Ulumul Quran (উলূমুল কুরআন) 201205 – Fazil Hons Al Quran 2nd Year 2022 QnA

Join Our Telegram Channel
দ্রুত নতুন বই পেতে যুক্ত থাকুন
Join Now
admin
ulumul quran 201205 fazil hons al quran 2nd year 2022 qna
Join Our WhatsApp Channel
দ্রুত নতুন বই পেতে যুক্ত থাকুন
Join Now
📋 সূচিপত্র (Table of Contents)

Ulumul Quran (Code: 201205) – ২০২২ প্রশ্ন ও উত্তর

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২২ এর আল-কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের علوم القرآن (উলূমুল কুরআন) বিষয়ের সম্পূর্ণ উত্তরমালা।

বিঃদ্রঃ পরীক্ষার্থীদের আগামী পরীক্ষার সর্বোচ্চ প্রস্তুতির সুবিধার্থে মূল প্রশ্নপত্রের ক-বিভাগ এবং খ-বিভাগের সবগুলো প্রশ্নের ১০০% নির্ভুল উত্তর বিস্তারিতভাবে নিচে দেওয়া হলো।

مجموعة (الف) – ক-বিভাগ [যেকোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও]

١- عرف أسباب النزول- ثم بين فوائد معرفتها مع بيان الصيغ المشهورة فيها-

[أسباب النزول এর পরিচয় দাও। أسباب النزول সম্পর্কে জানার উপকারিতা উল্লেখপূর্বক এ বিষয়ে বর্ণিত প্রসিদ্ধ صيغة গুলোর বর্ণনা দাও।]

১. أسباب النزول এর পরিচয়:
‘আসবাবুন নুযূল’ (أسباب النزول) একটি যৌগিক শব্দ। ‘আসবাব’ হলো ‘সবব’ (سبب) এর বহুবচন, যার অর্থ কারণ বা প্রেক্ষাপট। আর ‘নুযূল’ (نزول) অর্থ অবতীর্ণ হওয়া।
পারিভাষিক অর্থে, রাসুলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) এর যুগে সংঘটিত যেসব ঘটনা, প্রেক্ষাপট বা জিজ্ঞাসার প্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা সরাসরি পবিত্র কুরআনের কোনো আয়াত বা সূরা অবতীর্ণ করেছেন, সেই ঘটনা বা প্রেক্ষাপটকেই ‘আসবাবুন নুযূল’ বা শানে নুযূল বলা হয়।

২. أسباب النزول জানার উপকারিতা (فوائد معرفتها):
কুরআনুল কারিমের সঠিক তাফসির বোঝার জন্য আসবাবুন নুযূল জানা অপরিহার্য। এর প্রধান উপকারিতাগুলো হলো:
* আয়াতের সঠিক অর্থ অনুধাবন: শানে নুযূল ছাড়া অনেক আয়াতের প্রকৃত অর্থ ও উদ্দেশ্য বোঝা অসম্ভব। যেমন, সাফা-মারওয়ার সাঈ করার বিষয়ে আয়াতটির প্রেক্ষাপট না জানলে এর সঠিক হুকুম বোঝা যায় না।
* আইন বা হুকুমের রহস্য উদঘাটন: আল্লাহ তায়ালা কেন নির্দিষ্ট একটি হুকুম অবতীর্ণ করেছেন (حكمة التشريع), তা শানে নুযূলের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে জানা যায়।
* সন্দেহ দূরীকরণ: আয়াতের বাহ্যিক অর্থ অনেক সময় বিভ্রান্তির সৃষ্টি করতে পারে, যা শানে নুযূল জানলে দূর হয়ে যায়।
* নির্ধারণ: কোনো আয়াত নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা ঘটনার জন্য অবতীর্ণ হয়েছে নাকি তা সর্বজনীন (عام বা خاص), তা নির্ধারণ করা যায়।

৩. أسباب النزول বর্ণনার প্রসিদ্ধ শব্দসমূহ (الصيغ المشهورة):
সাহাবি ও তাবেয়িগণ যখন কোনো আয়াতের শানে নুযূল বর্ণনা করতেন, তখন তাঁরা নির্দিষ্ট কিছু শব্দ বা বাক্যবিন্যাস (صيغة) ব্যবহার করতেন। এগুলো প্রধানত দুই প্রকার:
ক. অকাট্য বা সুনির্দিষ্ট শব্দ (الصيغة الصريحة): যখন সাহাবি স্পষ্টভাবে বলেন- “سبب نزول هذه الآية كذا” (এই আয়াতের শানে নুযূল হলো এই ঘটনা) অথবা “سئل رسول الله صلى الله عليه وسلم عن كذا فنزلت الآية” (রাসুল সা. কে অমুক বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তখন এই আয়াত নাযিল হয়)। এসব শব্দ দ্বারা নিশ্চিত হওয়া যায় যে এটাই উক্ত আয়াতের শানে নুযূল।
খ. সম্ভাব্য শব্দ (الصيغة المحتملة): যখন সাহাবি বলেন- “نزلت هذه الآية في كذا” (এই আয়াতটি অমুক বিষয়ে নাযিল হয়েছে) অথবা “أحسب هذه الآية نزلت في كذا” (আমি ধারণা করি আয়াতটি এই ব্যাপারে নাযিল হয়েছে)। এর দ্বারা অনেক সময় শানে নুযূল না বুঝিয়ে আয়াতের সাধারণ বিধান (تفسير) বা হুকুমের প্রয়োগক্ষেত্র বোঝানো হয়।

٢- ما المراد بنزول القرآن على سبعة أحرف؟ وما الحكمة فيه؟ بين بالإيضاح-

[نزول القرآن على سبعة أحرف এর মর্মার্থ কী? এর হিকমাত বা গূঢ়রহস্য কী? বিশদভাবে বর্ণনা কর।]

১. سبعة أحرف (সাত হরফ) এর মর্মার্থ:
হাদিসে মুতাওয়াতির দ্বারা প্রমাণিত যে, রাসুল (صلى الله عليه وسلم) বলেছেন, “কুরআন সাতটি হরফে নাযিল হয়েছে” (أنزل القرآن على سبعة أحرف)। ‘হরফ’ শব্দের অর্থ হলো ভাষা, পঠনপদ্ধতি বা রীতি।
‘সাত হরফ’ বলতে ঠিক কী বোঝায়, এ নিয়ে ওলামায়ে কেরামের মাঝে ব্যাপক মতভেদ রয়েছে (প্রায় ৪০টি মত)। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও প্রসিদ্ধ মত হলো ইমাম ইবনে জারির তাবারী, ইবনুল কায়্যিম এবং অধিকাংশ মুহাক্কিক আলেমের মত। তাদের মতে, ‘সাত হরফ’ অর্থ হলো তৎকালীন আরবের প্রসিদ্ধ সাতটি গোত্রের ভাষা বা পঠনপদ্ধতি (لغات العرب)। অর্থাৎ, কুরআনুল কারিমের একই শব্দকে আরবের বিভিন্ন গোত্র তাদের নিজ নিজ উচ্চারণের ঢং, সমার্থক শব্দ (مرادف) এবং প্রকাশভঙ্গির ভিন্নতায় পড়তে পারত, যাতে অর্থের কোনো বিকৃতি ঘটত না। এই সাতটি গোত্র হলো: কুরাইশ, হুজাইল, সাকিফ, হাওয়াযিন, কিনানা, তামিম এবং ইয়েমেন।

২. سبعة أحرف এ কুরআন নাযিলের হিকমাত (وما الحكمة فيه):
কুরআনকে সাতটি ভিন্ন পঠনপদ্ধতি বা হরফে অবতীর্ণ করার পেছনে মহান আল্লাহর বিশেষ প্রজ্ঞা ও গূঢ় রহস্য নিহিত ছিল:
* উম্মতের জন্য সহজীকরণ (تيسيراً للأمة): আরবের বিভিন্ন গোত্রের উচ্চারণভঙ্গি ও ভাষা-রীতির মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য ছিল। কোনো বৃদ্ধ, শিশু বা নিরক্ষর ব্যক্তির পক্ষে হঠাৎ করে নিজ গোত্রের উচ্চারণ বাদ দিয়ে অন্য গোত্রের উচ্চারণে (যেমন শুধু কুরাইশদের ভাষায়) কুরআন তেলাওয়াত করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ছিল। তাই তাদের সুবিধার্থে আল্লাহ সাত হরফে পড়ার অনুমতি দেন।
* কুরআনের অলৌকিকত্ব প্রকাশ (إظهار إعجاز القرآن): এতগুলো ভিন্ন ভিন্ন পঠনপদ্ধতি থাকা সত্ত্বেও কুরআনের মূল অর্থ ও আহকামের মধ্যে কোনো বৈপরীত্য বা সাংঘর্ষিকতা দেখা যায়নি। এটি কুরআনের এক অনন্য মুজিযা।
* অর্থের ব্যাপকতা বৃদ্ধি: বিভিন্ন কিরাতে বা হরফে পড়ার কারণে অনেক সময় একই আয়াতের একাধিক শরয়ি অর্থ পাওয়া যায়, যা থেকে ফকিহগণ বিভিন্ন মাসআলা استنباط (উদ্ভাবন) করতে পারেন। ফলে ইসলামী আইনের পরিধি বিস্তৃত হয়েছে।
* উম্মতের ঐক্য পরীক্ষা: বিভিন্ন পঠনপদ্ধতি থাকার পরও মুসলমানরা এক আল্লাহর কিতাবকে কীভাবে গ্রহণ করে এবং এ নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিভেদে লিপ্ত না হয়ে কীভাবে ঐক্যবদ্ধ থাকে, এটি ছিল উম্মতের জন্য এক মহান পরীক্ষা।

٣- تحدث عن المنطوق والمفهوم- وكم قسما لهما؟ وما آراء العلماء فى الاحتجاج بالمفهوم؟ بين مفصلا-

[المنطوق ও المفهوم সম্পর্কে আলোচনা কর। منطوق ও مفهوم কত প্রকার? مفهوم কে দলিল হিসেবে গ্রহণে ওলামাদের মতামত কী? বিস্তারিত বর্ণনা কর।]

১. المنطوق (মানতুক) ও المفهوم (মাফহুম) এর পরিচয়:
উসুলুল ফিকহের পরিভাষায়, কোনো আয়াত বা হাদিস থেকে অর্থ গ্রহণের দুটি প্রধান পদ্ধতি হলো মানতুক ও মাফহুম।
* المنطوق (মানতুক): যা শব্দের বাহ্যিক উচ্চারণ বা ভাষ্য থেকেই সরাসরি বোঝা যায়। অর্থাৎ, শব্দটি যে অর্থের জন্য গঠন করা হয়েছে, সরাসরি সেই অর্থই গ্রহণ করা। যেমন: “পিতামাতাকে উফ শব্দ বলো না”। এখানে সরাসরি ‘উফ’ বলতে নিষেধ করা হয়েছে।
* المفهوم (মাফহুম): যা শব্দের বাহ্যিক উচ্চারণে সরাসরি বলা হয়নি, কিন্তু মানতুক (উচ্চারিত শব্দ) এর অন্তর্নিহিত ভাব, ইঙ্গিত বা বিপরীত অর্থ থেকে যা বুঝে নেওয়া হয়। যেমন: “উফ বলো না” এর মাফহুম হলো- পিতামাতাকে প্রহার করা বা গালি দেওয়া আরও বেশি হারাম।

২. প্রকারভেদ (أقسامهما):
* المنطوق এর প্রকারভেদ: মানতুক প্রধানত ২ প্রকার:
ক. النَّص (নস): যা দ্বারা একটি মাত্র সুনির্দিষ্ট অর্থই বোঝায়, অন্য কোনো অর্থের সম্ভাবনা থাকে না।
খ. الظَّاهِر (যাহির): যা দ্বারা একাধিক অর্থের সম্ভাবনা থাকলেও একটি অর্থ বেশি প্রবল ও স্পষ্ট হয়।
* المفهوم এর প্রকারভেদ: মাফহুম প্রধানত ২ প্রকার:
ক. مفهوم الموافقة (মাফহুমে মুওয়াফাকাহ): অনুক্ত বিধানটি যদি উচ্চারিত বিধানের (মানতুকের) হুকুমের অনুরূপ হয়। (যেমন উফ না বলা থেকে প্রহার না করার হুকুম)।
খ. مفهوم المخالفة (মাফহুমে মুখালাফাহ): অনুক্ত বিধানটি যদি উচ্চারিত বিধানের বিপরীত হয়। যেমন- “অবাধ্য ফাসিক কোনো সংবাদ আনলে যাচাই করো”। এর মাফহুমে মুখালাফাহ হলো- ন্যায়পরায়ণ (আদিল) ব্যক্তি সংবাদ আনলে তা যাচাই করার প্রয়োজন নেই।

৩. مفهوم কে দলিল হিসেবে গ্রহণে ওলামাদের মতামত (آراء العلماء في الاحتجاج بالمفهوم):
ক. مفهوم الموافقة এর ক্ষেত্রে: সকল ওলামায়ে কেরাম (হানাফি, শাফেয়ি, মালেকি, হাম্বলি) একমত যে, ‘মাফহুমে মুওয়াফাকাহ’ শরিয়তের একটি অকাট্য দলিল এবং এর ওপর আমল করা ওয়াজিব। হানাফিগণ একে ‘দালালাতুন নাস’ (دلالة النص) বলে থাকেন।
খ. مفهوم المخالفة এর ক্ষেত্রে: এ নিয়ে ইমামদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে:
* জুমহুর ওলামা (ইমাম শাফেয়ি, মালেক ও আহমাদ রহ.): তাদের মতে, যদি মানতুক এর বাক্যটি কোনো বিশেষ শর্ত, গুণ বা অবস্থার সাথে যুক্ত থাকে (দৃষ্টান্তস্বরূপ, ‘চরণশীল ছাগলের যাকাত আছে’), তবে তার বিপরীত অবস্থার ক্ষেত্রে (যেমন- ঘরে পালিত ছাগল) বিপরীত হুকুম (যাকাত নেই) সাব্যস্ত হবে। অর্থাৎ, তারা শর্তসাপেক্ষে ‘মাফহুমে মুখালাফাহ’ কে শরিয়তের দলিল হিসেবে গ্রহণ করেন।
* হানাফি মাযহাব (ইমাম আবু হানিফা রহ.): হানাফি উসুলিগণ ‘মাফহুমে মুখালাফাহ’ কে সরাসরি আইনি দলিল (হুজ্জাত) হিসেবে স্বীকার করেন না (বিশেষ করে কোরআন ও সুন্নাহর নসের ক্ষেত্রে)। তাদের মতে, শরিয়তের কোনো বিধান কেবল নীরবতা (সুকুত) থেকে প্রমাণ করা যায় না, বরং তা প্রমাণ করার জন্য অন্য কোনো নস বা কিয়াসের প্রয়োজন। তবে মানুষের দৈনন্দিন কথাবার্তা ও চুক্তির ক্ষেত্রে তারা এটি গ্রহণ করেন।

٤- ما الرسم العثمانى؟ هل يجب اتباع الرسم العثمانى فى كتابة القرآن الكريم؟ اكتب حكم كتابة القرآن بغير الرسم العثمانى مع بيان اختلاف العلماء فيه-

[الرسم العثمانى কী? কুরআনুল কারিম লেখার ক্ষেত্রে উসমানি লিপিকলা অনুসরণ কি ওয়াজিব? উসমানি লিপিকলা ব্যতীত কুরআন লেখার বিধান উলামাদের মতানৈক্যসহ আলোচনা কর।]

১. الرسم العثمانى (উসমানি লিপিকলা) কী:
‘রসম’ (رسم) অর্থ লেখা বা লিপি। ‘রসমুল উসমানি’ বলতে পবিত্র কুরআন লেখার সেই সুনির্দিষ্ট লিখনপদ্ধতি ও বানানরীতিকে বোঝায়, যা হজরত উসমান (রা.) এর খিলাফতকালে তাঁর নির্দেশে গঠিত সাহাবিদের একটি বিশেষ কমিটি (যার প্রধান ছিলেন যায়েদ বিন সাবিত রা.) দ্বারা প্রণীত হয়েছিল। এই বিশেষ লিখনপদ্ধতিতে কুরআনের এমন কিছু বানানরীতি (যেমন- কোথাও আলিফ বাদ দেওয়া, কোথাও ওয়াও বৃদ্ধি করা, কোথাও তা-মাবসুতা বা খোলা ‘ত’ লেখা) অনুসরণ করা হয়েছিল, যা সাধারণ আরবি ব্যাকরণ বা ইমলার (বানানরীতির) নিয়মের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন ছিল।

২. কুরআন লেখার ক্ষেত্রে উসমানি লিপিকলা অনুসরণ কি ওয়াজিব:
জুমহুর উলামায়ে কেরাম, মুফাসসিরিন এবং চার মাযহাবের শীর্ষস্থানীয় ফকিহদের ঐক্যমত (ইজমা) অনুযায়ী, পবিত্র কুরআনুল কারিম অনুলিপি বা ছাপানোর ক্ষেত্রে সর্বদাই ‘রসমুল উসমানি’ বা উসমানি লিপিকলা হুবহু অনুসরণ করা ওয়াজিব (বাধ্যতামূলক)। এর বাইরে গিয়ে আধুনিক আরবি বানানরীতি অনুযায়ী কুরআন লেখা সম্পূর্ণ অবৈধ। ইমাম মালেক (রহ.)-কে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, কেউ চাইলে কি আধুনিক বানান অনুযায়ী কুরআন লিখতে পারে? তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেছিলেন, “لا, إلا على الكتبة الأولى” (না, বরং প্রথম যুগের লিখনপদ্ধতিতেই লিখতে হবে)।

৩. উসমানি লিপিকলা ব্যতীত কুরআন লেখার বিধান নিয়ে মতানৈক্য (اختلاف العلماء):
* জুমহুর (অধিকাংশ) ওলামাদের মত: ইমাম মালেক, ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল এবং হানাফি ও শাফেয়ি মাযহাবের অধিকাংশ আলেমের মতে, ‘রসমুল উসমানি’ হলো তওকিফি (توقيفي), অর্থাৎ এটি রাসুল (সা.) এর নির্দেশিত এবং সাহাবাদের ইজমা দ্বারা সাব্যস্ত। তাই উসমানি রসমের বাইরে সাধারণ নিয়মে (الرسم الإملائي) কুরআন লেখা সম্পূর্ণরূপে হারাম বা নাজায়েজ। কারণ এতে কুরআনের শব্দ বা কিরাতে পরিবর্তন বা বিকৃতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
* ইমাম আবু বকর আল-বাকেল্লানি ও ইবনে খালদুন (রহ.) এর মত: তাঁদের মতে, উসমানি রসম কোনো ঐশী বা তওকিফি বিষয় নয়। এটি তৎকালীন সাহাবিদের একটি রীতিনীতি মাত্র। সুতরাং, মানুষের সুবিধার্থে এবং সহজে পড়ার জন্য যুগোপযোগী আধুনিক আরবি বানানরীতিতে (الرسم القياسي) কুরআন লেখা جائز (বৈধ)
* শাইখ ইযযুদ্দীন ইবনে আবদুস সালাম (রহ.) এর মত (সমন্বয়কারী মত): তিনি বলেন, কুরআন মুখস্থকারী ও আলেমদের জন্য উসমানি রসমেই কুরআন লেখা ও সংরক্ষণ করা ওয়াজিব। তবে সাধারণ মানুষ এবং নতুন শিক্ষার্থী যারা উসমানি রসমের জটিলতা বুঝতে অক্ষম, তাদের শিক্ষার সুবিধার্থে সাধারণ নিয়মে কুরআন লেখা বৈধ
ফয়সালা: আধুনিক যুগের বড় বড় ফতোয়া বোর্ড (যেমন- আল-আজহার এবং রাবেতা আল-আলম আল-ইসলামী) জুমহুর ওলামাদের মতকেই গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ, মূল মুসহাফ বা মুদ্রিত কুরআন অবশ্যই ‘রসমুল উসমানি’ অনুযায়ী হতে হবে, তবে পাঠ্যবই বা বোর্ডে বাচ্চাদের শেখানোর জন্য সাময়িকভাবে আধুনিক বানান ব্যবহার করা যেতে পারে।

٥- ما معنى القسم لغة واصطلاحا؟ كم نوعا للقسم وما صيغته؟ اذكر فوائد القسم فى القرآن الكريم-

[القسم এর শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ কী? قسم কত প্রকার এবং এর صيغة কী কী? কুরআনুল কারিমে قسم এর উপকারিতাসমূহ বর্ণনা কর।]

১. القسم (কসম) এর শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ:
* শাব্দিক অর্থ: القسم শব্দের অর্থ হলো শপথ করা, হলফ করা, কসম খাওয়া বা প্রতিজ্ঞা করা। এর সমার্থক শব্দ হলো আল-ইয়ামিন বা আল-হালাফ।
* পারিভাষিক অর্থ: উলূমুল কুরআনের পরিভাষায়, নিজের কথার সত্যতা ও দৃঢ়তা প্রমাণের জন্য আল্লাহ তায়ালার পবিত্র সত্তা, তাঁর কোনো গুণাবলি অথবা তাঁর কোনো মহান সৃষ্টির নাম উল্লেখ করে বাক্যকে শক্তিশালী করার প্রক্রিয়াকে القسم (কসম) বলা হয়।

২. القسم এর প্রকারভেদ (أنواع القسم):
কুরআনে ব্যবহৃত কসম প্রধানত ২ প্রকার:
* কসম যাহির (القسم الظاهر): যেখানে কসমের শব্দ (أقسم বা احلف) অথবা কসমের হরফ (واو, باء, تاء) সরাসরি বাক্যে উল্লেখ থাকে। যেমন: وَالْعَصْرِ (সময়ের কসম), لَا أُقْسِمُ بِيَوْمِ الْقِيَامَةِ।
* কসম মুযমার বা মুকাদ্দার (القسم المضمر বা المقدر): যেখানে কসমের শব্দ বা হরফ সরাসরি উল্লেখ থাকে না, কিন্তু বাক্যের অর্থ ও গঠনকাঠামো (যেমন লামে তাকিদ বা নুনে তাকিদ) প্রমাণ করে যে এখানে একটি কসম লুক্কায়িত আছে। যেমন: لَتُبْلَوُنَّ فِي أَمْوَالِكُمْ (অবশ্যই তোমাদের সম্পদ দ্বারা তোমাদের পরীক্ষা করা হবে- এখানে শুরুতে ‘والله’ কসম উহ্য আছে)।

৩. القسم এর সীগাহ বা শব্দাবলি (صيغته):
কসমের সীগাহ মূলত তিনটি অংশ নিয়ে গঠিত হয়:
* আদাতুল কসম (أداة القسم): কসমের হরফ, যেমন- ওয়াও (و), বা (ب) এবং তা (ت)।
* মুকসাম বিহি (المقسم به): যার নামে কসম খাওয়া হয়। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে নিজের সত্তার নামেও কসম করেছেন এবং নিজের মহান সৃষ্টি (সূর্য, চন্দ্র, রাত, দিন, ডুমুর, জলপাই ইত্যাদি) এর নামেও কসম করেছেন।
* মুকসাম আলাইহি (المقسم عليه): যে বিষয়টির সত্যতা প্রমাণের জন্য বা যে দাবির সপক্ষে কসম খাওয়া হয়, তাকে জাওয়াবুল কসমও বলা হয়।

৪. কুরআনুল কারিমে القسم এর উপকারিতা (فوائد القسم):
* তাকিদ বা দৃঢ়তা প্রদান: কসমের মূল উদ্দেশ্য হলো বক্তব্যের ওপর তাকিদ বা দৃঢ়তা আরোপ করা, যাতে শ্রোতার মনে সন্দেহ দূর হয়।
* মনোযোগ আকর্ষণ: কসম ব্যবহার করলে শ্রোতার মনোযোগ আকৃষ্ট হয় এবং সে বুঝতে পারে যে সামনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় বলা হচ্ছে।
* মুশরিকদের সন্দেহ নিরসন: আরবের কাফির ও মুশরিকরা পরকাল ও নবুওয়াতকে অস্বীকার করত, তাদের এই সন্দেহ দূর করতে আল্লাহ তায়ালা বারবার কসম খেয়ে সত্যতা প্রমাণ করেছেন।
* সৃষ্টির মহত্ত্ব প্রকাশ: আল্লাহ তায়ালা যখন সূর্য, চন্দ্র বা তিন-যাইতুনের কসম করেন, তখন এর মাধ্যমে তিনি তাঁর সৃষ্ট ঐ বস্তুগুলোর গুরুত্ব ও উপকারিতা মানুষের সামনে তুলে ধরেন।

٦- أذكر فوائد قصص القرآن الكريم وآثارها فى تقوية الإيمان وتهذيب الأخلاق-

[কুরআনুল কারিমে বর্ণিত কাহিনীসমূহের উপকারিতা এবং ঈমান সুদৃঢ়করণ ও নৈতিকতা গঠনে এর প্রভাব আলোচনা কর।]

কুরআনের কিসসা বা কাহিনীসমূহের উপকারিতা ও প্রভাব (فوائد قصص القرآن وآثارها):
পবিত্র কুরআনের এক-তৃতীয়াংশ জুড়ে রয়েছে পূর্ববর্তী নবি-রাসুল ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর কিসসা বা ঘটনাবলি। এগুলো নিছক কোনো গল্প বা রূপকথা নয়, বরং এগুলো হলো বাস্তব ইতিহাস ও মানবজাতির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষণীয় বিষয়। ঈমান সুদৃঢ়করণ ও নৈতিকতা গঠনে এর প্রভাব নিচে আলোচনা করা হলো:

১. ঈমান সুদৃঢ়করণে প্রভাব (في تقوية الإيمان):
* নবুওয়াতের প্রমাণ: রাসুল (صلى الله عليه وسلم) উম্মী (নিরক্ষর) হওয়া সত্ত্বেও তাঁর মুখ দিয়ে পূর্ববর্তী নবিদের এমন নিখুঁত ও বিস্তারিত ইতিহাস বর্ণনা করা—যা কেবল পূর্ববর্তী ঐশী কিতাবেই সংরক্ষিত ছিল—এটি তাঁর নবুওয়াত ও কুরআন আল্লাহর বাণী হওয়ার অকাট্য প্রমাণ। এটি মুমিনদের ঈমানকে সুদৃঢ় করে।
* রাসুল (সা.) ও মুমিনদের সান্ত্বনা: মক্কার কাফিরদের অত্যাচারে রাসুল (সা.) ও সাহাবিরা যখন মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়তেন, তখন আল্লাহ পূর্ববর্তী নবিদের (যেমন- নূহ, ইবরাহিম, মুসা আ.) সীমাহীন কষ্টের কাহিনী শুনিয়ে তাঁদের সান্ত্বনা দিতেন। এর দ্বারা তাঁরা বুঝতে পারতেন যে, সত্যের পথ সবসময় কণ্টকাকীর্ণ হয়, কিন্তু চূড়ান্ত বিজয় মুমিনদেরই হয়।
* আল্লাহর অসীম ক্ষমতার স্মরণ: নমরুদ, ফিরাউন বা আদ-সামুদ জাতির মতো শক্তিশালী অহংকারীদের কীভাবে আল্লাহ ধ্বংস করেছেন এবং মুসা (আ.) বা ইবরাহিম (আ.) এর মতো একনিষ্ঠ বান্দাদের কীভাবে অলৌকিকভাবে রক্ষা করেছেন, তা পাঠ করলে আল্লাহর একত্ববাদ ও কুদরতের ওপর ঈমান বহুগুণ বেড়ে যায়।

২. নৈতিকতা গঠনে প্রভাব (في تهذيب الأخلاق):
* উত্তম চরিত্রের শিক্ষা: ইউসুফ (আ.) এর কাহিনী থেকে পবিত্রতা, ক্ষমা ও ধৈর্য্যের শিক্ষা পাওয়া যায়। আইয়ুব (আ.) এর ঘটনা থেকে বিপদে চরম ধৈর্য্যের শিক্ষা মেলে। ইবরাহিম (আ.) এর ঘটনা থেকে আল্লাহর প্রতি শর্তহীন আনুগত্য ও আত্মত্যাগের শিক্ষা পাওয়া যায়। এগুলো মানুষের নৈতিক চরিত্র গঠনে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
* অহংকার ও পাপাচার থেকে বেঁচে থাকা: কারুনের সম্পদের অহংকার, ফিরাউনের ক্ষমতার দম্ভ এবং লুত (আ.) এর জাতির সীমাহীন পাপাচারের ভয়াবহ পরিণতির কাহিনী মানুষকে অহংকার, লোভ ও অজাচার থেকে দূরে থাকতে সতর্ক করে।
* আত্মশুদ্ধি: কুরআনের কাহিনীগুলো মানুষের মনে আল্লাহর ভয় (তাকওয়া) জাগ্রত করে, যা একজন মুমিনকে আত্মশুদ্ধি ও গুনাহমুক্ত জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করে।

٧- عرف المحكم والمتشابه- ثم بين الحكمة فى ورود الآيات المتشابهات فى القرآن الكريم-

[المحكم ও المتشابه এর পরিচয় দাও। কুরআনুল কারিমে المتشابهات অবতীর্ণ হওয়ার হিকমাত বর্ণনা কর।]

১. المحكم (মুহকাম) এর পরিচয়:
‘মুহকাম’ (المحكم) শব্দটি ‘ইহকাম’ থেকে নির্গত, যার অর্থ সুদৃঢ় করা বা স্পষ্ট করা। উলূমুল কুরআনের পরিভাষায়, কুরআনের যেসব আয়াতের অর্থ ও উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ সুনিশ্চিত ও সুস্পষ্ট, যা বুঝতে কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় না এবং যার একাধিক অর্থ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, সেসব আয়াতকে ‘মুহকাম’ বলা হয়। যেমন- সালাত কায়েম করা, রোজা রাখা, জিনা حرام হওয়ার আয়াতসমূহ। কুরআনের বেশিরভাগ আয়াতই মুহকাম (উম্মুল কিতাব)।

২. المتشابه (মুতাসাবিহ) এর পরিচয়:
‘মুতাসাবিহ’ (المتشابه) অর্থ সাদৃশ্যপূর্ণ বা অস্পষ্ট। পরিভাষায়, কুরআনের যেসব আয়াতের অর্থ অত্যন্ত সূক্ষ্ম, অস্পষ্ট বা গোপন থাকে এবং যার একাধিক অর্থের সম্ভাবনা থাকে, সেগুলোকে ‘মুতাসাবিহ’ বলা হয়। এর প্রকৃত অর্থ আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নিশ্চিতভাবে জানে না। যেমন- কুরআনের শুরুতে থাকা হুরুফে মুকাত্তা’আত (الم, يس) বা আল্লাহর গুণাবলি সম্পর্কিত কিছু আয়াত (যেমন- ‘আল্লাহর হাত’, ‘আল্লাহর আরশে সমাসীন হওয়া’)।

৩. المتشابهات অবতীর্ণ হওয়ার হিকমাত (الحكمة في ورودها):
কুরআনে সবকিছু স্পষ্ট না করে কিছু আয়াতকে অস্পষ্ট বা মুতাসাবিহ হিসেবে অবতীর্ণ করার পেছনে আল্লাহর গভীর প্রজ্ঞা রয়েছে:
* ঈমানের পরীক্ষা: আল্লাহ দেখতে চান কারা না দেখে বা না বুঝেও তাঁর বাণীকে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে। প্রকৃত মুমিনরা মুতাসাবিহ আয়াতের অর্থ না বুঝলেও বলে “كُلٌّ مِّنْ عِندِ رَبِّنَا” (সবই আমাদের রবের পক্ষ থেকে আগত)। অন্যদিকে, যাদের অন্তরে বক্রতা আছে তারা এগুলো নিয়ে বিতর্কে জড়ায়। এটি ঈমানের এক মহা পরীক্ষা।
* মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ: মুতাসাবিহ আয়াত মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতা প্রমাণ করে। মানুষ যতই জ্ঞানী হোক না কেন, আল্লাহর ইলমের বিশালতার সামনে সে যে সম্পূর্ণ অসহায় ও অজ্ঞ, তা সে উপলব্ধি করতে পারে।
* চিন্তা ও গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করা: যদি সবকিছুই মুহকাম হতো, তবে মানুষের চিন্তা-গবেষণা ও ইজতিহাদ করার দরজা বন্ধ হয়ে যেত। মুতাসাবিহ আয়াত আলেম সমাজকে ইলমের গভীরে প্রবেশ করতে, গবেষণা করতে এবং আল্লাহর রহমতের দিকে মুখাপেক্ষী হতে বাধ্য করে, যার ফলে তারা সওয়াবের অধিকারী হন।
* অহংকার চূর্ণ করা: বড় বড় পণ্ডিত ও জ্ঞানীরা যখন মুতাসাবিহ আয়াতের সঠিক মর্ম উদ্ধারে ব্যর্থ হন, তখন তাদের অহংকার চূর্ণ হয়ে যায় এবং তারা আল্লাহর বড়ত্বের কাছে আত্মসমর্পণ করেন।

٨- ما المراد بالإسرائيليات فى تفسير القرآن؟ اذكر أسباب دخولها فى كتب التفاسير مع بيان موقف العلماء منها-

[কুরআনের তাফসিরে الإسرائيليات বলতে কী বোঝায়? তাফসির গ্রন্থসমূহে الإسرائيليات অনুপ্রবেশের কারণ বর্ণনাবূর্বক এ ব্যাপারে আলেমগণের অবস্থান আলোচনা কর।]

১. الإسرائيليات (ইসরাইলিয়াত) এর অর্থ:
‘ইসরাইলিয়াত’ হলো ইসরাইলিয়্যাহ (إسرائيلية) শব্দের বহুবচন। উলূমুল কুরআন ও তাফসির শাস্ত্রের পরিভাষায়, ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের (আহলে কিতাবদের) গ্রন্থাবলি, তাদের আকিদা-বিশ্বাস, লোকগাথা, মিথ বা তাদের ধর্মীয় পণ্ডিতদের কাছ থেকে প্রাপ্ত যেসব গল্প, কাহিনী বা বর্ণনা ইসলামী তাফসির ও ইতিহাসের গ্রন্থসমূহে প্রবেশ করেছে, তাকে সম্মিলিতভাবে الإسرائيليات (ইসরাইলিয়াত) বলা হয়। মূলত পূর্ববর্তী নবিদের কাহিনীগুলোর বিস্তারিত জানার আগ্রহ থেকেই এগুলো তাফসিরে স্থান পেয়েছে।

২. তাফসির গ্রন্থসমূহে ইসরাইলিয়াত অনুপ্রবেশের কারণ (أسباب دخولها):
* বিস্তারিত জানার কৌতূহল: পবিত্র কুরআনে নবি-রাসুল ও পূর্ববর্তী উম্মতদের কাহিনী অত্যন্ত সংক্ষেপে, কেবল শিক্ষণীয় অংশটুকুই বর্ণনা করা হয়েছে (যেমন- আসহাবে কাহফের কুকুরের রঙ কী ছিল বা ইউসুফ আ. এর ভাইদের নাম কী ছিল তা কুরআনে নেই)। কিন্তু মানুষের স্বভাবজাত কৌতূহল ছিল এসব ঘটনার বিস্তারিত জানার।
* আহলে কিতাবদের ইসলাম গ্রহণ: সাহাবি ও তাবেয়িদের যুগে অনেক ইহুদি ও খ্রিষ্টান পণ্ডিত (যেমন- আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম, কাব আল-আহবার, ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বিহ) ইসলাম গ্রহণ করেন। মুসলমানরা কৌতূহলবশত কুরআনের সংক্ষিপ্ত কাহিনীগুলোর বিস্তারিত বর্ণনা তাদের কাছ থেকে জানতে চাইতেন এবং তাঁরা তাদের পূর্বের কিতাবের জ্ঞান (তাওরাত ও ইঞ্জিল) থেকে সেগুলো বর্ণনা করতেন।
* ইসলামের উদারতা: রাসুল (সা.) বলেছিলেন, “বনি ইসরাইল থেকে বর্ণনা করো, এতে কোনো দোষ নেই”। এই সাধারণ অনুমতির কারণে মুফাসসিরগণ তাফসিরে ইসরাইলিয়াত যুক্ত করতে দ্বিধা করেননি।
* قصص ও ওয়াযীনদের প্রভাব: যুগে যুগে ওয়াজকারী ও গল্পকাররা সাধারণ মানুষকে আকর্ষণ করার জন্য সত্য-মিথ্যা মিশ্রিত চটকদার ইসরাইলি কাহিনী বর্ণনা করতেন, যা ধীরে ধীরে বই-পুস্তকে স্থান করে নেয়।

৩. ইসরাইলিয়াতের ব্যাপারে আলেমগণের অবস্থান (موقف العلماء منها):
আলেমগণ ইসরাইলিয়াতকে প্রধানত তিনটি ভাগে বিভক্ত করে এর বিধান বা موقف বর্ণনা করেছেন:
* প্রথম প্রকার (গ্রহণযোগ্য): যেসব ইসরাইলি বর্ণনা কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর সাথে সম্পূর্ণ মিলে যায় এবং ইসলামের মৌলিক আকিদার সমর্থন করে। বিধান: এগুলো বর্ণনা করা ও বিশ্বাস করা সম্পূর্ণ বৈধ ও গ্রহণযোগ্য।
* দ্বিতীয় প্রকার (বর্জনীয়/পরিত্যাজ্য): যেসব ইসরাইলি বর্ণনা কুরআন, সহিহ হাদিস, মানুষের বিবেক বা নবি-রাসুলদের নিষ্পাপ চরিত্রের সম্পূর্ণ পরিপন্থী ও সাংঘর্ষিক (যেমন- দাউদ আ. বা সুলাইমান আ. সম্পর্কে মিথ্যা অপবাদ)। বিধান: এগুলো বর্ণনা করা, প্রচার করা ও বিশ্বাস করা সম্পূর্ণ হারাম এবং এগুলো নিশ্চিত মিথ্যা।
* তৃতীয় প্রকার (নিরপেক্ষ/মওকুফ): যেসব ইসরাইলি বর্ণনার ব্যাপারে শরিয়তে কোনো সমর্থনও নেই, আবার বিরোধিতাও নেই। এগুলো কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক নয়, আবার সমর্থকও নয়। বিধান: এগুলোর ব্যাপারে আলেমগণের অবস্থান হলো توقف (নিরপেক্ষতা)। এগুলো সত্য না মিথ্যা তা নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না, তবে ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে বর্ণনা করা জায়েজ, কিন্তু এর ওপর ধর্মীয় কোনো বিশ্বাস বা আকিদা স্থাপন করা যাবে না।

مجموعة (ب) – খ-বিভাগ [যেকোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও]

٩- اذكر خمسة من أشهر المؤلفات فى علوم القرآن مع ذكر أسماء مؤلفيها-

[লেখকের নাম উল্লেখপূর্বক পাঁচটি علوم القرآن বিষয়ক প্রসিদ্ধ গ্রন্থের নাম লেখ।]

علوم القرآن বিষয়ক পাঁচটি প্রসিদ্ধ গ্রন্থের নাম ও লেখকের নাম নিচে দেওয়া হলো:

১. البرهان في علوم القرآن (আল-বুরহান ফী উলূমিল কুরআন)
– লেখক: আল্লামা বদরুদ্দীন আয-যারকাশি (রহ.) (مؤلف: الإمام بدر الدين الزركشي).

২. الإتقان في علوم القرآن (আল-ইতকান ফী উলূমিল কুরআন)
– লেখক: আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ুতী (রহ.) (مؤلف: الإمام جلال الدين السيوطي).

৩. مناهل العرفان في علوم القرآن (মানাহিলুল ইরফান ফী উলূমিল কুরআন)
– লেখক: শাইখ মুহাম্মাদ আব্দুল আজিম আয-যারকানি (রহ.) (مؤلف: الشيخ محمد عبد العظيم الزرقاني).

৪. مباحث في علوم القرآن (মাবাহিস ফী উলূমিল কুরআন)
– লেখক: ড. সুবহয় আল-সালেহ (مؤلف: الدكتور صبحي الصالح).

৫. النبأ العظيم (আন-নাবাউল আজিম)
– লেখক: ড. মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ দারাজ (مؤلف: الدكتور محمد عبد الله دراز).

١٠- ما المراد بجدل القرآن؟ بين طريقة القرآن فى المجادلة-

[جدل القرآن দ্বারা উদ্দেশ্য কী? مجادلة এর ক্ষেত্রে কুরআনের পদ্ধতি আলোচনা কর।]

جدل القرآن (জাদালুল কুরআন) দ্বারা উদ্দেশ্য:
‘জাদাল’ বা ‘মাজাদালাহ’ শব্দের অর্থ হলো তর্ক করা, বিতর্ক করা বা যুক্তি খণ্ডন করা। উলূমুল কুরআনের পরিভাষায়, ‘জাদালুল কুরআন’ (جدل القرآن) বলতে পবিত্র কুরআনে ব্যবহৃত সেইসব শক্তিশালী যুক্তি ও প্রমাণপদ্ধতিকে বোঝায়, যার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা কাফির, মুশরিক, মুনাফিক ও আহলে কিতাবদের ভ্রান্ত আকিদা, সন্দেহ ও অভিযোগগুলো খণ্ডন করেছেন এবং ইসলামের সত্যতাকে অকাট্য প্রমাণের সাহায্যে প্রতিষ্ঠা করেছেন।

مجادلة বা বিতর্কের ক্ষেত্রে কুরআনের পদ্ধতি (কুরআনের বিতর্ক পদ্ধতি):
কুরআনের জাদাল বা বিতর্কের পদ্ধতি দার্শনিকদের মতো শুষ্ক যুক্তি (লজিক) নির্ভর নয়, বরং এটি অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ও ফিতরত (انسانی স্বভাব) নির্ভর। এর প্রধান পদ্ধতিগুলো হলো:
* استدلال بالآيات الكونية (সৃষ্টিকুল দিয়ে যুক্তি প্রদর্শন): কুরআন মানুষকে আকাশ, زمین, দিন-রাত ও মানুষের নিজের সৃষ্টির দিকে নজর দিতে বলে। এই বিশাল মহাবিশ্বের সুনিপুণ সৃষ্টিই আল্লাহর একত্ববাদ ও ক্ষমতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবে কুরআন উপস্থাপন করে।
* القياس الجلي (স্পষ্ট কিয়াস বা তুলনা): মৃত জমিনে বৃষ্টি বর্ষণের পর তা যেমন জীবিত বা শস্যশ্যামল হয়, তেমনি আল্লাহ মৃত মানুষকে কিয়ামতের দিন পুনরায় জীবিত করবেন—এই সহজ উপমার মাধ্যমে কুরআন পুনরুত্থানকে (হাশর) প্রমাণ করে।
* خصم (প্রতিপক্ষকে) তাদের নিজেদের যুক্তি দিয়েই ঘায়েল করা: মুশরিকরা বিশ্বাস করত যে আকাশ-যমিন আল্লাহর সৃষ্টি, অথচ ইবাদত করত মূর্তির। কুরআন তাদের এই স্ববিরোধী চিন্তাকে আঘাত করে বলেছে, “যদি তোমরা মানো আল্লাহই সৃষ্টিকর্তা, তবে কেন অপরের ইবাদত করছ?”
* মুজাদিলুন বিল লাতি হিয়া আহসান: কুরআনের বিতর্কের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি রূঢ় নয়। আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন “وَجَادِلْهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ” (আর তাদের সাথে বিতর্ক করো সর্বোত্তম পন্থায়)। কুরআন গালিগালাজ না করে অকাট্য যুক্তির মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে নিরুত্তর করে দেয়।

١١- ما حكم كتابة القرآن الكريم بغير اللغة العربية؟ بين-

[আরবি ভাষা ব্যতীত অন্য ভাষায় কুরআনুল কারিম লেখার বিধান কী? বর্ণনা কর।]

আরবি ভাষা ব্যতীত অন্য ভাষায় কুরআন লেখার বিধান (حكم كتابة القرآن بغير اللغة العربية):
পবিত্র কুরআনুল কারিমকে আরবি হরফ বা বর্ণমালা ব্যতীত অন্য কোনো ভাষার বর্ণমালা (যেমন- বাংলা তরজমা বা রোমান/ইংরেজি ট্রান্সলিটারেশন বা تلفظ) দিয়ে মূল কুরআন হিসেবে লেখা বা মুদ্রণ করার বিধান নিয়ে ওলামায়ে কেরামের স্পষ্ট ফতোয়া রয়েছে।

জুমহুর ওলামায়ে কেরামের মত:
চার মাযহাবের ফকিহ, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাবেতা আল-আলম আল-ইসলামীর ফতোয়া বোর্ড সর্বসম্মতভাবে একমত যে, আরবি বর্ণমালা ব্যতীত অন্য যেকোনো ভাষার বর্ণমালায় পবিত্র কুরআনের মূল মতন (Text) লেখা সম্পূর্ণ হারাম ও নাজায়েজ। এর প্রধান কারণসমূহ হলো:
১. উচ্চারণ বিকৃতি: আরবি ভাষার অনেক হরফের (যেমন- ح, خ, ص, ض, ط, ظ, ع, غ) সঠিক মাখরাজ ও উচ্চারণ অন্য কোনো ভাষার বর্ণমালা দিয়ে ১০০% নিখুঁতভাবে প্রকাশ করা অসম্ভব। বাংলা বা ইংরেজিতে লিখলে কুরআনের উচ্চারণ ও অর্থ মারাত্মকভাবে বিকৃত হয়ে যাবে।
২. ইজমা বিরোধী: হজরত উসমান (রা.) এর যুগে সাহাবিরা ‘রসমুল উসমানি’ তথা আরবি বর্ণমালায় কুরআন সংরক্ষণের ব্যাপারে ইজমা (ঐক্যমত) করেছেন। এর বরখেলাফ করা ইজমার পরিপন্থী।
৩. কুরআনের মুজিযা নষ্ট হওয়া: কুরআনের নিজস্ব শব্দ, গঠন ও আরবি ভাষার মুজিযা অন্য ভাষায় স্থানান্তরিত করলে তা তার ঐশ্বরিক মর্যাদা হারিয়ে ফেলবে।
তবে, কুরআনের অর্থ বা তাফসির অন্য ভাষায় লেখা সম্পূর্ণ জায়েজ ও সওয়াবের কাজ। কিন্তু মূল আরবি আয়াতটি পড়ার জন্য আরবি বর্ণমালাই ব্যবহার করতে হবে। যারা আরবি পড়তে জানে না, তাদের জন্য تلفظ (উচ্চারণ) লিখে দেওয়ার চেয়ে তাদের আরবি শেখানোর ব্যবস্থা করা ওয়াজিব।

١٢- اكتب أسماء القراء السبعة-

[القراء السبعة (সাতজন প্রসিদ্ধ কারী) এর নামগুলো লেখ।]

القراء السبعة (সাতজন প্রসিদ্ধ কারী) এর নাম:
ইলমুল কিরাত বা কুরআন পঠনবিদ্যায় যুগান্তকারী অবদান রাখা এবং যাদের কিরাত উম্মতের কাছে মুতাওয়াতির হিসেবে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে, এমন সাতজন প্রসিদ্ধ ইমাম বা কারী (القراء السبعة) হলেন:

  1. ইমাম নাফে’ আল-মাদানী (الإمام نافع المدني): মদিনার প্রসিদ্ধ কারী (মৃত্যু ১৬৯ হি.)।
  2. ইমাম ইবনে কাসির আল-মাক্কী (الإمام ابن كثير المكي): মক্কার প্রসিদ্ধ কারী (মৃত্যু ১২০ হি.)।
  3. ইমাম আবু আমর আল-বাসরী (الإمام أبو عمرو البصري): বসরার প্রসিদ্ধ কারী (মৃত্যু ১৫৪ হি.)।
  4. ইমাম ইবনে আমির আশ-শামী (الإمام ابن عامر الشامي): সিরিয়া বা শামের প্রসিদ্ধ কারী (মৃত্যু ১১৮ হি.)।
  5. ইমাম আসিম আল-কুফী (الإمام عاصم الكوفي): কুফার প্রসিদ্ধ কারী (মৃত্যু ১২৭ হি.)। বর্তমানে সারা বিশ্বে তাঁর قراءة (বিশেষ করে হাফস আন আসিম রওয়ায়াত) সবচেয়ে বেশি পঠিত হয়।
  6. ইমাম হামযা আল-কুফী (الإمام حمزة الكوفي): কুফার আরেকজন প্রসিদ্ধ কারী (মৃত্যু ১৫৬ হি.)।
  7. ইমাম কিসায়ী আল-কুফী (الإمام الكسائي الكوفي): কুফার প্রসিদ্ধ কারী ও নাহুবিদ (মৃত্যু ১৮৯ হি.)।

١٣- اذكر أنواع أمثال القرآن الكريم-

[أمثال القرآن الكريم এর প্রকারসমূহ লেখ।]

أمثال القرآن الكريم (কুরআনের উপমা বা দৃষ্টান্ত) এর প্রকারভেদ:
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা গভীর বিষয়গুলোকে মানুষের বোধগম্য করার জন্য যেসকল উপমা (أمثال) ব্যবহার করেছেন, তা প্রধানত তিন ভাগে বিভক্ত:

১. الأمثال المصرحة (সুস্পষ্ট উপমা):
যেসব উপমায় সরাসরি ‘مثل’ (উদাহরণ/দৃষ্টান্ত) শব্দটি উল্লেখ থাকে। যেমন, মুনাফিকদের উদাহরণ দিতে গিয়ে আল্লাহ বলেছেন: “مَثَلُهُمْ كَمَثَلِ الَّذِي اسْتَوْقَدَ نَارًا” (তাদের উদাহরণ ঐ ব্যক্তির মতো, যে আগুন জ্বালালো…)।
২. الأمثال الكامنة (লুক্কায়িত উপমা):
যেসব আয়াতে সরাসরি ‘مثل’ শব্দটির উল্লেখ নেই, কিন্তু আয়াতের অন্তর্নিহিত অর্থ প্রচলিত কোনো প্রবাদ বা চিরন্তন সত্যের (حكمة) উপমা বহন করে। যেমন: “وَلَا يَحِيقُ الْمَكْرُ السَّيِّئُ إِلَّا بِأَهْلِهِ” (খারাপ ষড়যন্ত্র ষড়যন্ত্রকারীকেই বেষ্টন করে) – এটি ‘যে অন্যের জন্য গর্ত খোঁড়ে সে নিজেই তাতে পড়ে’ প্রবাদের অনুরূপ।
৩. الأمثال المرسلة (উন্মুক্ত বা স্বাধীন উপমা):
কুরআনের এমন কিছু আয়াত, যা নিজে কোনো উপমা হিসেবে অবতীর্ণ হয়নি, কিন্তু মানুষের জীবনে তা এতোটাই প্রযোজ্য যে তা প্রবাদবাক্য বা স্বাধীন উপমা হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। যেমন: “كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ” (প্রতিটি প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে) অথবা “هَلْ جَزَاءُ الْإِحْسَانِ إِلَّا الْإِحْسَانُ” (উত্তম কাজের প্রতিদান কি উত্তম কাজ ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে?)।

١٤- هل يوجد المجاز والكناية فى القرآن الكريم؟ أوضح بالمثال-

[কুরআনুল কারিমে কি مجاز ও كناية পাওয়া যায়? উদাহরণসহ বর্ণনা কর।]

হ্যাঁ, কুরআনুল কারিমে المجاز (রূপক) এবং الكناية (ইঙ্গিত) উভয়েরই ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। কুরআনের অলৌকিকতা ও ভাষাগত মাধুর্য প্রকাশের এটি একটি বড় মাধ্যম। জুমহুর ওলামা ও মুফাসসিরদের মতে কুরআনে এর উপস্থিতি অকাট্য।

المجاز (মাজাজ / রূপক) এর উদাহরণ:
মাজাজ হলো কোনো শব্দকে তার প্রকৃত (আভিধানিক) অর্থের পরিবর্তে কোনো প্রাসঙ্গিক বা রূপক অর্থে ব্যবহার করা।
উদাহরণ: আল্লাহ তায়ালা বলেন- “يَجْعَلُونَ أَصَابِعَهُمْ فِي آذَانِهِم مِّنَ الصَّوَاعِقِ” (তারা বজ্রপাতের ভয়ে তাদের ‘আঙুলগুলো’ কানে ঢুকিয়ে দেয় – البقرة: ১৯)।
এখানে ‘আসাবআ’ (أصابع – আঙুলসমূহ) শব্দটি মাজাজ বা রূপক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। কারণ মানুষ কানের ভেতর পুরো আঙুল ঢোকাতে পারে না, বরং আঙুলের ‘অগ্রভাগ’ (أنامل) ঢুকায়। এখানে کل (সমগ্র) বুঝিয়ে جزء (অংশ) উদ্দেশ্য নেওয়া হয়েছে, যা একটি مجاز مرسل।

الكناية (কিনায়া / ইঙ্গিত) এর উদাহরণ:
কিনায়া হলো এমন কোনো শব্দ বা বাক্য ব্যবহার করা, যার একটি বাহ্যিক অর্থ আছে, لكن উদ্দেশ্য হলো এর সাথে সম্পর্কিত অন্য কোনো গভীর বা প্রচ্ছন্ন অর্থ।
উদাহরণ: আল্লাহ তায়ালা মরিয়ম (আ.) ও ঈসা (আ.) সম্পর্কে বলেছেন- “كَانَا يَأْكُلَانِ الطَّعَامَ” (তারা উভয়েই খাবার ভক্ষণ করত – المائدة: ৭৫)।
এখানে ‘খাবার ভক্ষণ করত’ এটি একটি কিনায়া বা ইঙ্গিত। এর বাহ্যিক অর্থ তারা খেত, কিন্তু এর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য (কিনা্যা) হলো: যে খাবার খায় তার শৌচকর্ম বা মলমূত্র ত্যাগের প্রয়োজন হয় (যা মানবীয় দুর্বলতা)। সুতরাং তারা ঈশ্বর (خدا) হতে পারে না, কারণ ঈশ্বর এমন মানবীয় দুর্বলতা থেকে পবিত্র। এটি অত্যন্ত শালীন একটি কিনায়া।

١٥- اكتب أسماء أشهر الرواة الإسرائيلية فى التفسير-

[তাফসির শাস্ত্রে إسرائيلية রেওয়ায়াত বর্ণনাকারী প্রসিদ্ধ রাবিদের নাম লেখ।]

তাফসির শাস্ত্রে الإسرائيليات (ইসরাইলি রেওয়ায়াত) বর্ণনাকারী প্রসিদ্ধ রাবিদের (أشهر الرواة) নাম:
ইসলামের প্রাথমিক যুগে যে সকল রাবি বা বর্ণনাকারী পূর্ববর্তী ঐশী কিতাব (তাওরাত ও ইঞ্জিল) সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখতেন এবং যাদের কাছ থেকে তাফসির গ্রন্থগুলোতে ইসরাইলি কাহিনীসমূহ সবচেয়ে বেশি বর্ণিত হয়েছে, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য চারজন প্রসিদ্ধ রাবি হলেন:

  1. عبد الله بن سلام (আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম রা.): তিনি ছিলেন মদিনার একজন শীর্ষস্থানীয় ইহুদি পণ্ডিত, যিনি রাসুল (صلى الله عليه وسلم) এর মদিনায় হিজরতের পরপরই ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য।
  2. كعب الأحبار (কাব আল-আহবার রহ.): তাঁর মূল নাম কাব ইবনে মাতে’। তিনি ইয়েমেনের একজন শ্রেষ্ঠ ইহুদি আলেম ছিলেন, যিনি হযরত উমর (রা.) বা আবু বকর (রা.) এর যুগে ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসরাইলিয়াতের বর্ণনায় তিনি সবচেয়ে বেশি প্রসিদ্ধ।
  3. وهب بن منبه (ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বিহ রহ.): তিনিও ইয়েমেনের অধিবাসী ছিলেন। তিনি পূর্ববর্তী কিতাব, ইতিহাস ও পুরাণ সম্পর্কে ব্যাপক জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। তাঁর বর্ণিত অনেক ইসরাইলি কাহিনী তাফসির ও ইতিহাসের কিতাবে স্থান পেয়েছে।
  4. عبد الملك بن عبد العزيز بن جريج (ইবনে জুরাইজ রহ.): তিনি একজন খ্রিষ্টান পণ্ডিত ছিলেন, যিনি পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর কাছ থেকেও অনেক খ্রিষ্টীয় (মসীহি) ইসরাইলিয়াত বর্ণিত হয়েছে।

١٦- ماذا تعلم عن الموضوعات فى تفسير القرآن الكريم؟ بين-

[তাফসিরুল কুরআন-এ الموضوعات বলতে কী বোঝ? বর্ণনা কর।]

الموضوعات فى التفسير (তাফসিরে মাওযুয়াত) বলতে যা বোঝায়:
‘আল-মাওযুয়াত’ (الموضوعات) শব্দটি ‘موضوع’ (মাওযু) এর বহুবচন, যার অর্থ হলো বানোয়াট, জাল বা মনগড়া।
ইলমুল তাফসির ও উলূমুল কুরআনের পরিভাষায়, ‘الموضوعات فى التفسير’ বলতে সেসব জাল বা বানোয়াট তাফসির বা হাদিসকে বোঝায়, যেগুলো কোনো স্বার্থান্বেষী মহল, বিভ্রান্ত দল, বিদআতি গোষ্ঠী, বা ইসলামের শত্রুরা নিজেদের মনগড়া মতামত বা ভ্রান্ত আকিদাকে প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে রাসুল (صلى الله عليه وسلم), সাহাবি বা তাবেয়িদের নামে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে কুরআনের আয়াতের মনগড়া ব্যাখ্যা তৈরি করে সমাজে ছড়িয়ে দিয়েছে এবং তা পরবর্তীতে কিছু তাফসির গ্রন্থে অনুপ্রবেশ করেছে।

তাফসিরে الموضوعات (বানোয়াট তাফসির) এর কারণ ও উৎস:
* রাজনৈতিক ও মাজহাবি দ্বন্দ্ব: ইসলামের প্রাথমিক যুগে শিয়া, খারেজি, মুতাযিলা ইত্যাদি দলের সৃষ্টি হলে তারা তাদের রাজনৈতিক বা মাজহাবি মতামতকে শক্তিশালী করার জন্য কুরআনের আয়াতের জাল তাফসির ও বানোয়াট শানে নুযূল তৈরি করে।
* যিন্দিক ও ইসলামের শত্রুদের ষড়যন্ত্র: ইহুদি, খ্রিষ্টান বা অগ্নিউপাসকদের ছদ্মবেশী মনাফকরা (যিন্দিক) ইসলামকে ভেতর থেকে ধ্বংস করার জন্য কুরআনের বিকৃত ব্যাখ্যা ও জাল হাদিস প্রচার করত।
* قصاص (গল্পকার) দের প্রভাব: একশ্রেণির বক্তা ও গল্পকার সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করার জন্য নিজেদের কল্পনা থেকে কুরআনের আয়াতের এমন সব অদ্ভুত ও অবাস্তব তাফসির শোনাতো, যার কোনো ভিত্তি শরিয়তে নেই।
* فضائل (فضائل) সম্পর্কিত জাল বর্ণনা: কিছু মূর্খ আবেদ (ইবাদতকারী) মানুষকে নেক আমলের দিকে ডাকার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সূরা পঠনের فضائل (ফজিলত) সম্পর্কে নিজেদের মন থেকে জাল হাদিস তৈরি করে তাফসির গ্রন্থে ঢুকিয়ে দিয়েছে (যেমন- সূরাগুলোর فضائل নিয়ে তৈরি করা কিছু বানোয়াট বর্ণনা)।
বিধান: তাফসিরের ক্ষেত্রে এসব ‘মাওযু’ অথবা বানোয়াট বর্ণনাকে শনাক্ত করা, তা থেকে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করা এবং এগুলো প্রত্যাখ্যান করা প্রত্যেক আলেম ও মুফাসসিরের জন্য অপরিহার্য দায়িত্ব।

Follow Our Facebook Page
দ্রুত নতুন বই পেতে যুক্ত থাকুন
Follow Now