Al-Madkhal Ila Ulumil Quran (Code: 201101) – ২০২২ প্রশ্ন ও উত্তর
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২২ এর আল-কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের আল-মাদখাল ইলা উলুমিল কুরআন (المدخل إلى علوم القرآن) বিষয়ের সম্পূর্ণ উত্তরমালা।
বিঃদ্রঃ পরীক্ষার্থীদের সুবিধার্থে মূল প্রশ্নপত্রের ক ও খ অংশের সকল প্রশ্নের উত্তর নিচে ধারাবাহিকভাবে দেওয়া হলো।
مجموعة (الف) / (ক) অংশ — রচনামূলক (মান—১৫x৪=৬০)
১। [আল-কুরআনের সংজ্ঞা দাও। আল-কুরআনের নাম ও বিশেষণসমূহ উদাহরণসহ বর্ণনা কর।]
উত্তর:
আল-কুরআনের সংজ্ঞা:
আভিধানিক অর্থে ‘কুরআন’ (قرآن) শব্দটি قرأ (সে পড়লো) বা قرن (একত্রিত করা) থেকে উদ্ভূত। এর অর্থ হলো পঠিত বা একত্রিত করা।
পারিভাষিক অর্থে: “আল-কুরআন হলো মহান আল্লাহর সেই মোজেজাপূর্ণ কালাম, যা জিবরাইল (আ.) এর মাধ্যমে শেষ নবি মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর অবতীর্ণ হয়েছে, যা মুসহাফে (গ্রন্থে) লিপিবদ্ধ আছে, যা মুতাওয়াতির সূত্রে বর্ণিত হয়ে আমাদের কাছে পৌঁছেছে এবং যার তিলাওয়াত করা ইবাদত।”
আল-কুরআনের নামসমূহ:
কুরআনের বেশ কিছু মূল নাম রয়েছে। যেমন:
১. আল-কুরআন (القرآن) – সর্বাধিক পঠিত।
২. আল-কিতাব (الكتاب) – লিখিত গ্রন্থ। (যেমন: ذَلِكَ الْكِتَابُ لاَ رَيْبَ فِيهِ)
৩. আল-ফুরকান (الفرقان) – সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী। (যেমন: تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ)
৪. আয-যিকর (الذكر) – উপদেশ বা স্মরণ। (যেমন: إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ)
৫. আত-তানযীল (التنزيل) – অবতীর্ণ বা নাজিলকৃত।
আল-কুরআনের বিশেষণসমূহ (أوصاف):
আল্লাহ তায়ালা কুরআনের বহু গুণবাচক নাম বা বিশেষণ উল্লেখ করেছেন। যেমন:
১. হুদাঁ (هدى) – পথপ্রদর্শক।
২. শিফা (شفاء) – আত্মিক ব্যাধির আরোগ্য।
৩. রহমত (رحمة) – মুমিনদের জন্য দয়া।
৪. নূর (نور) – আলো। (যেমন: وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكُمْ نُورًا مُبِينًا)
৫. মুবারক (مبارك) – বরকতময় বা কল্যাণময়।
৬. মাজিদ (مجيد) – মহা সম্মানিত। (যেমন: بَلْ هُوَ قُرْآنٌ مَجِيدٌ)
২। [অহি এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ কী? ফেরেশতা ও নবিগণের প্রতি অহি প্রেরণের পদ্ধতি বিশদভাবে আলোচনা কর।]
উত্তর:
অহির আভিধানিক অর্থ: ‘অহি’ (وحي) শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো ইশারা করা, দ্রুত ইঙ্গিত করা, গোপনে কথা বলা বা ইলহাম করা।
পারিভাষিক অর্থ: ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়, “মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর মনোনীত নবি ও রাসুলদের কাছে শরীয়তের বিধান বা যে গায়েবি বাণী ফেরেশতার মাধ্যমে বা সরাসরি প্রেরণ করেন, তাকে অহি বলে।”
ফেরেশতাদের প্রতি অহি প্রেরণের পদ্ধতি:
আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদের কাছে দুইভাবে অহি বা নির্দেশ পাঠান:
১. আল্লাহ সরাসরি ফেরেশতাদের সাথে কথা বলেন এবং নির্দেশ দেন।
২. আল্লাহ ফেরেশতাদের অন্তরে তাঁর নির্দেশ ইলহাম করে বা ঢেলে দেন।
নবিগণের প্রতি অহি প্রেরণের পদ্ধতি (كيفية الوحي):
নবি-রাসুল বিশেষ করে আমাদের প্রিয়নবি (সা.) এর কাছে অহি নাজিল হওয়ার বেশ কয়েকটি পদ্ধতি ছিল:
১. ঘণ্টাধ্বনির মতো (صلصلة الجرس): এটি ছিল সবচেয়ে কঠিন পদ্ধতি। ঘণ্টার তীব্র আওয়াজের মতো অহির শব্দ আসত এবং তা রাসুল (সা.) এর মুখস্থ হয়ে যেত। শীতকালেও এতে রাসুল (সা.) ঘর্মাক্ত হয়ে যেতেন।
২. মানুষের রূপে (تمثل الملك رجلا): জিবরাইল (আ.) মানুষের রূপ ধরে আসতেন (যেমন সাহাবি দাহিয়াতুল কালবি (রা.) এর রূপ ধরে) এবং রাসুল (সা.)-কে আল্লাহর বাণী শোনাতেন।
৩. সত্য স্বপ্ন (الرؤيا الصادقة): রাসুল (সা.) ঘুমের ঘোরে যে স্বপ্ন দেখতেন, ভোরে তা ভোরের আলোর মতো সত্য হয়ে দেখা দিত।
৪. পর্দার আড়াল থেকে সরাসরি কথা বলা: আল্লাহ তায়ালা সরাসরি নবিদের সাথে কথা বলেছেন। যেমন, মুসা (আ.) এর সাথে তুর পাহাড়ে এবং মুহাম্মদ (সা.) এর সাথে মেরাজের রাতে।
৫. অন্তরে ফুঁকে দেওয়া (النفث في الروع): জিবরাইল (আ.) অদৃশ্য অবস্থায় রাসুল (সা.) এর অন্তরে অহির বাণী ঢেলে দিতেন।
৩। [অহি অস্বীকারকারীরা বলে যে, “কুরআন মুহাম্মদ (সা.) এঁর নিজের রচনা। কুরআনের অর্থ ও শৈলীর তিনিই উদ্ভাবক” – অকাট্য দলিল দ্বারা তাদের এই সন্দেহ অপনোদন কর।]
উত্তর:
ইসলামের শত্রুরা সব যুগেই দাবি করেছে যে কুরআন আল্লাহর বাণী নয়, বরং এটি মুহাম্মদ (সা.) এর নিজের বানানো। কিন্তু যৌক্তিক ও অকাট্য দলিল দ্বারা এই ভিত্তিহীন দাবি সহজেই খণ্ডন করা যায়:
- নিরক্ষরতা (أمية النبي): রাসুল (সা.) ছিলেন ‘উম্মি’ বা নিরক্ষর। তিনি কখনোই কারো কাছে পড়াশোনা করেননি বা কোনো গ্রন্থ পাঠ করেননি। একজন নিরক্ষর মানুষের পক্ষে এমন জ্ঞানগর্ভ ও নিখুঁত গ্রন্থ রচনা করা সম্পূর্ণরূপে অসম্ভব।
- ভাষাগত অলৌকিকতা (الإعجاز اللغوي): তৎকালীন আরবরা ছিল ভাষা ও সাহিত্যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। কুরআন তাদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছে অন্তত একটি সূরার মতো সূরা বানিয়ে আনতে। কিন্তু আরবের শ্রেষ্ঠ কবি-সাহিত্যিকরা মিলে শত চেষ্টা করেও কুরআনের সমকক্ষ একটি বাক্যও বানাতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। মুহাম্মদ (সা.) যদি নিজেই এর রচয়িতা হতেন, তবে অন্য আরবরা কেন তা পারল না?
- অতীত ও ভবিষ্যতের নিখুঁত সংবাদ: কুরআনে পূর্ববর্তী নবিদের এমন নিখুঁত ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে যা তৎকালীন আরবে কারো জানা ছিল না। এছাড়া ‘রোমানদের বিজয়’ সহ অনেক ভবিষ্যদ্বাণী কুরআনে করা হয়েছে, যা অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। মানুষের পক্ষে এমন নির্ভুল ভবিষ্যৎবাণী করা অসম্ভব।
- রাসুল (সা.) এর নিজের হাদিস ও কুরআনের পার্থক্য: রাসুল (সা.) এর নিজস্ব কথা বা ‘হাদিস’ এর ভাষারীতি এবং কুরআনের ভাষারীতির মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য বিদ্যমান। একজন মানুষের পক্ষে একই সাথে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি ভাষারীতিতে কথা বলা প্রমাণ করে যে কুরআন তাঁর নিজের কথা নয়, বরং তা আল্লাহর বাণী।
- বৈজ্ঞানিক তথ্যের নির্ভুলতা: কুরআনে বিশ্বজগত, ভ্রূণতত্ত্ব এবং সৃষ্টিরহস্য নিয়ে যেসব বৈজ্ঞানিক তথ্য দেওয়া হয়েছে, তা আধুনিক বিজ্ঞান মাত্র আজ আবিষ্কার করছে। ১৪০০ বছর আগে মরুভূমির একজন মানুষের পক্ষে এই তথ্যগুলো দেওয়া অলৌকিক বিষয় ছাড়া আর কিছুই নয়।
সুতরাং, এ কথা দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে কুরআন মুহাম্মদ (সা.) এর রচনা নয়, বরং এটি জগতসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহর সরাসরি নাজিলকৃত বাণী।
৪। [কুরআনের প্রথম ও শেষ অবতীর্ণ সম্পর্কে জানার উপকারিতা বর্ণনাপূর্বক কুরআনের প্রথম অবতীর্ণ সম্পর্কে আলোচনা কর।]
উত্তর:
কুরআনের সর্বপ্রথম অবতীর্ণ অংশ (أول ما نزل):
বিশুদ্ধ ও সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য মত অনুযায়ী, কুরআনের সর্বপ্রথম অবতীর্ণ আয়াতগুলো হলো সূরা আল-আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত। রাসুল (সা.) হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন থাকাকালীন জিবরাইল (আ.) এসে বলেন “পড়ুন”। তখন এই আয়াতগুলো নাজিল হয়:
اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ – خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ – اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ – الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ – عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ (সূরা আলাক: ১-৫)।
প্রথম ও শেষ অবতীর্ণ জানার উপকারিতা (فوائد المعرفة):
কুরআনের কোনটি আগে আর কোনটি পরে নাজিল হয়েছে, তা জানা উলুমুল কুরআনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর উপকারিতাগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- নাসিখ ও মানসুখ চেনা: ইসলামি শরিয়তের কোনো কোনো বিধান পরবর্তীতে রহিত (নাসখ) করা হয়েছে। কোনটি রহিতকারী আর কোনটি রহিতকৃত, তা জানার একমাত্র উপায় হলো আয়াতগুলোর অবতীর্ণ হওয়ার সময়কাল বা প্রথম-শেষ জানা।
- শরিয়ত প্রবর্তনের ক্রমবিকাশ অনুধাবন: আল্লাহ তায়ালা একবারে সব বিধান চাপিয়ে দেননি; বরং মানবজাতির অবস্থার উন্নতি ও মানসিকতার সাথে মিলিয়ে ধীরে ধীরে শরিয়ত দিয়েছেন। প্রথম ও শেষ অবতীর্ণ জানলে আল্লাহর এই মহান হিকমত ও ক্রমবিকাশ বোঝা যায় (যেমন: মদ হারাম করার পর্যায়গুলো)।
- সাহাবিদের কুরআন সংরক্ষণের প্রমাণ: প্রথম ও শেষ অবতীর্ণ আয়াত জানার মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, সাহাবায়ে কেরাম কুরআন সংরক্ষণে কতটা যত্নবান ছিলেন। তারা শুধু আয়াত মুখস্থ করেননি, বরং কোন আয়াত কবে, কখন, কোথায় নাজিল হয়েছে তাও নিখুঁতভাবে সংরক্ষণ করেছেন।
- কুরআনের ইতিহাস সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া: এর মাধ্যমে ইসলাম ও কুরআনের ঐতিহাসিক প্রামাণিকতা সম্পর্কে সন্দেহাতীত বিশ্বাস অর্জিত হয়।
৫। [جمع القرآن الكريم দ্বারা উদ্দেশ্য কী? রসূলুল্লাহ (সা.) এঁর যুগের جمع القرآن এর বিচিত্ররূপ বিস্তারিত বর্ণনা কর।]
উত্তর:
জমহুল কুরআন (جمع القرآن) এর উদ্দেশ্য:
‘জমহুল কুরআন’ বলতে কুরআনের একত্রিকরণ ও সংরক্ষণকে বোঝানো হয়। এর মূল উদ্দেশ্য দুটি:
১. حفظ في الصدور (বক্ষে সংরক্ষণ): স্মৃতিতে বা অন্তরে কুরআন মুখস্থ করে রাখা।
২. حفظ في السطور (লিপিতে সংরক্ষণ): পাতায় বা কোনো বস্তুর ওপর লিখে সংরক্ষণ করা।
রাসুল (সা.) এর যুগে কুরআন একত্রিকরণের বিচিত্র রূপ:
রাসুল (সা.) এর যুগে কুরআন সংরক্ষণের কাজটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও জোরালোভাবে হয়েছিল। এর প্রধান দুটি রূপ ছিল:
১. স্মৃতিতে সংরক্ষণ (جمع الحفظ):
তৎকালীন আরবরা অত্যন্ত প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিল। অহি নাজিল হওয়ামাত্র রাসুল (সা.) তা নিজে মুখস্থ করতেন এবং সাহাবিদের শোনাতেন। সাহাবিগণও তা সাথে সাথে মুখস্থ করে নিতেন এবং নামাজে ও অবসরে তিলাওয়াত করতেন। অসংখ্য সাহাবি সম্পূর্ণ কুরআনের হাফেজ ছিলেন, যাদেরকে ‘কুররা’ বলা হতো।
২. লিখিতভাবে সংরক্ষণ (جمع الكتابة):
শুধু মুখস্থ নয়, রাসুল (সা.) অহি লিখে রাখারও বিশেষ ব্যবস্থা করেছিলেন। তাঁর প্রায় ৪৩ জন নির্দিষ্ট ‘অহি-লেখক’ (كاتب الوحي) সাহাবি ছিলেন (যেমন: জায়েদ ইবনে সাবিত, উবাই ইবনে কাব, আলী (রা.) প্রমুখ)।
অহি নাজিল হলেই রাসুল (সা.) লেখকদের ডাকতেন এবং বলে দিতেন যে, এই আয়াতটি অমুক সূরার অমুক আয়াতের পর লেখো। তৎকালীন যুগে কাগজের অভাব থাকায় সাহাবিগণ সাধারণত নিচের বস্তুগুলোতে কুরআন লিখে রাখতেন:
– عسب (উসুব): খেজুর গাছের চওড়া ডাল।
– لخاف (লিখাফ): চ্যাপ্টা ও পাতলা সাদা পাথর।
– رقاع (রিকা): চামড়ার টুকরা।
– أقتاب (আকতাব): উটের জিন বা কাঠের টুকরা।
– عظام (ইযাম): পশুর চওড়া হাড় বা কাঁধের হাড়।
রাসুল (সা.) এর জীবদ্দশাতেই পুরো কুরআন এভাবে বিক্ষিপ্ত বস্তুতে লিখিত অবস্থায় এবং হাজারো সাহাবির বক্ষে সম্পূর্ণ সংরক্ষিত হয়েছিল।
৬। [মুফাসসিরকে যে সব নিয়মাবলি জানতে হয় সংক্ষেপে তা আলোচনা কর।]
উত্তর:
কুরআনের তাফসির করা অত্যন্ত কঠিন ও দায়িত্বপূর্ণ কাজ। যে কেউ চাইলেই তাফসির করতে পারে না। আল্লামা সুয়ুতি (রহ.) সহ অন্যান্য মুফাসসিরদের মতে, একজন যোগ্য মুফাসসির হতে হলে তাকে অন্তত ১৫টি শাস্ত্রে অগাধ জ্ঞান বা নিয়মাবলি জানতে হয়। সংক্ষেপে প্রধান বিষয়গুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
- ইলমুল লুগাহ (অভিধান শাস্ত্র): আরবি ভাষার প্রতিটি শব্দের সঠিক অর্থ ও তার উৎপত্তিগত বৈচিত্র্য সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান থাকতে হবে।
- ইলমুন নাহু (ব্যাকরণ শাস্ত্র): আরবি বাক্যগঠন, ই’রাব (যবর-যের-পেশ) এবং বাক্যের গঠনগত কারণে অর্থের কী পরিবর্তন হয়, তা বুঝতে হবে।
- ইলমুস সরফ (রূপতত্ত্ব): শব্দ কীভাবে গঠিত হয়, একবচন-বহুবচন এবং ধাতুমূলের জ্ঞান থাকা অত্যাবশ্যক।
- ইলমুল বালাগাত (অলংকার শাস্ত্র): এর তিনটি শাখা—মায়ানি, বায়ান ও বাদি সম্পর্কে পারদর্শী হতে হবে, যাতে কুরআনের রূপক, উপমা ও অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য বোঝা যায়।
- উসুলুদ্দীন বা আকিদাহ শাস্ত্র: ইসলামি বিশ্বাসের মূল ভিত্তিগুলো সম্পর্কে সুস্পষ্ট জ্ঞান থাকতে হবে।
- আসবাবুন নুযুল: কোন আয়াত কখন, কী প্রেক্ষাপটে বা কী কারণে নাজিল হয়েছে (শানে নুযুল) তা জানা অত্যন্ত জরুরি।
- নাসিখ ও মানসুখ: কুরআনের কোন বিধানগুলো রহিত হয়ে গেছে এবং কোনগুলো বহাল আছে, তা জানতে হবে।
- ইলমুল হাদিস ও উসুলুল ফিকহ: রাসুল (সা.) এর সুন্নাহ এবং ইসলামি আইনতত্ত্বের মূলনীতি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান থাকতে হবে।
এই শাস্ত্রগুলোতে পূর্ণ জ্ঞান অর্জনের পরই কেবল একজন ব্যক্তি কুরআনের তাফসির বা ব্যাখ্যা করার যোগ্যতা অর্জন করেন।
৭। [النسخ অর্থ কী? এর শর্ত কী কী? নাসখ এর গুরুত্ব ও নসখ জানার পদ্ধতি বিশদভাবে বর্ণনা কর।]
উত্তর:
নাসখ (النسخ) এর অর্থ:
আভিধানিক অর্থে নাসখ মানে রহিত করা, মুছে ফেলা, স্থানান্তর করা বা পরিবর্তন করা।
পারিভাষিক অর্থে, “পূর্ববর্তী কোনো ইসলামি শরিয়তের বিধানকে পরবর্তী কোনো অকাট্য শরিয়তের বিধান দ্বারা রহিত বা বাতিল করাকে নাসখ বলে।”
নাসখ এর শর্তসমূহ:
১. রহিতকৃত বিধানটি অবশ্যই শরিয়তের ব্যবহারিক নির্দেশ বা নিষেধ (ফিকহি বিধান) হতে হবে; বিশ্বাস বা ইতিহাসের ক্ষেত্রে নাসখ হয় না।
২. রহিতকারী দলিলটি অবশ্যই রহিতকৃত দলিলের সমপর্যায়ের বা তার চেয়ে শক্তিশালী হতে হবে।
৩. দুটি বিধানের মধ্যে সরাসরি সাংঘর্ষিক অবস্থা থাকতে হবে, যা কোনোভাবেই সমন্বয় করা সম্ভব নয়।
৪. রহিতকারী দলিলটি সময়ের দিক থেকে পরে অবতীর্ণ হতে হবে।
নাসখের গুরুত্ব:
নাসখ সম্পর্কে জানা মুফাসসির ও ফকিহদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। আলী (রা.) এক কাজিকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “তুমি কি নাসিখ ও মানসুখ সম্পর্কে জানো?” সে না বললে তিনি বলেন, “তুমি নিজেও ধ্বংস হবে, অন্যদেরও ধ্বংস করবে।” এটি না জানলে মানুষ এমন বিধানের ওপর আমল করবে, যা আল্লাহ বাতিল করে দিয়েছেন।
নাসখ জানার পদ্ধতি:
নাসখ বা রহিতকরণ নিজের খেয়ালখুশি বা অনুমান দিয়ে নির্ণয় করা যায় না। এটি জানার পদ্ধতি হলো:
১. রাসুল (সা.) এর সুস্পষ্ট বর্ণনা: রাসুল (সা.) যদি নিজে বলেন যে অমুক বিধানটি বাতিল হয়ে নতুন বিধান এসেছে। (যেমন: “আমি আগে তোমাদের কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম, এখন তোমরা তা করতে পারো”)।
২. সাহাবিদের ঐকমত্য বা বর্ণনা: কোনো নির্ভরযোগ্য সাহাবির বর্ণনা থেকে জানা যে এই আয়াতটি আগে এবং ঐ আয়াতটি পরে নাজিল হয়েছে।
৩. তারিখ বা সন নিশ্চিত হওয়া: ঐতিহাসিক প্রমাণ থেকে নিশ্চিতভাবে জানা যে দুটি সাংঘর্ষিক বিধানের মধ্যে কোনটি আগে এবং কোনটি পরে এসেছে।
৮। [الإعجاز এর আভিধানিক ও পারিভাষিক পরিচয় দাও। ইজাজুল কুরআন বিষয়ে আহলুস সুন্নাহ ও মুতাযিলার দৃষ্টিভঙ্গি বর্ণনা কর।]
উত্তর:
ইজাজ (الإعجاز) এর পরিচয়:
আভিধানিক অর্থে: অক্ষম করা, অপারগ করা বা হার মানানো।
পারিভাষিক অর্থে: “ইজাজুল কুরআন হলো কুরআনের এমন এক অলৌকিক ও অতুলনীয় বৈশিষ্ট্য, যার সমকক্ষ বা অনুরূপ কোনো কিছু তৈরি করতে সারা বিশ্বের মানুষ ও জিন জাতি চরমভাবে অক্ষম বা অপারগ।”
ইজাজুল কুরআন বিষয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি:
১. আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের দৃষ্টিভঙ্গি:
আহলুস সুন্নাহর আকিদা হলো, কুরআন তার নিজস্ব শক্তিতেই অলৌকিক (মুজিজা)। কুরআনের শব্দচয়ন, বাক্য গঠন, সাহিত্যমান, অন্তর্নিহিত অর্থ এবং গায়েবি সংবাদ এতটাই নিখুঁত ও মহান যে, কোনো সৃষ্ট জীবের পক্ষে স্বভাবতই এর সমকক্ষ কিছু তৈরি করা অসম্ভব। আল্লাহ তায়ালা মানুষদের এই চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন, কিন্তু তারা তাদের নিজস্ব অক্ষমতার কারণেই তা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
২. মুতাযিলাদের দৃষ্টিভঙ্গি (আকীদাতুস সারফাহ):
মুতাযিলা সম্প্রদায়ের (বিশেষ করে নায্যাম এর) মতে, কুরআনের ভাষা বা শব্দাবলি স্বভাবগতভাবে মানুষের সাধ্যের বাইরের কিছু নয়। আরবরা চাইলে এর সমকক্ষ সূরা বা বাক্য রচনা করতে পারত। কিন্তু যখন তারা তা রচনা করতে গেল, তখন আল্লাহ তায়ালা তাদের অন্তর থেকে সেই রচনা করার ক্ষমতা বা জ্ঞান ছিনিয়ে নিয়েছিলেন অথবা তাদেরকে অন্যদিকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। এই মতবাদকে তারা ‘সারফাহ’ (الصرفة – ফিরিয়ে নেওয়া) বলে।
আহলুস সুন্নাহ এই মতবাদকে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও বাতিল বলে গণ্য করেন। কারণ, কুরআনের শব্দ ও অর্থ নিজেই একটি অলৌকিক বিষয়, এখানে মানুষের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না।
مجموعة (ب) / (খ) অংশ — সংক্ষিপ্ত (মান—৫x৪=২০)
৯। ترتيب سور القرآن الكريم [কুরআনের সূরাসমূহের বিন্যাস।]
উত্তর: পবিত্র কুরআনে মোট ১১৪টি সূরা রয়েছে। এই সূরাগুলো বর্তমানে যে ক্রমে সাজানো আছে (যেমন সূরা ফাতিহার পর সূরা বাকারা, তারপর আল-ইমরান ইত্যাদি), এই বিন্যাস পদ্ধতি সম্পর্কে ওলামায়ে কেরামের দুটি মত রয়েছে। তবে সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য মত হলো, সূরাগুলোর এই বিন্যাস সম্পূর্ণরূপে ‘তাওকিফি’ অর্থাৎ আল্লাহর নির্দেশে ও অহির ভিত্তিতে রাসুল (সা.) কর্তৃক নির্ধারিত। জিবরাইল (আ.) প্রতি বছর রমজান মাসে রাসুল (সা.) এর সাথে বর্তমান ক্রম অনুসারেই কুরআন দোহরাই (রিভিশন) করতেন।
১০। عرف الحديث القدسى بالمثال [উদাহরণসহ হাদিসে কুদসির সংজ্ঞা দাও।]
উত্তর: যে হাদিসের ভাব বা মূল কথা সরাসরি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে (অহি বা স্বপ্নের মাধ্যমে) অবতীর্ণ হয়েছে, কিন্তু শব্দগুলো রাসুল (সা.) এর নিজস্ব, তাকে ‘হাদিসে কুদসি’ বলে। রাসুল (সা.) সাধারণত “আল্লাহ তায়ালা বলেছেন…” এভাবে তা বর্ণনা করেন।
উদাহরণ: রাসুল (সা.) বলেন, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন—”হে আমার বান্দাগণ! আমি জুলুমকে আমার নিজের ওপর হারাম করেছি এবং তোমাদের পরস্পরের মধ্যেও তা হারাম করেছি। সুতরাং তোমরা একে অপরের ওপর জুলুম কোরো না।” (সহিহ মুসলিম)
১১। أوضح تأويل قوله تعالى : إنا أنزلناه فى ليلة مباركة، إنا كنا منذرين [আয়াতের মর্ম স্পষ্ট কর: إنا أنزلناه فى ليلة مباركة…]
উত্তর: আলোচ্য আয়াতের অর্থ হলো: “নিশ্চয়ই আমি একে (কুরআনকে) এক বরকতময় রাতে অবতীর্ণ করেছি, নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী।” (সূরা আদ-দুখান: ৩)
মর্ম: এখানে ‘বরকতময় রাত’ বলতে রমজান মাসের ‘লাইলাতুল কদর’ বা শবেকদরকে বোঝানো হয়েছে। এই আয়াতের মর্ম হলো, আল্লাহ তায়ালা এই মহিমান্বিত ও বরকতময় রাতেই লওহে মাহফুজ (সুরক্ষিত ফলক) থেকে প্রথম আসমানের ‘বায়তুল ইজ্জত’-এ সম্পূর্ণ কুরআন একসাথে নাজিল করেন। এরপর משসেখান থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে রাসুল (সা.) এর ওপর তা অবতীর্ণ হয়।
১২। بين حكمة نزول القرآن الكريم بالتدريج [কুরআন কারীম ধীরে ধীরে অবতীর্ণ হওয়ার হিকমত বর্ণনা কর।]
উত্তর: কুরআন একসাথে নাজিল না হয়ে ২৩ বছর ধরে ধীরে ধীরে অবতীর্ণ হওয়ার পেছনে মহান আল্লাহর অনেক হিকমত রয়েছে:
১. অন্তরে প্রশান্তি দেওয়া: কাফিরদের বিরোধিতা ও অত্যাচারে রাসুল (সা.) যখন কষ্ট পেতেন, তখন নতুন আয়াত নাজিল করে আল্লাহ তাঁকে সান্ত্বনা ও শক্তি জোগাতেন (تثبيت فؤاد النبي)।
২. মুখস্থ ও আমল করা সহজ হওয়া: অল্প অল্প করে নাজিল হওয়ায় সাহাবিদের জন্য তা মুখস্থ করা এবং জীবনে বাস্তবায়ন করা খুব সহজ হয়েছিল।
৩. তাত্ক্ষণিক সমস্যার সমাধান: উদ্ভূত বিভিন্ন পরিস্থিতি, প্রশ্ন এবং সমস্যার তাত্ক্ষণিক জবাব দেওয়ার জন্যই কুরআন ধাপে ধাপে নাজিল হয়েছে。
৪. শরিয়তের বিধানের ক্রমবিকাশ: সমাজের কুপ্রথাগুলো (যেমন- মদ পান) রাতারাতি বন্ধ না করে ধাপে ধাপে হারাম করা হয়েছে, যাতে মানুষের জন্য তা মেনে নেওয়া সহজ হয়।
১৩। مواقع النسخ [النسخ এর স্থানসমূহ।]
উত্তর: শরিয়তের সকল বিষয়ে ‘নাসখ’ বা বিধান রহিতকরণ ঘটে না। নাসখ হওয়ার নির্দিষ্ট স্থান বা ক্ষেত্র রয়েছে। নাসখ কেবলমাত্র আমর ও নাহি (আদেশ ও নিষেধমূলক ব্যবহারিক বা ফিকহি বিধানের) ক্ষেত্রেই ঘটে।
আকাইদ (আল্লাহ, ফেরেশতা ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস), মৌলিক নৈতিক গুণাবলি, এবং অতীতের ইতিহাস বা কিসসা-কাহিনির ক্ষেত্রে কখনোই নাসখ বা রহিতকরণ হয় না। কারণ সত্য ঘটনা বা বিশ্বাস পরিবর্তনশীল নয়।
১৪। أقسام التفسير [তাফসির এর প্রকারসমূহ।]
উত্তর: উৎস ও পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে তাফসিরকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা যায়:
১. তাফসির বিল মাসুর (التفسير بالمأثور): যে তাফসির স্বয়ং কুরআনের অন্য আয়াত, রাসুল (সা.) এর হাদিস এবং সাহাবা ও তাবেঈদের উক্তির ওপর ভিত্তি করে করা হয়। এটি সবচেয়ে বিশুদ্ধ তাফসির। (যেমন: তাফসিরে ইবনে কাসির)।
২. তাফসির বির রায় (التفسير بالرأي): যে তাফসিরে মুফাসসির আরবি ভাষার জ্ঞান, ব্যাকরণ, শরিয়তের মূলনীতি এবং নিজস্ব গবেষণার (ইজতিহাদ) ওপর ভিত্তি করে ব্যাখ্যা করেন। এটি শরিয়তের সীমার মধ্যে থাকলে তা গ্রহণযোগ্য। (যেমন: তাফসিরে জালালাইন)।
১৫। ما المراد بالإعجاز اللغوى؟ [الإعجاز اللغوى দ্বারা উদ্দেশ্য কী?]
উত্তর: ‘আল-ইজাজুল লুগবি’ অর্থ হলো কুরআনের ভাষাগত বা সাহিত্যিক অলৌকিকতা। এর উদ্দেশ্য হলো, কুরআন মাজিদের আরবি ভাষা ও সাহিত্য এতটাই নিখুঁত, এর শব্দচয়ন এতই চমৎকার এবং এর বাক্যালংকার এতই উচ্চাঙ্গের যে, তৎকালীন আরবের শ্রেষ্ঠ বাগ্মী ও কবিরাও এর সামনে মাথা নত করতে বাধ্য হয়েছিল। মানুষের তৈরি কোনো সাহিত্যের পক্ষেই কুরআনের এই ঐশী ভাষার সমকক্ষ হওয়া সম্ভব নয়।
১৬। اكتب أسماء خمس مؤلفات فى علوم القرآن [علوم القرآن বিষয়ে রচিত পাঁচটি গ্রন্থের নাম লেখ।]
উত্তর: ‘উলুমুল কুরআন’ বা কুরআন বিজ্ঞানের ওপর রচিত প্রসিদ্ধ পাঁচটি গ্রন্থের নাম হলো:
১. আল-বুরহান ফি উলুমিল কুরআন (البرهان في علوم القرآن) — ইমাম বদরুদ্দীন আয-যারকাশি (রহ.)।
২. আল-ইতকান ফি উলুমিল কুরআন (الإتقان في علوم القرآن) — ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ুতি (রহ.)।
৩. মানাহিলুল ইরফান ফি উলুমিল কুরআন (مناهل العرفان في علوم القرآن) — শেখ মুহাম্মদ আব্দুল আযিম আয-যারকানি।
৪. মাবাহিস ফি উলুমিল কুরআন (مباحث في علوم القرآن) — শেখ মান্না আল-কাত্তান।
৫. ফাদাইলুল কুরআন (فضائل القرآن) — ইমাম ইবনে কাসির (রহ.)।






