Ulumul Quran (Code: 201205) – ২০২০ প্রশ্ন ও উত্তর
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২০ এর আল-কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের علوم القرآن (উলূমুল কুরআন) বিষয়ের সম্পূর্ণ উত্তরমালা।
বিঃদ্রঃ পরীক্ষার্থীদের আগামী পরীক্ষার সর্বোচ্চ প্রস্তুতির সুবিধার্থে মূল প্রশ্নপত্রের আরবি প্রশ্ন ও এর বাংলা অনুবাদসহ বিকল্প সবগুলোর (অথবা) প্রশ্নের ১০০% নির্ভুল ও তথ্যবহুল উত্তর বিস্তারিতভাবে নিচে দেওয়া হলো।
مجموعة (أ) [ক-বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্ন]
[১. علوم القرآن বলতে কী বুঝ? علوم القرآن এর উৎপত্তি যুগের পরিক্রমায় এর ক্রমবিকাশ বর্ণনা কর। এ বিষয়ে তিনটি প্রসিদ্ধ গ্রন্থের বর্ণনা দাও।]
علوم القرآن (উলূমুল কুরআন) এর পরিচয়:
‘উলূম’ শব্দটি ‘ইলম’-এর বহুবচন, অর্থ জ্ঞান বা বিজ্ঞানসমূহ। ‘কুরআন’ অর্থ পঠিত। পারিভাষিক অর্থে, উলূমুল কুরআন বলতে এমন সব জ্ঞান বা শাস্ত্রের সমাহারকে বোঝায়, যা পবিত্র কুরআনের সাথে সম্পর্কিত। যেমন- আসবাবুন নুযূল, মাক্কী-মাদানী, নাসিখ-মানসুখ, ইলমুল কিরাআত, ইলমুত তাফসির, ইজাযুল কুরআন, মুহকাম ও মুতাশাবিহ ইত্যাদি। এটি মূলত কুরআনকে সঠিকভাবে অনুধাবন ও ব্যাখ্যার চাবিকাঠি।
نشأتها وتطورها (উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ):
১. রাসূল (সা.) ও সাহাবাদের যুগ: রাসূল (সা.)-এর যুগে অহী অবতীর্ণ হওয়ার সাথে সাথেই সাহাবারা তা মুখস্থ করতেন এবং রাসূল (সা.) থেকে সরাসরি এর ব্যাখ্যা জেনে নিতেন। এ যুগে তা লিখিত বা সংকলিত শাস্ত্র হিসেবে ছিল না, কারণ তখন কুরআনের সাথে অন্য কিছু লেখার উপর নিষেধাজ্ঞা ছিল।
২. তাবেঈনদের যুগ: এ যুগে তাফসির শাস্ত্রের প্রসার ঘটে। মুজাহিদ, ইকরিমা, কাতাদাহ প্রমুখ তাবেঈনরা সাহাবাদের কাছ থেকে ইলম অর্জন করে তা ছড়িয়ে দেন এবং কিছু কিছু লিপিবদ্ধ হতে শুরু করে।
৩. সংকলনের যুগ (২য়-৩য় হিজরী): এ যুগে কুরআনের বিভিন্ন শাখা নিয়ে আলাদা আলাদা বই লেখা শুরু হয়। যেমন ইমাম শাফেয়ী (রহ.) ‘আহকামুল কুরআন’ এবং ইমাম আলী ইবনে আল-মাদীনী ‘আসবাবুন নুযূল’ লেখেন।
৪. পূর্ণতার যুগ (৪র্থ-৮ম হিজরী): এ সময় উলূমুল কুরআন একটি স্বতন্ত্র ও স্বয়ংসম্পূর্ণ শাস্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বদরুদ্দীন যারকাশী ও জালালুদ্দীন সুয়ুতীর মতো আলেমরা এই শাস্ত্রকে চরম উৎকর্ষে পৌঁছে দেন।
أشهر المؤلفات (তিনটি প্রসিদ্ধ গ্রন্থ):
১. البرهان في علوم القرآن (আল-বুরহান ফী উলূমিল কুরআন): ইমাম বদরুদ্দীন যারকাশী (রহ.) রচিত। এটি এই শাস্ত্রের একটি বিশ্বকোষতুল্য গ্রন্থ।
২. الإتقان في علوم القرآن (আল-ইতকান ফী উলূমিল কুরআন): আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ুতী (রহ.) রচিত। এটি উলূমুল কুরআনের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ।
৩. مناهل العرفان في علوم القرآن (মানাহিলুল ইরফান ફী উলূমিল কুরআন): আধুনিক যুগের আলেম শাইখ মুহাম্মাদ আবদুল আজিম আয-যারকানী (রহ.) রচিত অত্যন্ত জনপ্রিয় গ্রন্থ।
[২. سبعة احرف বলতে কী বোঝায়? এ সম্পর্কে মতবিরোধ এবং এর হেকমত বা রহস্য কী? বর্ণনা কর।]
المراد بسبعة أحرف (সাবআতু আহরুফ এর অর্থ):
সহীহ হাদীসে এসেছে, রাসূল (সা.) বলেছেন, “إن هذا القرآن أنزل على سبعة أحرف” (নিশ্চয়ই এই কুরআন সাতটি হরফ বা পদ্ধতিতে অবতীর্ণ হয়েছে)। ‘হরফ’ শব্দের অর্থ দিক বা প্রান্ত। এখানে ‘সাত হরফ’ বলতে মূলত আরবের সাতটি প্রধান গোত্রের উচ্চারণভঙ্গি বা ভাষারীতির বৈচিত্র্যকে বোঝানো হয়েছে।
الاختلاف فيها (মতবিরোধ):
‘সাত হরফ’ এর প্রকৃত অর্থ নিয়ে আলেমদের মধ্যে প্রায় ৪০টির মতো মত রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান তিনটি মত হলো:
১. ইবনে জারির আত-তাবারির মত: সাতটি হরফ অর্থ আরবের সাতটি ভিন্ন গোত্রের (যেমন- কুরাইশ, হুযাইল, সাকীফ, হাওয়াযিন, কিনানাহ, তামীম ও ইয়ামান) সাতটি সমার্থক শব্দ বা ভাষারীতি।
২. জমহুর (অধিকাংশ) আলেমদের মত: সাত হরফ বলতে কিরাআতের সাতটি ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি বা বৈচিত্র্য বোঝায় (শব্দের গঠন, হরকত, ইদগাম ইত্যাদি পরিবর্তন)।
৩. কাজী আয়ায ও অন্যান্যদের মত: সাত বলতে নির্দিষ্ট সংখ্যা উদ্দেশ্য নয়, বরং কুরআনের শব্দের অর্থের ব্যাপকতা ও বিশাল বৈচিত্র্য বোঝানো হয়েছে।
الحكمة فيها (হেকমত বা রহস্য):
১. তিলাওয়াত সহজ করা: আরবের বিভিন্ন গোত্রের উচ্চারণভঙ্গি ভিন্ন হওয়ায় সবার জন্য এক রীতিতে পড়া কঠিন ছিল। তাই আল্লাহ উম্মতের জন্য তিলাওয়াত সহজ করে দিয়েছেন।
২. কুরআনের ইজায (অলৌকিকত্ব) প্রমাণ করা: এত বৈচিত্র্য ও ভিন্ন ভিন্ন কিরাআত থাকা সত্ত্বেও কুরআনের মূল অর্থে কোনো বৈসাদৃশ্য বা সাংঘর্ষিকতা নেই, এটি এক মহা মোজেজা।
৩. অর্থের ব্যাপকতা: বিভিন্ন কিরাআতের কারণে শরীয়তের অনেক সূক্ষ্ম বিধান ও মাসআলা ইস্তিম্বাত (নির্ণয়) করা সহজ হয়েছে, যা ইসলামি ফিকহের ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।
[৩. কুরআনে المجاز ও الكناية এর পরিচয় দাও। কুরআনে المجاز ও الكناية এর অস্তিত্ব দলিলসহ এর অস্বীকারকারির জবাব উল্লেখ কর।]
تعريف المجاز والكناية (পরিচয়):
* المجاز (মাজায/রূপক): যখন কোনো শব্দকে তার প্রকৃত বা আভিধানিক অর্থে (হাকীকী) ব্যবহার না করে, কোনো রূপক বা আলংকারিক অর্থে ব্যবহার করা হয় এবং উভয়ের মাঝে কোনো সম্পর্ক (আলাকা) বিদ্যমান থাকে, তখন তাকে মাজায বলে।
* الكناية (কিনায়াহ/ইঙ্গিত): যখন কোনো শব্দ বা বাক্য দ্বারা তার বাহ্যিক অর্থ উদ্দেশ্য না করে, বরং এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অন্য একটি প্রচ্ছন্ন অর্থ বোঝানো হয়, অথচ বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করাও অসম্ভব নয়, তখন তাকে কিনায়াহ বলে।
وجودهما في القرآن (কুরআনে এদের অস্তিত্ব ও দলিল):
জমহুর আলেমদের মতে কুরআনে মাজায ও কিনায়াহ ব্যাপকভাবে বিদ্যমান।
* মাজাযের দলিল: আল্লাহ বলেন, “يَجْعَلُونَ أَصَابِعَهُمْ فِي آذَانِهِم” (তারা তাদের আঙুলগুলো কানে ঢুকিয়ে দেয়)। এখানে সম্পূর্ণ ‘আঙুল’ শব্দটি মাজাযে মুরসাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, অথচ উদ্দেশ্য হলো ‘আঙুলের অগ্রভাগ’, কারণ পুরো আঙুল কানে ঢোকানো অসম্ভব।
* কিনায়াহর দলিল: আল্লাহ বলেন, “أَوْ لَامَسْتُمُ النِّسَاءَ” (অথবা তোমরা নারীদের স্পর্শ কর)। এখানে ‘স্পর্শ’ দ্বারা কিনায়াহ বা ইঙ্গিতে ‘সহবাস’ বোঝানো হয়েছে, যা কুরআনের শালীনতার অকাট্য প্রমাণ।
الرد على من أنكر (অস্বীকারকারীদের জবাব):
ইবনে তাইমিয়া, দাউদ যাহেরি প্রমুখ কিছু আলেম কুরআনে মাজায অস্বীকার করেছেন। వారి যুক্তি হলো- মাজায মানে এক প্রকার মিথ্যা বা ঘুরিয়ে বলা, যা আল্লাহর কালামে থাকতে পারে না। কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে সুস্পষ্ট আরবি ভাষায়, তাই সবকিছুর হাকীকী অর্থ নিতে হবে।
জবাব: মাজায বা কিনায়াহ কখনোই মিথ্যা নয়, বরং এটি আরবি সাহিত্যের সর্বোচ্চ অলংকার (بلاغة)। আল্লাহ তায়ালা আরবি সাহিত্যের সর্বোচ্চ অলংকারপূর্ণ রীতিতেই কুরআন নাযিল করেছেন। এর মাধ্যমে ভাবগাম্ভীর্য ও অর্থের বিশালতা প্রকাশ পায়। তাই কুরআনে এর অস্তিত্ব অনস্বীকার্য।
[৪. المنطوق ও المفهوم এর পরিচয় দাও। المنطوق ও المفهوم কত প্রকার ও কী কী? المفهوم দ্বারা দলিল গ্রহণে কি মতবিরোধ রয়েছে? বিস্তারিত বর্ণনা কর।]
تعريف المنطوق والمفهوم (পরিচয়):
* المنطوق (মানতূক): বাক্যের উচ্চারিত শব্দ থেকে সরাসরি যে অর্থ বা বিধান বোঝা যায়, তাকে মানতূক বলে। অর্থাৎ, শব্দ তার নিজের উচ্চারিত রূপ দিয়েই যে অর্থ প্রকাশ করে।
* المفهوم (মাফহূم): বাক্যের উচ্চারিত শব্দের বাইরে, শব্দের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য বা বিপরীত অবস্থা থেকে যে অর্থ বোঝা যায়, তাকে মাফহূম বলে।
أقسامهما (প্রকারভেদ):
المنطوق দুই প্রকার:
১. الصريح (সুস্পষ্ট): যা সরাসরি মূল অর্থ প্রকাশ করে (যেমন- নস, যাহির)।
২. غير الصريح (অস্পষ্ট): যা সরাসরি নয়, বরং ইঙ্গিত বা ইশারা থেকে বোঝা যায় (যেমন- দালালাতুল ইক্তিযা, দালালাতুল ইশারা)।
المفهوم দুই প্রকার:
১. مَفْهُوْمُ الْمُوَافَقَةِ (মাফহূমে মুওয়াফাকাহ): যখন অনুচ্চারিত অবস্থার বিধান এবং উচ্চারিত অবস্থার বিধান একই হয়। যেমন- কুরআনে পিতামাতাকে ‘উফ’ বলতে নিষেধ করা হয়েছে। এর মাফহূম হলো, তাদের প্রহার করা বা গালি দেওয়া আরও বেশি মাত্রায় হারাম।
২. مَفْهُوْمُ الْمُخَالَفَةِ (মাফহূমে মুখালাফাহ): যখন অনুচ্চারিত অবস্থার বিধান উচ্চারিত অবস্থার বিপরীত হয়। যেমন- “মুমিনরা যদি ফাসেক হয়, তবে যাচাই কর।” এর মাফহূম হলো, ফাসেক না হলে (ন্যায়পরায়ণ হলে) যাচাইয়ের প্রয়োজন নেই।
الاختلاف في الاحتجاج بالمفهوم (মাফহূম দ্বারা দলিল গ্রহণে মতবিরোধ):
মাফহূমে মুওয়াফাকাহ দ্বারা দলিল গ্রহণের ব্যাপারে সকল আলেম একমত। তবে ‘মাফহূমে মুখালাফাহ’ দ্বারা দলিল গ্রহণের ক্ষেত্রে মতবিরোধ রয়েছে:
* ইমাম শাফেয়ী, মালেক ও আহমাদ (রহ.) এর মতে: কিছু নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে মাফহূমে মুখালাফাহ শরীয়তের হুজ্জত বা স্বাধীন দলিল হিসেবে গ্রহণযোগ্য।
* ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর মতে: কুরআনের আয়াত বা সুন্নাহর ক্ষেত্রে ‘মাফহূমে মুখালাফাহ’ স্বাধীন দলিল হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয় (إلا إذا دلت عليه قرينة)। তবে মানুষের সাধারণ কথাবার্তা বা সামাজিক আইনের ক্ষেত্রে এটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
[৫. القسم এর শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ কী? القسم কত প্রকার এবং এর صيغة কী কী? কুরআনে القسم এর উপকারিতাসমূহ বর্ণনা কর।]
تعريف القسم (কসম এর অর্থ):
* লুগাতান (শাব্দিক): القسم (কসম) অর্থ শপথ, হলফ বা দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। এর বহুবচন أَقْسَامٌ।
* ইসতিলাহান (পারিভাষিক): পরিভাষায়, কোনো সম্মানিত বিষয় বা বস্তুর উল্লেখ করে নিজের কথার সত্যতা বা দাবির দৃঢ়তা প্রমাণ করার রীতিকে কসম বলা হয়।
أنواع القسم (কসমের প্রকারভেদ): কসম প্রধানত ২ প্রকার:
১. القسم الصريح (প্রকাশ্য কসম): যেখানে কসমের নির্দিষ্ট শব্দ (যেমন- أُقْسِمُ, حَلَفْتُ) বা কসমের হরফ স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে। যেমন- وَاللَّهِ, وَالْعَصْرِ।
২. القسم المضمر (উহ্য কসম): যেখানে কসমের শব্দ উহ্য থাকে, কিন্তু বাক্যের গঠন ও তাকীদ (যেমন لَـ ও نّ) থেকে বোঝা যায় যে কসম করা হয়েছে। যেমন- لَتُبْلَوُنَّ فِي أَمْوَالِكُمْ (অবশ্যই তোমাদের সম্পদ দ্বারা পরীক্ষা করা হবে)।
صيغته (কসমের শব্দমালা/হরফসমূহ):
আরবিতে কসমের মূল হরফ তিনটি: الباء (বা), الواو (ওয়াও) এবং التاء (তা)। এগুলোর সাহায্যে কসম করা হয়। যেমন- بِاللَّهِ, وَاللَّهِ, تَاللهِ।
فوائد القسم في القرآن (কুরআনে কসমের উপকারিতা):
১. تأكيد الكلام (তাকীদ বা দৃঢ়তা প্রদান): مخاطب (শ্রোতা বা পাঠক) যেন বিষয়টিতে কোনো প্রকার সন্দেহ পোষণ না করে, সেজন্য কসমের মাধ্যমে কথার গুরুত্ব বহুগুণ বাড়ানো হয়।
২. شرف المقسم به (শপথকৃত বস্তুর মর্যাদা প্রকাশ): আল্লাহ যখন কোনো বস্তুর (যেমন- সূর্য, চাঁদ, ডুমুর, সময়) কসম খান, তখন এর মাধ্যমে ওই বস্তুর বিশেষ গুরুত্ব এবং স্রষ্টার মহান কুদরত প্রকাশ পায়।
৩. مراعاة لغة العرب (আরবদের বাকরীতির অনুসরণ): কসম করা ছিল প্রাচীন আরবদের একটি অত্যন্ত জোরালো সাহিত্যিক রীতি। কুরআন সেই রীতি অনুসরণ করে অত্যন্ত সাবলীল ও অলংকারপূর্ণ ভাষায় তাদের সামনে সত্য তুলে ধরেছে।
[৬. الجدل এর পরিচয় দাও। مناظرة القران এর প্রকারগুলো দলিলসহ লেখ। الجدل এর ক্ষেত্রে কুরআনের পদ্ধতি বর্ণনা কর।]
تعريف الجدل (আল-জাদাল এর পরিচয়):
الجدل (জাদাল) শব্দের আভিধানিক অর্থ তর্ক করা, বিতর্ক করা বা যুক্তি খণ্ডন করা। পরিভাষায়, এমন তর্ক বা বিতর্ক যা নিজের সত্য মতকে প্রতিষ্ঠিত করতে এবং প্রতিপক্ষের বাতিল দাবিকে শক্তিশালী যুক্তির মাধ্যমে খণ্ডন করতে ব্যবহৃত হয়। কুরআনে একে ‘মুনাজারাহ’ (مناظرة) বা ‘মুজাদালাহ’ বলা হয়েছে।
أنواع مناظرات القرآن وأدلتها (কুরআনে বিতর্কের প্রকার ও প্রমাণাদি):
কুরআনে আল্লাহ তায়ালা কাফের, মুশরিক, ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের নানা ভ্রান্ত দাবির খণ্ডন করেছেন। এর প্রধান প্রকারগুলো হলো:
১. توحيد (তাওহীদ বা একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা): মুশরিকদের একাধিক মাবুদের দাবি খণ্ডন। প্রমাণ: “لَوْ كَانَ فِيهِمَا آلِهَةٌ إِلَّا اللَّهُ لَفَسَدَتَا” (যদি আকাশ ও পৃথিবীতে আল্লাহ ছাড়া অন্য মাবুদ থাকত, তবে উভয়ই ধ্বংস হয়ে যেত)।
২. إثبات البعث (পরকাল ও পুনরুত্থান প্রমাণ): কাফেরদের দাবি খণ্ডন। তারা বলত, হাড় পচে যাওয়ার পর কে জীবিত করবে? প্রমাণ: “قُلْ يُحْيِيهَا الَّذِي أَنْشَأَهَا أَوَّلَ مَرَّةٍ” (বলুন, তিনি জীবিত করবেন, যিনি প্রথমবার এগুলো সৃষ্টি করেছেন)।
৩. إثبات النبوة (নবুওয়াত প্রমাণ): মক্কার কাফেররা বলত, কুরআন কোনো মানুষের রচনা। আল্লাহ চ্যালেঞ্জ দিয়ে প্রমাণ করেছেন: “فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِنْ مِثْلِهِ” (তাহলে এর মতো একটি সূরা নিয়ে আসো)।
طريقة القرآن في المناظرة (বিতর্কের ক্ষেত্রে কুরআনের পদ্ধতি):
১. حكمة وموعظة حسنة (প্রজ্ঞা ও সুন্দর উপদেশ): আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, “وجادلهم بالتي هي أحسن” (তাদের সাথে উত্তম পন্থায় বিতর্ক করো)। কুরআন কখনোই গালিগালাজ বা উগ্র পথ বেছে নেয়নি।
২. إفحام الخصم بالدليل البديهي (অকাট্য ও সহজবোধ্য যুক্তি দ্বারা পরাস্ত করা): কুরআন অত্যন্ত যৌক্তিক ও বাস্তব উদাহরণ দিয়ে প্রতিপক্ষের যুক্তি খণ্ডন করে, যা সাধারণ বিবেক সহজেই মেনে নেয়।
৩. تدرج في الحجة (যুক্তির ক্রমবিকাশ): প্রতিপক্ষকে ধাপে ধাপে যুক্তি উপস্থাপন করে কোণঠাসা করে সত্যকে উদ্ভাসিত করা।
مجموعة (ب) [খ-বিভাগ: সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন]
[৭. اسباب النزول বলতে কী বুঝ? اسباب النزول জানার উপকারিতাসমূহ বর্ণনা কর।]
اسباب النزول (আসবাবুন নুযূল):
‘আসবাবুন নুযূল’ অর্থ অবতীর্ণ হওয়ার কারণ বা প্রেক্ষাপট। ইসলামি পরিভাষায়, রাসূল (সা.)-এর যুগে সংঘটিত এমন কোনো বিশেষ ঘটনা বা সাহাবীদের করা এমন কোনো প্রশ্নের উত্তর, যাকে কেন্দ্র করে তাৎক্ষণিকভাবে কুরআনের এক বা একাধিক আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে, তাকে ওই আয়াতের ‘শানে নুযূল’ বা ‘আসবাবুন নুযূল’ বলা হয়।
فوائد معرفتها (উপকারিতা):
১. আয়াতের সঠিক অর্থ অনুধাবন: শানে নুযূল না জানলে অনেক আয়াতের প্রকৃত অর্থ ও উদ্দেশ্য বোঝা অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়।
২. শরীয়তের বিধানের রহস্য উদ্ঘাটন: আল্লাহ কেন একটি নির্দিষ্ট বিধান বা আইন দিলেন, তার পেছনের হিকমত ও তাৎপর্য জানা যায়।
৩. সন্দেহ দূরীকরণ: শানে নুযূল জানলে আয়াতের হুকুম কার ওপর প্রয়োগ হবে এবং তা নির্দিষ্ট নাকি ব্যাপক, সে সম্পর্কে সৃষ্ট ভুল বোঝাবুঝি ও সন্দেহ দূর হয়।
[৮. الرسم العثماني বা উসমানি লিপিকলা এর পরিচয় দাও।]
الرسم العثماني (রাসমুল উসমানি) এর পরিচয়:
‘রাসমুল উসমানি’ বা উসমানি লিপিকলা বলতে পবিত্র কুরআনের ওই বিশেষ লিখন পদ্ধতি বা বানানরীতিকে বোঝায়, যা তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান (রা.)-এর যুগে আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়েছিল।
তাঁর খেলাফতকালে ইসলামি সাম্রাজ্য অনেক বড় হওয়ায় কুরআনের পঠন ও লিখনরীতি নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দেয়। তখন তিনি সাহাবীদের ইজমা বা ঐকমত্যের ভিত্তিতে, হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) এর নেতৃত্বে কুরাইশি ভাষায় একটি প্রমিত কপিতে সম্পূর্ণ কুরআন সংকলন করেন। উম্মতের মধ্যে মতবিরোধ এড়ানোর জন্য অন্যান্য ভিন্ন পাঠরীতির ব্যক্তিগত অনুলিপিগুলো পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেন। এই বিশেষ বানান ও লিখনরীতিই সারা বিশ্বে ‘উসমানি স্ক্রিপ্ট’ বা ‘রাসমুল উসমানি’ নামে পরিচিত এবং এটি অপরিবর্তনীয় ও বাধ্যতামূলক (তাওকিফি)।
[৯. কুরআনে المتشابه এর পরিচয় দাও। এর ব্যাখ্যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে কি? বর্ণনা কর।]
المتشابه (মুতাশাবিহ) এর পরিচয়:
কুরআনের যে সকল আয়াতের অর্থ অস্পষ্ট, বাহ্যিকভাবে একাধিক অর্থের সম্ভাবনা রাখে অথবা এর প্রকৃত অর্থ মানবজ্ঞানের ধরাছোঁয়ার বাইরে, সেগুলোকে ‘মুতাশাবিহাত’ বা অস্পষ্ট আয়াত বলা হয়। যেমন- আল্লাহর সিফাত (হাত, চোখ), কিয়ামতের নির্দিষ্ট সময়, জান্নাত-জাহান্নামের প্রকৃত রূপ এবং সূরার প্রারম্ভিক অক্ষরসমূহ (হুরূফে মুকাত্তায়াত)।
هل يعلم تأويله غير الله؟ (এর ব্যাখ্যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে কি?):
এ বিষয়ে সূরা আলে ইমরানের ৭ নং আয়াতের ওয়াকফ (থামা) এর ওপর ভিত্তি করে দুটি মত রয়েছে:
১. অধিকাংশ সালাফ ও জমহুর আলেমদের মতে: এর প্রকৃত ব্যাখ্যা বা রহস্য আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না (وَمَا يَعْلَمُ تَأْوِيلَهُ إِلَّا اللَّهُ)। তাই এগুলোর ওপর শুধু ঈমান আনতে হবে।
২. কিছু আলেম (যেমন ইবনে আব্বাস রা.) এর মতে: আল্লাহ ছাড়াও ‘রাসিখুনা ফিল ইলম’ বা সুগভীর জ্ঞানের অধিকারী আলেমরা গবেষণা করে এর কিছু ব্যাখ্যা বা তাৎপর্য জানতে পারেন, তবে এর পূর্ণাঙ্গ হাকীকত কেবল আল্লাহই ভালো জানেন।
[১০. কুরআনে الامثال তথা উপমাসমূহ উল্লেখের উপকারিতা আলোচনা কর।]
فوائد الأمثال (উপমার উপকারিতা):
‘আমসাল’ বা উপমা হলো কোনো অদেখা বা বিমূর্ত বিষয়কে বাস্তব বা পরিচিত বস্তুর সাথে তুলনা করে সহজভাবে তুলে ধরা। কুরআনে এর বহু উপকারিতা রয়েছে:
১. تقريب المعنى (অর্থ সহজবোধ্য করা): কঠিন, আধ্যাত্মিক ও বিমূর্ত বিষয়কে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে মানুষের মনের কাছাকাছি নিয়ে আসা।
২. ترغيب وترهيب (উৎসাহ ও ভীতি প্রদর্শন): জান্নাত বা ভালো কাজের উপমা দিয়ে উৎসাহ প্রদান এবং জাহান্নাম বা মন্দ কাজের উপমা দিয়ে ভীতি সৃষ্টি করা।
৩. تذكر وعبرة (স্মরণ ও শিক্ষা গ্রহণ): উপমার মাধ্যমে মানুষ সহজে শিক্ষা নিতে পারে এবং তা দীর্ঘদিন মনে থাকে। আল্লাহ বলেন, “আমি মানুষের জন্য এসব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি, যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করে।”
৪. إقناع الخصم (প্রতিপক্ষকে বোঝানো): অকাট্য যুক্তির মাধ্যমে প্রতিপক্ষের ভ্রান্ত ধারণা খণ্ডন করা।
[১১. قصص القران এর প্রকারসমূহ আলোচনা কর।]
أنواع قصص القرآن (কুরআনে বর্ণিত কিসসার প্রকারভেদ):
কুরআনে বর্ণিত ইতিহাস বা ঘটনাবলি (কিসাসুল কুরআন) উদ্দেশ্যহীন কোনো গল্প নয়, বরং তা হেদায়েত ও শিক্ষার জন্য। এগুলো প্রধানত তিন প্রকার:
১. قصص الأنبياء (নবী-রাসূলদের কিসসা): হযরত আদম, নূহ, ইব্রাহিম, মুসা, ঈসা (আ.) প্রমুখ নবী-রাসূলদের দাওয়াত, মুজিযা এবং তাঁদের অবাধ্য কওমের সাথে ঘটা ঘটনাবলি ও শাস্তির বিবরণ।
২. قصص الأمم والشخصيات (পূর্ববর্তী জাতি ও বিশেষ ব্যক্তিদের কিসসা): যারা নবী ছিলেন না, কিন্তু তাদের ঘটনা শিক্ষণীয়। যেমন- আসহাবে কাহাফ, লোকমান হেকিম, যুলকারনাইন, কারুন, আসহাবুল উখদুদ ইত্যাদির ঘটনা।
৩. قصص أحداث عهد الرسول (রাসূল সা.-এর যুগের ঘটনাবলি): রাসূল (সা.)-এর যুগে সংঘটিত বিভিন্ন যুদ্ধ ও অলৌকিক ঘটনা। যেমন- বদর, উহুদ, খন্দক, হিজরত, ইসরা ও মিরাজের ঘটনা এবং মুনাফিকদের ষড়যন্ত্রের বিবরণ।
[১২. القراء السبعة এর নামগুলো লেখ।]
أسماء القراء السبعة (সাতজন প্রসিদ্ধ ক্বারীর নাম):
ইলমুল কিরাআতে যে সাতজন ক্বারী ‘কিরাআতে সাবআ’ বা সাত কিরাআতের ইমাম হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত ও মুতাওয়াতির, তাঁরা হলেন:
- ইমাম নাফে’ আল-মাদানী (রহ.) (মদীনা)
- ইমাম ইবনে কাসির আল-মক্কী (রহ.) (মক্কা)
- ইমাম আবু আমর আল-বাসরী (রহ.) (বসরা)
- ইমাম ইবনে আমের আশ-শামী (রহ.) (সিরিয়া/শাম)
- ইমাম আসিম আল-কুফী (রহ.) (কুফা)
- ইমাম হামযা আল-কুফী (রহ.) (কুফা)
- ইমাম কিসায়ী আল-কুফী (রহ.) (কুফা)






