ফাজিল অনার্স ৩য় বর্ষ – ইসলামের ধর্মীয়, দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক ও সাহিত্যিক বিকাশ (৩০৭) প্রশ্ন সমাধান | Fazil Hons History 3rd Year – Religious Philosophical (307) QnA 2024

Join Our Telegram Channel
দ্রুত নতুন বই পেতে যুক্ত থাকুন
Join Now
admin
Fazil Honours 3rd Year Exam 2024 Question Paper Solution for Islamic History & Culture (Religious, Philosophical, Scientific and Literary Development of Islam). ফাজিল ৩য় বর্ষের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ের সকল প্রশ্ন ও বিস্তারিত উত্তর।
Join Our WhatsApp Channel
দ্রুত নতুন বই পেতে যুক্ত থাকুন
Join Now
📋 সূচিপত্র (Table of Contents)

পরীক্ষা কোড: ২ ০ ৩     প্রশ্নপত্র কোড: ১ ১ ৬

ফাজিল স্নাতক (অনার্স) তৃতীয় বর্ষ পরীক্ষা, ২০২৪

ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
(ইসলামের ধর্মীয়, দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক ও সাহিত্যিক বিকাশ)

বিষয় কোড: ২ ০ ৫ ৩ ০ ৭

সময়— ৪ ঘণ্টা
পূর্ণমান— ৮০

ক-বিভাগ
(যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও)
মান— ১৫×৪ = ৬০
১। ইসলাম কী? ইসলামের মৌলিক স্তম্ভসমূহ আলোচনা কর।
[What is Islam? Discuss fundamental pillers of Islam.]
উত্তর:

ইসলাম কী: ‘ইসলাম’ একটি আরবি শব্দ, যার আভিধানিক অর্থ হলো আত্মসমর্পণ করা, অনুগত হওয়া বা শান্তিতে প্রবেশ করা। ইসলামি পরিভাষায়, এক অদ্বিতীয় স্রষ্টা মহান আল্লাহর যাবতীয় আদেশ-নিষেধ নিঃশর্তভাবে মেনে নেওয়া এবং তাঁর কাছে পরিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করে শান্তিময় জীবনযাপন করার নামই হলো ইসলাম।

ইসলামের মৌলিক স্তম্ভসমূহ:
হাদিসে জিবরিল অনুযায়ী ইসলামের মূল ভিত্তি বা স্তম্ভ হলো ৫টি:
১. ঈমান (বিশ্বাস): অন্তরে বিশ্বাস, মুখে স্বীকৃতি এবং কাজে পরিণত করার মাধ্যমে আল্লাহ, ফেরেশতা, কিতাব, রাসুলগণ, পরকাল এবং তাকদিরের ওপর দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা।
২. সালাত (নামাজ): ঈমান আনার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত হলো দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা। এটি আল্লাহর সাথে বান্দার সরাসরি আধ্যাত্মিক যোগাযোগের মাধ্যম।
৩. সাওম (রোজা): রমজান মাসে সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও পাপাচার থেকে বিরত থাকা। এটি মানুষের মধ্যে তাকওয়া বা আল্লাহভীতি তৈরি করে।
৪. যাকাত: সম্পদশালীদের সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ (২.৫%) দরিদ্রদের মাঝে বণ্টন করা। এটি অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে সমাজকে পরিশুদ্ধ করে।
৫. হজ: শারীরিক ও আর্থিকভাবে সক্ষম ব্যক্তির জীবনে অন্তত একবার মক্কায় পবিত্র কাবা ঘর তওয়াফ ও সংশ্লিষ্ট ইবাদতসমূহ পালন করা। এটি বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্বের অনন্য নিদর্শন।

২। পবিত্র কোরআন সংরক্ষণ ও সংকলনের ইতিহাস লেখ।
[Write the history of consolidation and compilation of the Holy Quran]
উত্তর:

পবিত্র কুরআন দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর নাজিল হয়। এর সংরক্ষণ ও সংকলনের ইতিহাস তিনটি প্রধান ধাপে বিভক্ত:

১. রাসুল (সা.)-এর যুগ (সংরক্ষণ): ওহি নাজিল হওয়ার সাথে সাথে রাসুল (সা.) তা মুখস্থ করতেন এবং সাহাবিদের মুখস্থ করতে নির্দেশ দিতেন। অসংখ্য সাহাবি (হাফেজ) তা হুবহু মুখস্থ রাখতেন। এছাড়া ওহি লেখকদের মাধ্যমে তা খেজুরের পাতা, পশুর হাড়, চামড়া ও সাদা পাথরে লিখে সংরক্ষণ করা হতো।

২. আবু বকর (রা.)-এর যুগ (প্রথম সংকলন): ১২ হিজরিতে ইয়ামামার যুদ্ধে অনেক হাফেজ সাহাবি শহিদ হলে উমর (রা.) কুরআন বিলুপ্তির আশঙ্কা করেন। তাঁর পরামর্শে খলিফা আবু বকর (রা.) প্রধান ওহি লেখক যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করেন। তারা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মুখস্থ ও লিখিত পাণ্ডুলিপি মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থবদ্ধ রূপ দেন, যা ‘সুহুফ’ নামে পরিচিত। এটি উমর (রা.) এবং পরবর্তীতে তাঁর কন্যা হাফসা (রা.)-এর কাছে সংরক্ষিত ছিল।

৩. উসমান (রা.)-এর যুগ (চূড়ান্ত সংকলন): ইসলামি সাম্রাজ্য বিস্তারের পর বিভিন্ন অঞ্চলে কুরআন পাঠের উচ্চারণে (কিরাত) ভিন্নতা দেখা দেয়, যা নিয়ে বিবাদ শুরু হয়। খলিফা উসমান (রা.) পুনরায় যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর নেতৃত্বে একটি বোর্ড গঠন করেন। তারা হাফসা (রা.)-এর কাছে রক্ষিত মূল কপি থেকে কুরাইশ ভাষারীতিতে সাতটি প্রামাণ্য কপি (মুসহাফ) তৈরি করেন এবং বিভিন্ন প্রদেশে পাঠিয়ে দেন। এই অসামান্য অবদানের জন্য উসমান (রা.)-কে ‘জামেউল কুরআন’ (কুরআন একত্রকারী) বলা হয়।
৩। মুসলিম দর্শন কী? মুসলিম দর্শনের উৎসসমূহ আলোচনা কর।
[What is Muslim philosophy? Briefly discuss the sources of Muslim philosophy.]
উত্তর:

মুসলিম দর্শন: ইসলামি আকিদা ও বিশ্বাসকে অটুট রেখে, স্বাধীন বুদ্ধিভিত্তিক চর্চা এবং যৌক্তিক চিন্তাধারার মাধ্যমে স্রষ্টা, সৃষ্টি ও মহাবিশ্বের অন্তর্নিহিত সত্য অনুসন্ধানের যে জ্ঞানশাখা মুসলিম চিন্তাবিদদের দ্বারা গড়ে উঠেছে, তাকে মুসলিম দর্শন বলে। এটি মূলত গ্রিক দর্শনের যুক্তিবিদ্যার সাথে ইসলামি ঐশী বাণীর (কুরআন) সমন্বয়ের একটি ফসল।

উৎসসমূহ:
১. আল-কুরআন: মুসলিম দর্শনের প্রধান উৎস কুরআন। কুরআন বারবার মানুষকে প্রকৃতি, সৃষ্টিজগত এবং জীবন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা (তাফাক্কুর) করার নির্দেশ দিয়েছে।
২. হাদিস বা সুন্নাহ: রাসুল (সা.)-এর জীবনদর্শন ও বাণী মুসলিম চিন্তাবিদদের গভীর প্রেরণা যুগিয়েছে।
৩. ইলমুল কালাম (ইসলামি ধর্মতত্ত্ব): মুতাজিলা এবং আশারিয়া সম্প্রদায়ের পণ্ডিতরা ইসলামি আকিদাকে যুক্তি দিয়ে প্রমাণের জন্য যে ধর্মতত্ত্বের উদ্ভব ঘটান, তা মুসলিম দর্শনের একটি বড় উৎস।
৪. গ্রিক দর্শন: আব্বাসীয় আমলে অনুবাদ আন্দোলনের মাধ্যমে অ্যারিস্টটল, প্লেটো, সক্রেটিস প্রমুখ গ্রিক দার্শনিকদের রচনা আরবিতে অনূদিত হয়, যা মুসলিম দর্শনে যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি প্রদান করে।
৫. পারস্য ও ভারতীয় দর্শন: পারস্যের সুফিবাদ ও ভারতের প্রাচীন চিন্তা-চেতনার কিছু উপাদানও মুসলিম দর্শনের বিকাশকে সমৃদ্ধ করেছে।

৪। মুসলিম দর্শনে ইবনে রুশদের অবদান মূল্যায়ন কর।
[Evaluate the contributions of Ibn Rushd to the Muslim philosophy.]
উত্তর:

ইবনে রুশদ (১১২৬-১১৯৮ খ্রি.), যিনি পাশ্চাত্যে ‘অ্যাভেরোজ’ (Averroes) নামে পরিচিত, ছিলেন স্পেনের আন্দালুসিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুসলিম দার্শনিক, চিকিৎসক ও বিচারক। মুসলিম দর্শনকে চরম উৎকর্ষে পৌঁছাতে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়।

অবদান:
১. অ্যারিস্টটলের শ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যাকার: তিনি অ্যারিস্টটলের দর্শনের সবচেয়ে নির্ভুল ও বিস্তৃত আরবি ব্যাখ্যা রচনা করেন। এজন্য পাশ্চাত্যে তাঁকে ‘The Great Commentator’ (মহা ব্যাখ্যাকার) বলা হয়। তাঁর ব্যাখ্যার মাধ্যমেই মধ্যযুগীয় ইউরোপ অ্যারিস্টটলকে নতুন করে চিনতে পেরেছিল।
২. দর্শন ও ধর্মের সমন্বয়: তাঁর রচিত “ফাসল আল-মাকাল” গ্রন্থে তিনি প্রমাণ করেন যে, দর্শন এবং ধর্ম একে অপরের পরিপন্থী নয়, বরং সত্যে পৌঁছানোর দুটি ভিন্ন পথ। যুক্তি এবং ওহির মধ্যে কোনো সংঘাত নেই।
৩. আল-গাজ্জালির জবাব: ইমাম আল-গাজ্জালি তাঁর বিখ্যাত “তাহাফুত আল-ফালাসিফা” (দার্শনিকদের বিভ্রান্তি) বইয়ে দর্শনের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। ইবনে রুশদ এর জবাবে “তাহাফুত আল-তাহাফুত” (বিভ্রান্তির বিভ্রান্তি) লিখে দর্শনের শক্তিশালী ও যৌক্তিক প্রতিরক্ষা করেন।
৪. পশ্চিমা দর্শনে প্রভাব: তাঁর স্বাধীন চিন্তাধারা ইউরোপের স্কলাস্টিক দর্শনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে, যা পরবর্তীতে ‘ল্যাটিন অ্যাভেরোইজম’ নামে পরিচিতি লাভ করে এবং ইউরোপীয় নবজাগরণের (রেনেসাঁ) পথ প্রশস্ত করে।

৫। প্রাক-ইসলামি যুগের আরবি সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা দাও।
[Give an idea about the characteristics of Arabic literature of the Pre-Islamic period.]
উত্তর:

প্রাক-ইসলামি যুগ বা ‘আইয়ামে জাহিলিয়া’ (অজ্ঞতার যুগ) জ্ঞান-বিজ্ঞানে পশ্চাৎপদ হলেও সাহিত্য, বিশেষ করে কাব্যচর্চায় ছিল আরবের স্বর্ণযুগ।

বৈশিষ্ট্যসমূহ:
১. মৌখিক ঐতিহ্য ও স্মৃতিশক্তি: তখন লেখাপড়ার তেমন প্রচলন ছিল না। কবিরা কবিতা রচনা করতেন এবং তা শ্রুতি ও প্রখর স্মৃতিশক্তির মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ত।
২. কবিতার বিষয়বস্তু: তৎকালীন কবিতার প্রধান বিষয় ছিল গোত্রীয় অহংকার, বীরত্ব, যুদ্ধবিগ্রহ, প্রেম, বিরহ, মদ, উট, ঘোড়া এবং প্রকৃতির রুক্ষ সৌন্দর্য।
৩. কাব্যিক উৎকর্ষতা: ভাষার লালিত্য, উপমা, অলংকার এবং ছন্দের ব্যবহারে এই যুগের কবিতা ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ওকাজ মেলায় প্রতি বছর কবিতা প্রতিযোগিতার আয়োজন হতো।
৪. সাবয়ে মুয়াল্লাকা (ঝুলন্ত সপ্তক): ওকাজ মেলায় বিজয়ী শ্রেষ্ঠ সাতটি কবিতাকে সোনালি অক্ষরে মিসরীয় রেশমি কাপড়ে লিখে কাবার দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা হতো, যা ‘সাবয়ে মুয়াল্লাকা’ নামে পরিচিত। ইমরুল কায়েস, আনতারা ইবনে শাদ্দাদ প্রমুখ ছিলেন এর বিখ্যাত রচয়িতা।
৫. গদ্য সাহিত্য: গদ্য সাহিত্যের খুব বেশি বিকাশ না হলেও প্রবাদ বাক্য, লোককাহিনি এবং বংশলতিকা সংরক্ষণে তাদের দক্ষতা ছিল অসাধারণ।

৬। আব্বাসী আমলে শিক্ষার বিভিন্ন শাখায় মুসলমানদের অবদান মূল্যায়ন কর।
[Evaluate the contributions of the Muslims to various branches of learning under the Abbasides.]
উত্তর:

আব্বাসীয় আমল (৭৫০-১২৫৮ খ্রি.) হলো ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতার ‘সুবর্ণ যুগ’। খলিফা হারুনুর রশিদ এবং আল-মামুনের পৃষ্ঠপোষকতায় বাগদাদ হয়ে উঠেছিল বিশ্বের বুদ্ধিবৃত্তিক রাজধানী।

বিভিন্ন শাখায় অবদান:
১. বায়তুল হিকমাহ ও অনুবাদ: আল-মামুন বাগদাদে ‘বায়তুল হিকমাহ’ (House of Wisdom) প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে গ্রিক, ফারসি, সংস্কৃত প্রভৃতি ভাষার শ্রেষ্ঠ জ্ঞানভাণ্ডার আরবিতে অনূদিত হয়।
২. চিকিৎসাবিজ্ঞান: এই যুগে চিকিৎসাবিজ্ঞানে যুগান্তকারী অগ্রগতি হয়। আল-রাজি ‘আল-হাউয়ী’ এবং ইবনে সিনা চিকিৎসাশাস্ত্রের বাইবেল খ্যাত ‘আল-কানুন ফিত-তিব্ব’ রচনা করেন, যা ইউরোপে শতাব্দীর পর শতাব্দী পাঠ্য ছিল।
৩. গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞান: আল-খাওয়ারিজমি বীজগণিতের (Algebra) আবিষ্কার করেন এবং শূন্যের (০) ব্যবহার ইউরোপে পরিচিত করান। আল-বাত্তানি এবং ওমর খৈয়াম জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ত্রিকোণমিতিতে অভাবনীয় অবদান রাখেন।
৪. দর্শন ও রসায়ন: আল-কিন্দী, আল-ফারাবি এবং ইবনে সিনা গ্রিক দর্শনের সাথে ইসলামের সমন্বয় করেন। অন্যদিকে জাবির ইবনে হাইয়ান পরীক্ষামূলক রসায়ন বিজ্ঞানের (Chemistry) ভিত্তি স্থাপন করেন।
৫. প্রতিষ্ঠান গঠন: নিজামিয়া মাদ্রাসার মতো বিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং অসংখ্য পাবলিক লাইব্রেরি স্থাপন এই যুগের শ্রেষ্ঠ অবদান।

৭। ইউরোপে জ্ঞান-বিজ্ঞান বিস্তারে মুসলিম স্পেনের ভূমিকা নিরূপণ কর।
[Determine the role of Muslim Spain in the spread of knowledge and science in Europe.]
উত্তর:

মধ্যযুগে ইউরোপ যখন কুসংস্কার ও অজ্ঞতার অন্ধকারে (Dark Ages) নিমজ্জিত, তখন মুসলিম শাসিত স্পেন (আন্দালুসিয়া) জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোয় আলোকিত ছিল। ইউরোপের নবজাগরণে (রেনেসাঁ) মুসলিম স্পেনের ভূমিকা অবিস্মরণীয়।

জ্ঞান বিস্তারে ভূমিকা:
১. শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র: কর্ডোভা, টলেডো, সেভিল এবং গ্রানাডার মতো শহরগুলো ছিল ইউরোপের জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র। কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে খ্রিষ্টান ও ইহুদি পণ্ডিতরা জ্ঞান অর্জনের জন্য ছুটে আসত।
২. অনুবাদ আন্দোলন: টলেডো শহরটি ছিল অনুবাদের প্রধান কেন্দ্র। এখানে মুসলিম, খ্রিষ্টান ও ইহুদি পণ্ডিতরা মিলে আরবিতে সংরক্ষিত গ্রিক দর্শন, চিকিৎসা, গণিত ও বিজ্ঞানের বিশাল ভাণ্ডার ল্যাটিন ও অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষায় অনুবাদ করেন।
৩. বিজ্ঞানের হস্তান্তর: ইবনে সিনা, আল-জাহারাবি (শল্যচিকিৎসার জনক), এবং ইবনে রুশদের মতো পণ্ডিতদের মৌলিক কাজ স্পেনের মাধ্যমেই ইউরোপে প্রবেশ করে।
৪. সভ্যতার আলো: যখন ইউরোপে রাজপ্রাসাদেও পাঠাগার ছিল না, তখন স্পেনের কর্ডোভায় শুধু সরকারি লাইব্রেরিতেই কয়েক লাখ বই ছিল। স্পেনের উন্নত কৃষি, স্থাপত্য, কাগজ তৈরি এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের জ্ঞান ইউরোপীয়দের অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছিল।

৮। রসায়ন অথবা গণিত শাস্ত্রে মুসলমানদের অবদান পর্যালোচনা কর।
[Review the contributions of the Muslims in the Chemistry or the Mathematics.]
উত্তর:

গণিত শাস্ত্রে মুসলমানদের অবদান:
মধ্যযুগে গণিত শাস্ত্রে মুসলিম বিজ্ঞানীদের অবদান ছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম যুগান্তকারী ঘটনা, যার ওপর ভিত্তি করেই আধুনিক গণিত দাঁড়িয়ে আছে।
১. বীজগণিতের আবিষ্কার: মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খাওয়ারিজমিকে “বীজগণিতের জনক” বলা হয়। তাঁর লেখা বিখ্যাত গ্রন্থ “আল-জাবর ওয়াল-মুকাবালা” থেকেই ‘Algebra’ (অ্যালজেবরা) শব্দের উৎপত্তি। তিনি গণিতকে একটি স্বাধীন শাস্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
২. শূন্য (০) এবং সংখ্যা পদ্ধতির প্রসার: ভারতীয় হিন্দু সংখ্যা পদ্ধতি (০ থেকে ৯) আরবরা গ্রহণ করে উন্নত করে এবং আল-খাওয়ারিজমির মাধ্যমেই তা ‘অ্যারাবিক নিউমারেলস’ নামে ইউরোপ ও সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।
৩. ত্রিকোণমিতি (Trigonometry): আল-বাত্তানি এবং আবুল ওয়াফা ত্রিকোণমিতিকে চরম উৎকর্ষে পৌঁছান। তারা সাইন (Sine), কোসাইন (Cosine) এবং ট্যানজেন্ট (Tangent)-এর নির্ভুল মান ও সারণি নির্ণয় করেন।
৪. জ্যামিতি ও সমীকরণ: ওমর খৈয়াম ঘন বা ত্রিঘাত সমীকরণের (Cubic Equations) জ্যামিতিক সমাধান প্রদান করে গণিতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান।
এসব আবিষ্কার না হলে আধুনিক যুগে কম্পিউটার ও প্রযুক্তির বিকাশ অসম্ভব ছিল।

খ-বিভাগ
(যে কোনো দুইটি প্রশ্নের উত্তর দাও)
মান— ১০×২ = ২০
৯। সমাজ জীবনে ইজতিহাদের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ কর।
[Mention the necessity of Iztihad in social life.]
উত্তর:

ইজতিহাদ কী: ইসলামি পরিভাষায়, কুরআন ও সুন্নাহর মৌলিক নীতিমালার আলোকে গভীর গবেষণা ও চিন্তা-ভাবনার মাধ্যমে যুগের নতুন নতুন সমস্যার ইসলামি সমাধান বা আইন বের করাকে ‘ইজতিহাদ’ বলা হয়।

সমাজ জীবনে এর প্রয়োজনীয়তা:
১. ইসলামের গতিশীলতা রক্ষা: মানব সমাজ পরিবর্তনশীল। ১৪০০ বছর আগে যে সমস্যা ছিল না, আজ তা উদ্ভূত হয়েছে (যেমন: আধুনিক ব্যাংকিং, ডিজিটাল মুদ্রা)। ইজতিহাদ ছাড়া ইসলামকে আধুনিক যুগে গতিশীল ও যুগোপযোগী রাখা সম্ভব নয়।
২. চিকিৎসা বিজ্ঞানের নতুন সমস্যা সমাধান: অঙ্গ প্রতিস্থাপন, টেস্টটিউব বেবি, ডিএনএ (DNA) টেস্টের মতো আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান সৃষ্ট জটিল নৈতিক প্রশ্নগুলোর সমাধান একমাত্র ইজতিহাদের মাধ্যমেই দেওয়া সম্ভব।
৩. রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক সমস্যা: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, শেয়ারবাজার, বিমা ব্যবস্থা প্রভৃতি বিষয়ে শরিয়তের সঠিক দিকনির্দেশনা পেতে যোগ্য মুজতাহিদদের ইজতিহাদ অপরিহার্য।
৪. কুরআন-সুন্নাহর সঠিক প্রয়োগ: ইজতিহাদ নতুন ধর্ম তৈরি করে না, বরং কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে বর্তমান বাস্তবতার নিরিখে সঠিক আইন প্রয়োগের পথ প্রশস্ত করে সমাজকে স্থবিরতার হাত থেকে রক্ষা করে।

১০। দারিদ্র্য বিমোচনে যাকাতের ভূমিকা মূল্যায়ন কর।
[Evaluate the role of Zakat in poverty alleviation.]
উত্তর:

ইসলামি অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো যাকাত। এটি কোনো দয়া নয়, বরং ধনীর সম্পদে গরিবের অবশ্য প্রাপ্য অধিকার। সমাজের দারিদ্র্য বিমোচনে যাকাতের ভূমিকা অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী:
১. সম্পদের সুষম বণ্টন: পুঁজিবাদী সমাজে সম্পদ গুটিকয়েক মানুষের হাতে কুক্ষিগত থাকে। কিন্তু যাকাত ব্যবস্থার ফলে ধনীর অলস সম্পদের ২.৫% বাধ্যতামূলকভাবে গরিবদের হাতে পৌঁছায়, যা অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে।
২. কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসন: যাকাত শুধু খাওয়ার জন্য না দিয়ে যদি দরিদ্রদের কর্মসংস্থানের (যেমন: রিকশা, সেলাই মেশিন বা ব্যবসার মূলধন প্রদান) ব্যবস্থা করা হয়, তবে তারা দ্রুত স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে।
৩. ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি: গরিব মানুষের হাতে যাকাতের অর্থ গেলে তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে। ফলে বাজারে পণ্যের চাহিদা বাড়ে, উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির চাকা সচল হয়।
৪. সামাজিক নিরাপত্তা: যাকাতের মাধ্যমে এতিম, বিধবা, পঙ্গু ও কর্মক্ষমতাহীন মানুষের অন্ন, বস্ত্র ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করা সম্ভব হয়, যা সমাজ থেকে ভিক্ষাবৃত্তি ও অপরাধ দূর করে।
১১। চিকিৎসা বিজ্ঞানে ইবনে সিনার অবদান মূল্যায়ন কর।
[Evaluate the contributions of Ibn Sina to the medical science.]
উত্তর:

আবু আলী হোসাইন ইবনে সিনা (পাশ্চাত্যে ‘Avicenna’ নামে পরিচিত) ছিলেন মধ্যযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মুসলিম চিকিৎসক, দার্শনিক ও বিজ্ঞানী। তাঁকে ‘ফাদার অব আর্লি মডার্ন মেডিসিন’ বলা হয়।

অবদান:
১. আল-কানুন ফিত-তিব্ব (The Canon of Medicine): এটি ইবনে সিনার শ্রেষ্ঠ কীর্তি। ৫ খণ্ডে রচিত এই চিকিৎসা বিশ্বকোষটি এতটাই নির্ভুল ও বিজ্ঞানসম্মত ছিল যে, এটি প্রায় ৬০০ বছর ধরে ইউরোপের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রধান পাঠ্যবই হিসেবে পড়ানো হতো।
২. রোগ নির্ণয় ও ছোঁয়াচে রোগ: তিনিই প্রথম আবিষ্কার করেন যে যক্ষ্মা (TB) একটি বায়ুবাহিত ছোঁয়াচে রোগ। মহামারি এড়াতে তিনিই প্রথম ‘কোয়ারেন্টাইন’ (Quarantine) পদ্ধতির ধারণা দেন।
৩. মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা: শারীরিক রোগের পেছনে মানসিক কারণ (Psychosomatic illness) থাকতে পারে, তা তিনিই প্রথম চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রমাণ করেন।
৪. ফার্মাকোলজি বা ঔষধবিজ্ঞান: তাঁর বইয়ে প্রায় ৭৬০টি ঔষধের বর্ণনা, তাদের কার্যকারিতা এবং ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের পদ্ধতি আলোচনা করা হয়েছে। এছাড়া চোখের অ্যানাটমি এবং স্নায়ুতন্ত্র নিয়ে তাঁর গবেষণা ছিল তাঁর সময়ের চেয়ে বহু যুগ এগিয়ে।

১২। উমাইয়া আমলে আরবি সাহিত্যের বৈশিষ্ট্যসমূহ বর্ণনা কর।
[Describe the characteristics of the Arabic literature under the Umayyad.]
উত্তর:

উমাইয়া আমল (৬৬১-৭৫০ খ্রি.) ছিল আরবি সাহিত্যের একটি ক্রান্তিকাল, যেখানে প্রাক-ইসলামি যুগের ঐতিহ্য এবং ইসলামি যুগের শালীনতার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটেছিল।

বৈশিষ্ট্যসমূহ:
১. রাজনৈতিক কবিতার উদ্ভব: এই যুগে রাজনৈতিক দলগুলোর (শিয়া, খারিজি, জুবায়রি ও উমাইয়া সমর্থক) উদ্ভব ঘটে। প্রতিটি দল তাদের নিজেদের মতাদর্শ প্রচার এবং বিরোধীদের আক্রমণের হাতিয়ার হিসেবে কবিতাকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে।
২. গজল বা প্রেমের কবিতার বিকাশ: এ যুগে প্রেমের কবিতা দুটি ধারায় বিকশিত হয়। একটি হলো ‘উমরি গজল’ (বাস্তববাদী ও বিলাসী প্রেম) এবং অপরটি হলো ‘উধরি গজল’ (নিষ্পাপ, আধ্যাত্মিক ও ট্র্যাজিক প্রেম, যেমন- মজনু ও লায়লার প্রেমকাহিনি)।
৩. নাকাইদ (ব্যঙ্গ কবিতা): দুজন কবির মধ্যে কবিতায় কবিতায় আক্রমণ ও প্রতি-আক্রমণ বা ব্যঙ্গাত্মক প্রতিযোগিতাকে ‘নাকাইদ’ বলা হয়। জারির, আল-ফারাজদাক এবং আল-আখতাল ছিলেন এই যুগের বিখ্যাত ‘নাকাইদ’ রচয়িতা।
৪. গদ্য ও বাগ্মিতা: রাজনৈতিক সভা, খুতবা ও চিঠিপত্রের (রাসাইল) প্রয়োজনে এ যুগে গদ্য সাহিত্য এবং অলংকারপূর্ণ বক্তৃতার (Oratory) ব্যাপক বিকাশ ঘটে। হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ছিলেন এই যুগের শ্রেষ্ঠ বাগ্মী।

Follow Our Facebook Page
দ্রুত নতুন বই পেতে যুক্ত থাকুন
Follow Now