Al-Madkhal Ila Ulumil Quran (Code: 201101) – ২০২১ প্রশ্ন ও উত্তর
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২১ এর আল-কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের আল-মাদখাল ইলা উলুমিল কুরআন (المدخل الى علوم القرآن) বিষয়ের সম্পূর্ণ উত্তরমালা।
বিঃদ্রঃ শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে পরীক্ষায় আসা প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর ধারাবাহিকভাবে দেওয়া হলো।
مجموعة (الف) / (ক) অংশ — রচনামূলক প্রশ্ন (মান—১৫x৪=৬০)
১। [‘উলূমুল কুরআন’-এর সংজ্ঞা দাও। অতঃপর এর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ সবিস্তারে বর্ণনা কর।]
উত্তর:
‘উলূমুল কুরআন’-এর সংজ্ঞা:
শব্দগতভাবে ‘উলূম’ হলো ‘ইলম’ এর বহুবচন, যার অর্থ জ্ঞান বা বিজ্ঞান। আর ‘কুরআন’ হলো মহান আল্লাহর অবতীর্ণ সর্বশেষ আসমানি কিতাব। সুতরাং ‘উলূমুল কুরআন’ অর্থ হলো কুরআন বিষয়ক জ্ঞানাবলি।
পারিভাষিক অর্থে, উলূমুল কুরআন হলো এমন সব বিদ্যার সমষ্টি যার মাধ্যমে আল-কুরআনের পঠন-পাঠন, নাযিলের প্রেক্ষাপট (শান-ই-নুযূল), মক্কী ও মাদানী সূরা, নাসিখ ও মানসুখ, মুহকাম ও মুতাশাবিহ, ইজাযুল কুরআন এবং কুরআনের আয়াতের তাফসির ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা হয়। আল্লামা যুরকানী (রহ.) বলেন, “উলূমুল কুরআন এমন এক শাস্ত্র, যা কুরআনের নাযিল, তার ক্রমান্বয়, তার সংরক্ষণ, পঠন, ব্যাখ্যা, নাসিখ-মানসুখ এবং এ জাতীয় বিষয়াবলি নিয়ে আলোচনা করে।”
উলূমুল কুরআনের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ:
উলূমুল কুরআন শাস্ত্রটি একদিনে বা একজন ব্যক্তির দ্বারা পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করেনি। এর উৎপত্তি ও বিকাশ ধাপে ধাপে সম্পন্ন হয়েছে:
- রাসুল (সা.)-এর যুগ: উলূমুল কুরআনের মূল ভিত্তি স্থাপিত হয় স্বয়ং রাসুল (সা.)-এর যুগে। সাহাবীগণ কুরআনের কোনো আয়াতের অর্থ বুঝতে না পারলে রাসুল (সা.) তা ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিতেন। এই যুগে কুরআন সংরক্ষণের জন্য ওহী লেখকদের দ্বারা তা লিপিবদ্ধ করা হতো এবং সাহাবীগণ তা মুখস্থ করতেন। তবে তখনো এটি স্বতন্ত্র শাস্ত্র হিসেবে লিখিত রূপ পায়নি।
- সাহাবী ও তাবিঈদের যুগ: রাসুল (সা.)-এর ইন্তেকালের পর চার খলিফার আমলে উলূমুল কুরআনের প্রভূত উন্নতি হয়। হযরত আবু বকর (রা.) ও হযরত উসমান (রা.)-এর যুগে কুরআন গ্রন্থবদ্ধ ও সংকলিত হয়। হযরত আলী (রা.), ইবনে আব্বাস (রা.), ইবনে মাসউদ (রা.) প্রমুখ সাহাবী তাফসির ও শান-ই-নুযূল বর্ণনায় অসামান্য অবদান রাখেন। তাবিঈদের যুগে মক্কা, মদিনা ও ইরাকে পৃথক তাফসির কেন্দ্র গড়ে ওঠে।
- تدوين বা গ্রন্থনা যুগ (দ্বিতীয় ও তৃতীয় হিজরি): এই যুগে প্রথম তাফসির গ্রন্থ লেখা শুরু হয়। ইয়াহইয়া ইবনে যিয়াদ আল-ফাররা (মৃত ২০৭ হি.) ‘মাআনিউল কুরআন’ এবং আবু উবায়দা (মৃত ২১০ হি.) ‘মাজাযুল কুরআন’ রচনা করেন। এটি ছিল উলূমুল কুরআনের বিভিন্ন শাখার ওপর লিখিত প্রথম দিককার বই।
- পরিপূর্ণ বিকাশ (চতুর্থ থেকে নবম হিজরি): এই যুগে উলূমুল কুরআন একটি স্বতন্ত্র ও স্বয়ংসম্পূর্ণ শাস্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ইমাম ইবনুল জাওযী (মৃত ৫৯৭ হি.) ‘ফুনুনুল আফনান ফি আজায়িবিল কুরআন’, ইমাম বদরুদ্দীন যারকাশী (মৃত ৭৯৪ হি.) ‘আল-বুরহান ফি উলূমিল কুরআন’ এবং আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী (মৃত ৯১১ হি.) তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘আল-ইতকান ফি উলূমিল কুরআন’ রচনা করেন। এই গ্রন্থগুলোর মাধ্যমে শাস্ত্রটি তার চূড়ান্ত পূর্ণতা লাভ করে।
২। [হযরত আবু বকর (রা) ও হযরত ওসমান (রা) এর যুগে আল-কুরআনুল কারীম একত্রিকরণ সম্পর্কে আলোচনা কর এবং আল-কুরআনুল কারীম একত্রিকরণে উভয়ের মধ্যে পার্থক্য কী?]
উত্তর:
হযরত আবু বকর (রা.)-এর যুগে কুরআন একত্রিকরণ:
রাসুল (সা.)-এর ইন্তেকালের পর ভণ্ড নবীদের দমনে ‘ইয়ামামার যুদ্ধ’ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে প্রায় ৭০ জন হাফেজে কুরআন সাহাবী শাহাদাত বরণ করেন। এতে হযরত উমর (রা.) চিন্তিত হয়ে পড়েন যে, এভাবে হাফেজগণ শহীদ হতে থাকলে কুরআনের অনেক অংশ হারিয়ে যেতে পারে। তাই তিনি খলিফা হযরত আবু বকর (রা.)-কে কুরআন গ্রন্থবদ্ধ করার পরামর্শ দেন। প্রথমে আবু বকর (রা.) ইতস্তত করলেও পরে আল্লাহর নির্দেশক্রমে তিনি এই কাজে রাজি হন এবং প্রধান ওহী লেখক হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-কে এই গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেন। যায়েদ (রা.) চরম সতর্কতা ও নিষ্ঠার সাথে সাহাবীদের স্মৃতি এবং লিখিত পাণ্ডুলিপি মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ মাসহাফ বা গ্রন্থ তৈরি করেন। এই মাসহাফটি আবু বকর (রা.)-এর কাছে সংরক্ষিত থাকে।
হযরত উসমান (রা.)-এর যুগে কুরআন একত্রিকরণ:
হযরত উসমান (রা.)-এর খেলাফতকালে ইসলামি সাম্রাজ্য বহু দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। সিরিয়া, ইরাক, আরমেনিয়া ও আজারবাইজানের মুসলিমদের মধ্যে কুরআন তিলাওয়াতের পদ্ধতি ও পঠনরীতি (ক্বিরাআত) নিয়ে চরম মতবিরোধ দেখা দেয়। এই পরিস্থিতি দেখে সাহাবী হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান (রা.) খলিফা উসমান (রা.)-কে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের স্বার্থে পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করেন। তখন হযরত উসমান (রা.) উম্মুল মুমিনীন হযরত হাফসা (রা.)-এর কাছ থেকে আবু বকর (রা.)-এর যুগের সেই মূল মাসহাফটি আনান। এরপর হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে কুরাইশী পঠনরীতি অনুযায়ী সেই মাসহাফের একাধিক অনুলিপি (কপি) তৈরি করেন। এই কপিগুলো মক্কা, কুফা, বসরা ও সিরিয়াসহ বিভিন্ন প্রদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং বাকি সব ভিন্ন পঠনরীতির কপি পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়। এভাবেই তিনি মুসলিম উম্মাহকে এক পঠনরীতির ওপর ঐক্যবদ্ধ করেন।
উভয়ের একত্রিকরণের মধ্যে পার্থক্য:
- প্রেক্ষাপট ও উদ্দেশ্য: আবু বকর (রা.)-এর যুগে কুরআন একত্রিকরণের উদ্দেশ্য ছিল হাফেজদের শাহাদাতের কারণে কুরআন বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রোধ করা। অন্যদিকে উসমান (রা.)-এর যুগে এর উদ্দেশ্য ছিল ক্বিরাআত বা পঠনরীতি নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ মিটিয়ে উম্মাহকে একটি অভিন্ন ক্বিরাআতের ওপর ঐক্যবদ্ধ করা।
- কাজের ধরন: আবু বকর (রা.)-এর যুগে মূলত চামড়া, হাড়, পাথর ও পাতায় বিক্ষিপ্তভাবে লেখা কুরআনের আয়াতগুলোকে একটি মলাটের ভেতর একত্রিত করা হয়েছিল। আর উসমান (রা.)-এর যুগে ওই একটি মূল কপি থেকে কুরাইশী ক্বিরাআত অনুসারে একাধিক অনুলিপি বা কপি তৈরি করে বিভিন্ন প্রদেশে পাঠানো হয়েছিল।
- উপাধি: আবু বকর (রা.)-কে বলা হয় কুরআনের ‘প্রথম সংকলক’, আর উসমান (রা.)-কে বলা হয় ‘জামেউল কুরআন’ বা কুরআনের ওপর উম্মাহর একত্রকারী।
৩। [আল-কুরআনুল কারীম ধীরে ধীরে ও বিচ্ছিন্নভাবে অবতীর্ণ হওয়ার স্তরসমূহ সবিস্তারে লিখ।]
উত্তর:
পবিত্র আল-কুরআন পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবগুলোর মতো একসাথে পূর্ণাঙ্গভাবে অবতীর্ণ হয়নি। মানুষের প্রয়োজন, সমাজের অবস্থা এবং প্রেক্ষাপট অনুযায়ী এটি সুদীর্ঘ ২৩ বছর ধরে ধীরে ধীরে ও খণ্ড খণ্ডভাবে (منجما ومفرقا) অবতীর্ণ হয়েছে। এর অবতীর্ণ হওয়ার স্তর বা পর্যায়সমূহ নিচে আলোচনা করা হলো:
কুরআন অবতীর্ণের স্তরসমূহ:
আল-কুরআন মূলত তিনটি স্তরে অবতীর্ণ হয়েছে:
- প্রথম স্তর (লাওহে মাহফুজে সংরক্ষণ): কুরআন সর্বপ্রথম মহান আল্লাহর কাছ থেকে লাওহে মাহফুজ বা সংরক্ষিত ফলকে লিপিবদ্ধ হয়। এই স্তরে কুরআন সম্পূর্ণ সংরক্ষিত অবস্থায় ছিল, যেখানে কোনো বিকৃতি বা পরিবর্তনের সুযোগ নেই। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “বরং এটি সম্মানিত কুরআন, যা লাওহে মাহফুজে সংরক্ষিত।” (সূরা আল-বুরুজ: ২১-২২)
- দ্বিতীয় স্তর (বায়তুল ইযযাহ বা প্রথম আসমানে অবতীর্ণ): দ্বিতীয় স্তরে লাওহে মাহফুজ থেকে পবিত্র কুরআনকে সম্পূর্ণ একসাথে প্রথম আসমানের ‘বায়তুল ইযযাহ’ নামক স্থানে অবতীর্ণ করা হয়। এটি ঘটেছিল পবিত্র রমজান মাসের লাইলাতুল কদরে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “নিশ্চয়ই আমি এটি কদরের রাতে অবতীর্ণ করেছি।” (সূরা আল-কদর: ১)
- তৃতীয় স্তর (রাসুল (সা.)-এর প্রতি পর্যায়ক্রমে অবতীর্ণ): প্রথম আসমানের বায়তুল ইযযাহ থেকে প্রয়োজন ও প্রেক্ষাপট অনুযায়ী জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে খণ্ড খণ্ড আকারে রাসুল (সা.)-এর প্রতি কুরআন অবতীর্ণ হয়। এটি শুরু হয় মক্কার হেরা গুহায় সূরা আলাকের প্রথম ৫টি আয়াতের মাধ্যমে এবং সমাপ্ত হয় রাসুল (সা.)-এর ইন্তেকালের কিছুকাল পূর্বে।
ধীরে ধীরে ও বিচ্ছিন্নভাবে অবতীর্ণ হওয়ার হিকমত বা যৌক্তিকতা:
- রাসুল (সা.)-এর অন্তরকে সুদৃঢ় করা: কাফিরদের অবিরাম নির্যাতন ও অপপ্রচারের মাঝে রাসুল (সা.)-কে সান্ত্বনা দেওয়া এবং তাঁর মনোবল চাঙা রাখার জন্য অল্প অল্প করে ওহী নাযিল করা হতো।
- কুরআন মুখস্থ ও সংরক্ষণে সুবিধা: তৎকালিন আরবদের স্মৃতিশক্তি প্রখর হলেও একবারে বিশাল একটি কিতাব মুখস্থ করা ও তা অক্ষরে অক্ষরে মনে রাখা কঠিন ছিল। খণ্ড খণ্ডভাবে নাযিল হওয়ায় তা মুখস্থ করা ও আমল করা সহজ হয়েছে।
- পর্যায়ক্রমে বিধান প্রবর্তন: দীর্ঘদিনের কুসংস্কার, মদপান বা অন্যান্য পাপাচার একবারে বন্ধ করা সম্ভব ছিল না। তাই আল্লাহ তায়ালা পর্যায়ক্রমে ও ধীরে ধীরে আইন বা বিধান প্রবর্তন করেছেন (যেমন: মদের বিধান), যাতে মানুষ সহজে তা গ্রহণ করতে পারে।
- প্রশ্নের উত্তর ও সমস্যার সমাধান: যখনই মুসলমানরা কোনো সমস্যায় পড়ত বা কাফিররা কোনো কঠিন প্রশ্ন করত, তখনই আল্লাহ তায়ালা ওহী নাযিল করে তার সমাধান বা উত্তর জানিয়ে দিতেন।
৪। [ই’জাযুল কুরআনিল কারীম বলতে কী বুঝ? এর ই’জাযের বিভিন্ন দিক বিশদভাবে আলোচনা কর।]
উত্তর:
ই’জাযুল কুরআনিল কারীম-এর পরিচয়:
‘ই’জায’ (إعجاز) শব্দটি আরবি শব্দমূল ‘আজয’ থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো অক্ষম বা অপারগ করে দেওয়া। ইসলামি পরিভাষায়, ‘ই’জাযুল কুরআন’ বলতে কুরআনের সেই অলৌকিক ক্ষমতাকে বোঝায়, যা মানুষ বা জিন জাতিকে এর সমকক্ষ কোনো কিছু রচনা করতে সম্পূর্ণ অক্ষম ও পরাভূত করে দিয়েছে। আল্লাহ তায়ালা কুরআন মাজিদে কাফিরদেরকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিলেন যেন তারা পারলে কুরআনের মতো একটি সূরা বা অন্তত একটি আয়াত তৈরি করে দেখায়। কিন্তু তৎকালীন যুগের শ্রেষ্ঠ কবি-সাহিত্যিকরাও এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে ব্যর্থ ও অক্ষম হয়েছে। কুরআনের এই অলৌকিক শক্তি ও মানুষের অক্ষমতাই হলো ই’জাযুল কুরআন।
কুরআনের ই’জায বা অলৌকিকতার বিভিন্ন দিক:
কুরআন মাজিদ শুধুমাত্র একটি দিক থেকে অলৌকিক নয়; বরং এর অনেকগুলো ই’জায বা অলৌকিক দিক রয়েছে:
- ভাষাগত ও সাহিত্যিক ই’জায: কুরআনের সবচেয়ে বড় মুজিযা বা ই’জায হলো এর অতুলনীয় ভাষা, শব্দচয়ন, গাঁথুনি এবং ছন্দ। তৎকালীন আরবে ভাষার চরম উৎকর্ষ সাধিত হয়েছিল। কিন্তু কুরআনের গাম্ভীর্যপূর্ণ ভাষা, প্রবাদ-প্রবচন ও সাহিত্যের অনন্য শৈলী শুনে আরবের বড় বড় কবিরা পর্যন্ত মাথা নত করেছিল। এর প্রতিটি শব্দ এতটা নিখুঁত যে, একটি শব্দ পরিবর্তন করলে পুরো বাক্যের সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়।
- অদৃশ্যের খবর (গায়িবের ই’জায): কুরআনে এমন সব অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের ঘটনার নিখুঁত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, যা কোনো নিরক্ষর মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না। যেমন, ফেরাউনের ডুবে মরা এবং তার লাশ সংরক্ষণের কথা, রোমানদের পরাজয়ের পর পুনরায় বিজয়ী হওয়ার ভবিষ্যৎবাণী (সূরা আর-রূম)—যা হুবহু সত্য প্রমাণিত হয়েছে।
- বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত ই’জায: কুরআন কোনো বিজ্ঞানের বই নয়, তবুও এতে মহাকাশ, ভ্রূণতত্ত্ব, জ্যোতির্বিদ্যা, সমুদ্রবিজ্ঞান সম্পর্কে এমন সব তথ্য দেওয়া হয়েছে, যা আধুনিক বিজ্ঞান মাত্র কয়েক দশক আগে আবিষ্কার করতে পেরেছে। যেমন, বিগ ব্যাং তত্ত্ব, মাতৃগর্ভে শিশুর বেড়ে ওঠার স্তর, পর্বতের গঠন ইত্যাদি।
- আইন ও বিধানগত ই’জায: কুরআনে মানবজীবনের জন্য এমন নিখুঁত ও ভারসাম্যপূর্ণ আইন-কানুন, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজনীতির বিধান দেওয়া হয়েছে, যা সকল যুগের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য এবং যা কোনো মানুষের পক্ষে রচনা করা অসম্ভব।
- প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা: কুরআনের তিলাওয়াত শুনলে মানুষের অন্তরে এক অভাবনীয় প্রভাব সৃষ্টি হয়। এর সুর ও মাধুর্য পাষাণ হৃদয়কেও গলিয়ে দেয়। হযরত উমর (রা.)-এর মতো কঠোর ব্যক্তিও কুরআন শুনে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।
৫। [ওহি অর্থ কী? মানুষের জন্য কেন ওহির প্রয়োজন? ওহি অস্বীকারকারীদের সন্দেহসমূহ উদাহরণসহ বর্ণনা কর।]
উত্তর:
ওহি-এর অর্থ:
‘ওহি’ (وحي) শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো গোপনে ইঙ্গিত করা, ইশারা করা, দ্রুত কোনো কিছু মনের মধ্যে ঢেলে দেওয়া বা প্রত্যাদেশ। ইসলামি পরিভাষায়, মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবী ও রাসুলগণের কাছে মানবজাতির হেদায়াতের জন্য ফেরেশতার মাধ্যমে বা সরাসরি যে ঐশী বাণী বা বার্তা প্রেরণ করেছেন, তাকে ‘ওহি’ বলা হয়। পবিত্র কুরআন হলো ওহির সবচেয়ে বড় ও চূড়ান্ত রূপ।
মানুষের জন্য ওহির প্রয়োজনীয়তা:
মানুষের জ্ঞান, বুদ্ধি ও ইন্দ্রিয় খুবই সীমিত। মানুষ নিজের বুদ্ধি দিয়ে পার্থিব বিজ্ঞানের অনেক কিছু আবিষ্কার করতে পারলেও জীবনের মূল উদ্দেশ্য, পরকালের হিসাব-নিকাশ, জান্নাত-জাহান্নাম এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির উপায় সম্পর্কে নিজের বুদ্ধি দিয়ে জানতে পারে না। ওহি মানুষের এই সীমাবদ্ধতা দূর করে। ওহির প্রয়োজনীয়তাগুলো হলো:
- স্রষ্টার পরিচয় ও উদ্দেশ্য জানা: একমাত্র ওহির মাধ্যমেই মানুষ তার স্রষ্টার সঠিক পরিচয় এবং পৃথিবীতে তাকে সৃষ্টির উদ্দেশ্য জানতে পারে।
- সঠিক ও ভুলের পার্থক্য নির্ধারণ: মানুষের বুদ্ধি পরিবেশ ও পরিস্থিতি দ্বারা প্রভাবিত হয়, তাই সে সর্বদা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। ওহি মানবজাতিকে স্থায়ী ও নিখুঁত আইন-কানুন প্রদান করে হালাল ও হারামের পার্থক্য শিখিয়েছে।
- অদৃশ্য জগতের জ্ঞান: পরকাল, ফেরেশতা, কবর, হাশর ইত্যাদি অদৃশ্য (গায়িব) বিষয়গুলো সম্পর্কে মানুষের পক্ষে ওহি ছাড়া জানা সম্পূর্ণ অসম্ভব।
ওহি অস্বীকারকারীদের সন্দেহসমূহ ও তার খণ্ডন:
সব যুগেই নাস্তিক ও অবিশ্বাসীরা ওহির সত্যতা নিয়ে বিভিন্ন সন্দেহ ও অপবাদ ছড়ানোর চেষ্টা করেছে। তাদের প্রধান সন্দেহগুলো হলো:
- সন্দেহ-১: ওহি হলো মানসিক রোগ বা মৃগীরোগের ফল।
খণ্ডন: মৃগীরোগী খিঁচুনির পর অসংলগ্ন ও অর্থহীন কথা বলে এবং তারা শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু রাসুল (সা.) ওহি লাভের পর এমন সব উচ্চাঙ্গের সাহিত্যিক ও জ্ঞানগর্ভ বাণী (কুরআন) শোনাতেন যা আরবের সেরা পণ্ডিতদেরও হতবাক করে দিত। কোনো অসুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের পক্ষে এমন বিজ্ঞানময় ও নির্ভুল আইন প্রদান করা অসম্ভব। - সন্দেহ-২: ওহি হলো কবি বা জাদুকরের কল্পনা।
খণ্ডন: কবিদের কবিতায় কল্পনা ও অতিরঞ্জন থাকে, আর জাদুকররা মানুষের দৃষ্টিবিভ্রম ঘটায়। কিন্তু কুরআনের বাণী শতভাগ বাস্তবসম্মত, এর বিধানসমূহ যুক্তিনির্ভর। কুরআন নিজেই চ্যালেঞ্জ করেছে যে এটি কোনো কবির কথা নয়, বরং জগতসমূহের প্রতিপালকের নাযিলকৃত। - সন্দেহ-৩: কুরআন হলো পূর্ববর্তী কিতাব (বাইবেল/তাওরাত) থেকে চুরি করা।
খণ্ডন: রাসুল (সা.) ছিলেন ‘উম্মী’ বা নিরক্ষর। তিনি কোনো পাদ্রির কাছে পড়েননি বা কোনো বই পড়েননি। তাছাড়া পূর্ববর্তী কিতাবগুলোতে অনেক বিকৃতি ঢুকে গিয়েছিল, কিন্তু কুরআন সেসব ঘটনার সত্য ও নিখুঁত বিবরণ তুলে ধরেছে যা অন্য কোনো গ্রন্থে ছিল না।
৬। [কুরআন কারীমের সূরাসমূহের নামকরণ ও বিন্যাস কীভাবে হলো? দলিলসহ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা কর।]
উত্তর:
সূরাসমূহের নামকরণ কীভাবে হলো?
কুরআন মাজিদের ১১৪টি সূরার প্রত্যেকটির একটি বা একাধিক নির্দিষ্ট নাম রয়েছে। সূরার নামকরণ মূলত দুটি উপায়ে হয়েছে:
- তাওকীফী বা আল্লাহর নির্দেশক্রমে: জমহুর বা অধিকাংশ ওলামায়ে কেরামের মতে, কুরআনের সমস্ত সূরার নামই ‘তাওকীফী’ (توقيفي), অর্থাৎ স্বয়ং আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.) কর্তৃক নির্ধারিত। যখন কোনো সূরা নাযিল হতো, তখন জিবরাইল (আ.) ওহির মাধ্যমে রাসুল (সা.)-কে সেই সূরার নাম বলে দিতেন। যেমন, রাসুল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি সূরা বাকারাহ ও আলে ইমরান পাঠ করবে…”। এটি প্রমাণ করে যে নামগুলো রাসুলেরই দেওয়া।
- সূরার ভেতরের কোনো বিশেষ শব্দ বা ঘটনাকে কেন্দ্র করে: সূরার নামকরণ সাধারণত ওই সূরার ভেতরে আলোচিত কোনো বিশিষ্ট ঘটনা, চরিত্র বা শব্দের ভিত্তিতে করা হয়েছে। যেমন, সূরা আল-বাকারায় গরুর ঘটনা বর্ণিত হওয়ায় এর নাম ‘বাকারাহ’ রাখা হয়েছে। আবার সূরা ইউসুফে হযরত ইউসুফ (আ.)-এর পূর্ণাঙ্গ কাহিনি থাকায় ওই নামে নামকরণ করা হয়েছে।
সূরাসমূহের বিন্যাস বা ترتيب কীভাবে হলো?
কুরআন মাজিদ নাযিলের ক্রম আর বর্তমান মাসহাফে এর বিন্যাস এক নয়। যেমন, প্রথম নাযিল হয়েছে সূরা আলাক, কিন্তু কুরআনের প্রথম সূরা হলো সূরা আল-ফাতিহা। সূরা ও আয়াতগুলোর এই বিন্যাস কীভাবে হলো তা নিয়ে ওলামায়ে কেরাম বিস্তারিত আলোচনা করেছেন:
- আয়াতের বিন্যাস তাওকীফী: সকল ওলামায়ে কেরাম একমত যে, একটি সূরার ভেতরে আয়াতগুলোর বিন্যাস সম্পূর্ণ তাওকীফী বা আল্লাহর নির্দেশক্রমে হয়েছে। যখন কোনো আয়াত নাযিল হতো, রাসুল (সা.) ওহী লেখকদের নির্দেশ দিতেন, “এই আয়াতটি অমুক সূরার অমুক আয়াতের পরে লেখ।” (তিরমিযি)
- সূরাসমূহের বিন্যাসও তাওকীফী: অধিকাংশ বিজ্ঞ মুফাসসির (যেমন: আল্লামা সুয়ূতী, ইবনুল হিসার) মনে করেন, ১১৪টি সূরার বর্তমান ধারাবাহিক বিন্যাসটিও তাওকীফী, অর্থাৎ রাসুল (সা.) জিবরাইল (আ.)-এর নির্দেশনা অনুযায়ী সাহাবীদের এই বিন্যাস শিখিয়েছিলেন। দলিল হিসেবে বলা যায়, রাসুল (সা.) প্রতি রমজানে জিবরাইল (আ.)-এর সাথে কুরআন সম্পূর্ণ দাউর (রিভিশন) করতেন, এবং মৃত্যুর বছর তিনি দুইবার দাউর করেছিলেন। এই দাউর বর্তমান বিন্যাসেই হয়েছিল।
- সাহাবীদের ইজতিহাদ: কিছু মুফাসসিরের মতে, কয়েকটি সূরার বিন্যাস হয়তো সাহাবীদের নিজস্ব ইজতিহাদ বা মতামতের ভিত্তিতে উসমান (রা.)-এর যুগে নির্ধারিত হয়েছিল, তবে এ মতটি জমহুর আলেমদের কাছে ততটা জোরালো নয়। বিশুদ্ধ মত হলো, সমগ্র কুরআনের সূরা ও আয়াতের বিন্যাস আল্লাহর নির্দেশেই রাসুল (সা.) সম্পন্ন করে গিয়েছিলেন।
مجموعة (ب) / (খ) অংশ — সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্ন (মান—৫x৪=২০)
৭। [মুফাসসির এর শর্তসমূহ লিখ।]
উত্তর:
আল-কুরআনের তাফসির করা অত্যন্ত কঠিন ও দায়িত্বপূর্ণ কাজ। যে কেউ চাইলেই তাফসির করতে পারে না। একজন যোগ্য মুফাসসির হতে হলে বেশ কিছু কঠিন শর্ত পূরণ করতে হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো:
- বিশুদ্ধ আকিদা ও ইখলাস: মুফাসসিরকে অবশ্যই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের বিশুদ্ধ আকিদার অধিকারী হতে হবে এবং নিয়তে পূর্ণ ইখলাস থাকতে হবে।
- আরবি ভাষায় অগাধ পাণ্ডিত্য: আরবি ভাষা, এর ব্যাকরণ (নাহু-সরফ), অলঙ্কার শাস্ত্র (বালাঘাত) এবং শব্দের বৈচিত্র্য সম্পর্কে গভীর জ্ঞান থাকতে হবে।
- কুরআন ও হাদিসের জ্ঞান: এক আয়াতের তাফসির অন্য আয়াত দিয়ে করার দক্ষতা থাকতে হবে। পাশাপাশি সিহাহ সিত্তাহসহ হাদিসের বিশাল ভাণ্ডারে বিচরণ থাকতে হবে।
- শান-ই-নুযূল ও নাসিখ-মানসুখ: আয়াত নাজিলের প্রেক্ষাপট এবং কোন আয়াত রহিতকারী আর কোনটি রহিত—এ বিষয়ে সুস্পষ্ট জ্ঞান থাকা বাধ্যতামূলক।
- ইলমুল উসূল ও ফিকহ: উসূলুল ফিকহ এবং ফিকহ শাস্ত্রের জ্ঞান থাকতে হবে, যাতে আয়াত থেকে সঠিক আইন বা মাসআলা বের করা যায়।
৮। [সূরা ও আয়াতের অর্থ কী? উভয়ের মধ্যে পার্থক্য কী?]
উত্তর:
আয়াতের অর্থ: ‘আয়াত’ শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো নিদর্শন, চিহ্ন বা দলিল। পরিভাষায়, পবিত্র কুরআনের একেকটি ছোট বাক্য বা অংশকে আয়াত বলা হয়, যা আল্লাহর একত্ববাদের একটি নিদর্শন।
সূরার অর্থ: ‘সূরা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ প্রাচীর, উচ্চমর্যাদা বা পরিবেষ্টিত স্থান। পরিভাষায়, কুরআনের এমন একটি নির্দিষ্ট অংশ বা অধ্যায়কে সূরা বলা হয়, যার একটি নাম আছে এবং যা অনেকগুলো আয়াতের সমন্বয়ে গঠিত।
সূরা ও আয়াতের মধ্যে পার্থক্য:
- আয়াত হলো কুরআনের ক্ষুদ্রতম একক বা বাক্য। আর সূরা হলো অনেকগুলো আয়াতের সমষ্টি বা একটি পূর্ণাঙ্গ অধ্যায়।
- কুরআনে মোট আয়াতের সংখ্যা ৬ হাজারের বেশি (৬২৩৬টি), কিন্তু সূরার সংখ্যা মাত্র ১১৪টি।
- একটি সূরা দ্বারা একটি পূর্ণাঙ্গ আলোচনা বা ঘটনা সম্পন্ন হতে পারে, কিন্তু একটি আয়াত সাধারণত একটি পূর্ণাঙ্গ ঘটনার আংশিক দিক তুলে ধরে।
৯। [নাসখ অর্থ কী? তা কত প্রকার? প্রত্যেক প্রকার সংক্ষেপে আলোচনা কর।]
উত্তর:
নাসখ এর অর্থ: ‘নাসখ’ (النسخ) শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো রহিত করা, দূর করা, বাতিল করা বা স্থানান্তর করা। পরিভাষায়, শরিয়তের পূর্ববর্তী কোনো হুকুম বা বিধানকে পরবর্তীতে অবতীর্ণ অন্য কোনো হুকুম বা দলিল দ্বারা রহিত বা বাতিল করে দেওয়াকে ‘নাসখ’ বলা হয়। যে বিধানটি রহিত করে তাকে ‘নাসিখ’ এবং যাকে রহিত করা হয় তাকে ‘মানসুখ’ বলে।
নাসখের প্রকারভেদ: নাসখ প্রধানত তিন প্রকার:
- আয়াত ও হুকুম উভয়ের নাসখ: অর্থাৎ কুরআনের তিলাওয়াত এবং আইন উভয়ই রহিত হয়ে যাওয়া। যেমন, দশবার দুধপানের আয়াতটি রহিত হয়ে যায়।
- তিলাওয়াত রহিত কিন্তু হুকুম বহাল: এমন আয়াত যার শব্দমালা কুরআন থেকে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে, কিন্তু তার বিধান এখনো শরিয়তে বহাল রয়েছে। যেমন, বিবাহিত ব্যভিচারীর পাথর নিক্ষেপের (রজম) বিধানের আয়াত।
- হুকুম রহিত কিন্তু তিলাওয়াত বহাল: এমন আয়াত যা আজও কুরআনে তিলাওয়াত করা হয়, কিন্তু তার আমল বা বিধান রহিত হয়ে গেছে। কুরআনে এ ধরনের আয়াতের সংখ্যাই বেশি। যেমন, বিধবার ইদ্দত এক বছর পালনের আয়াতটি পরবর্তীতে ৪ মাস ১০ দিনের আয়াত দ্বারা রহিত হয়েছে, কিন্তু পূর্বের আয়াতটি এখনো পড়া হয়।
১০। [আল-ইতকান ফী উলূমিল কুরআন এর বৈশিষ্ট্যগুলো লিখ।]
উত্তর:
আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.) রচিত ‘আল-ইতকান ফী উলূমিল কুরআন’ (الإتقان في علوم القرآن) গ্রন্থটি উলূমুল কুরআন শাস্ত্রের এক অনন্য বিশ্বকোষ। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
- جامعيت বা ব্যাপকতা: এই গ্রন্থে উলূমুল কুরআনের প্রায় ৮০টি প্রকার বা শাখা নিয়ে অত্যন্ত বিস্তারিত ও প্রামাণিক আলোচনা করা হয়েছে, যা অন্য কোনো গ্রন্থে এত ব্যাপকভাবে পাওয়া যায় না।
- উৎসগ্রন্থের সমাহার: আল্লামা সুয়ূতী এই গ্রন্থটি রচনার জন্য পূর্ববর্তী শত শত তাফসির, হাদিস ও উলূমুল কুরআনের অমূল্য গ্রন্থ থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। এটি পড়লে পূর্ববর্তী অনেক গ্রন্থের নির্যাস পাওয়া যায়।
- সুশৃঙ্খল বিন্যাস: গ্রন্থের অধ্যায়গুলো অত্যন্ত যৌক্তিক ও সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে। মক্কী-মাদানী, শান-ই-নুযূল, নাসিখ-মানসুখ প্রতিটি বিষয় আলাদা করে বোঝানো হয়েছে।
- গ্রহণযোগ্যতা: এটি বিশ্বের সকল ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদরাসায় উলূমুল কুরআন শাস্ত্রের প্রধান পাঠ্যবই এবং রেফারেন্স বুক হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত।
১১। [আল-কুরআনুল কারীমের শেষে অবতীর্ণ সম্পর্কে আলোচনা কর।]
উত্তর:
কুরআন মাজিদের সর্বপ্রথম আয়াত (সূরা আলাকের ১ম ৫ আয়াত) সম্পর্কে ওলামায়ে কেরাম একমত হলেও, সর্বশেষ অবতীর্ণ আয়াত বা সূরা নিয়ে একাধিক মত রয়েছে। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি মত হলো:
- সর্বশেষ আয়াত: অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে (হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর সূত্রে), কুরআনের সর্বশেষ অবতীর্ণ আয়াত হলো সূরা বাকারার ২৮১ নং আয়াত: “وَاتَّقُوا يَوْمًا تُرْجَعُونَ فِيهِ إِلَى اللَّهِ…” (আর তোমরা সেই দিনকে ভয় কর, যে দিন তোমাদেরকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে)। এই আয়াত নাযিলের পর রাসুল (সা.) ৯ বা ৮১ দিন জীবিত ছিলেন।
- সুদ সম্পর্কিত আয়াত: হযরত উমর (রা.)-এর মতে, সূরা বাকারার সুদের বিধান সম্পর্কিত আয়াতগুলোই (আয়াত ২৭৮) সর্বশেষ নাযিল হয়েছিল।
- সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ সূরা: মুফাসসিরদের সর্বসম্মত মতে, সর্বশেষ অবতীর্ণ পূর্ণাঙ্গ সূরাটি হলো ‘সূরা আন-নাসর’ (إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللَّهِ وَالْفَتْحُ)। এটি বিদায় হজের সময় নাযিল হয়, যা রাসুল (সা.)-এর ইন্তেকালের ইঙ্গিত বহন করত।
১২। [আল-কুরআনুল কারীম, আল-হাদীসুল কুদসি ও আল-হাদীসুন নাবাবীর বৈশিষ্ট্য আলোচনা কর।]
উত্তর:
- আল-কুরআনুল কারীমের বৈশিষ্ট্য: কুরআনের শব্দ এবং অর্থ দুটোই সরাসরি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে নাযিলকৃত। এটি একটি মুজিযা বা অলৌকিক গ্রন্থ। নামাজে অবশ্যই কুরআন তিলাওয়াত করতে হয় এবং পবিত্রতা (অজু) ছাড়া তা স্পর্শ করা হারাম। এর প্রতিটি অক্ষর পাঠে ১০টি নেকি পাওয়া যায়।
- হাদিসে কুদসির বৈশিষ্ট্য: হাদিসে কুদসির অর্থ বা ভাব আল্লাহর পক্ষ থেকে ইলহাম বা স্বপ্নের মাধ্যমে রাসুল (সা.)-এর অন্তরে দেওয়া হয়, কিন্তু শব্দ বা বাক্যগুলো রাসুল (সা.) নিজের ভাষায় প্রকাশ করেন। এটি মুজিযা নয় এবং নামাজে তিলাওয়াত করা যায় না। এটি সাধারণত “আল্লাহ তায়ালা বলেছেন…” এভাবে বর্ণনা করা হয়।
- হাদিসে নববীর বৈশিষ্ট্য: রাসুল (সা.)-এর নিজস্ব কথা, কাজ ও অনুমোদনকেই হাদিসে নববী বলা হয়। এর ভাব আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী হলেও তা প্রকাশ সম্পূর্ণ রাসুল (সা.)-এর নিজস্ব। এটি শরীয়তের দ্বিতীয় দলিল। নামাজে এটি তিলাওয়াত করার কোনো বিধান নেই।






