পরীক্ষা কোড: ২ ০ ৩ প্রশ্নপত্র কোড: ১ ১ ১
ফাজিল স্নাতক (অনার্স) তৃতীয় বর্ষ পরীক্ষা, ২০২৪
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
(অর্থনীতি ও ইসলামি অর্থনীতি)
বিষয় কোড: ২ ০ ৫ ৩ ০ ২
সময়— ৪ ঘণ্টা
পূর্ণমান— ৮০
(যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও)
মান— ১৫×৪ = ৬০
ইসলামি অর্থনীতির সংজ্ঞা: কুরআন ও সুন্নাহর মৌলিক নীতিমালার আলোকে মানুষের অর্থনৈতিক সমস্যা ও তার সমাধানের পথ যে শাস্ত্রে আলোচনা করা হয়, তাকে ইসলামি অর্থনীতি বলে। অন্য কথায়, উপার্জনে হালাল-হারামের সীমারেখা মেনে এবং সামাজিক সুবিচারের ভিত্তিতে সম্পদ উৎপাদন, বণ্টন ও ভোগের ব্যবস্থাই হলো ইসলামি অর্থনীতি।
ইসলামি অর্থনীতির বৈশিষ্ট্যসমূহ:
১. ঐশী উৎস: এর মূল ভিত্তি মানুষের তৈরি কোনো মতবাদ নয়, বরং কুরআন ও হাদিস।
২. মালিকানার ধারণা: ইসলামে সম্পদের নিরঙ্কুশ মালিকানা একমাত্র মহান আল্লাহর। মানুষ কেবল আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে সম্পদের ভোগদখল বা ট্রাস্টি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে।
৩. সুদবিহীন ব্যবস্থা: ইসলামি অর্থনীতিতে সুদ (রিবা) সম্পূর্ণ হারাম। এর পরিবর্তে লাভ-লোকসানের ভিত্তিতে ব্যবসা পরিচালিত হয়।
৪. যাকাত ও সাদাকাহ: সম্পদের সুষম বণ্টনের জন্য যাকাত ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা ধনীদের সম্পদে গরিবের অধিকার নিশ্চিত করে।
৫. হালাল-হারামের সীমারেখা: মদ, জুয়া, লটারি, শূকর পালন বা ক্ষতিকর দ্রব্যের উৎপাদন ও ব্যবসা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
৬. ভারসাম্যপূর্ণ ভোগ: ইসলাম অপচয় বা অমিতব্যয়িতাকে যেমন নিষেধ করেছে, তেমনি কৃপণতাকেও নিষিদ্ধ করেছে।
চাহিদা সূচি ও চাহিদা রেখার পার্থক্য:
১. সংজ্ঞা: অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে, বিভিন্ন দামে ক্রেতা একটি দ্রব্যের যে বিভিন্ন পরিমাণ ক্রয় করতে প্রস্তুত থাকে, তার তালিকাকে চাহিদা সূচি বলে। অন্যদিকে, এই চাহিদা সূচির জ্যামিতিক বা লৈখিক প্রকাশকে চাহিদা রেখা বলে।
২. প্রকাশের মাধ্যম: চাহিদা সূচি গাণিতিক সংখ্যা ও সারণির মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। আর চাহিদা রেখা চিত্র বা গ্রাফের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়।
কাল্পনিক চাহিদা সূচি:
| দ্রব্যের দাম (টাকায়) | চাহিদার পরিমাণ (এককে) |
|---|---|
| ১০ | ২০ |
| ৮ | ৩০ |
| ৬ | ৪০ |
| ৪ | ৫০ |
চাহিদা রেখা অঙ্কনের বর্ণনা: উপরোক্ত সূচি অনুযায়ী একটি ছক কাগজে (Graph Paper) লম্ব অক্ষে (Y-axis) দ্রব্যের দাম এবং ভূমি অক্ষে (X-axis) চাহিদার পরিমাণ নির্দেশ করতে হবে। দাম যখন ১০ টাকা, চাহিদা তখন ২০ একক, যা একটি বিন্দু (যেমন A) দ্বারা চিহ্নিত করা যায়। দাম কমে ৮, ৬ ও ৪ টাকা হলে চাহিদা বেড়ে যথাক্রমে ৩০, ৪০ ও ৫০ একক হয়, যা পর্যায়ক্রমে B, C ও D বিন্দু দ্বারা চিহ্নিত করা যায়। এই A, B, C ও D বিন্দুগুলো যোগ করলে ডানদিকে নিম্নগামী যে রেখাটি পাওয়া যায়, তা-ই হলো নির্ণেয় চাহিদা রেখা। (পরীক্ষার খাতায় এটি পেন্সিল দিয়ে এঁকে দেখাতে হবে)।
মুনাফা (Profit): ব্যবসা বা বিনিয়োগে মূলধন খাটানোর পর শ্রম, মেধা ও ঝুঁকি গ্রহণের বিনিময়ে যে অতিরিক্ত অর্থ বা আয় অর্জিত হয়, তাকে মুনাফা বলে। ইসলামে হালাল পন্থায় অর্জিত মুনাফা সম্পূর্ণ বৈধ।
সুদ (Interest/Riba): ঋণের চুক্তিতে নির্দিষ্ট সময়ের পর মূলধনের ওপর পূর্বনির্ধারিত হারে ঝুঁকিহীন যে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়, তাকে সুদ বা রিবা বলে।
সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ (কুরআন ও হাদিসের আলোকে):
১. শোষণমূলক ব্যবস্থা: সুদ ব্যবস্থায় ঋণী ব্যক্তি লোকসান করলেও তাকে সুদ দিতে হয়, যা চরম শোষণের হাতিয়ার।
২. সম্পদের কেন্দ্রীভবন: সুদের কারণে সম্পদ সমাজের গুটিকয়েক মহাজনের হাতে কুক্ষিগত হয়।
৩. আল্লাহর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা: আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, “আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন” (সূরা আল-বাকারাহ: ২৭৫)।
৪. আল্লাহ ও রাসুলের সাথে যুদ্ধ: কুরআনে বলা হয়েছে, যারা সুদ ছাড়বে না, তাদের আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে (সূরা আল-বাকারাহ: ২৭৯)।
৫. হাদিসের নিষেধাজ্ঞা: জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) সুদখোর, সুদদাতা, সুদের চুক্তি লেখক এবং সুদের সাক্ষী—সকলের ওপর অভিসম্পাত করেছেন এবং বলেছেন, পাপে তারা সবাই সমান (মুসলিম)।
আয় ও ব্যয়ের ধারণা:
ইসলামে আয়ের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো, তা অবশ্যই হালাল এবং শরিয়াহ সম্মত উপায়ে হতে হবে। প্রতারণা, সুদ, ঘুষ বা অবৈধ ব্যবসার মাধ্যমে আয় সম্পূর্ণ হারাম।
ব্যয়ের ক্ষেত্রে ইসলামের নীতি হলো মধ্যপন্থা অবলম্বন করা। অপচয় (ইশরাফ) করা যাবে না, কারণ “অপচয়কারী শয়তানের ভাই” (সূরা বনি ইসরাইল: ২৭)। আবার কৃপণতাও করা যাবে না। নিজের ও পরিবারের বৈধ প্রয়োজন মেটানোর পর উদ্বৃত্ত অর্থ জনকল্যাণে ও আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করতে উৎসাহিত করা হয়েছে।
হালাল উপার্জনের বৈধ পন্থাগুলো:
১. ব্যবসা-বাণিজ্য (তিজারাত): সততা ও বিশ্বস্ততার সাথে ব্যবসা করা ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পেশা।
২. কৃষিকাজ (জিরায়াত): জমি চাষাবাদ করে ফসল ফলানো একটি অত্যন্ত সম্মানজনক ও বৈধ উপার্জনের পথ।
৩. মুদারাবা (অংশীদারি কারবার): যেখানে এক পক্ষের মূলধন এবং অন্য পক্ষের শ্রম থাকে, অর্জিত মুনাফা পূর্বনির্ধারিত চুক্তিতে বণ্টিত হয়।
৪. মুশারাকা (যৌথ মূলধনি কারবার): একাধিক ব্যক্তি যৌথভাবে মূলধন ও শ্রম বিনিয়োগ করে ব্যবসা করা।
৫. ইজারা বা চাকরি: নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকের বিনিময়ে বৈধ কোনো কাজে শ্রম দেওয়া বা চাকরি করা।
পার্থক্য:
১. পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজারে অসংখ্য ক্রেতা ও বিক্রেতা থাকে। কিন্তু একচেটিয়া বাজারে বিক্রেতা থাকে মাত্র একজন এবং ক্রেতা অসংখ্য।
২. পূর্ণ প্রতিযোগিতায় সমজাতীয় দ্রব্য বেচাকেনা হয়। একচেটিয়া বাজারে দ্রব্যের কোনো নিকট পরিবর্তক (Substitute) থাকে না।
৩. পূর্ণ প্রতিযোগিতায় বিক্রেতা দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না (Price Taker)। কিন্তু একচেটিয়া বাজারে বিক্রেতা নিজেই দ্রব্যের দাম নির্ধারণ করে (Price Maker)।
ইসলামে পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজার পছন্দের কারণ:
ইসলাম সর্বদা ইনসাফ ও ন্যায়ের পক্ষে। একচেটিয়া বাজারে বিক্রেতা পণ্য মজুদ (ইহতিকার) করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে পারে এবং ইচ্ছামতো চড়া দাম আদায় করে ক্রেতাদের শোষণ করে। রাসুল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি পণ্য মজুদ করে সে পাপী” (মুসলিম)।
অন্যদিকে, পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজারে কেউ দাম নিয়ে কারসাজি করতে পারে না। বাজারে স্বাভাবিক নিয়মে (চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে) ন্যায্য দাম নির্ধারিত হয়। এখানে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ই শোষণের হাত থেকে রক্ষা পায়, যা ইসলামি অর্থনীতির মূলনীতির সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ইসলামি ব্যাংক: যে ব্যাংক ইসলামি শরিয়াহর আলোকে অর্থাৎ সুদবিহীন লাভ-লোকসান ভাগাভাগির ভিত্তিতে পরিচালিত হয় এবং যার প্রতিটি লেনদেন কুরআন ও সুন্নাহ নির্দেশিত হালাল পন্থায় সম্পন্ন হয়, তাকে ইসলামি ব্যাংক বলে।
ইসলামি ব্যাংকের গুরুত্ব: সমাজ থেকে সুদের মতো শোষণমূলক প্রথার উচ্ছেদ ঘটিয়ে ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক সমাজ গঠনে ইসলামি ব্যাংকের বিকল্প নেই। এটি উদ্যোক্তাদের মাঝে ঝুঁকি বন্টন করে, হারাম খাতে অর্থায়ন রোধ করে এবং হালাল পন্থায় জনগণের সঞ্চয়কে লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করে।
বিনিয়োগ পদ্ধতি:
১. মুরাবাহা: গ্রাহকের চাহিদামতো ব্যাংক নগদ মূল্যে পণ্য কিনে নির্দিষ্ট লাভে বাকিতে গ্রাহকের কাছে বিক্রি করে।
২. মুদারাবা: ব্যাংক মূলধন সরবরাহ করে এবং গ্রাহক তার মেধা ও শ্রম দেয়। মুনাফা চুক্তি অনুযায়ী বণ্টিত হয়।
৩. মুশারাকা: ব্যাংক ও গ্রাহক উভয়েই মূলধন বিনিয়োগ করে। লাভ চুক্তিতে এবং লোকসান মূলধনের অনুপাতে বণ্টিত হয়।
৪. ইজারা (Leasing): ব্যাংক কোনো সম্পদ বা যন্ত্রপাতি কিনে নির্দিষ্ট ভাড়ার বিনিময়ে গ্রাহককে ব্যবহার করতে দেয়।
যাকাত বণ্টনের খাতসমূহ: পবিত্র কুরআনের সূরা আত-তাওবাহ এর ৬০ নম্বর আয়াতে যাকাত বণ্টনের ৮টি খাতের কথা সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে:
১. ফকির (যাদের কোনো সম্পদ নেই বা সামান্য আছে)।
২. মিসকিন (যাদের আয় দ্বারা সংসার চলে না, অথচ লজ্জায় কারও কাছে চায় না)।
৩. যাকাত আদায়কারী কর্মচারী (যাকাত বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন)।
৪. মুয়াল্লাফাতুল কুলুব (ইসলামের প্রতি যাদের মন আকৃষ্ট করা প্রয়োজন)।
৫. দাসমুক্তি (ক্রীতদাসকে স্বাধীন করার জন্য)।
৬. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি (যে বৈধ কাজে ঋণ করে পরিশোধে অক্ষম)।
৭. ফি সাবিলিল্লাহ (আল্লাহর পথে জিহাদ বা ইসলামের সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তি)।
৮. মুসাফির (সফররত অবস্থায় যিনি নিঃস্ব হয়ে গেছেন)।
দরিদ্রতা দূরীকরণে ভূমিকা: যাকাত কোনো দয়া নয়, বরং এটি ধনীর সম্পদে গরিবের অধিকার। যাকাত ব্যবস্থার সঠিক বাস্তবায়ন হলে সমাজের অলস সম্পদ উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত হয়। এটি সমাজের ধনী-গরিবের বৈষম্য কমায় এবং গরিবদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। দরিদ্রদের মধ্যে যাকাতের অর্থ এমনভাবে প্রদান করা উচিত (যেমন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়া), যাতে তারা স্বাবলম্বী হতে পারে এবং ভবিষ্যতে তাদের আর যাকাত গ্রহণ করতে না হয়।
বিমা (Insurance): মানুষের জীবন ও সম্পদের সম্ভাব্য ঝুঁকির আর্থিক ক্ষতি মোকাবিলার জন্য যে চুক্তির মাধ্যমে প্রিমিয়াম বা কিস্তির বিনিময়ে কোনো প্রতিষ্ঠান ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়, তাকে বিমা বলে।
প্রচলিত বিমা ও ইসলামি বিমার (তাকাফুল) পার্থক্য:
১. ভিত্তি: প্রচলিত বিমা সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক ও ঝুঁকি হস্তান্তরের নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু ইসলামি বিমা ‘তাকাফুল’ হলো পারস্পরিক সহযোগিতা (তাআউন) ও অনুদানের (তাবাররু) নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত।
২. সুদ (রিবা): প্রচলিত বিমার তহবিলের অর্থ সুদি ব্যাংকে বা সুদি বন্ডে বিনিয়োগ করা হয়, যা ইসলামে হারাম। ইসলামি বিমায় সংগৃহীত তহবিল শরিয়াহ সম্মত হালাল ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়।
৩. গারার (অনিশ্চয়তা) ও মাইসির (জুয়া): প্রচলিত বিমায় ক্ষতি না হলে জমাকৃত প্রিমিয়ামের অর্থ কোম্পানি আত্মসাৎ করে, যা জুয়া ও অনিশ্চয়তার শামিল। ইসলামি বিমায় উদ্বৃত্ত তহবিল অংশগ্রহণকারীদের মাঝে পলিসির শর্তানুযায়ী বণ্টন করে দেওয়া হয়।
৪. শরিয়াহ বোর্ড: প্রচলিত বিমায় কোনো শরিয়াহ বোর্ড থাকে না। ইসলামি বিমায় কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য শরিয়াহ সুপারভাইজরি বোর্ড থাকে।
(যে কোনো দুইটি প্রশ্নের উত্তর দাও)
মান— ১০×২ = ২০
মালিকানার অর্থ: কোনো বস্তুর ওপর আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তা নিজের ইচ্ছামতো ভোগ, ব্যবহার বা হস্তান্তর করার ক্ষমতাকে মালিকানা বলে।
ইসলামে মালিকানার ধারণা: ইসলামি অর্থনীতিতে মালিকানার ধারণা প্রচলিত পুঁজিবাদের মতো অবাধ নয়।
১. প্রকৃত মালিকানা: ইসলাম মনে করে আসমান, জমিন এবং এর মধ্যকার সবকিছুর নিরঙ্কুশ মালিক একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামিন।
২. প্রতিনিধিত্বশীল মালিকানা: মানুষ হলো পৃথিবীতে আল্লাহর খলিফা বা প্রতিনিধি। আল্লাহ তাকে যে সম্পদ দিয়েছেন, মানুষ তার আমানতদার বা ট্রাস্টি মাত্র।
৩. সীমাবদ্ধ ব্যক্তিগত মালিকানা: ইসলাম মানুষকে সম্পদের ব্যক্তিগত মালিকানার অধিকার দিয়েছে, তবে তা শর্তসাপেক্ষে। উপার্জনের পথ হালাল হতে হবে এবং তা ব্যয়ের ক্ষেত্রে শরিয়তের বিধি-নিষেধ (হারাম কাজে ব্যয় না করা) মানতে হবে।
৪. সামাজিক দায়বদ্ধতা: সম্পদের ওপর সমাজের গরিব-দুঃখীর অধিকার (যাকাত, ফিতরা) আদায় করতে হবে।
ইসলামি অর্থনীতিতে সম্পদ বণ্টনের প্রধান লক্ষ্য হলো সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। এর মূলনীতিসমূহ নিম্নরূপ:
১. সম্পদের আবর্তন নিশ্চিতকরণ: পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, “যাতে সম্পদ কেবল তোমাদের ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়” (সূরা হাশর: ৭)। অর্থাৎ সম্পদ গুটিকয়েক মানুষের হাতে কুক্ষিগত হওয়া প্রতিরোধ করা।
২. মৌলিক চাহিদার নিশ্চয়তা: সমাজের প্রতিটি মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা।
৩. সুদ ও মজুতদারি নিষিদ্ধকরণ: সম্পদ বণ্টনের বৈষম্য রোধে সুদ এবং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির জন্য পণ্য মজুত করা সম্পূর্ণ হারাম করা হয়েছে।
৪. যাকাত ও সাদাকাহ ব্যবস্থা: ধনীদের সম্পদে গরিবের বাধ্যতামূলক অধিকার (যাকাত) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সম্পদ পুঞ্জীভূত হওয়ার পথ বন্ধ করা হয়েছে।
৫. উত্তরাধিকার (মীরাস) আইন: মৃত ব্যক্তির সম্পদ ইসলামি ফারায়েজ আইন অনুযায়ী আত্মীয়-স্বজনের মাঝে নিখুঁতভাবে বণ্টন করে দেওয়া, যাতে সম্পদ এক হাতে আটকে না থাকে।
সাধারণভাবে সময়ের সাথে সাথে বাজারে দ্রব্যমূল্যের ক্রমাগত ও দীর্ঘস্থায়ী বৃদ্ধি পাওয়াকেই অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি (Inflation) বলে। মুদ্রাস্ফীতি ঘটলে টাকার ক্রয়ক্ষমতা বা মূল্য কমে যায়। অর্থাৎ, আগে যে পরিমাণ টাকা দিয়ে যে পরিমাণ পণ্য বা সেবা কেনা যেত, মুদ্রাস্ফীতির কারণে একই পরিমাণ পণ্য কিনতে আগের চেয়ে বেশি টাকার প্রয়োজন হয়। অর্থনীতিবিদ ক্রাউথারের মতে, “মুদ্রাস্ফীতি এমন একটি অবস্থা যখন অর্থের মূল্য ক্রমশ হ্রাস পায় অর্থাৎ দ্রব্যমূল্য ক্রমশ বৃদ্ধি পায়।” সাধারণত বাজারে পণ্য বা সেবার জোগানের তুলনায় অর্থের জোগান বা মানুষের হাতে টাকা বেশি চলে এলে মুদ্রাস্ফীতির সৃষ্টি হয়।
ইসলামি অর্থনীতিতে শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে ইসলামের সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে:
১. মৌলিক প্রয়োজন পূরণের নিশ্চয়তা: একজন শ্রমিকের মজুরি এমন হতে হবে যেন সে তা দিয়ে সম্মানজনকভাবে তার এবং তার পরিবারের অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের মতো মৌলিক প্রয়োজনগুলো মেটাতে পারে।
২. পারস্পরিক সম্মতি ও ন্যায়বিচার: মজুরি নির্ধারণ হতে হবে মালিক ও শ্রমিকের পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে এবং তা হতে হবে ইনসাফপূর্ণ। মালিক কখনোই তার ক্ষমতার দাপটে ঠকিয়ে কম মজুরি নির্ধারণ করতে পারবে না।
৩. দ্রুত মজুরি প্রদান: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “শ্রমিকের ঘাম শুকানোর পূর্বেই তার মজুরি পরিশোধ করে দাও” (ইবনে মাজাহ)।
৪. জীবনযাত্রার মানের সাথে সামঞ্জস্য: মালিক যে মানের জীবনযাপন করবে, তার অধীনস্ত শ্রমিকদেরও সেই মানের খাবার ও পোশাকের ব্যবস্থা করা মালিকের নৈতিক দায়িত্ব।






