পরীক্ষা কোড: ২ ০ ৩ প্রশ্নপত্র কোড: ১ ১ ৫
ফাজিল স্নাতক (অনার্স) তৃতীয় বর্ষ পরীক্ষা, ২০২৪
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
(মুসলিম স্থাপত্যের বিকাশ ও প্রত্নতত্ত্ব)
বিষয় কোড: ২ ০ ৫ ৩ ০ ৬
সময়— ৪ ঘণ্টা
পূর্ণমান— ৮০
(যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও)
মান— ১৫×৪ = ৬০
মুসলিম স্থাপত্যের সংজ্ঞা: ইসলামি জীবনাদর্শ, বিশ্বাস এবং সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে যে বিশেষ নির্মাণশৈলী ও শিল্পরীতির বিকাশ ঘটেছে, তাকে মুসলিম বা ইসলামি স্থাপত্য বলে। এই স্থাপত্যের মূল ভিত্তি হলো তাওহিদ বা একত্ববাদ। এখানে প্রাণী বা মানুষের মূর্তির পরিবর্তে জ্যামিতিক নকশা, আরবস্ক (লতাপাতার কারুকাজ) এবং ক্যালিগ্রাফি বা আরবি লিপি ব্যবহার করা হয়। এর প্রধান কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য হলো খিলান (Arches), গম্বুজ (Domes), মিনার (Minarets) এবং প্রশস্ত প্রাঙ্গণ।
প্রথম আল-আকসা মসজিদের গুরুত্ব:
জেরুজালেমে অবস্থিত আল-আকসা মসজিদ ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
১. প্রথম কিবলা: মক্কায় কিবলা পরিবর্তনের পূর্বে মহানবী (সা.) এবং সাহাবিগণ প্রায় ১৬ বা ১৭ মাস এই আল-আকসা মসজিদের দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করতেন।
২. মেরাজের স্মৃতিবিজড়িত: পবিত্র লাইলাতুল মেরাজের রাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে ‘বুরাক’ যোগে প্রথম এই আল-আকসা মসজিদে আসেন এবং সকল নবি-রাসুলদের জামাতে ইমামতি করেন। এখান থেকেই তাঁর ঊর্ধ্বাকাশে যাত্রা শুরু হয়।
৩. তৃতীয় পবিত্র স্থান: মক্কার মসজিদুল হারাম এবং মদিনার মসজিদে নববির পর ইসলামে তৃতীয় পবিত্রতম স্থান হলো এই আল-আকসা মসজিদ।
ভারতীয় উপমহাদেশে প্রত্নতত্ত্বের বিকাশ একদিনে হয়নি, এটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে কয়েকজন উৎসাহী পণ্ডিতের হাত ধরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।
১. প্রাথমিক পর্যায় (এশিয়াটিক সোসাইটি): ১৭৮৪ সালে স্যার উইলিয়াম জোন্স কলকাতায় ‘এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বেঙ্গল’ প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল প্রাচীন ভারতের ইতিহাস, শিলালিপি ও মুদ্রা নিয়ে গবেষণার প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ।
২. আলেকজান্ডার কানিংহামের অবদান: ১৮৬১ সালে ব্রিটিশ সরকার ‘আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া’ (ASI) প্রতিষ্ঠা করে এবং স্যার আলেকজান্ডার কানিংহামকে এর প্রথম মহাপরিচালক নিযুক্ত করা হয়। তাঁকে ‘ভারতীয় প্রত্নতত্ত্বের জনক’ বলা হয়। তিনি বৌদ্ধ তীর্থস্থানগুলো ব্যাপকভাবে জরিপ করেন।
৩. লর্ড কার্জনের যুগান্তকারী পদক্ষেপ: ১৯০৪ সালে ভাইসরয় লর্ড কার্জন ‘প্রাচীন স্মৃতিস্তম্ভ সংরক্ষণ আইন’ পাস করেন, যা ঐতিহাসিক ইমারতগুলোকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে।
৪. জন মার্শালের যুগ ও সিন্ধু সভ্যতা: স্যার জন মার্শাল এএসআই-এর মহাপরিচালক থাকাকালে ১৯২০-এর দশকে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দয়ারাম সাহানির নেতৃত্বে হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো আবিষ্কৃত হয়। এর ফলে ভারতের ইতিহাস আরও কয়েক হাজার বছর পিছিয়ে যায় এবং বিশ্বদরবারে ভারতীয় প্রত্নতত্ত্বের ব্যাপক মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।
৫. মর্টিমার হুইলারের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি: ১৯৪৪ সালে স্যার মর্টিমার হুইলার এএসআই-এর দায়িত্ব নেন এবং খননকাজে স্তরতাত্ত্বিক (Stratigraphy) বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রচলন করেন, যা প্রত্নতত্ত্বকে একটি আধুনিক বিজ্ঞানে পরিণত করে।
পবিত্র কাবা শরিফের স্থাপত্য ইতিহাস হাজার বছরের বিবর্তনের সাক্ষী:
১. আদি নির্মাণ: ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, সর্বপ্রথম ফেরেশতারা অথবা হজরত আদম (আ.) কাবার ভিত্তি স্থাপন করেন। নূহ (আ.)-এর মহাপ্লাবনে এটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।
২. ইব্রাহিম (আ.) এর পুনর্নির্মাণ: পরবর্তীতে আল্লাহর নির্দেশে হজরত ইব্রাহিম (আ.) এবং তাঁর পুত্র ইসমাইল (আ.) কাবার ভিত্তি পুনরায় উত্তোলন করেন এবং এটিকে একটি চতুষ্কোণ ইমারত হিসেবে গড়ে তোলেন।
৩. কুরাইশদের নির্মাণ: মহানবী (সা.)-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির পাঁচ বছর পূর্বে কুরাইশরা কাবার পুনর্নির্মাণ করে। তখন কাঠ ও তহবিলের অভাবে কাবার একটি অংশ (হাতিম) মূল কাঠামোর বাইরে রেখে দেওয়া হয় এবং ছাদ তৈরি করা হয়। এ সময়ই হাজরে আসওয়াদ স্থাপনের বিখ্যাত ঘটনা ঘটে।
৪. আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.)-এর সংস্কার: ৬৪ হিজরিতে তিনি কাবা শরিফকে ইব্রাহিম (আ.)-এর মূল নকশা অনুযায়ী ‘হাতিম’ অংশটি কাবার ভেতরে অন্তর্ভুক্ত করে পুনর্নির্মাণ করেন এবং কাবার দুটি দরজা (প্রবেশ ও প্রস্থানের জন্য) তৈরি করেন।
৫. হাজ্জাজ বিন ইউসুফের পরিবর্তন: ৭৪ হিজরিতে উমাইয়া সেনাপতি হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ইবনে জুবায়েরের পরিবর্তন বাতিল করে কাবাকে পুনরায় কুরাইশদের নির্মিত মডেলে ফিরিয়ে আনেন, যা আজও বিদ্যমান।
৬. উসমানীয় ও আধুনিক যুগ: ১৬২৬ সালে প্রবল বন্যায় কাবার দেয়াল ধসে পড়লে উসমানীয় সুলতান চতুর্থ মুরাদ এটি পুনর্নির্মাণ করেন। আধুনিক যুগে সৌদি সরকার কাবার চারপাশের মাতাফ (তাওয়াফের স্থান) এবং ছাদের ব্যাপক সম্প্রসারণ করেছে।
উমাইয়া এবং আব্বাসীয় আমল ছিল ইসলামি স্থাপত্য বিকাশের দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের যুগ।
উমাইয়া স্থাপত্য (সিরিয়া ও স্পেন কেন্দ্রিক):
১. প্রভাব: উমাইয়া স্থাপত্যে হেলেনিস্টিক (গ্রিক) ও বাইজেন্টাইন রীতির ব্যাপক প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।
২. উপাদান: তারা নির্মাণ সামগ্রী হিসেবে প্রধানত কাটা পাথর (Stone) এবং মার্বেল ব্যবহার করত।
৩. খিলান: তারা অর্ধ-বৃত্তাকার এবং অশ্বখুরাকৃতি (Horseshoe) খিলানের প্রচলন করে।
৪. অলংকরণ: দেয়াল ও গম্বুজ সাজানোর জন্য তারা বাইজেন্টাইন ঘরানার চমৎকার মোজাইক শিল্প ব্যবহার করত (যেমন: দামেস্ক জামে মসজিদ)।
আব্বাসীয় স্থাপত্য (ইরাক ও পারস্য কেন্দ্রিক):
১. প্রভাব: তাদের স্থাপত্যে পারস্য বা সাসানীয় রীতির প্রভাব প্রবল ছিল।
২. উপাদান: পাথরের অভাব থাকায় তারা রোদে পোড়ানো ইট (Brick) এবং পলেস্তারা বা স্টাকো (Stucco) বেশি ব্যবহার করত।
৩. খিলান ও মিনার: তারা সূক্ষ্মাগ্র খিলান (Pointed arch) ব্যবহার শুরু করে। তাদের সবচেয়ে অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল প্যাঁচানো বা সর্পিল মিনার, যার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ সামাররার বিশাল মালউইয়া মিনার।
৪. অলংকরণ: মোজাইকের পরিবর্তে তারা ইটের গাঁথুনি এবং স্টাকোর (চুন-সুরকির প্রলেপ) ওপর জ্যামিতিক ও লতাপাতার নকশা খোদাই করে অসাধারণ অলংকরণ করত।
উমাইয়া খলিফা প্রথম আল-ওয়ালিদ কর্তৃক ৭০৫-৭১৫ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত ‘দামেস্ক জামে মসজিদ’কে ইসলামি স্থাপত্যের ইতিহাসে “প্রথম পূর্ণাঙ্গ মসজিদ” বলা হয়। এর কারণ হলো, এই মসজিদটিতেই প্রথমবারের মতো একটি আদর্শ মসজিদের সকল অত্যাবশ্যকীয় উপাদান সুসংগঠিতভাবে যুক্ত করা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে মসজিদের নকশার মানদণ্ড বা স্ট্যান্ডার্ড হয়ে দাঁড়ায়।
পূর্ণাঙ্গ রূপের কারণসমূহ:
১. মিনারের সংযোজন: আজান দেওয়ার জন্য এই মসজিদেই প্রথমবারের মতো সুউচ্চ ও কাঠামোগত মিনার নির্মিত হয়।
২. মিহরাব: কিবলা নির্দেশ করার জন্য কিবলা দেয়ালে প্রথমবারের মতো অবতল কুলুঙ্গি বা ‘মিহরাব’ (Concave Niche) যুক্ত করা হয়।
৩. মাকসুরা: খলিফা বা শাসকের নিরাপত্তার জন্য মসজিদের ভেতরে একটি সংরক্ষিত ঘেরাও বা ‘মাকসুরা’ তৈরি করা হয়।
৪. গম্বুজ ও প্রশস্ত সাহান: মিহরাবের ঠিক সামনে একটি বিশাল কেন্দ্রীয় গম্বুজ (Dome of the Eagle) এবং বাইরে একটি প্রশস্ত উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ বা ‘সাহান’ রাখা হয়, যা রিওয়াক (ছাদযুক্ত বারান্দা) দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল। এই সকল উপাদান একত্রে প্রথম ব্যবহৃত হওয়ায় একে প্রথম পূর্ণাঙ্গ মসজিদ বলা হয়।
মিসরে শিয়া ফাতেমীয় বংশের সেনাপতি জাওহার আল-সিকিলি ৯৭০-৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে কায়রো নগরী প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে ‘জামে আল-আজহার’ নির্মাণ করেন। এটি ফাতেমীয় স্থাপত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন এবং পরবর্তীতে এটি বিখ্যাত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়।
স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য:
১. কিল খিলান (Keel Arches): এই মসজিদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ‘কিল খিলান’ বা নৌকার তলার মতো বাঁকানো খিলান, যা ফাতেমীয় স্থাপত্যের ট্রেডমার্ক। খিলানগুলো প্রাচীন রোমান স্তম্ভের ওপর স্থাপিত।
২. স্টাকো অলংকরণ: দেয়াল ও খিলানের উপরিভাগে চুন-সুরকির (Stucco) ওপর অত্যন্ত নিখুঁত ও দৃষ্টিনন্দন জ্যামিতিক এবং লতাপাতার (আরবস্ক) খোদাই করা নকশা রয়েছে।
৩. কুফিক ক্যালিগ্রাফি: মসজিদের অভ্যন্তরে এবং মিহরাবের চারপাশে ফ্লোরিয়েটেড কুফিক (লতাপাতাযুক্ত কুফিক লিপি) হরফে কুরআনের আয়াত উৎকীর্ণ রয়েছে।
৪. কেন্দ্রীয় সাহান: অন্যান্য ধ্রুপদী মসজিদের মতো এর কেন্দ্রে একটি আয়তাকার উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ (সাহান) রয়েছে, যার চারপাশে স্তম্ভযুক্ত আর্কেড বা বারান্দা আছে।
৫. একাধিক মিনার: যদিও মূল ফাতেমীয় নকশায় মিনার ছিল না, তবে পরবর্তীতে মামলুক ও উসমানীয় আমলে এতে বেশ কয়েকটি অত্যন্ত সুসজ্জিত মিনার যুক্ত করা হয়, যা একে আরও মনোমুগ্ধকর রূপ দিয়েছে।
৮৭৬-৮৭৯ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত কায়রোর ‘আহমদ ইবনে তুলুন মসজিদ’ হলো মিসরের প্রাচীনতম মসজিদ যা এখনো তার আদি রূপে টিকে আছে। এটি আব্বাসীয় সামাররা রীতির এক অনবদ্য প্রতিলিপি।
স্থাপত্যিক স্বরূপ:
১. সর্পিল মিনার: এই মসজিদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর পেঁচানো বা সর্পিল মিনার, যার সিঁড়িগুলো বাইরের দিক দিয়ে পেঁচিয়ে ওপরে উঠেছে। এটি ইরাকের সামাররার মালউইয়া মিনারের অনুকরণে নির্মিত।
২. জিয়াদা (Ziyada): মসজিদের চারপাশ ঘিরে একটি অতিরিক্ত খালি প্রাচীরবেষ্টিত প্রাঙ্গণ রয়েছে যাকে ‘জিয়াদা’ বলা হয়। এটি মূল মসজিদকে বাইরের বাজারের কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন করে পবিত্রতা ও প্রশান্তি বজায় রাখে।
৩. পিয়ারের ব্যবহার: এই মসজিদে প্রচলিত গোলাকার স্তম্ভের পরিবর্তে ছাদ ধরে রাখার জন্য বিশাল ও মজবুত আয়তাকার ইটের স্তম্ভ বা ‘পিয়ার’ (Piers) ব্যবহার করা হয়েছে।
আলংকারিক স্বরূপ:
১. ইট ও স্টাকোর কাজ: এটি সম্পূর্ণ পোড়া ইট দিয়ে তৈরি। ইটের ওপর পুরু স্টাকোর (Stucco) প্রলেপ দিয়ে চমৎকার খোদাই করা হয়েছে।
২. সামাররা স্টাইল: খিলানের ধার ঘেঁষে এবং জানালার গ্রিলে সামাররা ঘরানার জ্যামিতিক ও উদ্ভিজ্জ নকশা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
স্পেনের আন্দালুসিয়ায় উমাইয়া শাসক প্রথম আবদুর রহমান ৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দে ‘কর্ডোভা জামে মসজিদ’-এর নির্মাণ শুরু করেন। এটি স্পেনে মুসলিম স্থাপত্যের চরম উৎকর্ষের প্রতীক।
স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য:
১. স্তম্ভের অরণ্য (Forest of Columns): মসজিদের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে মনে হয় যেন স্তম্ভের এক বিশাল অরণ্য। এতে প্রায় ৮৫৬টি গ্রানাইট, জেসপার ও মার্বেলের স্তম্ভ রয়েছে। মজার বিষয় হলো, এই স্তম্ভগুলো প্রাচীন রোমান ও ভিসিগোথিক ইমারত থেকে সংগ্রহ করা (যাকে Spolia বলা হয়)।
২. দ্বি-স্তরবিশিষ্ট খিলান: ছাদকে আরও উঁচু করার জন্য স্থপতিরা একটি অভাবনীয় কৌশল প্রয়োগ করেন। তারা প্রতিটি স্তম্ভের ওপর দুটি স্তরে খিলান নির্মাণ করেন—নিচেরটি অশ্বখুরাকৃতি (Horseshoe) এবং ওপরেরটি অর্ধ-বৃত্তাকার।
৩. লাল-সাদা ভুসয়ার: খিলানগুলো লাল ইট এবং সাদা পাথরের খণ্ড (Voussoirs) পর্যায়ক্রমে সাজিয়ে তৈরি করা হয়েছে, যা এর সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
৪. মোজাইক সমৃদ্ধ মিহরাব: এর মিহরাবটি সাধারণ অবতল কুলুঙ্গির চেয়ে ভিন্ন। এটি একটি ছোট কক্ষের মতো, যার প্রবেশদ্বার এবং ওপরের গম্বুজ বাইজেন্টাইন শিল্পীদের তৈরি খাঁটি সোনার মোজাইক দিয়ে অসাধারণভাবে অলংকৃত।
(যে কোনো দুইটি প্রশ্নের উত্তর দাও)
মান— ১০×২ = ২০
দিল্লিতে কুতুব মিনার চত্বরে অবস্থিত ‘কুওয়াত-উল-ইসলাম’ (ইসলামের শক্তি) মসজিদটি হলো ভারতে নির্মিত প্রথম মসজিদ। সুলতান কুতুবউদ্দীন আইবেক ১১৯৩ সালে এটি নির্মাণ করেন।
বৈশিষ্ট্যসমূহ:
১. স্পোলিয়ার ব্যবহার (Spolia): দ্রুত মসজিদ নির্মাণের জন্য ২৭টি ধ্বংসপ্রাপ্ত হিন্দু ও জৈন মন্দিরের উপাদান (স্তম্ভ, পাথর) ব্যবহার করে এটি তৈরি করা হয়। তাই এর স্তম্ভগুলোতে ভারতীয় স্থাপত্যের কারুকাজ লক্ষ্য করা যায়, তবে মূর্তিগুলোর মুখমণ্ডল নষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল।
২. কোরবেল্ড খিলান (Corbelled Arches): তৎকালীন স্থানীয় ভারতীয় কারিগররা ইসলামি ট্রু আর্চ (True Arch) বা আসল খিলান তৈরি করতে জানত না। তাই তারা পাথরকে একে অপরের ওপর সামান্য বের করে দিয়ে ধাপে ধাপে ‘কোরবেল্ড’ পদ্ধতিতে খিলান নির্মাণ করেছিল।
৩. পাথরের পর্দা বা মাকসুরা: মসজিদের প্রার্থনা কক্ষের সামনে একটি বিশাল পাথরের দেয়াল (Screen) তৈরি করা হয়, যাতে চমৎকার আরবি ক্যালিগ্রাফির সাথে ভারতীয় লতাপাতার মোটিফ মিশিয়ে অনন্য এক ‘ইন্দো-ইসলামিক’ অলংকরণ তৈরি করা হয়েছে।
৪. লৌহ স্তম্ভ: মসজিদের সাহানে একটি প্রাচীন গুপ্ত আমলের লৌহ স্তম্ভ রয়েছে, যা শত শত বছর ধরে মরিচাবিহীন অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে।
একটি আদর্শ ধ্রুপদী মসজিদের কাঠামোগত নকশায় কিছু সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য থাকে, যা মুসলিম উপাসনার সুবিধার্থে তৈরি করা হয়।
১. কিবলা দেয়াল ও মিহরাব: মসজিদের প্রধান দেয়ালটি পবিত্র মক্কার কাবার দিকে মুখ করা থাকে। এই দেয়ালে একটি অবতল কুলুঙ্গি থাকে যাকে ‘মিহরাব’ বলা হয়, যেখানে দাঁড়িয়ে ইমাম নামাজ পরিচালনা করেন।
২. মিনবার: মিহরাবের ডান পাশে ইমামের খুতবা দেওয়ার জন্য সিঁড়িযুক্ত একটি বেদি থাকে, যাকে মিনবার বলে।
৩. সাহান (Sahn): মসজিদের কেন্দ্রে একটি প্রশস্ত উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ থাকে। অতিরিক্ত মুসল্লিদের জায়গা দেওয়া এবং আলো-বাতাস চলাচলের জন্য এটি রাখা হয়।
৪. ওজুর ব্যবস্থা (হাওজ): সাহানের মাঝখানে বা মসজিদের প্রবেশপথে পবিত্রতা অর্জনের জন্য পানির ফোয়ারা বা ওজুখানা থাকে।
৫. মিনার: আজান দিয়ে মুসল্লিদের ডাকার জন্য মসজিদের সাথে এক বা একাধিক সুউচ্চ মিনার যুক্ত থাকে।
৬. রিওয়াক (Riwaq): সাহানের চারপাশে রোদ ও বৃষ্টি থেকে রক্ষার জন্য ছাদযুক্ত বারান্দা বা আর্কেড থাকে।
৭. গম্বুজ: মিহরাবের ঠিক ওপরে এবং অনেক সময় পুরো ছাদজুড়ে গম্বুজ থাকে, যা শব্দের প্রতিধ্বনি ও সৌন্দর্য বাড়ায়।
‘কুসায়রে আমরা’ (Qusayr Amra) হলো জর্ডানের মরুভূমিতে অবস্থিত একটি বিখ্যাত উমাইয়া রাজপ্রাসাদ বা ডেজার্ট ক্যাসেল (Desert Castle)। এটি অষ্টম শতাব্দীর শুরুতে উমাইয়া খলিফা দ্বিতীয় আল-ওয়ালিদ কর্তৃক নির্মিত বলে ধারণা করা হয়।
এটি মূলত কোনো মসজিদ বা দুর্গ নয়, বরং এটি ছিল রাজপরিবারের বিনোদন, অবকাশ যাপন এবং শিকারের জন্য তৈরি একটি কমপ্লেক্স। এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর দেয়ালচিত্র বা ফ্রেসকো (Frescoes)। ইসলামি শিল্পকলায় প্রাণী বা মানুষের ছবি আঁকা নিষিদ্ধ হলেও, এই রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরে স্নানাগারে (Hammam) এবং দেয়ালে প্রচুর শিকারের দৃশ্য, স্নানরতা নারী, রাশিচক্রের চিত্র এবং বিভিন্ন পেশির ছবি আঁকা আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো “ছয় রাজার চিত্র” (Fresco of the Six Kings), যেখানে সমসাময়িক পরাজিত রাজাদের দেখানো হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, প্রাথমিক উমাইয়া যুগের ধর্মনিরপেক্ষ স্থাপত্যে হেলেনিস্টিক ও বাইজেন্টাইন শিল্পের গভীর প্রভাব ছিল।
‘ডোম অব দ্য রক’ (কুব্বাত আস-সাখরা) হলো জেরুজালেমের হারাম আল-শরিফে অবস্থিত ইসলামের প্রাচীনতম টিকে থাকা স্থাপত্য নিদর্শন। উমাইয়া খলিফা আবদ আল-মালিক ৬৯১ খ্রিষ্টাব্দে এটি নির্মাণ করেন। এটি কোনো মসজিদ নয়, বরং একটি ‘শ্রাইন’ বা স্মৃতিস্তম্ভ।
স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য:
১. অষ্টভুজাকৃতি নকশা: এটি সাধারণ মসজিদের মতো আয়তাকার নয়, বরং এর মূল নকশাটি অষ্টভুজাকৃতির (Octagonal)। মাঝখানে রয়েছে পবিত্র সেই পাথর (ফাউন্ডেশন স্টোন), যেখান থেকে নবীজি (সা.) মেরাজে গমন করেছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়।
২. স্বর্ণালী গম্বুজ: এর একেবারে কেন্দ্রে একটি সুউচ্চ কাঠের গম্বুজ রয়েছে, যার বাইরের অংশে খাটি সোনার প্রলেপ দেওয়া। গম্বুজটি একটি ড্রাম বা গোলাকার ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
৩. মোজাইক অলংকরণ: এর ভেতরের দেয়াল এবং গম্বুজের নিচের অংশ বাইজেন্টাইন ধাঁচের চোখ ধাঁধানো মোজাইক দিয়ে সাজানো। তবে এখানে কোনো মানুষ বা প্রাণীর ছবি নেই, বরং মুকুট, গহনা এবং উদ্ভিজ্জ লতাপাতার নকশা ব্যবহৃত হয়েছে।
৪. ক্যালিগ্রাফি: এর ভেতরে প্রথমবারের মতো স্থাপত্য অলংকরণ হিসেবে কুরআনের আয়াতের (কুফিক লিপিতে) ব্যাপক ব্যবহার করা হয়েছে।






