As-Sirah An-Nabawiyyah (আস-সীরাহ আন-নাববীয়্যাহ) 201204 – Fazil Hons Al Quran 2nd Year 2023 QnA

Join Our Telegram Channel
দ্রুত নতুন বই পেতে যুক্ত থাকুন
Join Now
admin
as sirah an nabawiyyah 201204 fazil hons al quran 2nd year 2023 qna
Join Our WhatsApp Channel
দ্রুত নতুন বই পেতে যুক্ত থাকুন
Join Now
📋 সূচিপত্র (Table of Contents)

As-Sirah An-Nabawiyyah (Code: 201204) – ২০২৩ প্রশ্ন ও উত্তর

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২৩ এর আল-কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের السيرة النبوية (আস-সীরাহ আন-নাববীয়্যাহ) বিষয়ের সম্পূর্ণ উত্তরমালা।

বিঃদ্রঃ পরীক্ষার্থীদের আগামী পরীক্ষার সর্বোচ্চ প্রস্তুতির সুবিধার্থে মূল প্রশ্নপত্রের বিকল্প সবগুলোর (অথবা) প্রশ্নের ১০০% নির্ভুল ও তথ্যবহুল উত্তর বিস্তারিতভাবে নিচে দেওয়া হলো।

مجموعة (أ) [ক-বিভাগ]

الملاحظة: أجب عن أربعة من مجموعة (أ) (যেকোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও)

١- اكتب الحالات السياسية والاقتصادية والخلقية قبل مبعث النبي صلى الله عليه وسلم في العرب-

[১. আরবে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রেরিত হওয়ার পূর্বের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও চারিত্রিক অবস্থা লিপিবদ্ধ কর।]

ভূমিকা: নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাবের পূর্বে আরবের মানুষ অজ্ঞতা, কুসংস্কার এবং চরম অন্ধকারের যুগে নিমজ্জিত ছিল, যাকে ইতিহাসে ‘আইয়্যামে জাহেলিয়াত’ বা মূর্খতার যুগ বলা হয়। নিচে সে সময়ের আরবের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও চারিত্রিক অবস্থার বিবরণ দেওয়া হলো:

১. রাজনৈতিক অবস্থা:
প্রাক-ইসলামি আরবে কোনো ঐক্যবদ্ধ বা কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা ছিল না। আরবরা গোত্রভিত্তিক সমাজব্যবস্থায় অভ্যস্ত ছিল এবং গোত্রপ্রধানরাই ছিল সর্বেসর্বা। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে যুগের পর যুগ যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগেই থাকত। উদাহরণস্বরূপ, বকর ও তাগ্লিব গোত্রের মধ্যে সংঘটিত ‘বসুসের যুদ্ধ’ প্রায় ৪০ বছর ধরে চলেছিল। পবিত্র কুরআনে তাদের সে অবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছে:
وَكُنتُمْ عَلَىٰ شَفَا حُفْرَةٍ مِّنَ النَّارِ فَأَنقَذَكُم مِّنْهَا ۗ
অর্থ: “আর তোমরা ছিলে অগ্নিকুণ্ডের প্রান্তে, অতঃপর তিনি (আল্লাহ) তোমাদেরকে তা থেকে রক্ষা করেছেন।” (সূরা আলে-ইমরান: ১০৩)

২. অর্থনৈতিক অবস্থা:
তৎকালীন আরবের অর্থনীতি ছিল মূলত কৃষিকাজ, পশুপালন ও ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। মক্কার কুরাইশরা ব্যবসা-বাণিজ্যে বেশ উন্নত ছিল। তারা শীতকালে ইয়েমেন এবং গ্রীষ্মকালে সিরিয়ায় বাণিজ্য যাত্রা করত। আল্লাহ তা’আলা তাদের এই ব্যবসার কথা কুরআনে উল্লেখ করেছেন:
إِيلَافِهِمْ رِحْلَةَ الشِّتَاءِ وَالصَّيْفِ
অর্থ: “শীত ও গ্রীষ্মকালের বাণিজ্য যাত্রায় তাদের আসক্তির কারণে।” (সূরা কুরাইশ: ২)
তবে সেসময় সমাজে সুদ (রিবা)-এর ব্যাপক প্রচলন ছিল, যা দরিদ্রদের আরও নিঃস্ব এবং ধনীদের আরও সম্পদশালী করে তুলছিল। লুটতরাজ এবং লুণ্ঠন ছিল অনেক বেদুঈন গোত্রের জীবিকা নির্বাহের অন্যতম উপায়।

৩. চারিত্রিক ও সামাজিক অবস্থা:
আরবদের সামাজিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। নারী সমাজের কোনো সম্মান বা অধিকার ছিল না। কন্যাসন্তান জন্ম নেওয়াকে তারা চরম অপমানজনক মনে করত এবং অনেক ক্ষেত্রে জীবন্ত কবর দিত। কুরআনে এর চিত্র এভাবেই ফুটে উঠেছে:
وَإِذَا الْمَوْءُودَةُ سُئِلَتْ بِأَيِّ ذَنبٍ قُتِلَتْ
অর্থ: “যখন জীবন্ত প্রোথিত কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হবে, কী অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?” (সূরা তাকভীর: ৮-৯)
এছাড়া মদ্যপান, জুয়া, ব্যভিচার ও কুসংস্কার সমাজে মহামারির আকার ধারণ করেছিল। তবে এতসব খারাপ দিকের পরও আরবদের মধ্যে কিছু মহৎ গুণও ছিল, যেমন— অতিথি পরায়ণতা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা, বীরত্ব এবং আশ্রিতকে রক্ষা করা ইত্যাদি।

উপসংহার: বস্তুত সে সময়কার আরব সমাজ সর্বদিক থেকে এমন এক চরম পতনের দ্বারপ্রান্তে ছিল, যেখানে একজন মহান সংস্কারক ও পথপ্রদর্শকের আবির্ভাব অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। আল্লাহ তা’আলা রাহমাতুল্লিল আলামিন (স.)-কে প্রেরণের মাধ্যমে সেই জাহেলিয়াতের অবসান ঘটান।

٢- تحدث عن أهم الأحداث التي وقعت قبل وبعد مولد النبي صلى الله عليه وسلم-

[২. নবি (স.) এর জন্মের পূর্বে ও পরে সংঘটিত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহ সম্পর্কে আলোচনা কর।]

ভূমিকা: বিশ্বমানবতার মুক্তির দিশারী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাব পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। তাঁর জন্মের আগে এবং পরে এমন কিছু বিস্ময়কর ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল, যা তাঁর মহান নবুওয়াতের আগাম সুসংবাদ বহন করত।

জন্মের পূর্বে সংঘটিত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি:

১. আসহাবে ফিল বা হাতির বাহিনীর ঘটনা:
নবিজি (স.)-এর জন্মের মাত্র ৫০ বা ৫৫ দিন পূর্বে ইয়েমেনের খ্রিষ্টান শাসক আবরাহা পবিত্র কাবা ঘর ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে বিশাল হস্তীবাহিনী নিয়ে মক্কায় আক্রমণ করে। আল্লাহ তা’আলা ঝাঁকে ঝাঁকে আবাবিল পাখি পাঠিয়ে তাদের ধ্বংস করে দেন। কুরআনে বলা হয়েছে:
أَلَمْ تَرَ كَيْفَ فَعَلَ رَبُّكَ بِأَصْحَابِ الْفِيلِ
অর্থ: “আপনি কি দেখেননি আপনার রব্ব হাতিওয়ালাদের সাথে কীরূপ আচরণ করেছেন?” (সূরা ফিল: ১)
এই ঘটনাটি নবিজির (স.) আগমনের একটি বিশাল নিদর্শন (ইরহাস) ছিল।

২. যমযম কূপ পুনঃখনন:
নবিজি (স.)-এর জন্মের বেশ আগে পবিত্র যমযম কূপের চিহ্ন মুছে গিয়েছিল। তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিব স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে যমযম কূপ পুনঃখনন করেন এবং হাজীদের পানি পানের ব্যবস্থা করেন।

৩. নবিজির (স.) পিতার ইন্তেকাল:
তিনি মায়ের গর্ভে থাকাবস্থাতেই তাঁর পিতা আবদুল্লাহ ব্যবসার উদ্দেশ্যে সিরিয়া যাওয়ার পথে মদিনায় ইন্তেকাল করেন। ফলে নবিজি (স.) এতিম হিসেবে দুনিয়ায় আসেন। কুরআনে আল্লাহ বলেন:
أَلَمْ يَجِدْكَ يَتِيمًا فَآوَىٰ
অর্থ: “তিনি কি আপনাকে এতিম হিসেবে পাননি? অতঃপর তিনি আশ্রয় দিয়েছেন।” (সূরা দুহা: ৬)

জন্মের পরে সংঘটিত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি:

১. বক্ষ বিদীর্ণ বা সিনা চাকের ঘটনা:
নবিজি (স.) যখন দুধমাতা হালিমা সাদিয়া (রা.)-এর কাছে বনু সাদ গোত্রে লালিত-পালিত হচ্ছিলেন, তখন চার বছর বয়সে একদিন ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) এসে তাঁর বক্ষ বিদীর্ণ করেন এবং অন্তর থেকে কলুষতা বা শয়তানের অংশ বের করে যমযমের পানি দিয়ে ধৌত করেন। (সহিহ মুসলিম)

২. মাতা ও দাদার ইন্তেকাল:
তাঁর বয়স যখন ছয় বছর, তখন মা আমিনা ইন্তেকাল করেন। এরপর আট বছর বয়সে স্নেহময় দাদা আবদুল মুত্তালিবও ইন্তেকাল করেন। এরপর থেকে চাচা আবু তালিব তাঁর লালন-পালনের দায়িত্ব নেন।

৩. ফিজারের যুদ্ধ ও হিলফুল ফুজুল:
কৈশোরে নবিজি (স.) ‘হারবুল ফিজার’ বা অন্যায় যুদ্ধে চাচাদের সাথে অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মক্কার যুবকদের নিয়ে তিনি ‘হিলফুল ফুজুল’ নামক একটি শান্তিসংঘ গঠন করেন, যা ছিল তাঁর মহানুভবতা ও সমাজ সংস্কারের অনন্য দৃষ্টান্ত।

৪. হাজরে আসওয়াদ স্থাপন:
নবুওয়াতের আগে ৩৫ বছর বয়সে কাবা ঘর পুনর্নির্মাণের পর ‘হাজরে আসওয়াদ’ (কালো পাথর) স্থাপন নিয়ে কুরাইশদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী বিবাদের আশঙ্কা দেখা দিলে, নবিজি (স.) নিজ বিচক্ষণতায় নিজের চাদরে পাথরটি রেখে সব গোত্রপ্রধানের মাধ্যমে তা স্থাপন করে বিবাদের চমৎকার মীমাংসা করেন।

٣- اكتب معنى الهجرة ثم بين سبب هجرة النبي صلى الله عليه وسلم من مكة إلى المدينة مع بيان واقعة الهجرة-

[৩. হিজরতের অর্থ লেখ। অতঃপর নবি (স.) মক্কা হতে মদিনায় হিজরতের কারণ উল্লেখপূর্বক হিজরতের ঘটনা বর্ণনা কর।]

হিজরতের অর্থ:
শাব্দিক অর্থ: ‘হিজরত’ (الهجرة) আরবি শব্দ, এর আভিধানিক অর্থ হলো— ত্যাগ করা, এক স্থান ছেড়ে অন্য স্থানে গমন করা বা দেশত্যাগ করা।
পারিভাষিক অর্থ: ইসলামি পরিভাষায়, দ্বীনের সুরক্ষার জন্য কুফরের দেশ (দারুল কুফর) ত্যাগ করে শান্তির দেশ (দারুল ইসলাম)-এ পাড়ি জমানোকে হিজরত বলে। বিশেষ করে রাসুলুল্লাহ (স.) ও সাহাবায়ে কেরাম মক্কার কাফিরদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে আল্লাহর নির্দেশে মক্কা ছেড়ে মদিনায় যে স্থানান্তর করেছিলেন, ইসলামের ইতিহাসে তাই হিজরত নামে পরিচিত।

হিজরতের কারণসমূহ:
১. কুরাইশদের অমানবিক নির্যাতন: মক্কায় ইসলাম প্রচার শুরু করার পর কুরাইশরা মুসলমানদের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন শুরু করে। বিশেষ করে আবু তালিব ও খাদিজা (রা.)-এর ইন্তেকালের পর নবিজির (স.) ওপর অত্যাচারের মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়।
২. দারুন নাদওয়ার ষড়যন্ত্র: মক্কার কাফিররা ‘দারুন নাদওয়া’ বা তাদের পরামর্শ সভায় মিলিত হয়ে নবিজি (স.)-কে হত্যার চূড়ান্ত ষড়যন্ত্র করে। তারা প্রতিটি গোত্র থেকে একজন করে শক্তিশালী যুবক নির্বাচন করে একসাথে আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এ ষড়যন্ত্রের কথা আল্লাহ কুরআনে উল্লেখ করেছেন:
وَإِذْ يَمْكُرُ بِكَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِيُثْبِتُوكَ أَوْ يَقْتُلُوكَ أَوْ يُخْرِجُوكَ ۚ وَيَمْكُرُونَ وَيَمْكُرُ اللَّهُ ۖ وَاللَّهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ
অর্থ: “আর স্মরণ করুন, যখন কাফিররা আপনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিল আপনাকে বন্দি করার জন্য, হত্যা করার জন্য অথবা নির্বাসিত করার জন্য। তারা ষড়যন্ত্র করে এবং আল্লাহও কৌশল করেন; আর আল্লাহই সর্বশ্রেষ্ঠ কৌশলী।” (সূরা আনফাল: ৩০)
৩. মদিনাবাসীর ইসলাম গ্রহণ (আকাবার বাইয়াত): মদিনা থেকে আগত লোকেরা আকাবা নামক স্থানে নবিজির (স.) হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাঁকে মদিনায় হিজরতের আমন্ত্রণ জানান। তারা নিজেদের প্রাণের বিনিময়ে তাঁকে রক্ষার শপথ নেন।
৪. আল্লাহর নির্দেশ: পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক হয়ে উঠলে আল্লাহ তা’আলা তাঁর নবিকে মদিনায় হিজরতের চূড়ান্ত নির্দেশ প্রদান করেন।

হিজরতের ঘটনা:
আল্লাহর নির্দেশ পেয়ে নবিজি (স.) হযরত আবু বকর (রা.)-কে সাথে নিয়ে হিজরতের প্রস্তুতি নেন। হত্যার উদ্দেশ্যে কুরাইশ যুবকরা তাঁর ঘর ঘেরাও করে রাখলে তিনি হযরত আলী (রা.)-কে তাঁর বিছানায় শুইয়ে দিয়ে সূরা ইয়াসিনের আয়াত পড়তে পড়তে কাফিরদের চোখের সামনে দিয়ে বেরিয়ে যান। আল্লাহ তাদের চোখ অন্ধ করে দেন।
নবিজি (স.) ও আবু বকর (রা.) মক্কার অদূরে ‘সাওর’ গুহায় তিন দিন আত্মগোপন করে থাকেন। কুরাইশরা খুঁজতে খুঁজতে গুহার মুখে চলে এলে আবু বকর (রা.) চিন্তিত হয়ে পড়েন। তখন নবিজি (স.) তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, যা কুরআনে বর্ণিত হয়েছে:
لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا
অর্থ: “তুমি বিষণ্ন হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।” (সূরা তাওবা: ৪০)
অতঃপর গুহা থেকে বেরিয়ে পথপ্রদর্শক আবদুল্লাহ ইবনে উরাইকিতের সাহায্যে তারা মদিনার দিকে রওনা হন। পথে সুরাকা ইবনে মালেক তাদের ধাওয়া করলেও তার ঘোড়ার পা মাটিতে দেবে যায়। অবশেষে দীর্ঘ ও বিপদসংকুল পথ পাড়ি দিয়ে নবিজি (স.) প্রথমে কুবায় পৌঁছান এবং ‘মসজিদে কুবা’ নির্মাণ করেন। এরপর তিনি মদিনায় প্রবেশ করলে মদিনাবাসী তাকে অভূতপূর্ব আনন্দ ও “তালাআল বাদরু আলাইনা” গজল গেয়ে বরণ করে নেয়। এর মাধ্যমেই মদিনায় প্রথম ইসলামি রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন হয়।

٤- تحدث عن خلفية صلح الحديبية واهم بنوده بالإيضاح-

[৪. হুদায়বিয়ার সন্ধির প্রেক্ষাপট ও গুরুত্বপূর্ণ ধারাসমূহ বিশদভাবে আলোচনা কর।]

হুদায়বিয়ার সন্ধির প্রেক্ষাপট:
ষষ্ঠ হিজরিতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বপ্নে দেখলেন যে, তিনি তাঁর সাহাবিদের নিয়ে নিরাপদে মক্কায় প্রবেশ করে কাবা ঘর তাওয়াফ করছেন। নবিদের স্বপ্ন ওহী। তাই তিনি ১৪০০ সাহাবিকে সাথে নিয়ে ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা অভিমুখে রওনা হলেন। তাদের সাথে যুদ্ধের কোনো অস্ত্র ছিল না, শুধু আত্মরক্ষার্থে কোষবদ্ধ তরবারি এবং কোরবানির পশু ছিল।
কিন্তু কুরাইশরা খবর পেয়ে খালিদ বিন ওয়ালিদ ও ইকরিমা বিন আবু জাহেলের নেতৃত্বে ২০০ অশ্বারোহীর এক বাহিনী পাঠিয়ে মুসলমানদের মক্কায় প্রবেশে বাধা দেয়। সংঘাত এড়ানোর জন্য নবিজি (স.) পথ পরিবর্তন করে মক্কার অদূরে ‘হুদায়বিয়া’ নামক স্থানে শিবির স্থাপন করেন।
নবিজি (স.) হযরত উসমান (রা.)-কে কুরাইশদের কাছে পাঠান এই বার্তা দিয়ে যে, তারা যুদ্ধ করতে আসেননি, শুধু ওমরাহ করতে এসেছেন। কিন্তু কুরাইশরা হযরত উসমান (রা.)-কে আটকে রাখে এবং রটে যায় যে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। এই চরম মুহূর্তে নবিজি (স.) বাবলা গাছের নিচে সাহাবিদের কাছ থেকে মৃত্যুর শপথ গ্রহণ করেন, যা ‘বাইআতুর রিদওয়ান’ নামে পরিচিত। আল্লাহ এই বাইয়াতের ওপর সন্তুষ্ট হয়ে ঘোষণা করেন:
لَّقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ
অর্থ: “অবশ্যই আল্লাহ মুমিনদের ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন, যখন তারা গাছের নিচে আপনার হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেছিল।” (সূরা ফাতহ: ১৮)
অবশেষে কুরাইশরা ভয় পেয়ে সুহাইল ইবনে আমরকে সন্ধির প্রস্তাব দিয়ে পাঠায় এবং দীর্ঘ আলোচনার পর একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যাকে ‘হুদায়বিয়ার সন্ধি’ বলা হয়। আল্লাহ তা’আলা এই সন্ধিকে ‘সুস্পষ্ট বিজয়’ (ফাতহুম মুবীন) আখ্যা দিয়েছেন।

হুদায়বিয়ার সন্ধির গুরুত্বপূর্ণ ধারাসমূহ:
১. যুদ্ধবিরতি: আগামী ১০ বছর পর্যন্ত মুসলমান এবং কুরাইশদের মধ্যে সব ধরনের যুদ্ধ বন্ধ থাকবে। এই সময়ে একে অপরের জানমালের কোনো ক্ষতি করবে না।
২. ওমরাহ স্থগিত: মুসলমানরা এ বছর ওমরাহ না করেই মদিনায় ফিরে যাবে। তবে আগামী বছর তারা ওমরাহ পালনের জন্য আসতে পারবে এবং মক্কায় তিন দিন অবস্থান করতে পারবে। তখন তাদের সাথে শুধু কোষবদ্ধ তরবারি ছাড়া অন্য কোনো অস্ত্র থাকবে না।
৩. মৈত্রী জোট গঠন: আরবের যেকোনো গোত্র মক্কার কুরাইশদের সাথে অথবা মুসলমানদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার স্বাধীনতা পাবে। (এর ফলে খুজাআ গোত্র মুসলমানদের সাথে এবং বনু বকর গোত্র কুরাইশদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়)।
৪. পলাতক ব্যক্তিদের প্রত্যর্পণ: কুরাইশদের কেউ তার অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া ইসলাম গ্রহণ করে মদিনায় গেলে নবিজি (স.) তাকে ফেরত দিতে বাধ্য থাকবেন। কিন্তু মুসলমানদের কেউ ধর্ম ত্যাগ করে মক্কায় গেলে কুরাইশরা তাকে ফেরত দেবে না।
৫. বাণিজ্যিক নিরাপত্তা: কুরাইশদের বাণিজ্য কাফেলা নিরাপদে মদিনার পাশ দিয়ে সিরিয়া যাতায়াত করতে পারবে এবং মুসলমানরাও নিরাপদে মক্কায় আসা-যাওয়া করতে পারবে।

আপাতদৃষ্টিতে সন্ধির কিছু ধারা মুসলমানদের বিপক্ষে মনে হলেও, এটি ছিল ইসলামের ইতিহাসের এক যুগান্তকারী বিজয়, যা মুসলমানদের জন্য নিরাপদ পরিবেশে ইসলাম প্রচারের দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছিল।

٥- اكتب عن وثيقة المدينة مع بيان أهميتها في التاريخ الإسلامي-

[৫. মদিনা সনদ সম্পর্কে লেখ। অতঃপর ইসলামের ইতিহাসে উহার গুরুত্ব বর্ণনা কর।]

মদিনা সনদ (وثيقة المدينة):
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় দীর্ঘ ১৩ বছর অমানবিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর আল্লাহর আদেশে মদিনায় হিজরত করেন। মদিনায় এসে তিনি দেখলেন, সেখানকার জনসংখ্যা বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মে বিভক্ত— মক্কা থেকে আসা মুহাজির, মদিনার আনসার (আউস ও খাযরাজ গোত্র), এবং ইহুদিদের তিনটি প্রধান গোত্র (বনু কাইনুকা, বনু নাযির ও বনু কুরায়জা)।
একটি নতুন ও স্থিতিশীল ইসলামি রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে এবং মদিনার সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে শান্তি, সম্প্রীতি ও সহাবস্থান নিশ্চিত করার জন্য নবিজি (স.) সকল গোত্রের প্রতিনিধিদের সাথে নিয়ে একটি লিখিত চুক্তি বা সংবিধান প্রণয়ন করেন। ইসলামের ইতিহাসে এটিই ‘মদিনা সনদ’ বা ‘মিছাকুল মদিনা’ নামে পরিচিত।

মদিনা সনদের গুরুত্বপূর্ণ ধারাসমূহ:
১. এক জাতি (উম্মাহ): সনদ গ্রহণকারী সকল মুসলমান, ইহুদি ও অন্যান্য সম্প্রদায় একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে পরিগণিত হবে。
২. ধর্মীয় স্বাধীনতা: মদিনায় বসবাসকারী সকল সম্প্রদায় নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করতে পারবে। কেউ কারও ধর্মে হস্তক্ষেপ করবে না।
৩. সম্মিলিত প্রতিরক্ষা: বহিরাগত কোনো শত্রু মদিনা আক্রমণ করলে মদিনার সকল সম্প্রদায় (مسلم ও أجنبي) মিলেমিশে তা প্রতিহত করবে এবং মদিনার নিরাপত্তায় সবাই অংশগ্রহণ করবে。
৪. মিত্রতা ও চুক্তি: কুরাইশ বা তাদের মিত্রদের কেউ মদিনায় আশ্রয় দিতে পারবে না বা তাদের সাথে কোনো গোপন আঁতাত করতে পারবে না।
৫. রক্তপাত ও অপরাধ দমন: মদিনায় রক্তপাত, হত্যা, ব্যভিচার ও অপরাধমূলক কাজ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হলো। কেউ অপরাধ করলে তা তার ব্যক্তিগত অপরাধ বলে গণ্য হবে।
৬. সর্বোচ্চ বিচারালয়: যেকোনো বিবাদ বা মতবিরোধ দেখা দিলে তার চূড়ান্ত মীমাংসা আল্লাহ ও তাঁর রাসুল মুহাম্মদ (স.)-এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হবে।

ইসলামের ইতিহাসে মদিনা সনদের গুরুত্ব:
১. পৃথিবীর প্রথম লিখিত সংবিধান: মদিনা সনদ হলো পৃথিবীর ইতিহাসের সর্বপ্রথম লিখিত রাষ্ট্রীয় সংবিধান, যা নাগরিক অধিকার ও মানবাধিকারের এক অনন্য দলিল।
২. ইসলামি রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন: এই সনদের মাধ্যমে মদিনায় একটি সুশৃঙ্খল ও সার্বভৌম ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় এবং রাসুলুল্লাহ (স.) এই রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে সর্বজনীন স্বীকৃতি লাভ করেন।
৩. সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি: এটি প্রমাণ করে যে ইসলাম একটি শান্তির ধর্ম এবং এটি অমুসলিমদের প্রতি সহনশীলতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার পূর্ণ নিশ্চয়তা দেয়।
৪. গোত্রপ্রথার বিলোপ: এই সনদের মাধ্যমে যুগ যুগ ধরে চলে আসা আউস ও খাযরাজ গোত্রের রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে এবং ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন:
فَأَصْبَحْتُم بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا
অর্থ: “অতঃপর তাঁর অনুগ্রহে তোমরা পরস্পর ভাই ভাই হয়ে গেলে।” (সূরা আলে-ইমরান: ১০৩)
সংক্ষেপে, মদিনা সনদ ছিল একটি রাজনৈতিক মাস্টারপিস, যা মদিনাকে একটি শক্তিশালী ও নিরাপদ রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল।

٦- بين تاريخ بناء المسجد النبوي ثم اكتب أهميتها وفضائلها في الإسلام-

[৬. মসজিদ নববী নির্মাণের ইতিহাস বর্ণনা কর। অতঃপর ইসলামে ইহার গুরুত্ব ও মর্যাদাসমূহ বিশদভাবে লেখ।]

মসজিদে নববী নির্মাণের ইতিহাস:
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরত করে মদিনায় পৌঁছানোর পর, তাঁর উটনী (কাসওয়া) যেখানে গিয়ে বসে পড়ে, নবিজি (স.) সেখানেই মসজিদ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। স্থানটি ছিল সাহল ও সুহাইল নামক দুই এতিম বালকের, যারা এটি খেজুর শুকানোর কাজে ব্যবহার করত। নবিজি (স.) তাদের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্যে জমিটি কিনে নেন এবং মসজিদ নির্মাণের কাজ শুরু করেন।
নবিজি (স.) নিজে আনসার ও মুহাজির সাহাবিদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ইট ও পাথর বয়ে মসজিদ নির্মাণে অংশগ্রহণ করেন। মসজিদটি ছিল অত্যন্ত ছিমছাম ও সাদাসিধা। এর দেয়াল ছিল কাঁচা ইট ও মাটির, ছাদ ছিল খেজুর পাতার, খুঁটিগুলো ছিল খেজুর গাছের কাণ্ডের এবং মেঝেতে বিছানো ছিল সাধারণ বালু ও পাথরকুচি। এর পাশেই রাসুলুল্লাহ (স.) ও তাঁর পরিবারবর্গের জন্য ছোট ছোট হুজরা বা থাকার ঘর নির্মাণ করা হয়। এই মসজিদই ‘মসজিদে নববী’ নামে পরিচিত।

ইসলামে মসজিদে নববীর গুরুত্ব ও মর্যাদা:
মসজিদে নববী কেবল একটি উপাসনালয় ছিল না, বরং এটি ছিল সমগ্র ইসলামি রাষ্ট্রের স্নায়ুকেন্দ্র বা প্রাণকেন্দ্র। এর গুরুত্ব ও মর্যাদা নিচে বর্ণনা করা হলো:

১. ইবাদতের শ্রেষ্ঠ স্থান:
মসজিদুল হারামের পর মসজিদে নববী হলো ইবাদতের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ স্থান। এখানে এক রাকাত নামাজ পড়লে অন্যান্য মসজিদের তুলনায় বহুগুণ বেশি সওয়াব পাওয়া যায়। হাদিসে এসেছে:
صَلَاةٌ فِي مَسْجِدِي هَذَا خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ صَلَاةٍ فِيمَا سِوَاهُ، إِلَّا الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ
অর্থ: “আমার এই মসজিদে এক রাকাত সালাত আদায় করা, মসজিদে হারাম ছাড়া অন্য যেকোনো মসজিদে এক হাজার সালাত আদায়ের চেয়ে উত্তম।” (সহিহ বুখারি)

২. রওজাতুম মিন রিয়াজিল জান্নাহ:
মসজিদে নববীর একটি বিশেষ অংশ (নবিজির হুজরা ও মিম্বরের মধ্যবর্তী স্থান) হলো জান্নাতের টুকরো। রাসুলুল্লাহ (স.) এর মর্যাদা সম্পর্কে বলেছেন:
مَا بَيْنَ بَيْتِي وَمِنْبَرِي رَوْضَةٌ مِنْ رِيَاضِ الجَنَّةِ
অর্থ: “আমার ঘর এবং আমার মিম্বরের মধ্যবর্তী স্থানটি জান্নাতের বাগানগুলোর মধ্যে একটি বাগান।” (সহিহ বুখারি)

৩. ইসলামি রাষ্ট্রের প্রথম পার্লামেন্ট ও বিচারালয়:
মসজিদে নববী ছিল তৎকালীন ইসলামি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কেন্দ্র। নবিজি (স.) এখানেই বসে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নিতেন, সন্ধি-চুক্তি করতেন এবং বিভিন্ন দেশ থেকে আসা দূতদের সাথে সাক্ষাৎ করতেন। এখানেই বিচারকার্য পরিচালিত হতো এবং বিবাদ মীমাংসা করা হতো।

৪. সামরিক ও শিক্ষাকেন্দ্র:
এখানেই মুজাহিদদের সমবেত করে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া হতো এবং সেনাপতিদের হাতে পতাকা তুলে দেওয়া হতো। এছাড়াও এটি ছিল আসহাবে সুফফার (আবাসিক সাহাবি) জ্ঞানার্জনের প্রথম ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে সাহাবায়ে কেরাম কুরআন ও হাদিসের জ্ঞান অর্জন করতেন।

٧- اكتب شمائل رسول الله صلى الله عليه وسلم الخلقية مفصلاً-

[৭. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শারীরিক গঠন (শামায়েল) সবিস্তারে আলোচনা কর।]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শারীরিক গঠন (শামায়েল):
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর প্রিয় হাবিব হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দর আকৃতি, সুঠাম দেহ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ চরিত্র দিয়ে সৃষ্টি করেছিলেন। সাহাবায়ে কেরাম (রা.) অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তাঁর শারীরিক গঠন বা শামায়েলের বর্ণনা দিয়েছেন। হযরত আনাস, হযরত আলী ও বারা বিন আযেব (রা.)-এর বর্ণনা থেকে নবিজির (স.) যে অপরূপ চিত্র আমরা পাই, তা নিচে আলোচনা করা হলো:

১. চেহারা ও গায়ের রং:
নবিজি (স.)-এর চেহারা মোবারক ছিল পূর্ণিমার চাঁদের মতো উজ্জ্বল ও দীপ্তিময়। তিনি অত্যাধিক লম্বাও ছিলেন না, আবার বেটেও ছিলেন না, বরং মাঝারি গড়নের ছিলেন। তাঁর গায়ের রং ধবধবে সাদাও ছিল না, আবার কালচেও ছিল না; বরং তাঁর রং ছিল উজ্জ্বল গোলাপি বা লালচে আভাযুক্ত সাদা (আজহারুল লাওন)।

২. মাথা ও চুল:
তাঁর মাথা মোবারক ছিল বড় এবং সুগঠিত। মাথার চুলগুলো একেবারে কোঁকড়ানোও ছিল না, আবার সম্পূর্ণ সোজাও ছিল না; বরং কিছুটা ঢেউ খেলানো ছিল। তাঁর চুল কখনো কানের লতি পর্যন্ত, আবার কখনো কাঁধ পর্যন্ত ঝুলে থাকত। ইন্তেকালের সময় তাঁর মাথা ও দাড়িতে মাত্র সামান্য কয়েকটি চুল পেকেছিল।

৩. চোখ ও ভ্রু:
তাঁর চোখ দুটি ছিল আয়তাকার ও অত্যন্ত আকর্ষণীয়। চোখের মণি ছিল গাঢ় কালো এবং চোখের সাদা অংশে হালকা লালচে আভা ছিল। চোখের পাপড়িগুলো ছিল দীর্ঘ ও ঘন। তাঁর ভ্রু দুটি ছিল ধনুকের মতো বাঁকানো এবং ঘন, তবে একটির সাথে অন্যটি জোড়া লাগানো ছিল না।

৪. দেহকাঠামো ও মোহরে নবুওয়াত:
তাঁর বুক ছিল প্রশস্ত এবং দুই কাঁধের মধ্যবর্তী স্থান ছিল বেশ চওড়া। তাঁর দুই কাঁধের মাঝখানে পিঠের ওপর একটি বিশেষ মাংসপিণ্ড ছিল, যাকে ‘মোহরে নবুওয়াত’ (নবুওয়াতের সিলমোহর) বলা হতো। এটি ছিল কবুতরের ডিমের মতো হালকা লালচে রঙের এবং এর চারপাশে কিছু লোম ছিল। এটি ছিল তাঁর শেষ নবি হওয়ার অন্যতম নিদর্শন।

৫. হাঁটার ধরন:
তিনি অত্যন্ত তেজস্বী ও দ্রুত পায়ে হাঁটতেন। হাঁটার সময় তিনি কিছুটা সামনের দিকে ঝুঁকে হাঁটতেন, মনে হতো যেন তিনি কোনো উঁচু জায়গা থেকে নিচের দিকে নামছেন। তিনি অহংকারের সাথে বুক ফুলিয়ে বা অলসভাবে হাঁটতেন না।

সারসংক্ষেপ:
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর চেহারা ও ব্যক্তিত্ব ছিল এতটাই সম্মোহনী যে, যে কেউ তাঁকে প্রথমবার দেখলে সম্ভ্রমে অভিভূত হয়ে যেত, আর যে তাঁর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে মিশত, সে তাঁকে নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবেসে ফেলত। বিখ্যাত সাহাবি বারা বিন আযেব (রা.) নবিজির রূপের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন:
مَا رَأَيْتُ مِنْ ذِي لِمَّةٍ فِي حُلَّةٍ حَمْرَاءَ أَحْسَنَ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
অর্থ: “লাল চাদর পরিহিত অবস্থায় বাবরি চুলবিশিষ্ট রাসুলুল্লাহ (স.)-এর চেয়ে অধিক সুন্দর কোনো মানুষ আমি জীবনে দেখিনি।” (সহিহ বুখারি)

٨- تحدث عن غزوة بدر ثم بين سببها مع بيان أهميتها في الإسلام-

[৮. বদর যুদ্ধ সম্পর্কে বিস্তারিত লেখ। অতঃপর ইসলামে ইহার গুরুত্ব ও কারণ বিস্তারিত বর্ণনা কর।]

বদর যুদ্ধের পটভূমি ও কারণ:
বদর যুদ্ধ হলো ইসলাম ও কুফরের মধ্যকার প্রথম এবং সবচেয়ে নির্ণায়ক সশস্ত্র সংগ্রাম। এটি দ্বিতীয় হিজরির ১৭ই রমজান (৬২৪ খ্রিষ্টাব্দ) মদিনা থেকে প্রায় ৮০ মাইল দূরে ‘বদর’ নামক প্রান্তরে সংঘটিত হয়।
মুসলমানরা যখন মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় যান, তখন তারা তাদের ঘরবাড়ি, ধনসম্পদ সবকিছু মক্কায় ফেলে যেতে বাধ্য হন। মক্কার কুরাইশরা মুসলমানদের সেই ফেলে আসা সম্পদ অন্যায়ভাবে দখল করে ব্যবসা-বাণিজ্যে লাগিয়ে দেয়। দ্বিতীয় হিজরিতে মক্কার কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান একটি বিশাল বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে সিরিয়া থেকে মক্কায় ফিরছিল। এই কাফেলায় মুসলমানদের লুণ্ঠিত সম্পদও ছিল।
নবিজি (স.) মুসলমানদের লুণ্ঠিত অধিকার আদায়ের জন্য এই কাফেলাটিকে বাধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু আবু সুফিয়ান মুসলমানদের এই প্রস্তুতির কথা জানতে পেরে পথ পরিবর্তন করে মক্কায় খবর পাঠায়। খবর পেয়ে মক্কার কাফিররা আবু জাহেলের নেতৃত্বে প্রায় ১,০০০ সুসজ্জিত সৈন্য, ১০০টি ঘোড়া এবং প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মদিনার দিকে অগ্রসর হয়। রাসুলুল্লাহ (স.) মাত্র ৩১৩ জন প্রায় নিরস্ত্র সাহাবি (যাদের কাছে মাত্র ২টি ঘোড়া ও ৭০টি উট ছিল) নিয়ে বদর প্রান্তরে উপস্থিত হন। এভাবেই বদর যুদ্ধের সূচনা হয়।

বদর যুদ্ধের গুরুত্ব ও তাৎপর্য:
ইসলামের ইতিহাসে বদর যুদ্ধের গুরুত্ব অপরিসীম। নিচে এর কয়েকটি প্রধান গুরুত্ব তুলে ধরা হলো:

১. হক ও বাতিলের পার্থক্যকারী (ইয়াওমুল ফুরকান):
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা এই যুদ্ধকে ‘ফুরকান’ বা সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী দিন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। কারণ এই যুদ্ধের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, ইসলামই হলো চূড়ান্ত সত্য। আল্লাহ বলেন:
وَمَا أَنزَلْنَا عَلَىٰ عَبْدِنَا يَوْمَ الْفُرْقَانِ يَوْمَ الْتَقَى الْجَمْعَانِ
অর্থ: “এবং আমি আমার বান্দার প্রতি যা নাজিল করেছিলাম ফয়সালার দিন, যেদিন দুই দল পরস্পরের সম্মুখীন হয়েছিল।” (সূরা আনফাল: ৪১)

২. ফেরেশতাদের মাধ্যমে গায়েবি সাহায্য:
বদর প্রান্তরে মুসলমানদের সংখ্যা ও সমরাস্ত্র ছিল একেবারেই নগণ্য। নবিজি (স.) আল্লাহর দরবারে অঝোরে কেঁদে সাহায্য প্রার্থনা করেন। আল্লাহ তা’আলা হাজার হাজার ফেরেশতা পাঠিয়ে মুসলমানদের গায়েবি সাহায্য করেন। কুরআনে বলা হয়েছে:
وَلَقَدْ نَصَرَكُمُ اللَّهُ بِبَدْرٍ وَأَنتُمْ أَذِلَّةٌ ۖ فَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
অর্থ: “নিশ্চয়ই আল্লাহ বদরের যুদ্ধে তোমাদের সাহায্য করেছেন, অথচ তোমরা ছিলে দুর্বল। অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হতে পারো।” (সূরা আলে-ইমরান: ১২৩)

৩. কুরাইশদের দম্ভ চূর্ণ ও নেতাদের পতন:
এই যুদ্ধে ইসলাম ও মুসলমানদের চরম শত্রু আবু জাহেল, উমাইয়া ইবনে খালাফ, উতবা, শায়বাসহ কুরাইশদের ৭০ জন শীর্ষ নেতা নিহত হয় এবং ৭০ জন বন্দি হয়। এর ফলে মক্কার কুরাইশদের মেরুদণ্ড ভেঙে যায় এবং তাদের অহংকার চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। অপরপক্ষে মাত্র ১৪ জন সাহাবি শাহাদাত বরণ করেন।

৪. ইসলামি রাষ্ট্রের ভিত্তি মজবুত হওয়া:
বদর যুদ্ধের অভাবনীয় বিজয়ের ফলে মদিনায় নবপ্রতিষ্ঠিত ইসলামি রাষ্ট্রের মর্যাদা বহুগুণ বেড়ে যায়। আরবের অন্যান্য গোত্র এবং মদিনার মুনাফিক ও ইহুদিরা বুঝতে পারে যে মুসলমানরা এখন একটি অপ্রতিরোধ্য শক্তি। এই যুদ্ধ মুসলমানদের মনে প্রবল আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করে, যা পরবর্তী সকল বিজয়ের ভিত রচনা করেছিল।

مجموعة (ب) [খ-বিভাগ]

الملاحظة: أجب عن أربعة من مجموعة (ب) (যেকোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও)

٩- بين تاريخ نزول الوحي-

[৯. অহী নাযিলের ইতিহাস বর্ণনা কর।]

অহী নাযিলের ইতিহাস:
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বয়স যখন ৪০ বছরের কাছাকাছি, তখন তিনি মানুষের কোলাহল থেকে দূরে মক্কার অদূরে ‘হেরা’ গুহায় আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকতে শুরু করেন। এ সময় তিনি ঘুমে সত্য স্বপ্ন (রুইয়ায়ে সাদেকা) দেখতেন, যা ভোরের আলোর মতো সত্য হয়ে দেখা দিত।
অবশেষে নবুওয়াতের প্রথম বছর (৬১০ খ্রিষ্টাব্দ) পবিত্র রমজান মাসে নবিজি (স.) হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন থাকাবস্থায় ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) আল্লাহর পক্ষ থেকে অহী নিয়ে তাঁর কাছে আসেন। জিবরাইল (আ.) তাঁকে বললেন, “পড়ুন।” নবিজি (স.) বললেন, “আমি তো পড়তে জানি না।” তখন জিবরাইল (আ.) তাঁকে জড়িয়ে ধরে তিনবার প্রবল চাপ দেন। এরপর জিবরাইল (আ.) সূরা আলাকের প্রথম ৫টি আয়াত পাঠ করেন:
اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ
অর্থ: “পড়ুন আপনার রব্বের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা আলাক: ১)
অতঃপর নবিজি (স.) আয়াতগুলো মুখস্থ করে কাঁপতে কাঁপতে ঘরে ফিরে স্ত্রী খাদিজা (রা.)-কে বললেন, “আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও।” খাদিজা (রা.) তাঁকে সান্ত্বনা দেন এবং তাঁর চাচাতো ভাই ওয়ারাকা বিন নওফেলের কাছে নিয়ে যান, যিনি তাঁকে নিশ্চিত করেন যে তিনিই শেষ নবি। এভাবেই পৃথিবীতে কুরআন বা অহী নাযিলের সূচনা হয়।

١٠- تحدث عن حلف الفضول-

[১০. হিলফুল ফুজুল সম্পর্কে আলোচনা কর।]

হিলফুল ফুজুল (حلف الفضول):
‘হিলফুল ফুজুল’ হলো প্রাক-ইসলামি যুগে মক্কায় গঠিত একটি শান্তিসংঘ বা চুক্তি। নবুওয়াতের পূর্বে ‘ফিজারের যুদ্ধ’ নামক এক অন্যায় যুদ্ধে ব্যাপকভাবে জানমালের ক্ষতি হওয়ার পর মক্কার কিছু বিবেকবান মানুষের মনে শান্তি প্রতিষ্ঠার তাগিদ অনুভূত হয়।
প্রেক্ষাপট: ইয়েমেনের যাবিদ গোত্রের এক ব্যবসায়ী মক্কায় এসে আস বিন ওয়াইল নামক এক কুরাইশ নেতার কাছে কিছু পণ্য বিক্রি করে। কিন্তু আস বিন ওয়াইল তার পাওনা টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। অসহায় লোকটি তখন আবু কুবাইস পাহাড়ে দাঁড়িয়ে কুরাইশদের সাহায্য প্রার্থনা করে।
গঠন: এই অবিচার দেখে জুবায়ের ইবনে আবদুল মুত্তালিবের আহ্বানে আবদুল্লাহ ইবনে জুদআনের বাড়িতে মক্কার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা মিলিত হন এবং একটি শান্তিসংঘ গঠন করেন। নবিজি (স.) তখন একজন যুবক এবং তিনিও এতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন।
অঙ্গীকার: তারা শপথ করেন যে, মক্কায় কোনো মজলুম (অত্যাচারিত) ব্যক্তি দেখলে তারা সংঘবদ্ধভাবে তার সাহায্যে এগিয়ে আসবেন এবং জালিমের কাছ থেকে তার পাওনা আদায় করে দেবেন। ইসলাম গ্রহণের পরও নবিজি (স.) এই সংঘের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছিলেন, “ইসলামের যুগেও যদি আমাকে এমন কোনো চুক্তির দিকে ডাকা হতো, আমি অবশ্যই তাতে সাড়া দিতাম।” (সীরাতে ইবনে হিশাম)

١١- عرف الاسراء والمعراج-

[১১. মিরাজ ও ইসরা এর পরিচয় দাও।]

মিরাজ ও ইসরা এর পরিচয়:
ইসরা (الإسراء): ‘ইসরা’ শব্দের অর্থ হলো রাতের বেলায় ভ্রমণ করানো। নবুওয়াতের দ্বাদশ বা একাদশ বছরে এক রাতে আল্লাহ তা’আলা তাঁর প্রিয় হাবিব মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সশরীরে ‘বোরাক’ নামক ঐশী বাহনে করে মক্কার মসজিদে হারাম থেকে ফিলিস্তিনের মসজিদে আকসায় ভ্রমণ করান। এই নৈশভ্রমণকে ‘ইসরা’ বলা হয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন:
سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَىٰ بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى
অর্থ: “পবিত্র সেই সত্তা, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে ভ্রমণ করিয়েছেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত।” (সূরা বনি ইসরাইল: ১)
মিরাজ (المعراج): ‘মিরাজ’ শব্দের অর্থ ঊর্ধ্বগমন বা সিঁড়ি। মসজিদে আকসায় সকল নবি-রাসুলের ইমামতি করার পর জিবরাইল (আ.)-এর সাথে নবিজি (স.)-এর আকাশ পানে ঊর্ধ্বগমনকে ‘মিরাজ’ বলা হয়। মিরাজে তিনি সাত আসমান ভেদ করে সিদরাতুল মুনতাহা পার হয়ে আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্যে পৌঁছান। সেখানে তিনি জান্নাত-জাহান্নাম পরিদর্শন করেন এবং উম্মতের জন্য দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের উপহার নিয়ে দুনিয়ায় ফিরে আসেন। নবিজির (স.) নবুওয়াতের এটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ মোজেযা।

١٢- بين عن الهجرة الى الحبشة-

[১২. হাবশায় হিজরত সম্পর্কে বর্ণনা দাও।]

হাবশায় হিজরত:
নবুওয়াতের পঞ্চম বছর। মক্কায় ইসলাম গ্রহণকারী অসহায় মুসলমানদের ওপর কুরাইশদের অকথ্য নির্যাতন যখন চরম আকার ধারণ করে, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের ঈমান ও প্রাণ রক্ষার জন্য হাবশায় (বর্তমান ইথিওপিয়া) হিজরত করার নির্দেশ দেন। নবিজি (স.) বলেন, “হাবশায় একজন ন্যায়পরায়ণ বাদশা (নাজ্জাশি) আছেন, যাঁর রাজ্যে কারও ওপর জুলুম করা হয় না।”
প্রথম হিজরত: নবিজির নির্দেশে প্রথমে ১১ জন পুরুষ এবং ৪ জন নারী গোপনে হাবশায় পাড়ি জমান। যার মধ্যে হযরত উসমান (রা.) এবং তাঁর স্ত্রী, নবিজির কন্যা রুকাইয়া (রা.) ছিলেন।
দ্বিতীয় হিজরত: কিছুকাল পর গুজব ছড়ায় যে মক্কার সবাই মুসলমান হয়ে গেছে। এই খবর শুনে তারা মক্কায় ফিরে আসেন, কিন্তু খবরটি মিথ্যা ছিল এবং নির্যাতন আরও বেড়ে যায়। তখন নবিজি (স.)-এর নির্দেশে দ্বিতীয় দফায় ৮৩ জন পুরুষ ও ১৮ জন নারী হাবশায় হিজরত করেন।
কুরাইশরা মুসলমানদের ফেরত আনার জন্য আমর ইবনুল আসকে প্রচুর উপঢৌকনসহ নাজ্জাশির দরবারে পাঠায়। কিন্তু হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব (রা.) বাদশার সামনে ইসলামের সৌন্দর্যের কথা তুলে ধরেন এবং সূরা মারইয়াম তিলাওয়াত করেন। নাজ্জাশি কেঁদে ফেলেন এবং মুসলমানদের ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানান। এভাবেই হাবশা মুসলমানদের জন্য প্রথম নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়।

١٣- ابحث عن غزوة تبوك-

[১৩. তাবুক যুদ্ধ সম্পর্কে বর্ণনা দাও।]

তাবুক যুদ্ধ:
তাবুক যুদ্ধ হলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে সশরীরে অংশগ্রহণ করা সর্বশেষ যুদ্ধ (গাযওয়া), যা নবম হিজরির রজব মাসে সংঘটিত হয়।
কারণ: রোমান (বাইজেন্টাইন) সম্রাট হিরাক্লিয়াস মদিনা আক্রমণ করে ইসলামি রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার জন্য সিরিয়া সীমান্তে বিপুল সৈন্য সমাবেশ করেছে বলে খবর আসে। তৎকালীন বিশ্বের সুপারপাওয়ার রোমানদের প্রতিহত করার জন্য নবিজি (স.) যুদ্ধের ডাক দেন।
প্রেক্ষাপট (জাইশুল উসরা): সময়টি ছিল প্রচণ্ড গরমের এবং মদিনায় তখন খরা চলছিল, আর খেজুর পাকার সময় ছিল। এটি ছিল মুসলমানদের জন্য বড় পরীক্ষার সময়। আল্লাহ একে কুরআনে ‘কঠিন সময়’ বলেছেন। অনেক মুনাফিক যুদ্ধে যেতে অস্বীকৃতি জানায়। কিন্তু হযরত আবু বকর, উসমান, উমর (রা.) সহ মুমিনরা অকাতরে সম্পদ দান করেন।
নবিজি (স.) ৩০ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে মদিনা থেকে অনেক দূরে সিরিয়া সীমান্তের ‘তাবুক’ নামক স্থানে উপস্থিত হন। কিন্তু মুসলমানদের বিশাল বাহিনীর খবর শুনে রোমানদের মনে আল্লাহ ভীতির সঞ্চার করেন এবং তারা ভয়ে অগ্রসর হয়নি। কোনো রক্তপাত ছাড়াই নবিজি (স.) সেখানে ২০ দিনের মতো অবস্থান করেন এবং আশপাশের গোত্রগুলোর সাথে সন্ধি করে বিজয়ী বেশে মদিনায় ফিরে আসেন। এই যুদ্ধের মাধ্যমে সমগ্র আরবে ইসলামি রাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

١٤- اكتب عن اهل بيت النبي (صلعم)-

[১৪. আহলে বাইতে নবি (স.) সম্পর্কে বিবরণ লেখ।]

আহলে বাইতে নবি (স.):
‘আহলে বাইত’ (أهل البيت) বলতে সাধারণত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিবার, বংশধর এবং ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনকে বোঝায়। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়, যাঁদের জন্য সদকা ও যাকাত গ্রহণ করা চিরতরে হারাম, তাঁরাই মূলত আহলে বাইত। এর মধ্যে রয়েছেন— বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিব গোত্রের মুমিন সদস্যগণ, নবিজির (স.) পবিত্র স্ত্রীগণ (উম্মাহাতুল মুমিনিন) এবং তাঁর সন্তান-সন্ততিরা।
বিশেষভাবে ‘আহলে বাইত’ বলতে হযরত আলী (রা.), ফাতেমা (রা.) এবং তাঁদের দুই নয়নের মণি হযরত হাসান (রা.) ও হুসাইন (রা.)-কে বোঝানো হয়। এক হাদিসে এসেছে, নবিজি (স.) এই চারজনকে নিজের চাদরে আবৃত করে বলেছিলেন, “হে আল্লাহ! এরা আমার আহলে বাইত।” (সহিহ মুসলিম)
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা তাঁদের পবিত্রতার ঘোষণা দিয়ে বলেছেন:
إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيُذْهِبَ عَنكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا
অর্থ: “হে নবি পরিবার! আল্লাহ তো চান তোমাদের থেকে সব ধরনের অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে পূর্ণরূপে পবিত্র করতে।” (সূরা আহযাব: ৩৩)
উম্মতে মুসলিমার ওপর আহলে বাইতকে ভালোবাসা এবং তাঁদের সম্মান করা অপরিহার্য কর্তব্য। বিদায় হজ্জের ভাষণে নবিজি (স.) আহলে বাইতের অধিকারের বিষয়ে উম্মতকে বিশেষভাবে সতর্ক করে গেছেন।

١٥- علق: بنو قريضة-

[১৫. বনু কুরায়জা সম্পর্কে একটি টীকা লেখ।]

বনু কুরায়জা (بنو قريظة):
‘বনু কুরায়জা’ ছিল মদিনায় বসবাসকারী ইহুদিদের তিনটি প্রধান গোত্রের মধ্যে অন্যতম একটি গোত্র। নবিজি (স.) মদিনায় আসার পর মদিনা সনদের মাধ্যমে তাদের সাথে শান্তি ও প্রতিরক্ষার চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন।
বিশ্বাসঘাতকতা: পঞ্চম হিজরিতে যখন মক্কার কুরাইশ ও আরবের অন্যান্য গোত্র মিলে দশ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে মদিনা আক্রমণ করে (যা খন্দক বা আহযাবের যুদ্ধ নামে পরিচিত), তখন বনু কুরায়জা মুসলমানদের সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করে। তারা চুক্তি ভঙ্গ করে গোপনে শত্রুপক্ষের সাথে হাত মেলায় এবং মদিনার ভেতরে মুসলমানদের ওপর আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়, যা ছিল রাষ্ট্রের প্রতি রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল।
শাস্তি: খন্দকের যুদ্ধ শেষে আল্লাহ মুসলমানদের সাহায্য করেন এবং শত্রুরা পালিয়ে যায়। এরপর আল্লাহর নির্দেশে নবিজি (স.) বনু কুরায়জাকে অবরোধ করেন। ২৫ দিন পর তারা আত্মসমর্পণ করে এবং নিজেদের পুরোনো মিত্র সা’দ বিন মুআয (রা.)-কে তাদের বিচারক হিসেবে মেনে নেয়। সা’দ (রা.) বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি হিসেবে ইহুদিদের নিজস্ব ধর্মগ্রন্থ তাওরাতের বিধান অনুযায়ী তাদের যুদ্ধক্ষম পুরুষদের মৃত্যুদণ্ড এবং নারী ও শিশুদের বন্দি করার রায় দেন। নবিজি (স.) বলেন, “তুমি আল্লাহর বিধান অনুযায়ীই ফয়সালা করেছো।” এর মাধ্যমে মদিনা সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাসঘাতক ইহুদিদের হাত থেকে মুক্ত হয়।

١٦- تحدث عن حجة الوداع-

[১৬. বিদায় হজ্জ সম্পর্কে আলোচনা কর।]

বিদায় হজ্জ:
দশম হিজরিতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনে প্রথমবারের মতো এবং সর্বশেষ হজ্জ পালন করেন, যা ইসলামের ইতিহাসে ‘বিদায় হজ্জ’ নামে পরিচিত। নবিজি (স.) যেহেতু বুঝতে পেরেছিলেন তাঁর দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে, তাই তিনি এই হজ্জের সময় সাহাবিদের কাছ থেকে বিদায় নেন। প্রায় এক লক্ষ বা এক লক্ষ চুয়াল্লিশ হাজার সাহাবি এই হজ্জে অংশগ্রহণ করেন।
বিদায় হজ্জের ভাষণ: ৯ জিলহজ আরাফার ময়দানে নবিজি (স.) এক ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন, যা মানবাধিকারের সর্বশ্রেষ্ঠ দলিল হিসেবে বিবেচিত। এই ভাষণের কিছু উল্লেখযোগ্য দিক হলো:
১. জানমালের পবিত্রতা: “আজকের এই দিন ও এই মাসের মতো তোমাদের রক্ত, সম্পদ ও সম্মান একে অপরের জন্য পবিত্র (حرام)।”
২. জাহেলিয়াতের রীতিনীতি বাতিল: “জাহেলি যুগের সকল কুসংস্কার ও রক্তের দাবি আজ আমার পায়ের নিচে পিষ্ট করা হলো।”
৩. সুদ বাতিল: সকল প্রকার সুদ হারাম ঘোষণা করা হলো।
৪. নারীর অধিকার: “নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। তাদের ওপর তোমাদের যেমন অধিকার আছে, তোমাদের ওপরও তাদের অধিকার আছে।”
৫. সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব: “সব মুসলমান ভাই ভাই। তাকওয়া ছাড়া কোনো আরবের ওপর অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই।”
৬. কুরআন ও সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা: “আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি— আল্লাহর কিতাব ও তাঁর নবির সুন্নাহ। এ দুটি আঁকড়ে ধরলে তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না।”
ভাষণের শেষে আল্লাহ তা’আলা ওহী নাজিল করেন:
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا
অর্থ: “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের ওপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।” (সূরা মায়িদা: ৩)

Follow Our Facebook Page
দ্রুত নতুন বই পেতে যুক্ত থাকুন
Follow Now