পরীক্ষা কোড: ২ ০ ৩ প্রশ্নপত্র কোড: ১ ১ ৩
ফাজিল স্নাতক (অনার্স) তৃতীয় বর্ষ পরীক্ষা, ২০২৪
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
[আধুনিক তুরস্ক, ইরান, আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার মুসলিম রাষ্ট্রসমূহ (১৯১৯ খ্রি. পর্যন্ত)]
বিষয় কোড: ২ ০ ৫ ৩ ০ ৪
সময়— ৪ ঘণ্টা
পূর্ণমান— ৮০
(যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও)
মান— ১৫×৪ = ৬০
পরিচয়: মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক (১৮৮১–১৯৩৮) হলেন আধুনিক ও ধর্মনিরপেক্ষ তুরস্ক প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রথম রাষ্ট্রপতি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতনের মুখে তিনি তুর্কি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেন এবং তুরস্ককে একটি আধুনিক রাষ্ট্রে রূপান্তর করেন। ‘আতাতুর্ক’ শব্দের অর্থ ‘তুর্কিদের পিতা’, যা আধুনিক তুরস্ক নির্মাণে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য তুর্কি পার্লামেন্ট তাঁকে উপাধি হিসেবে প্রদান করে।
জাতীয়তাবাদী নেতা হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপট:
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানীয় সাম্রাজ্য মিত্রবাহিনীর কাছে পরাজিত হলে সাম্রাজ্যের বিশাল অংশ দখলদারদের হাতে চলে যায় এবং সুলতান একটি পুতুল শাসকে পরিণত হন। এই চরম দুর্দিনে মোস্তফা কামাল একজন সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে ১৯১৫ সালের গ্যালিপলির যুদ্ধে ব্রিটিশ ও ফরাসি বাহিনীকে পরাজিত করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন।
যুদ্ধ শেষে মিত্রবাহিনী যখন অপমানজনক ‘সেভরেস চুক্তি’ (Treaty of Sèvres) চাপিয়ে দিয়ে তুরস্ককে ভাগ করার ষড়যন্ত্র করে, তখন কামাল এর তীব্র প্রতিবাদ করেন। তিনি ১৯১৯ সালে আনাতোলিয়ায় গিয়ে তুর্কি জনগণকে একত্রিত করে ‘তুর্কি স্বাধীনতা যুদ্ধ’ শুরু করেন। তাঁর অসাধারণ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বে গ্রিক, আর্মেনীয় ও ফরাসি বাহিনী তুরস্ক থেকে বিতাড়িত হয়। এরপর তিনি ১৯২২ সালে সুলতান প্রথার বিলুপ্তি ঘটান এবং ১৯২৩ সালের ২৯ অক্টোবর আধুনিক তুরস্ক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে একজন অবিসংবাদিত জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে বিশ্বদরবারে আত্মপ্রকাশ করেন।
লুজান চুক্তি পর্যালোচনা: ১৯২৩ সালের ২৪ জুলাই সুইজারল্যান্ডের লুজান শহরে তুরস্কের গ্র্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি এবং মিত্রশক্তির (ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইতালি, গ্রিস ইত্যাদি) মধ্যে যে ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তা ‘লুজান চুক্তি’ নামে পরিচিত। মোস্তফা কামালের স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয়ের ফলে মিত্রশক্তি পূর্বের অপমানজনক ‘সেভরেস চুক্তি’ বাতিল করে এই নতুন চুক্তি করতে বাধ্য হয়। এর প্রধান শর্তগুলো ছিল:
১. আধুনিক তুরস্কের আন্তর্জাতিক সীমানা চূড়ান্তভাবে স্বীকৃত হয়।
২. তুরস্কের ওপর থেকে সকল ধরনের বৈদেশিক অর্থনৈতিক ও বিচারিক নিয়ন্ত্রণ (Capitulations) তুলে নেওয়া হয়।
৩. তুরস্ককে কোনো যুদ্ধাপরাধের ক্ষতিপূরণ দিতে হয়নি।
৪. গ্রিস ও তুরস্কের মধ্যে সংখ্যালঘু জনসংখ্যার বিনিময় ঘটে।
তুরস্কের রাজনীতিতে এর প্রভাব:
লুজান চুক্তি ছিল আধুনিক তুরস্কের ‘জন্মসনদ’। এর প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী:
১. সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা: এই চুক্তির মাধ্যমে তুরস্ক পুনরায় একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের স্বীকৃতি পায়।
২. সাম্রাজ্যের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি: এটি উসমানীয় সাম্রাজ্যের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয় এবং তুরস্ককে একটি নির্দিষ্ট সীমানার জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
৩. কামালবাদের উত্থান: লুজান চুক্তির কূটনৈতিক বিজয় মোস্তফা কামালের রাজনৈতিক ক্ষমতাকে একচ্ছত্র করে তোলে। এই চুক্তির পর তিনি নির্বিঘ্নে তাঁর ধর্মনিরপেক্ষতা, আধুনিকীকরণ, আরবি লিপির পরিবর্তে ল্যাটিন লিপির প্রবর্তন এবং ইউরোপীয় আইনের মতো বৈপ্লবিক সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হন।
রেজা শাহ পাহলভি (১৯২৫-১৯৪১) ছিলেন ইরানের পাহলভি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ইরানকে একটি আধুনিক ও শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য ব্যাপক সংস্কার সাধন করেন।
সংস্কারসমূহের মূল্যায়ন:
১. সামরিক সংস্কার: তিনি বিদেশি প্রভাবমুক্ত একটি আধুনিক, সুশৃঙ্খল ও শক্তিশালী জাতীয় সেনাবাহিনী গঠন করেন এবং বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা চালু করেন।
২. যাতায়াত ও অবকাঠামো: তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো ‘ট্রান্স-ইরানিয়ান রেলওয়ে’ নির্মাণ। এটি বিদেশি ঋণ ছাড়াই সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে তৈরি হয়েছিল। এছাড়া তিনি অসংখ্য আধুনিক সড়ক ও শিল্প কারখানা স্থাপন করেন।
৩. সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্কার: তিনি ইরানে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রসার ঘটান। ১৯৩৬ সালে তিনি নারীদের জন্য ‘হিজাব’ বা চাদর পরা নিষিদ্ধ করেন এবং পুরুষদের পশ্চিমা পোশাক পরতে বাধ্য করেন, যা ধর্মীয় সমাজে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল।
৪. শিক্ষা ও বিচার ব্যবস্থা: আধুনিক শিক্ষার প্রসারে তিনি তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং বিচার ব্যবস্থাকে মোল্লাদের হাত থেকে মুক্ত করে ফরাসি মডেলের ধর্মনিরপেক্ষ আইন চালু করেন।
মূল্যায়ন: রেজা শাহের সংস্কার ইরানকে মধ্যযুগীয় পশ্চাৎপদতা থেকে আধুনিক যুগে প্রবেশ করিয়েছিল। তবে তাঁর সংস্কারগুলো ছিল অত্যন্ত স্বৈরতান্ত্রিক এবং জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া, যা ইরানের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় সমাজকে চরমভাবে ক্ষুব্ধ করেছিল।
শ্বেত বিপ্লবের বিবরণ: ১৯৬৩ সালে ইরানের শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি সমাজ ও অর্থনীতিতে আধুনিকীকরণ এবং বামপন্থি বিপ্লবের সম্ভাবনা নস্যাৎ করার লক্ষ্যে যে ব্যাপক সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করেন, তা ‘শ্বেত বিপ্লব’ (White Revolution) নামে পরিচিত। এটি ছিল রক্তপাতহীন একটি উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া বিপ্লব, তাই একে ‘শ্বেত বা সাদা বিপ্লব’ বলা হয়। এর প্রধান কর্মসূচির মধ্যে ছিল ভূমি সংস্কার, নারীদের ভোটাধিকার প্রদান, শ্রমিকদের কারখানার মুনাফার অংশ দেওয়া এবং নিরক্ষরতা দূরীকরণের জন্য ‘লিটারেসি কর্পস’ বা শিক্ষা বাহিনী গঠন করা।
আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে প্রভাব:
১. ভূমি সংস্কার: জমিদারদের বিশাল ভূ-সম্পত্তি অধিগ্রহণ করে তা সাধারণ কৃষকদের মাঝে বণ্টন করা হয়। এতে সামন্তবাদের পতন ঘটে এবং কৃষকদের অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়।
২. শিল্পায়ন ও নগরায়ন: তেলের অর্থে দেশে দ্রুত শিল্পায়ন শুরু হয়। গ্রামের মানুষ কাজের সন্ধানে শহরে ভিড় করতে থাকে, ফলে ব্যাপক নগরায়ন ঘটে।
৩. নারীর ক্ষমতায়ন: নারীরা প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার লাভ করেন এবং শিক্ষা ও চাকরিতে তাদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায়।
৪. নেতিবাচক প্রভাব ও অসন্তোষ: অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটলেও এর সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়নি, বরং শাহের ঘনিষ্ঠ পুঁজিপতিরা লাভবান হয়। ভূমি সংস্কারের ফলে অনেক ধর্মীয় ওয়াকফ সম্পত্তিও সরকার নিয়ে নেয়। অন্যদিকে পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ ইরানের ঐতিহ্যবাহী ইসলামি মূল্যবোধে আঘাত হানে, যার ফলে উলামা (বিশেষ করে আয়াতুল্লাহ খোমেনি) ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম হয়, যা শেষ পর্যন্ত ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পথ প্রশস্ত করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ইরানের রেজা শাহ পাহলভি নিরপেক্ষতা ঘোষণা করেন। কিন্তু ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব এবং তেলের মজুতের কারণে ইরান বৃহৎ শক্তিবর্গের (ব্রিটেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র) রাজনৈতিক ও সামরিক দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের প্রকৃতি:
১. অ্যাংলো-সোভিয়েত আগ্রাসন (১৯৪১): জার্মান নাৎসি বাহিনীর সাথে রেজা শাহের সুসম্পর্ক থাকায় মিত্রবাহিনী আশঙ্কা করে যে জার্মানি ইরানের তেলক্ষেত্র দখল করতে পারে। তাছাড়া জার্মানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত সোভিয়েত ইউনিয়নকে সামরিক রসদ পাঠানোর জন্য ইরানের মধ্য দিয়ে একটি নিরাপদ রুট (Persian Corridor) প্রয়োজন ছিল। তাই ১৯৪১ সালের আগস্টে ব্রিটেন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন যৌথভাবে ইরানে আক্রমণ করে এবং রেজা শাহকে পদত্যাগ করে নির্বাসনে যেতে বাধ্য করে।
২. প্রভাব বলয় সৃষ্টি: আগ্রাসনের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন উত্তর ইরানে এবং ব্রিটেন দক্ষিণ ইরানে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রও মিত্রবাহিনীর সাহায্যে ইরানে তাদের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করে।
৩. যুদ্ধোত্তর সংকট: যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর চুক্তি অনুযায়ী ব্রিটিশ ও মার্কিন বাহিনী ইরান ত্যাগ করলেও সোভিয়েত ইউনিয়ন উত্তর ইরান থেকে সৈন্য সরাতে অস্বীকৃতি জানায় এবং সেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী কমিউনিস্ট রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা করে (১৯৪৬ সালের ইরান সংকট)। পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের তীব্র চাপে সোভিয়েত ইউনিয়ন সৈন্য প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। এই দ্বন্দ্বটি ছিল মূলত শীতল যুদ্ধের (Cold War) প্রথম দিকের অন্যতম একটি প্রধান ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব বিংশ শতাব্দীর অন্যতম যুগান্তকারী ঘটনা, যার মাধ্যমে ইরানে ২৫০০ বছরের রাজতন্ত্রের পতন ঘটে এবং আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
কারণসমূহ:
১. শাহের স্বৈরতন্ত্র ও সাভাক-এর নির্যাতন: শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি দেশে একনায়কতন্ত্র কায়েম করেছিলেন। তাঁর গুপ্তচর বাহিনী ‘সাভাক’ (SAVAK) বিরোধীদের ওপর চরম নির্মম নির্যাতন ও গুপ্তহত্যা চালাত।
২. পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ: শাহের দ্রুত আধুনিকীকরণ ও পশ্চিমা জীবনাচরণ চাপিয়ে দেওয়ার নীতি ইরানের রক্ষণশীল ও ধর্মপ্রাণ শিয়া সমাজকে ক্ষুব্ধ করে তোলে।
৩. অর্থনৈতিক বৈষম্য: তেলের দাম বৃদ্ধিতে দেশ ধনী হলেও ব্যাপক দুর্নীতি ও মুদ্রাস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনমান নিচে নেমে যায় এবং ধনী-গরিবের বৈষম্য চরম আকার ধারণ করে।
৪. আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্ব: নির্বাসিত ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনির ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্ব, তাঁর জ্বালাময়ী ক্যাসেট বার্তা এবং আপসহীন অবস্থান সাধারণ ছাত্র, জনতা ও আলেম সমাজকে বিপ্লবের মঞ্চে ঐক্যবদ্ধ করে।
ফলাফল:
১. পাহলভি রাজতন্ত্রের পতন ঘটে এবং ‘বেলায়াত-ই-ফকিহ’ (ইসলামি আইনজ্ঞের শাসন) তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
২. ইরানের বৈদেশিক নীতিতে আমূল পরিবর্তন আসে; ইরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (যাকে তারা ‘বড় শয়তান’ বলত) ও পশ্চিমা বলয় থেকে বেরিয়ে এসে সম্পূর্ণ স্বাধীন নীতি গ্রহণ করে।
৩. এই বিপ্লব মধ্যপ্রাচ্যসহ সমগ্র মুসলিম বিশ্বে ইসলামি পুনর্জাগরণের চেতনা ছড়িয়ে দেয়।
ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার ইতিহাস:
১৯২৯ সালে আফগানিস্তানের সংস্কারপন্থি রাজা আমানুল্লাহ খান রক্ষণশীলদের বিদ্রোহের মুখে সিংহাসন ত্যাগ করতে বাধ্য হন। এরপর হাবিবুল্লাহ কালাকানি (যিনি ‘বাচ্চা-ই-সাক্কো’ বা পানিওয়ালার ছেলে নামে পরিচিত ছিলেন) ক্ষমতা দখল করেন এবং দেশে চরম নৈরাজ্য শুরু হয়। এই পরিস্থিতিতে আমানুল্লাহ খানের প্রাক্তন সেনাপতি ও প্যারিসে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ নাদির খান ফ্রান্সে থেকে দেশে ফিরে আসেন। তিনি পশতুন উপজাতিদের সংগঠিত করে একটি শক্তিশালী বাহিনী গঠন করেন এবং ব্রিটিশদের পরোক্ষ সহায়তায় ১৯২৯ সালের অক্টোবরে হাবিবুল্লাহ কালাকানিকে পরাজিত ও নিহত করে ‘নাদির শাহ’ নাম ধারণ করে আফগানিস্তানের সিংহাসনে আরোহণ করেন।
শাসক হিসেবে কর্মকাণ্ড:
১. শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা: তিনি কঠোর হাতে দেশের গৃহযুদ্ধ ও নৈরাজ্য দমন করে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেন।
২. নতুন সংবিধান (১৯৩১): তিনি ১৯৩১ সালে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করেন, যেখানে রাজতন্ত্রের পাশাপাশি একটি দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট গঠন করা হয়, যদিও প্রকৃত ক্ষমতা রাজার হাতেই ছিল।
৩. সমন্বয়বাদী নীতি: আমানুল্লাহ খানের দ্রুত পশ্চিমা সংস্কারের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নাদির শাহ আধুনিকীকরণ ও ধর্মীয়/উপজাতীয় ঐতিহ্যের মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেন। তিনি মোল্লাদের ক্ষমতা আংশিক ফিরিয়ে দেন।
৪. উন্নয়নমূলক কাজ: তিনি শিক্ষার প্রসারে কাবুল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, সড়ক যোগাযোগ উন্নত করেন এবং একটি আধুনিক ব্যাংক ও সেনাবাহিনী গঠন করেন। তবে ১৯৩৩ সালে একজন আততায়ীর হাতে তিনি নিহত হন।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আফগানিস্তান প্রাচীনকাল থেকেই বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত। একে এশিয়ার ‘হার্ট’ বা হৃৎপিণ্ড বলা হয়।
ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব:
১. সংযোগস্থল: আফগানিস্তান হলো মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংযোগস্থল। স্থলবেষ্টিত (Landlocked) এই দেশটি এই তিন অঞ্চলের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। প্রাচীন ‘সিল্ক রুট’ এর উপর দিয়ে গেছে।
২. ঐতিহাসিক বাফার স্টেট: ঊনবিংশ শতাব্দীতে ‘গ্রেট গেম’ (Great Game) এর সময় দক্ষিণ এশিয়ায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এবং মধ্য এশিয়ায় রুশ সাম্রাজ্যের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ এড়াতে আফগানিস্তান একটি নিরপেক্ষ ‘বাফার স্টেট’ বা প্রহরীর ভূমিকা পালন করেছিল।
৩. জ্বালানি করিডোর: আধুনিক বিশ্বে মধ্য এশিয়ার বিশাল তেল ও গ্যাস সম্পদ দক্ষিণ এশিয়া (বিশেষ করে পাকিস্তান ও ভারত) এবং আরব সাগরে পৌঁছানোর সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ও লাভজনক ট্রানজিট রুট হলো আফগানিস্তান (যেমন: TAPI গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প)।
৪. খনিজ সম্পদ: আফগানিস্তানের ভূগর্ভে লিথিয়াম, তামা, লোহাসহ প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের অব্যবহৃত খনিজ সম্পদ রয়েছে, যা চীনসহ বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
৫. আঞ্চলিক নিরাপত্তা: আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার ওপর সরাসরি পাকিস্তান, ইরান, চীন এবং মধ্য এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা নির্ভর করে।
(যে কোনো দুটি প্রশ্নের উত্তর দাও)
মান— ১০×২ = ২০
প্রায় ছয়শ বছর বিশ্ব শাসন করার পর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ওসমানি (উসমানীয়) সাম্রাজ্যের আনুষ্ঠানিক পতন ঘটে। এই পতনের পেছনে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত কারণ ছিল:
১. অযোগ্য উত্তরাধিকারী ও দুর্নীতি: সুলতান সুলেমানের পর অধিকাংশ সুলতান ছিলেন দুর্বল ও অযোগ্য। হারেমের প্রভাব এবং প্রশাসনে ব্যাপক দুর্নীতির কারণে রাষ্ট্রের কাঠামো ভেঙে পড়ে।
২. সামরিক দুর্বলতা: একসময়ের অজেয় ‘জ্যানিসারি’ (Janissaries) বাহিনী আধুনিক সমরবিদ্যার সাথে তাল মেলাতে ব্যর্থ হয় এবং তারা রাষ্ট্রের সুরক্ষার চেয়ে নিজেদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বিদ্রোহ শুরু করে।
৩. অর্থনৈতিক স্থবিরতা: ভৌগোলিক আবিষ্কারের ফলে বাণিজ্য পথ ইউরোপের আটলান্টিক মহাসাগরে স্থানান্তরিত হলে সাম্রাজ্যের বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তীতে তারা ইউরোপের কাছে বিপুল ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়ে।
৪. জাতীয়তাবাদের উত্থান: ফরাসি বিপ্লবের প্রভাবে সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা বলকান অঞ্চলের খ্রিষ্টান জাতিগুলো এবং মধ্যপ্রাচ্যের আরবরা স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু করে।
৫. প্রথম বিশ্বযুদ্ধ: সাম্রাজ্যের পতনের চূড়ান্ত কারণ ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পক্ষে (কেন্দ্রীয় শক্তি) যোগদান করা। যুদ্ধে পরাজয়ের পর মিত্রবাহিনী সাম্রাজ্যকে টুকরো টুকরো করে ভাগ করে নেয়।
‘ডি-৮’ (D-8) বা Developing-8 হলো উন্নয়নশীল ৮টি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতামূলক একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা।
প্রতিষ্ঠা: তুরস্কের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দিন এরবাকানের উদ্যোগে ১৯৯৭ সালের ১৫ জুন ইস্তাম্বুলে এই জোটটি আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয়।
সদস্য রাষ্ট্রসমূহ: এই জোটের সদস্য দেশগুলো হলো বাংলাদেশ, মিশর, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান এবং তুরস্ক।
লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য: এর মূল উদ্দেশ্য হলো বিশ্ব অর্থনীতিতে সদস্য দেশগুলোর অবস্থান সুদৃঢ় করা, নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক বাড়ানো, বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা এবং নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা। এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো কোনো রাজনৈতিক বা সামরিক জোট নয়, বরং এটি একটি খাঁটি অর্থনৈতিক ফোরাম।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানের পররাষ্ট্র নীতিতে আমূল পরিবর্তন আসে। শাহ আমলের পশ্চিমা-ঘেঁষা নীতির সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী অবস্থান নেয় নতুন সরকার।
পররাষ্ট্র নীতির মূল বৈশিষ্ট্য:
১. ‘না প্রাচ্য, না পাশ্চাত্য’: আয়াতুল্লাহ খোমেনির এই স্লোগানের অর্থ হলো ইরান পুঁজিবাদী যুক্তরাষ্ট্র (যাকে তারা ‘গ্রেট শয়তান’ বলে) এবং তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন—কারও আধিপত্যই মেনে নেবে না। সম্পূর্ণ স্বাধীন ও ইসলামি আদর্শের ভিত্তিতে রাষ্ট্র চলবে।
২. বিপ্লব রপ্তানি: ইসলামি বিপ্লবের আদর্শকে মধ্যপ্রাচ্য এবং বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম দেশে ছড়িয়ে দেওয়া ইরানের একটি অলিখিত পররাষ্ট্র নীতিতে পরিণত হয়।
৩. ফিলিস্তিন সমর্থন ও ইসরাইল বিরোধিতা: বিপ্লবোত্তর ইরান ইসরাইলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে প্রবলভাবে সমর্থন করতে শুরু করে।
৪. প্রতিরোধ বলয়: আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের জন্য ইরান লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুথিদের মতো বিভিন্ন প্রতিরোধ গোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়ে আসছে।
২০২১ সালের আগস্টে তালেবান পুনরায় আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর দেশটির অর্থনীতি একটি বড় ধরনের ধাক্কার সম্মুখীন হয়। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং বিদেশে থাকা রিজার্ভ বাজেয়াপ্ত হওয়ার কারণে অর্থনীতি প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে।
সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা:
১. নিজস্ব রাজস্ব বৃদ্ধি: বিদেশি অনুদান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তালেবান সরকার কঠোরভাবে দুর্নীতি দমন করে এবং কাস্টমস ও খনিজ সম্পদ (যেমন: কয়লা) রপ্তানি থেকে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করেছে।
২. মুদ্রার স্থিতিশীলতা: তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও আফগান কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর মুদ্রানীতির মাধ্যমে তাদের নিজস্ব মুদ্রা ‘আফগানি’-এর মান ডলারের বিপরীতে অভাবনীয়ভাবে স্থিতিশীল রাখতে সক্ষম হয়েছে।
৩. আঞ্চলিক বাণিজ্য ও মেগা প্রকল্প: তারা চীন, ইরান ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সাথে ট্রানজিট ও বাণিজ্য চুক্তিতে জোর দিচ্ছে। নিজস্ব অর্থায়নে বিশাল ‘কুশতেপা খাল’ (Qosh Tepa Canal) খনন প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যা কৃষিক্ষেত্রে বিপ্লব আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এতদসত্ত্বেও, ব্যাপক বেকারত্ব, ব্যাংকিং খাতের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অভাবে আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সংকট এখনো চরম পর্যায়ে রয়েছে।






