At-Tafsir Bidunis Sanad (Code: 201201) – ২০২৩ প্রশ্ন ও উত্তর
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২৩ এর আল-কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের التفسير بدون السند (আত-তাফসীর বিদূনিস সানাদ) বিষয়ের সম্পূর্ণ উত্তরমালা।
বিঃদ্রঃ পরীক্ষার্থীদের আগামী পরীক্ষার সর্বোচ্চ প্রস্তুতির সুবিধার্থে মূল প্রশ্নপত্রের বিকল্প সবগুলোর (অথবা) প্রশ্নের ১০০% নির্ভুল ও তথ্যবহুল উত্তর বিস্তারিতভাবে নিচে দেওয়া হলো।
مجموعة (أ) [ক-অংশ: রচনামূলক প্রশ্ন]
আয়াতসমূহের অনুবাদ:
“আমরা শুধু আপনারই ইবাদত করি এবং শুধু আপনারই সাহায্য চাই। আমাদেরকে সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করুন। তাদের পথ—যাদের ওপর আপনি অনুগ্রহ করেছেন; যাদের ওপর গযব আপতিত হয়নি এবং যারা পথভ্রষ্টও নয়।”
সংক্ষিপ্ত তাফসির:
সুরা ফাতিহার এই আয়াতগুলোতে আল্লাহর কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণ এবং হিদায়াতের প্রার্থনা করা হয়েছে। ইবাদত ও সাহায্য চাওয়ার ক্ষেত্রে একমাত্র আল্লাহকেই নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এরপর সিরাতে মুস্তাকিম বা সরল পথের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, যা হলো নবী, সিদ্দিক, শহীদ ও নেককারদের পথ। আর অভিশপ্ত (ইহুদি) ও পথভ্রষ্ট (খ্রিষ্টান) দের পথ থেকে পানাহ চাওয়া হয়েছে।
[الهداية এর অর্থ কী? উহা কত প্রকার বর্ণনা কর।]
الهداية (হিদায়াত) এর অর্থ:
আভিধানিক অর্থ: الدلالة بلطف (নম্রতা ও দয়ার সাথে পথ দেখানো), راہ دکھانا (রাস্তা দেখানো)।
পারিভাষিক অর্থ: আল্লামা রাগিব ইস্পাহানি (রহ.) এর মতে, “কল্যাণের গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য কাউকে নম্রতা ও আন্তরিকতার সাথে পথ নির্দেশ করাকে হিদায়াত বলে।”
হিদায়াতের প্রকারভেদ:
কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে হিদায়াত প্রধানত ৪ প্রকার:
১. هداية وجدانية (সৃষ্টিগত হিদায়াত): জন্মগতভাবে প্রতিটি প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য যে জ্ঞান আল্লাহ দান করেন। যেমন, মানবশিশু জন্মের পরপরই মায়ের দুধ পানের পদ্ধতি শিখে যায়।
২. هداية حواسية (ইন্দ্রীয়গত হিদায়াত): মানুষের পঞ্চইন্দ্রিয় (চোখ, কান, নাক, জিহ্বা, ত্বক) দ্বারা ভালো-মন্দ অনুধাবন করার হিদায়াত।
৩. هداية عقلية (বিবেকগত হিদায়াত): পঞ্চইন্দ্রিয় অনেক সময় ভুল করতে পারে, তাই সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বোঝার জন্য আল্লাহ মানুষকে যে বিবেক বা عقل (আকল) দিয়েছেন।
৪. هداية دينية (দ্বীনি বা অহি-ভিত্তিক হিদায়াত): এটি সর্বোচ্চ স্তরের হিদায়াত। মানব বিবেক যেন শয়তানের ধোঁকায় পড়ে পথভ্রষ্ট না হয়, তাই নবী-রাসুল ও আসমানি কিতাবের মাধ্যমে আল্লাহ যে হিদায়াত দিয়েছেন। আয়াতে মূলত এই হিদায়াতই প্রার্থনা করা হয়েছে।
[المغضوب এবং الضآلين দ্বারা উদ্দেশ্য কী? বর্ণনা কর।]
‘المغضوب’ এবং ‘الضآلين’ দ্বারা উদ্দেশ্য:
- المغضوب (যাদের ওপর গযব নাজিল হয়েছে): তিরমিযি শরিফের হাদিস এবং মুফাসসিরদের ঐকমত্য অনুযায়ী ‘মাগযূব’ দ্বারা ইহুদি সম্প্রদায়কে বোঝানো হয়েছে। কারণ তারা সত্যকে চেনার পরও অহংকারবশত তা গ্রহণ করেনি, ইচ্ছাকৃতভাবে নবীদের হত্যা করেছে এবং আল্লাহর অবাধ্য হয়েছে। ফলে তারা আল্লাহর চরম গযব ও অভিশাপের পাত্র হয়েছে।
- الضآلين (যারা পথভ্রষ্ট): মুফাসসিরদের মতে ‘যাল্লিন’ দ্বারা খ্রিষ্টান সম্প্রদায়কে বোঝানো হয়েছে। কারণ তারা অজ্ঞতা ও বাড়াবাড়ির কারণে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। তারা হযরত ঈসা (আ.)-কে সম্মান দেখাতে গিয়ে তাঁকে আল্লাহর পুত্র বানিয়ে শিরকে লিপ্ত হয়েছে এবং সত্য পথ হারিয়ে ফেলেছে।
আয়াতসমূহের অনুবাদ:
“নিশ্চয়ই যারা কুফরি করেছে, আপনি তাদেরকে সতর্ক করুন বা না-ই করুন, তাদের জন্য উভয়ই সমান; তারা ঈমান আনবে না। আল্লাহ তাদের অন্তর ও শ্রবণশক্তির ওপর মোহর মেরে দিয়েছেন এবং তাদের চোখের ওপর আবরণ রয়েছে; আর তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।”
সংক্ষিপ্ত তাফসির:
সুরা বাকারার এই আয়াতগুলোতে মক্কার ওইসব একগুঁয়ে কাফিরদের অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে, যারা অহংকার ও জেদের বশবর্তী হয়ে সত্য গ্রহণ করতে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছিল (যেমন: আবু জাহেল, আবু লাহাব)। তাদের অবাধ্যতার কারণে আল্লাহ তাদের অন্তর ও কান সিলগালা করে দিয়েছেন এবং তাদের চোখের ওপর পর্দা ফেলে দিয়েছেন, ফলে হিদায়াতের আলো তাদের হৃদয়ে আর প্রবেশ করতে পারে না।
[তাহকীক কর: غشاوة ، كفروا ، يؤمنون ، لم تنذر]
তাহকীক (تحقيق):
- لَمْ تُنْذِرْ : صيغة (সীগাহ)- واحد مذكر حاضر, بحث (বহস)- نفى جحد بلم معروف, باب (বাব)- افعال, مادة (মাদদাহ)- ن ذ ر, هفت اقسام (জিনস)- صحيح। অর্থ: আপনি সতর্ক করেননি।
- يُؤْمِنُوْنَ : صيغة (সীগাহ)- جمع مذكر غائب, بحث (বহস)- اثبات فعل مضارع معروف, باب (বাব)- افعال, مادة (মাদদাহ)- أ م ن, هفت اقسام (জিনস)- مهموز الفاء। অর্থ: তারা ঈমান আনবে।
- كَفَرُوْا : صيغة (সীগাহ)- جمع مذكر غائب, بحث (বহস)- اثبات فعل ماضى مطلق معروف, باب (বাব)- نصر ينصر, مادة (মাদদাহ)- ك ف ر, هفت اقسام (জিনস)- صحيح। অর্থ: তারা কুফরি করেছে বা অস্বীকার করেছে।
- غِشَاوَةٌ : এটি مصدر বা اسم ذات। এর مادة (মাদদাহ) হলো- غ ش و, باب (বাব)- ضرب يضرب থেকে এসেছে, আর هفت اقسام (জিনস)- ناقص واوى। অর্থ: পর্দা, আচ্ছাদন বা আবরণ।
[الختم এর অর্থ কী? ختم الله على قلوبهم দ্বারা উদ্দেশ্য কী? বিস্তারিত লেখ।]
‘الختم’ এর অর্থ:
الختم (খতম) শব্দের আভিধানিক অর্থ মোহর মারা, সিলগালা করা, সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া বা শেষ করা।
‘ختم الله على قلوبهم’ এর উদ্দেশ্য ও ব্যাখ্যা:
এর অর্থ হলো- “আল্লাহ তাদের অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছেন।”
এখানে ‘মোহর মারা’ বলতে মানুষের স্বাভাবিক বিবেক বা অন্তরকে বুঝানো হয়নি; বরং অন্তরের সত্য গ্রহণ করার ক্ষমতাকে বুঝানো হয়েছে। মক্কার কট্টর কাফিররা যখন দিনের পর দিন অহংকার, বিদ্বেষ ও জেদের বশবর্তী হয়ে রাসুল (সা.)-এর দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করছিল এবং জেনেশুনে সত্যকে অস্বীকার করছিল, তখন আল্লাহর নিয়মানুযায়ী তাদের অবাধ্যতার শাস্তি স্বরূপ তাদের অন্তরে ‘মোহর’ বা সিলগালা করে দেওয়া হয়। এর ফলে তাদের অন্তর এমনভাবে অবরুদ্ধ হয়ে যায় যে, সেখানে ঈমান বা হিদায়াতের কোনো আলো প্রবেশ করতে পারে না এবং কুফরি বা পাপের অন্ধকার সেখান থেকে বের হতে পারে না। এটি তাদের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া হয়নি, বরং এটি তাদের স্বেচ্ছায় ক্রমাগত সত্য প্রত্যাখ্যানেরই একটি অনিবার্য পরিণতি।
আয়াতসমূহের অনুবাদ:
“আর তারা (মুনাফিকরা) যখন মুমিনদের সাথে মিলিত হয়, তখন বলে—‘আমরা ঈমান এনেছি’; কিন্তু যখন তারা গোপনে তাদের শয়তানদের (নেতাদের) সাথে মিলিত হয়, তখন বলে—‘নিশ্চয়ই আমরা তোমাদের সাথেই আছি, আমরা তো শুধু (মুমিনদের সাথে) উপহাস করছিলাম।’ আল্লাহই তাদের সাথে উপহাস করেন এবং তাদের অবাধ্যতায় তাদেরকে ঢিল দেন, ফলে তারা অন্ধের মতো ঘুরপাক খেতে থাকে।”
সংক্ষিপ্ত তাফসির:
এই আয়াতগুলোতে মদিনার মুনাফিকদের (আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ও তার সঙ্গীদের) দ্বিমুখী আচরণের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তারা মুসলমানদের সামনে নিজেদের মুমিন বলে দাবি করত, আবার গোপনে ইহুদি ও কাফির নেতাদের সাথে বসে মুসলমানদের নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত। আল্লাহ তাআলা তাদের এই ধোঁকাবাজির কঠোর নিন্দা জানিয়েছেন।
[نفاق এর পরিচয় দাও। মুনাফিকদের চিহ্নসমূহ বর্ণনা কর।]
النفاق (নিফাক) এর পরিচয়:
নিফাক শব্দটি نافقاء (নাফিকা) থেকে উৎপন্ন, যার অর্থ ইঁদুরের গর্তের গুপ্ত দরজা। শরিয়তের পরিভাষায়, অন্তরে কুফরি ও অবিশ্বাস গোপন রেখে মুখে ঈমানের দাবি করা এবং বাহ্যিকভাবে ইসলামি অনুশাসন মেনে চলার ভান করাকে নিফাক বা মুনাফিকি বলে।
علامات المنافقين (মুনাফিকদের চিহ্নসমূহ):
কুরআন ও হাদিসে মুনাফিকদের বেশ কিছু আলামত বা চিহ্ন উল্লেখ করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “মুনাফিকের নিদর্শন হলো ৩টি (অন্য বর্ণনায় ৪টি):”
১. যখন কথা বলে, মিথ্যা বলে।
২. যখন ওয়াদা করে, তা ভঙ্গ করে বা খেলাফ করে।
৩. যখন তার কাছে কোনো আমানত রাখা হয়, সে তার খিয়ানত (আত্মসাৎ) করে।
৪. যখন সে কারো সাথে ঝগড়া বা বিবাদে লিপ্ত হয়, তখন চরম অশ্লীল বা গালিগালাজপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করে।
[استهزاء এর অর্থ কী? الله يستهزئ بهم এর বিশ্লেষণ কর।]
الاستهزاء (ইস্তাহযা) এর অর্থ:
الاستهزاء শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো ঠাট্টা করা, বিদ্রূপ করা, উপহাস করা বা কাউকে বোকা বানানো।
“الله يستهزئ بهم” এর বিশ্লেষণ:
এর শাব্দিক অর্থ হলো, “আল্লাহ তাদের সাথে উপহাস করেন।”
কিন্তু আল্লাহ তায়ালা ঠাট্টা বা উপহাস করা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। এখানে ‘আল্লাহর উপহাস’ বলতে মূলত মুনাফিকদের উপহাসের শাস্তি বা বদলা বোঝানো হয়েছে। আরবি ভাষার অলংকারশাস্ত্র (الجزاء من جنس العمل) অনুযায়ী, কোনো কাজের শাস্তিকে ওই কাজের নামেই উল্লেখ করা হয়। মুনাফিকরা যেমন মুসলমানদের সাথে প্রতারণা করে মনে করত তারা সফল, আল্লাহও দুনিয়াতে তাদের ইসলাম প্রকাশের সুযোগ দিয়ে সাময়িক সুযোগ-সুবিধা লাভের ঢিল দিয়েছেন; কিন্তু আখিরাতে হঠাৎ করে যখন তাদের এই মিথ্যা আবরণ খুলে ভয়াবহ আজাবে নিক্ষেপ করা হবে, তখনই তারা বুঝতে পারবে যে তারা নিজেরাই সবচেয়ে বেশি ধোঁকার শিকার হয়েছে। আল্লাহর এই সূক্ষ্ম পাকড়াওকেই এখানে উপহাস বা ‘ইস্তাহযা’ বলা হয়েছে।
আয়াতসমূহের অনুবাদ:
“(তারা বলে) হে আমাদের রব! আপনি আমাদেরকে হিদায়াত দান করার পর আমাদের অন্তরগুলোকে বক্র করে দেবেন না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদেরকে রহমত দান করুন; নিশ্চয়ই আপনি মহাদাতা। হে আমাদের রব! নিশ্চয়ই আপনি একদিন সমস্ত মানুষকে একত্র করবেন, যাতে কোনো সন্দেহ নেই। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না।”
সংক্ষিপ্ত তাফসির:
সুরা আলে ইমরানের এই আয়াতগুলোতে ‘রাসিখুনা ফিল ইলম’ বা প্রকৃত জ্ঞানীদের একটি দোয়া উল্লেখ করা হয়েছে। তারা আল্লাহর ওপর পূর্ণ ঈমান আনার পর ভয় করে যে, শয়তানের ধোঁকায় তাদের অন্তর যেন আবার পথভ্রষ্ট না হয়ে যায়। তাই তারা হিদায়াতের ওপর অটল থাকার জন্য আল্লাহর কাছে এই দোয়া করে এবং কিয়ামত দিবসের প্রতি তাদের দৃঢ় বিশ্বাস প্রকাশ করে।
[তারকীব কর: إن الله لا يخلف الميعاد]
التركيب (তারকীব):
- إنَّ (ইন্না): হরফে মুশাব্বাহ বিল-ফেল (حرف مشبه بالفعل)।
- اللهَ (আল্লাহ): ইসমে জালালাহ, ‘إنَّ’ এর اسم, যা محل نصب (মানসুব বা যবরযুক্ত) অবস্থায় রয়েছে।
- لَا يُخْلِفُ (লা-ইউখলিফু): فعل مضارع منفي (নেতিবাচক বর্তমান/ভবিষ্যত কাল)। এর ভেতরে একটি هُوَ (হুয়া) জমির লুক্কায়িত আছে, যা الفاعل (কর্তা) এবং যা আল্লাহ শব্দের দিকে ইঙ্গিত করছে।
- الْمِيْعَادَ (আল-মি’আদ): مفعول به (কর্মকারক), যা منصوب (নসব বা যবরযুক্ত)।
- فعل (لَا يُخْلِفُ) + فاعل (هو) + مفعول به (الْمِيْعَادَ): এই তিনটি মিলে جمله فعلية خبرية (ক্রিয়াবাচক বাক্য) হয়ে ‘إنَّ’ এর خبر (বিধেয়) হয়েছে, যা محل رفع (উত্তোলিত) অবস্থায় রয়েছে।
- إنَّ + তার اسم (اللهَ) + তার خبر (لَا يُخْلِفُ الْمِيْعَادَ): সব মিলিয়ে جملة إسمية خبرية (নামবাচক বাক্য) গঠিত হয়েছে।
[زيغ এর অর্থ কী? لا تزغ قلوبنا দ্বারা উদ্দেশ্য কী?]
الزيغ (যাইগ) এর অর্থ:
الزيغ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো বক্রতা, বাঁকা হয়ে যাওয়া, সোজা পথ থেকে সরে যাওয়া বা সত্য থেকে বিচ্যুত হওয়া।
“لا تزغ قلوبنا” দ্বারা উদ্দেশ্য:
এর অর্থ হলো- “আমাদের অন্তরগুলোকে বক্র করে দেবেন না বা সত্যপথ থেকে বিচ্যুত করবেন না।”
মুমিনরা যখন ঈমানের আলো পায়, তখন তাদের সবচেয়ে বড় ভয় থাকে সেই ঈমান হারিয়ে ফেলার। শয়তান সর্বদা মানুষের অন্তরকে সন্দেহ, ভ্রান্তি ও প্রবৃত্তির দিকে ধাবিত করতে চায়। তাই প্রকৃত জ্ঞানীরা আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করে বলেন, “হে আল্লাহ! আপনি যখন আপনার দয়ায় আমাদেরকে ঈমান ও সিরাতে মুস্তাকিমের হিদায়াত দান করেছেন, তখন আর আমাদের অন্তরকে সন্দেহের বক্রতায় পতিত হতে দেবেন না। আমরা যেন মৃত্যু পর্যন্ত এই সরল পথেই অটল থাকতে পারি।” এটি ঈমানের ওপর অবিচল থাকার একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ দোয়া।
আয়াতসমূহের অনুবাদ:
“আল্লাহ সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই; আর ফেরেশতাগণ ও ন্যায়নিষ্ঠ জ্ঞানীগণও (এই সাক্ষ্য দিয়েছেন)। তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই, তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট একমাত্র দ্বীন (জীবনব্যবস্থা) হলো ইসলাম। আর যাদের কিতাব দেওয়া হয়েছিল, তারা কেবল জ্ঞান আসার পরই পরস্পর জেদ ও বিদ্বেষবশত মতবিরোধে লিপ্ত হয়েছে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ হিসাব গ্রহণে অত্যন্ত দ্রুত।”
সংক্ষিপ্ত তাফসির:
এই আয়াতে তাওহিদ বা একত্ববাদের সবচেয়ে শক্তিশালী সাক্ষ্য প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহ স্বয়ং নিজের একত্ববাদের সাক্ষ্য দিয়েছেন এবং এর সাথে ফেরেশতা ও সত্যজ্ঞানী আলেমদের সাক্ষ্যও যুক্ত করেছেন। এছাড়া ইসলামকেই আল্লাহর কাছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য ধর্ম হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে এবং যারা সত্য জানার পরও অহংকারবশত ইসলামকে অস্বীকার করে, তাদের জন্য শাস্তির সতর্কবাণী দেওয়া হয়েছে।
[إيمان ও إسلام এর মধ্যে পার্থক্য বর্ণনা কর।]
الإيمان (ঈমান) ও الإسلام (ইসলাম) এর মাঝে পার্থক্য:
- ঈমান (الإيمان): ঈমান হলো মূলত অন্তরের বিশ্বাস। আল্লাহ, ফেরেশতা, আসমানি কিতাব, রাসুলগণ, আখিরাত এবং তাকদিরের ওপর দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করাকেই ঈমান বলে। এটি সম্পূর্ণ একটি মানসিক ও আধ্যাত্মিক বিষয়। যে ব্যক্তির অন্তরে ঈমান আছে, তাকে মুমিন বলা হয়।
- ইসলাম (الإسلام): ইসলাম হলো বাহ্যিক আনুগত্য এবং আত্মসমর্পণ। শরিয়তের বিধানগুলো (যেমন: নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত) শারীরিকভাবে পালন করা এবং আল্লাহর নির্দেশের সামনে মাথা নত করাকে ইসলাম বলে। যে ব্যক্তি বাহ্যিকভাবে ইসলামি অনুশাসন মেনে চলে, তাকে মুসলিম বলা হয়।
- পার্থক্য: ঈমান হলো শেকড়ের মতো, যা অন্তরে লুক্কায়িত থাকে; আর ইসলাম হলো গাছের ডালপালার মতো, যা বাইরে প্রকাশিত হয়। ঈমান ছাড়া কেবল বাহ্যিক ইসলাম (মুনাফিকদের মতো) আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। আবার পরিপূর্ণ ঈমান থাকলে তা অবশ্যই ইসলাম বা আমলের মাধ্যমে প্রকাশ পাবে।
[إن الدين عند الله الإسلام এর বিশ্লেষণ কর।]
“إن الدين عند الله الإسلام” এর বিশ্লেষণ:
এর অর্থ হলো- “নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট একমাত্র দ্বীন বা জীবনব্যবস্থা হলো ইসলাম।”
এখানে ‘দ্বীন’ বলতে শুধু কিছু আচার-অনুষ্ঠান বা উপাসনা বোঝায় না, বরং মানুষের ব্যক্তিজীবন, সমাজজীবন ও রাষ্ট্রপরিচালনার একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধানকে (Complete Code of Life) বোঝানো হয়েছে। হযরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে হযরত মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত সকল নবীর মূল দ্বীন ছিল ইসলাম। তবে পূর্ববর্তী শরিয়তগুলো ছিল নির্দিষ্ট সময় ও জাতির জন্য। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আগমনের পর আল্লাহ তায়ালা ইসলামকে কিয়ামত পর্যন্ত সকল মানুষের জন্য চূড়ান্ত ও একমাত্র গ্রহণযোগ্য ধর্ম হিসেবে সিলমোহর মেরে দিয়েছেন। এখন ইসলাম ছাড়া ইহুদি, খ্রিষ্টান বা অন্য কোনো মতবাদ অবলম্বন করলে তা আল্লাহর দরবারে কখনোই কবুল হবে না।
আয়াতসমূহের অনুবাদ:
“হে মানুষ! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি (আদম) থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তা থেকে তার সঙ্গিনী (হাওয়া) সৃষ্টি করেছেন, আর তাদের উভয়ের থেকে বহু নর-নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন। আর আল্লাহকে ভয় করো, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের কাছে অধিকার দাবি করো এবং আত্মীয়তার সম্পর্কের ব্যাপারে সতর্ক থাকো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখেন।”
সংক্ষিপ্ত তাফসির:
সুরা নিসার এই আয়াতে মানবজাতির সৃষ্টিতত্ত্ব এবং তাদের পারস্পরিক অধিকারের ভিত্তি তুলে ধরা হয়েছে। সমস্ত মানুষ একই মাতা-পিতা থেকে সৃষ্ট, তাই তাদের মাঝে ভ্রাতৃত্ববোধ থাকা জরুরি। আত্মীয়তার সম্পর্ক (সিলয়ে রেহমি) ছিন্ন করতে এখানে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে এবং আল্লাহ যে আমাদের প্রতিটি কাজের ওপর নজর রাখছেন, তা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
[আয়াতে কারিমার শানে নুযুল উল্লেখ কর।]
শানে নুযূল (سبب النزول):
অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, এই পুরো সুরাটি (সুরা নিসা) মদিনায় নাজিল হয়েছে। ইসলাম পূর্ববর্তী জাহিলি যুগে নারী, এতিম এবং অসহায়দের কোনো অধিকার ছিল না। শক্তিশালীরা দুর্বলদের ওপর চরম জুলুম করত এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক খুব সহজেই ছিন্ন করত। মানুষের মাঝে বংশীয় ও গোত্রীয় অহংকার তীব্র ছিল।
এসব সামাজিক অনাচার দূর করার জন্য এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে আল্লাহ তায়ালা এই আয়াত নাজিল করেন। এতে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় যে, আরবের বড় সর্দার আর একজন হাবশি দাস—সবাই একই পিতা-মাতার (আদম ও হাওয়া) সন্তান। তাই মানুষের মাঝে জন্মগতভাবে কোনো বৈষম্য নেই। সবাইকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা অপরিহার্য।
[والارحام এর মহুল্লে ইরাব কী?]
“والارحام” (ওয়াল আরহাম) এর মহল্লে ইরাব:
এই শব্দটির পঠনপদ্ধতি (কিরাত) ও ইরাব নিয়ে ব্যাকরণবিদদের মাঝে দুটি প্রসিদ্ধ মত রয়েছে:
১. نصب (যবর) যোগে ‘وَالْأَرْحَامَ’: এটিই সর্বাধিক প্রসিদ্ধ কিরাত (যেমন- হাফস আন আসিমের কিরাত)। এক্ষেত্রে শব্দটি পূর্ববর্তী আদেশের ‘اتَّقُوا’ (ভয় করো) ক্রিয়ার مفعول به (কর্ম) হিসেবে منصوب হয়েছে। অথবা ‘الله’ শব্দের ওপর عطف (সংযুক্ত) হয়েছে। অর্থ হবে- “তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করাকে ভয় করো।”
২. جر (জের) যোগে ‘وَالْأَرْحَامِ’: হামযা (রহ.) এর কিরাতে এটি জেরযুক্ত। এক্ষেত্রে এটি পূর্ববর্তী مجرور সর্বনাম (بِهِ) এর ওপর عطف হয়েছে। তখন অর্থ হবে- “তোমরা আল্লাহর নামে এবং আত্মীয়তার সম্পর্কের দোহাই দিয়ে পরস্পরের কাছে অধিকার দাবি করো।”
আয়াতসমূহের অনুবাদ:
“পিতা-মাতা ও আত্মীয়স্বজনের রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে পুরুষদের অংশ রয়েছে; আর পিতা-মাতা ও আত্মীয়স্বজনের রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে নারীদেরও অংশ রয়েছে—তা কম হোক বা বেশি হোক, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত অংশ।”
সংক্ষিপ্ত তাফসির:
জাহিলি যুগে নারীদের এবং ছোট শিশুদের সম্পদের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হতো। তারা মনে করত, যারা যুদ্ধ করতে পারে, সম্পদ কেবল তাদেরই প্রাপ্য। ইসলাম সেই চরম জুলুমের অবসান ঘটিয়ে নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য মিরাস বা উত্তরাধিকারের সুনির্দিষ্ট অংশ নির্ধারণ করে দিয়েছে, যা পবিত্র কুরআনে ‘ফরজ’ বা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
[নির্দিষ্ট অংশের উত্তরাধিকারীগণ কারা? বর্ণনা কর।]
اصحاب الفرائض (নির্দিষ্ট অংশের উত্তরাধিকারীগণ):
ইসলামি ফরায়েজ বা উত্তরাধিকার আইনে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তির ওয়ারিশদের প্রধানত ৩টি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণি হলো ‘আসহাবুল ফারায়েজ’ (যবীল ফুরূয)।
কুরআন ও হাদিসে যাদের মিরাসের বা সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ (যেমন- অর্ধেক, এক-চতুর্থাংশ, এক-অষ্টমাংশ, দুই-তৃতীয়াংশ ইত্যাদি) স্পষ্টভাবে ঠিক করে দেওয়া হয়েছে, তাদেরকে اصحاب الفرائض বলা হয়। মৃত ব্যক্তির কাফন-দাফন এবং ঋণ পরিশোধের পর সর্বপ্রথম এদের মাঝেই নির্দিষ্ট হারে সম্পদ বণ্টন করতে হয়।
আসহাবুল ফারায়েজ মোট ১২ জন। এর মধ্যে ৪ জন পুরুষ (পিতা, পিতামহ/দাদা, বৈমাত্রেয় ভাই এবং স্বামী) এবং ৮ জন নারী (স্ত্রী, কন্যা, পৌত্রী/নাতনি, মাতা, দাদি/নানি, সহোদর বোন, বৈমাত্রেয় বোন এবং বৈপিত্রীয় বোন)।
[তাহকীক কর: ترك ، اقربون ، قلّ ، كثر]
তাহকীক (تحقيق):
- تَرَكَ : صيغة (সীগাহ)- واحد مذكر غائب, بحث (বহস)- اثبات فعل ماضى مطلق معروف, باب (বাব)- نصر ينصر, مادة (মাদদাহ)- ت ر ك, هفت اقسام (জিনস)- صحيح। অর্থ: সে রেখে গেছে বা বর্জন করেছে।
- أَقْرَبُوْنَ : صيغة (সীগাহ)- جمع مذكر, بحث (বহস)- اسم التفضيل, باب (বাব)- كرم يكرم (قرب), مادة (মাদদাহ)- ق ر ب, هفت اقسام (জিনস)- صحيح। এটি اقرب এর বহুবচন। অর্থ: সবচেয়ে নিকটবর্তী আত্মীয়স্বজন।
- قَلَّ : صيغة (সীগাহ)- واحد مذكر غائب, بحث (বহস)- اثبات فعل ماضى مطلق معروف, باب (বাব)- ضرب يضرب, مادة (মাদদাহ)- ق ل ل, هفت اقسام (জিনস)- مضاعف ثلاثى। অর্থ: তা কম হয়েছে।
- كَثُرَ : صيغة (সীগাহ)- واحد مذكر غائب, بحث (বহস)- اثبات فعل ماضى مطلق معروف, باب (বাব)- كرم يكرم, مادة (মাদদাহ)- ك ث ر, هفت اقسام (জিনস)- صحيح। অর্থ: তা বেশি বা প্রচুর হয়েছে।
আয়াতসমূহের অনুবাদ:
“নিশ্চয়ই যারা এতিমদের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করে, তারা তো নিজেদের পেটে আগুনই ভর্তি করছে; আর অচিরেই তারা জ্বলন্ত আগুনে প্রবেশ করবে।”
সংক্ষিপ্ত তাফসির:
এতিম বা পিতৃহীন অসহায় শিশুদের অধিকার রক্ষা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিধান। যারা এতিমের অভিভাবক হয়ে তাদের অসহায়ত্বের সুযোগে সম্পদ আত্মসাৎ করে, আয়াতে তাদের জন্য অত্যন্ত ভয়াবহ শাস্তির (জাহান্নামের আগুন) ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এটি একটি কবিরা গুনাহ।
[يتيم অর্থ কী? অতঃপর এতিমদের হকসমূহ বর্ণনা কর।]
يتيم (এতিম) এর অর্থ:
اليتيم শব্দটি يُتْم (ইউতমুন) থেকে নির্গত, যার আভিধানিক অর্থ হলো একা বা নিঃসঙ্গ হওয়া। শরিয়তের পরিভাষায়, যে মানবশিশু বা বালক সাবালক হওয়ার আগেই তার পিতাকে হারিয়েছে (মারা গেছে), তাকে এতিম বলা হয়। সাবালক হয়ে যাওয়ার পর আর তাকে শরিয়তের দৃষ্টিতে এতিম বলা হয় না।
حقوق الأيتام (এতিমদের হক বা অধিকারসমূহ):
ইসলামে এতিমদের অধিকার সংরক্ষণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে:
১. সম্পদের হেফাজত: এতিমের সম্পদ অতি সতর্কতার সাথে আমানত হিসেবে সংরক্ষণ করতে হবে। কোনোভাবেই তা অন্যায়ভাবে খাওয়া বা নিজেদের সম্পদের সাথে মিশিয়ে আত্মসাৎ করা যাবে না।
২. স্নেহ ও ভালোবাসা: এতিমের সাথে রূঢ় আচরণ করা সম্পূর্ণ নিষেধ। তাদেরকে নিজের সন্তানের মতো স্নেহ, মায়া-মমতা ও উত্তম তরবিয়ত (শিক্ষাদীক্ষা) দিতে হবে। রাসুল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি এতিমের মাথায় স্নেহের হাত বুলাবে, তার হাতের নিচের প্রতিটি চুলের বিনিময়ে আল্লাহ তাকে সওয়াব দান করবেন।”
৩. সম্পদ বুঝিয়ে দেওয়া: এতিম সন্তান যখন সাবালক হয় এবং তার মধ্যে ভালো-মন্দের বিচার করার মানসিক পরিপক্বতা আসে, তখন সাথে সাথে তার সমস্ত সম্পদ তার কাছে বুঝিয়ে দিতে হবে।
[إنما يأكلون فى بطونهم نارا এর বিশ্লেষণ কর।]
“إنما يأكلون فى بطونهم نارا” এর বিশ্লেষণ:
এর আক্ষরিক অর্থ হলো, “নিশ্চয়ই তারা তাদের পেটে কেবল আগুনই ভক্ষণ করছে।”
এখানে ‘আগুন খাওয়া’ বলতে রূপক অর্থে এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করাকে বোঝানো হয়েছে। এতিমের মাল অত্যন্ত পবিত্র একটি আমানত। কেউ যদি জুলুম করে এই সম্পদ নিজের উদর পূর্তির জন্য ব্যয় করে, তবে দুনিয়াতে তা খাবার মনে হলেও আখিরাতে এই সম্পদই জাহান্নামের লেলিহান আগুনে পরিণত হবে এবং তার নাড়িভুঁড়ি জ্বালিয়ে ছাই করে দেবে। এটি ইসলামের অন্যতম কঠোর একটি ধমকি, যা এতিমের সম্পদের পবিত্রতা এবং তা আত্মসাৎ করার ভয়াবহ পরিণতির দিকে ইঙ্গিত করে।
আয়াতসমূহের অনুবাদ:
“হে মুমিনগণ! তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ করো। তোমাদের জন্য গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তু হালাল করা হয়েছে, তবে যা তোমাদের কাছে পাঠ করা হবে তা ছাড়া। আর এহরাম অবস্থায় তোমরা শিকারকে হালাল মনে কোরো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন, তারই নির্দেশ দেন।”
সংক্ষিপ্ত তাফসির:
সুরা মায়িদার প্রথম আয়াতে মুমিনদের সমস্ত বৈধ চুক্তি ও ওয়াদা পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া গবাদিপশুর হালাল হওয়ার কথা বলা হয়েছে, তবে এহরাম অবস্থায় বা পবিত্র হারাম শরিফের সীমানায় যেকোনো ধরনের পশু বা পাখি শিকার করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
[صيد অর্থ কী? মুহরيم অবস্থায় বন্যপশু শিকার করার হুকুম কী? বর্ণনা কর।]
الصيد (সাইদ) এর অর্থ:
الصيد শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো শিকার করা। শরিয়তের পরিভাষায়, যেসব বন্যপশু বা পাখি প্রাকৃতিকভাবেই মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে এবং আত্মরক্ষায় সক্ষম, সেগুলোকে ফাঁদ বা অস্ত্রের সাহায্যে ধরা বা শিকার করাকে ‘সাইদ’ বলা হয়।
মুহরিম অবস্থায় বন্যপশু শিকার করার হুকুম:
হজ বা উমরার নিয়তে এহরাম পরিহিত ব্যক্তিকে মুহরিম বলা হয়। মুহরيم অবস্থায় যেকোনো বন্যপশু বা পাখি (যেমন- হরিণ, খরগোশ, কবুতর ইত্যাদি) শিকার করা, শিকারিকে সাহায্য করা, এমনকি শিকারের দিকে ইশারা করে দেখিয়ে দেওয়াও সম্পূর্ণরূপে হারাম বা নিষিদ্ধ। যদি কোনো মুহরিম ভুলক্রমে বা ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো পশু শিকার করে ফেলে, তবে শরিয়তের বিধান অনুযায়ী তাকে সমমূল্যের জরিমানা বা কাফফারা (دم) আদায় করতে হবে। তবে ক্ষতিকারক প্রাণী (যেমন- সাপ, বিচ্ছু, পাগল কুকুর, ইঁদুর ইত্যাদি) মারলে কোনো অপরাধ হবে না। সামুদ্রিক প্রাণী বা মাছ শিকার করা মুহরিমের জন্য হালাল।
[عقود অর্থ কী? এর শর্তসমূহ বর্ণনা কর।]
العقود (উকুদ) এর অর্থ:
العقود শব্দটি عَقْد (আকদ) এর বহুবচন। এর আভিধানিক অর্থ গিঁট দেওয়া, দৃঢ় করা বা চুক্তি করা। শরিয়তের পরিভাষায়, উকুদ বলতে এমন সব দৃঢ় অঙ্গীকার, চুক্তি, ওয়াদা বা শপথকে বোঝায়, যা মানুষ আল্লাহর সাথে বা অন্য কোনো মানুষের সাথে করে থাকে (যেমন- ঈমানের অঙ্গীকার, নামাজের ওয়াদা, ব্যবসা-বাণিজ্যের চুক্তি, বিবাহের আকদ ইত্যাদি)।
شرائط العقود (চুক্তি বা আকদ পালনের শর্তসমূহ):
ইসলামে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা মুমিনের অন্যতম প্রধান গুণ। তবে কোনো চুক্তি পালন করার জন্য কিছু শর্ত রয়েছে:
১. শরিয়তসম্মত হওয়া: চুক্তিটি অবশ্যই কোরআন-সুন্নাহ ও হালাল কাজের ওপর হতে হবে। কোনো হারাম কাজের (যেমন- সুদ, মদ বিক্রি বা মানুষ হত্যা) চুক্তি করা এবং তা পালন করা সম্পূর্ণ হারাম।
২. স্বেচ্ছায় হওয়া: চুক্তিটি উভয় পক্ষের স্বাধীন মতামতের ভিত্তিতে হতে হবে, জোরপূর্বক বা বলপ্রয়োগ করে কোনো চুক্তি করালে তা শরিয়তে গ্রহণযোগ্য নয়।
৩. ক্ষমতার মধ্যে থাকা: চুক্তির বিষয়টি বাস্তবায়ন করার সক্ষমতা থাকতে হবে। অসম্ভব বা অবাস্তব কোনো কাজের চুক্তি করা বাতিল।
আয়াতসমূহের অনুবাদ:
“হে মুমিনগণ! তোমরা যখন সালাতের জন্য দাঁড়ানোর ইচ্ছা করো, তখন তোমাদের মুখমণ্ডল এবং কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত করো; আর তোমাদের মাথা মাসেহ করো এবং টাখনু পর্যন্ত পা ধৌত করো। আর যদি তোমরা অপবিত্র (জুনুবী) অবস্থায় থাকো, তবে উত্তমরূপে পবিত্রতা অর্জন (গোসল) করো।”
সংক্ষিপ্ত তাফসির:
সুরা মায়িদার এই আয়াতে নামাজ আদায়ের পূর্বশর্ত হিসেবে অযু ও পবিত্রতা অর্জনের বিধান দেওয়া হয়েছে। অযুর ৪টি ফরজ কাজ—মুখ ধোয়া, কনুইসহ হাত ধোয়া, মাথা মাসেহ করা এবং টাখনুসহ পা ধোয়ার কথা এখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া গোসল ফরজ হলে তা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
[অযুর ফরজ এবং সুন্নাতসমূহ লেখ।]
فرائض الوضوء (অযুর ফরজসমূহ):
উপরিউক্ত আয়াতের আলোকে অযুর ফরজ কাজ হলো ৪টি। এর কোনো একটি বাদ পড়লে অযু হবে না:
১. فاغسلوا وجوهكم: সম্পূর্ণ মুখমণ্ডল (কপালের চুলের গোড়া থেকে থুতনির নিচ পর্যন্ত এবং এক কানের লতি থেকে অন্য কানের লতি পর্যন্ত) একবার ধৌত করা।
২. وأيديكم إلى المرافق: উভয় হাত কনুইসহ একবার ধৌত করা।
৩. وامسحوا برءوسكم: মাথার এক-চতুর্থাংশ (চার ভাগের এক ভাগ) একবার মাসেহ করা।
৪. وارجلكم إلى الكعبين: উভয় পা টাখনু (গোড়ালি) সহ একবার ধৌত করা।
سننه (অযুর সুন্নাতসমূহ):
রাসুল (সা.) এর হাদিস থেকে প্রমাণিত অযুর প্রধান কয়েকটি সুন্নাত হলো:
১. নিয়ত করা।
২. বিসমিল্লাহ বলে অযু শুরু করা।
৩. কবজি পর্যন্ত উভয় হাত তিনবার ধোয়া।
৪. মেসওয়াক করা।
৫. তিনবার কুলি করা এবং নাকে তিনবার পানি দেওয়া।
৬. প্রতিটি অঙ্গ তিনবার করে ধৌত করা।
৭. সম্পূর্ণ মাথা একবার মাসেহ করা এবং কান মাসেহ করা।
৮. ধারাবাহিকতা (তারতিব) বজায় রাখা।
[মাথা মাসেহ সম্পর্কে মতভেদগুলো লেখ।]
মাথা মাসেহ সম্পর্কে ফকিহদের মতভেদ (الاختلاف فى مسح الرأس):
কুরআনের আয়াতে “بِرُءُوسِكُمْ” (মাথা মাসেহ করো) বলা হয়েছে, কিন্তু ঠিক কতটুকু মাথা মাসেহ করা ফরজ, সে বিষয়ে ‘ب’ (বা) হরফের অর্থের ভিন্নতার কারণে ফকিহদের (মাযহাবের ইমামদের) মাঝে মতভেদ দেখা দিয়েছে:
১. ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মত: তাঁর মতে, মাথার এক-চতুর্থাংশ (চার ভাগের এক ভাগ) মাসেহ করা ফরজ। তিনি ‘ب’ হরফটিকে ‘إلصاق’ (মিলানো) অর্থে নিয়েছেন, অর্থাৎ হাতের তালুর যে অংশটুকু মাথার সাথে লাগে (যা সাধারণত এক-চতুর্থাংশ), তা মাসেহ করলেই ফরজ আদায় হয়ে যাবে।
২. ইমাম মালেক (রহ.) ও ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর মত: তাঁদের মতে, সম্পূর্ণ মাথা মাসেহ করা ফরজ। তাঁরা ‘ب’ হরফটিকে অতিরিক্ত (زائدة) হিসেবে ধরেছেন।
৩. ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর মত: তাঁর মতে, মাথার সামান্য অংশ বা অন্তত কয়েকটি চুল মাসেহ করলেই ফরজ আদায় হয়ে যাবে। তিনি ‘ب’ হরফটিকে ‘تبعيض’ (আংশিক বা কিছু অংশ) অর্থে গ্রহণ করেছেন।
مجموعة (ب) [খ-অংশ: সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন]
[১১. تفسير অর্থ কী? তা কত প্রকার? التفسير بدون السند এর বৈশিষ্ট্যসমূহ লেখ।]
التفسير (তাফসির) এর পরিচয়:
আভিধানিক অর্থ: তাফসির শব্দটি فسر (ফাসরুন) মূলধাতু থেকে উৎপন্ন, যার অর্থ খোলা, স্পষ্ট করা, উন্মোচন করা বা ব্যাখ্যা করা।
পারিভাষিক অর্থ: যে শাস্ত্রের মাধ্যমে পবিত্র কুরআনের আয়াতগুলোর অর্থ, মর্ম, শানে নুযূল, বিধিবিধান এবং গূঢ় রহস্য মানবীয় সাধ্য অনুযায়ী স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়, তাকে ইলমুত তাফসির বা তাফসির শাস্ত্র বলে।
তাফসিরের প্রকারভেদ (أقسام التفسير):
উৎস বা পদ্ধতির ভিত্তিতে তাফসির প্রধানত দুই প্রকার:
১. تفسير بالمأثور (তাফসির বিল মাথুর) বা التفسير بالسند: যে তাফসির কুরআন, রাসুল (সা.)-এর হাদিস, সাহাবি ও তাবেয়িদের নির্ভরযোগ্য বর্ণনার (সনদের) ওপর ভিত্তি করে রচিত। যেমন- তাফসিরে ইবনে কাসির, তাফসিরে তাবারী।
২. تفسير بالرأي (তাফসির বির রায়) বা التفسير بدون السند: যে তাফসির শুধু বর্ণনা বা সনদের ওপর নির্ভর না করে, বরং আরবি ভাষা, ব্যাকরণ, ইজতিহাদ এবং যুক্তির ওপর ভিত্তি করে রচিত। একে ‘আকলি তাফসির’ও বলা হয়। যেমন- তাফসিরে জালালাইন, তাফসিরে বায়যাবী।
التفسير بدون السند (সনদবিহীন তাফসির)-এর বৈশিষ্ট্যসমূহ:
যেসব তাফসির গ্রন্থে মুফাসসিরগণ বর্ণনাকারীদের দীর্ঘ সনদ বা সূত্র পরিহার করে সরাসরি তাফসির বর্ণনা করেছেন, তাদের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
১. সংক্ষিপ্ততা ও সাবলীলতা: সনদ না থাকার কারণে তাফসিরটি অহেতুক দীর্ঘ হয় না, বরং মূল বক্তব্যটি সংক্ষেপে ও প্রাঞ্জল ভাষায় পাঠকের কাছে পৌঁছে যায়।
২. ব্যাকরণ ও ভাষার ওপর জোর: এসব তাফসিরে আরবি ভাষার অলংকার (বালাগাত), নাহু-সরফ (ব্যাকরণ) এবং শব্দের সূক্ষ্ম প্রয়োগের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
৩. যুক্তি ও ইজতিহাদের ব্যবহার: পূর্ববর্তী সনদ বা বর্ণনার চেয়ে ফিকহি মাসআলা উদ্ভাবন এবং যুক্তিনির্ভর ব্যাখ্যার প্রতি এই তাফসিরগুলোর ঝোঁক বেশি থাকে।
৪. পাঠকের সুবিধা: সাধারণ মানুষ বা শিক্ষার্থীদের জন্য দীর্ঘ সনদের গোলকধাঁধা এড়িয়ে সরাসরি কুরআনের মূল অর্থ ও মর্ম বোঝার জন্য এই তাফসিরগুলো খুবই উপকারী (যেমন- তাফসিরে জালালাইন)।
[১২. تفسير بيضاوى এবং تفسير كشاف এর মধ্যে তুলনা কর।]
আরবি অলংকারশাস্ত্র ও ব্যাকরণের দিক থেকে ‘তাফসিরে কাশশাফ’ এবং ‘তাফসিরে বায়যাবী’ উভয় গ্রন্থই ইসলামি বিশ্বে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। নিচে এদের তুলনামূলক আলোচনা (موازنة) করা হলো:
تفسير الكشاف (তাফসিরে কাশশাফ):
১. রচয়িতা: এটি রচনা করেছেন আল্লামা আবুল কাসেম মাহমুদ ইবনে উমর আয-যামাখশারী (রহ.)।
২. প্রধান বৈশিষ্ট্য: কুরআনের ভাষাগত মুজিজা, বালাগাত (অলংকারশাস্ত্র), ফাসাহাত এবং নাহু-সরফের সূক্ষ্মতম রহস্য উদ্ঘাটনে এর সমকক্ষ দ্বিতীয় কোনো গ্রন্থ নেই।
৩. আকিদাগত ত্রুটি: যামাখশারী ছিলেন ‘মুতাযিলা’ সম্প্রদায়ের কট্টর অনুসারী। তাই তিনি তাঁর তাফসিরে অত্যন্ত চতুরতার সাথে মুতাযিলাদের ভ্রান্ত আকিদা (যেমন- কুরআনকে সৃষ্ট মনে করা, আল্লাহর দর্শন অস্বীকার করা) সুকৌশলে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছেন, যা সাধারণ পাঠকের পক্ষে ধরা অত্যন্ত কঠিন।
تفسير البيضاوي (তাফসিরে বায়যাবী):
১. রচয়িতা: এর রচয়িতা হলেন প্রখ্যাত মুফাসসির আল্লামা কাদি নাসিরুদ্দীন বায়যাবী (রহ.)। গ্রন্থটির প্রকৃত নাম ‘আনওয়ারুত তানজিল ওয়া আসরারুত তাবিল’।
২. প্রধান বৈশিষ্ট্য: এটি মূলত ‘তাফসিরে কাশশাফ’-এর একটি সারসংক্ষেপ বা পরিমার্জিত রূপ। আল্লামা বায়যাবী (রহ.) কাশশাফের ভাষাগত ও অলংকারগত অমূল্য রত্নগুলোকে ঠিকই গ্রহণ করেছেন, কিন্তু সেগুলোকে আরও সংক্ষেপ করেছেন।
৩. আকিদাগত শুদ্ধতা: এটি এই তাফসিরের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। আল্লামা বায়যাবী ছিলেন ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত’-এর অনুসারী। তিনি কাশশাফে থাকা মুতাযিলাদের সমস্ত ভ্রান্ত আকিদা ছেঁটে ফেলে সেখানে আহলে সুন্নাতের খাঁটি আকিদা ও যুক্তি স্থাপন করেছেন।
উপসংহার: ‘তাফসিরে কাশশাফ’ ভাষাগত দিক থেকে একটি মাস্টারপিস হলেও আকিদাগত ত্রুটির কারণে এটি সবার জন্য নিরাপদ নয়। অন্যদিকে ‘তাফসিরে বায়যাবী’ কাশশাফের সাহিত্যিক মাধুর্য এবং আহলে সুন্নাতের নিখুঁত আকিদার এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছে, যার ফলে যুগ যুগ ধরে বিশ্বজুড়ে ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর (মাদরাসা) সিলেবাসে বায়যাবী সর্বাধিক পঠিত তাফসির হিসেবে সমাদৃত।






