At-Tafsir Bidunis Sanad (আত-তাফসীর বিদূনিস সানাদ) 201201 – Fazil Hons Al Quran 2nd Year 2020 QnA

Join Our Telegram Channel
দ্রুত নতুন বই পেতে যুক্ত থাকুন
Join Now
admin
at tafsir bidunis sanad 201201 fazil hons al quran 2nd year 2020 qna
Join Our WhatsApp Channel
দ্রুত নতুন বই পেতে যুক্ত থাকুন
Join Now
📋 সূচিপত্র (Table of Contents)

At-Tafsir Bidunis Sanad (Code: 201201) – ২০২০ প্রশ্ন ও উত্তর

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২০ এর আল-কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের التفسير بدون السند (আত-তাফসীর বিদূনিস সানাদ) বিষয়ের সম্পূর্ণ উত্তরমালা।

বিঃদ্রঃ পরীক্ষার্থীদের সুবিধার্থে মূল প্রশ্নপত্রের আরবি প্রশ্নসহ ক-বিভাগ এবং খ-বিভাগের সবগুলো প্রশ্নের ১০০% নির্ভুল উত্তর দেওয়া হলো।

مجموعة ( أ ) [ক-বিভাগ]

أجب عن خمسة من الأسئلة [যে কোনো পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দাও]

۱- قال الله تبارك تعالى: الحمد لله رب العالمين- الرحمن الرحيم- مالك يوم الدين- اياك نعبد واياك نستعين-

আয়াতসমূহের অনুবাদ:

“যাবতীয় প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। যিনি পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু। যিনি বিচার দিনের মালিক। আমরা কেবল তোমারই ইবাদত করি এবং তোমারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি।”

সংক্ষিপ্ত তাফসির:

সুরা ফাতিহার এই আয়াতগুলোতে আল্লাহ তাআলার একত্ববাদ, তাঁর রহমত এবং বিচার দিনের ক্ষমতা বর্ণনা করা হয়েছে। এটি বান্দা ও আল্লাহর মাঝের একটি সরাসরি কথোপকথন, যেখানে বান্দা তাঁর কাছে সাহায্য চায় এবং একমাত্র তাঁরই ইবাদতের ঘোষণা দেয়। এখানে তাওহিদুর রুবুবিয়্যাহ এবং তাওহিদুল উলুহিয়্যাহ উভয়েরই স্বীকারোক্তি রয়েছে।

আয়াতসমূহের অনুবাদ:

“যাবতীয় প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। যিনি পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু। যিনি বিচার দিনের মালিক। আমরা কেবল তোমারই ইবাদত করি এবং তোমারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি।”

সংক্ষিপ্ত তাফসির:

সুরা ফাতিহার এই আয়াতগুলোতে আল্লাহ তাআলার একত্ববাদ, তাঁর রহমত এবং বিচার দিনের ক্ষমতা বর্ণনা করা হয়েছে। এটি বান্দা ও আল্লাহর মাঝের একটি সরাসরি কথোপকথন, যেখানে বান্দা তাঁর কাছে সাহায্য চায় এবং একমাত্র তাঁরই ইবাদতের ঘোষণা দেয়। এখানে তাওহিদুর রুবুবিয়্যাহ এবং তাওহিদুল উলুহিয়্যাহ উভয়েরই স্বীকারোক্তি রয়েছে।

( أ ) ما معنى الرحمن والرحيم؟ وما الفرق بينهما؟

[ক. رحمن এবং رحيم এর অর্থ কী? এ দুটির মধ্যে পার্থক্য কী?]

رحمن এবং رحيم এর অর্থ:
দুটি শব্দই আরবি ‘رَحْمَةٌ’ (রহমত) ধাতু থেকে নির্গত।
الرحمن (আর-রহমান): এর অর্থ পরম করুণাময় বা দাতা। যিনি সৃষ্টিজগতের সবার প্রতি (মুমিন ও কাফের নির্বিশেষে) দয়ালু।
الرحيم (আর-রহিম): এর অর্থ অসীম দয়ালু। যিনি বিশেষ করে মুমিনদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল ও দয়ালু।

এ দুটির মধ্যে পার্থক্য:
১. ‘রহমান’ শব্দটি ব্যাপক (عام), এর রহমত দুনিয়াতে মুমিন-কাফের সকলের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। অন্যদিকে ‘রহিম’ শব্দটি খাস (خاص), এর রহমত আখিরাতে কেবল মুমিনদের জন্য নির্দিষ্ট।
২. ‘রহমান’ আল্লাহ তাআলার নিজস্ব গুণবাচক সত্তাগত নাম, যা অন্য কারো ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায় না। কিন্তু ‘রহিম’ শব্দটি আল্লাহ ছাড়া অন্যের ক্ষেত্রেও (যেমন- রাসূল সা.-এর ক্ষেত্রে) ব্যবহার করা জায়েজ আছে।

( ب ) كم قراءة في قول: مالك يوم الدين؟ بين-

[খ. مالك يوم الدين এর মধ্যে কয়টি ক্বিরাআত রয়েছে বর্ণনা কর।]

মালকি ইয়াওমিদ্দীন-এর ক্বিরাআত:
مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ শব্দে মূলত দুটি প্রসিদ্ধ মুতাওয়াতির ক্বিরাআত রয়েছে:
১. مَالِكِ (মালিকি): মিম অক্ষরে আলিফ (যবর) সহকারে। এর অর্থ হলো মালিক বা অধিকারী। ইমাম আসিম ও কিসাইসহ অনেক ক্বারি এই ক্বিরাআত গ্রহণ করেছেন।
২. مَلِكِ (মালিকি): মিম অক্ষরে আলিফ ছাড়া (শুধু যবর) সহকারে। এর অর্থ হলো রাজা বা অধিপতি। ইমাম নাফে, ইবনে কাসির, আবু আমরসহ বাকি ক্বারিগণ এই ক্বিরাআত গ্রহণ করেছেন।
উভয় ক্বিরাআতই সঠিক এবং আল্লাহ তাআলার মহিমা প্রকাশে পরিপূরক।

۲- قال تعالى: ان الذين كفروا سواء عليهم أأنذرتهم ام لم تنذرهم لا يؤمنون- ختم الله على قلوبهم وعلى سمعهم وعلى ابصارهم غشاوة ولهم عذاب عظيم-

আয়াতসমূহের অনুবাদ:

“নিশ্চয় যারা কুফরি করেছে, আপনি তাদেরকে সতর্ক করুন বা না করুন, উভয়ই তাদের জন্য সমান; তারা ঈমান আনবে না। আল্লাহ তাদের অন্তর ও কানের ওপর মোহর মেরে দিয়েছেন এবং তাদের চোখের ওপর রয়েছে পর্দা। আর তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।”

সংক্ষিপ্ত তাফসির:

সুরা বাকারার এই আয়াত দুটি বিশেষত আবু জাহেল, আবু লাহাব প্রমুখ কট্টর কাফিরদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। যারা সত্যকে জেনে-বুঝে অহংকারবশত প্রত্যাখ্যান করে, আল্লাহ তাদের অন্তরে মোহর লাগিয়ে দেন, ফলে তাদের হিদায়াত পাওয়ার আর কোনো সম্ভাবনা থাকে না। এখানে নবীজির (সা.) সান্ত্বনার জন্য বলা হয়েছে যে, এদের ঈমান না আনার পেছনে নবীজির কোনো ত্রুটি নেই।

আয়াতসমূহের অনুবাদ:

“নিশ্চয় যারা কুফরি করেছে, আপনি তাদেরকে সতর্ক করুন বা না করুন, উভয়ই তাদের জন্য সমান; তারা ঈমান আনবে না। আল্লাহ তাদের অন্তর ও কানের ওপর মোহর মেরে দিয়েছেন এবং তাদের চোখের ওপর রয়েছে পর্দা। আর তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।”

সংক্ষিপ্ত তাফসির:

সুরা বাকারার এই আয়াত দুটি বিশেষত আবু জাহেল, আবু লাহাব প্রমুখ কট্টর কাফিরদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। যারা সত্যকে জেনে-বুঝে অহংকারবশত প্রত্যাখ্যান করে, আল্লাহ তাদের অন্তরে মোহর লাগিয়ে দেন, ফলে তাদের হিদায়াত পাওয়ার আর কোনো সম্ভাবনা থাকে না। এখানে নবীজির (সা.) সান্ত্বনার জন্য বলা হয়েছে যে, এদের ঈমান না আনার পেছনে নবীজির কোনো ত্রুটি নেই।

( أ ) ما معنى الإنذار؟ وكم قراءة في أأنذرتهم؟ بين-

[ক. إنذار শব্দের অর্থ কী? أأنذرتهم এর মধ্যে কয়টি ক্বিরাআত রয়েছে বর্ণনা কর।]

إنذار (ইনযার) এর অর্থ:
ইনযার শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো সতর্ক করা বা ভয় দেখানো। শরিয়তের পরিভাষায় ইনযার বলতে, আল্লাহর অবাধ্যতার পরিণাম এবং জাহান্নামের আজাব সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করাকে বোঝায়।

أأنذرتهم এর ক্বিরাআতসমূহ:
এই শব্দটিতে পাশাপাশি দুটি হামযা (أَ أَنْذَرْتَهُمْ) রয়েছে। ক্বারিদের মধ্যে এটি পড়ার তিনটি নিয়ম রয়েছে:
১. তাহকিক (تحقيق): দুটি হামযাকেই স্পষ্ট করে আলাদাভাবে উচ্চারণ করা। (যেমন- আ-আনযারতাহুম)।
২. তাসহিল (تسهيل): প্রথম হামযাটি স্পষ্ট করে দ্বিতীয় হামযাটিকে নরম বা সহজ করে (আলিফ ও হামযার মাঝামাঝি) উচ্চারণ করা।
৩. ইবদান (إبدال): দ্বিতীয় হামযাকে আলিফ দ্বারা পরিবর্তন করে একটু টেনে পড়া (যেমন- আনযারতাহুম)।

( ب ) ما معنى الكفر؟ وما الفرق بينه وبين الشرك؟

[খ. كفر শব্দের অর্থ কী? كفر এবং شرك এর মধ্যে পার্থক্য কী?]

كفر (কুফর) এর অর্থ:
কুফর শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো ঢেকে রাখা, গোপন করা বা অস্বীকার করা। শরিয়তের পরিভাষায়, আল্লাহ তাআলার অস্তিত্ব, তাঁর গুণাবলি, তাঁর প্রেরিত রাসূল বা ইসলামের অকাট্য কোনো বিধানকে অস্বীকার করাকে কুফর বলে।

কুফর ও শিরক এর মধ্যে পার্থক্য:
শিরক (الشرك) অর্থ হলো আল্লাহ তাআলার সত্তা, গুণাবলি বা ইবাদতে অন্য কাউকে অংশীদার বা সমকক্ষ স্থাপন করা।
পার্থক্য হলো, শিরক হলো কুফরের একটি বিশেষ প্রকার। সকল শিরকই কুফর, কিন্তু সকল কুফর শিরক নয়। যেমন- কোনো নাস্তিক যদি ঈশ্বরের অস্তিত্বই অস্বীকার করে, তবে সে কাফের, কিন্তু সে কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ বানাচ্ছে না বলে শাব্দিক অর্থে সে মুশরিক নয়। কিন্তু যে ব্যক্তি আল্লাহর পাশাপাশি মূর্তিপূজাও করে, সে কাফের ও মুশরিক উভয়ই।

۳- قال تعالى: مثلهم كمثل الذى استوقد نارًا، فلما اضاءت ما حوله ذهب الله بنورهم وتركهم فى ظلمات لا يبصرون- صم بكم عمى فهم لا يرجعون- او كصيب من السماء فيه ظلمات ورعد وبرق، يجعلون اصابعهم فى اذانهم من الصواعق حذر الموت والله محيط بالكافرين-

আয়াতসমূহের অনুবাদ:

“তাদের উদাহরণ ওই ব্যক্তির মতো, যে আগুন জ্বালালো। এরপর যখন আগুন তার চারপাশ আলোকিত করল, তখন আল্লাহ তাদের জ্যোতি কেড়ে নিলেন এবং তাদেরকে এমন অন্ধকারে ছেড়ে দিলেন যে তারা কিছুই দেখতে পায় না। তারা বধির, বোবা এবং অন্ধ; সুতরাং তারা ফিরে আসবে না। অথবা (তাদের উদাহরণ) আকাশ থেকে নেমে আসা বৃষ্টির মতো…”

সংক্ষিপ্ত তাফসির:

এখানে আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের অবস্থার দুটি চমৎকার উদাহরণ দিয়েছেন। প্রথমটি হলো, তারা ঈমানের আলো পেয়েও কুফরির কারণে তা হারিয়ে অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। দ্বিতীয়টি হলো, ইসলামকে তারা ভয়ংকর ঝড়-বৃষ্টির মতো মনে করে, যার বজ্রধ্বনি (ইসলামের কঠোর বিধান) তাদের ভয় দেখায়। তাই তারা সত্য শোনা থেকে কানে আঙুল দিয়ে রাখে।

( أ ) ما معنى المثل؟ وما الفائدة في إيراد الأمثال في القران؟

[ক. مثل শব্দের অর্থ কী? কুরআনে مثل পেশ করার উপকারিতা কী?]

مثل (মাছাল) এর অর্থ:
مثل শব্দের অর্থ হলো দৃষ্টান্ত, উপমা বা উদাহরণ।

কুরআনে উপমা (مثل) পেশ করার উপকারিতা:
১. বিমূর্ত বা কঠিন আধ্যাত্মিক বিষয়গুলোকে বাস্তব ও পরিচিত জাগতিক উদাহরণের সাহায্যে মানুষের বুদ্ধির কাছাকাছি ও সহজবোধ্য করা।
২. শ্রোতার মনে গভীর প্রভাব বিস্তার করা এবং উপদেশ গ্রহণ করতে উৎসাহিত করা।
৩. বিষয়বস্তুর চিত্র এমনভাবে মনের পর্দায় ফুটিয়ে তোলা, যাতে তা ভোলা কঠিন হয়।

( ب ) فسر الآية – يجعلون اصابعهم فى اذانهم من الصواعق حذر الموت-

[খ. يجعلون اصابعهم فى اذانهم من الصواعق حذر الموت আয়াতের ব্যাখ্যা কর।]

আয়াতের ব্যাখ্যা:
এই আয়াতে মুনাফিকদের চরম ভয় ও বিভ্রান্তিকর অবস্থাকে একটি ভয়ানক ঝড়ের সাথে তুলনা করা হয়েছে। যখন আকাশে প্রচণ্ড মেঘ, অন্ধকার এবং বিকট শব্দের বজ্রপাত হয়, তখন মানুষ মৃত্যুর ভয়ে কানে আঙুল দিয়ে রাখে। ঠিক তেমনি, মুনাফিকরা যখন কুরআন মাজিদের কঠোর নির্দেশাবলি, জিহাদের হুকুম বা জাহান্নামের আজাবের কথা (যা বজ্রের মতো ভয়ানক) শোনে, তখন তারা তা শুনতে অস্বীকার করে এবং কানে আঙুল দেয় বা এড়িয়ে চলে। তারা মনে করে যে, এই সতর্কবাণীগুলো না শুনলেই তারা শাস্তি ও মৃত্যু থেকে বাঁচতে পারবে। কিন্তু আল্লাহ আয়াতের শেষাংশে বলেছেন যে, তিনি কাফেরদের পরিবেষ্টন করে আছেন, তাই তাদের পালানোর কোনো সুযোগ নেই।

٤- قوله تعالى: الم- الله لا اله الا هو الحى القيوم، نزل عليك الكتاب بالحق مصدقا لما بين يديه وانزل التوراة والإنجيل-

আয়াতসমূহের অনুবাদ:

“আলিফ-লাম-মীম। আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো সত্য মাবুদ নেই; তিনি চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী। তিনি আপনার ওপর সত্যসহ কিতাব নাজিল করেছেন, যা তার আগের কিতাবগুলোর সত্যায়নকারী; আর তিনি নাজিল করেছেন তাওরাত ও ইঞ্জিল।”

সংক্ষিপ্ত তাফসির:

সুরা আলে ইমরানের এই আয়াতগুলোতে তাওহিদের মহান ঘোষণা রয়েছে। নাজরানের খ্রিষ্টান প্রতিনিধিদল যখন ঈসা (আ.) কে ইলাহ বলে দাবি করছিল, তখন এই আয়াতগুলো নাজিল হয়। আল্লাহ স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে তিনি একাই চিরঞ্জীব ও চিরস্থায়ী।

( أ ) لم قال الله تعالى: نزل الكتاب وأنزل التوراة والإنجيل؟

[ক. কুরআনের ক্ষেত্রে نزل এবং তাওরাত ও ইনজিলের ক্ষেত্রে أنزل বলার কারণ কী?]

نزل এবং أنزل বলার কারণ:
আরবি ব্যাকরণে ‘نَزَّلَ’ (নাযযালা – তাফয়িল ওযন) শব্দটি সাধারণত ধীরে ধীরে, পর্যায়ক্রমে এবং অল্প অল্প করে কোনো কিছু অবতীর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। পবিত্র কুরআন একবারে নাজিল হয়নি, বরং প্রয়োজন অনুযায়ী দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে খণ্ড খণ্ড আকারে নাজিল হয়েছে। তাই কুরআনের ক্ষেত্রে ‘نَزَّلَ’ ব্যবহৃত হয়েছে।
অন্যদিকে, ‘أَنْزَلَ’ (আনযালা – ইফয়িল ওযন) শব্দটি দ্বারা কোনো কিছু একবারে সম্পূর্ণ অবতীর্ণ হওয়াকে বোঝায়। তাওরাত ও ইনজিল কিতাবগুলো হযরত মুসা (আ.) এবং ঈসা (আ.)-এর ওপর একেবারে পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ হিসেবে নাজিল হয়েছিল। তাই এগুলোর ক্ষেত্রে ‘أَنْزَلَ’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এটি কুরআনের এক অসাধারণ ভাষাগত মুজিযা।

( ب ) ما معنى الاسم الاعظم؟ وما هو؟ فصل-

[খ. الاسم الأعظم এর অর্থ কী এবং উহা কী? বিস্তারিত লেখ।]

الاسم الأعظم (ইসমে আজম) এর অর্থ:
ইসমে আজম অর্থ হলো ‘সর্বশ্রেষ্ঠ নাম’। ইসলামি আকিদা অনুযায়ী, এটি আল্লাহ তাআলার এমন একটি বিশেষ ও সুমহান নাম, যেই উসিলা দিয়ে দোয়া করলে আল্লাহ অবশ্যই সেই দোয়া কবুল করেন এবং কোনো কিছু চাইলে তা দান করেন।

ইসমে আজম কোনটি:
ইসমে আজম নির্দিষ্টভাবে কোনটি, তা নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। প্রধান মতামতগুলো হলো:
১. অনেক মুফাসসিরের মতে, স্বয়ং “আল্লাহ” (الله) শব্দটিই ইসমে আজম, কারণ এটি আল্লাহর সত্তাগত নাম।
২. আয়াতুল কুরসি এবং সূরা আল-ইমরানের শুরুতে থাকা “আল-হাইয়্যুল কাইয়্যুম” (الحي القيوم) ইসমে আজম হওয়ার পক্ষে অনেক হাদিস রয়েছে।
৩. কারও মতে “আর-রহমান আর-রহিম” (الرحمن الرحيم) হলো ইসমে আজম।
৪. কেউ কেউ বলেছেন, আল্লাহ তাআলা লাইলাতুল কদরের মতো ইসমে আজমকেও তাঁর ৯৯টি নামের মধ্যে গোপন রেখেছেন, যাতে বান্দারা সবগুলো নামের জিকির ও দোয়া করে।

٥- قال تعالى: زين للناس حب الشهوات من النساء والبنين والقناطير المقنطرة من الذهب والفضة والخيل المسومة والانعام والحرث، ذالك متاع الحياة الدنيا والله عنده حسن المأب-

আয়াতসমূহের অনুবাদ:

“মানুষের জন্য সুশোভিত করা হয়েছে নারী, সন্তান-সন্ততি, রাশি রাশি সোনা-রুপা, চিহ্নিত ঘোড়া, গবাদি পশু ও খেত-খামারের প্রতি আসক্তি। এসবই পার্থিব জীবনের ভোগ-সামগ্রী; আর আল্লাহর কাছেই রয়েছে উত্তম প্রত্যাবর্তনস্থল।”

সংক্ষিপ্ত তাফসির:

এই আয়াতে দুনিয়ার মোহ ও ক্ষণস্থায়ী সম্পদের প্রতি মানুষের স্বাভাবিক দুর্বলতার কথা বলা হয়েছে। নারী, সন্তান, সম্পদ ও পশু—এগুলো মানুষের বেঁচে থাকার মাধ্যম হলেও, এগুলোই শেষ লক্ষ্য নয়। এগুলো দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী পরীক্ষার বস্তু।

( أ ) بين سبب نزول الآية – زين للناس حب الشهوات من النساء-

[ক. زين للناس حب الشهوات من النساء আয়াতের শানে নুযুল বর্ণনা কর।]

শানে নুযুল (অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট):
ইহুদি ও মুনাফিকরা পার্থিব ধন-সম্পদ, নারী এবং দুনিয়ার আরাম-আয়েশের প্রতি অত্যন্ত লোভী ও আসক্ত ছিল। তারা মুসলমানদের দারিদ্র্য দেখে উপহাস করত এবং নিজেদের ধন-সম্পদ নিয়ে গর্ব করত। তাদের এই ভুল ধারণা খণ্ডন করার জন্য আল্লাহ তাআলা এই আয়াত নাজিল করেন। এখানে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, দুনিয়ার এসব বস্তু মানুষের পরীক্ষার জন্য সুশোভিত করা হয়েছে। এগুলো অস্থায়ী ভোগ্যবস্তু মাত্র। মুমিনদের এসবে মত্ত না হয়ে আল্লাহর কাছে থাকা চিরস্থায়ী জান্নাতের উত্তম পুরস্কারের (حسن المأب) প্রতি আগ্রহী হওয়া উচিত।

( ب ) ما المراد بالقناطير المقنطرة؟

[খ. القناطير المقنطرة দ্বারা উদ্দেশ্য কী?]

القناطير المقنطرة (আল-কানাতীর আল-মুকান্তারাহ) দ্বারা উদ্দেশ্য:
‘কানাতীর’ হলো ‘ক্বিনতার’ (قنطار)-এর বহুবচন, যার অর্থ বিপুল পরিমাণ বা স্তূপীকৃত ধন-সম্পদ। আর ‘মুকান্তারাহ’ শব্দটি একে আরও জোরদার করেছে। এর সম্মিলিত অর্থ হলো স্তূপীকৃত ও অঢেল ধন-সম্পদ বা সোনা-দানার ভাণ্ডার। দুনিয়ালোভী মানুষেরা সোনা-রুপা জমিয়ে পাহাড় প্রমাণ করতে চায়। এই আয়াতাংশে মানুষের সম্পদের প্রতি সেই অসীম ও অন্ধ লালসাকেই উদ্দেশ্য করা হয়েছে।

٦- قال تعالى: يايها الناس اتقوا ربكم الذى خلقكم من نفس واحدة وخلق منها زوجها وبث منهما رجالا كثيرا ونساء، واتقوا الله الذى تساءلون به والارحام، ان الله كان عليكم رقيبا-

আয়াতসমূহের অনুবাদ:

“হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকেই তার সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন; আর তাদের উভয় থেকে বহু নর-নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন। আর আল্লাহকে ভয় করো, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের কাছে সাহায্য চাও…”

সংক্ষিপ্ত তাফসির:

সুরা নিসার প্রথম আয়াতে মানবতার ঐক্য এবং ভ্রাতৃত্ববোধের মূল ভিত্তি বর্ণনা করা হয়েছে। সমগ্র মানবজাতি একজন পিতা (আদম) ও মাতা (হাওয়া) থেকে সৃষ্টি হয়েছে। তাই বর্ণ বা গোত্রের অহংকার করা উচিত নয়। পাশাপাশি এই আয়াতে তাকওয়া এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

( أ ) اذكر وجه التسمية لسورة النساء-

[ক. سورة النساء এর নামকরণের কারণ উল্লেখ কর।]

সূরা নিসা নামকরণের কারণ:
‘নিসা’ (النساء) শব্দের অর্থ হলো নারী। এই সূরায় নারী সমাজের অধিকার, তাদের সামাজিক মর্যাদা, বিবাহ, তালাক, মোহরানা, উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারীর অংশ এবং এতিম নারীদের রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত বিধিবিধান অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। কুরআনের অন্য কোনো সূরায় নারীদের বিষয়ে এত ব্যাপক আলোচনা হয়নি। নারীদের অধিকার ও বিধিবিধানের এই আধিক্যের কারণেই এই সূরার নামকরণ করা হয়েছে ‘সূরা আন-নিসা’ বা নারী বিষয়ক সূরা।

( ب ) ما هو محل الإعراب بقوله تعالى “والأرحام”؟

[খ. والأرحام এর মহলে ইরাব কী?]

والأرحام (ওয়াল-আরহাম) এর মহলে ইরাব:
এই শব্দটির ইরাব নিয়ে ক্বারিদের মাঝে দুটি প্রসিদ্ধ মত রয়েছে:
১. মনসুব বা যবর বিশিষ্ট (وَالْأَرْحَامَ): অধিকাংশ ক্বারির ক্বিরাআত অনুযায়ী এটি ‘মনসুব’। এ অবস্থায় এটি পূর্ববর্তী ‘আল্লাহ’ (اللهَ) শব্দের ওপর আত্বফ (সংযুক্ত) হয়েছে। অর্থাৎ “তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করাকে ভয় কর।”
২. মাজরুর বা যের বিশিষ্ট (وَالْأَرْحَامِ): ইমাম হামযাহ (রহ.) এর ক্বিরাআত অনুযায়ী এটি ‘মাজরুর’। এ অবস্থায় এটি পূর্ববর্তী تَسَاءَلُونَ بِهِ এর মধ্যে থাকা مجرور ضمیر (সর্বনাম ‘হি’) এর ওপর আত্বফ হয়েছে। অর্থাৎ “তোমরা যাঁর (আল্লাহর) দোহাই দিয়ে এবং আত্মীয়তার সম্পর্কের দোহাই দিয়ে একে অপরের কাছে সাহায্য চেয়ে থাক।”

٧- والتى يأتين الفاحشة من نسائكم فاستشهدوا عليهن اربعة منكم، فان شهدوا فامسكوهن فى البيوت حتى يتوفهن الموت او يجعل الله لهن سبيلًا-

[আয়াতগুলোর তাফসির লিখে উহার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দাও]

আয়াতসমূহের তাফসির বা অনুবাদ:
“তোমাদের নারীদের মধ্যে যারা ব্যভিচারে লিপ্ত হয়, তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের মধ্য থেকে চারজন সাক্ষী তলব কর। অতঃপর যদি তারা সাক্ষ্য দেয়, তবে ওই নারীদের ঘরে অবরুদ্ধ করে রাখ, যতক্ষণ না মৃত্যু তাদের তুলে নেয় অথবা আল্লাহ তাদের জন্য অন্য কোনো পথ (শাস্তির বিধান) বের করে দেন।”

( أ ) ما معنى الفاحشة؟ وما المراد بالفاحشة هنا؟

[ক. فاحشة এর অর্থ কী? এখানে فاحشة দ্বারা উদ্দেশ্য কী?]

فاحشة (ফাহিশাহ) এর অর্থ ও উদ্দেশ্য:
ফাহিশাহ শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো প্রকাশ্য অশ্লীলতা, নির্লজ্জ কাজ বা চরম খারাপ কাজ।
তবে এই আয়াতে ‘ফাহিশাহ’ দ্বারা বিশেষভাবে যিনা বা ব্যভিচার-কে উদ্দেশ্য করা হয়েছে। যেসব নারী ব্যভিচারের মতো মারাত্মক অশ্লীল কাজে লিপ্ত হয়, তাদের শাস্তির বিধান সম্পর্কেই এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছিল।

( ب ) ما الحكمة في اربعة شهداء؟ وما هى الشروط فى شاهدى الزنا؟

[খ. সাক্ষী চারজন হওয়ার হেকমত কী? যিনার সাক্ষীদের শর্তসমূহ কী কী?]

সাক্ষী চারজন হওয়ার হেকমত (প্রজ্ঞা):
ইসলামে সাধারণত প্রমাণ প্রমাণের জন্য দুজন পুরুষ সাক্ষীই যথেষ্ট। কিন্তু যিনা বা ব্যভিচারের ক্ষেত্রে চারজন সাক্ষী বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর হেকমত হলো মানুষের সম্মান ও মর্যাদার সুরক্ষা করা। যিনার অভিযোগ অত্যন্ত মারাত্মক, যা একটি পরিবারকে ধ্বংস করে দিতে পারে। কেউ যেন সহজে এবং মিথ্যা অপবাদ (কযফ) দিয়ে মানুষের সম্মানহানি করতে না পারে, সেজন্য চারজন চাক্ষুষ সাক্ষীর কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।

যিনার সাক্ষীদের শর্তসমূহ:
চারজন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য কিছু কঠিন শর্ত রয়েছে:
১. সাক্ষীদের অবশ্যই স্বাধীন, প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন এবং মুসলিম পুরুষ হতে হবে।
২. তাদের ন্যায়পরায়ণ (আদেল) হতে হবে, অর্থাৎ তারা ফাসেক বা প্রকাশ্য পাপী হতে পারবে না।
৩. চারজন সাক্ষীকেই চাক্ষুষ দেখতে হবে। অর্থাৎ ব্যভিচারের চূড়ান্ত কাজ সংঘটিত হওয়াকে এমনভাবে স্পষ্ট দেখতে হবে, যেমন সুরমাদানিতে সুরমা লাগানোর শলাকা প্রবেশ করে। সামান্য সন্দেহ থাকলে সাক্ষ্য বাতিল হয়ে যাবে এবং উল্টো সাক্ষীদের বেত্রাঘাত করা হবে।

۸- قال تعالى: يايها الذين أمنوا كونوا قوامين لله شهداء بالقسط ولا يجرمنكم شنأن قوم على ألّا تعدلوا، اعدلوا هو اقرب للتقوى واتقوا الله ان الله خبير بما تعملون-

আয়াতসমূহের অনুবাদ:

“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায়বিচারে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাকবে এবং সাক্ষ্যদানে ইনসাফ করবে। কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদেরকে যেন কখনো সুবিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে। সুবিচার করো, এটাই তাকওয়ার অধিকতর নিকটবর্তী। আর আল্লাহকে ভয় করো…”

সংক্ষিপ্ত তাফসির:

সুরা মায়িদার এই আয়াতে ইসলামি বিচারব্যবস্থার চরম উৎকর্ষের কথা বলা হয়েছে। ইসলাম নির্দেশ দেয় যে, শত্রুর সাথেও ইনসাফ করতে হবে। শত্রুতার বশবর্তী হয়ে কারো প্রতি জুলুম করা বা মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম।

( أ ) ما المراد بقوله تعالى: كونوا قوّامين لله شهداء بالقسط؟

[ক. كونوا قوامين لله شهداء بالقسط এর মর্মার্থ কী?]

كونوا قوامين لله شهداء بالقسط এর মর্মার্থ:
এর অর্থ হলো, “তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে দৃঢ়ভাবে ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে এবং ইনসাফপূর্ণ সাক্ষ্যদাতা হবে।”
এর মর্মার্থ হলো, একজন মুমিন ব্যক্তি সর্বদা এবং সকল পরিস্থিতিতে হকের বা সত্যের ওপর অটল থাকবে, তা কেবল আল্লাহকে রাজি করার জন্যই হবে, দুনিয়ার কোনো স্বার্থে নয়। যখন সাক্ষ্য দেওয়ার প্রয়োজন হবে, তখন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে সত্য সাক্ষ্য দিতে হবে। এমনকি সেই সাক্ষ্য যদি নিজের, পিতা-মাতার, আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধেও যায় অথবা চরম শত্রুর পক্ষেও যায়, তবুও বিন্দুমাত্র অবিচার বা পক্ষপাতিত্ব করা যাবে না।

( ب ) ما معنى التقوى والعدل؟ بين-

[খ. عدل ও تقوى এর অর্থ কী? বর্ণনা কর।]

عدل (আদল) এর অর্থ:
আদল অর্থ সুবিচার, ন্যায়বিচার ও ইনসাফ। শরিয়তের পরিভাষায়, কারও অধিকার ক্ষুণ্ন না করে প্রতিটি জিনিসকে তার সঠিক ও উপযুক্ত স্থানে রাখা এবং শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সবার প্রতি সমান আচরণ করাকে আদল বলে।
تقوى (তাকওয়া) এর অর্থ:
তাকওয়া অর্থ বেঁচে থাকা, ভয় করা বা পরহেজগারি। শরিয়তের পরিভাষায়, আল্লাহ তাআলার ভয়ে যাবতীয় গুনাহ ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে নিজেকে দূরে রাখা এবং আল্লাহর আদেশসমূহ যথাযথভাবে পালন করে নিজের আত্মাকে রক্ষা করাকে তাকওয়া বলে। আয়াতে বলা হয়েছে, সুবিচার করাই হলো তাকওয়ার সবচেয়ে নিকটবর্তী পথ।

مجموعة ( ب ) [খ-বিভাগ]

[যে কোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও]

۹- ما معنى التفسير بدون السند؟ ثم بين نشأته وتطوره مفصلًا-

[ ৯। التفسير بدون السند এর অর্থ কী? অতঃপর উহার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ বর্ণনা কর। ]

التفسير بدون السند (তফসির বিদূনিস সানাদ) এর অর্থ:
‘তাফসির বিদূনিস সানাদ’ বলতে এমন তাফসিরকে বোঝায়, যা সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সা.), সাহাবা বা তাবেয়িনদের বর্ণিত ধারাবাহিক সনদ বা বর্ণনা-সূত্রের ওপর নির্ভর করে রচিত হয়নি; বরং মুফাসসির নিজের ইজতিহাদ, গভীর জ্ঞান, আরবি ভাষার ওপর পাণ্ডিত্য এবং যুক্তির ওপর ভিত্তি করে আয়াতের ব্যাখ্যা করেছেন। একে ‘তাফসির বির-রায়’ (التفسير بالرأي) বা যুক্তিনির্ভর তাফসিরও বলা হয়।

উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ:
উৎপত্তি: ইসলামের প্রাথমিক যুগে (রাসূল ও সাহাবাদের যুগে) তাফসির সম্পূর্ণরূপে ‘তাফসির বিল-মাছুর’ বা সনদনির্ভর ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে যখন ইসলামি সাম্রাজ্য বিস্তার লাভ করে, নতুন নতুন দার্শনিক চিন্তা, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এবং নতুন সমস্যার উদ্ভব ঘটে, তখন শুধু পূর্ববর্তী বর্ণিত তাফসির দিয়ে সব নতুন প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। তখন যুগের চাহিদামেটাতে আলিম ও মুজতাহিদগণ শরিয়তের মূল কাঠামোর মধ্যে থেকে নিজেদের জ্ঞান ও গবেষণার মাধ্যমে কুরআনের ব্যাখ্যা শুরু করেন। এভাবেই ‘তাফসির বিদূনিস সানাদ’-এর উৎপত্তি ঘটে।

ক্রমবিকাশ: আব্বাসীয় যুগে গ্রিক দর্শনের অনুবাদের ফলে মুতাজিলা, শিয়া ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটে। তারা নিজেদের ভ্রান্ত মতবাদ প্রমাণের জন্য যুক্তি দিয়ে কুরআনের মনগড়া ব্যাখ্যা করতে শুরু করে (যাকে مذموم বা নিন্দনীয় তাফসির বির-রায় বলা হয়)। এর বিপরীতে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আলেমগণ সঠিক আরবি ব্যাকরণ, শরিয়তের মূলনীতি এবং বিশুদ্ধ আকিদার সমন্বয়ে যুক্তিনির্ভর তাফসির রচনা শুরু করেন (যা ممدوح বা প্রশংসনীয় তাফসির বির-রায়)।
পরবর্তীতে এই ধারাটি ব্যাপকভাবে বিকশিত হয় এবং তাফসিরুল কাবির (ইমাম রাজি), তাফসির আল-বায়যাবি, তাফসিরুল জালালাইন এবং তাফসির আল-কাশশাফ (মুতাজিলা আকিদাভিত্তিক হলেও ভাষাগত কারণে সমাদৃত)-এর মতো কালজয়ী তাফসির গ্রন্থ রচিত হয়। আধুনিক যুগের প্রায় সব তাফসিরই মূলত এই ধারার অন্তর্ভুক্ত।

۱۰- اذكر نبذة من حياة صاحب الكشاف ثم قارن بين تفسير الكشاف وتفسير البيضاوى مختصرًا-

[ ১০। تفسير الكشاف গ্রন্থকারের জীবনী লেখ। অতঃপর الكشاف ও تفسير البيضاوى এর মধ্যে সংক্ষেপে তুলনা কর। ]

তাফসির আল-কাশশাফ গ্রন্থকারের জীবনী:
তাফসির আল-কাশশাফ-এর রচয়িতা হলেন প্রখ্যাত ভাষাবিদ ও মুফাসসির আল্লামা মাহমুদ ইবনে উমর আল-যামাখশারী (جار الله الزمخشري)। তিনি ৪৬৭ হিজরিতে বর্তমান উজবেকিস্তানের খাওয়ারেজম অঞ্চলের ‘যামাখশার’ নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন।
তিনি আরবি ভাষা, ব্যাকরণ (নাহু-সরফ), ইলমুল বালালাহ এবং সাহিত্যে অসাধারণ পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন। মক্কায় দীর্ঘকাল অবস্থান করায় তাকে ‘জারুল্লাহ’ (আল্লাহর প্রতিবেশী) উপাধি দেওয়া হয়। আকিদাগতভাবে তিনি কট্টর ‘মুতাজিলা’ মতবাদের অনুসারী ছিলেন। তাঁর রচিত ‘আল-কাশশাফ’ তাফসির জগতের এক অমূল্য রত্ন। ৫৩৮ হিজরিতে তিনি ইন্তেকাল করেন।

আল-কাশশাফ ও তাফসির আল-বায়যাবি এর মধ্যে সংক্ষেপে তুলনা:
১. আকিদাগত পার্থক্য: আল-কাশশাফ তাফসিরটি সম্পূর্ণ মুতাজিলা আকিদার ওপর ভিত্তি করে রচিত। যামাখশারী তাঁর এই তাফনিরে মুতাজিলাদের ভ্রান্ত আকিদা (যেমন- কুরআন সৃষ্ট, পরকালে আল্লাহকে দেখা যাবে না) অত্যন্ত সুকৌশলে প্রমাণের চেষ্টা করেছেন। অন্যদিকে ‘তাফসির আল-বায়যাবি’ (আনোয়ারুত তানজিল) হলো আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের বিশুদ্ধ আশআরি আকিদাভিত্তিক তাফসির। ইমাম বায়যাবি যামাখশারীর অনেক ভ্রান্ত যুক্তির চমৎকার খণ্ডন করেছেন।
২. ভাষাগত বিশ্লেষণ: আরবি সাহিত্য, অলংকার শাস্ত্র (বালালাহ) এবং ব্যাকরণের গভীরতা উপস্থাপনে আল-কাশশাফ অনন্য এবং শ্রেষ্ঠ। ইমাম বায়যাবি মূলত আল-কাশশাফ থেকে এই ভাষাগত ও অলংকারিক সৌন্দর্যের সারসংক্ষেপ গ্রহণ করেছেন, তবে ক্ষতিকর মুতাজিলা আকিদাগুলো ছেঁটে ফেলেছেন।
৩. গ্রহণযোগ্যতা: মুতাজিলা আকিদার কারণে আল-কাশশাফ সাধারণ আলেমদের জন্য পাঠ করা ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হয়। কিন্তু তাফসির আল-বায়যাবি সুন্নি আলেম সমাজের কাছে অত্যন্ত সমাদৃত ও নিরাপদ হওয়ায় এটি বিশ্বের বিভিন্ন ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যপুস্তক হিসেবে ব্যাপকভাবে পড়ানো হয়।

Follow Our Facebook Page
দ্রুত নতুন বই পেতে যুক্ত থাকুন
Follow Now