Ulumil Quran (Code: 201101) – ২০২৩ প্রশ্ন ও উত্তর
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৩ এর আল-কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের আল-মাদখাল ইলা উলুমিল কুরআন (المدخل إلى علوم القرآن) বিষয়ের সম্পূর্ণ উত্তরমালা。
বিঃদ্রঃ পরীক্ষার্থীদের সুবিধার্থে মূল প্রশ্নপত্রের ক-বিভাগ (রচনামূলক) এবং খ-বিভাগ (সংক্ষিপ্ত) এর সবগুলো প্রশ্নের ১০০% নির্ভুল উত্তর দেওয়া হলো।
مجموعة (أ) / (ক) অংশ — রচনামূলক প্রশ্ন (মান—১৫x৪=৬০)
[ أجب عن أربعة من الأسئلة التالية / নিম্নের যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও ]
১। علوم القرآن এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ কী? এর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ সম্পর্কে বিশদভাবে বর্ণনা কর।
আভিধানিক অর্থ:
‘উলূম’ (علوم) শব্দটি আরবি ‘ইলম’ (علم)-এর বহুবচন, যার অর্থ জ্ঞান বা বিদ্যা। আর ‘কুরআন’ (القرآن) হলো মহান আল্লাহর কালাম। সুতরাং ‘উলূমুল কুরআন’ অর্থ হলো কুরআন বিষয়ক জ্ঞান বা বিদ্যাসমূহ।
পারিভাষিক অর্থ:
ইসলামি পরিভাষায়, যেসব শাস্ত্র বা বিদ্যা পবিত্র কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হওয়া, এর বিন্যাস, সংকলন, পঠনপদ্ধতি (কিরাত), তাফসির, নাসিখ-মানসুখ, মাক্কী-মাদানী, মুহকাম-মুতানাশিহ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা করে, তাকে একত্রে ‘উলূমুল কুরআন’ বলে।
উলূমুল কুরআনের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ:
উলূমুল কুরআন শাস্ত্রটি একদিনে গড়ে ওঠেনি। বিভিন্ন যুগে পর্যায়ক্রমে এর বিকাশ ঘটেছে:
- রাসূল (সা.) ও সাহাবাদের যুগ: কুরআন নাজিল হওয়ার সময় থেকেই মূলত উলূমুল কুরআনের উৎপত্তি শুরু হয়। সাহাবাগণ কুরআন পড়ার সাথে সাথে রাসূল (সা.) এর কাছ থেকে এর অর্থ এবং শানে নুযূল জেনে নিতেন। এ যুগে চার খলিফা ছাড়াও ইবনে আব্বাস (রা.), ইবনে মাসউদ (রা.) ও উবাই বিন কাব (রা.) ছিলেন অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুফাসসির।
- তাবিঈদের যুগ: এ যুগে তাফসিরের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা তৈরি হয় এবং কিছু বিষয় লিখিত হতে থাকে। মুজাহিদ, কাতাদা, ইকরিমা, সাঈদ ইবনে জুবায়ের প্রমুখ তাবিঈগণ তাফসির শাস্ত্রকে আরও সমৃদ্ধ করেন। তারা সাহাবাদের কাছ থেকে শুনে তাফসির বর্ণনা করতেন।
- সংকলন যুগ (২য় ও ৩য় হিজরি): হিজরি দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতকে উলূমুল কুরআনের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর পৃথক পৃথক গ্রন্থ রচিত হতে থাকে। যেমন, আলী ইবনুল মাদীনী (রহ.) ‘আসবাবুন নুযূল’ সম্পর্কে এবং আবু উবাইদ কাসিম ইবনে সাল্লাম ‘নাসিখ-মানসুখ’ ও ‘কিরাত’ সম্পর্কে বই লেখেন। ইমাম তাবারী (রহ.) তাঁর বিখ্যাত তাফসির গ্রন্থ রচনা করেন।
- পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ: চতুর্থ শতক থেকে এটি একটি সুশৃঙ্খল শাস্ত্রে পরিণত হতে থাকে। অষ্টম শতকে আল্লামা যরকশী (রহ.) ‘আল-বুরহান ফি উলূমিল কুরআন’ রচনা করেন। অবশেষে নবম শতকে আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.) তাঁর বিশ্বখ্যাত ‘আল-ইতকান ফি উলূমিল কুরআন’ রচনার মাধ্যমে এই শাস্ত্রকে পূর্ণতা দান করেন, যা আজও অদ্বিতীয়।
২। প্রাচীন ও আধুনিক যুগের জাহিলিয়াতপন্থিরা বলে যে, “কোনো এক মানবগুরুর কাছ থেকে মুহাম্মদ কুরআন শিখেছে”—অকাট্য দলিল দ্বারা তাদের এই সন্দেহের অপনোদন কর।
সন্দেহের বিবরণ:
মক্কার কুরাইশরা এবং আধুনিক যুগের কিছু ওরিয়েন্টালিস্ট বা প্রাচ্যবিদ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দাবি করে যে, মুহাম্মদ (সা.) নিজে কুরআন রচনা করেছেন অথবা তিনি মক্কায় অবস্থানকারী জাবর, ইয়াসার বা কোনো রোমান খ্রিষ্টান দাস বা পাদ্রির কাছ থেকে এই গ্রন্থ শিখেছেন।
অকাট্য যুক্তি দ্বারা সন্দেহের অপনোদন:
তাদের এই দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং অযৌক্তিক। নিচের অকাট্য যুক্তিগুলোর মাধ্যমে এই সন্দেহ দূর করা যায়:
- উম্মি নবী: রাসূল (সা.) ছিলেন ‘উম্মি’ বা নিরক্ষর। তিনি কখনোই কারো কাছে লেখাপড়া শিখেননি। চল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি কখনো কোনো কবিতা বা সাহিত্য রচনা করেননি। একজন নিরক্ষর মানুষের পক্ষে হঠাৎ করে এমন উচ্চাঙ্গের সাহিত্যপূর্ণ ও জ্ঞানগর্ভ গ্রন্থ রচনা করা একেবারেই অসম্ভব।
- ভাষার বিশাল পার্থক্য: কাফিররা যাদের কাছ থেকে রাসূল (সা.) কুরআন শিখেছেন বলে অভিযোগ করত, তাদের অনেকেই ছিল অনারব বা আযমী। তাদের মাতৃভাষা আরবি ছিল না এবং তারা আরবিতে ঠিকমতো কথাও বলতে পারত না। অন্যদিকে কুরআনের ভাষা হলো চূড়ান্ত স্তরের বিশুদ্ধ, অলংকারপূর্ণ ও প্রাঞ্জল আরবি (আরবিয়্যুম মুবীন)। একজন অনারব ব্যক্তির কাছ থেকে এমন বিশুদ্ধ আরবি গ্রন্থ শেখার দাবি অত্যন্ত হাস্যকর। স্বয়ং আল্লাহ সূরা নাহলের ১০৩ নং আয়াতে এই জবাব দিয়েছেন।
- ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক তথ্য: কুরআনে পূর্ববর্তী নবী-রাসূলদের এবং বিভিন্ন জাতির এমন নিখুঁত ইতিহাস বর্ণনা করা হয়েছে এবং আধুনিক মহাকাশ ও ভ্রূণবিজ্ঞানের এমন তথ্য দেওয়া হয়েছে, যা সে যুগের আরবের কোনো মানুষের পক্ষেই জানা সম্ভব ছিল না।
- চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় চরম ব্যর্থতা: আল্লাহ তাআলা কুরআনের মতো একটি সূরা বা অন্তত একটি আয়াত রচনা করে আনার জন্য তৎকালীন আরবের শ্রেষ্ঠ কবি-সাহিত্যিকদের চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। কিন্তু তারা চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। যদি কুরআন কোনো মানুষের লেখা হতো, তবে তৎকালীন পণ্ডিতরাও তা লিখতে পারত।
৩। কুরআনের সূরাগুলোর বিন্যাস কি ওহি নির্ভর না ইজতিহাদ নির্ভর? এ বিষয়ে আলিমগণের মতামত কী? বিস্তারিত বর্ণনা কর।
উত্তর: কুরআনের ১১৪টি সূরার বর্তমান বিন্যাস বা তারতিব কীভাবে হয়েছে—এটি কি আল্লাহর ওহি (তাওকিফি) নাকি সাহাবাদের ইজতিহাদের মাধ্যমে নির্ধারিত—এ নিয়ে ইসলামি স্কলারদের মাঝে দীর্ঘ আলোচনা রয়েছে। এ বিষয়ে আলিমগণের প্রধান তিনটি মতামত নিম্নে বিস্তারিত বর্ণনা করা হলো:
- প্রথম মত (সম্পূর্ণ তাওকিফি বা ওহিনির্ভর): অধিকাংশ আলিম এবং জমহুরের মতে, সূরাগুলোর বিন্যাস সম্পূর্ণ ওহি নির্ভর (তাওকিফি)। জিবরীল (আ.) রাসূল (সা.)-কে যেভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, রাসূল (সা.) সেভাবেই সাহাবাদেরকে সূরাগুলোর ক্রম নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এটিই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য, শক্তিশালী ও বিশুদ্ধ মত। ইমাম বাকিল্লানি (রহ.) এবং আল্লামা সুয়ূতী (রহ.) এই মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
- দ্বিতীয় মত (সম্পূর্ণ ইজতিহাদি): ইমাম মালেক (রহ.) ও কিছু আলিমের মতে, সূরাগুলোর বিন্যাস সাহাবায়ে কেরামের ইজতিহাদ বা ব্যক্তিগত গবেষণার ভিত্তিতে হয়েছে। উসমান (রা.) যখন কুরআন সংকলন করেন, তখন সাহাবাগণ নিজেদের মতামতের ভিত্তিতে বড় সূরাগুলো আগে এবং ছোট সূরাগুলো পরে—এভাবে সাজিয়েছেন।
- তৃতীয় মত (আংশিক তাওকিফি ও আংশিক ইজতিহাদি): ইবনে আতিয়া (রহ.) ও কিছু আলিমের মতে, কুরআনের অধিকাংশ সূরার বিন্যাস তাওকিফি, তবে অল্প কিছু সূরার (যেমন- সূরা আনফাল ও সূরা তাওবার) বিন্যাস সাহাবাদের ইজতিহাদের ভিত্তিতে হয়েছে।
উপসংহার: সর্বজনস্বীকৃত ও বিশুদ্ধ মত হলো, কুরআনের আয়াত এবং সূরা উভয়ের বিন্যাসই সম্পূর্ণ ওহি বা তাওকিফি। এর অকাট্য প্রমাণ হলো, রাসূল (সা.) স্বয়ং নামাজে সূরাগুলো একটি নির্দিষ্ট ক্রমানুসারে পড়তেন এবং জীবনের শেষ রমজানে জিবরীল (আ.) এর সাথে সম্পূর্ণ কুরআন বর্তমান ক্রমানুসারেই দাওর (রিভিশন) করেছিলেন। সাহাবাগণ কেবল সেই ক্রম অনুসারেই তা গ্রন্থবদ্ধ করেছেন।
৪। أنزل القرآن منجما দ্বারা উদ্দেশ্য কী? এর হিকমত কী? বিস্তারিত বর্ণনা কর।
أنزل القرآن منجما এর অর্থ বা উদ্দেশ্য:
‘আনযালুল কুরআন মুনাজজামান’ (أنزل القرآن منجما) এর আভিধানিক অর্থ হলো খণ্ড খণ্ড বা পর্যায়ক্রমে অবতীর্ণ হওয়া। এর উদ্দেশ্য হলো, পবিত্র কুরআন অন্যান্য আসমানি কিতাবের মতো একত্রে সম্পূর্ণ বা একবারে অবতীর্ণ হয়নি; বরং সুদীর্ঘ ২৩ বছর ধরে মানুষের প্রয়োজন, পরিস্থিতি ও ঘটনাবলির প্রেক্ষাপট অনুযায়ী খণ্ড খণ্ড রূপে, কয়েকটি আয়াত বা ছোট ছোট সূরা আকারে অল্প অল্প করে অবতীর্ণ হয়েছে।
খণ্ড খণ্ডভাবে অবতীর্ণ হওয়ার হিকমত বা প্রজ্ঞাসমূহ:
- রাসূল (সা.)-এর অন্তরকে মজবুত করা: মক্কার কাফিরদের চরম অত্যাচার ও বিরোধিতায় যখনই রাসূল (সা.) মানসিকভাবে কষ্ট পেতেন, তখনই নতুন ওহি নাজিল হয়ে তাঁকে সান্ত্বনা দিত এবং তাঁর অন্তরকে প্রশান্ত ও সুদৃঢ় করত। (সূরা ফুরকান: ৩২)।
- মুখস্থ করা ও বোঝা সহজ হওয়া: তৎকালীন আরবরা মূলত শ্রুতি ও স্মৃতির ওপর নির্ভরশীল ছিল। অল্প অল্প করে নাজিল হওয়ার কারণে নিরক্ষর সাহাবায়ে কেরামের জন্য কুরআনের আয়াতগুলো সহজে মুখস্থ করা এবং এর গভীর অর্থ অনুধাবন করা অত্যন্ত সহজ হয়েছিল। একবারে নাজিল হলে তা আয়ত্ত করা কঠিন হতো।
- বিধানসমূহ পর্যায়ক্রমে প্রবর্তন: জাহিলি সমাজের গভীরভাবে শেকড় গাড়ানো বদভ্যাসগুলো (যেমন- মদ পান, জুয়া) দূর করা সহজ ছিল না। তাই ইসলামী বিধানগুলো মানুষের ওপর হঠাৎ চাপিয়ে না দিয়ে ধাপে ধাপে প্রবর্তন করা হয়েছে। এতে মানুষের জন্য তা মেনে নেওয়া ও আমল করা সহজ হয়েছে।
- সমসাময়িক প্রশ্নের তাৎক্ষণিক উত্তর: যখনই সাহাবাগণ কোনো দ্বীনি বিষয়ে প্রশ্ন করতেন বা কাফিররা কোনো সন্দেহ নিয়ে আসত কিংবা কোনো নতুন সামাজিক সমস্যার উদ্ভব হতো, আল্লাহ তাআলা সাথে সাথেই আয়াত নাজিল করে তার সমাধান ও উত্তর দিয়ে দিতেন।
- নাসিখ-মানসুখ এর বিধান কার্যকর করা: যুগের চাহিদা ও মানুষের কল্যাণে আগের কোনো বিধান রহিত করে নতুন বিধান (নাসিখ-মানসুখ) দেওয়ার জন্য খণ্ড খণ্ডভাবে নাজিল হওয়া জরুরি ছিল।
৫। আবু বকর (রা) ও উসমান (রা) এর যুগে আল-কুরআনুল কারিম একত্রিকরণ সম্পর্কে বর্ণনা কর এবং দুই যুগে দুইবার কুরআন একত্রিকরণের মধ্যে পার্থক্য কী? বর্ণনা কর।
আবু বকর (রা.) এর যুগে কুরআন একত্রিকরণ:
রাসূল (সা.) এর ইন্তেকালের পর খলিফা আবু বকর (রা.) এর সময়ে ভণ্ড নবী মুসাইলিমাতুল কাযযাবের বিরুদ্ধে ইয়ামামার যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে বহু হাফেজে কুরআন সাহাবী শহীদ হন। এতে উমর (রা.) শঙ্কিত হয়ে পড়েন যে, হাফেজরা এভাবে শহীদ হতে থাকলে কুরআনের অনেক অংশ হারিয়ে যেতে পারে। তিনি আবু বকর (রা.)-কে কুরআন গ্রন্থাকারে সংকলনের পরামর্শ দেন। খলিফা আবু বকর (রা.) প্রথমে রাজি না হলেও পরে সম্মত হন এবং প্রখ্যাত ওহি লেখক যায়েদ বিন সাবিত (রা.)-কে এই গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেন। তিনি চামড়া, হাড়, পাথর এবং সাহাবাদের মুখস্থের সাথে দ্বিগুণ সাক্ষ্য মিলিয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সম্পূর্ণ কুরআন একটি মাসহাফে (গ্রন্থে) লিপিবদ্ধ করেন।
উসমান (রা.) এর যুগে কুরআন একত্রিকরণ:
ইসলামের প্রচার যখন আরব ছাড়িয়ে আর্মেনিয়া, আজারবাইজানসহ বিভিন্ন অনারব দেশগুলোতে পৌঁছায়, তখন মানুষের মাতৃভাষার পার্থক্যের কারণে কুরআনের পঠনপদ্ধতি (কিরাত) নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়। এক দল অন্য দলের কিরাতকে ভুল বলতে শুরু করে। এই ভয়ানক ফিতনা দূর করার জন্য খলিফা উসমান (রা.) আবু বকর (রা.)-এর যুগে সংকলিত এবং হাফসা (রা.) এর কাছে সংরক্ষিত মূল কপিটি নিয়ে আসেন। এরপর তিনি যায়েদ বিন সাবিত (রা.) এর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে কুরাইশি রীতি অনুযায়ী মূল কপির একাধিক অনুলিপি (কপি) তৈরি করে বিভিন্ন প্রদেশে পাঠিয়ে দেন এবং ভিন্ন ভিন্ন পাঠের বাকি সব খসড়া কপি পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেন, যাতে উম্মত একটিমাত্র কিরাতের ওপর ঐক্যবদ্ধ থাকে।
দুই যুগের সংকলনের মাঝে পার্থক্য:
- উদ্দেশ্যের পার্থক্য: আবু বকর (রা.) এর সংকলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল হাফেজদের মৃত্যুর কারণে কুরআনের কোনো অংশ যেন হারিয়ে বা বিলুপ্ত না হয়ে যায়, তা রক্ষা করা। অন্যদিকে উসমান (রা.) এর সংকলনের উদ্দেশ্য ছিল কিরাত বা পঠনরীতি নিয়ে উম্মতের ভেতরের বিভেদ দূর করা এবং সবাইকে একটিমাত্র বিশুদ্ধ পাঠরীতির ওপর ঐক্যবদ্ধ করা।
- পদ্ধতির পার্থক্য: আবু বকর (রা.) এর যুগে সাহাবাদের কাছে থাকা চামড়া, পাথর বা পাতায় লেখা বিক্ষিপ্ত অংশগুলোকে একত্রিত করে একটি গ্রন্থে বা ফাইলে রূপ দেওয়া হয়েছিল। আর উসমান (রা.) এর যুগে নতুন করে কোনো অংশ খোঁজা হয়নি, বরং পূর্বের সেই একটিমাত্র প্রামাণ্য গ্রন্থ থেকে অনুলিপি (কপি) তৈরি করে তা সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
৬। ‘নাস্খ’ এর পরিচয় দাও। নাস্খ-এর প্রকারসমূহ ও হিকমত বিস্তারিত বর্ণনা কর।
নাস্খ (النسخ) এর পরিচয়:
আভিধানিক অর্থে নাস্খ মানে বাতিল করা, পরিবর্তন করা, রহিত করা বা স্থানান্তর করা।
পারিভাষিক অর্থে, শরীয়তের পূর্ববর্তী কোনো হুকুম বা বিধানকে পরবর্তী কোনো শক্তিশালী ওহির দলিলের মাধ্যমে আইনগতভাবে রহিত বা বাতিল করাকে নাস্খ বলে। যে আয়াতটি রহিত করে তাকে ‘নাসিখ’ এবং যে আয়াতের বিধান রহিত হয়ে যায় তাকে ‘মানসুখ’ বলে।
নাস্খ-এর প্রকারসমূহ:
কুরআনুল কারিমে নাস্খ প্রধানত তিন প্রকার হয়ে থাকে:
- নাস্খুল হুকুম ওয়া তিলাওয়াত (বিধান ও তিলাওয়াত উভয়ই রহিত): এমন কিছু আয়াত ছিল যার বিধান এবং তিলাওয়াত উভয়ই রহিত হয়ে গেছে। এগুলো এখন আর কুরআনে লিপিবদ্ধ নেই এবং এর ওপর আমলও করা যায় না। (যেমন- দশবার দুধ পানের মাধ্যমে হারাম হওয়ার আয়াত)।
- নাস্খুল হুকুম দুন তিলাওয়াত (বিধান রহিত, কিন্তু তিলাওয়াত বিদ্যমান): এমন আয়াত যার বিধান বা হুকুম রহিত হয়ে গেছে, কিন্তু এর তিলাওয়াত কুরআনে এখনো বিদ্যমান রয়েছে। কুরআনে এ ধরনের নাস্খই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। (যেমন- বিধবা নারীর এক বছর ইদ্দত পালনের বিধান রহিত করে চার মাস দশ দিন করা হয়েছে, কিন্তু পূর্বের আয়াতটি কুরআনে রয়ে গেছে)।
- নাস্খুত তিলাওয়াত দুন হুকুম (তিলাওয়াত রহিত, কিন্তু বিধান বিদ্যমান): এমন আয়াত যার শব্দ বা তিলাওয়াত কুরআন থেকে রহিত বা মুছে ফেলা হয়েছে, কিন্তু এর আইনি বিধান শরীয়তে এখনো বলবৎ আছে (যেমন- বিবাহিত ব্যভিচারীকে রজম বা পাথর নিক্ষেপ করার বিধান)।
নাস্খ-এর হিকমত বা প্রজ্ঞাসমূহ:
- মানবজাতির কল্যাণের প্রতি লক্ষ্য রাখা। সমাজের বিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের উপযোগিতার জন্যই পূর্বের বিধান রহিত করে নতুন বিধান দেওয়া হয়েছে।
- কঠিন হুকুম রহিত করে সহজ হুকুম প্রবর্তনের মাধ্যমে মানুষের জন্য শরীয়তের বিধান পালন করা সহজ করা।
- বান্দার ঈমান ও আনুগত্যের পরীক্ষা নেওয়া। অর্থাৎ আল্লাহ যখন যে হুকুম দেন, বান্দা বিনা দ্বিধায় তা মেনে নেয় কি না তা যাচাই করা।
৭। التفسير ও التأويل এর সংজ্ঞা দাও এবং উভয়ের মাঝে পার্থক্য উল্লেখ কর।
তাফসির (التفسير) এর সংজ্ঞা:
তাফসির শব্দটি আরবি ‘ফাসরুন’ (فسر) থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ প্রকাশ করা বা পর্দা উন্মোচন করা। পারিভাষিক অর্থে, তাফসির এমন একটি শাস্ত্র, যার মাধ্যমে পবিত্র কুরআনের আয়াতগুলোর বাহ্যিক অর্থ, শানে নুযূল, ব্যাকরণগত দিক এবং মানুষের বোধগম্য অনুযায়ী আল্লাহর উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়।
তাবিল (التأويل) এর সংজ্ঞা:
তাবিল শব্দটি আরবি ‘আউলুন’ (أول) থেকে এসেছে, যার অর্থ ফিরে যাওয়া বা পরিণতি। পারিভাষিক অর্থে, একটি শব্দের একাধিক সম্ভাব্য অর্থ থাকলে, শরীয়তের দলিলের ভিত্তিতে সবচেয়ে উপযুক্ত অর্থটি গ্রহণ করা এবং বাকি অর্থগুলো বর্জন করাকে তাবিল বলে। এটি মূলত আয়াতের গূঢ় অর্থ বা অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অনুধাবন করার প্রক্রিয়া।
তাফসির ও তাবিল এর মাঝে পার্থক্য:
- প্রকৃতিগত পার্থক্য: তাফসির হলো আয়াতের বাহ্যিক, আক্ষরিক ও শাব্দিক অর্থের ব্যাখ্যা; আর তাবিল হলো আয়াতের অন্তর্নিহিত, গূঢ় অর্থের ব্যাখ্যা ও পরিণতি।
- ভিত্তিগত পার্থক্য: তাফসিরের মূল ভিত্তি হলো রিওয়ায়াত বা বর্ণনা (যেমন- রাসূল সা.-এর হাদিস বা সাহাবাদের উক্তি); আর তাবিলের মূল ভিত্তি হলো দিরায়াত বা ইজতিহাদ, বুদ্ধি ও গভীর গবেষণা।
- প্রয়োগক্ষেত্র: তাফসির মূলত সুস্পষ্ট ও মুহকাম আয়াতের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়; আর তাবিল মূলত অস্পষ্ট ও মুতাশাবিহ আয়াতের সম্ভাব্য অর্থ নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।
- পরিধি: তাফসির একটি ব্যাপক বিষয়, যা কুরআনের সব জায়গায় প্রয়োগ হয়। অন্যদিকে তাবিলের পরিধি তুলনামূলক সীমিত, যা কেবল অর্থের রূপক বা বহুমাত্রিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রয়োগ হয়।
৮। إعجاز القرآن الكريم অর্থ কী? কুরআন কারিমের ‘ইজাযের বিভিন্ন দিক বিস্তারিত বর্ণনা কর।
ইজাযুল কুরআন (إعجاز القرآن) এর অর্থ:
‘ইজায’ অর্থ অক্ষম বা অপারগ করে দেওয়া। ইজাযুল কুরআন বলতে বোঝায় পবিত্র কুরআনের এমন অলৌকিক ও অনন্য বৈশিষ্ট্য, যার সমকক্ষ কোনো কিছু বা একটি ছোট সূরা রচনা করতেও সমগ্র জিন ও মানবজাতি চিরকালের জন্য সম্পূর্ণভাবে অক্ষম ও অপারগ।
কুরআনের ইজাযের বিভিন্ন দিক:
কুরআনের অলৌকিকত্ব কেবল একটি বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর প্রতিটি পরতে পরতে ইজায বা অলৌকিকত্ব বিদ্যমান। এর প্রধান দিকগুলো হলো:
- ভাষাগত ও সাহিত্যিক ইজায (الإعجاز البلاغي): কুরআনের আরবি ভাষা, শব্দচয়ন, অলংকার ও প্রাঞ্জলতা এতই উচ্চাঙ্গের এবং মধুর যে, তৎকালীন আরবের শ্রেষ্ঠ কবি-সাহিত্যিকরাও এর একটি ক্ষুদ্র সূরার সমকক্ষ কিছু রচনা করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। এর গদ্য ও পদ্যের সংমিশ্রণ এক জাদুকরী আবেদন তৈরি করে।
- বৈজ্ঞানিক ইজায (الإعجاز العلمي): কুরআনে মহাকাশবিজ্ঞান, পৃথিবীর সৃষ্টি, ভ্রূণতত্ত্ব, সমুদ্রবিজ্ঞান ও ভূতত্ত্বের এমন অনেক সূক্ষ্ম তথ্য দেওয়া হয়েছে, যা আধুনিক বিজ্ঞান মাত্র কয়েক দশক আগে আবিষ্কার করেছে। ১৪০০ বছর আগে মরুভূমির বুকে একজন নিরক্ষর নবীর পক্ষে এগুলো জানা সম্পূর্ণ অসম্ভব ছিল।
- অদৃশ্য ও ভবিষ্যৎ সংবাদের ইজায (الإعجاز الغيبي): কুরআনে পারস্যের বিরুদ্ধে রোমানদের বিজয়, মক্কা বিজয় এবং আবু লাহাবের ইসলাম গ্রহণ না করে মারা যাওয়ার মতো এমন কিছু সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎবাণী করা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছে।
- ঐতিহাসিক ইজায: কুরআনে পূর্ববর্তী জাতিসমূহ, যেমন- আদ, সামুদ, ফেরাউনের ডুবে মরা এবং বিভিন্ন নবীদের এমন নির্ভুল ও নিখুঁত ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে, যা সে যুগে আরবের কারও জানা ছিল না বা কোনো গ্রন্থেও সংরক্ষিত ছিল না।
- আইন ও বিধানগত ইজায: কুরআনের দেওয়া আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও পারিবারিক আইনগুলো এতই ভারসাম্যপূর্ণ ও নিখুঁত যে, যুগ যুগ ধরে তা আধুনিক সমস্যার সমাধান দিয়ে আসছে। এটি কিয়ামত পর্যন্ত সকল মানুষের কল্যাণের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ ও অলৌকিক সংবিধান।
مجموعة (ب) / (খ) অংশ — সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্ন (মান—৫x৪=২০)
[ أجب عن أربعة من الأسئلة التالية / নিম্নের যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও ]
৯। আল-কুরআনুল কারিম, আল-হাদিসুল কুদসী ও আল-হাদিসুন নাবাবীর মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর:
১. আল-কুরআন: এর শব্দ এবং অর্থ উভয়ই সরাসরি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে জিবরীল (আ.) এর মাধ্যমে অবতীর্ণ। এর তিলাওয়াত ইবাদত এবং নামাজে তা পড়া ফরজ।
২. হাদিসে কুদসী: এর অর্থ বা মূলভাব আল্লাহর পক্ষ থেকে ইলহাম বা স্বপ্নের মাধ্যমে প্রাপ্ত, কিন্তু শব্দ ও ভাষা রাসূল (সা.) এর নিজস্ব। এর তিলাওয়াত ইবাদত নয় এবং নামাজে এটি পড়া যায় না।
৩. হাদিসে নাবাবী: এর শব্দ ও অর্থ উভয়ই রাসূল (সা.) এর নিজস্ব, তবে তা আল্লাহর পরোক্ষ ওহির (ওহি খফি) নির্দেশনায় বলা হয়েছে। এটি ইসলামী আইনের দ্বিতীয় প্রধান উৎস।
১০। কুরআনের আয়তের বিন্যাস সম্পর্কে সংক্ষেপে বর্ণনা কর।
উত্তর: কুরআনের আয়াতগুলোর বর্তমান বিন্যাস বা ক্রম (তারতিব) সম্পূর্ণ ‘তাওকিফি’ বা সরাসরি ওহি নির্ভর। এ বিষয়ে সকল আলিম ও উম্মাহর ইজমা (ঐকমত্য) রয়েছে। জিবরীল (আ.) আয়াত নিয়ে অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূল (সা.)-কে বলে দিতেন যে, এই আয়াতটি অমুক সূরার অমুক আয়াতের পরে স্থাপন করুন। রাসূল (সা.) ওহি লেখকদের ডেকে ঠিক সেভাবেই তা লিপিবদ্ধ করাতেন। এতে সাহাবাদের নিজস্ব কোনো ইজতিহাদ বা মতামতের সুযোগ ছিল না।
১১। কুরআনের সর্বশেষ অবতীর্ণ আয়াত সম্পর্কে বর্ণনা কর।
উত্তর: কুরআনের সর্বশেষ অবতীর্ণ আয়াত কোনটি, এ বিষয়ে ওলামায়ে কেরামের কয়েকটি মত থাকলেও সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য মত হলো, সূরা বাকারার ২৮১ নং আয়াতটিই সর্বশেষ অবতীর্ণ আয়াত। আয়াতটি হলো: “وَاتَّقُوا يَوْمًا تُرْجَعُونَ فِيهِ إِلَى اللَّهِ ۖ ثُمَّ تُوَفَّىٰ كُلُّ نَفْسٍ مَّا كَسَبَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ” (আর তোমরা সেই দিনকে ভয় কর, যেদিন তোমাদেরকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। তারপর প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার কামাইয়ের পূর্ণ প্রতিফল দেওয়া হবে এবং তাদের ওপর জুলুম করা হবে না)। এই আয়াতটি রাসূল (সা.) এর ইন্তেকালের মাত্র কয়েক দিন (মতান্তরে ৯ বা ২১ দিন) আগে অবতীর্ণ হয়েছিল।
১২। রাসুলুল্লাহ (স) এঁর যুগে কীভাবে কুরআন সংরক্ষণ করা হতো?
উত্তর: রাসূল (সা.) এর যুগে কুরআন অত্যন্ত নিখুঁতভাবে প্রধানত দুটি উপায়ে সংরক্ষণ করা হতো:
১. মুখস্থ করার মাধ্যমে (حفظ في الصدور): আরবদের স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত প্রখর ছিল। আয়াত নাজিল হওয়া মাত্রই সাহাবাগণ তা মুখস্থ করে নিতেন। অসংখ্য সাহাবী সম্পূর্ণ কুরআনের হাফেজ ছিলেন।
২. লিপিবদ্ধ করার মাধ্যমে (حفظ في السطور): রাসূল (সা.) এর একাধিক সার্বক্ষণিক ওহি লেখক ছিলেন (যেমন- যায়েদ বিন সাবিত)। আয়াত নাজিল হলে তাঁরা তা চামড়া, খেজুর পাতার ডাল, চওড়া হাড় এবং সমতল পাথরের ওপর লিখে রাখতেন।
১৩। কোন কোন বিষয়ে ‘নাস্খ’ হতে পারে এবং কোন কোন বিষয়ে ‘নাস্খ’ হতে পারে না? বর্ণনা কর।
উত্তর:
যেসব বিষয়ে নাস্খ হতে পারে: ইসলামী শরীয়তের শাখা-প্রশাখাগত হুকুম বা বিধান (আহকাম), হালাল-হারাম এবং আমল সংক্রান্ত বিধিবিধানের ক্ষেত্রে নাস্খ বা রহিতকরণ হতে পারে।
যেসব বিষয়ে নাস্খ হতে পারে না:
১. আকিদা বা বিশ্বাসগত বিষয় (যেমন- তাওহিদ, রিসালাত, আখিরাতে বিশ্বাস)।
২. মৌলিক নৈতিক গুণাবলি (যেমন- সত্য কথা বলা, ন্যায়বিচার করা)।
৩. অতীত ও ভবিষ্যতের ঐতিহাসিক ঘটনা বা সংবাদ। এগুলোতে কখনোই কোনো পরিবর্তন বা নাস্খ হয় না।
১৪। মুফাসসির এর আদবসমূহ সংক্ষেপে লেখ।
উত্তর: কুরআনের তাফসির করার জন্য একজন মুফাসসিরের কিছু অত্যাবশ্যকীয় আদব বা গুণাবলি থাকা প্রয়োজন:
১. নিয়তের বিশুদ্ধতা: একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তাফসির করা।
২. সঠিক আকিদা পোষণ করা: আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকিদার অধিকারী হওয়া।
৩. আমলকারী হওয়া: তিনি যা বলবেন বা লিখবেন, নিজের জীবনে তা বাস্তবায়ন করা।
৪. সত্য প্রকাশে নির্ভীক হওয়া: সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে দুনিয়ার কারো পরোয়া না করা।
৫. বিনয়ী হওয়া এবং মনগড়া তাফসির করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা।
১৫। রসমে উসমানি কি তাওকিফি? সংক্ষেপে বর্ণনা কর।
উত্তর: উসমান (রা.) যে বিশেষ রীতি বা বানানে সম্পূর্ণ কুরআন সংকলন করেছিলেন, তাকে ‘রসমে উসমানি’ বলে। এই লিখনপদ্ধতিটি তাওকিফি (ওহি নির্ভর) নাকি ইজতিহাদি, এ নিয়ে ওলামায়ে কেরামের মাঝে মতভেদ আছে। তবে অধিকাংশ জমহুর আলিমদের মতে, রসমে উসমানি মূলত ‘তাওকিফি’ বা ওহির সমতুল্য। কারণ, উসমান (রা.) ও সংকলক সাহাবাগণ রাসূল (সা.) এর সামনে ওহি লেখকদের লিখিত মূল পান্ডুলিপিটিই হুবহু অনুকরণ করেছেন, এতে নিজেদের পক্ষ থেকে কোনো পরিবর্তন বা সংযোজন করেননি।
১৬। ‘তাফসির বিল মাছুর’ এর উপর সংকলিত পাঁচটি তাফসিরের নাম লেখকের নামসহ লেখ।
উত্তর: তাফসির বিল মাছুর (রিওয়ায়াত বা বর্ণনানির্ভর তাফসির)-এর পাঁচটি বিখ্যাত গ্রন্থ ও লেখকের নাম নিচে দেওয়া হলো:
১. তাফসিরুত তাবারী (جامع البيان) – রচয়িতা: ইমাম ইবনে জারির আত-তাবারী (রহ.)।
২. তাফসির ইবনে কাসির (تفسير القرآن العظيم) – রচয়িতা: হাফেজ ইমাদুদ্দীন ইবনে কাসির (রহ.)।
৩. তাফসিরুল কুরতুবী (الجامع لأحكام القرآن) – রচয়িতা: ইমাম আবু আব্দুল্লাহ আল-কুরতুবী (রহ.)।
৪. তাফসির বাগভী (معالم التنزيل) – রচয়িতা: ইমাম আল-হুসাইন আল-বাগভী (রহ.)।
৫. তাফসির আদ্-দুররুল মানসুর (الدر المنثور) – রচয়িতা: আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.)।
১৭। উলূমুল কুরআন বিষয়ে সাম্প্রতিক সময়ে রচিত চারটি কিতাবের নাম লেখকের নামসহ লেখ।
উত্তর: উলূমুল কুরআন বিষয়ে আধুনিক বা সাম্প্রতিক যুগে রচিত ৪টি বিখ্যাত কিতাব হলো:
১. মানাহিলুল ইরফান ফি উলূমিল কুরআন (مناهل العرفان في علوم القرآن) – লেখক: শাইখ মুহাম্মদ আবদুল আজিম আয-যারকানি।
২. মাবাহিস ফি উলূমিল কুরআন (مباحث في علوم القرآن) – লেখক: ড. সুবহি আস-সালিহ।
৩. মাবাহিস ফি উলূমিল কুরআন (مباحث في علوم القرآن) – লেখক: শাইখ মান্না আল-কাত্তান।
৪. আত-তিবইয়ান ফি উলূমিল কুরআন (التبيان في علوم القرآن) – লেখক: শাইখ মুহাম্মদ আলী আস-সাবুনী।
১৮। উলূমুল কুরআন বিষয়ে রচিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে الإتقان فى علوم القرآن কিতাবটির মর্যাদা বর্ণনা কর।
উত্তর: আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.) রচিত ‘আল-ইতকান ফি উলূমিল কুরআন’ (الإتقان في علوم القرآن) উলূমুল কুরআন শাস্ত্রের একটি বিশ্বকোষ ও সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ। এই গ্রন্থে তিনি উলূমুল কুরআনের ৮০টি গুরুত্বপূর্ণ প্রকার বা অধ্যায় অত্যন্ত পাণ্ডিত্যের সাথে আলোচনা করেছেন। পূর্ববর্তী সকল গ্রন্থের নির্যাস তিনি এতে স্থান দিয়েছেন। এর ভাষা ও উপস্থাপনা এতই চমৎকার যে, বিশ্বব্যাপী সকল ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদরাসায় এটি একটি প্রামাণ্য পাঠ্যপুস্তক হিসেবে যুগের পর যুগ ধরে সমাদৃত হয়ে আসছে। উলূমুল কুরআন নিয়ে অধ্যয়নকারী যেকোনো গবেষকের জন্য এটি একটি অপরিহার্য গ্রন্থ।






