Bangladesh Studies (Code: 201107) – ২০২১ প্রশ্ন ও উত্তর
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২১ এর আল-কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের বাংলাদেশ স্টাডিজ (Bangladesh Studies) বিষয়ের সম্পূর্ণ উত্তরমালা।
বিঃদ্রঃ শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে পরীক্ষায় আসা প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর ধারাবাহিকভাবে দেওয়া হলো।
مجموعة (الف) / (ক) অংশ — রচনামূলক প্রশ্ন (মান—১৫x৪=৬০)
১। [বাংলাদেশের স্বাধীনতার রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পটভূমি আলোচনা কর।]
উত্তর:
বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শোষণ-বঞ্চনার চূড়ান্ত বিস্ফোরণ। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী সীমাহীন বৈষম্য ও অত্যাচার শুরু করে। নিম্নে স্বাধীনতার পটভূমি আলোচনা করা হলো:
১. রাজনৈতিক পটভূমি:
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা সংখ্যাগরিষ্ঠ (৫৬%) হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও চাবিকাঠি ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে। বাঙালিরা যাতে ক্ষমতায় আসতে না পারে, সে জন্য নানা ষড়যন্ত্র করা হতো। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বাঙালিরা বিপুল ভোটে জয়ী হলেও খুব দ্রুতই কেন্দ্রীয় সরকার সে মন্ত্রিসভা বাতিল করে দেয়। এরপর ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি করে আইয়ুব খান দীর্ঘ সময় ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখে। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও তাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়নি। এই রাজনৈতিক বঞ্চনা ও বিশ্বাসঘাতকতাই বাঙালিদের স্বাধীনতার পথে ধাবিত করে।
২. অর্থনৈতিক পটভূমি:
পূর্ব পাকিস্তানের উৎপাদিত পাট ও চা রপ্তানি করে পাকিস্তান বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করত। কিন্তু সেই অর্থের খুব সামান্যই পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়নে ব্যয় করা হতো। বেশির ভাগ অর্থ পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্পায়ন, রাজধানী নির্মাণ ও সামরিক খাতে ব্যয় হতো। এক হিসাবে দেখা যায়, ১৯৫০ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে বিপুল পরিমাণ সম্পদ পাচার করা হয়েছে। এর ফলে পশ্চিম পাকিস্তান দিনে দিনে সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠলেও পূর্ব পাকিস্তান চরম দারিদ্র্যের মুখে পড়ে। অর্থনৈতিক বৈষম্যের এই চিত্র তুলে ধরেই ১৯৬৬ সালে ৬ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়েছিল।
৩. সামাজিক পটভূমি:
বাঙালিদের সব সময় দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হতো। সরকারি চাকরিতে, বিশেষ করে সামরিক বাহিনী ও প্রশাসনের উচ্চপদে বাঙালিদের নিয়োগ দেওয়া হতো না। চাকরি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানিদের প্রাধান্য দেওয়া হতো। এর ফলে বাঙালিদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও বঞ্চনাবোধ তৈরি হয়, যা স্বাধীনতার ভিত্তি রচনা করে।
৪. সাংস্কৃতিক পটভূমি:
সাংস্কৃতিক শোষণের প্রথম আঘাতটি আসে মাতৃভাষার ওপর। সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্র করা হয়। এর প্রতিবাদে ১৯৫২ সালে বাঙালি দামাল ছেলেরা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করে। ভাষা আন্দোলন শুধু ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠাই করেনি, বরং বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটায়। এরপর রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ করা, পহেলা বৈশাখ পালনে বাধা দেওয়াসহ নানাভাবে বাঙালি সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়। এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাঙালিরা রুখে দাঁড়ায়।
উপসংহার: মূলত রাজনৈতিক বঞ্চনা, অর্থনৈতিক শোষণ, সামাজিক বৈষম্য এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসন—এই চতুর্মুখী আক্রমণের হাত থেকে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই ১৯৭১ সালে বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
২। [বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীর অংশগ্রহণ সম্পর্কে আলোচনা কর।]
উত্তর:
যেকোনো দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো মোট জনসংখ্যার নারী ও পুরুষের সমান অংশগ্রহণ। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই নারী। দেশের অর্থনৈতিক চাকাকে সচল রাখতে ও জাতীয় আয় বৃদ্ধিতে নারীদের অংশগ্রহণ এখন অভাবনীয়। নিচে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রগুলো আলোচনা করা হলো:
- তৈরি পোশাক শিল্পে নারী (RMG Sector): বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো তৈরি পোশাক শিল্প, যা দেশের রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় খাত। এই খাতের প্রায় ৪০ লক্ষ শ্রমিকের মধ্যে ৬০-৭০ শতাংশই নারী। গ্রামীণ অভাবী ও সাধারণ নারীরা এই শিল্পের মাধ্যমে নিজেরা যেমন স্বাবলম্বী হচ্ছে, তেমনি দেশের জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে।
- কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারী: বাংলাদেশের কৃষিকাজের বিশাল একটি অংশ নারীরা সম্পাদন করে থাকে। ধান মাড়াই থেকে শুরু করে বীজ সংরক্ষণ, হাস-মুরগি পালন, গবাদিপশু পালন, ছাদবাগান, বাড়ির আঙিনায় শাক-সবজি চাষ ইত্যাদি কাজে নারীদের অবদান অসামান্য। গ্রামীণ অর্থনীতি টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প: কুটির শিল্প, নকশিকাঁথা, তাঁত শিল্প, হস্তশিল্প ও মৃৎশিল্পের সাথে গ্রামীণ নারীরা নিবিড়ভাবে জড়িত। এই শিল্পগুলোর উৎপাদিত পণ্য দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।
- ক্ষুদ্রঋণ ও আত্মকর্মসংস্থান: ব্র্যাক, গ্রামীণ ব্যাংক, আশা ইত্যাদি এনজিও-এর ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির প্রধান সুবিধাভোগী হলো নারীরা। ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে তারা ছোট ছোট ব্যবসা পরিচালনা করে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে এবং পরিবার ও সমাজকে দারিদ্র্যমুক্ত করছে।
- প্রশাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাত: বর্তমানে বাংলাদেশের নারীরা প্রশাসন, পুলিশ, সামরিক বাহিনী থেকে শুরু করে শিক্ষকতা, চিকিৎসা ও ব্যাংকিং খাতে দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করছে। নারী ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখছেন।
- প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স: বর্তমানে প্রচুর বাংলাদেশি নারী মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গৃহকর্মী, নার্স ও শ্রমিক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তাদের প্রেরিত রেমিট্যান্স দেশের অর্থনৈতিক ভিত মজবুত করছে।
উপসংহার: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা এবং একটি উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পেছনে নারীদের অবদান অপরিসীম। নারী সমাজ আজ আর ঘরে আবদ্ধ নেই; বরং তারা পুরুষের পাশাপাশি সমানতালে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অংশগ্রহণ করছে।
৩। [“বঙ্গবন্ধু ও তাঁর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ” শীর্ষক একটি প্রবন্ধ লিখ।]
উত্তর:
বঙ্গবন্ধু ও তাঁর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ
ভূমিকা: হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। তাঁর বলিষ্ঠ ও দূরদর্শী নেতৃত্বেই বাঙালি জাতি পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে ছিনিয়ে এনেছিল লাল-সবুজের স্বাধীন পতাকা। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ। মাত্র ১৮ মিনিটের এই অলিখিত ভাষণটি ঘুমন্ত বাঙালি জাতিকে জাগিয়ে তুলেছিল এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রেরণা জুগিয়েছিল।
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক পটভূমি: বঙ্গবন্ধু তাঁর ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬ দফা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান—প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেও পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে। তারা জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করলে সারা বাংলায় প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। এই উত্তাল পরিস্থিতির মাঝেই আসে ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ।
৭ মার্চের ভাষণের প্রেক্ষাপট: পাকিস্তান সরকার ১৯৭১ সালের ১লা মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করলে ক্ষুব্ধ বাঙালি অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে। পুরো দেশ অচল হয়ে পড়ে। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা বাঙালিদের ওপর গুলি চালায় এবং অনেক নিরীহ মানুষ নিহত হয়। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক বিশাল জনসভার ডাক দেন।
ভাষণের মূল বিষয়বস্তু: ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু এক বিশাল জনসমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। এই ভাষণে তিনি মূলত চারটি শর্ত আরোপ করেছিলেন:
- অবিলম্বে সামরিক আইন বা মার্শাল ল প্রত্যাহার করতে হবে।
- সামরিক বাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে।
- গণহত্যার তদন্ত করতে হবে।
- নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।
বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে আরও বলেন, “রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব, ইনশাআল্লাহ।” ভাষণের শেষ পর্যায়ে তিনি ঘোষণা করেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”
৭ মার্চের ভাষণের গুরুত্ব ও তাৎপর্য: ৭ মার্চের ভাষণ ছিল মূলত বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরোক্ষ ঘোষণা। এই ভাষণের মাধ্যমে দিকভ্রান্ত বাঙালি জাতি যুদ্ধের স্পষ্ট দিকনির্দেশনা পেয়ে যায়। এটি শুধু একটি ভাষণ ছিল না, এটি ছিল একটি জাতির মুক্তির সনদ। বঙ্গবন্ধু এই ভাষণের মাধ্যমে জনগণকে যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন। এই ভাষণের প্রতিটি শব্দ ছিল এক একটি বুলেট, যা আপামর জনতাকে মুক্তিযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেছিল। ২০১৭ সালের ৩০শে অক্টোবর ইউনেস্কো (UNESCO) এই ভাষণটিকে ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টার’ (Memory of the World International Register) এ অন্তর্ভুক্ত করে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে, যা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়।
উপসংহার: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর ৭ মার্চের ভাষণ একই সুতোয় গাঁথা। এই ভাষণের মাধ্যমেই তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতাই নন, তিনি একটি রাষ্ট্রের রূপকার। তাঁর বজ্রকণ্ঠের আহ্বানে সাড়া দিয়েই বাঙালি জাতি দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জন করেছে একটি স্বাধীন দেশ—বাংলাদেশ। যতদিন এই বাংলাদেশ থাকবে, ততদিন বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ চির অম্লান হয়ে থাকবে।
৪। [‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ এবং ‘স্বাধীন বাংলার ৬ দফা আন্দোলন’ সম্পর্কে যা জান সংক্ষেপে লেখ।]
উত্তর:
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা (১৯৬৮):
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ১৯৬৮ সালের ৩ জানুয়ারি পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৩৫ জন বাঙালি সেনা কর্মকর্তা, সিএসপি অফিসার ও বিশিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করে, যা ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ নামে পরিচিত।
মামলার আনুষ্ঠানিক নাম ছিল “রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান এবং অন্যান্য”। পাকিস্তান সরকারের অভিযোগ ছিল যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আসামিরা ভারতের আগরতলায় বসে ভারতের সহায়তায় সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্র করছিল। মূলত ৬ দফা আন্দোলনকে নস্যাৎ করা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের কণ্ঠস্বর চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার হীন উদ্দেশ্যেই আইয়ুব খান এই মিথ্যা মামলা সাজিয়েছিলেন।
কিন্তু এই মামলা হিতে বিপরীত ফল দেয়। এই মামলাকে কেন্দ্র করে ১৯৬৯ সালে পূর্ব পাকিস্তানে তীব্র ছাত্র আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থান গড়ে ওঠে। সাধারণ মানুষ ‘জেলের তালা ভাঙবো, শেখ মুজিবকে আনবো’ স্লোগানে রাজপথ প্রকম্পিত করে। প্রবল গণআন্দোলনের মুখে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সরকার মামলাটি প্রত্যাহার করতে এবং বঙ্গবন্ধুকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে।
স্বাধীন বাংলার ৬ দফা আন্দোলন (১৯৬৬):
৬ দফা আন্দোলন হলো বাঙালির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার আদায়ের এক ঐতিহাসিক মুক্তির সনদ বা ম্যাগনাকার্টা। পশ্চিম পাকিস্তানের অব্যাহত শোষণ ও বঞ্চনার হাত থেকে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে মুক্ত করার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালের ৫-৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলগুলোর এক সম্মেলনে এই ঐতিহাসিক ৬ দফা কর্মসূচি পেশ করেন।
৬ দফার মূল দাবিগুলো ছিল:
- লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তানকে একটি ফেডারেল রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা এবং সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সংসদীয় সরকার গঠন।
- কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে কেবল দেশরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয় থাকবে; বাকি সব বিষয় প্রদেশগুলোর হাতে থাকবে।
- দেশের দুই অঞ্চলের জন্য দুটি পৃথক অথচ সহজে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা অথবা একটি মুদ্রাই থাকবে, তবে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে মূলধন পাচার রোধে শক্ত বিধিনিষেধ থাকবে।
- সব ধরনের কর ও খাজনা আদায়ের ক্ষমতা প্রাদেশিক সরকারের হাতে থাকবে এবং আদায়কৃত অর্থের একটি অংশ কেন্দ্রীয় সরকার পাবে।
- দুই অঞ্চলের বৈদেশিক মুদ্রার আয় পৃথক হিসাব রাখা হবে এবং প্রদেশগুলো নিজেদের জন্য বাণিজ্য চুক্তি করতে পারবে।
- পূর্ব পাকিস্তানের সুরক্ষার জন্য নিজস্ব আধা-সামরিক বাহিনী (প্যারামিলিশিয়া) গঠন করতে হবে।
এই ৬ দফা ছিল মূলত পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের রূপরেখা। এই দাবি উত্থাপনের ফলে বাঙালি জাতির মধ্যে অভূতপূর্ব ঐক্য গড়ে ওঠে এবং এটিই পরবর্তীতে স্বাধীনতার এক দফা দাবিতে রূপান্তরিত হয়।
৫। [বাংলাদেশে বেকার সমস্যার কারণ ও তার সমাধানের উপায়সমূহ লিখ।]
উত্তর:
বাংলাদেশে বেকার সমস্যার কারণ:
বেকারত্ব বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান আর্থসামাজিক সমস্যা। দেশে কাজ করার ইচ্ছা ও সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কাজ না পাওয়া মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বেকার সমস্যার প্রধান কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- অতিরিক্ত জনসংখ্যা: বাংলাদেশের জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। ফলে প্রচুর মানুষ বেকার থাকছে।
- ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা: বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা মূলত সাধারণ ও তাত্ত্বিক জ্ঞাননির্ভর। কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষার অভাবে উচ্চশিক্ষিত হয়েও যুবকেরা চাকরি পাচ্ছে না। একে ‘শিক্ষিত বেকারত্ব’ বলা হয়।
- শিল্পায়নের অভাব: কৃষিপ্রধান দেশ হওয়ায় এখানে শিল্প খাতের পর্যাপ্ত বিকাশ ঘটেনি। ভারী ও কুটির শিল্পের অভাবে অনেক মানুষ বেকার জীবন যাপন করছে।
- কৃষির ওপর অত্যাধিক চাপ: কৃষিকাজ একটি মৌসুমী পেশা। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে কাজ থাকলেও বাকি সময়ে কৃষকদের কোনো কাজ থাকে না। ফলে ‘ছদ্মবেশী বেকারত্ব’ বা ‘মৌসুমী বেকারত্ব’ দেখা দেয়।
- কারিগরি দক্ষতার অভাব: আধুনিক প্রযুক্তির যুগে যে ধরনের কারিগরি ও আইটি দক্ষতার প্রয়োজন, দেশের অধিকাংশ যুবকের তা নেই। ফলে তারা আধুনিক কর্মজগতে প্রবেশ করতে পারছে না।
বেকার সমস্যা সমাধানের উপায়:
এই বিশাল সমস্যা রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয়, তবে সঠিক পদক্ষেপের মাধ্যমে এটি কমানো সম্ভব:
- কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার: প্রচলিত সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক (Vocational) শিক্ষাকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে ছাত্ররা পড়ালেখা শেষ করে নিজেরাই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে।
- শিল্পায়ন: দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়িয়ে নতুন নতুন শিল্পকারখানা (গার্মেন্টস, চামড়া, আইটি শিল্প) স্থাপন করতে হবে, যা ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।
- আত্মকর্মসংস্থানে উৎসাহ দান: বেকার যুবকদের কৃষি খামার, মৎস্য চাষ, হাঁস-মুরগি পালন, ফ্রিল্যান্সিং ইত্যাদি আত্মকর্মসংস্থানমূলক কাজে উৎসাহিত করতে হবে এবং বিনা জামানতে সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে।
- জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ: জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমিয়ে আনতে হবে।
- বিদেশে জনশক্তি রপ্তানি: বেকার যুবকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও ভাষা শিক্ষা দিয়ে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাঠাতে হবে। এতে বেকারত্ব কমার পাশাপাশি রেমিট্যান্স আয়ও বৃদ্ধি পাবে।
৬। [বাংলাদেশের প্রসিদ্ধ শিল্পগুলো কী কী? পাট শিল্পের সোনালী অতীত ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যত সম্পর্কে আলোচনা কর।]
উত্তর:
বাংলাদেশের প্রসিদ্ধ শিল্পগুলো:
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হলেও বর্তমানে বিভিন্ন শিল্পখাতে অনেক উন্নতি সাধন করেছে। বাংলাদেশের প্রসিদ্ধ ও প্রধান শিল্পগুলো হলো:
- তৈরি পোশাক শিল্প (RMG): এটি বর্তমান বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানিমুখী শিল্প।
- পাট ও পাটজাত শিল্প: বাংলাদেশের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিল্প।
- চামড়া ও জুতা শিল্প: চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশের অনেক সুনাম রয়েছে।
- ওষুধ শিল্প (Pharmaceuticals): বর্তমানে দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে।
- চা শিল্প: সিলেট ও পার্বত্য অঞ্চলে প্রচুর চা উৎপাদিত হয়, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী শিল্প।
- সার, কাগজ ও সিমেন্ট শিল্প: দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে এসব শিল্পের গুরুত্ব অনেক।
পাট শিল্পের সোনালী অতীত:
পাটকে বলা হয় বাংলাদেশের ‘সোনালী আঁশ’ (Golden Fiber)। ষাট ও সত্তরের দশকে পাট ছিল এদেশের প্রধান অর্থকরী ফসল এবং রপ্তানি আয়ের মূল উৎস। সেই সময় সারা বিশ্বে পাটের ব্যাপক চাহিদা ছিল। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বিশ্বের সর্ববৃহৎ পাটকল ‘আদমজী জুট মিলস’ স্থাপিত হয়। কাঁচা পাট এবং পাট দিয়ে তৈরি চট, বস্তা, কার্পেট, দড়ি ইত্যাদি বিদেশে রপ্তানি করে বাংলাদেশ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করত। দেশের লাখ লাখ কৃষক ও শ্রমিকের জীবিকা নির্বাহ হতো এই পাট শিল্পকে কেন্দ্র করে। তখন পাটের অর্থনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব এতটাই বেশি ছিল যে, পাটের সোনালী রঙের কারণেই একে ‘সোনালী আঁশ’ বলা হতো।
পাট শিল্পের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যত:
আশির দশকে কৃত্রিম তন্তু বা পলিথিনের ব্যাপক ব্যবহারের ফলে পাটের চাহিদা বিশ্বজুড়ে কমে যায় এবং পাট শিল্প বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ে। তবে বর্তমানে পরিবেশ দূষণ ও পলিথিনের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে বিশ্ববাসী সচেতন হওয়ায় পাটের সুদিন আবার ফিরে আসছে। পাট শিল্পের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ নিচে দেওয়া হলো:
- পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা: বিশ্বজুড়ে পলিথিন ও প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব (Eco-friendly) পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়ছে। পাটের ব্যাগ, শপিং ব্যাগ ও প্যাকেজিং ম্যাটেরিয়ালের চাহিদা ইউরোপ-আমেরিকায় ব্যাপক হারে বাড়ছে।
- বহুমুখী পাটপণ্য (Diversified Jute Products): কেবল বস্তা বা দড়ি নয়, বর্তমানে পাট থেকে উন্নত মানের কাপড়, জুতা, ঘর সাজানোর জিনিসপত্র, কার্পেট এবং এমনকী পাটের তৈরি সোনালী ব্যাগ (পচনশীল পলিব্যাগ) তৈরি হচ্ছে, যা নতুন বাজারের দুয়ার খুলে দিয়েছে।
- পাটকাঠির ব্যবহার: পাটের পাশাপাশি পাটকাঠি বা পাটের খড়ি পুড়িয়ে বিশেষ প্রক্রিয়ায় ‘চারকোল’ তৈরি হচ্ছে, যা বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় হচ্ছে। এটি কার্বন পেপার, ফটোকপি মেশিনের কালি ও ওয়াটার পিউরিফায়ার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
- পাটের জিনোম সিকোয়েন্সিং: বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ড. মাকসুদুল আলম পাটের জিনোম সিকোয়েন্সিং (জীবন রহস্য) আবিষ্কার করেছেন। এর ফলে ভবিষ্যতে উন্নত জাতের, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ও ভালো ফলনশীল পাট উৎপাদন করা সম্ভব হবে।
উপসংহার: সরকারি উদ্যোগ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে পাট হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করতে পারে এবং দেশের অর্থনীতিতে আবার নতুন করে বড় ধরনের অবদান রাখতে পারে।
مجموعة (ب) / (খ) অংশ — সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্ন (মান—৫x৪=২০)
৭। [বাংলাদেশের সংবিধানে উল্লিখিত মৌলিক অধিকারসমূহ লিখ।]
উত্তর:
বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে (অনুচ্ছেদ ২৬ থেকে ৪৭ পর্যন্ত) নাগরিকদের মৌলিক অধিকারগুলোর কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সংবিধানে উল্লিখিত প্রধান মৌলিক অধিকারগুলো হলো:
- আইনের দৃষ্টিতে সমতা (অনুচ্ছেদ ২৭): সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।
- ধর্ম, বর্ণ বা লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য থেকে সুরক্ষা (অনুচ্ছেদ ২৮): রাষ্ট্র কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদে কোনো নাগরিকের প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করবে না।
- জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার (অনুচ্ছেদ ৩২): আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে কোনো ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাবে না।
- চলাফেরার স্বাধীনতা (অনুচ্ছেদ ৩৬): দেশের যেকোনো স্থানে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার অধিকার।
- সমাবেশ ও সংগঠনের স্বাধীনতা (অনুচ্ছেদ ৩৭ ও ৩৮): শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ করা এবং সমিতি বা সংগঠন করার অধিকার।
- চিন্তা, বিবেক ও বাক-স্বাধীনতা (অনুচ্ছেদ ৩৯): প্রতিটি নাগরিকের কথা বলার, মত প্রকাশের এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা থাকবে।
- পেশা বা বৃত্তির স্বাধীনতা (অনুচ্ছেদ ৪০): যেকোনো আইনসঙ্গত পেশা গ্রহণ ও ব্যবসা করার অধিকার।
- ধর্মীয় স্বাধীনতা (অনুচ্ছেদ ৪১): যেকোনো ধর্ম পালন, চর্চা ও প্রচার করার অধিকার।
- সম্পত্তির অধিকার (অনুচ্ছেদ ৪২): আইনানুযায়ী সম্পত্তি অর্জন, ধারণ, হস্তান্তর ও ভোগ করার অধিকার।
৮। [“পদ্মা বহুমুখী সেতু বাংলাদেশের গৌরব” শীর্ষক একটি রচনা লিখ।]
উত্তর:
পদ্মা বহুমুখী সেতু বাংলাদেশের গৌরব
পদ্মা সেতু বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এবং চ্যালেঞ্জিং অবকাঠামো প্রকল্প। প্রমত্তা পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতুটি রাজধানী ঢাকার সাথে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার সরাসরি সড়ক ও রেল যোগাযোগ স্থাপন করেছে। এটি শুধুমাত্র একটি সেতু নয়; এটি বাংলাদেশের আত্মমর্যাদা, সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের এক অনন্য প্রতীক।
বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য দাতা সংস্থা দুর্নীতির মিথ্যা অভিযোগ তুলে এই প্রকল্পে অর্থায়ন বন্ধ করে দিলে বাংলাদেশ এক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে এই সেতু নির্মাণের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। দেশি-বিদেশি প্রকৌশলীদের কঠোর পরিশ্রমে অবশেষে ২০২২ সালের ২৫শে জুন এই স্বপ্নের সেতুটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।
পদ্মা সেতু চালু হওয়ার ফলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসছে। যাতায়াতের সময় কমে যাওয়ায় কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের সঠিক দাম পাচ্ছেন, নতুন নতুন শিল্পকারখানা গড়ে উঠছে এবং মোংলা ও পায়রা বন্দরের কর্মচাঞ্চল্য বেড়েছে। এটি দেশের জিডিপি (GDP) প্রবৃদ্ধিতে এক থেকে দুই শতাংশ অতিরিক্ত অবদান রাখবে বলে আশা করা যায়। নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত এই সেতু বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের মাথা উঁচু করেছে। পদ্মা সেতু আজ শুধু কংক্রিটের কাঠামো নয়, এটি কোটি বাঙালির আবেগ ও গৌরবের প্রতীক।
৯। [বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গ্যাস সম্পর্কে আলোচনা কর।]
উত্তর:
প্রাকৃতিক গ্যাস বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রধান খনিজ সম্পদ। দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশেরও বেশি পূরণ হয় এই প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে। বাংলাদেশের গ্যাস ক্ষেত্রগুলো মূলত দেশের পূর্বাঞ্চল অর্থাৎ সিলেট, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম এবং বঙ্গোপসাগরের অগভীর অঞ্চলে অবস্থিত। উল্লেখযোগ্য গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মধ্যে তিতাস, হবিগঞ্জ, বাখরাবাদ, কৈলাশটিলা, সিলেট, রশীদপুর ও বিবিয়ানা অন্যতম।
প্রাকৃতিক গ্যাস দেশের অর্থনীতিতে বহুমুখী অবদান রাখছে। এটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর প্রধান জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া সার কারখানা, শিল্পকারখানা, সিএনজি (CNG) চালিত যানবাহন এবং বাসাবাড়িতে রান্নার কাজে গ্যাসের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। তবে দেশের গ্যাসের মজুত সীমিত হওয়ায় এর পরিকল্পিত ও সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। নতুন নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার এবং অপচয় রোধ করতে পারলে এটি দেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় অবদান রাখবে।
১০। [বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমারেখা লিখ।]
উত্তর:
বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। এর ভৌগোলিক অবস্থান ২০°৩৪’ উত্তর অক্ষাংশ থেকে ২৬°৩৮’ উত্তর অক্ষাংশ পর্যন্ত এবং ৮৮°০১’ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ থেকে ৯২°৪১’ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত। কর্কটক্রান্তি রেখা (Tropic of Cancer) ঠিক বাংলাদেশের মাঝখান দিয়ে অতিক্রম করেছে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমারেখা:
- উত্তরে: ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, মেঘালয় ও আসাম রাজ্য।
- পশ্চিমে: ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য।
- পূর্বে: ভারতের আসাম, ত্রিপুরা ও মিজোরাম রাজ্য এবং দক্ষিণ-পূর্বে মিয়ানমারের (বার্মা) রাখাইন রাজ্য।
- দক্ষিণে: বিশাল বঙ্গোপসাগর অবস্থিত।
বাংলাদেশের মোট আয়তন ১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটার বা ৫৬,৯৭৭ বর্গমাইল। তিন দিক দিয়ে ভারত পরিবেষ্টিত হওয়ায় ভারতের সাথেই বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘ সীমানা রয়েছে।
১১। [বাংলাদেশের সংখ্যা লঘু সম্প্রদায় সম্পর্কে যা জান লিখ।]
উত্তর:
বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হলেও এখানে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী এবং পাহাড়ি ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করে, যারা ‘সংখ্যালঘু সম্প্রদায়’ হিসেবে পরিচিত। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, এরপর রয়েছে বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়।
অন্যদিকে জাতিগত সংখ্যালঘু বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর (যেমন: চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, গারো, খাসিয়া, ত্রিপুরা ইত্যাদি) নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, পোশাক ও জীবনধারা রয়েছে। এরা মূলত পার্বত্য চট্টগ্রাম (রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান), সিলেট, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী অঞ্চলে বসবাস করে। বাংলাদেশের সংবিধানে সকল নাগরিকের সমান অধিকার, স্বাধীনভাবে ধর্ম পালন এবং নিজ নিজ সংস্কৃতি সংরক্ষণের অধিকার সুনিশ্চিত করা হয়েছে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের এই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
১২। [বাংলাদেশে প্রাকৃতিক মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সম্ভাব্য পদক্ষেপসমূহ লিখ।]
উত্তর:
নদীমাতৃক বাংলাদেশে প্রাকৃতিক মৎস্য সম্পদের বিশাল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পরিবেশ দূষণ ও যথেচ্ছভাবে মাছ শিকারের কারণে এই সম্পদ হুমকির মুখে। প্রাকৃতিক মৎস্য উৎপাদন বাড়াতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে:
- মাছের অভয়াশ্রম তৈরি: নদ-নদী ও হাওর-বাঁওড়ে মাছের নিরাপদ প্রজনন ও বংশবৃদ্ধির জন্য নির্দিষ্ট এলাকাকে ‘মাছের অভয়াশ্রম’ হিসেবে ঘোষণা ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে।
- প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা নিষিদ্ধকরণ: ইলিশসহ অন্যান্য দেশি মাছের প্রজনন মৌসুমে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মাছ ধরা, পরিবহন ও বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে এবং আইন অমান্যকারীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
- পোণা ও ডিমওয়ালা মাছ নিধন রোধ: কারেন্ট জাল, বেহুন্দি জাল বা বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করে ছোট পোণা মাছ (যেমন: জাটকা) এবং ডিমওয়ালা মাছ নিধন কঠোরভাবে দমন করতে হবে।
- জলাশয় দূষণ রোধ: শিল্পকারখানার বর্জ্য, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক যেন নদী বা খাল-বিলের পানিতে মিশে মাছের আবাসস্থল ধ্বংস করতে না পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
- নদী খনন ও জলাশয় সংরক্ষণ: পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়া নদী, খাল ও বিলগুলো খনন (ড্রেজিং) করে নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে হবে, যাতে মাছের বিচরণক্ষেত্র বৃদ্ধি পায়।






