ফাজিল অনার্স ৩য় বর্ষ – তারিখুল বাঙ্গাল-২ (২০৫৩০৩) প্রশ্ন সমাধান | Fazil Hons History 3rd Year – Tarikhul Bengal-2 (303) QnA 2024

Join Our Telegram Channel
দ্রুত নতুন বই পেতে যুক্ত থাকুন
Join Now
admin
Fazil Honours 3rd Year Exam 2024 Question Paper Solution for Islamic History & Culture (Tarikhul Bengal-2: 1576-1947). ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ৩য় বর্ষের তারিখুল বাঙ্গাল-২ বিষয়ের সকল প্রশ্ন ও বিস্তারিত উত্তর পড়ুন।
Join Our WhatsApp Channel
দ্রুত নতুন বই পেতে যুক্ত থাকুন
Join Now
📋 সূচিপত্র (Table of Contents)

পরীক্ষা কোড: ২ ০ ৩     প্রশ্নপত্র কোড: ১ ১ ২

ফাজিল স্নাতক (অনার্স) তৃতীয় বর্ষ পরীক্ষা, ২০২৪

ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
[তারিখুল বাঙ্গাল-২ (১৫৭৬—১৯৪৭ খ্রি.)]

বিষয় কোড: ২ ০ ৫ ৩ ০ ৩

সময়— ৪ ঘণ্টা
পূর্ণমান— ৮০

ক বিভাগ
(যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও)
মান— ১৫×৪ = ৬০
১। বার ভূঁইয়া কারা? বাংলায় মুঘলদের বিরুদ্ধে বার ভূঁইয়াদের কর্মতৎপরতা আলোচনা কর।
[Who were the Bara Bhuiyans? Discuss the activities of the Bara Bhuiyans in Bengal against the Mughals.]
উত্তর:

বার ভূঁইয়াদের পরিচয়: ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগ এবং সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথমভাগে বাংলায় যে সকল স্বাধীন ও প্রতাপশালী জমিদার মুঘল আধিপত্য অস্বীকার করে নিজেদের স্বাধীনতা টিকিয়ে রেখেছিলেন, ইতিহাসে তারাই ‘বার ভূঁইয়া’ নামে পরিচিত। ‘বার’ বলতে এখানে নির্দিষ্ট ১২ জন নয়, বরং অসংখ্য স্বাধীন জমিদারকে বোঝানো হয়েছে। এদের মধ্যে ঈসা খান, মুসা খান, কেদার রায়, প্রতাপাদিত্য, ফজল গাজী প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।

মুঘলদের বিরুদ্ধে কর্মতৎপরতা ও প্রতিরোধ: ১৫৭৬ সালে রাজমহলের যুদ্ধে দাউদ খান কররানীর পতনের মাধ্যমে বাংলায় মুঘল শাসন প্রতিষ্ঠিত হলেও ভাটি অঞ্চলে বার ভূঁইয়ারা প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
১. ঈসা খানের নেতৃত্ব: বার ভূঁইয়াদের অবিসংবাদিত নেতা ঈসা খান সম্রাট আকবরের সেনাপতি মানসিংহ ও শাহবাজ খানের বিরুদ্ধে সফলভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করেন এবং আমৃত্যু (১৫৯৯ খ্রি.) মুঘলদের বাংলায় আধিপত্য বিস্তার করতে দেননি।
২. নৌযুদ্ধ ও গেরিলা কৌশল: বার ভূঁইয়াদের প্রধান শক্তি ছিল তাদের শক্তিশালী নৌবাহিনী এবং নদীমাতৃক বাংলার ভৌগোলিক পরিবেশ। মুঘল অশ্বারোহী বাহিনী বাংলার কাদা-পানিতে অকেজো হয়ে পড়ত। ভূঁইয়ারা গেরিলা কায়দায় আক্রমণ করে মুঘলদের পর্যুদস্ত করতেন।
৩. চূড়ান্ত পতন: সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে সুবাদার ইসলাম খান অত্যন্ত সুকৌশলে এবং শক্তিশালী নৌবহর ব্যবহার করে মুসা খান (ঈসা খানের পুত্র) সহ অন্যান্য ভূঁইয়াদের একে একে পরাজিত করেন (১৬১১-১৬১২ খ্রি.) এবং বাংলায় মুঘলদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন।

২। বাংলার মুসলিমদের উপর এর প্রভাব নির্দেশপূর্বক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শিক্ষানীতি পর্যালোচনা কর।
[Review the education policy of East India Company emphasizing its impact on the Muslim’s in Bengal.]
উত্তর:

কোম্পানির শিক্ষানীতি: ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রথমদিকে এদেশের শিক্ষায় হস্তক্ষেপ করেনি। পরবর্তীতে লর্ড মেকলের শিক্ষানীতি (১৮৩৫) এবং উডের ডেসপ্যাচ (১৮৫৪) এর মাধ্যমে ইংরেজি ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম ও সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল এমন এক শ্রেণি তৈরি করা, যারা রক্তে ও বর্ণে হবে ভারতীয়, কিন্তু রুচি, মতবাদ ও বুদ্ধিমত্তায় হবে ইংরেজ, যারা কোম্পানির শাসন পরিচালনায় সস্তা কেরানি হিসেবে কাজ করবে।

বাংলার মুসলিমদের ওপর প্রভাব:
কোম্পানির এই শিক্ষানীতি বাংলার মুসলিম সমাজে সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল।
১. ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত: মুসলিমরা ইংরেজি শিক্ষাকে খ্রিষ্টান ধর্মান্তরিত করার ষড়যন্ত্র মনে করত। তাই তারা ইংরেজি স্কুলগুলো বর্জন করে নিজেদের মক্তব-মাদরাসায় আবদ্ধ থাকে।
২. ফারসির বিলুপ্তি: ১৮৩৭ সালে ফারসির বদলে ইংরেজিকে সরকারি ভাষা করা হলে মুসলিমরা রাতারাতি সরকারি চাকরি ও সামাজিক মর্যাদা হারায়।
৩. অর্থনৈতিক ও সামাজিক পশ্চাৎপদতা: হিন্দু সম্প্রদায় দ্রুত ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করে সরকারি চাকরি ও জমিদারিতে উন্নতি লাভ করে। অন্যদিকে মুসলিমরা অর্থনৈতিকভাবে চরম দরিদ্র ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়ে। অনেক পরে নওয়াব আব্দুল লতিফ এবং স্যার সৈয়দ আহমদ খানের প্রচেষ্টায় মুসলিমরা আধুনিক শিক্ষার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে।

৩। বাংলার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সুবাদার শায়েস্তা খানের কৃতিত্ব মূল্যায়ন কর।
[Evaluate the achievements of Subader Shaista Khan in the socio-economic development of Bengal.]
উত্তর:

সম্রাট আওরঙ্গজেবের মামা এবং বাংলার বিখ্যাত সুবাদার শায়েস্তা খান (১৬৬৪-১৬৮৮ খ্রি.) বাংলার ইতিহাসে এক স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। তাঁর শাসনামল বাংলার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের স্বর্ণযুগ হিসেবে পরিচিত।

আর্থ-সামাজিক কৃতিত্ব:
১. জলদস্যু দমন ও শান্তি প্রতিষ্ঠা: তাঁর সবচেয়ে বড় সামরিক ও সামাজিক কৃতিত্ব হলো মগ (আরাকানি) ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের কঠোর হাতে দমন করা এবং চট্টগ্রাম জয় করে এর নাম ‘ইসলামাবাদ’ রাখা। এর ফলে বাংলার উপকূলীয় অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরে আসে।
২. দ্রব্যমূল্যের অভাবনীয় সস্তা দর: তাঁর আমলে কৃষিকাজের ব্যাপক প্রসার ঘটে এবং জিনিসপত্রের দাম অবিশ্বাস্য রকম কমে যায়। সে সময় টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত, যা ইতিহাসে প্রবাদে পরিণত হয়েছে।
৩. ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার: তিনি বিদেশি বণিকদের (ইংরেজ, ফরাসি) ব্যবসা করার সুযোগ দেন এবং শুল্ক ব্যবস্থা সংস্কার করে বাণিজ্যের প্রসার ঘটান।
৪. স্থাপত্য শিল্প ও জনকল্যাণ: তিনি ঢাকা শহরে অসংখ্য রাস্তাঘাট, সরাইখানা, মসজিদ ও ইমারত নির্মাণ করেন। ঢাকার লালবাগ কেল্লা, ছোট কাটরা, এবং তাঁর কন্যা পরী বিবির মাজার তাঁর অনবদ্য স্থাপত্যকীর্তি। তিনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ ও জনদরদি শাসক।

৪। পলাশী যুদ্ধের পটভূমি ব্যাখ্যা কর এবং নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়ের কারণ উল্লেখ কর।
[Explain the background of the battle of Plassey and point out the reasons of Nawab Shiraj-Ud-Daula’s defeat.]
উত্তর:

পলাশী যুদ্ধের পটভূমি: ১৭৫৬ সালে আলীবর্দী খানের মৃত্যুর পর তাঁর দৌহিত্র সিরাজ-উদ-দৌলা বাংলার নবাব হন। ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই তিনি নানা ষড়যন্ত্রের শিকার হন। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নবাবের বিনা অনুমতিতে কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ নির্মাণ শুরু করে, নবাবের অবাধ্য রাজবল্লভের পুত্র কৃষ্ণদাসকে বিপুল ধনসম্পদসহ আশ্রয় দেয় এবং বাণিজ্যের ছাড়পত্র বা ‘দস্তক’-এর চরম অপব্যবহার করে বাংলার অর্থনীতি ধ্বংস করতে থাকে। নবাব এসব বেআইনি কাজ বন্ধের নির্দেশ দিলে ইংরেজরা তা অমান্য করে, ফলে ১৭ ৫৭ সালের ২৩ জুন ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর প্রান্তরে ঐতিহাসিক যুদ্ধ বেধে যায়।

নবাবের পরাজয়ের কারণসমূহ:
১. মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতা: এটি পরাজয়ের প্রধান কারণ। নবাবের প্রধান সেনাপতি মীর জাফর পবিত্র কুরআন ছুঁয়ে শপথ নিলেও যুদ্ধের মাঠে তিনি ও তার বিশাল বাহিনী নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে।
২. প্রাসাদ ষড়যন্ত্র: ঘসেটি বেগম, শওকত জং, জগৎ শেঠ, উমিচাঁদ ও রাজবল্লভরা নবাবকে ক্ষমতাচ্যুত করতে রবার্ট ক্লাইভের সাথে গোপন চুক্তি করেছিল।
৩. নবাবের সিদ্ধান্তহীনতা ও অভিজ্ঞতা অভাব: সিরাজ-উদ-দৌলা ছিলেন তরুণ ও আবেগপ্রবণ। মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতা বুঝতে পেরেও তাকে বন্দি না করে বারবার ক্ষমা করা তাঁর চরম রাজনৈতিক ভুল ছিল।
৪. প্রতিকূল আবহাওয়া ও মীর মদনের মৃত্যু: যুদ্ধের একপর্যায়ে হঠাৎ বৃষ্টিতে নবাবের বাহিনীর বারুদ ভিজে যায়, কিন্তু ইংরেজরা ত্রিপল দিয়ে তাদের বারুদ রক্ষা করে। নবাবের বিশ্বস্ত সেনাপতি মীর মদন কামানের গোলায় নিহত হলে নবাব মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।

৫। বাংলায় ফরায়েজি আন্দোলন কীভাবে গণমানুষের আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল? ব্যাখ্যা কর।
[How the Faraizi movement turned into movement for mass people in Bengal? Explain.]
উত্তর:

ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে হাজি শরিয়তুল্লাহর নেতৃত্বে বাংলায় যে সংস্কারমুখী ইসলামি আন্দোলনের সূচনা হয়, তা-ই ফরায়েজি আন্দোলন নামে পরিচিত। ‘ফরজ’ (অবশ্য পালনীয়) শব্দ থেকে ফরায়েজি নামের উৎপত্তি।

গণমানুষের আন্দোলনে রূপান্তর:
প্রাথমিকভাবে এটি ছিল মুসলমানদের মধ্যে শিরক, বিদআত ও কুসংস্কার দূর করে খাঁটি ইসলামি জীবনযাপনের একটি ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন। কিন্তু পরবর্তীতে এটি একটি বিশাল কৃষক ও গণআন্দোলনে পরিণত হয়।
১. জমিদার ও নীলকরদের অত্যাচার প্রতিরোধ: হাজি শরিয়তুল্লাহর মৃত্যুর পর তাঁর সুযোগ্য পুত্র দুদু মিয়া এই আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। হিন্দু জমিদাররা মুসলমানদের ওপর দাড়ি রাখা, মসজিদ নির্মাণ ইত্যাদি খাতে অবৈধ কর (আবওয়াব) আরোপ করত এবং ব্রিটিশ নীলকররা জোরপূর্বক নীল চাষ করাত। দুদু মিয়া এর বিরুদ্ধে কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করেন।
২. জমির ওপর আল্লাহর মালিকানা ঘোষণা: দুদু মিয়া ঘোষণা করেন “লা-খারাজ” অর্থাৎ ‘জমি আল্লাহর, তাই খাজনা দেওয়ার অধিকার কেবল আল্লাহর’। তিনি জমিদারদের অবৈধ খাজনা দেওয়া বন্ধ করে দেন।
৩. লাঠিয়াল বাহিনী গঠন: অত্যাচারী জমিদার ও নীলকরদের সশস্ত্র মোকাবিলার জন্য তিনি একটি সুসংগঠিত লাঠিয়াল বাহিনী গঠন করেন।
৪. পঞ্চায়েত ব্যবস্থা: তিনি নিজেদের মধ্যে বিরোধ মেটানোর জন্য নিজস্ব বিচার ব্যবস্থা (পঞ্চায়েত) চালু করেন।
ফলে বাংলার নির্যাতিত, শোষিত কৃষক ও সাধারণ মানুষ দলে দলে ফরায়েজি আন্দোলনে যোগ দেয় এবং এটি একটি আর্থ-সামাজিক ও ব্রিটিশবিরোধী গণআন্দোলনের রূপ নেয়।

৬। ১৯০৫ সালের বাংলা বিভক্তর কারণ ও ফলাফল আলোচনা কর।
[Discuss the causes and consequences of the Partition of Bengal in 1905.]
উত্তর:

লর্ড কার্জন ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর পূর্ব বাংলা ও আসাম নিয়ে একটি এবং পশ্চিম বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা নিয়ে অপর একটি প্রদেশ গঠনের মাধ্যমে বিশাল বঙ্গপ্রদেশকে বিভক্ত করেন, যা ইতিহাসে ‘বঙ্গভঙ্গ’ নামে পরিচিত।

বঙ্গভঙ্গের কারণসমূহ:
১. প্রশাসনিক অসুবিধা: অবিভক্ত বাংলা ছিল বিশাল একটি প্রদেশ (প্রায় ১ লক্ষ ৮৯ হাজার বর্গমাইল)। একজন গভর্নরের পক্ষে এই বিশাল প্রদেশ শাসন করা অত্যন্ত কঠিন ছিল।
২. রাজনৈতিক উদ্দেশ্য: কলকাতায় ক্রমবর্ধমান ব্রিটিশবিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দুর্বল করা এবং হিন্দু-মুসলিম ঐক্যে ফাটল ধরানো (Divide and Rule Policy) ছিল ব্রিটিশদের গোপন উদ্দেশ্য।
৩. পূর্ব বাংলার উন্নয়ন: কলকাতা কেন্দ্রিক উন্নয়নের ফলে পূর্ব বাংলা অবহেলিত ছিল। ঢাকা রাজধানী হলে পূর্ব বাংলার অর্থনৈতিক ও শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন হবে—এই আশায় বঙ্গভঙ্গ করা হয়।

ফলাফল ও প্রভাব:
১. মুসলিমদের আনন্দ: বঙ্গভঙ্গের ফলে পূর্ব বাংলার মুসলিমরা চরম আনন্দিত হয়। ঢাকায় হাইকোর্ট, নতুন নতুন স্কুল-কলেজ ও বন্দর স্থাপিত হতে থাকে।
২. হিন্দুদের বিরোধিতা ও স্বদেশি আন্দোলন: হিন্দু সমাজ বঙ্গভঙ্গকে ‘মাতৃভূমির অঙ্গচ্ছেদ’ বলে মনে করে। কংগ্রেস এর তীব্র বিরোধিতা করে এবং ব্রিটিশ পণ্য বর্জনের মাধ্যমে ‘স্বদেশি ও বয়কট’ আন্দোলন শুরু করে।
৩. সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভব: বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে রাজনৈতিক ও মানসিক দূরত্ব সৃষ্টি হয়। অবশেষে হিন্দুদের প্রবল আন্দোলনের মুখে ব্রিটিশ সরকার ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য হয়।

৭। নওয়াব আব্দুল লতিফের পরিচয় দাও। মুসলিমদের শিক্ষা বিস্তারে তার ভূমিকা মূল্যায়ন কর।
[Introduce Nawab Abdul Latif. Evaluate his role to spread out the education among the Muslims.]
উত্তর:

পরিচয়: নওয়াব আব্দুল লতিফ (১৮২৮-১৮৯৩) ছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার মুসলিম নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ। উত্তর ভারতের স্যার সৈয়দ আহমদ খান যে ভূমিকা পালন করেছিলেন, বাংলায় আব্দুল লতিফ অবিকল সেই দায়িত্ব পালন করেন। তিনি পেশায় ছিলেন একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, তবে তাঁর জীবনের মূল ব্রত ছিল পিছিয়ে পড়া মুসলিম সমাজের আধুনিকীকরণ।

মুসলিমদের শিক্ষা বিস্তারে তাঁর ভূমিকা:
১. মহামেডান লিটারারি সোসাইটি স্থাপন (১৮৬৩): তিনি কলকাতায় এই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষা ও আধুনিক বিজ্ঞান সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা এবং ব্রিটিশদের সাথে মুসলমানদের ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটানো।
২. ইংরেজি শিক্ষার প্রসার: তিনি বুঝতে পেরেছিলেন ইংরেজি শিক্ষা ছাড়া মুসলমানদের উন্নতি অসম্ভব। তাই তিনি ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি ইংরেজি শিক্ষার ওপর জোর দেন এবং মুসলিমদের আধুনিক স্কুল-কলেজে যেতে উদ্বুদ্ধ করেন।
৩. মোহসীন ফান্ডের সঠিক ব্যবহার: দানবীর হাজি মুহম্মদ মোহসীনের বিশাল তহবিল হিন্দু ও মুসলিম উভয়ের জন্য ব্যবহৃত হতো। আব্দুল লতিফ সরকারের কাছে সফলভাবে যুক্তি উপস্থাপন করেন যে, এই তহবিল কেবল মুসলিম শিক্ষার্থীদের শিক্ষার জন্যই ব্যবহার হওয়া উচিত। এই ফান্ডের টাকায় পরে অনেক মাদ্রাসা ও ছাত্রাবাস গড়ে ওঠে।
৪. কলকাতা মাদ্রাসা সংস্কার: তিনি কলকাতা মাদ্রাসায় ইংরেজি ও ফারসি বিভাগ চালু করতে সরকারকে প্রভাবিত করেন এবং রাজশাহী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টায় বাংলার মুসলিম সমাজে আধুনিক শিক্ষার আলো প্রবেশ করে।

৮। লাহোর প্রস্তাবের পটভূমি আলোচনা কর। তুমি কি মনে কর যে, লাহোর প্রস্তাবের মধ্যেই স্বাধীন বাংলাদেশের বীজ নিহিত ছিল?
[Discuss the background of the Lahore resolution. Do you think that the Lahore resolution contained the seeds of independent Bangladesh?]
উত্তর:

লাহোর প্রস্তাবের পটভূমি: ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে কংগ্রেস নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে হিন্দুত্ববাদী শাসন শুরু করলে মুসলিমরা চরম বৈষম্যের শিকার হয়। মুসলিম লীগ বুঝতে পারে যে, অখণ্ড ভারতে মুসলমানদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অধিকার সুরক্ষিত নয়। এই প্রেক্ষাপটে হিন্দু-মুসলিম সমস্যার চিরস্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে ১৯৪০ সালের ২৩শে মার্চ লাহোরে মুসলিম লীগের অধিবেশনে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক এক ঐতিহাসিক প্রস্তাব পেশ করেন, যা ‘লাহোর প্রস্তাব’ বা ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ নামে পরিচিত।

লাহোর প্রস্তাব ও স্বাধীন বাংলাদেশের বীজ:
হ্যাঁ, ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে লাহোর প্রস্তাবের মধ্যেই স্বাধীন বাংলাদেশের বীজ নিহিত ছিল। এর কারণগুলো হলো:
১. ‘States’ বা ‘রাষ্ট্রসমূহ’ শব্দটির ব্যবহার: লাহোর প্রস্তাবের মূল বয়ানে বলা হয়েছিল—ভারতের উত্তর-পশ্চিম এবং পূর্ব ভাগে (বাংলা ও আসাম) যে সকল অঞ্চলে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেগুলোকে নিয়ে ‘স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ’ (Independent States) গঠন করতে হবে। এখানে বহুবচন ‘States’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছিল, যার অর্থ পূর্ব বাংলায় একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের কথা বলা হয়েছিল।
২. স্বায়ত্তশাসন: প্রস্তাবে এই রাষ্ট্রগুলোর পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ও সার্বভৌমত্বের কথা বলা হয়েছিল।
যদিও ১৯৪৬ সালে জিন্নাহ সুকৌশলে দিল্লি কনভেনশনে ‘States’ শব্দটির ‘s’ বাদ দিয়ে একটিমাত্র অখণ্ড রাষ্ট্র (পাকিস্তান) গঠনের প্রস্তাব পাস করেন, কিন্তু পূর্ব বাংলার নেতারা (যেমন আবুল হাশিম) এর তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন। পরবর্তীতে এই লাহোর প্রস্তাবের ‘স্বায়ত্তশাসন’ ও ‘আলাদা রাষ্ট্র’-এর চেতনাকে ধারণ করেই ৬ দফা দাবি প্রণীত হয় এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্ম হয়।

খ বিভাগ
(যে কোনো দুটি প্রশ্নের উত্তর দাও)
মান— ১০×২ = ২০
৯। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের কারণ ও ফলাফল বর্ণনা কর।
[Discuss the causes and consequences of the sepoy mutiny in 1857.]
উত্তর:

১৮৫৭ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শোষণের বিরুদ্ধে ভারতীয় সেনাসদস্যদের (সিপাহী) নেতৃত্বে যে সশস্ত্র অভ্যুত্থান ঘটে, তা ইতিহাসে সিপাহী বিদ্রোহ বা ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম নামে পরিচিত।

কারণসমূহ:
১. রাজনৈতিক কারণ: লর্ড ডালহৌসির ‘স্বত্ববিলোপ নীতি’ (Doctrine of Lapse) প্রয়োগ করে ঝাঁসি, সিতারা, নাগপুর প্রভৃতি রাজ্য দখল এবং অযোধ্যার নবাবকে ক্ষমতাচ্যুত করা।
২. অর্থনৈতিক কারণ: ব্রিটিশদের অতিরিক্ত কর আরোপ এবং ভারতীয় তাঁত ও কুটির শিল্প ধ্বংস করার ফলে তীব্র বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের সৃষ্টি।
৩. ধর্মীয় ও সামাজিক কারণ: সতীদাহ প্রথা বাতিল, বিধবা বিবাহ চালু এবং জোরপূর্বক খ্রিষ্টান ধর্মে দীক্ষিত করার প্রচেষ্টা ভারতীয়দের মনে ভয়ের সঞ্চার করে।
৪. প্রত্যক্ষ কারণ: সেনাবাহিনীতে ‘এনফিল্ড রাইফেল’-এর প্রচলন করা হয়। গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, এই রাইফেলের কার্তুজের খোলস গরু ও শুকরের চর্বি দিয়ে তৈরি, যা দাঁত দিয়ে কাটতে হতো। এটি হিন্দু ও মুসলিম উভয় সিপাহীর ধর্মীয় অনুভূতিতে চরম আঘাত হানে, যার ফলে মঙ্গল পান্ডের নেতৃত্বে বিদ্রোহের দাবানল জ্বলে ওঠে।

ফলাফল:
বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও এর ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। ১৮৫৮ সালে মহারানির ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে এবং ভারতের শাসনভার সরাসরি ব্রিটিশ রাজমুকুটের (Crown) অধীনে চলে যায়। মুঘল সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতন ঘটে এবং ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে ভারতীয়দের সংখ্যা কমিয়ে ইউরোপীয় সৈন্যের সংখ্যা বাড়ানো হয়।

১০। অন্ধকূপ হত্যা সম্পর্কে কী জান লেখ।
[Write what do you know about the dungeon killing.]
উত্তর:

‘অন্ধকূপ হত্যা’ (Black Hole Tragedy) হলো ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাসের একটি চরম বিতর্কিত ও অতিরঞ্জিত ঘটনা।

ঘটনার বিবরণ: ইংরেজ কর্মকর্তা হলওয়েলের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৭৫৬ সালের ২০ জুন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা কলকাতা দখল করার পর ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের একটি ছোট, অন্ধকার ও দমবন্ধ করা প্রকোষ্ঠে (যার আয়তন ছিল মাত্র ১৮ ফুট × ১৪ ফুট ১০ ইঞ্চি) ১৪৬ জন ইংরেজ বন্দিকে সারারাত আটকে রাখেন। প্রচণ্ড গরম ও শ্বাসকষ্টে পরের দিন সকালে নাকি ১২৩ জন বন্দি মারা যায়।

ঐতিহাসিক সত্যতা: অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, গোলাম হোসেন সলিমসহ আধুনিক ও নিরপেক্ষ ঐতিহাসিকগণ প্রমাণ করেছেন যে, এটি ছিল সম্পূর্ণরূপে একটি বানোয়াট ও কাল্পনিক গল্প। এত ছোট একটি ঘরে ১৪৬ জন পূর্ণবয়স্ক মানুষকে জোর করে ঢোকানো গাণিতিক ও শারীরবৃত্তীয়ভাবে অসম্ভব। মূলত নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে একজন নিষ্ঠুর ও স্বৈরাচারী শাসক হিসেবে প্রমাণ করতে এবং ব্রিটিশদের বাংলা আক্রমণের যৌক্তিকতা দাঁড় করাতেই হলওয়েল এই মিথ্যা কল্পকাহিনি তৈরি করেছিল।
১১। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত সম্পর্কে ধারণা দাও।
[Give an idea about the permanent settlement.]
উত্তর:

১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস ভূমি রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে জমিদারদের সাথে যে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী চুক্তি সম্পাদন করেন, ইতিহাসে তা ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ (Permanent Settlement) নামে পরিচিত।

মূল বৈশিষ্ট্য ও ধারণা:
১. মালিকানা স্বত্ব: এর মাধ্যমে জমিদারদের জমির চিরস্থায়ী ও শর্তহীন মালিকানা প্রদান করা হয়। জমি কেনাবেচা, হস্তান্তর এবং উত্তরাধিকার সূত্রে হস্তান্তরের অধিকার জমিদাররা লাভ করেন।
২. নির্দিষ্ট রাজস্ব: জমিদাররা ব্রিটিশ সরকারকে বাৎসরিক কত টাকা রাজস্ব দেবে তা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়, যা ভবিষ্যতে আর পরিবর্তন করা হবে না।
৩. সূর্যাস্ত আইন (Sunset Law): এই বন্দোবস্তের একটি কঠোর শর্ত ছিল। বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনের সূর্যাস্তের পূর্বে জমিদারকে কোষাগারে রাজস্ব জমা দিতে হতো। ব্যর্থ হলে তার জমিদারি বাজেয়াপ্ত করে নিলামে তোলা হতো।

প্রভাব: এর ফলে ব্রিটিশদের প্রতি অনুগত একটি শক্তিশালী জমিদার শ্রেণি তৈরি হয় এবং সরকারের রাজস্ব আয় সুনির্দিষ্ট হয়। কিন্তু জমির ওপর কৃষকদের চিরাচরিত অধিকার সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়। কৃষকরা জমিদারদের দয়া-দাক্ষিণ্যের ওপর নির্ভরশীল প্রজা বা দাসে পরিণত হয় এবং তাদের ওপর সীমাহীন শোষণের পথ প্রশস্ত হয়।

১২। মুঘল আমলে বাংলার অর্থনৈতিক অবস্থার বিবরণ দাও।
[Describe the economic condition of Bengal during the Mughal period.]
উত্তর:

মুঘল আমলে (বিশেষ করে সুবাদার শায়েস্তা খান ও মুর্শিদকুলী খানের আমলে) বাংলার অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী ছিল। সম্রাট আওরঙ্গজেব বাংলাকে ‘জাতিসমূহের জান্নাত’ (Paradise of Nations) বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।

অর্থনৈতিক অবস্থার বিবরণ:
১. কৃষিজ সমৃদ্ধি: বাংলার মাটি ছিল অত্যন্ত উর্বর। ধান, পাট, তুলা, ইক্ষু ও রেশম প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত হতো। চালের উৎপাদন এতই বেশি ছিল যে, তা বিদেশে রপ্তানি করা হতো। জিনিসপত্রের দাম ছিল অবিশ্বাস্য রকম সস্তা।
২. শিল্প ও কারুকার্য: সে সময় বাংলার বস্ত্রশিল্প ছিল বিশ্ববিখ্যাত। বিশেষ করে ঢাকার ‘মসলিন’ কাপড় ইউরোপের রাজদরবারগুলোতে মহামূল্যবান বস্তুর মতো কদর পেত। এছাড়া রেশম ও সুতি কাপড় উৎপাদন এবং নৌকা ও জাহাজ নির্মাণ শিল্পে বাংলা চরম উন্নতি লাভ করেছিল।
৩. বৈদেশিক বাণিজ্য: চট্টগ্রাম, সপ্তগ্রাম ও সোনারগাঁও ছিল বিখ্যাত আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দর। আরব, পর্তুগিজ, ওলন্দাজ এবং ইংরেজ বণিকরা বাংলা থেকে চিনি, চাল, মসলিন, রেশম এবং সোরা (Saltpeter) কিনে ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করত। এর বিনিময়ে বাংলায় প্রচুর স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা আসত।
তবে, সামগ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা অত্যন্ত ধনী হলেও, কৃষকদের ওপর জমিদার ও মনসবদারদের অতিরিক্ত করের বোঝাও ছিল, যার ফলে সাধারণ কৃষকের জীবনমান সবসময় এই বিশাল প্রাচুর্যের সমানুপাতিক ছিল না।

Follow Our Facebook Page
দ্রুত নতুন বই পেতে যুক্ত থাকুন
Follow Now