ফাজিল অনার্স ৩য় বর্ষ – দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মুসলমানদের ইতিহাস (৩০৮) প্রশ্ন সমাধান | Fazil Hons History 3rd Year – History of Muslims in South-East Asia (308) QnA 2024

Join Our Telegram Channel
দ্রুত নতুন বই পেতে যুক্ত থাকুন
Join Now
admin
Fazil Honours 3rd Year Exam 2024 Question Paper Solution for Islamic History & Culture (History of Muslims in South-East Asia). ফাজিল ৩য় বর্ষের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মুসলমানদের ইতিহাস) বিষয়ের সকল প্রশ্ন ও বিস্তারিত উত্তর।
Join Our WhatsApp Channel
দ্রুত নতুন বই পেতে যুক্ত থাকুন
Join Now
📋 সূচিপত্র (Table of Contents)

পরীক্ষা কোড: ২ ০ ৩     প্রশ্নপত্র কোড: ১ ১ ৭

ফাজিল স্নাতক (অনার্স) তৃতীয় বর্ষ পরীক্ষা, ২০২৪

ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
[দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মুসলমানদের ইতিহাস (১৯০০ খ্রি. পর্যন্ত)]

বিষয় কোড: ২ ০ ৫ ৩ ০ ৮

সময়— ৪ ঘণ্টা
পূর্ণমান— ৮০

ক বিভাগ
(যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও)
মান— ১৫×৪ = ৬০
১। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভৌগোলিক সীমানা উল্লেখ কর। ইসলাম আগমনের পূর্বে এ আঞ্চলিক লোকদের সামাজিক ও ধর্মীয় অবস্থা আলোচনা কর।
[Mention the geographical boundary of South-East Asia. Discuss the social and religious condition of the people of this region before the advent of Islam.]
উত্তর:

ভৌগোলিক সীমানা: এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত সুবিশাল ভূখণ্ড ও দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া গঠিত। এর উত্তরে চীন, দক্ষিণে অস্ট্রেলিয়া ও ভারত মহাসাগর, পূর্বে প্রশান্ত মহাসাগর এবং পশ্চিমে ভারত ও বঙ্গোপসাগর অবস্থিত। বর্তমান মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, ব্রুনাই, সিঙ্গাপুর এবং পূর্ব তিমুর এই অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত।

প্রাক-ইসলামি সামাজিক ও ধর্মীয় অবস্থা:
১. সামাজিক অবস্থা: ইসলাম আগমনের পূর্বে এ অঞ্চলের সমাজ ব্যবস্থা ছিল বহুধাবিভক্ত। সমাজে রাজা, অভিজাত শ্রেণি, সাধারণ প্রজা এবং ক্রীতদাস—এই স্তরভেদ ছিল। ভারতীয় সংস্কৃতির প্রভাবে জাতিভেদ প্রথারও কিছুটা অস্তিত্ব ছিল। নারীদের অবস্থা তুলনামূলক ভালো থাকলেও সমাজে পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য বজায় ছিল।
২. ধর্মীয় অবস্থা: প্রাচীনকাল থেকেই এ অঞ্চলের মানুষের আদি ধর্ম ছিল সর্বপ্রাণবাদ (Animism) বা জড়োপাসনা। পরবর্তীতে ভারতীয় বণিক ও পণ্ডিতদের মাধ্যমে এখানে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের ব্যাপক প্রসার ঘটে। শ্রীবিজয় সাম্রাজ্য (বৌদ্ধ) এবং মাজাপাহিত সাম্রাজ্য (হিন্দু) এই অঞ্চলে শক্তিশালী ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার করেছিল। ইসলাম আগমনের প্রাক্কালে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মই ছিল এ অঞ্চলের প্রধান ধর্ম।

২। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রাক ইউরোপীয় অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সম্পর্ক আলোচনা কর।
[Discuss the pre-European economy of South-East Asia and its connection to International trade.]
উত্তর:

প্রাক-ইউরোপীয় অর্থনীতি: ইউরোপীয়দের আগমনের পূর্বে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতি মূলত কৃষি ও মসলা উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল ছিল। জাভা, সুমাত্রা এবং মূল ভূখণ্ডে প্রচুর পরিমাণে ধান উৎপাদিত হতো। তবে এই অঞ্চলের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ ছিল মসলা (লবঙ্গ, গোলমরিচ, দারুচিনি, জায়ফল), যা প্রধানত মালুকু বা ‘স্পাইস আইল্যান্ডস’ এ উৎপাদিত হতো।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সাথে সম্পর্ক:
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ভৌগোলিকভাবে চীন এবং ভারত/মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্য রুটের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত হওয়ায় এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়।
১. বাণিজ্যিক হাব: মালাক্কা প্রণালি ছিল পূর্ব ও পশ্চিমের বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। এখানে চীন থেকে সিল্ক ও সিরামিক এবং ভারত ও আরব থেকে সুতি কাপড়, পারফিউম ও কাঁচের জিনিসপত্র আসত।
২. আরব ও ভারতীয় বণিকদের আধিপত্য: ইউরোপীয়রা আসার আগে এই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মূলত আরব, পারস্য, গুজরাটি এবং তামিল বণিকদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এই বাণিজ্যিক সম্পর্কের সূত্র ধরেই মূলত এই অঞ্চলে প্রথম ইসলামের আগমন ও বিস্তার ঘটে।

৩। মালাক্কা সালতানাতের পরিচয় দাও। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইসলাম বিস্তারে মালাক্কার ভূমিকা আলোচনা কর।
[Introduce the Malakka Saltanate. Discuss the role of Malakka in the spread of Islam in South-East Asia.]
উত্তর:

মালাক্কা সালতানাতের পরিচয়: মালাক্কা সালতানাত ছিল ১৫শ শতাব্দীর একটি শক্তিশালী সামুদ্রিক সাম্রাজ্য। ১৪০০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে সুমাত্রার শ্রীবিজয় রাজবংশের এক পলাতক যুবরাজ ‘পরমেশ্বর’ (যিনি পরে ইসলাম গ্রহণ করে ইস্কান্দার শাহ নাম ধারণ করেন) মালাক্কা প্রণালির তীরে এই রাজ্যটি প্রতিষ্ঠা করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়।

ইসলাম বিস্তারে মালাক্কার ভূমিকা:
১. বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে প্রভাব: মালাক্কায় ব্যবসা করতে আসা বিদেশি মুসলিম বণিকদের সংস্পর্শে স্থানীয় অধিবাসীরা ইসলাম সম্পর্কে জানতে পারে। মালাক্কা থেকে ব্যবসায়ীরা জাভা, বোর্নিও, মালুকু ও ফিলিপাইনে গেলে তাদের সাথে ইসলামও সেখানে পৌঁছে যায়।
২. ইসলামি শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র: মালাক্কার সুলতানরা ইসলামি পণ্ডিত ও সুফি সাধকদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। ফলে মালাক্কা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইসলামি শিক্ষা, দর্শন ও সংস্কৃতির প্রধান কেন্দ্রে (Hub) পরিণত হয়।
৩. রাজনৈতিক ও বৈবাহিক সম্পর্ক: মালাক্কার সুলতানরা পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের রাজকন্যাদের বিয়ে করতেন এবং শর্ত দিতেন ইসলাম গ্রহণের। এছাড়া মালাক্কার রাজনৈতিক আধিপত্য এবং সামরিক অভিযানের ফলেও মালয় উপদ্বীপ এবং সুমাত্রার বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলামের দ্রুত প্রসার ঘটে।

৪। ডাচ কারা? জাভায় প্রবর্তিত কালচার সিস্টেমের সুফল ও কুফল পর্যালোচনা কর।
[Who were the Dutch? Review the merits and demerits of the culture system introduced by the Dutch in Java.]
উত্তর:

ডাচ কারা: ইউরোপের নেদারল্যান্ডস (হল্যান্ড) দেশের অধিবাসীদের ডাচ (Dutch) বা ওলন্দাজ বলা হয়। তারা ১৬০২ সালে ‘ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ (VOC) গঠন করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়, বিশেষত ইন্দোনেশিয়ায় মসলা বাণিজ্যের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল।

কালচার সিস্টেম (Cultuurstelsel): ১৮৩০ সালে ডাচ গভর্নর জেনারেল জোহানেস ভ্যান ডেন বোশ জাভায় একটি বাধ্যতামূলক কৃষিনীতি চালু করেন, যা ‘কালচার সিস্টেম’ নামে পরিচিত। এর অধীনে কৃষকদের তাদের জমির এক-পঞ্চমাংশে ডাচদের নির্ধারিত রপ্তানিযোগ্য ফসল (যেমন: কফি, চিনি, নীল) চাষ করতে বাধ্য করা হতো।

সুফল:
১. ডাচ সরকারের জন্য এটি বিপুল অর্থনৈতিক সফলতা নিয়ে আসে এবং নেদারল্যান্ডস দেউলিয়া হওয়া থেকে রক্ষা পায়।
২. জাভায় যোগাযোগের জন্য কিছু রাস্তাঘাট ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটে, যা মূলত ডাচদের ব্যবসায়িক স্বার্থেই করা হয়েছিল।

কুফল (নেতিবাচক দিক):
১. চরম শোষণ ও দুর্ভিক্ষ: কৃষকদের ধানের জমিতে জোরপূর্বক কফি ও নীল চাষ করানোয় জাভায় তীব্র খাদ্য সংকট ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যাতে হাজার হাজার মানুষ মারা যায়।
২. দুর্নীতি ও নির্যাতন: স্থানীয় অভিজাতদের মাধ্যমে এই প্রথা বাস্তবায়ন করায় কৃষকদের ওপর অবর্ণনীয় শারীরিক নির্যাতন ও শোষণ চালানো হয়। এটি ছিল ইন্দোনেশিয়ার ইতিহাসের অন্যতম কালো অধ্যায়।

৫। ইন্দোনেশিয়ায় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পটভূমি ও প্রভাব পর্যালোচনা কর।
[Review the background and consequence of the Nationalist movement in Indonesia.]
উত্তর:

পটভূমি:
১. ডাচদের শোষণ: শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ডাচদের অর্থনৈতিক শোষণ, কালচার সিস্টেমের মাধ্যমে নির্যাতন এবং ইন্দোনেশীয়দের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে গণ্য করার ফলে জনগণের মনে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
২. ইসলামি পুনর্জাগরণ ও সংগঠন: বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ‘সারেকাত ইসলাম’ (১৯১২) এবং ‘মুহাম্মাদিয়া’র মতো সংগঠনগুলো ইসলামি ভ্রাতৃত্ববোধের মাধ্যমে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে শুরু করে।
৩. শিক্ষিত শ্রেণির উত্থান: ডাচদের ‘এথিক্যাল পলিসি’র কারণে কিছু ইন্দোনেশীয় আধুনিক পশ্চিমা শিক্ষা লাভের সুযোগ পায়। এই শিক্ষিত যুবকরাই জাতীয়তাবাদের বীজ বপন করে এবং ১৯০৮ সালে ‘বুদি উতোমো’ (Budi Utomo) নামক প্রথম আধুনিক সংগঠন তৈরি করে।
৪. বৈশ্বিক প্রভাব: ১৯০৫ সালে রাশিয়ার বিরুদ্ধে জাপানের বিজয় এশিয়ানদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয় যে, ইউরোপীয়দের পরাজিত করা সম্ভব।

প্রভাব (Consequence):
জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ফলে ইন্দোনেশীয়দের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি পায়। সুকর্ন-এর নেতৃত্বে ১৯২৭ সালে ‘ইন্দোনেশিয়ান ন্যাশনালিস্ট পার্টি’ (PNI) গঠিত হয়। এই আন্দোলনের চাপেই শেষ পর্যন্ত ডাচরা পিছু হটে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৫ সালের ১৭ আগস্ট ইন্দোনেশিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করতে সক্ষম হয়।

৬। ১৮২৪ সালের ইঙ্গ-ওলন্দাজ চুক্তির ধারাসমূহ বিশ্লেষণ কর এবং এর গুরুত্ব আলোচনা কর।
[Analyze the main clauses of the Anglo-Dutch Treaty of 1824 and evolute its historical significance.]
উত্তর:

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় উপনিবেশ ও বাণিজ্য নিয়ে ব্রিটেন এবং নেদারল্যান্ডসের (ডাচ) মধ্যে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব মেটানোর জন্য ১৮২৪ সালে লন্ডনে ঐতিহাসিক ‘ইঙ্গ-ওলন্দাজ চুক্তি’ (Anglo-Dutch Treaty) স্বাক্ষরিত হয়।

প্রধান ধারাসমূহ:
১. অঞ্চল ভাগাভাগি: চুক্তির মাধ্যমে মালয় দ্বীপপুঞ্জকে দুটি প্রভাব বলয়ে ভাগ করা হয়। মালাক্কা প্রণালির উত্তর-পূর্ব অংশ (মালয় উপদ্বীপ ও সিঙ্গাপুর) ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে এবং দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ (সুমাত্রা, জাভা ও অন্যান্য ইন্দোনেশীয় দ্বীপ) ডাচদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
২. অঞ্চল বিনিময়: ডাচরা মালয় উপদ্বীপে তাদের সমস্ত সম্পত্তি (যেমন: মালাক্কা) ব্রিটিশদের কাছে হস্তান্তর করে। বিনিময়ে ব্রিটিশরা সুমাত্রায় অবস্থিত তাদের উপনিবেশ ‘বেনকুলেন’ ডাচদের ছেড়ে দেয়।
৩. বাণিজ্যিক সুবিধা: উভয় দেশ একে অপরের বন্দরে মুক্ত বাণিজ্যের অধিকার লাভ করে এবং জলদস্যুতা দমনে যৌথভাবে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেয়।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব:
এই চুক্তি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানচিত্রকে চিরতরে বদলে দেয়। এর ফলেই আধুনিক মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সীমানা নির্ধারিত হয়। এটি ব্রিটিশ ও ডাচদের মধ্যকার ঔপনিবেশিক সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে উভয় শক্তিকে নিজ নিজ অঞ্চলে নির্বিঘ্নে শোষণ করার পথ প্রশস্ত করে।

৭। মালয়ে ব্রিটিশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় ফ্রান্সিস লাইটের অবদান মূল্যায়ন কর।
[Evaluate the role of Francis Light in establishing British supremacy in Malaya.]
উত্তর:

ক্যাপ্টেন ফ্রান্সিস লাইট ছিলেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন নাবিক ও প্রতিনিধি। মালয় উপদ্বীপে ব্রিটিশ আধিপত্যের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনে তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।

অবদান মূল্যায়ন:
১. পেনাং অধিকার (১৭৮৬): ডাচদের একচেটিয়া বাণিজ্যিক আধিপত্য ভাঙার জন্য ব্রিটিশদের মালাক্কা প্রণালিতে একটি নৌঘাঁটির প্রয়োজন ছিল। ফ্রান্সিস লাইট তাঁর ব্যক্তিগত কূটনীতি ও প্রভাব খাটিয়ে কেদাহর সুলতানের কাছ থেকে বাৎসরিক ভাড়ার বিনিময়ে ‘পেনাং’ দ্বীপ ইজারা নেন। এটিই ছিল মালয়ে ব্রিটিশদের প্রথম সরাসরি উপনিবেশ।
২. মুক্ত বন্দর প্রতিষ্ঠা: তিনি পেনাংকে একটি ‘ফ্রি পোর্ট’ বা মুক্ত বন্দর ঘোষণা করেন, যেখানে কোনো শুল্ক ছাড়াই ব্যবসা করা যেত। এর ফলে আরব, ভারতীয়, চীনা এবং ইউরোপীয় বণিকরা দলে দলে পেনাংয়ে আসতে থাকে এবং ডাচদের বাণিজ্যিক মনোপলি ভেঙে পড়ে।
৩. ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন: পেনাংয়ের এই সফলতাই পরবর্তীতে ব্রিটিশদের সিঙ্গাপুর এবং মালাক্কা দখলে উৎসাহিত করে, যা ১৮২৬ সালে ‘স্ট্রেইটস সেটেলমেন্টস’ (Straits Settlements) গঠনের মাধ্যমে মালয়ে ব্রিটিশদের চূড়ান্ত আধিপত্য নিশ্চিত করে।

৮। ফিলিপাইনে ইসলাম প্রচার ও প্রসারের পর্যায় ক্রমিক ধারাসমূহ আলোচনা কর।
[Discuss the stages in the propagation and spread of Islam in the Philippines.]
উত্তর:

ফিলিপাইনে ইসলাম কোনো সামরিক অভিযানের মাধ্যমে নয়, বরং বণিক ও সুফি সাধকদের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে কয়েকটি ধাপে প্রসার লাভ করেছিল।

পর্যায়ক্রমিক ধারাসমূহ:
১. প্রাথমিক পর্যায় (বণিকদের আগমন): ১৩শ শতাব্দীর শেষের দিকে আরব ও গুজরাটি মুসলিম বণিকরা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে ফিলিপাইনের দক্ষিণ উপকূলে (সুলু দ্বীপপুঞ্জ) আসতে শুরু করে। তাদের সততা ও উন্নত জীবনাচরণ দেখে স্থানীয়রা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়।
২. সুফি সাধকদের পর্যায়: ১৩৮০ সালের দিকে মখদুম করিম নামক একজন বিখ্যাত আরব সুফি সাধক সুলু দ্বীপে আসেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। তিনি সেখানে প্রথম মসজিদ নির্মাণ করেন।
৩. সালতানাত প্রতিষ্ঠা (সুলু): ১৪৫০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে সৈয়দ আবু বকর ফিলিপাইনে আসেন এবং সুলুর রাজকন্যাকে বিয়ে করে ‘সুলু সালতানাত’ প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ইসলামকে রাজনৈতিক ভিত্তি দান করে।
৪. মিন্দানাও অঞ্চলে বিস্তার: ১৫শ শতাব্দীর শেষের দিকে জোহরের রাজপুত্র শরিফ কাবুংসুয়ান মিন্দানাও দ্বীপে আসেন এবং স্থানীয়দের ইসলামে দীক্ষিত করে ‘মাগুইন্দানাও সালতানাত’ গঠন করেন।
৫. উত্তরে বিস্তার ও বাধা: ১৬শ শতাব্দীর মধ্যে ইসলাম ম্যানিলা পর্যন্ত পৌঁছে যায় এবং রাজা সুলায়মান সেখানে একটি মুসলিম রাজত্ব কায়েম করেন। কিন্তু ১৫৬৫ সালে স্প্যানিশদের আগমনের ফলে ম্যানিলা থেকে মুসলিমদের বিতাড়িত করা হয় এবং ইসলামের প্রসার শুধুমাত্র দক্ষিণাঞ্চলেই (মরো মুসলিম) সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

খ বিভাগ
(যে কোনো দুটি প্রশ্নের উত্তর দাও)
মান— ১০×২ = ২০
৯। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উপর টীকা লেখ।
[Write a short notes on the cultural heritage of Southeast Asia.]
উত্তর:

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হলো স্থানীয় সর্বপ্রাণবাদ (Animism), ভারতীয় (হিন্দু-বৌদ্ধ), ইসলামি এবং ইউরোপীয় সংস্কৃতির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ বা সিনক্রেটিজম (Syncretism)।

স্থাপত্য: এ অঞ্চলের স্থাপত্যে প্রাচীন হিন্দু ও বৌদ্ধ প্রভাব সুস্পষ্ট, যার প্রমাণ হলো ইন্দোনেশিয়ার বোরোবুদুর (বিশ্বের বৃহত্তম বৌদ্ধ মন্দির) এবং কম্বোডিয়ার আংকরভাট মন্দির। পরবর্তীতে ইসলামি যুগে এখানে এমন মসজিদ নির্মিত হয়, যেগুলোর ছাদ মধ্যপ্রাচ্যের মতো গম্বুজাকৃতির না হয়ে প্যাগোডা বা বহুতল বিশিষ্ট স্থানীয় ডিজাইনের ছিল।

শিল্প ও সাহিত্য: ছায়াপুতুল নাচ বা ‘ওয়ায়াং কুলিত’ (Wayang Kulit) এবং কাপড়ে নকশা করার বিশেষ পদ্ধতি ‘বাটিক’ (Batik) শিল্প এ অঞ্চলের অনন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। ভাষা ও সাহিত্যে সংস্কৃত ও আরবি শব্দের ব্যাপক ব্যবহার এ অঞ্চলের মিশ্র সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
১০। লিবারেল পলিসি কী? ব্যাখ্যা কর।
[What is the Liberal policy? Explain briefly.]
উত্তর:

লিবারেল পলিসি (Liberal Policy): ডাচ ইস্ট ইন্ডিজ বা বর্তমান ইন্দোনেশিয়ায় ১৮৭০ থেকে ১৯০০ সাল পর্যন্ত ডাচ সরকার যে অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক নীতি গ্রহণ করেছিল, তা ‘লিবারেল পলিসি’ বা উদারনীতিক পলিসি নামে পরিচিত।

ব্যাখ্যা: পূর্বে প্রবর্তিত ‘কালচার সিস্টেম’ বা জোরপূর্বক কৃষিনীতির ভয়াবহ কুফল ও তীব্র সমালোচনার মুখে ডাচ সরকার সেটি বাতিল করে। নতুন লিবারেল পলিসির অধীনে সরকারি মনোপলি বা একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়া হয় এবং পশ্চিমা বেসরকারি পুঁজিপতিদের (Private enterprise) ইন্দোনেশিয়ায় রাবার, তামাক, চা বাগান এবং খনিজ সম্পদে বিনিয়োগের অবাধ সুযোগ দেওয়া হয়।
যদিও এর ফলে ইন্দোনেশিয়ায় আধুনিক অর্থনীতি ও শিল্পের বিকাশ ঘটে, কিন্তু স্থানীয় সাধারণ কৃষকদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি; তারা বেসরকারি ইউরোপীয় মালিকদের কারখানায় ও বাগানে সস্তা শ্রমিকে পরিণত হয়।
১১। ভিওসি।
[The VOC.]
উত্তর:

ভিওসি (VOC) বা ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি: ‘VOC’ হলো ডাচ শব্দ “Vereenigde Oostindische Compagnie”-এর সংক্ষিপ্ত রূপ, যার অর্থ ইউনাইটেড ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ১৬০২ সালে নেদারল্যান্ডস সরকার এই কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠা করে।

এটি ছিল বিশ্বের প্রথম বহুজাতিক কর্পোরেশন (Multinational Corporation) এবং প্রথম কোম্পানি যারা সাধারণ মানুষের কাছে শেয়ার বিক্রি করেছিল। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়, বিশেষত ইন্দোনেশিয়ায় মসলা বাণিজ্যের (লবঙ্গ, জায়ফল) ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাই ছিল এর মূল লক্ষ্য। এই কোম্পানিটি নিজস্ব সেনাবাহিনী রাখা, যুদ্ধ ঘোষণা করা এবং উপনিবেশ স্থাপন করার মতো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিকারী ছিল। প্রায় ২০০ বছর ধরে ব্যাপক শোষণ ও একচেটিয়া ব্যবসা করার পর, চরম দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে ১৭৯৯ সালে কোম্পানিটি দেউলিয়া হয়ে বিলুপ্ত হয়।
১২। তোমো পিরেস।
[Temo Peras.]
উত্তর:

তোমে পিরেস (Tomé Pires): তোমে পিরেস (১৪৬৫–১৫৪০) ছিলেন একজন পর্তুগিজ ফার্মাসিস্ট, লেখক এবং কূটনীতিক। তিনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইতিহাসের একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যক্ষদর্শী।

১৫১২ থেকে ১৫১৫ সাল পর্যন্ত তিনি মালাক্কায় অবস্থান করেন। সেখানে থাকাকালীন তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “সুমা ওরিয়েন্টাল” (Suma Oriental) রচনা করেন। এই গ্রন্থে তিনি লোহিত সাগর থেকে শুরু করে জাপান পর্যন্ত এশিয়ার বিশাল অঞ্চলের ভৌগোলিক বর্ণনা, বাণিজ্য পথ, বিভিন্ন জাতির বিবরণ এবং রাজনৈতিক অবস্থার অত্যন্ত নিখুঁত তথ্য লিপিবদ্ধ করেছেন। ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম দিকে মালয় দ্বীপপুঞ্জে মসলা বাণিজ্য, স্থানীয় সমাজ ব্যবস্থা এবং ইসলাম বিস্তারের ইতিহাস জানার জন্য এটি আধুনিক ঐতিহাসিকদের কাছে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ‘প্রাইমারি সোর্স’ বা প্রাথমিক উৎস হিসেবে বিবেচিত।
Follow Our Facebook Page
দ্রুত নতুন বই পেতে যুক্ত থাকুন
Follow Now