মানানসই এমন রূপক অর্থ বা ব্যাখ্যা (তাউয়িল) করা বৈধ মনে করেন। যেমন— ‘আল্লাহর হাত’ (يَدُ اللَّهِ) এর অর্থ তারা করেছেন— আল্লাহর ক্ষমতা বা কুদরত।
উপসংহার: সালাফদের পথটি অধিক নিরাপদ (أسلم) এবং খালাফদের পথটি বেশি প্রজ্ঞাপূর্ণ (أحكم)।
[৮. ইসরাইলিয়াত কী? কীভাবে তা তাফসিরে প্রবেশ করল? এ বিষয়ে আলিমদের দৃষ্টিভঙ্গি বর্ণনা কর।]
ইসরাইলিয়াত (الإسرائيليات) কী?
‘ইসরাইলিয়াত’ শব্দটি ‘ইসরাইলিয়্যাহ’ এর বহুবচন। এর দ্বারা ওইসব প্রাচীন কাল্পনিক কাহিনি, গল্প, রূপকথা ও বর্ণনাসমূহকে বোঝায়, যা পূর্ববর্তী আহলে কিতাবদের (ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের) ধর্মগ্রন্থ, তাওরাত, ইনজিল, তালমুদ বা তাদের পণ্ডিতদের মৌখিক বর্ণনা থেকে ইসলামি তাফসিরে প্রবেশ করেছে। বনি ইসরাইলের সাথে সম্পর্কিত হওয়ার কারণে এগুলোকে ‘ইসরাইলিয়াত’ বলা হয়।
কীভাবে তা তাফসিরে প্রবেশ করল?
পবিত্র কুরআনে পূর্ববর্তী নবি-রাসুলদের ঘটনা সংক্ষেপে বর্ণনা করা হয়েছে, শুধু মূল শিক্ষণীয় অংশটুকু তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু কিছু সাহাবি ও তাবিঈ যখন এসব ঘটনার বিস্তারিত খুঁটিনাটি (যেমন: আসহাবে কাহাফের কুকুরের রং কী ছিল, নূহ আ.-এর নৌকার দৈর্ঘ্য কত ছিল) জানতে আগ্রহী হলেন, তখন তারা ইসলাম গ্রহণকারী ইহুদি পণ্ডিতদের (যেমন: কাব আল-আহবার, ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বিহ, আবদুল্লাহ ইবনে সালাম) কাছে প্রশ্ন করতে লাগলেন।
প্রাথমিকভাবে শুধুমাত্র কৌতূহল মেটানোর জন্য এসব বর্ণনা গ্রহণ করা হতো। কিন্তু পরবর্তী যুগে কিছু অসতর্ক তাফসিরকারক কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই এসব কাল্পনিক ইসরাইলি কাহিনি তাদের তাফসির গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করতে শুরু করেন। এভাবেই ইসরাইলিয়াত তাফসির সাহিত্যে প্রবেশ করে।
এ বিষয়ে আলিমদের দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থান:
ইসলামি স্কলারগণ ইসরাইলি বর্ণনাগুলোকে প্রধানত তিনটি ভাগে বিভক্ত করে তাদের সুস্পষ্ট অবস্থান জানিয়েছেন:
১. গ্রহণযোগ্য (যা ইসলাম সমর্থন করে):
যেসব ইসরাইলি বর্ণনা কুরআন ও সহিহ হাদিসের সাথে সম্পূর্ণ মিলে যায় এবং ইসলামের মূলনীতির পরিপন্থী নয়। এগুলো গ্রহণ করা এবং বর্ণনা করা জায়েজ। যেমন: হযরত মুসা (আ.)-এর ঘটনাবলি।
২. অগ্রহণযোগ্য (যা ইসলাম প্রত্যাখ্যান করে):
যেসব ইসরাইলি বর্ণনা কুরআন ও সুন্নাহর সরাসরি বিরোধী বা নবি-রাসুলদের নিষ্পাপ হওয়ার ধারণার পরিপন্থী। যেমন: দাউদ (আ.) বা সুলাইমান (আ.) সম্পর্কে ইহুদিদের রচিত নোংরা কাহিনি। এগুলোকে বিশ্বাস করা এবং বর্ণনা করা সম্পূর্ণ হারাম।
৩. নীরবতা পালনীয় (যা সমর্থিতও নয়, প্রত্যাখ্যাতও নয়):
যেসব বর্ণনার সত্যতা বা মিথ্যা হওয়া সম্পর্কে কুরআন ও হাদিসে কিছুই বলা হয়নি। এগুলো বিশ্বাস করাও যাবে না, আবার পুরোপুরি অস্বীকারও করা যাবে না। নবিজি (স.) বলেছেন:
لَا تُصَدِّقُوا أَهْلَ الْكِتَابِ وَلَا تُكَذِّبُوهُمْ، وَقُولُوا: آمَنَّا بِاللَّهِ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْنَا
অর্থ: “তোমরা আহলে কিতাবদের কথায় বিশ্বাসও কোরো না এবং তাদের মিথ্যাও বোলো না। বরং বলো: আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর ওপর এবং যা আমাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে তার ওপর।” (সহিহ বুখারি)
الملاحظة: أجب عن أربعة من مجموعة (ب) (যেকোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও)
[৯. উলুমুল কুরআন বিষয়ে রচিত দশটি গ্রন্থের নাম লেখ।]
উলুমুল কুরআন বিষয়ে রচিত ১০টি গ্রন্থের নাম:
উলুমুল কুরআনের ওপর যুগে যুগে বহু কালজয়ী গ্রন্থ রচিত হয়েছে। নিম্নে বিখ্যাত ১০টি গ্রন্থের নাম দেওয়া হলো:
১. আল-ইতকান ফি উলুমিল কুরআন (الإتقان في علوم القرآن) — হাফিজ জালালুদ্দীন সুয়ূতি (রহ.)
২. আল-বুরহান ফি উলুমিল কুরআন (البرهان في علوم القرآن) — আল্লামা বদরুদ্দীন যারকাশি (রহ.)
৩. মাবাহিছ ফি উলুমিল কুরআন (مباحث في علوم القرآن) — ড. মান্না আল-কাত্তান
৪. মানাহিলুল ইরফান ফি উলুমিল কুরআন (مناهل العرفان في علوم القرآن) — শেখ মুহাম্মদ আবদুল আযিম আয-যুরকানি
৫. আল-ফুনুনুল আফনান ফি উলুমিল কুরআন (فنون الأفنان في عيون علوم القرآن) — ইবনুল জাওযি (রহ.)
৬. আত-তিবইয়ান ফি উলুমিল কুরআন (التبيان في علوم القرآن) — শেখ মুহাম্মদ আলী সাবুনি
৭. আল-মুক্বাদ্দামাতুল আসাসিয়্যাহ ফি উলুমিল কুরআন — আবদুল্লাহ ইউসুফ জুদাই
৮. লামহাত ফি উলুমিল কুরআন — মুহাম্মদ লুতফি সাব্বাগ
৯. মুজামু উলুমিল কুরআন — ইবরাহিম মুহাম্মদ আল-জরমী
১০. উলুমুল কুরআন: তারিখুহু ওয়া আত্তাসনিফু ফিহ — ড. ফাহাদ বিন আবদুর রহমান আর-রুমি
[১০. “العبرة بعموم اللفظ لا بخصوص السبب” – কথাটি ব্যাখ্যা কর।]
ব্যাখ্যা: العبرة بعموم اللفظ لا بخصوص السبب
উক্ত বাক্যটি তাফসির ও উসুলুল ফিকহের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি। এর অর্থ হলো— “বিধান বা শিক্ষা গ্রহণ করা হবে আয়াতের ব্যাপক শব্দের ভিত্তিতে, কোনো বিশেষ প্রেক্ষাপট বা ঘটনার ভিত্তিতে নয়।”
বিশ্লেষণ: পবিত্র কুরআনের অধিকাংশ আয়াত কোনো না কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা ঘটনার (শানে নুযূল) পরিপ্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, ওই আয়াতের হুকুম বা বিধান শুধু ওই ব্যক্তির জন্যই নির্দিষ্ট। বরং ওই আয়াতে যদি ‘আম’ (ব্যাপক) শব্দ ব্যবহৃত হয়, তবে কিয়ামত পর্যন্ত আসা সবার জন্যই সেই হুকুম প্রযোজ্য হবে।
উদাহরণ: ‘লিআন’ (স্বামী-স্ত্রীর একে অপরকে অপবাদ দেওয়া) সম্পর্কিত সূরা নূরের ৬-৯ নং আয়াতসমূহ নির্দিষ্টভাবে সাহাবি হিলাল ইবনে উমাইয়া (রা.) এবং তার স্ত্রীর একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নাযিল হয়েছিল। কিন্তু এর হুকুম কেবল হিলাল (রা.)-এর জন্যই নির্দিষ্ট ছিল না; বরং এই আয়াতের ব্যাপক শব্দের কারণে কিয়ামত পর্যন্ত যেকোনো স্বামী-স্ত্রীর ক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য হবে। এটাই হলো “আল-ইবরাহ বি উমুমিল লাফয” এর তাৎপর্য।
[১১. সাত হরফে কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার হিকমত কী?]
সাত হরফে কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার হিকমত:
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, إِنَّ هَذَا الْقُرْآنَ أُنْزِلَ عَلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ “নিশ্চয়ই এই কুরআন সাতটি হরফে (পঠন পদ্ধতিতে) নাযিল হয়েছে।” (সহিহ বুখারি)। এর হিকমত বা প্রজ্ঞাসমূহ হলো:
১. উম্মতের জন্য সহজীকরণ: তৎকালীন আরবে বিভিন্ন গোত্রের উচ্চারণভঙ্গি ও ভাষার উচ্চারণে ভিন্নতা ছিল। এক গোত্রের মানুষের পক্ষে অন্য গোত্রের উচ্চারণে কুরআন পড়া অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ছিল। তাই আল্লাহ তা’আলা উম্মতের কষ্ট লাঘবের জন্য সাত হরফে কুরআন পড়ার অনুমতি দেন।
২. কুরআনের ইজায বা মুজিযা প্রমাণ: একই আয়াতের ভিন্ন ভিন্ন পঠন পদ্ধতি থাকা সত্ত্বেও এর অর্থের কোনো বিকৃতি বা বৈপরীত্য তৈরি হয়নি, বরং তা অর্থের ব্যাপকতা ও গভীরতা বৃদ্ধি করেছে। এটি কুরআনের এক মহা মুজিযা।
৩. ফিকহি বিধানের প্রশস্ততা: বিভিন্ন কিরাআত বা হরফের ভিন্নতার কারণে ইসলামি আইনের (ফিকহ) অনেক নতুন নতুন বিধান বের করা আলিমদের জন্য সহজ হয়েছে।
[১২. নস ও জহির এর সংজ্ঞা উদাহরণসহ লেখ।]
নস ও জহির-এর সংজ্ঞা:
উলুমুল কুরআনে অর্থ প্রকাশের স্পষ্টতার দিক থেকে শব্দকে চার ভাগে ভাগ করা হয়। তার মধ্যে নস ও জহির অন্যতম:
১. জহির (الظاهر): যে শব্দ শোনার সাথে সাথেই কোনো চিন্তাভাবনা ছাড়া তার অর্থ সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়, কিন্তু ওই অর্থটিই বক্তার মূল উদ্দেশ্য (মাকসাদ) হয় না এবং শব্দটিতে ভিন্ন অর্থ (তাউয়িল) বা রহিত (মানসুখ) হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাকে জহির বলে।
উদাহরণ: وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا “আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।” এখানে ‘হালাল ও হারাম’ হওয়াটা সুস্পষ্ট (জহির)। কিন্তু এটি আয়াতের মূল উদ্দেশ্য নয়, মূল উদ্দেশ্য হলো ব্যবসা ও সুদের মধ্যে পার্থক্য করা।
২. নস (النص): যে শব্দ শোনার সাথে সাথে তার অর্থ সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায় এবং সেই অর্থটিই বক্তার মূল উদ্দেশ্য (মাকসাদ) হয়। এতে ভিন্ন অর্থের সম্ভাবনা থাকে না, তবে রহিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এটি জহিরের চেয়ে বেশি শক্তিশালী।
উদাহরণ: ওপরের একই আয়াতে ব্যবসা ও সুদের মধ্যে যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে, তা প্রমাণ করাই হলো মূল উদ্দেশ্য। তাই এই আয়াতটি পার্থক্য বর্ণনার ক্ষেত্রে ‘নস’।
[১৩. তারবিয়াহ এর ক্ষেত্রে কুরআনের ঘটনাবলির প্রভাব বর্ণনা কর।]
তারবিয়াহ (চরিত্র গঠন)-এর ক্ষেত্রে কুরআনের ঘটনাবলির প্রভাব:
পবিত্র কুরআনের এক-তৃতীয়াংশ জুড়ে রয়েছে বিভিন্ন নবি-রাসুল, নেককার ব্যক্তি এবং অবাধ্য জাতিগুলোর সত্য ঘটনা (কিসাসুল কুরআন)। মানবজীবনের ‘তারবিয়াহ’ বা চারিত্রিক ও আত্মিক সংশোধনের ক্ষেত্রে এসব ঘটনার প্রভাব অপরিসীম:
১. ঈমান দৃঢ় করা: অতীত নবিদের ত্যাগের ঘটনা শুনলে মুমিনদের অন্তরে ঈমান ও আত্মবিশ্বাস দৃঢ় হয় এবং বিপদে সবর করার প্রেরণা জাগে। আল্লাহ বলেন, “এসব ঘটনার মাধ্যমে আমি আপনার অন্তরকে মজবুত করি।”
২. অহংকার ও পাপাচার থেকে সতর্কীকরণ: ফিরাউন, কারুন, নমরুদ, আদ ও সামুদ জাতির মর্মান্তিক পরিণতির ঘটনাগুলো অহংকারী ও পাপীদের জন্য এক বিশাল সতর্কবার্তা, যা মানুষকে গুনাহ থেকে বিরত রাখে।
৩. আদর্শ চরিত্র গঠন: হযরত ইউসুফ (আ.)-এর ক্ষমা, আইয়ুব (আ.)-এর চরম ধৈর্য, ইবরাহিম (আ.)-এর আত্মত্যাগ— এসব ঘটনা মানবজীবনে শ্রেষ্ঠ চারিত্রিক গুণাবলি অর্জনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।
[১৪. উসমানি লিপিকলা এর পরিচয় দাও।]
উসমানি লিপিকলা (الرسم العثماني):
‘রসম’ (الرسم) অর্থ লিখনপদ্ধতি বা লিপিকলা। তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান (রা.)-এর শাসনামলে যখন বিশাল ইসলামি সম্রাজ্যে কুরআনের বিভিন্ন কিরাআত নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে চরম মতবিরোধ দেখা দেয়, তখন তিনি এই ফিতনা দূর করার জন্য একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেন।
তিনি হযরত যায়িদ বিন সাবিত (রা.)-এর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করেন। তারা হযরত আবু বকর (রা.)-এর যুগে সংকলিত মূল কপিটি এনে এমন এক বিশেষ আরবি লিপিকলা বা বানানরীতিতে কুরআন লিপিবদ্ধ করেন, যা কুরআনের অনুমোদিত সাতটি কিরাআতের (সাত হরফের) সবগুলোকে নিজের মধ্যে ধারণ করতে সক্ষম ছিল।
হযরত উসমান (রা.)-এর নির্দেশে ও সাহাবাদের সর্বসম্মতিক্রমে (ইজমা) লেখা কুরআনের এই বিশেষ বানানরীতি বা লিখনপদ্ধতিকেই ‘রসমুল উসমানি’ বা ‘উসমানি লিপিকলা’ বলা হয়। মুসলিম উম্মাহর জন্য উসমানি রসমের বাইরে অন্য কোনো বানানে কুরআন লেখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
[১৫. ইসরাইলি বর্ণনা পাওয়া যায় এমন পাঁচটি তাফসিরের কিতাবের নাম লেখ।]
ইসরাইলি বর্ণনা পাওয়া যায় এমন ৫টি তাফসিরের কিতাব:
যেসব তাফসির গ্রন্থে প্রচুর পরিমাণে ইসরাইলি রূপকথা ও কাল্পনিক বর্ণনা (ইসরাইলিয়াত) স্থান পেয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ৫টি গ্রন্থ হলো:
১. তাফসিরু মুকাতিল বিন সুলাইমান (تفسير مقاتل بن سليمان) — মুকাতিল বিন সুলাইমান (রহ.)
২. তাফসিরুল কালবি (تفسير الكلبي) — মুহাম্মদ ইবনুল সাইব আল-কালবি
৩. جامع البيان عن تأويل آي القرآن (তাফসিরে তাবারী) — ইমাম ইবনে জারির আত-তাবারী (রহ.) [তিনি সনদ উল্লেখ করলেও যাচাই ছাড়া অনেক বর্ণনা এনেছেন]
৪. معالم التنزيل (তাফসিরে বাগাভি) — ইমাম আল-হুসাইন আল-বাগাভি (রহ.)
৫. الكشف والبيان عن تفسير القرآن (তাফসিরে ছা’লাবি) — ইমাম আবু ইসহাক আছ-ছা’লাবি (রহ.)
[১৬. সাত ক্বারীর নামগুলো লেখ।]
সাত ক্বারীর নাম (القراء السبعة):
পবিত্র কুরআনের বিশুদ্ধ কিরাআত বা পঠন পদ্ধতিগুলো উম্মতের কাছে অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে যারা পৌঁছে দিয়েছেন, তাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ৭ জন ইমামকে ‘কুর্রাউস সাবআ’ বা সাত ক্বারী বলা হয়। তাদের নাম হলো:
১. ইমাম নাফে’ আল-মাদানি (মৃ. ১৬৯ হি.)
২. ইমাম ইবনে কাসির আল-মাক্কি (মৃ. ১২০ হি.)
৩. ইমাম আবু আমর আল-বাসরি (মৃ. ১৫৪ হি.)
৪. ইমাম ইবনে আমির আশ-শামি (মৃ. ১১৮ হি.)
৫. ইমাম আসিম আল-কুফি (মৃ. ১২৭ হি.) [আমাদের উপমহাদেশে তাঁর কিরাআতই বেশি প্রচলিত]
৬. ইমাম হামযা আল-কুফি (মৃ. ১৫৬ হি.)
৭. ইমাম কিসাই আল-কুফি (মৃ. ১৮৯ হি.)






