Economics and Islamic Economics (অর্থনীতি ও ইসলামি অর্থনীতি) 201106 – Fazil Hons Al Quran 1st Year 2021 QnA

Join Our Telegram Channel
দ্রুত নতুন বই পেতে যুক্ত থাকুন
Join Now
admin
economics 201106 fazil hons al quran 1st year 2021 qna
Join Our WhatsApp Channel
দ্রুত নতুন বই পেতে যুক্ত থাকুন
Join Now
📋 সূচিপত্র (Table of Contents)

Economics and Islamic Economics (Code: 201106) – ২০২১ প্রশ্ন ও উত্তর

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২১ এর আল-কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অর্থনীতি ও ইসলামি অর্থনীতি (Economics and Islamic Economics) বিষয়ের সম্পূর্ণ উত্তরমালা।

বিঃদ্রঃ শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে পরীক্ষায় আসা প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর ধারাবাহিকভাবে দেওয়া হলো।

ক বিভাগ — রচনামূলক প্রশ্ন (মান—১৫x৪=৬০)

১। অর্থনীতি বলতে কী বোঝায়? অর্থনীতির পরিধি ও বিষয়বস্তু আলোচনা কর।

উত্তর:

অর্থনীতি (Economics):

অর্থনীতি হলো এমন একটি সামাজিক বিজ্ঞান যা মানুষের অসীম অভাব এবং বিকল্প ব্যবহারযোগ্য সসীম সম্পদের মধ্যে সমন্বয় সাধনের উদ্দেশ্যে মানব আচরণ বিশ্লেষণ করে। অ্যাডাম স্মিথের মতে, “অর্থনীতি হলো সম্পদের বিজ্ঞান।” অন্যদিকে অধ্যাপক এল. রবিন্সের মতে, “অর্থনীতি হলো এমন একটি বিজ্ঞান, যা মানুষের অসীম অভাব এবং বিকল্প ব্যবহারযোগ্য দুষ্প্রাপ্য সম্পদের মধ্যে সম্পর্ক বিষয়ক মানব আচরণ নিয়ে আলোচনা করে।”

অর্থনীতির পরিধি ও বিষয়বস্তু:

অর্থনীতির পরিধি ও বিষয়বস্তু অত্যন্ত ব্যাপক। মানুষের অর্থনৈতিক কার্যাবলি যত বিস্তৃত হচ্ছে, অর্থনীতির পরিধিও তত বাড়ছে। নিচে অর্থনীতির প্রধান আলোচ্য বিষয়বস্তু তুলে ধরা হলো:

  1. উৎপাদন (Production): মানুষের অভাব পূরণের জন্য প্রকৃতি প্রদত্ত সম্পদের রূপ পরিবর্তন করে নতুন উপযোগ সৃষ্টি করাকে উৎপাদন বলে। ভূমি, শ্রম, মূলধন ও সংগঠন—এই চারটি উপকরণের সমন্বয়ে উৎপাদন প্রক্রিয়া কীভাবে পরিচালিত হয়, তা অর্থনীতিতে আলোচনা করা হয়।
  2. বিনিময় (Exchange): উৎপাদিত পণ্য উৎপাদকের কাছ থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর প্রক্রিয়াকে বিনিময় বলে। দাম নির্ধারণ, বাজার ব্যবস্থা, অর্থ ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা ইত্যাদি বিনিময়ের অন্তর্ভুক্ত।
  3. বণ্টন (Distribution): উৎপাদিত মোট সম্পদ উৎপাদনের চারটি উপকরণের (খাজনা, মজুরি, সুদ ও মুনাফা) মধ্যে কীভাবে বণ্টিত হবে, অর্থনীতি তার নীতি নির্ধারণ করে।
  4. ভোগ (Consumption): মানুষের অভাব মেটানোর উদ্দেশ্যে দ্রব্যের উপযোগ ব্যবহার করাই হলো ভোগ। ভোক্তার আচরণ, চাহিদা ও উপযোগ বিধি ইত্যাদি ভোগ তত্ত্বের আলোচ্য বিষয়।
  5. সরকারি অর্থব্যবস্থা (Public Finance): সরকারের আয়-ব্যয়, কর ব্যবস্থা, বাজেট প্রণয়ন, সরকারি ঋণ ইত্যাদি বিষয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
  6. আন্তর্জাতিক বাণিজ্য (International Trade): বর্তমান যুগে কোনো দেশই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। তাই আমদানি-রপ্তানি, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতি ইত্যাদি অর্থনীতিতে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।
  7. অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধি (Economic Development & Growth): একটি দেশের জাতীয় আয় ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের উপায় নিয়ে অর্থনীতি আলোচনা করে।

২। চাহিদা ও যোগান বলতে কী বোঝায়? চাহিদা ও যোগানের সনাতন তত্ত্বটি আলোচনা কর।

উত্তর:

চাহিদা (Demand):

অর্থনীতিতে চাহিদা বলতে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট দামে ক্রেতার কোনো দ্রব্য ক্রয় করার সামর্থ্য ও ইচ্ছাকে বোঝায়। অর্থাৎ চাহিদা হতে হলে তিনটি শর্ত পূরণ হতে হবে: ১. দ্রব্যটি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, ২. ক্রয়ের আর্থিক সামর্থ্য এবং ৩. অর্থ ব্যয়ের ইচ্ছা।

যোগান (Supply):

অর্থনীতিতে যোগান বলতে একটি নির্দিষ্ট সময়ে, একটি নির্দিষ্ট দামে বিক্রেতারা বাজারে যে পরিমাণ দ্রব্য বিক্রয় করতে প্রস্তুত থাকে, তাকে বোঝায়। মজুত (Stock) এবং যোগান এক নয়; মজুত হলো মোট পরিমাণ, আর যোগান হলো সেই মজুত থেকে যে পরিমাণ বিক্রেতা ওই নির্দিষ্ট দামে বিক্রি করতে চায়।

চাহিদা ও যোগানের সনাতন তত্ত্ব (Classical Theory of Demand and Supply):

চাহিদা ও যোগানের সনাতন তত্ত্ব মূলত বাজারের দাম নির্ধারণ প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি মুক্ত বা প্রতিযোগিতামূলক বাজারে কোনো দ্রব্যের দাম চাহিদা ও যোগানের পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়।

  1. চাহিদা বিধি: অন্যান্য অবস্থা স্থির থাকলে, দাম বাড়লে চাহিদা কমে এবং দাম কমলে চাহিদা বাড়ে। দাম ও চাহিদার এই সম্পর্ক বিপরীতমুখী।
  2. যোগান বিধি: অন্যান্য অবস্থা স্থির থাকলে, দাম বাড়লে যোগান বাড়ে এবং দাম কমলে যোগান কমে। দাম ও যোগানের এই সম্পর্ক সমমুখী।
  3. ভারসাম্য দাম নির্ধারণ: বাজারে ক্রেতারা সবসময় কম দামে বেশি দ্রব্য কিনতে চায় (চাহিদা), আর বিক্রেতারা বেশি দামে বেশি দ্রব্য বিক্রি করতে চায় (যোগান)। ক্রেতা ও বিক্রেতার এই দরকষাকষির ফলে এমন একটি দামে এসে পৌঁছায় যেখানে দ্রব্যের চাহিদার পরিমাণ ও যোগানের পরিমাণ পরস্পর সমান হয় (চাহিদা = যোগান)। এই দামকেই ‘ভারসাম্য দাম’ (Equilibrium Price) বলা হয়।
  4. যদি বাজারের দাম ভারসাম্য দামের চেয়ে বেশি হয়, তবে যোগান চাহিদার চেয়ে বেশি হবে (উদ্বৃত্ত সৃষ্টি হবে), ফলে বিক্রেতারা দাম কমাতে বাধ্য হবে।
  5. বিপরীতভাবে, যদি দাম ভারসাম্য দামের চেয়ে কম হয়, তবে চাহিদা যোগানের চেয়ে বেশি হবে (ঘাটতি সৃষ্টি হবে), ফলে ক্রেতারা বেশি দাম দিয়ে দ্রব্য কিনতে চাইবে এবং দাম আবার ভারসাম্য স্তরে ফিরে আসবে।

এভাবেই চাহিদা ও যোগানের স্বয়ংক্রিয় শক্তির মাধ্যমে বাজারে একটি স্থিতিশীল দাম নির্ধারিত হয়।

৩। উপযোগ কাকে বলে? সমালোচনাসহ ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধিটি ব্যাখ্যা কর।

উত্তর:

উপযোগ (Utility):

উপযোগ বলতে কোনো দ্রব্য বা সেবার ওই বিশেষ ক্ষমতাকে বোঝায়, যা মানুষের কোনো না কোনো অভাব মেটাতে সক্ষম। যেমন, পানির উপযোগ হলো তা মানুষের তৃষ্ণা মেটায়, খাদ্যের উপযোগ হলো তা ক্ষুধা মেটায়। এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক ধারণা।

ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধি (Law of Diminishing Marginal Utility):

অধ্যাপক আলফ্রেড মার্শাল এই বিধিটি প্রদান করেন। বিধিটির মূল কথা হলো: “অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে, কোনো নির্দিষ্ট সময়ে একজন ভোক্তা যখন কোনো একটি নির্দিষ্ট দ্রব্যের ভোগ ক্রমাগত বৃদ্ধি করতে থাকে, তখন ওই দ্রব্যের অতিরিক্ত এককগুলো থেকে প্রাপ্ত উপযোগ বা প্রান্তিক উপযোগ ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকে।”

ব্যাখ্যা: ধরা যাক, একজন তৃষ্ণার্ত ব্যক্তি এক গ্লাস পানি পান করল। প্রথম গ্লাস পানি থেকে সে যে তৃপ্তি পাবে, দ্বিতীয় গ্লাস থেকে তার চেয়ে কম তৃপ্তি পাবে, কারণ তার তৃষ্ণা কিছুটা কমে গেছে। এভাবে তৃতীয় বা চতুর্থ গ্লাস থেকে প্রাপ্ত তৃপ্তি বা প্রান্তিক উপযোগ আরও কমতে থাকবে। এক পর্যায়ে তার আর পানির প্রয়োজন হবে না, তখন প্রান্তিক উপযোগ শূন্য (০) হবে। এরপরও যদি তাকে পানি পান করানো হয়, তবে প্রান্তিক উপযোগ ঋণাত্মক (Negative) হবে। এই ক্রমশ কমে যাওয়ার প্রবণতাকেই ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধি বলে।

বিধিটির সমালোচনা (Criticisms):

অর্থনীতিবিদগণ এই বিধির কিছু সীমাবদ্ধতা বা সমালোচনা তুলে ধরেছেন:

  1. উপযোগের পরিমাপ অসম্ভব: মার্শাল ধরে নিয়েছেন যে উপযোগকে সংখ্যায় (১, ২, ৩…) পরিমাপ করা যায়। কিন্তু বাস্তবে উপযোগ একটি মানসিক বিষয়, একে সংখ্যায় মাপা যায় না।
  2. সময়ের ব্যবধান: এই বিধি কাজ করতে হলে ভোগের সময় নির্দিষ্ট ও নিরবচ্ছিন্ন হতে হবে। যদি সকালে এক গ্লাস এবং বিকেলে এক গ্লাস পানি পান করা হয়, তবে দ্বিতীয় গ্লাসের উপযোগ না-ও কমতে পারে।
  3. শখের দ্রব্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়: ডাকটিকিট, পুরোনো মুদ্রা বা শখের জিনিস সংগ্রহের ক্ষেত্রে এই বিধি খাটে না। কারণ এগুলোর পরিমাণ যত বাড়ে, আকাঙ্ক্ষাও তত বাড়ে।
  4. নেশাজাতীয় দ্রব্য: নেশাগ্রস্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে মদের প্রথম গ্লাসের চেয়ে দ্বিতীয় গ্লাসের উপযোগ বেশি মনে হতে পারে। তাই এখানে বিধিটি কার্যকর নয়।
  5. অর্থের প্রান্তিক উপযোগ: বলা হয় অর্থের প্রান্তিক উপযোগ কখনো শূন্য বা ঋণাত্মক হয় না। মানুষের কাছে যত টাকা আসে, সে আরও বেশি টাকা চায়।

৪। ইসলামি অর্থনীতি বলতে কী বোঝায়? “ইসলামি অর্থনীতির উৎস যেখানে কুরআন ও হাদিস, আধুনিক অর্থনীতি সেখানে মানবপ্রসূত”—উক্তিটি ব্যাখ্যা কর।

উত্তর:

ইসলামি অর্থনীতি (Islamic Economics):

ইসলামি অর্থনীতি হলো এমন এক অর্থব্যবস্থা যা পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ওপর ভিত্তি করে মানুষের অর্থনৈতিক কার্যাবলি পরিচালনা করে। এর মূল লক্ষ্য হলো মানুষের ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তির পথ নির্দেশ করা। ড. এম. এ. মান্নানের মতে, “ইসলামি অর্থনীতি হচ্ছে এমন একটি সামাজিক বিজ্ঞান যা কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে মানবজীবনের অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোর সমাধান দেয়।”

উক্তিটির ব্যাখ্যা:

“ইসলামি অর্থনীতির উৎস যেখানে কুরআন ও হাদিস, আধুনিক অর্থনীতি সেখানে মানবপ্রসূত”—এই উক্তিটি ইসলামি ও আধুনিক (পুঁজিবাদী বা সমাজতান্ত্রিক) অর্থনীতির মৌলিক পার্থক্য তুলে ধরে। নিচে এর যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করা হলো:

  1. উৎসগত পার্থক্য: ইসলামি অর্থনীতির প্রধান ও অকাট্য উৎস হলো আল্লাহর বাণী আল-কুরআন এবং রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহ বা হাদিস। এই বিধানগুলো শাশ্বত, নির্ভুল ও অপরিবর্তনীয়। অন্যদিকে আধুনিক অর্থনীতির প্রবক্তা হলেন সাধারণ মানুষ (যেমন: অ্যাডাম স্মিথ, কার্ল মার্কস, মার্শাল)। মানুষের জ্ঞান সীমাবদ্ধ হওয়ায় তাদের প্রণীত অর্থনৈতিক নীতিমালারও ভুল-ভ্রান্তি থাকে এবং তা সময় ও পরিস্থিতির সাথে সাথে পরিবর্তন করতে হয়।
  2. মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ: ইসলামি অর্থনীতিতে আসমান ও জমিনের সবকিছুর প্রকৃত মালিক আল্লাহ। মানুষ কেবল তার প্রতিনিধি। কিন্তু মানবপ্রসূত আধুনিক অর্থনীতিতে সম্পদের মালিকানা মানুষের নিজের অথবা রাষ্ট্রের হাতে ন্যস্ত বলে মনে করা হয়।
  3. নৈতিকতার ভিত্তি: কুরআন ও হাদিসভিত্তিক হওয়ায় ইসলামি অর্থনীতিতে হালাল-হারামের সুস্পষ্ট সীমারেখা রয়েছে এবং এর প্রতিটি কাজের জন্য পরকালে জবাবদিহি করতে হবে—এই বিশ্বাস থাকে। কিন্তু মানবপ্রসূত অর্থনীতিতে কেবল বস্তুগত লাভ-ক্ষতির হিসাব করা হয়, নৈতিকতা বা পরকালীন জবাবদিহিতার কোনো স্থান সেখানে নেই।
  4. সুদ বনাম লাভ-ক্ষতি: মানবপ্রসূত পুঁজিবাদী অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো সুদ (Interest)। কিন্তু কুরআন ও হাদিস সুদকে সম্পূর্ণ হারাম ঘোষণা করেছে এবং এর বিকল্প হিসেবে ব্যবসা ও লাভ-ক্ষতির অংশীদারিত্বকে (মুদারাবা) উৎসাহিত করেছে।

উপসংহার: আধুনিক অর্থনীতি মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত হওয়ায় তা সমাজকে শোষণ, বৈষম্য ও অর্থনৈতিক মন্দা থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি দিতে পারেনি। অন্যদিকে কুরআন ও হাদিসভিত্তিক ইসলামি অর্থনীতি মানুষের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত এক কল্যাণকামী জীবনব্যবস্থা, যা অর্থনৈতিক ইনসাফ ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় সক্ষম।

৫। ইসলামি ব্যাংক কী? বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকের উন্নয়নে সমস্যাসমূহ বর্ণনা কর এবং সমস্যার সমাধান সম্পর্কে তোমার পরামর্শ পেশ কর।

উত্তর:

ইসলামি ব্যাংক (Islamic Bank):

ইসলামি ব্যাংক বলতে এমন একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে বোঝায়, যার সকল কার্যাবলি ও লেনদেন সম্পূর্ণভাবে ইসলামি শরিয়তের নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হয় এবং যা সুদের (রিবা) আদান-প্রদান থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকে। ওআইসি (OIC)-এর সংজ্ঞানুযায়ী, “ইসলামি ব্যাংক এমন এক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যার গঠনতন্ত্র, বিধি-বিধান ও কর্মপদ্ধতি সুনিশ্চিতভাবে ইসলামি শরিয়তের ভিত্তিতে পরিচালিত হয় এবং যা সুদ গ্রহণ ও প্রদান থেকে বিরত থাকে।”

বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকের উন্নয়নে সমস্যাসমূহ:

বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকিং ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেলেও এর বিকাশে কিছু উল্লেখযোগ্য সমস্যা রয়েছে:

  1. ইসলামি ব্যাংকিং আইনের অভাব: বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকগুলো পরিচালনার জন্য এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ ও পৃথক ‘ইসলামি ব্যাংকিং আইন’ তৈরি হয়নি। প্রচলিত সুদী ব্যাংকিং আইনের আওতায় এদের কার্যক্রম চালাতে নানা জটিলতায় পড়তে হয়।
  2. শরিয়াহসম্মত মুদ্রাবাজারের অভাব: প্রচলিত ব্যাংকগুলো সহজে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার (Call Money Market) থেকে ঋণ নিতে পারে। কিন্তু এই বাজার সুদী হওয়ায় ইসলামি ব্যাংকগুলো এখান থেকে তারল্য সংকট মেটাতে পারে না।
  3. দক্ষ ও শরিয়াহ জ্ঞানসম্পন্ন জনবলের অভাব: ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থা সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য আধুনিক ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি ইসলামি ফিকহ ও শরিয়াহ সম্পর্কে অগাধ জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। দেশে এমন দক্ষ জনবলের যথেষ্ট অভাব রয়েছে।
  4. গ্রাহকদের সচেতনতার অভাব: অনেক সাধারণ মানুষ ইসলামি ব্যাংকিংয়ের পদ্ধতি (মুরাবাহা, মুদারাবা, ইজারা) সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখে না। তারা একে প্রচলিত সুদী ব্যাংকের অন্য একটি রূপ বলে ভুল বোঝে।
  5. কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালার সীমাবদ্ধতা: বাংলাদেশ ব্যাংকের বেশ কিছু আর্থিক নীতিমালা সুদী ব্যাংকের কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছে, যা ইসলামি ব্যাংকের দর্শন ও কাজের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

সমস্যা সমাধানের পরামর্শ:

  1. সংসদে অতি দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ইসলামি ব্যাংকিং আইন’ পাস করতে হবে।
  2. কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অধীনে একটি পৃথক শরিয়াহসম্মত ‘আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার’ গড়ে তুলতে হবে এবং ইসলামি বন্ড বা সুকুক এর পরিধি বাড়াতে হবে।
  3. বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে ইসলামি ব্যাংকিং ও ফিন্যান্স বিষয়ের ওপর উচ্চতর ডিগ্রি ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে দক্ষ জনবল তৈরি হয়।
  4. গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সুদের কুফল এবং ইসলামি ব্যাংকিংয়ের হালাল ও কল্যাণকর দিক সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।
  5. বাংলাদেশ ব্যাংকের শরিয়াহ বোর্ডকে আরও শক্তিশালী করে তদারকি বাড়াতে হবে যেন ইসলামি ব্যাংকগুলো শতভাগ শরিয়াহ পরিপালন করে।

৬। বিমা কাকে বলে? প্রচলিত বিমা ও ইসলামি বিমার মধ্যে পার্থক্য আলোচনা কর।

উত্তর:

বিমা (Insurance):

বিমা হলো এমন একটি আর্থিক চুক্তি বা ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ প্রিমিয়াম বা কিস্তির বিনিময়ে তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ আর্থিক ঝুঁকি বা ক্ষতি অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের (বিমা কোম্পানি) ওপর হস্তান্তর করে। অর্থাৎ, বিমাকারী নির্দিষ্ট কিস্তি প্রদান করে এবং এর বিনিময়ে বিমা কোম্পানি চুক্তিবদ্ধ ক্ষতির (যেমন: মৃত্যু, দুর্ঘটনা, চুরি, অগ্নিকাণ্ড) ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।

প্রচলিত বিমা ও ইসলামি বিমার (তাকাফুল) মধ্যে পার্থক্য:

ইসলামি বিমাকে বলা হয় ‘তাকাফুল’ (Takaful), যার অর্থ যৌথ গ্যারান্টি বা পারস্পরিক সহযোগিতা। প্রচলিত বিমা এবং ইসলামি বিমার মধ্যে মৌলিক কিছু পার্থক্য রয়েছে:

  1. চুক্তির প্রকৃতি: প্রচলিত বিমা হলো ঝুঁকি কেনাবেচার একটি বাণিজ্যিক চুক্তি। কিন্তু ইসলামি বিমা বা তাকাফুল হলো পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতার ভিত্তিতে গঠিত একটি তহবিল, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা একে অপরকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নিয়ত করে চাঁদা দেয়।
  2. সুদ (রিবা): প্রচলিত বিমা কোম্পানিগুলো তাদের সংগৃহীত প্রিমিয়ামের অর্থ বিভিন্ন সুদী বন্ড বা ব্যাংকে বিনিয়োগ করে এবং সুদের ভিত্তিতে মুনাফা দেয়। কিন্তু তাকাফুল কোম্পানিগুলো সুদমুক্ত হালাল ব্যবসায় (যেমন মুদারাবা বা মুশারাকা) বিনিয়োগ করে।
  3. জুয়া (মাইসির): প্রচলিত বিমায় পলিসি মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে কেউ মারা গেলে তার নমিনি বিপুল অর্থ পায় (যা জুয়ার অনুরূপ), আবার প্রিমিয়াম দিতে ব্যর্থ হলে তার জমানো টাকা বাজেয়াপ্ত হয়। ইসলামি বিমায় জুয়ার কোনো স্থান নেই; জমাকৃত অর্থ সম্পূর্ণ গ্রাহকের সম্পদ।
  4. অনিশ্চয়তা (গারার): প্রচলিত বিমায় গ্রাহক জানে না সে ক্ষতিপূরণ পাবে কি না এবং কোম্পানি জানে না তাকে কত টাকা দিতে হবে। ইসলামি বিমায় এই ধরনের ধোঁকা বা গারার নেই, কারণ এটি অনুদানের নিয়তে দেওয়া হয়।
  5. তহবিলের মালিকানা: প্রচলিত বিমায় তহবিলের মালিকানা বিমা কোম্পানির। কিন্তু ইসলামি বিমায় তহবিলের প্রকৃত মালিক হলো অংশগ্রহণকারী গ্রাহকগণ; কোম্পানি কেবল ‘মুদারিব’ বা ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করে। উদ্বৃত্ত তহবিল গ্রাহকদের মাঝে বণ্টন করা হয়।

খ বিভাগ — সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্ন (মান—৫x৪=২০)

৭। ব্যাষ্টিক ও সামষ্টিক অর্থনীতির মধ্যে পার্থক্য আলোচনা কর।

উত্তর:

  1. সংজ্ঞা: ব্যাষ্টিক অর্থনীতিতে কোনো অর্থনীতির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র একক (যেমন: একজন ব্যক্তির আয়, একটি ফার্মের উৎপাদন) নিয়ে আলোচনা করা হয়। অন্যদিকে সামষ্টিক অর্থনীতিতে কোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে সামগ্রিকভাবে (যেমন: জাতীয় আয়, মোট কর্মসংস্থান) আলোচনা করা হয়।
  2. বিশ্লেষণের ভিত্তি: ব্যাষ্টিক অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো দ্রব্যের দাম ও উৎপাদনের পরিমাণ নির্ধারণ। সামষ্টিক অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো সামগ্রিক আয় ও কর্মসংস্থান স্তরের বিশ্লেষণ।
  3. ভারসাম্য: ব্যাষ্টিক অর্থনীতি আংশিক ভারসাম্য বিশ্লেষণ করে। সামষ্টিক অর্থনীতি সাধারণ বা সামগ্রিক ভারসাম্য বিশ্লেষণ করে।
  4. নীতি নির্ধারণ: ব্যাষ্টিক অর্থনীতি নির্দিষ্ট ফার্ম বা শিল্পের নীতি নির্ধারণে সহায়ক। অন্যদিকে সামষ্টিক অর্থনীতি জাতীয় পর্যায়ের অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নে ব্যবহৃত হয়।

৮। চাহিদা রেখা কেন ডান দিকে নিম্নগামী হয়?

উত্তর:

চাহিদা রেখা বাম থেকে ডান দিকে নিম্নগামী হওয়ার প্রধান কারণগুলো হলো:

  1. ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধি: মানুষ যখন কোনো দ্রব্য বেশি বেশি কেনে, তখন তার কাছে ওই দ্রব্যের প্রান্তিক উপযোগ কমতে থাকে। তাই সে ওই দ্রব্যের জন্য কম দাম দিতে চায়। ফলে দাম কমলেই কেবল সে বেশি দ্রব্য কেনে।
  2. আয় প্রভাব: কোনো দ্রব্যের দাম কমে গেলে ক্রেতার প্রকৃত আয় (Purchasing Power) বেড়ে যায়, ফলে সে আগের চেয়ে বেশি দ্রব্য ক্রয় করতে পারে।
  3. বিকল্প প্রভাব: কোনো দ্রব্যের দাম বাড়লে ক্রেতারা ওই দ্রব্যের সস্তা বিকল্প দ্রব্যের দিকে ঝুঁকে পড়ে, ফলে মূল দ্রব্যের চাহিদা কমে যায়। দাম ও চাহিদার এই বিপরীত সম্পর্কের কারণেই রেখাটি নিম্নগামী হয়।

৯। কর ও যাকাতের মধ্যে পার্থক্য কী?

উত্তর:

  1. ভিত্তি ও উদ্দেশ্য: কর হলো রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য জনগণের ওপর সরকারের আরোপিত বাধ্যতামূলক আর্থিক চার্জ। অন্যদিকে যাকাত হলো ইসলামি শরিয়ত কর্তৃক নির্ধারিত নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিকের ওপর ফরজ একটি আর্থিক ইবাদত।
  2. হার নির্ধারণ: করের হার সরকার সময় সময় পরিবর্তন করতে পারে। কিন্তু যাকাতের হার (সাধারণত ২.৫%) আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত, যা অপরিবর্তনীয়।
  3. ব্যয়ের খাত: করের টাকা সরকার রাষ্ট্রের যেকোনো উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কাজে ব্যয় করতে পারে। কিন্তু যাকাতের টাকা কুরআন নির্দেশিত ৮টি খাতেই কেবল ব্যয় করা যায়।
  4. জবাবদিহিতা: কর না দিলে দুনিয়ার আইনে শাস্তি পেতে হয়। কিন্তু যাকাত না দিলে দুনিয়ার পাশাপাশি আখিরাতেও কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে।

১০। পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজার বলতে কী বোঝায়?

উত্তর:

পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজার (Perfectly Competitive Market) হলো এমন এক ধরনের বাজার কাঠামো যেখানে অসংখ্য ক্রেতা ও বিক্রেতা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে সমজাতীয় বা অভিন্ন পণ্য ক্রয়-বিক্রয় করে। এই বাজারের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

  • অসংখ্য ক্রেতা ও বিক্রেতার উপস্থিতি।
  • পণ্যগুলো সম্পূর্ণ সমজাতীয় বা একই ধরনের হয়।
  • কোনো একক ক্রেতা বা বিক্রেতা দামকে প্রভাবিত করতে পারে না (তারা Price Taker)।
  • বাজারে ক্রেতা ও বিক্রেতার অবাধ প্রবেশ ও প্রস্থানের অধিকার থাকে।
  • বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে সবার পূর্ণ জ্ঞান থাকে।

১১। ইসলামে ব্যক্তি মালিকানা বলতে কী বোঝায়?

উত্তর:

ইসলামি অর্থনীতিতে মহাবিশ্বের যাবতীয় সম্পদের নিরঙ্কুশ ও চূড়ান্ত মালিকানা একমাত্র মহান আল্লাহর। তবে আল্লাহ মানুষকে তার প্রতিনিধি হিসেবে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন এবং সম্পদের ভোগ ও ব্যবহারের অধিকার দিয়েছেন। ইসলামে ব্যক্তি মালিকানা বলতে বোঝায়, শরিয়ত অনুমোদিত হালাল পথে পরিশ্রম করে বা উত্তরাধিকার সূত্রে অর্জিত সম্পদের ওপর ব্যক্তির অধিকার। ইসলাম এই ব্যক্তিগত মালিকানাকে স্বীকৃতি দেয়, তবে তা শর্তসাপেক্ষ। অর্থাৎ, ব্যক্তি তার সম্পদ যথেচ্ছাভাবে অপচয় বা হারাম কাজে ব্যবহার করতে পারবে না। তাকে এই সম্পদ থেকে যাকাত দিতে হবে এবং সমাজকল্যাণ বিরোধী কোনো কাজে সম্পদ ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

১২। যাকাতের নিসাব আলোচনা কর।

উত্তর:

ইসলামি শরিয়তে যে নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ থাকলে কোনো ব্যক্তির ওপর যাকাত প্রদান করা ফরজ হয়, সেই পরিমাণ সম্পদকে ‘নিসাব’ বলা হয়। অর্থাৎ নিসাব হলো যাকাত ফরজ হওয়ার ন্যূনতম সীমা। নিসাব পূর্ণ হওয়ার পর সম্পদ যদি পূর্ণ এক চন্দ্রবছর মালিকের কাছে থাকে, তবে তার ওপর ২.৫% বা চল্লিশ ভাগের এক ভাগ যাকাত দেওয়া ফরজ।

প্রধান প্রধান সম্পদের নিসাব হলো:

  • স্বর্ণের ক্ষেত্রে: সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি বা ৮৭.৪৮ গ্রাম।
  • রৌপ্যের ক্ষেত্রে: সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি বা ৬১২.৩৬ গ্রাম।
  • নগদ অর্থ ও ব্যবসার পণ্যের ক্ষেত্রে: সাড়ে বায়ান্ন ভরি রূপার বর্তমান বাজার মূল্যের সমপরিমাণ অর্থ।
Follow Our Facebook Page
দ্রুত নতুন বই পেতে যুক্ত থাকুন
Follow Now