Ilmul Balaghah (Code: 201206) – ২০২৩ প্রশ্ন ও উত্তর
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২৩ এর আল-কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের علم البلاغة (ইলমুল বালাগাহ) বিষয়ের সম্পূর্ণ উত্তরমালা。
বিঃদ্রঃ পরীক্ষার্থীদের আগামী পরীক্ষার সর্বোচ্চ প্রস্তুতির সুবিধার্থে মূল প্রশ্নপত্রের বিকল্প সবগুলোর (অথবা) প্রশ্নের ১০০% নির্ভুল ও তথ্যবহুল উত্তর আরবি উদাহরণসহ বিস্তারিতভাবে নিচে দেওয়া হলো।
الملاحظة: أجب عن أربعة من مجموعة (أ) (যেকোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও)
[১. ইলমুল বালাগাহ এর সংজ্ঞা, উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ, লক্ষ্য ও ইলমুল বালাগাহ পাঠের গুরুত্ব আলোচনা কর।]
ইলমুল বালাগাহ-এর পরিচয়:
‘বালাগাহ’ (البلاغة) শব্দটি আরবি শব্দমূল ‘ب-ل-غ’ থেকে নির্গত। এর আভিধানিক অর্থ হলো— পৌঁছানো, চূড়ান্ত সীমায় উপনীত হওয়া বা হৃদয়গ্রাহী হওয়া।
পারিভাষিক অর্থে: مُطَابَقَةُ الْكَلَامِ لِمُقْتَضَى الْحَالِ مَعَ فَصَاحَتِهِ
অর্থ: “পরিস্থিতি ও শ্রোতার অবস্থা অনুযায়ী ফাসাহাত (বিশুদ্ধতা ও প্রাঞ্জলতা) সহকারে উপযুক্ত বাক্য প্রয়োগ করাকেই ইলমুল বালাগাহ বা অলংকার শাস্ত্র বলা হয়।” অর্থাৎ, স্থান, কাল, পাত্র বুঝে সঠিক ও আকর্ষণীয় ভাষায় কথা বলাই হলো বালাগাহ।
বালাগাহ-এর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ (نشأته وتطوره):
আরবদের জন্মগত স্বভাবই ছিল সাহিত্য ও অলংকারপূর্ণ ভাষায় কথা বলা। জাহেলি যুগেই আরবি সাহিত্য চরম উৎকর্ষ লাভ করেছিল, তবে তখন ‘বালাগাহ’ নামে কোনো নির্দিষ্ট শাস্ত্র ছিল না। ইসলাম আগমনের পর পবিত্র কুরআন নাযিল হলে এর অলৌকিক ভাষা ও সাহিত্যের শ্রেষ্ঠত্ব (ইজাযুল কুরআন) আরব সাহিত্যিকদের হতবাক করে দেয়। কুরআন ও হাদিসের অর্থের গভীরতা বোঝার প্রয়োজনেই মূলত বালাগাহর বিভিন্ন উপাদানের ওপর আলোচনা শুরু হয়।
– আবু উবায়দাহ (মৃ. ২১০ হি.) ‘মাজাযুল কুরআন’ এবং আল-জাহিয (মৃ. ২৫৫ হি.) ‘আল-বায়ান ওয়াত-তাবয়ীন’ রচনার মাধ্যমে এর প্রাথমিক ভিত্তি স্থাপন করেন।
– এরপর ইবনুল মুতায (মৃ. ২৯৬ হি.) ‘আল-বাদি’ গ্রন্থ লিখে এই শাস্ত্রকে আরও এগিয়ে নেন।
– তবে ইলমুল বালাগাহকে একটি সুশৃঙ্খল ও পূর্ণাঙ্গ শাস্ত্র হিসেবে রূপদান করেন আল্লামা আবদুল ক্বাহির জুরজানি (মৃ. ৪৭১ হি.)। তার রচিত ‘দালায়িলুল ইজায’ ও ‘আসরারুল বালাগাহ’ গ্রন্থ দুটিকে বালাগাহর মূল ভিত্তি ধরা হয়।
– পরবর্তীতে আল্লামা খতিব কাযবিনি (রহ.) ‘তালখিসুল মিফতাহ’ রচনার মাধ্যমে এটিকে আরও সহজবোধ্য করেন।
ইলমুল বালাগাহ-এর লক্ষ্য (غايته) ও গুরুত্ব (أهميته):
১. কুরআনের মুজিযা অনুধাবন: পবিত্র কুরআনের শব্দচয়ন, উপমা ও ভাষার যে এক অলৌকিক সৌন্দর্য রয়েছে, তা ইলমুল বালাগাহ ছাড়া বোঝা কিছুতেই সম্ভব নয়।
২. হাদিসের সৌন্দর্য অনুধাবন: রাসুলুল্লাহ (স.) ছিলেন ‘জাওয়ামিউল কালিম’ (অল্প কথায় বিশাল অর্থবোধক বাক্যের অধিকারী)। বালাগাহ শাস্ত্র হাদিসের গভীরে লুকিয়ে থাকা তাৎপর্য বুঝতে সাহায্য করে।
৩. বিশুদ্ধভাবে মনোভাব প্রকাশ: শ্রোতার মানসিক অবস্থা বুঝে কখন সংক্ষেপে আর কখন বিস্তারিত বলতে হবে, তা এই শাস্ত্র শেখায়।
৪. সাহিত্যের মান নির্ণয়: ভালো কবিতা, ভাষণ বা রচনার সাহিত্যিক মান বিচার করার একমাত্র মাপকাঠি হলো ইলমুল বালাগাহ।
[২. ইনশা এর পরিচয় দাও। অতঃপর ইনশা এর প্রকারগুলো উদাহরণসহ বর্ণনা কর।]
ইনশা (الإنشاء)-এর পরিচয়:
আভিধানিক অর্থ: ‘ইনশা’ শব্দের অর্থ হলো— সৃষ্টি করা, গঠন করা বা শুরু করা।
পারিভাষিক অর্থ: مَا لَا يَحْتَمِلُ الصِّدْقَ وَالْكَذِبَ لِذَاتِهِ
অর্থ: “যে বাক্যের অর্থের দিক থেকে বক্তাকে সত্যবাদী বা মিথ্যাবাদী বলা যায় না, তাকে ইনশা বলা হয়।” যেমন, কেউ যদি বলে, “তুমি পানি পান করো” (اشْرَبِ الْمَاءَ), তবে এই কথাটিকে সত্য বা মিথ্যা কোনোটিই বলার সুযোগ নেই।
ইনশা-এর প্রকারভেদ (أقسام الإنشاء):
ইনশা প্রধানত দুই প্রকার:
১. আল-ইনশাউত তলাবি (الإنشاء الطلبي):
যে বাক্যের মাধ্যমে বক্তা শ্রোতার কাছে কোনো কিছু দাবি করে বা কোনো কিছু সম্পাদনের আশা করে, যা বাক্যটি বলার সময় বিদ্যমান ছিল না, তাকে ইনশাউত তলাবি বলে। এটি ৫ প্রকার:
ক. আমর (الأمر) [আদেশ]: যেমন— أَقِيمُوا الصَّلَاةَ “তোমরা নামাজ কায়েম করো।”
খ. নাহি (النهي) [নিষেধ]: যেমন— لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ “আল্লাহর সাথে শিরক কোরো না।”
গ. ইস্তিফহাম (الاستفهام) [প্রশ্ন]: যেমন— هَلْ جَاءَ زَيْدٌ؟ “যায়েদ কি এসেছে?”
ঘ. তামান্নি (التمني) [আকাঙ্ক্ষা]: যেমন— لَيْتَ الشَّبَابَ يَعُودُ يَوْمًا “হায়! যৌবন যদি একদিন ফিরে আসত।”
ঙ. নিদা (النداء) [আহ্বান]: যেমন— يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ “হে নবি!”
২. আল-ইনশাউ গায়রুত তলাবি (الإنشاء غير الطلبي):
যে বাক্যের মাধ্যমে বক্তা কোনো কিছু দাবি করে না, বরং এর মাধ্যমে শুধু আবেগ, শপথ বা প্রশংসা প্রকাশ পায়, তাকে গায়রুত তলাবি বলে। এটি কয়েক প্রকার:
ক. কসম (القسم) [শপথ]: যেমন— وَاللَّهِ لَأَفْعَلَنَّ “আল্লাহর কসম! আমি কাজটি করব।”
খ. তাআজ্জুব (التعجب) [বিস্ময়]: যেমন— مَا أَحْسَنَ زَيْدًا! “যায়েদ কতই না সুন্দর!”
গ. মাদহ ও যাম (المدح والذم) [প্রশংসা ও নিন্দা]: যেমন— نِعْمَ الرَّجُلُ زَيْدٌ “যায়েদ কতই না ভালো মানুষ!”
[৩. আমর কাকে বলে? এর সিগাহ কয়টি? আমর যে সব অর্থে ব্যবহৃত হয় তা উদাহরণসহ আলোচনা কর।]
আমর (الأمر)-এর পরিচয়:
আভিধানিক অর্থ: আদেশ করা বা নির্দেশ দেওয়া।
পারিভাষিক অর্থ: طَلَبُ الْفِعْلِ عَلَى وَجْهِ الِاسْتِعْلَاءِ وَالْإِلْزَامِ
অর্থ: “উপরস্থ বা মর্যাদাবান কোনো ব্যক্তি যখন অধীনস্থ কাউকে কর্তৃত্বের সাথে ও আবশ্যিকভাবে কোনো কাজ করার নির্দেশ দেয়, তখন তাকে আমর বলা হয়।”
আমর-এর সিগাহ (صیغة الأمر):
আমরের মূলত ৪টি সিগাহ বা গঠনরূপ রয়েছে:
১. ফেলে আমর (فعل الأمر): যেমন— خُذِ الْكِتَابَ “বইটি নাও।”
২. লামে আমর যুক্ত মুদারে (المضارع المقرون بلام الأمر): যেমন— لِيُنفِقْ ذُو سَعَةٍ مِّن سَعَتِهِ “সামর্থ্যবান ব্যক্তি যেন তার সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করে।”
৩. ইসমে ফেলে আমর (اسم فعل الأمر): যেমন— عَلَيْكُمْ أَنفُسَكُمْ “তোমরা নিজেদের ব্যাপারে সতর্ক থাকো।”
৪. মাজদারে নায়েব আনিল আমর (المصدر النائب عن فعل الأمر): যেমন— وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا “এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো।” (এখানে إحسانا মাজদারটি أحسنوا আমরের স্থলাভিষিক্ত)।
আমর-এর ভিন্ন বা আলঙ্কারিক অর্থসমূহ (المعاني المجازية للأمر):
প্রকৃতপক্ষে আমর আদেশ করার জন্য ব্যবহৃত হলেও, পরিস্থিতি অনুযায়ী এটি বিভিন্ন আলঙ্কারিক অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন:
১. দুআ (الدعاء): নিচু স্তরের কেউ ওপরের স্তরের কাউকে (যেমন বান্দা আল্লাহকে) নির্দেশসূচক শব্দ বললে তা দুআ বা প্রার্থনা অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন— رَبِّ اغْفِرْ لِي “হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন।”
২. পরামর্শ (الإرشاد): যেমন— فَاكْتُبُوهُ “তোমরা তা (ঋণ) লিখে রাখো।”
৩. সতর্ক করা বা হুমকি দেওয়া (التهديد): যেমন— اعْمَلُوا مَا شِئْتُمْ “তোমাদের যা ইচ্ছা তা-ই করো।”
৪. অপারগতা প্রকাশ করা (التعجيز): যেমন— فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِّن مِّثْلِهِ “তবে এর (কুরআনের) মতো একটি সূরা অন্তত নিয়ে আসো!”
৫. আকাঙ্ক্ষা বা তামান্নি (التمني): জড় পদার্থকে কিছু করতে বললে। যেমন— أَلَا أَيُّهَا اللَّيْلُ الطَّوِيلُ أَلَا انْجَلِ “ওহে দীর্ঘ রাত! তুমি প্রভাত হয়ে যাও।”
[৪. ইস্তিফহাম কাকে বলে? তার আদওয়াতগুলো কী? ইস্তিফহাম তার মূল অর্থ ব্যতীত যেসব অর্থে ব্যবহৃত হয় তা উদাহরণসহ উল্লেখ কর।]
ইস্তিফহাম (الاستفهام)-এর পরিচয়:
আভিধানিক অর্থ: জিজ্ঞাসা করা, জানতে চাওয়া বা প্রশ্ন করা।
পারিভাষিক অর্থ: طَلَبُ الْعِلْمِ بِشَيْءٍ لَمْ يَكُنْ مَعْلُومًا مِنْ قَبْلُ
অর্থ: “বক্তার কাছে অজানা কোনো বিষয় সম্পর্কে শ্রোতার কাছে প্রশ্নবোধক অব্যয় (আদওয়াত) ব্যবহার করে জ্ঞান লাভ করার দাবি করাকে ইস্তিফহাম বলা হয়।”
ইস্তিফহামের আদওয়াত (أدوات الاستفهام):
প্রশ্ন করার জন্য আরবিতে মোট ১১টি অব্যয় বা আদওয়াত ব্যবহৃত হয়। এগুলো হলো:
أَ (আ), هَلْ (হাল), مَنْ (মান), مَا (মা), مَتَى (মাতা), أَيَّانَ (আইয়্যানা), كَيْفَ (কাইফা), أَيْنَ (আইনা), أَنَّى (আন্না), كَمْ (কাম) এবং أَيٌّ (আইয়্যুন)।
ইস্তিফহামের ভিন্ন বা আলঙ্কারিক অর্থসমূহ (المعاني المجازية للاستفهام):
অনেক সময় বক্তা কোনো কিছু জানার জন্য প্রশ্ন করে না, বরং তার উদ্দেশ্য থাকে অন্য কোনো অনুভূতি বা মেসেজ দেওয়া। ইস্তিফহামের এমন কিছু আলঙ্কারিক অর্থ হলো:
১. অস্বীকার করা বা না-সূচক অর্থ (النفي): যখন প্রশ্নের উত্তর ‘না’ হয়। যেমন— هَلْ جَزَاءُ الْإِحْسَانِ إِلَّا الْإِحْسَانُ “উত্তম কাজের প্রতিদান উত্তম ছাড়া আর কী হতে পারে?” (অর্থাৎ, কিছুই হতে পারে না)।
২. স্বীকারোক্তি আদায় (التقرير): যেমন— أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ؟ “আমি কি তোমাদের রব নই?” (অর্থাৎ, অবশ্যই আমি তোমাদের রব)।
৩. তিরস্কার বা নিন্দা করা (الإنكار التوبيخي): যেমন— أَغَيْرَ اللَّهِ تَدْعُونَ؟ “তোমরা কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ডাকো?”
৪. বিস্ময় প্রকাশ (التعجب): যেমন— مَا لِهَٰذَا الرَّسُولِ يَأْكُلُ الطَّعَامَ “এ কেমন রাসুল, যে (আমাদের মতোই) খাবার খায়!”
৫. আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ (التمني): যেমন— فَهَل لَّنَا مِن شُفَعَاءَ فَيَشْفَعُوا لَنَا “আমাদের কি কোনো সুপারিশকারী আছে, যে আমাদের জন্য সুপারিশ করবে?”
[৫. তাশবীহ এর সংজ্ঞা দাও। তার রুকন, প্রকারভেদ ও উদ্দেশ্যবলি বিস্তারিতভাবে লেখ।]
তাশবীহ (التشبيه)-এর সংজ্ঞা:
আভিধানিক অর্থ: তুলনা করা, সাদৃশ্য স্থাপন করা।
পারিভাষিক অর্থ: بَيَانُ أَنَّ شَيْئًا أَوْ أَشْيَاءَ شَارَكَتْ غَيْرَهَا فِي صِفَةٍ أَوْ أَكْثَرَ، بِأَدَاةٍ هِيَ الْكَافُ أَوْ نَحْوُهَا مَلْفُوظَةً أَوْ مُقَدَّرَةً
অর্থ: “কাফ (ك) বা এ জাতীয় কোনো অব্যয় (প্রকাশ্য বা উহ্য) ব্যবহার করে একটি বস্তুকে এক বা একাধিক গুণের কারণে অন্য একটি বস্তুর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বা তুলনীয় প্রমাণ করাকে তাশবীহ বলে।”
তাশবীহের রুকন বা অংশ (أركان التشبيه):
তাশবীহের ৪টি রুকন বা স্তম্ভ রয়েছে। যথা:
১. মুশাব্বাহ (المشبه): যাকে তুলনা করা হয়।
২. মুশাব্বাহ বিহী (المشبه به): যার সাথে তুলনা করা হয়।
৩. আদাতে তাশবীহ (أداة التشبيه): তুলনাবাচক শব্দ (যেমন: كَ, كَأَنَّ, مِثْل)।
৪. ওয়াজহুল শিবিহ (وجه الشبه): যে গুণের কারণে তুলনা করা হয় (সাধারণ গুণ)।
উদাহরণ: زَيْدٌ كَالْأَسَدِ فِي الشَّجَاعَةِ “যায়েদ সাহসিকতায় সিংহের মতো।”
এখানে— যায়েদ (মুশাব্বাহ), সিংহ (মুশাব্বাহ বিহী), কাফ (আদাতে তাশবীহ) এবং সাহসিকতা (ওয়াজহুল শিবিহ)।
তাশবীহের প্রকারভেদ (أقسام التشبيه):
আদাতে তাশবীহ ও ওয়াজহুল শিবিহ থাকা বা না থাকার ওপর ভিত্তি করে তাশবীহ কয়েক প্রকার:
১. তাশবীহ মুরসাল (مرسل): যে তাশবীহে ‘আদাতে তাশবীহ’ (তুলনাবাচক শব্দ) উল্লেখ থাকে। (যেমন: যায়েদ সিংহের মতো সাহসী)।
২. তাশবীহ মুআক্কাদ (مؤكد): যে তাশবীহে ‘আদাতে তাশবীহ’ উল্লেখ থাকে না। (যেমন: যায়েদ সাহসিকতায় সিংহ)।
৩. তাশবীহ মুফাসসাল (مفصل): যে তাশবীহে ‘ওয়াজহুল শিবিহ’ (সাধারণ গুণ) উল্লেখ থাকে। (যেমন: যায়েদ সাহসিকতায় সিংহের মতো)।
৪. তাশবীহ মুজমাল (مجمل): যে তাশবীহে ‘ওয়াজহুল শিবিহ’ উল্লেখ থাকে না। (যেমন: যায়েদ সিংহের মতো)।
৫. তাশবীহ বালিগ (بليغ): যে তাশবীহে ‘আদাত’ এবং ‘ওয়াজহুল শিবিহ’ উভয়টিই উহ্য থাকে। এটি সবচেয়ে উচ্চাঙ্গের তাশবীহ। (যেমন: زَيْدٌ أَسَدٌ “যায়েদ সিংহ!”)।
তাশবীহের উদ্দেশ্য (أغراض التشبيه):
১. মুশাব্বাহর অবস্থা বর্ণনা করা: অস্পষ্ট জিনিসকে পরিচিত জিনিসের মাধ্যমে স্পষ্ট করা।
২. মুশাব্বাহর পরিমাণ নির্ধারণ করা: যেমন— “কয়লার মতো কালো”।
৩. মুশাব্বাহর সম্ভাবনা প্রমাণ করা: অসম্ভব মনে হওয়া কোনো জিনিসকে উপমার মাধ্যমে সম্ভব প্রমাণ করা।
৪. মুশাব্বাহকে সুন্দর করে তোলা (تزيين): যেমন কালো চেহারাকে রাতের চাঁদের সাথে তুলনা করা।
৫. মুশাব্বাহকে কুৎসিত করে তোলা (تقبيح): যেমন খারাপ চেহারাকে শয়তানের চেহারার সাথে তুলনা করা।
[৬. তামান্নী ও তারাজ্জী এর সংজ্ঞা দাও। তামান্নী এর শব্দাবলি উদাহরণসহ বর্ণনা কর।]
তামান্নী (التمني) এবং তারাজ্জী (الترجي)-এর সংজ্ঞা:
১. তামান্নী (التمني):
طَلَبُ الشَّيْءِ الْمَحْبُوبِ الَّذِي لَا يُرْجَى وُقُوعُهُ
অর্থ: “এমন কোনো কাঙ্ক্ষিত বা প্রিয় জিনিস পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করা, যা পাওয়া একেবারে অসম্ভব অথবা বাস্তবে ঘটার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে, তাকে তামান্নী বলে।”
২. তারাজ্জী (الترجي):
طَلَبُ الْأَمْرِ الْمَحْبُوبِ مِمَّا يُرْجَى حُصُولُهُ
অর্থ: “এমন কোনো কাঙ্ক্ষিত বিষয় পাওয়ার আশা করা, যা পাওয়া সম্ভবপর এবং বাস্তবে ঘটার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে, তাকে তারাজ্জী বলে।”
তামান্নী-এর আদওয়াত বা শব্দাবলি (أدوات التمني):
তামান্নী প্রকাশের জন্য আরবিতে প্রধানত ১টি মূল শব্দ এবং আলঙ্কারিক অর্থে আরও ৩টি শব্দ ব্যবহৃত হয়।
ক. মূল শব্দ (الأداة الأصلية): لَيْتَ (লাইতা – হায় যদি!)।
উদাহরণ: لَيْتَ الشَّبَابَ يَعُودُ يَوْمًا “হায়! যৌবন যদি একদিন ফিরে আসত!” (যৌবন ফিরে পাওয়া অসম্ভব, তাই এখানে লাইতা ব্যবহৃত হয়েছে)।
খ. আলঙ্কারিক শব্দ (الأدوات المجازية): অনেক সময় অসম্ভব আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করতে لَيْتَ এর পরিবর্তে هَلْ, لَوْ এবং لَعَلَّ ব্যবহৃত হয়।
১. هَلْ (হাল): কোনো অসম্ভব জিনিসকে এমনভাবে চাওয়া, যেন তা সম্ভব।
উদাহরণ: فَهَل لَّنَا مِن شُفَعَاءَ “আমাদের কি কোনো সুপারিশকারী আছে?” (কিয়ামতের দিন কাফিরদের এই অসম্ভব আকাঙ্ক্ষা)।
২. لَوْ (লাউ): আক্ষেপ বোঝানোর জন্য।
উদাহরণ: فَلَوْ أَنَّ لَنَا كَرَّةً فَنَكُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ “হায়! যদি আমরা আরেকবার দুনিয়ায় ফিরে যেতে পারতাম, তবে আমরা মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত হতাম।”
৩. لَعَلَّ (লা’আল্লা): কোনো অসম্ভব জিনিসকে সম্ভবপর জিনিসের রূপে প্রকাশ করতে।
উদাহরণ: ফিরাউন বলেছিল— لَعَلِّي أَبْلُغُ الْأَسْبَابَ أَسْبَابَ السَّمَاوَاتِ “যাতে আমি আসমানের পথগুলোতে পৌঁছতে পারি।”
[৭. নিদা এর অর্থ কী? নিদা এর শব্দাবলি তার ব্যবহার বিধিসহ উল্লেখ কর।]
নিদা (النداء)-এর অর্থ ও পরিচয়:
আভিধানিক অর্থ: আহ্বান করা, ডাকা বা চিৎকার করা।
পারিভাষিক অর্থ: طَلَبُ الْإِقْبَالِ بِحَرْفٍ نَائِبٍ مَنَابَ أَدْعُو
অর্থ: “‘আদউ’ (أدعو – আমি ডাকছি) ক্রিয়ার স্থলাভিষিক্ত কোনো একটি হরফ বা অব্যয় ব্যবহার করে কাউকে নিজের দিকে متوجه (মনোযোগী) হতে আহ্বান করাকে নিদা বলা হয়।”
নিদা-এর আদওয়াত ও ব্যবহারবিধি (أدوات النداء وطريقة استعمالها):
কাউকে ডাকার জন্য আরবিতে ৮টি হরফ বা অব্যয় ব্যবহৃত হয়। এগুলোকে ‘হুরূফুন নিদা’ বলে। দূরত্বের ওপর ভিত্তি করে এগুলোর ব্যবহারবিধি নিচে দেওয়া হলো:
১. নিকটবর্তী কাউকে ডাকার জন্য (للقريب):
কাছে অবস্থানরত কাউকে ডাকার জন্য ২টি হরফ ব্যবহৃত হয়। যথা: أَ (হামযা) এবং أَيْ (আই)।
উদাহরণ: أَخَالِدُ، أَقْبِلْ “হে খালিদ (যে কাছে আছে)! এদিকে এসো।”
أَيْ بُنَيَّ “হে আমার প্রিয় বৎস!”
২. দূরবর্তী কাউকে ডাকার জন্য (للبعيد):
দূরে অবস্থানরত কাউকে ডাকার জন্য ৫টি হরফ ব্যবহৃত হয়। কারণ দূর থেকে কাউকে ডাকতে আওয়াজ দীর্ঘ করতে হয়। যথা: يَا (ইয়া), آيَا (আয়া), هَيَا (হায়া), أَيْ (আই দীর্ঘ টানে), آ (আ দীর্ঘ টানে)।
উদাহরণ: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا “হে মুমিনগণ!”
أَيَا عَبْدَ اللَّهِ “হে আল্লাহর বান্দা (যে দূরে আছে)!”
৩. ব্যথা বা আক্ষেপ প্রকাশের জন্য (للندبة):
মৃত ব্যক্তি বা কোনো ব্যথার স্থানকে উদ্দেশ্য করে ডাকার জন্য বা বিলাপ করার জন্য ১টি হরফ ব্যবহৃত হয়। তা হলো: وَا (ওয়া)।
উদাহরণ: وَا إِسْلَامَاهُ “হায় ইসলাম!” বা وَارَأْسَاهُ “হায় আমার মাথা (ব্যথা)!”
বিশেষ দ্রষ্টব্য: অনেক সময় আলঙ্কারিক কারণে কাছের ব্যক্তিকে দূরের অব্যয় দিয়ে ডাকা হয় (তার উচ্চ মর্যাদা বোঝানোর জন্য)। যেমন, আল্লাহ মানুষের কাছে থাকলেও সম্মান বোঝাতে ‘يَا’ (ইয়া) দিয়ে يَا رَبِّ বলা হয়।
[৮. মাজায মুরসাল এর পরিচয় দাও। এর علاقة গুলো উদাহরণসহ বর্ণনা কর।]
মাজায মুরসাল (المجاز المرسل)-এর পরিচয়:
আভিধানিক অর্থ: ‘মাজায’ মানে রূপক, আর ‘মুরসাল’ মানে মুক্ত বা শর্তহীন।
পারিভাষিক অর্থ: هُوَ الْكَلِمَةُ الْمُسْتَعْمَلَةُ فِي غَيْرِ مَعْنَاهَا الْأَصْلِيِّ لِعَلَاقَةٍ غَيْرِ الْمُشَابَهَةِ مَعَ قَرِينَةٍ مَانِعَةٍ مِنْ إِرَادَةِ الْمَعْنَى الْأَصْلِيِّ
অর্থ: “যদি কোনো শব্দকে তার মূল (আভিধানিক) অর্থের পরিবর্তে এমন কোনো রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়, যেখানে মূল অর্থ ও রূপক অর্থের মধ্যে ‘সাদৃশ্য’ বা উপমা ছাড়া অন্য কোনো ‘আলাকাহ’ (علاقة) বা সম্পর্ক বিদ্যমান থাকে, তখন তাকে মাজায মুরসাল বলে।” একে মুরসাল বলা হয় কারণ এটি তাশবীহ (সাদৃশ্য)-এর শর্ত থেকে মুক্ত।
মাজায মুরসালের আলাকাহ (علاقة) ও উদাহরণ:
মাজায মুরসালের অনেকগুলো আলাকাহ বা সম্পর্ক রয়েছে। নিম্নে প্রধান কয়েকটি বর্ণনা করা হলো:
১. আল-জুযয়িয়্যাহ (الجزئية): অংশের নাম বলে সমগ্রকে বোঝানো।
উদাহরণ: فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ “একটি গর্দান আজাদ করা।” (এখানে ‘গর্দান’ মানে শুধু গলা নয়, বরং এর দ্বারা ‘সম্পূর্ণ একজন দাস’ বোঝানো হয়েছে)।
২. আল-কুল্লিয়্যাহ (الكلية): সমগ্রের নাম বলে অংশকে বোঝানো।
উদাহরণ: يَجْعَلُونَ أَصَابِعَهُمْ فِي آذَانِهِمْ “তারা তাদের আঙুলগুলো তাদের কানে ঢুকিয়ে দেয়।” (আঙুল পুরোটা কানে ঢোকানো যায় না, এখানে আঙুলের অগ্রভাগ বোঝানো হয়েছে)।
৩. আস-সাবাহিয়্যাহ (السببية): কারণের নাম বলে ফলাফলকে বোঝানো।
উদাহরণ: رَعَتِ الْمَاشِيَةُ الْغَيْثَ “গবাদিপশু বৃষ্টি খেয়েছে।” (বৃষ্টি খাওয়া যায় না, বৃষ্টির কারণে উৎপন্ন ঘাস বোঝানো হয়েছে)।
৪. আল-মুসাব্বাবিয়্যাহ (المسببية): ফলাফলের নাম বলে কারণকে বোঝানো।
উদাহরণ: وَيُنَزِّلُ لَكُم مِّنَ السَّمَاءِ رِزْقًا “তিনি আকাশ থেকে তোমাদের জন্য রিযিক অবতীর্ণ করেন।” (আকাশ থেকে বৃষ্টি পড়ে, যা রিযিকের কারণ। এখানে বৃষ্টির জায়গায় রিযিক বলা হয়েছে)।
৫. ই’তিবারু মা কানা (اعتبار ما كان): অতীত অবস্থার নাম ধরে বর্তমানকে বোঝানো।
উদাহরণ: وَآتُوا الْيَتَامَىٰ أَمْوَالَهُمْ “এতিমদের সম্পদ তাদের দিয়ে দাও।” (বালেগ হলে আর এতিম থাকে না, কিন্তু অতীত অবস্থার কারণে বালেগ ব্যক্তিকেও এখানে এতিম বলা হয়েছে)।
الملاحظة: أجب عن أربعة من مجموعة (ب) (যেকোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও)
[৯. ফাসাহাতুল কালিমা এর বর্ণনা উদাহরণসহ দাও।]
ফাসাহাতুল কালিমা (فصاحة الكلمة) এর বর্ণনা:
‘ফাসাহাত’ অর্থ সুস্পষ্ট ও প্রাঞ্জল হওয়া। বালাগাহ শাস্ত্রের পরিভাষায় ‘ফাসাহাতুল কালিমা’ বলতে এমন একটি একক শব্দকে (مفرد) বোঝায়, যা তিনটি মারাত্মক ভাষাগত দোষ বা ত্রুটি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। এই তিনটি ত্রুটি হলো:
১. তানাফুরুল হুরূফ (تنافر الحروف): শব্দের অক্ষরগুলো এমন হওয়া, যা মুখে উচ্চারণ করা অত্যন্ত কষ্টকর এবং শুনতে শ্রুতিকটু লাগে। যেমন— ‘هعخع’ (একটি নির্দিষ্ট উদ্ভিদ)। ফাসিহ শব্দ এমন হওয়া যাবে না।
২. গরাবাহ (الغرابة): শব্দটি এমন অপ্রচলিত ও অপরিচিত হওয়া, যার অর্থ ডিকশনারি না দেখে সাধারণ আরবদের পক্ষে বোঝা অসম্ভব। যেমন— ‘تكأكأتم’ (তোমরা একত্রিত হয়েছ)। এর পরিবর্তে ‘اجتمعتم’ বলা ফাসাহাত।
৩. মুখালাফাতুল কিয়াস (مخالفة القياس): শব্দটি আরবি ব্যাকরণ বা সরফ শাস্ত্রের নিয়মের পরিপন্থী হওয়া। যেমন— ‘بوقات’ (শিঙাগুলো)। ব্যাকরণের নিয়ম অনুযায়ী এর বহুবচন হওয়া উচিত ‘أبواق’।
সুতরাং, যে শব্দ এই তিনটি দোষ থেকে মুক্ত, তাকেই ‘কালিমাতুন ফাসিহাতুন’ বা প্রাঞ্জল শব্দ বলা হয়।
[১০. মুখালাফাতুল কিয়াস ও গরাবাহ এর অর্থ কী? উদাহরণসহ বর্ণনা কর।]
মুখালাফাতুল কিয়াস (مخالفة القياس) ও গরাবাহ (الغرابة)-এর অর্থ:
১. মুখালাফাতুল কিয়াস:
এর অর্থ হলো— আরবি ব্যাকরণ বা সরফ (صرف) শাস্ত্রের নির্ধারিত নিয়ম ও কানুন ভঙ্গ করে কোনো শব্দ গঠন করা। কোনো শব্দে এই ত্রুটি থাকলে তা ফাসাহাত বা প্রাঞ্জলতা হারিয়ে ফেলে।
উদাহরণ: এক কবি বলেছেন— الْحَمْدُ لِلَّهِ الْعَلِيِّ الْأَجْلَلِ “সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি সুউচ্চ ও মহান।”
এখানে ‘الْأَجْلَل’ (আল-আজলাল) শব্দটি মুখালাফাতুল কিয়াস। কারণ সরফের নিয়ম অনুযায়ী একই জাতীয় দুটি অক্ষর পাশাপাশি এলে ইদগাম (যুক্ত) করতে হয়। তাই সঠিক ফাসিহ শব্দ হবে ‘الأجلّ’ (আল-আজাল্লু)।
২. গরাবাহ:
এর অর্থ হলো— অপরিচিত বা দুর্বোধ্য হওয়া। কোনো শব্দ যদি এতই অপ্রচলিত ও জটিল হয় যে তার অর্থ বুঝতে পণ্ডিতদেরও অভিধানের আশ্রয় নিতে হয়, তবে তাকে গরাবাহ বলে।
উদাহরণ: এক ব্যক্তি উট থেকে পড়ে গেলে লোকজন জড়ো হয়ে যায়। সে তাদের দেখে বলে— مَا لَكُمْ تَكَأْكَأْتُمْ عَلَيَّ تَكَأْكُؤَكُمْ عَلَى ذِي جِنَّةٍ! افْرَنْقِعُوا عَنِّي “কী ব্যাপার, তোমরা আমার চারপাশে এমনভাবে জটলা পাকিয়েছ, যেন এক পাগলের চারপাশে ভিড় করেছ! সরে যাও আমার কাছ থেকে।”
এখানে ‘تَكَأْكَأْتُمْ’ (জটলা পাকানো) এবং ‘افْرَنْقِعُوا’ (সরে যাওয়া) শব্দ দুটি গরাবাহ বা চরম দুর্বোধ্য।
[১১. সংক্ষিপ্তরূপে খবর এর উদ্দেশ্যগুলো বর্ণনা কর।]
খবর-এর উদ্দেশ্য (أغراض الخبر):
বালাগাহ শাস্ত্রে ‘খবর’ (الخبر) বলতে এমন বাক্য বোঝায়, যাকে সত্য বা মিথ্যা বলা যায়। সাধারণ নিয়মে খবর দুটি উদ্দেশ্যে প্রদান করা হয়:
১. ফায়দাতুল খবর (فائدة الخبر): শ্রোতাকে এমন কোনো নতুন তথ্য দেওয়া, যা সে আগে জানত না। যেমন— “ধর্মই হলো উত্তম চরিত্র।”
২. লাযিমুল ফায়দাহ (لازم الفائدة): শ্রোতাকে এটা জানানো যে, বক্তা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আছে। (শ্রোতা আগে থেকেই তথ্যটি জানে)। যেমন— শিক্ষক ছাত্রকে বলল, “তুমি কাল ক্লাসে আসোনি।”
আলঙ্কারিক উদ্দেশ্য (الأغراض المجازية): ওপরের দুটি মূল উদ্দেশ্য ছাড়াও খবর অনেক সময় ভিন্ন আলঙ্কারিক অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন:
– আক্ষেপ প্রকাশ (التحسر): “হায়! আমার যৌবন শেষ হয়ে গেছে।”
– অপারগতা ও বিনয় প্রকাশ (إظهار الضعف): “হে আমার রব! আমার হাড়গুলো দুর্বল হয়ে গেছে।” (সূরা মারয়াম: ৪)
– দয়া প্রার্থনা (الاسترحام): “হে আল্লাহ! আমি একজন অভাবী মানুষ।”
– অহংকার বা গর্ব (الفخر): “আমি সেই ব্যক্তি, যাকে অন্ধরাও চেনে।”
[১২. মুনাদা কাকে বলে? মুনাদা এর প্রকারসমূহ স্পষ্টরূপে বর্ণনা কর।]
মুনাদা (المنادى)-এর পরিচয় ও প্রকারভেদ:
সংজ্ঞা: নিদা (النداء) বা ডাকার অব্যয়ের মাধ্যমে যাকে উদ্দেশ্য করে ডাকা হয় বা যার মনোযোগ আকর্ষণ করা হয়, তাকে ‘মুনাদা’ বলে। যেমন— يَا زَيْدُ “হে যায়েদ!” এখানে ‘ইয়া’ হলো হরফে নিদা এবং ‘যায়েদ’ হলো মুনাদা।
মুনাদা-এর প্রকারভেদ (أقسام المنادى):
মুনাদাকে ব্যাকরণগত দিক থেকে ৫ ভাগে ভাগ করা যায়:
১. মুফরাদ মারিফাহ (المفرد المعرفة): নির্দিষ্ট একক নাম। এটি যম্মা (পেশ) দিয়ে শেষ হয়। যেমন— يَا مُحَمَّدُ “হে মুহাম্মদ!”
২. নাকিরা মাকসুদাহ (النكرة المقصودة): অনির্দিষ্ট হলেও ডাকার সময় কাউকে নির্দিষ্ট করে নেওয়া। এটিও যম্মা দিয়ে শেষ হয়। যেমন— يَا رَجُلُ “হে লোক!” (সামনে দাঁড়ানো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে)।
৩. নাকিরা গায়র মাকসুদাহ (النكرة غير المقصودة): অনির্দিষ্ট ব্যক্তি। এটি নাসব (যবর) গ্রহণ করে। যেমন অন্ধ ব্যক্তি বলছে— يَا رَجُلًا، خُذْ بِيَدِي “হে কোনো এক লোক! আমার হাত ধরো।”
৪. মুদাফ (المضاف): সম্বন্ধযুক্ত পদ। এটি নাসব গ্রহণ করে। যেমন— يَا عَبْدَ اللَّهِ “হে আল্লাহর বান্দা!”
৫. শিবাহ বিল মুদাফ (الشبيه بالمضاف): মুদাফের মতো কিন্তু সম্পূর্ণ মুদাফ নয়। এটি নাসব গ্রহণ করে। যেমন— يَا طَالِعًا جَبَلًا “হে পাহাড়ে আরোহণকারী!”
[১৩. কসর কাকে বলে? কসর এর পদ্ধতিগুলো উদাহরণসহ বর্ণনা কর।]
কসর (القصر)-এর পরিচয় ও পদ্ধতি:
সংজ্ঞা: ‘কসর’ মানে নির্দিষ্ট করা বা সীমাবদ্ধ করা। বালাগাহর পরিভাষায়, বিশেষ পদ্ধতির মাধ্যমে কোনো একটি বিষয়কে অন্য একটি বিষয়ের সাথে নির্দিষ্ট বা সীমাবদ্ধ করে দেওয়াকে ‘কসর’ বলে। যেমন— “যায়েদ ছাড়া কেউ কবি নয়।”
কসর করার পদ্ধতি (طرق القصر):
আরবি ভাষায় কসর করার প্রধান ৪টি পদ্ধতি রয়েছে:
১. নাফি ও ইসতিসনা (النفي والاستثناء): না-বোধক অব্যয় (لا, ما, إن) এবং ‘ইল্লা’ (إلا) ব্যবহারের মাধ্যমে কসর করা।
উদাহরণ: وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ “মুহাম্মদ (স.) তো একজন রাসুল ছাড়া আর কিছুই নন।”
২. ইন্নামা (إنما): ‘ইন্নামা’ শব্দের মাধ্যমে কসর করা। এটি বাক্যের শুরুতে বসে।
উদাহরণ: إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ “নিশ্চয়ই আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে শুধু আলিমরাই তাঁকে ভয় করে।”
৩. আতিফ বা অব্যয়ের মাধ্যমে (العطف بـ لا، بل، لكن):
উদাহরণ: الْأَرْضُ مُتَحَرِّكَةٌ لَا ثَابِتَةٌ “পৃথিবী ঘূর্ণায়মান, স্থির নয়।”
৪. তাকদিম বা শব্দ আগে আনার মাধ্যমে (تقديم ما حقه التأخير): বাক্যের যে অংশটি পরে বসার কথা, তাকে গুরুত্ব বোঝাতে আগে নিয়ে আসা।
উদাহরণ: إِيَّاكَ نَعْبُدُ “আমরা শুধুমাত্র আপনারই ইবাদত করি।” (এখানে ‘নাবুদু’ আগে বসার কথা ছিল)।
[১৪. ইতনাব এর সংজ্ঞা দাও। ইতনাব এর প্রকারগুলো সংক্ষিপ্তরূপে বর্ণনা কর।]
ইতনাব (الإطناب)-এর সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ:
সংজ্ঞা: ইতনাব মানে হলো প্রসারিত করা বা বিস্তারিত বলা। বালাগাহর পরিভাষায়, বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যে বা আলঙ্কারিক ফায়দা হাসিলের জন্য অল্প অর্থের কথায় প্রয়োজনের চেয়ে বেশি শব্দ ব্যবহার করে বাক্যকে দীর্ঘ করাকে ‘ইতনাব’ বলে।
ইতনাব-এর প্রকারগুলো (أقسام الإطناب):
ইতনাব বিভিন্নভাবে হতে পারে। এর কয়েকটি প্রধান প্রকার হলো:
১. আম-এর পর খাস উল্লেখ করা (ذكر الخاص بعد العام): সাধারণ কথা বলার পর গুরুত্ব বোঝাতে নির্দিষ্ট কিছু আবার বলা। যেমন— “তোমরা নামাজগুলোর হিফাযত করো, বিশেষ করে মধ্যবর্তী (আসর) নামাজের।”
২. খাস-এর পর আম উল্লেখ করা (ذكر العام بعد الخاص): যেমন— “হে রব! আমাকে, আমার পিতামাতাকে এবং সকল মুমিনকে ক্ষমা করুন।”
৩. অস্পষ্ট কথার পর স্পষ্ট করা (الإيضاح بعد الإبهام): শ্রোতার মনোযোগ আকর্ষণের জন্য। যেমন— “আমি কি তোমাকে এমন ব্যবসার কথা বলব, যা তোমাকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি থেকে বাঁচাবে? তা হলো, আল্লাহর ওপর ঈমান আনা।”
৪. তাকরার (التكرار): একই শব্দ বা বাক্য বারবার বলা। যেমন— “সুতরাং নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে।”
৫. ই’তিরাদ বা মাঝখানে বাক্য ঢোকানো (الاعتراض): বাক্যের মাঝখানে দুআ বা অন্য উদ্দেশ্যে একটি অতিরিক্ত বাক্য ঢোকানো। যেমন— “আল্লাহ—তাঁকে পবিত্র ঘোষণা করছি—সর্বজ্ঞানী।”
[১৫. মাজায আকলী কাকে বলে? উদাহরণসহ বর্ণনা দাও।]
মাজায আকলী (المجاز العقلي)-এর পরিচয়:
সংজ্ঞা: কোনো কাজ (فعل) বা ক্রিয়াকে তার প্রকৃত সম্পাদনকারীর (যে কাজটা করেছে) দিকে সম্বন্ধ না করে, রূপকভাবে অন্য কিছুর দিকে (যেমন: সময়, স্থান, কারণ বা মাধ্যম) সম্বন্ধ বা নিসবত করাকে ‘মাজায আকলী’ বলে। এটি বুদ্ধিবৃত্তিক রূপক, কারণ মানুষের আকল (বুদ্ধি) বুঝতে পারে যে কাজটা প্রকৃতপক্ষে সে করেনি, বরং এর পেছনে অন্য কেউ আছে।
মাজায আকলী-এর উদাহরণ (التمثيل):
১. কারণের দিকে সম্বন্ধ (الإسناد إلى السبب):
بَنَى الْأَمِيرُ الْمَدِينَةَ “রাজা শহরটি নির্মাণ করেছেন।”
(প্রকৃতপক্ষে রাজা নিজে ইট-বালু দিয়ে শহর বানাননি, বানিয়েছে শ্রমিকরা। কিন্তু রাজা যেহেতু আদেশের কারণ, তাই কাজটিকে রূপকভাবে তাঁর দিকে সম্বন্ধ করা হয়েছে)।
২. সময়ের দিকে সম্বন্ধ (الإسناد إلى الزمان):
نَهَارُهُ صَائِمٌ “তার দিনটি রোযা পালনকারী।”
(দিন রোযা রাখতে পারে না, রোযা রাখে মানুষ। কিন্তু দিন হলো রোযা রাখার সময়)।
৩. স্থানের দিকে সম্বন্ধ (الإسناد إلى المكان):
جَرَى النَّهْرُ “নদী প্রবাহিত হয়েছে।”
(প্রকৃতপক্ষে নদী প্রবাহিত হয় না, নদীর পানি প্রবাহিত হয়। নদী হলো পানি প্রবাহের স্থান)।
[১৬. মুহাসসিনাতুল লাফযিয়্যাহ এর সংজ্ঞা উদাহরণসহ বর্ণনা কর।]
মুহাসসিনাতুল লাফযিয়্যাহ (المحسنات اللفظية)-এর সংজ্ঞা:
ইলমুল বাদি (علم البديع) শাস্ত্রে বাক্যের সৌন্দর্য বৃদ্ধির উপায় নিয়ে আলোচনা করা হয়। এর দুটি অংশ— লাফযি (শব্দগত) ও মানুয়ি (অর্থগত)।
সংজ্ঞা: যেসব অলংকারের মাধ্যমে বাক্যের অর্থের চেয়ে শব্দের উচ্চারণের সৌন্দর্য, ধ্বনিমাধুর্য ও ছন্দ বৃদ্ধি পায় এবং শুনতে খুব ভালো লাগে, সেগুলোকে ‘মুহাসসিনাতুল লাফযিয়্যাহ’ বা শব্দগত অলংকার বলা হয়।
প্রকার ও উদাহরণ:
এর বেশ কিছু প্রকার রয়েছে, তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
১. জিনাস (الجناس): বাক্যের মধ্যে একই রকম উচ্চারণের দুটি শব্দ ব্যবহার করা, কিন্তু তাদের অর্থ ভিন্ন হওয়া।
উদাহরণ: يَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ يُقْسِمُ الْمُجْرِمُونَ مَا لَبِثُوا غَيْرَ سَاعَةٍ
“যেদিন কিয়ামত (السَّاعَةُ) সংঘটিত হবে, সেদিন অপরাধীরা কসম খেয়ে বলবে যে, তারা পৃথিবীতে এক মুহূর্তের (سَاعَةٍ) বেশি অবস্থান করেনি।” (এখানে الساعة শব্দটি দুবার ব্যবহৃত হয়েছে, প্রথমটির অর্থ কিয়ামত, দ্বিতীয়টির অর্থ সময়)।
২. সাজাহ (السجع): গদ্যের বাক্যগুলোর শেষ অক্ষরের মিল বা ছন্দ।
উদাহরণ: اللَّهُمَّ أَعْطِ مُنْفِقًا خَلَفًا، وَأَعْطِ مُمْسِكًا تَلَفًا
“হে আল্লাহ! দানকারীকে প্রতিদান দিন (خَلَفًا) এবং কৃপণকে ধ্বংস দিন (تَلَفًا)।”






