At-Tafsir Al-Mu’asir (আত-তাফসীর আল-মু’আসির) 201202 – Fazil Hons Al Quran 2nd Year 2023 QnA

Join Our Telegram Channel
দ্রুত নতুন বই পেতে যুক্ত থাকুন
Join Now
admin
at tafsir al muasir 201202 fazil hons al quran 2nd year 2023 qna
Join Our WhatsApp Channel
দ্রুত নতুন বই পেতে যুক্ত থাকুন
Join Now
📋 সূচিপত্র (Table of Contents)

At-Tafsir Al-Mu’asir (Code: 201202) – ২০২৩ প্রশ্ন ও উত্তর

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২৩ এর আল-কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের التفسير المعاصر (আত-তাফসীর আল-মু’আসির) বিষয়ের সম্পূর্ণ উত্তরমালা।

বিঃদ্রঃ পরীক্ষার্থীদের আগামী পরীক্ষার সর্বোচ্চ প্রস্তুতির সুবিধার্থে মূল প্রশ্নপত্রের বিকল্প সবগুলোর (অথবা) প্রশ্নের ১০০% নির্ভুল ও তথ্যবহুল উত্তর বিস্তারিতভাবে নিচে দেওয়া হলো।

مجموعة (أ) [ক-অংশ: রচনামূলক প্রশ্ন]

١- قل سيروا فى الأرض ثم انظروا كيف كان عاقبة المكذبين- قل لمن ما فى السموات والارض، قل لله، كتب على نفسه الرحمة، ليجمعنك الى يوم القيامة لا ريب فيه، الذين خسروا انفسهم فهم لا يؤمنون-

আয়াতসমূহের অনুবাদ:

“বলুন, তোমরা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করো, তারপর দেখো যারা সত্যকে মিথ্যা সাব্যস্ত করেছিল তাদের পরিণতি কী হয়েছিল! বলুন, আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে তা কার? বলুন, আল্লাহরই জন্য। তিনি নিজের ওপর রহমত করা অবধারিত করে নিয়েছেন। তিনি অবশ্যই তোমাদেরকে কিয়ামতের দিন একত্র করবেন, যাতে কোনো সন্দেহ নেই। যারা নিজেদের ক্ষতি করেছে, তারা ঈমান আনবে না।”

সংক্ষিপ্ত তাফসির:

এই আয়াতগুলোতে আল্লাহ তাআলা কুরাইশদেরকে পূর্ববর্তী ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিগুলোর পরিণতি দেখে শিক্ষা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এরপর বলা হয়েছে যে, আসমান ও জমিনের সবকিছুর মালিকানা কেবল আল্লাহর। তিনি রহমান ও রহিম, তাই দ্রুত শাস্তি না দিয়ে তিনি কিয়ামত পর্যন্ত সুযোগ দিয়েছেন। কিন্তু যারা নিজেদের বিবেককে নষ্ট করে ফেলেছে, তারা কখনো ঈমান আনবে না।

(أ) بين سبب نزول هذه الآية الكريمة: قل سيروا فى الأرض ……. المكذبين-

[আয়াতে কারিমাটির শানে নুযুল বর্ণনা কর: قل سيروا فى الأرض ……. المكذبين]

শানে নুযূল:
মক্কার কুরাইশরা যখন রাসুল (সা.)-এর নবুওয়াতকে অস্বীকার করল, তাঁকে মিথ্যাবাদী বলল এবং তাঁর সাথে চরম ঠাট্টা-বিদ্রূপ করতে শুরু করল, তখন রাসুল (সা.) মনে খুব কষ্ট পেলেন। কুরাইশরা অহংকারবশত মনে করত যে, তারা যা ইচ্ছা তাই করবে, এতে তাদের কোনো শাস্তি হবে না বা তাদের ধরপাকড় করার কেউ নেই।
তখন আল্লাহ তায়ালা রাসুল (সা.)-কে সান্ত্বনা দিয়ে এবং কাফিরদের সতর্ক করে এই আয়াত নাজিল করেন। আল্লাহ নির্দেশ দেন যে, আপনি তাদের বলুন, তারা যেন নিজেদের অহংকার ছেড়ে দিয়ে পৃথিবীতে ভ্রমণ করে এবং পূর্ববর্তী ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিগুলোর (যেমন আদ, সামুদ, নূহ ও লুত আলাইহিমুস সালামের জাতি) করুণ পরিণতির দিকে লক্ষ্য করে। তারা দেখুক, যারা নবীদের মিথ্যাবাদী বলেছিল এবং অহংকার করেছিল, আল্লাহ কীভাবে তাদের সমূলে ধ্বংস করে দিয়েছেন। এতে মক্কার কাফিরদের জন্য চরম শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে।

(ب) حقق الكلمات التالية: سيروا، ليجمعنكم، كتب، السموات-

[নিম্নের শব্দাবলির তাহকীক কর: سيروا، ليجمعنكم، كتب، السموات]

তাহকীক (تحقيق):

  • سِيرُوا : صيغة (সীগাহ)- جمع مذكر حاضر, بحث (বহস)- امر حاضر معروف, باب (বাব)- ضرب يضرب, مادة (মাদদাহ)- س ي ر, هفت اقسام (জিনস)- أجوف يائى। অর্থ: তোমরা ভ্রমণ করো বা ঘোরাঘুরি করো।
  • لَيَجْمَعَنَّكُمْ : এখানে (لَ) হলো তাকীদের, (كُم) হলো مفعول। মূল শব্দটি হলো يَجْمَعَنَّ। صيغة (সীগাহ)- واحد مذكر غائب, بحث (বহস)- فعل مضارع مؤكد بلام التاكيد ونون الثقيلة, باب (বাব)- فتح يفتح, مادة (মাদদাহ)- ج م ع, هفت اقسام (জিনস)- صحيح। অর্থ: তিনি অবশ্যই তোমাদের একত্রিত করবেন।
  • كَتَبَ : صيغة (সীগাহ)- واحد مذكر غائب, بحث (বহস)- ماضى مطلق مثبت معروف, باب (বাব)- نصر ينصر, مادة (মাদদাহ)- ك ت ب, هفت اقسام (জিনস)- صحيح। অর্থ: তিনি অবধারিত করেছেন বা লিখে দিয়েছেন।
  • السَّمٰوَاتُ : এটি جمع مؤنث سالم বা বহুবচন। এর واحد (একবচন) হলো- سَمَاءٌ। এর مادة (মাদদাহ) হলো- س م و, আর هفت اقسام (জিনস)- ناقص واوى। অর্থ: আকাশমণ্ডল বা আসমানসমূহ।

٢- قل ان صلاتى ونسكى ومحياى ومماتى لله رب العلمين- لا شريك له وبذلك امرت وانا اول المسلمين-

আয়াতসমূহের অনুবাদ:

“বলুন, আমার নামাজ, আমার কুরবানি (ইবাদত), আমার জীবন ও আমার মরণ—সবকিছুই বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। তাঁর কোনো শরিক নেই। আর আমাকে এরই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং আমিই প্রথম মুসলিম (আত্মসমর্পণকারী)।”

সংক্ষিপ্ত তাফসির:

সুরা আনআমের এই আয়াতে ইসলামি আকিদার মূল নির্যাস তুলে ধরা হয়েছে। এখানে মুমিনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে তার সমস্ত ইবাদত, আমল এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত কেবল আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্যই নিবেদিত হবে। এতে শিরকের সম্পূর্ণ মূলোৎপাটন করা হয়েছে এবং আল্লাহর কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণের কথা বলা হয়েছে।

(أ) اشرح قوله تعالى: “ان صلاتى ونسكى ومحياى ومماتى لله رب العلمين-”

[আল্লাহ তায়ালার বাণী “ان صلاتى ونسكى ومحياى ومماتى لله رب العلمين” এর ব্যাখ্যা কর।]

আয়াতের ব্যাখ্যা (شرح الآية):
মক্কার মুশরিকরা আল্লাহকে মানার দাবি করলেও তারা মূর্তিদের নামে কুরবানি করত এবং নিজেদের জীবন পরিচালনার জন্য মনগড়া উপাস্যদের নির্দেশ মানত। তাদের এই প্রকাশ্য শিরকের প্রতিবাদে আল্লাহ তায়ালা রাসুল (সা.)-কে এই কালজয়ী ঘোষণা দিতে বলেন।
* صلاتى (আমার নামাজ): নামাজ হলো শারীরিক ইবাদতের মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ। একজন মুমিন তার নামাজ কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই আদায় করে, লোক-দেখানোর জন্য নয়।
* نسكى (আমার কুরবানি): আর্থিক বা শারীরিক যেকোনো ত্যাগ (বিশেষ করে হজ বা পশুকুরবানি) কেবল আল্লাহর নামেই নিবেদিত হবে। কোনো মূর্তি বা পীর-ফকিরের নামে নয়।
* ومحياى ومماتى (আমার জীবন ও মরণ): অর্থাৎ আমার পুরো জীবনের সব কাজ (যেমন- খাওয়া, ঘুম, কাজ-কর্ম) যদি আল্লাহর রাসুলের সুন্নাত অনুযায়ী হয়, তবে তা-ও আল্লাহর ইবাদতে পরিণত হবে। আর আমার মৃত্যুও হবে আল্লাহর পথে বা আল্লাহর সন্তুষ্টি নিয়ে।
পরিশেষে, এখানে বিশ্বজগতের মালিক (رب العلمين) হিসেবে আল্লাহর একচ্ছত্র অধিকার এবং ইখলাস বা একনিষ্ঠতার চূড়ান্ত রূপ ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

(ب) حقق الكلمات التالية: قل، العالمين، ذالك، امرت-

[নিম্নের শব্দাবলির তাহকীক কর: قل، العالمين، ذالك، امرت]

তাহকীক (تحقيق):

  • قُلْ : صيغة (সীগাহ)- واحد مذكر حاضر, بحث (বহস)- امر حاضر معروف, باب (বাব)- نصر ينصر, مادة (মাদদাহ)- ق و ل, هفت اقسام (জিনস)- أجوف واوى। অর্থ: আপনি বলুন।
  • الْعَالَمِينَ : এটি جمع مذكر বা বহুবচন مجرور অবস্থায় রয়েছে। এর واحد (একবচন) হলো- عَالَمٌ (জগৎ)। এর مادة (মাদদাহ) হলো- ع ل م, আর هفت اقسام (জিনস)- صحيح। অর্থ: বিশ্বজগৎসমূহ।
  • ذٰلِكَ : اسم اشارة بعيد למذكر (দূরবর্তী পুংলিঙ্গ নির্দেশক সর্বনাম)। এর مادة ও باب নেই, কারণ এটি مبني (অপরিবর্তনীয়) শব্দ। অর্থ: ঐটা বা ওটা।
  • أُمِرْتُ : صيغة (সীগাহ)- واحد متكلم (مذكر او مؤنث), بحث (বহস)- فعل ماضى مطلق مجهول, باب (বাব)- نصر ينصر, مادة (মাদদাহ)- أ م ر, هفت اقسام (জিনস)- مهموز الفاء। অর্থ: আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

٣- ويآدم اسكن انت وزوجك الجنة فكلا من حيث شئتما ولا تقربا هذه الشجرة فتكونا من الظالمين-

আয়াতসমূহের অনুবাদ:

“আর হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করো। অতঃপর তোমরা যেখান থেকে ইচ্ছা স্বাচ্ছন্দ্যে আহার করো, কিন্তু এই গাছটির নিকটবর্তী হয়ো না; তাহলে তোমরা জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।”

সংক্ষিপ্ত তাফসির:

সুরা আরাফের এই আয়াতে হযরত আদম (আ.) ও মা হাওয়াকে জান্নাতে বসবাসের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জান্নাতের সমস্ত নেয়ামত তাদের জন্য বৈধ করা হলেও পরীক্ষাস্বরূপ একটি নির্দিষ্ট গাছের ফল খেতে বা তার কাছে যেতে নিষেধ করা হয়েছিল। শয়তান পরবর্তীতে এই সুযোগটিই কাজে লাগিয়েছিল।

(أ) اذكر القصة المتعلقة بالآيات الكريمة-

[আয়াতে কারিমার সাথে সংশ্লিষ্ট ঘটনাটি বর্ণনা কর।]

সংশ্লিষ্ট ঘটনা (قصة آدم في الجنة):
আল্লাহ তায়ালা হযরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করে এবং তাঁকে সিজদা করার নির্দেশ দিয়ে ফেরেশতাদের ওপর তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করলেন। কিন্তু শয়তান অহংকারবশত সিজদা না করে জান্নাত থেকে বিতাড়িত ও অভিশপ্ত হলো।
এরপর আল্লাহ তায়ালা আদম (আ.)-এর একাকিত্ব দূর করার জন্য তাঁর পাঁজরের হাড় থেকে মা হাওয়াকে সৃষ্টি করলেন। আল্লাহ তাঁদের উভয়কে জান্নাতে বসবাস করার নির্দেশ দিলেন এবং বললেন যে, জান্নাতের যত ফলমূল, নদী-নালা ও নিয়ামত আছে, তা তোমরা তোমাদের ইচ্ছামতো ভোগ করতে পারো। তবে আল্লাহ তায়ালা তাঁদের আনুগত্য পরীক্ষার জন্য একটি নির্দিষ্ট গাছ (شجرة) দেখিয়ে দিয়ে বললেন, “তোমরা এই গাছটির কাছেও যেয়ো না। যদি যাও, তবে তোমরা জালিম বা অপরাধীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।”
কিন্তু বিতাড়িত শয়তান প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তাঁদের ধোঁকা দিল। সে মিথ্যা কসম করে তাঁদের বোঝাল যে, এই গাছের ফল খেলে তাঁরা চিরঞ্জীব হয়ে যাবেন এবং চিরস্থায়ী রাজত্ব লাভ করবেন। শয়তানের প্ররোচনায় ভুলে তাঁরা সেই নিষিদ্ধ ফল খেয়ে ফেললেন। ফলস্বরূপ, তাঁদের জান্নাতি পোশাক খুলে গেল এবং আল্লাহর আদেশে তাঁদেরকে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেওয়া হলো।

(ب) اكتب أسماء الجنة مستدلا بالنصوص القرآنية-

[আয়াতে কারীমা দ্বারা জান্নাতের নামসমূহ লেখ।]

জান্নাতের নামসমূহ (أسماء الجنة):
পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে আল্লাহ তাআলা জান্নাতের ভিন্ন ভিন্ন নাম ও বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন। মুফাসসিরদের মতে, জান্নাত মূলত একটাই, তবে এর মর্যাদা ও স্তরভেদে ভিন্ন ভিন্ন নাম রাখা হয়েছে। কুরআন থেকে প্রাপ্ত জান্নাতের প্রধান ৮টি নাম নিচে দেওয়া হলো:
১. جَنَّةُ الْفِرْدَوْسِ (জান্নাতুল ফিরদাউস): এটি সবচেয়ে উত্তম ও সর্বোচ্চ জান্নাত। (সূরা আল-কাহফ: ১০৭)
২. دَارُ السَّلَامِ (দারুস সালাম বা শান্তির নীড়): এখানে কোনো দুঃখ-কষ্ট বা মৃত্যু নেই। (সূরা আল-আনআম: ১২৭)
৩. دَارُ الْمُقَامَةِ (দারুল মাকামাহ বা চিরস্থায়ী আবাস): (সূরা ফাতির: ৩৫)
৪. جَنَّةُ الْمَأْوَىٰ (জান্নাতুল মাওয়া বা আশ্রয়ের জান্নাত): (সূরা আন-নাজম: ১৫)
৫. جَنَّاتُ عَدْنٍ (জান্নাতুল আদন বা স্থায়ী বসবাসের জান্নাত): (সূরা আত-তাওবাহ: ৭২)
৬. جَنَّاتُ النَّعِيمِ (জান্নাতুন নাঈম বা নেয়ামতপূর্ণ জান্নাত): (সূরা আল-মায়িদাহ: ৬৫)
৭. الْمَقَامُ الْأَمِينُ (মাকামুল আমিন বা নিরাপদ স্থান): (সূরা আদ-দুখান: ৫১)
৮. دَارُ الْخُلْدِ (দারুল খুলদ বা চিরন্তন নিবাস): (সূরা ফুরকান: ১৫)

٤- قل انما حرم ربى الفواحش ما ظهر منها وما بطن والاثم والبغى بغير الحق وان تشركوا بالله ما لم ينزل به سلطانا وان تقولوا على الله ما لا تعلمون-

আয়াতসমূহের অনুবাদ:

“বলুন, আমার রব কেবল প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অশ্লীল কাজসমূহ, যাবতীয় পাপ, অন্যায়ভাবে সীমালঙ্ঘন, আল্লাহর সাথে শিরক করা—যার পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি—এবং আল্লাহ সম্পর্কে এমন কথা বলা যা তোমরা জানো না, তা হারাম করেছেন।”

সংক্ষিপ্ত তাফসির:

সুরা আরাফের এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা জাহিলি যুগের কিছু ভ্রান্ত ধারণার অপনোদন করেছেন। কাফিররা উলঙ্গ হয়ে কাবা তাওয়াফ করত, অথচ একে হারাম মনে করত না। আল্লাহ এখানে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, শিরক, বিদআত, প্রকাশ্য বা গোপনীয় অশ্লীলতা, জুলুম এবং না জেনে আল্লাহর নামে ফতোয়া দেওয়া—এ সবই আল্লাহর কাছে জঘন্যতম হারাম কাজ।

(أ) ما هى الفواحش الظاهرة والباطنة؟

[প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য فاحشة কী?]

الفواحش (ফাওয়াহিশ):
এটি فاحشة (ফাহিশাহ) এর বহুবচন, যার অর্থ চরম অশ্লীল, নির্লজ্জ বা অত্যন্ত জঘন্য গুনাহের কাজ। আয়াতে একে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে:
১. الفواحش الظاهرة (প্রকাশ্য অশ্লীলতা): যেসব গুনাহ বা নির্লজ্জ কাজ মানুষ প্রকাশ্যে এবং সমাজের সামনে করে থাকে। যেমন—জাহিলি যুগে উলঙ্গ হয়ে কাবাঘর তাওয়াফ করা, প্রকাশ্যে জিনা-ব্যভিচার করা, উলঙ্গপনা বা বেহায়াপনা ছড়ানো, পতিতালয় কায়েম করা ইত্যাদি।
২. الفواحش الباطنة (অপ্রকাশ্য বা গোপন অশ্লীলতা): যেসব নির্লজ্জ কাজ মানুষ লোকচক্ষুর অন্তরালে বা গোপনে করে। যেমন—গোপনে প্রেম করা বা জিনা করা, অন্তরে অহংকার বা হিংসা পুষে রাখা, অন্যের অমঙ্গল কামনা করা ইত্যাদি। আল্লাহ তায়ালা উভয় প্রকার অশ্লীলতাকেই সমানভাবে হারাম করেছেন।

(ب) ما الفرق بين الفاحشة والاثم والبغى؟

[الفاحشة ও الاثم এবং البغى এর মধ্যে পার্থক্য কী?]

الفاحشة, الاثم এবং البغى এর মাঝে পার্থক্য:

  • الفاحشة (অশ্লীলতা): এটি বিশেষ ধরনের জঘন্য পাপ, যা মানুষের স্বাভাবিক সতীত্ব ও লজ্জাশীলতার পরিপন্থী। এর দ্বারা প্রধানত যৌনতা-সংশ্লিষ্ট চরম অনৈতিক কাজ বা বেহায়াপনাকে (যেমন- জিনা, সমকামিতা, উলঙ্গপনা) বোঝায়।
  • الاثم (যাবতীয় পাপ): এটি ফাহিশার চেয়েও ব্যাপক (عام)। যেকোনো ধরনের গুনাহের কাজ, তা ছোট হোক বা বড়, যা মানুষকে আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং সওয়াব থেকে বঞ্চিত করে, তাকেই ‘ইসম’ বলা হয়। যেমন- মিথ্যা বলা, মদ পান করা ইত্যাদি।
  • البغى (সীমালঙ্ঘন বা জুলুম): এর মূল অর্থ হলো সীমালঙ্ঘন করা বা অন্যের অধিকার হরণ করা। ইসম এবং ফাহিশা দ্বারা সাধারণত নিজের ক্ষতি হয়, কিন্তু ‘বাগ্যি’ হলো এমন পাপ যার দ্বারা অন্য মানুষের বা সৃষ্টির ক্ষতি হয় এবং সমাজে অশান্তি ছড়ায়। যেমন- অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করা, রক্তপাত করা বা অত্যাচার করা।

٥- يسئلونك عن الانفال- قل الانفال لله والرسول فاتقوا الله واصلحوا ذات بينكم واطيعوا الله ورسوله ان كنتم مؤمنين-

আয়াতসমূহের অনুবাদ:

“তারা আপনাকে আনফাল (গনিমত বা যুদ্ধের লব্ধ সম্পদ) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলুন, আনফাল হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং নিজেদের মধ্যকার সম্পর্ক সংশোধন করে নাও। আর আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করো, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাকো।”

সংক্ষিপ্ত তাফসির:

বদর যুদ্ধের পর গনিমতের সম্পদ বণ্টন নিয়ে সাহাবিদের মাঝে কিছু মতবিরোধ দেখা দিলে এই আয়াত নাজিল হয়। আল্লাহ জানিয়ে দেন যে গনিমতের সম্পদের মালিকানা আল্লাহ ও রাসুলের, রাসুল (সা.) আল্লাহর নির্দেশে তা বণ্টন করবেন। এখানে সম্পদের চেয়ে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও আল্লাহর আনুগত্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

(أ) ما معنى الأنفال؟ وما حكمها؟ وما الفرق بين الفيئ والغنيمة؟

[الأنفال এর অর্থ কী? এবং তার হুকুম কী? الغنيمة ও الفيئ এর মধ্যে পার্থক্য কী?]

الأنفال (আনফাল) এর অর্থ ও হুকুম:
الأنفال শব্দটি نفل (নফল) এর বহুবচন, যার আভিধানিক অর্থ হলো অতিরিক্ত, উপঢৌকন বা দান। শরিয়তের পরিভাষায়, যুদ্ধের ময়দানে কাফিরদের পরাজিত করার পর তাদের ফেলে যাওয়া যে সম্পদ মুসলমানদের হস্তগত হয়, তাকে আনফাল বা গনিমতের সম্পদ বলা হয়। পূর্ববর্তী নবীদের উম্মতের জন্য গনিমতের মাল হালাল ছিল না, কিন্তু উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য একে বিশেষ উপঢৌকন হিসেবে সম্পূর্ণ হালাল (حلال) করা হয়েছে। এর হুকুম হলো—গনিমতের সম্পদের পাঁচ ভাগের এক ভাগ (খুমুস) আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের (অর্থাৎ ইসলামি রাষ্ট্রের কোষাগারে) জন্য নির্ধারিত থাকবে, আর বাকি চার ভাগ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুজাহিদদের মাঝে ন্যায়সঙ্গতভাবে বণ্টন করা হবে।

الفيئ (ফাই) এবং الغنيمة (গনিমত) এর মাঝে পার্থক্য:

  • الفيئ (ফাই): কাফিরদের সাথে কোনো প্রকার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ছাড়াই (যেমন- তারা ভয়ে পালিয়ে গেলে বা সন্ধি করলে) তাদের যে সম্পদ মুসলমানদের হস্তগত হয়, তাকে ‘ফাই’ বলা হয়। ফাই এর সম্পদের পুরো অংশই ইসলামি রাষ্ট্রের বাইতুল মালে জমা হয় এবং তা জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা হয়। মুজাহিদদের মাঝে বণ্টন করা হয় না।
  • الغنيمة (গনিমত): কাফিরদের সাথে সরাসরি যুদ্ধ করে তাদের পরাজিত করার পর যে সম্পদ লাভ করা হয়, তাকে ‘গনিমত’ বলা হয়। এর এক-পঞ্চমাংশ বাইতুল মালে যায় এবং বাকি চার-পঞ্চমাংশ মুজাহিদদের মাঝে বণ্টন করা হয়।

(ب) ما معنى التقوى؟ اكتب مراتب التقوى مختصرا-

[التقوى এর অর্থ কী? তাকওয়া এর স্তরসমূহ সংক্ষেপে লেখ।]

التقوى (তাকওয়া) এর অর্থ:
التقوى শব্দটি وقاية (উইকায়াহ) থেকে উৎপন্ন, যার অর্থ বেঁচে থাকা, আত্মরক্ষা করা বা ভয় করা। শরিয়তের পরিভাষায়, আল্লাহর ভয়ে যাবতীয় হারাম, নাজায়েজ এবং সন্দেহযুক্ত কাজ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা এবং আল্লাহর আদেশসমূহ যথাযথভাবে পালন করাকেই তাকওয়া বলা হয়।

مراتب التقوى (তাকওয়ার স্তরসমূহ):
ইসলামি স্কলারদের মতে, তাকওয়ার প্রধানত তিনটি স্তর (মারতাবা) রয়েছে:
১. প্রাথমিক স্তর (التقوى عن الشرك): এটি হলো সবচেয়ে নিম্ন স্তর। এর অর্থ হলো আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করা (শিরক) এবং কুফরি থেকে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে বাঁচিয়ে রাখা। যে ব্যক্তি এই স্তরে থাকে, সে চিরস্থায়ী জাহান্নাম থেকে বেঁচে যায়।
২. মধ্যম স্তর (التقوى عن المعاصي): এটি হলো মুমিনদের সাধারণ স্তর। এর অর্থ হলো যাবতীয় কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকা এবং সগিরা গুনাহ হয়ে গেলে সাথে সাথে তওবা করা। পাশাপাশি আল্লাহর ফরজ ও ওয়াজিব বিধানগুলো নিষ্ঠার সাথে পালন করা। শরিয়তে ‘মুত্তাকি’ বলতে মূলত এই স্তরের মানুষকেই বোঝায়।
৩. সর্বোচ্চ স্তর (التقوى عن ما سوى الله): এটি হলো সুফি-সাধক এবং কামিল মুমিনদের স্তর। এর অর্থ হলো আল্লাহ ছাড়া অন্য সবকিছু থেকে নিজের অন্তরকে খালি করে ফেলা এবং এমন প্রতিটি কাজ ও চিন্তা থেকে বেঁচে থাকা যা মানুষকে আল্লাহর স্মরণ (জিকির) থেকে গাফেল করে দেয়।

٦- يا ايها الذين امنوا لا تخونوا الله والرسول وتخونوا امنتكم وانتم تعلمون- واعلموا انما اموالكم واولادكم فتنة وان الله عنده اجر عظيم-

আয়াতসমূহের অনুবাদ:

“হে মুমিনগণ! তোমরা জেনেশুনে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সাথে খিয়ানত করো না এবং তোমাদের পরস্পরের আমানতেরও খিয়ানত করো না। আর জেনে রাখো যে, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কেবল এক পরীক্ষাস্বরূপ; এবং নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট রয়েছে মহাপুরস্কার।”

সংক্ষিপ্ত তাফসির:

এই আয়াতে আল্লাহ ও রাসুলের সাথে কৃত ওয়াদা এবং মানুষের রাখা আমানতের খিয়ানত করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির প্রতি মাত্রাতিরিক্ত ভালোবাসা অনেক সময় মানুষকে আল্লাহর অবাধ্য করে তোলে, তাই এগুলোকে মুমিনের জন্য ‘ফিতনা’ বা পরীক্ষার বস্তু বলা হয়েছে।

(أ) بين سبب نزول الآية الكريمة-

[আয়াতে কারীমার শানে নুযুল লেখ।]

শানে নুযূল (سبب النزول):
এই আয়াতটি হযরত আবু লুবাবা (রা.) এর একটি ভুলের প্রেক্ষাপটে নাজিল হয়েছে। খন্দকের যুদ্ধের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনার বিশ্বাসঘাতক ইহুদি গোত্র ‘বনু কুরাইজা’-কে অবরুদ্ধ করেন। অবরুদ্ধ অবস্থায় ইহুদিরা আবু লুবাবা (রা.)-কে পরামর্শের জন্য ডেকে পাঠায়, কারণ ইসলামের পূর্বে তাদের সাথে তাঁর মিত্রতা ছিল এবং তাঁর ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তাদের এলাকায় ছিল। ইহুদিরা তাঁকে জিজ্ঞেস করল, “আমরা যদি রাসুলের ফায়সালার ওপর আত্মসমর্পণ করি, তবে আমাদের কী পরিণতি হতে পারে?”
আবু লুবাবা (রা.) নিজের গলার দিকে ইশারা করে বুঝিয়ে দিলেন যে, তোমাদের জবাই করা হবে (মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে)। এটি ছিল রাসুল (সা.)-এর একটি গোপন পরিকল্পনা, যা ফাঁস করা আবু লুবাবার জন্য উচিত হয়নি। তিনি নিজের ধন-সম্পদ ও সন্তানদের প্রতি মায়ার কারণেই এই দুর্বলতা দেখিয়েছিলেন। কিন্তু ইশারা করার পরমুহূর্তেই তিনি বুঝতে পারলেন যে, তিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সাথে ভয়ানক খিয়ানত করেছেন। তখন তিনি মসজিদে নববীতে এসে নিজেকে একটি খুঁটির সাথে বেঁধে ফেলেন এবং বলেন, “আল্লাহ আমাকে ক্ষমা না করা পর্যন্ত আমি এখান থেকে খুলব না।” তখন আল্লাহ তায়ালা এই আয়াত নাজিল করেন।

(ب) بين التركيب: “ان الله عنده اجر عظيم”-

[ان الله عنده اجر عظيم বাক্যটির তারকীব কর।]

التركيب (তারকীব):

  • أنَّ (আন্না): হরফে মুশাব্বাহ বিল-ফেল (حرف مشبه بالفعل)। এটি বাক্যের মাঝে আসায় ‘আন্না’ হয়েছে।
  • اللهَ (আল্লাহ): ইসমে জালালাহ, ‘أنَّ’ এর اسم, যা محل نصب (মানসুব বা যবরযুক্ত) অবস্থায় রয়েছে।
  • عِنْدَ (ইনদা): مضاف (সম্বন্ধ পদ) যা ظرف مكان (স্থানবাচক অব্যয়)।
  • هُ (হু): ضمیر مجرور متصل (সর্বনাম), যা مضاف اليه (সম্বন্ধিত পদ)। مضاف এবং مضاف اليه মিলে ظرف مستقر হয়ে বাক্যে লুক্কায়িত ثَابِتٌ (সাবিতুন) বা موجود এর متعلق (সম্পর্কিত) হয়েছে। এটি المقدم خبر (অগ্রিম বিধেয়)।
  • أَجْرٌ (আজরুন): موصوف (বিশেষ্য)।
  • عَظِيمٌ (আযীমুন): صفت (বিশেষণ)। موصوف এবং صفت মিলে مبتدا مؤخر (বিলম্বিত উদ্দেশ্য)।
  • المقدم خبر (عِنْدَهُ) + مبتدا مؤخر (أَجْرٌ عَظِيمٌ): মিলে جملة إسمية খবরিয়া হয়ে ‘أنَّ’ এর خبر (বিধেয়) হয়েছে।
  • أنَّ + তার اسم (اللهَ) + তার خبر (عِنْدَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ): সব মিলিয়ে جملة إسمية خبرية গঠিত হয়েছে এবং এটি পূর্ববর্তী واعلموا এর مفعول به বা مفعول مطلق এর স্থলাভিষিক্ত হয়েছে।

٧- لقد نصركم الله فى مواطن كثيرة ويوم حنين، اذ اعجبتكم كثرتكم فلم تغن عنكم شيئا وضاقت عليكم الارض بما رحبت ثم وليتم مدبرين-

আয়াতসমূহের অনুবাদ:

“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে বহু ক্ষেত্রে সাহায্য করেছেন; এবং হুনাইনের দিনেও, যখন তোমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা তোমাদেরকে অহংকারী করে তুলেছিল, কিন্তু তা তোমাদের কোনো কাজেই আসেনি; আর পৃথিবী এত প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তা তোমাদের জন্য সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল, অতঃপর তোমরা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে পালিয়ে গিয়েছিলে।”

সংক্ষিপ্ত তাফসির:

অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের পরপরই সংগঠিত হুনাইন যুদ্ধের কথা এখানে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেসময় মুসলমানদের সংখ্যা ছিল ১২ হাজার, যা দেখে তাদের মনে অহংকার এসেছিল। কিন্তু শত্রুদের আচমকা আক্রমণে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এর মাধ্যমে আল্লাহ শিক্ষা দিয়েছেন যে, বিজয় সংখ্যার ওপর নয়, বরং আল্লাহর সাহায্যের ওপর নির্ভর করে।

(أ) بين واقعة حنين ملخصا-

[হুনাইনের ঘটনার সারসংক্ষেপ বর্ণনা কর।]

হুনাইনের ঘটনার সারসংক্ষেপ (واقعة حنين):
অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের পর হাওয়াজিন ও সাকিফ গোত্র মুসলমানদের ওপর আক্রমণ করার জন্য হুনাইন নামক উপত্যকায় সমবেত হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) ১২ হাজার মুজাহিদ নিয়ে তাদের মোকাবিলা করার জন্য মক্কা থেকে হুনাইনের দিকে রওনা হন। এর আগে কোনো যুদ্ধে মুসলমানদের সংখ্যা এত বেশি ছিল না। এই বিশাল সৈন্যবাহিনী দেখে কিছু মুসলমানের মনে অহংকার চলে আসে এবং তারা বলতে থাকে, “আজ সংখ্যার দিক থেকে কেউ আমাদের পরাজিত করতে পারবে না।” এই আত্মঅহংকার আল্লাহর অপছন্দ হয়।
হুনাইন উপত্যকায় পৌঁছানোর পর ভোরবেলায় শত্রুরা চারপাশ থেকে অতর্কিতভাবে মুসলমানদের ওপর বৃষ্টির মতো তীর নিক্ষেপ করতে শুরু করে। আকস্মিক এই আক্রমণে মুসলমানরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং জীবন বাঁচাতে পিছু হটতে বাধ্য হয়। বিশাল পৃথিবী তখন তাদের কাছে সংকীর্ণ মনে হতে থাকে। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) ময়দানে অবিচল থাকেন এবং আব্বাস (রা.)-কে উচ্চস্বরে মুসলমানদের ডাকতে বলেন। তাঁর ডাকে সাহাবিরা পুনরায় একত্রিত হন এবং আল্লাহর সাহায্যে বিপুল বিক্রমে যুদ্ধ করে শত্রুদের পরাজিত করেন। আল্লাহ তায়ালা এই ঘটনার মাধ্যমে শিক্ষা দিয়েছেন যে, জয়ের চাবিকাঠি সৈন্যসংখ্যা নয়, বরং আল্লাহর সাহায্য।

(ب) اكتب التركيب النحوى لقوله تعالى: “مواطن كثيرة”-

[আল্লাহ তায়ালার বাণী “مواطن كثيرة” এর তারকীব লেখ।]

التركيب (তারকীব):

  • فِى (ফী): حرف جر (অব্যয়)।
  • مَوَاطِنَ (মাওয়াতিনা): موصوف (বিশেষ্য)। এটি اسم غير منصرف (গায়রে মুনসারিফ বা অপবিবর্তনীয় নামপদ), কারণ এটি مَفَاعِلُ (মাফায়িলু) এর ওজনে মুনতাহাল জুমু (সর্বোচ্চ বহুবচন) এর সিগাহ। গায়রে মুনসারিফ হওয়ার কারণে حرف جر (ফী) আসার পরও এর শেষে কাসরা (জের) না হয়ে الفتحة (যবর) হয়েছে।
  • كَثِيْرَةٍ (কাসীরাতিন): صفت (বিশেষণ)। এটি منصرف (মুনসারিফ), তাই এটি موصوف এর مجرور অবস্থাকে অনুসরণ করে স্বাভাবিকভাবেই কাসরা (জের) গ্রহণ করেছে।
  • موصوف (مَوَاطِنَ) + صفت (كَثِيْرَةٍ): মিলে مجرور (মাজরুর) হয়েছে।
  • حرف جر (فِى) + مجرور (مَوَاطِنَ كَثِيْرَةٍ): মিলে الجار والمجرور হয়ে পূর্ববর্তী ক্রিয়া نَصَرَكُمْ (নাসারাকুম) এর متعلق (সম্পর্কিত) হয়েছে, যা যুদ্ধক্ষেত্রের স্থানকে নির্দেশ করছে।

٨- لقد جاءكم رسول من انفسكم عزيز عليه ما عنتم حريص عليكم بالمؤمنين رءوف رحيم- فان تولوا فقل حسبى الله لا اله الا هو، عليه توكلت وهو رب العرش العظيم-

আয়াতসমূহের অনুবাদ:

“অবশ্যই তোমাদের কাছে তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রাসুল এসেছেন। তোমাদের দুঃখ-কষ্ট তাঁর জন্য অত্যন্ত পীড়াদায়ক। তিনি তোমাদের কল্যাণের জন্য খুবই আকাঙ্ক্ষী এবং মুমিনদের প্রতি তিনি অতিশয় দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু। এরপরও যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে বলুন—আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই; আমি তাঁরই ওপর তাওয়াক্কুল করেছি এবং তিনি মহান আরশের অধিপতি।”

সংক্ষিপ্ত তাফসির:

সুরা তাওবার সর্বশেষ এই আয়াত দুটিতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মহান চরিত্র, উম্মতের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা ও দয়া তুলে ধরা হয়েছে। উম্মতের যেকোনো কষ্ট নবীজিকে চরমভাবে ব্যথিত করত। শেষে বলা হয়েছে, মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিলেও মুমিনের একমাত্র ভরসা ও তাওয়াক্কুলের জায়গা হবেন মহান আল্লাহ।

(أ) اكتب من حياة الرسول المذكر فى الآية الكريمة مختصرا-

[আয়াতে কারীমায় উল্লিখিত রসুল (স) এর জীবনী সংক্ষেপে লেখ।]

রাসুল (সা.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী:
উল্লিখিত আয়াতে মানবজাতির শ্রেষ্ঠ নবী ও সর্বশেষ রাসুল হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কথা বলা হয়েছে। তিনি ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে (মতান্তরে রবীউল আউয়াল মাসে) মক্কার সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আবদুল্লাহ এবং মাতার নাম আমিনা। জন্মের পূর্বেই তিনি পিতাকে এবং ছয় বছর বয়সে মাতাকে হারান। এরপর তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিব এবং পরে চাচা আবু তালিব তাঁকে লালন-পালন করেন।
ছোটবেলা থেকেই তিনি অত্যন্ত সত্যবাদী, আমানতদার এবং পরোপকারী ছিলেন, যে কারণে মক্কাবাসীরা তাঁকে ‘আল-আমিন’ উপাধি দিয়েছিল। ৪০ বছর বয়সে তিনি হেরা গুহায় আল্লাহর পক্ষ থেকে নবুওয়াত লাভ করেন। নবুওয়াত লাভের পর তিনি মক্কায় ১৩ বছর মানুষদেরকে এক আল্লাহর দিকে ডাকেন, কিন্তু কাফিরদের চরম নির্যাতনের শিকার হন। এরপর আল্লাহর নির্দেশে তিনি মদিনায় হিজরত করেন। মদিনায় তিনি একটি আদর্শ ইসলামি রাষ্ট্র কায়েম করেন। ২৩ বছরের কঠোর সাধনায় তিনি আরব ভূখণ্ডে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দেন। দশম হিজরিতে তিনি বিদায় হজ সম্পন্ন করেন এবং ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে, ৬৩ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। আয়াতে তাঁর যে দয়ামায়া ও উম্মতের প্রতি দরদের কথা বলা হয়েছে, তা তাঁর পুরো জীবনে প্রতিফলিত ছিল।

(ب) حقق الالفاظ الآتية: رسول، تولوا، توكلت، العظيم-

[আগত শব্দাবলির তাহকীক কর: رسول، تولوا، توكلت، العظيم]

তাহকীক (تحقيق):

  • رَسُولٌ : এটি فعول এর ওজনে مبالغة اسم فاعل (অথবা مفعول এর অর্থে ব্যবহৃত اسم)। এর جمع (বহুবচন) হলো- رُسُلٌ। مادة (মাদদাহ)- ر س ل, باب (বাব)- نصر ينصر। অর্থ: প্রেরিত পুরুষ বা বার্তাবাহক।
  • تَوَلَّوْا : صيغة (সীগাহ)- جمع مذكر غائب, بحث (বহস)- اثبات فعل ماضى مطلق معروف, باب (বাব)- تفعل (تفعّل), مادة (মাদদাহ)- و ل ى, هفت اقسام (জিনস)- لفيف مفروق। অর্থ: তারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
  • تَوَكَّلْتُ : صيغة (সীগাহ)- واحد متكلم (مذكر او مؤنث), بحث (বহস)- اثبات فعل ماضى مطلق معروف, باب (বাব)- تفعل (تفعّل), مادة (মাদদাহ)- و ك ل, هفت اقسام (জিনস)- مثال واوى। অর্থ: আমি ভরসা বা তাওয়াক্কুল করেছি।
  • الْعَظِيمِ : এটি فعيل এর ওজনে صفت مشبهة (বিশেষণমূলক নামপদ)। مادة (মাদদাহ)- ع ظ م, باب (বাব)- كرم يكرم। অর্থ: মহান, বিশাল বা অতিশয় মর্যাদাবান।

٩- الر- تلك ايت الكتب الحكيم- اكان للناس عجبا ان اوحينا الى رجل منهم ان انذر الناس وبشر الذين امنوا ان لهم قدم صدق عند ربهم، قال الكافرون ان هذا لساحر مبين-

আয়াতসমূহের অনুবাদ:

“আলিফ-লাম-রা। এগুলো প্রজ্ঞাময় কিতাবের আয়াত। মানুষের জন্য কি এটা আশ্চর্যের বিষয় যে, আমি তাদের মধ্য থেকেই এক ব্যক্তির কাছে ওহি প্রেরণ করেছি যে—আপনি মানুষকে সতর্ক করুন এবং যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে সুসংবাদ দিন যে, তাদের রবের কাছে তাদের জন্য রয়েছে উচ্চমর্যাদা? (কিন্তু) কাফিররা বলে—নিশ্চয়ই সে একজন প্রকাশ্য জাদুকর!”

সংক্ষিপ্ত তাফসির:

সুরা ইউনুসের শুরুর এই আয়াতগুলোতে মক্কার মুশরিকদের একটি বড় আপত্তির জবাব দেওয়া হয়েছে। তারা মনে করত আল্লাহর নবী কোনো মানুষ হতে পারে না, ফেরেশতা হতে হবে। আল্লাহ জানিয়েছেন, একজন মানুষের কাছে ওহি আসা মোটেও আশ্চর্যের বিষয় নয়; কিন্তু কাফিররা সত্য গ্রহণ না করে উল্টো নবীজিকে জাদুকর বলে আখ্যায়িত করেছে।

(أ) اين ومتى نزلت سورة يونس؟ بين وجه تسميتها-

[কখন এবং কোথায় অবতীর্ণ হয়? এর নামকরণের কারণ উল্লেখ কর।]

অবতীর্ণ হওয়ার স্থান ও সময়:
সূরা ইউনুস একটি মক্কি সূরা। অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, এই সূরাটি হিজরতের আগে মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। ইবনে আব্বাস (রা.) এর মতে, এই সূরার ৪০ ও ৯৪ নং আয়াত ব্যতীত বাকি পুরো সূরাটিই মক্কায় নাজিল হয়েছে। এটি পবিত্র কুরআনের ১০ম সূরা, যার মোট আয়াত সংখ্যা ১০৯টি।

নামকরণের কারণ (وجه التسمية):
পবিত্র কুরআনের সূরাগুলোর নামকরণ সাধারণত সেই সূরায় আলোচিত কোনো উল্লেখযোগ্য ঘটনা বা শব্দের ভিত্তিতে করা হয়। এই সূরার ৯৮ নম্বর আয়াতে হযরত ইউনুস (আ.) এবং তাঁর জাতির তওবা কবুল হওয়ার একটি বিশেষ শিক্ষণীয় ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। পূর্ববর্তী কোনো জাতি আজাব দেখে ফেলার পর ঈমান আনলে তা কবুল করা হতো না, কিন্তু একমাত্র ইউনুস (আ.) এর জাতির ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালা আজাব আসার পূর্বমুহূর্তে তাদের তওবা কবুল করেছিলেন এবং আজাব উঠিয়ে নিয়েছিলেন। এই অনন্য ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার সূত্র ধরেই এই সূরার নাম রাখা হয়েছে ‘সূরা ইউনুস’।

(ب) “اوحينا الى رجل منهم” أوضح هذه القطعة-

[এই অংশটুকুর ব্যাখ্যা কর।]

ব্যাখ্যা:
এর অর্থ হলো- “আমি তাদের মধ্য থেকেই এক ব্যক্তির কাছে ওহি প্রেরণ করেছি।”
মক্কার মুশরিকদের একটি ভ্রান্ত ধারণা ছিল যে, যিনি আল্লাহর বার্তাবাহক বা নবী হবেন, তিনি কোনো সাধারণ মানুষ হতে পারেন না। তিনি হবেন কোনো ফেরেশতা বা অতিমানব। তাই আল্লাহ যখন মক্কার কুরাইশদের মধ্য থেকেই অতি পরিচিত এক ব্যক্তিকে (হযরত মুহাম্মদ সা.) নবী হিসেবে পাঠালেন, তখন তারা চরম আশ্চর্যান্বিত হলো এবং এটিকে মিথ্যা সাব্যস্ত করতে শুরু করল।
আল্লাহ তায়ালা তাদের এই মুর্খতার জবাবে আয়াতে বলেছেন, এতে আশ্চর্য হওয়ার কী আছে? মানুষের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছানোর জন্য, মানুষের সুখ-দুঃখ বোঝার জন্য এবং মানুষকে প্র্যাকটিক্যালি আমল করে দেখানোর জন্য একজন ‘মানুষ’ নবী হওয়াই তো সবচেয়ে বেশি যুক্তিসঙ্গত। আর তিনি তো কোনো অপরিচিত ব্যক্তি নন, বরং তিনি তোমাদেরই মধ্য থেকে বেড়ে ওঠা (رجل منهم) সবচেয়ে বিশ্বস্ত ব্যক্তি। সুতরাং তাঁর কাছে ওহি আসায় বিস্ময়ের কোনো কারণ নেই।

١٠- ويقولون لولا أنزل عليه اية من ربه فقل انما الغيب لله فانتظروا انى معكم من المنتظرين-

আয়াতসমূহের অনুবাদ:

“আর তারা বলে, ‘তাঁর রবের পক্ষ থেকে তাঁর ওপর কোনো নিদর্শন (মুজিজা) অবতীর্ণ হলো না কেন?’ সুতরাং আপনি বলুন, ‘অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান কেবল আল্লাহরই অধিকারে; অতএব তোমরা প্রতীক্ষা করো, আমিও তোমাদের সাথে প্রতীক্ষাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হলাম।'”

সংক্ষিপ্ত তাফসির:

মক্কার কুরাইশরা বারবার রাসুল (সা.)-এর কাছে তাদের মনগড়া বিভিন্ন অলৌকিক মুজিজা দাবি করত। আল্লাহ নবীজিকে নির্দেশ দেন তাদের জানিয়ে দিতে যে, কখন কোন মুজিজা প্রকাশ পাবে, তা সম্পূর্ণ গায়ব বা অদৃশ্য বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত, যা কেবল আল্লাহই জানেন। আল্লাহ চাইলে মুজিজা দেবেন, না চাইলে দেবেন না।

(أ) اذكر القصّة المتعلقة بالآية الكريمة-

[আয়াতে কারীমা সংশ্লিষ্ট ঘটনা বর্ণনা কর।]

সংশ্লিষ্ট ঘটনা:
মক্কার মুশরিকরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নবুওয়াতকে সত্য বলে মানতে অস্বীকার করত। তারা বলত, “তিনি যদি সত্যিই নবী হন, তবে পূর্ববর্তী নবী মুসা (আ.) এর লাঠি বা ঈসা (আ.) এর মতো মৃতকে জীবিত করার মুজিজা দেখাচ্ছেন না কেন?” আবার কখনো তারা দাবি করত, “মক্কার পাহাড়গুলোকে সোনার পাহাড় বানিয়ে দিন”, অথবা “আসমান থেকে আমাদের ওপর ফেরেশতা নামিয়ে আনুন।”
তাদের এসব অবান্তর দাবির উত্তরে আল্লাহ এই আয়াত নাজিল করেন। এতে রাসুল (সা.)-কে জানিয়ে দেওয়া হয় যে, মুজিজা দেখানো কোনো নবীর নিজ ক্ষমতার অধীন নয়; এটি সম্পূর্ণ আল্লাহর ইচ্ছা। আল্লাহ যখন যাকে ইচ্ছা, যে মুজিজা দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেন, তখন সেটিই দেন। আর ভবিষ্যতের এই বিষয়গুলো ‘গায়ব’ এর অন্তর্ভুক্ত। তাই আল্লাহ নির্দেশ দেন, “আপনি তাদের বলে দিন, তোমরাও অপেক্ষা করো যে আল্লাহ তোমাদের এসব অবাধ্যতার কী ফায়সালা করেন, আর আমিও অপেক্ষা করি।”

(ب) ما معنى الغيب؟ هل يعلم غيبا احد غير الله؟ بين-

[الغيب অর্থ কী? আল্লাহ ছাড়া অন্য কেহ গায়েব জানে কিনা? বর্ণনা কর।]

الغيب (গায়েব) এর অর্থ:
الغيب শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো অদৃশ্য, যা দেখা যায় না বা যা ইন্দ্রিয়ের অগোচরে থাকে। শরিয়তের পরিভাষায়, যে জ্ঞান মানুষের পঞ্চইন্দ্রিয় (চোখ, কান, নাক ইত্যাদি) বা সাধারণ বুদ্ধি-বিবেক দ্বারা অর্জন করা সম্ভব নয়, তাকে ইলমে গায়েব বা অদৃশ্যের জ্ঞান বলা হয়। যেমন- ভবিষ্যতের খবর, জান্নাত-জাহান্নাম, ফেরেশতা ইত্যাদি।

আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ গায়েব জানে কি না?
কুরআন ও সুন্নাহর সুস্পষ্ট আকিদা হলো—পরিপূর্ণ ইলমে গায়েব কেবল মহান আল্লাহরই নিজস্ব গুণ। আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো মানুষ, জ্বিন, ফেরেশতা বা নবী-রাসুল নিজ থেকে গায়েবের খবর জানেন না।
কুরআনে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্টভাবে বলেছেন: “বলুন, আল্লাহ ছাড়া আসমান ও জমিনে অন্য কেউ গায়েবের খবর জানে না।” (সূরা আন-নামল: ৬৫)
তবে আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রেরিত নবী-রাসুলদেরকে ওহির মাধ্যমে প্রয়োজন অনুযায়ী গায়েবের কিছু কিছু সংবাদ জানিয়ে থাকেন। যেমন—রাসুলুল্লাহ (সা.) কিয়ামত বা জান্নাত-জাহান্নামের অনেক খবর জানিয়েছেন। কিন্তু এই জ্ঞান তাঁদের নিজস্ব ছিল না, বরং তা ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহির মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞান (عطاء إلهي)। সুতরাং স্বাধীনভাবে বা নিজ ক্ষমতায় গায়েব জানা কেবল আল্লাহরই বৈশিষ্ট্য, এতে অন্য কারো অংশীদারি নেই।

مجموعة (ب) [খ-অংশ: সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন]

١١- اكتب نبذة من حياة رشيد رضا مع خصائص تفسيره ‘تفسير المنار’-

[১১. রশিদ রধা এর জীবনী উল্লেখসহ তার রচিত تفسير المنار এর বৈশিষ্ট্যসমূহ লেখ।]

রশিদ রিধা (رحمه الله) এর সংক্ষিপ্ত জীবনী:
তাঁর পুরো নাম মুহাম্মদ রশিদ বিন আলী রিধা। তিনি ১৮৬৫ সালে লেবাননের ত্রিপোলি শহরের নিকটবর্তী কালামুন গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন আধুনিক যুগের একজন শ্রেষ্ঠ ইসলামি চিন্তাবিদ, সংস্কারক এবং প্রখ্যাত মুফাসসির। তিনি জামালুদ্দিন আফগানি এবং মুফতি মুহাম্মদ আবদুহুর সুযোগ্য ছাত্র ছিলেন। তিনি ১৮৯৮ সালে মিশরের কায়রো থেকে ‘আল-মানার’ নামক একটি বিখ্যাত ইসলামি পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেন, যা গোটা মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। তিনি ইসলামি ঐক্য ও পুনর্জাগরণের জন্য সারা জীবন কাজ করেছেন এবং ১৯৩৫ সালে ইন্তেকাল করেন।

تفسير المنار (তাফসিরে মানার) এর বৈশিষ্ট্যসমূহ:
তাফসিরে মানার হলো আধুনিক যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি তাফসির গ্রন্থ। এটি মূলত তাঁর শিক্ষক মুফতি মুহাম্মদ আবদুহুর তাফসিরের লেকচারগুলোর সংকলন এবং রশিদ রিধার নিজের জ্ঞানগর্ভ ব্যাখ্যার সমন্বয়। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
১. যুক্তি ও বিজ্ঞানের সমন্বয়: এই তাফসিরে কুরআনের আয়াতগুলোকে অন্ধভাবে অনুকরণ না করে আধুনিক বিজ্ঞান ও যুক্তির সাথে চমৎকারভাবে সমন্বয় করা হয়েছে।
২. সামাজিক সংস্কারের ওপর জোর: এটি কেবল একটি ধর্মীয় ব্যাখ্যা নয়, বরং তৎকালীন মুসলিম সমাজের কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ও রাজনৈতিক দুর্বলতা দূর করার দিকনির্দেশনা এই তাফসিরে ব্যাপকভাবে স্থান পেয়েছে।
৩. ইসরাইলি বর্ণনা বর্জন: পূর্ববর্তী অনেক তাফসিরে ভিত্তিহীন ইসরাইলি কল্পকাহিনী স্থান পেলেও, তাফসিরে মানারে এই ধরনের বানোয়াট বর্ণনাকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
৪. কুরআন দিয়ে কুরআনের তাফসির: এই তাফসিরের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, একটি আয়াতের ব্যাখ্যায় কুরআনেরই অন্য আয়াতকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

١٢- وازن بين خصائص صفوة التفاسير وتفسير المنير-

[১২. صفوة التفاسير ও تفسير المنير এর বৈশিষ্ট্যসমূহের তুলনামূলক আলোচনা কর।]

সমকালীন তাফসির সাহিত্যের জগতে ‘সফওয়াতুত তাফাসির’ এবং ‘আত-তাফসিরুল মুনির’ উভয় গ্রন্থই অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং সমাদৃত। নিচে এদের তুলনামূলক আলোচনা (موازنة) করা হলো:

صفوة التفاسير (সফওয়াতুত তাফাসির):
১. রচয়িতা: প্রখ্যাত সিরীয় মুফাসসির আল্লামা মুহাম্মদ আলী আস-সাবুনি (রহ.)।
২. প্রধান বৈশিষ্ট্য (সারসংক্ষেপ): ‘সফওয়াহ’ শব্দের অর্থ হলো নির্যাস বা খাঁটি জিনিস। এই তাফসিরটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি পূর্ববর্তী ৬টি বিখ্যাত তাফসিরের (তাবারী, কাশশাফ, কুরতুবী, আলুসী, ইবনে কাসির, বাহরুল মুহিত) সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও সারগর্ভ নির্যাস নিয়ে রচিত। এটি অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল আরবি ভাষায় লেখা, যা সাধারণ পাঠকদের জন্য খুব সহজে বোধগম্য। এখানে ফিকহি মাসআলার বিস্তারিত বিতর্কে না গিয়ে কুরআনের মূল মেসেজটিকে সহজভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

تفسير المنير (আত-তাফসিরুল মুনির):
১. রচয়িতা: বিখ্যাত আধুনিক ইসলামি স্কলার ড. ওয়াহবা মুস্তফা আয-যুহাইলি (রহ.)।
২. প্রধান বৈশিষ্ট্য (বিশ্লেষণধর্মী): এটি একটি আধুনিক ও অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এনসাইক্লোপেডিক তাফসির। এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর অসাধারণ উপস্থাপন পদ্ধতি। প্রতিটি সূরার শুরুতে তার সারসংক্ষেপ দেওয়া হয়েছে। এরপর আয়াতগুলোকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে প্রথমে শাব্দিক অর্থ, তারপর শানে নুযূল, এরপর আলংকারিক দিক এবং সবশেষে ওই আয়াত থেকে শিক্ষণীয় ফিকহি মাসআলা বা হুকুম-আহকামগুলো (ما ترشد إليه الآيات) পয়েন্ট আকারে তুলে ধরা হয়েছে। এটি গবেষক ও আলেমদের জন্য এক অমূল্য সম্পদ।

উপসংহার: ‘সফওয়াতুত তাফাসির’ মূলত সাধারণ শিক্ষিত সমাজ এবং যারা সংক্ষেপে কুরআনের অর্থ বুঝতে চান তাদের জন্য বেশি উপযোগী। অন্যদিকে ‘আত-তাফসিরুল মুনির’ হলো এমন একটি পূর্ণাঙ্গ ও পদ্ধতিগত তাফসির, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, গবেষক এবং আলেমদের জন্য গভীরভাবে কুরআন গবেষণার একটি আধুনিক রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়।

Follow Our Facebook Page
দ্রুত নতুন বই পেতে যুক্ত থাকুন
Follow Now