As-Sirah An-Nabawiyyah (Code: 201204) – ২০২০ প্রশ্ন ও উত্তর
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২০ এর আল-কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের السيرة النبوية (আস-সীরাহ আন-নাববীয়্যাহ) বিষয়ের সম্পূর্ণ উত্তরমালা।
বিঃদ্রঃ পরীক্ষার্থীদের আগামী পরীক্ষার সর্বোচ্চ প্রস্তুতির সুবিধার্থে মূল প্রশ্নপত্রের আরবি প্রশ্ন ও এর বাংলা অনুবাদসহ বিকল্প সবগুলোর (অথবা) প্রশ্নের ১০০% নির্ভুল ও তথ্যবহুল উত্তর বিস্তারিতভাবে নিচে দেওয়া হলো।
مجموعة (أ) [ক-বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্ন]
[১. السيرة النبوية এর পরিচয়, মর্যাদা ও পাঠের গুরুত্ব আলোচনা কর।]
السيرة النبوية (সীরাতুন্নবী) এর পরিচয়:
আভিধানিক অর্থ: السيرة শব্দটি سير থেকে নির্গত, যার অর্থ চলা, পথ, পদ্ধতি, জীবনবৃত্তান্ত বা জীবনী।
পারিভাষিক অর্থ: ইসলামি পরিভাষায়, ‘السيرة النبوية’ বলতে মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম থেকে ইন্তেকাল পর্যন্ত তাঁর সমগ্র জীবনের ঘটনাবলি, উত্তম চরিত্র, জিহাদ ও যুদ্ধবিগ্রহ, ইসলাম প্রচার এবং তাঁর কথা, কাজ ও অনুমোদনের পূর্ণাঙ্গ বিবরণকে বোঝায়।
مكانتها (মর্যাদা):
সীরাতের মর্যাদা ইসলামি শরীয়তে অপরিসীম। এটি পবিত্র কুরআনের বাস্তব ব্যাখ্যা এবং সুন্নাহর আদি উৎস। সীরাত পাঠের মাধ্যমেই মুসলমানরা ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা, আত্মিক পরিশুদ্ধি এবং আদর্শ জীবন যাপনের পদ্ধতি অনুধাবন করতে পারে।
أهمية دراستها (পাঠের গুরুত্ব):
১. রাসূল (সা.)-কে চেনা এবং ভালোবাসা: সীরাত পাঠের মাধ্যমে রাসূল (সা.)-এর জীবনের ত্যাগ, সংগ্রাম ও মহান আদর্শ জানা যায়, যা মুমিনের অন্তরে তাঁর প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি করে। আর তাঁর প্রতি ভালোবাসাই ঈমানের শর্ত।
২. কুরআনের সঠিক ব্যাখ্যা অনুধাবন: পবিত্র কুরআনের অনেক আয়াতের ‘শানে নুযূল’ বা অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট সীরাতের মাধ্যমে জানা যায়, যা ছাড়া কুরআন পূর্ণাঙ্গভাবে বোঝা সম্ভব নয়।
৩. সুন্নাহর অনুসরণ: রাসূল (সা.)-এর জীবন ছিল কুরআনের জীবন্ত রূপ। সীরাত পাঠ করে আমরা ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে তাঁর সুন্নাহ বাস্তবায়ন করতে পারি।
৪. উত্তম চরিত্র গঠন: রাসূল (সা.)-এর ধৈর্য, ক্ষমা, সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও দয়া আমাদের উত্তম চরিত্র গঠনে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে।
৫. দীনি দাওয়াতের পদ্ধতি শিক্ষা: কীভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে হিকমত ও ধৈর্যের সাথে ইসলাম প্রচার করতে হবে, তা সীরাত থেকে হাতে-কলমে শেখা যায়।
[২. জাহেলী যুগের আরবদের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা লিপিবদ্ধ কর।]
الحالات السياسية (রাজনৈতিক অবস্থা):
প্রাক-ইসলামি যুগে বা আইয়্যামে জাহেলিয়াত-এ আরবে কোনো সুসংগঠিত রাষ্ট্র বা কেন্দ্রীয় সরকার ব্যবস্থা ছিল না। সমগ্র সমাজ ছিল গোত্রভিত্তিক (القبيلة)। প্রতিটি গোত্রের নিজস্ব নেতা বা ‘শাইখ’ থাকত। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার চরম অভাব ছিল। এক গোত্রের সাথে অন্য গোত্রের সামান্য কারণে যুগের পর যুগ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলত, যেমন- আইয়্যামুল ফিজার, বাসুসের যুদ্ধ ইত্যাদি। ‘জোর যার মুল্লুক তার’- এটাই ছিল তৎকালীন আরবের রাজনৈতিক মূলনীতি।
الحالات الثقافية (সাংস্কৃতিক অবস্থা):
আরবদের মধ্যে লেখাপড়ার প্রচলন খুব কম থাকলেও তাদের স্মৃতিশক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর। কবিতা রচনা, বাগ্মিতা এবং বংশতালিকা মুখস্থ করায় তারা ছিল পারদর্শী। তাদের মেলাগুলোতে, বিশেষ করে ‘উকায’ মেলায় সাহিত্য চর্চা ও কবিতা পাঠের তুমুল প্রতিযোগিতা হতো (যেমন- সাবয়ুল মুয়াল্লাকাত)। তবে তাদের এই সাহিত্যের পাশাপাশি সংস্কৃতিতে নারী নির্যাতন, জীবন্ত কন্যাসন্তান কবর দেওয়া (وعد البنات), মদ্যপান, জুয়া, ব্যভিচার ও কুসংস্কার গভীরভাবে মিশে ছিল। নারীদের কোনো সামাজিক মর্যাদা ছিল না এবং তাদের বাজারের পণ্যের মতো বেচাকেনা করা হতো।
الحالات الاقتصادية (অর্থনৈতিক অবস্থা):
আরবদের অর্থনীতি মূলত পশুপালন (উট, ছাগল), ব্যবসা-বাণিজ্য ও কিছু মরূদ্যানভিত্তিক কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল ছিল। মক্কার কুরাইশরা মূলত ব্যবসায়ী ছিল এবং তারা শীত ও গ্রীষ্মকালে ইয়েমেন ও সিরিয়ায় বিশাল বাণিজ্য কাফেলা পাঠাত (رحلة الشتاء والصيف)। তবে সমাজে সুদপ্রথা (الربا) চরমভাবে প্রচলিত ছিল, যার কারণে গরিবরা ঋণের দায়ে দাসত্ব বরণ করত এবং ধনীরা আরও ধনী হতো। লুটতরাজ (الغزو), ছিনতাই ও চাঁদাবাজিও আয়ের একটি অন্যতম উৎস ছিল। সম্পদের চরম বৈষম্য সমাজে বিরাজমান ছিল।
[৩. খাদিজা (রা) এর পক্ষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ব্যবসা পরিচালনা ও তার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া সম্পর্কে আলোচনা কর।]
تجارة رسول الله لخديجة (খাদিজা রা.-এর পক্ষে ব্যবসা পরিচালনা):
খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ (রা.) ছিলেন মক্কার কুরাইশ বংশের একজন অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত, ধনী ও বুদ্ধিমতী বিধবা ব্যবসায়ী নারী। তিনি বিশ্বস্ত লোকদের মাধ্যমে সিরিয়া ও ইয়েমেনে বাণিজ্য কাফেলা পাঠাতেন। যুবক মুহাম্মদ (সা.)-এর অনুপম সততা (যাঁর উপাধি ছিল ‘আল-আমীন’ বা বিশ্বস্ত) ও মহান চরিত্রের কথা শুনে খাদিজা (রা.) তাঁকে নিজের ব্যবসার দায়িত্ব দিয়ে সিরিয়ায় যাওয়ার প্রস্তাব দেন এবং অন্যদের চেয়ে দ্বিগুণ পারিশ্রমিক দেওয়ার কথা বলেন। রাসূল (সা.) খাদিজা (রা.)-এর দাস মায়সারাহকে সাথে নিয়ে সিরিয়ার বসরায় বাণিজ্য সফরে যান। তাঁর সততা, বুদ্ধিমত্তা ও অসাধারণ ব্যবসায়িক দক্ষতার কারণে এই সফরে অপ্রত্যাশিত বিশাল মুনাফা অর্জিত হয়। সফর শেষে মায়সারাহ ফিরে এসে খাদিজা (রা.)-কে রাসূল (সা.)-এর উন্নত চরিত্র, আমানতদারি ও সফরের অলৌকিক ঘটনাবলির কথা বিস্তারিত জানান।
زواجه بها (খাদিজা রা.-এর সাথে বিবাহ):
রাসূল (সা.)-এর মহৎ চরিত্র, বিশ্বস্ততা ও যোগ্যতায় মুগ্ধ হয়ে খাদিজা (রা.) নিজেই তাঁর বান্ধবী নাফিসা বিনতে মুনয়িয়ার মাধ্যমে রাসূল (সা.)-এর কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। রাসূল (সা.) তাঁর চাচা আবু তালিব এবং বংশের অন্যান্য মুরব্বিদের সাথে পরামর্শ করে এই সম্মানজনক প্রস্তাবে সম্মতি জ্ঞাপন করেন। তখন রাসূল (সা.)-এর বয়স ছিল ২৫ বছর এবং খাদিজা (রা.)-এর বয়স ছিল ৪০ বছর। আবু তালিব নিজে উপস্থিত থেকে বিয়ের খুতবা পাঠ করেন এবং ৫০০ দিরহাম মোহরানা ধার্য করে তাদের বিবাহ সম্পন্ন হয়। এটি ছিল রাসূল (সা.)-এর জীবনের প্রথম বিবাহ। খাদিজা (রা.) জীবিত থাকাকালীন (প্রায় ২৫ বছর) রাসূল (সা.) অন্য কোনো নারীকে বিয়ে করেননি। খাদিজা (রা.) তাঁর সর্বস্ব দিয়ে ইসলাম ও রাসূল (সা.)-এর খেদমত করেছিলেন।
[৪. কখন ও কীভাবে অহী অবতীর্ণ হয়? অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাওয়াতি কার্যক্রম কীভাবে পরিচালনা করেন? সবিস্তারে বর্ণনা কর।]
متى وكيف نزل الوحي؟ (কখন ও কীভাবে অহী অবতীর্ণ হয়?):
রাসূল (সা.) যখন ৪০ বছর বয়সের কাছাকাছি পৌঁছান, তখন সমাজের অন্যায়-অবিচার দেখে তাঁর অন্তর ব্যথিত হতো। তিনি মক্কার অদূরে ‘হেরা’ গুহায় দিনের পর দিন নির্জনে আল্লাহ তায়ালার ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। অবশেষে নবুওয়াতের প্রথম বছর, রমজান মাসের কদরের রাতে (হিজরতের ১৩ বছর পূর্বে) জিবরাঈল (আ.) তাঁর কাছে প্রথম অহী নিয়ে আসেন। জিবরাঈল (আ.) তাঁকে বললেন “اقْرَأْ” (পড়ুন)। রাসূল (সা.) বললেন “আমি তো পড়তে জানি না।” জিবরাঈল (আ.) তাঁকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ছেড়ে দিয়ে আবার পড়তে বললেন। এভাবে তিনবার আলিঙ্গন করার পর জিবরাঈল (আ.) সূরা আলাকের প্রথম ৫টি আয়াত “اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ…” তেলাওয়াত করেন। রাসূল (সা.) তা মুখস্থ করে নেন। এটিই ছিল প্রথম অহী অবতীর্ণের ঐতিহাসিক ঘটনা, যা পৃথিবীতে এক নতুন যুগের সূচনা করে।
كيف أجرى الدعوة بعده؟ (অতঃপর দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা):
অহী প্রাপ্তির পর রাসূল (সা.)-এর দাওয়াতি কার্যক্রমকে প্রধানত দুটি যুগে ভাগ করা যায়: মাক্কী যুগ ও মাদানী যুগ।
১. মাক্কী যুগ (১৩ বছর):
* গোপনে দাওয়াত (৩ বছর): নবুওয়াতের শুরুতে তিনি গোপনে তাঁর আত্মীয়স্বজন ও কাছের বিশ্বস্ত বন্ধুদের মাঝে ইসলামের দাওয়াত দেন। খাদিজা (রা.), আলী (রা.), আবু বকর (রা.) ও যায়েদ ইবনে হারিসা (রা.) সবার আগে ইসলাম গ্রহণ করেন। তারা দারুল আরকামে গোপন বৈঠক করতেন।
* প্রকাশ্যে দাওয়াত (১০ বছর): আল্লাহর আদেশে তিনি সাফা পাহাড়ে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে মক্কাবাসীকে তাওহীদের দাওয়াত দেন। প্রকাশ্যে দাওয়াত শুরু হলে কুরাইশরা চরম বিরোধিতা, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ও অকথ্য নির্যাতন শুরু করে। মুসলমানদের সামাজিক বয়কট (শিয়াবে আবি তালিবে অবরুদ্ধ) করা হয়। তবুও তিনি তায়েফে দাওয়াত নিয়ে যান এবং হজের মৌসুমে আগত মানুষের কাছে দাওয়াত দিতে থাকেন।
২. মাদানী যুগ (১০ বছর):
মদীনায় হিজরতের পর তিনি একটি স্বাধীন ইসলামি রাষ্ট্র গঠন করেন। মদীনার সনদ প্রণয়ন করে সকল গোত্রের মধ্যে শান্তি স্থাপন করেন। এরপর যখন মক্কার কাফেররা মদীনা আক্রমণ করে, তখন বাধ্য হয়ে জিহাদের (বদর, উহুদ, খন্দক ইত্যাদি) মাধ্যমে সত্যকে রক্ষা করেন। পরিশেষে মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তিনি সমগ্র আরব উপদ্বীপে ইসলামকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন এবং শান্তির ধর্মকে বিজয়ী করেন।
[৫. হুদায়বিয়ার সন্ধির প্রেক্ষাপট ও গুরুত্বপূর্ণ ধারাসমূহ বিশদভাবে আলোচনা কর।]
خلفية صلح الحديبية (প্রেক্ষাপট):
হিজরী ৬ষ্ঠ সনের জিলকদ মাসে রাসূল (সা.) স্বপ্নে দেখেন যে, তিনি সাহাবীদের সাথে নিয়ে বায়তুল্লাহর তওয়াফ করছেন। নবীদের স্বপ্ন অহী সমতুল্য হওয়ায় তিনি প্রায় ১৪০০ সাহাবী নিয়ে উমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা রওনা হন। তাঁদের সাথে কোনো যুদ্ধের অস্ত্র ছিল না, কেবল আত্মরক্ষার জন্য কোষবদ্ধ তলোয়ার ছিল এবং সাথে কুরবানির পশু ছিল। কুরাইশরা খবর পেয়ে মুসলমানদের মক্কায় প্রবেশে বাধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং হুদায়বিয়া নামক স্থানে তাঁদের পথরোধ করে। পরিস্থিতি শান্ত করতে ও নিজেদের উদ্দেশ্য বোঝাতে রাসূল (সা.) উসমান (রা.)-কে দূত হিসেবে মক্কায় পাঠান। কিন্তু কুরাইশরা তাঁকে আটকে রাখে এবং মুসলমানদের শিবিরে তাঁর শাহাদাতের গুজব ছড়িয়ে পড়ে। তখন রাসূল (সা.) একটি গাছের নিচে বসে সাহাবীদের কাছ থেকে যুদ্ধের কঠিন শপথ গ্রহণ করেন, যা ‘বাইয়াতুর রিদওয়ান’ নামে পরিচিত। মুসলমানদের এই দৃঢ়তা দেখে কুরাইশরা ভয় পেয়ে যায় এবং সুহাইল ইবনে আমরকে পাঠিয়ে সন্ধির প্রস্তাব দেয়। দীর্ঘ আলোচনার পর যে ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তা-ই ‘হুদায়বিয়ার সন্ধি’ নামে পরিচিত।
أهم بنوده (গুরুত্বপূর্ণ ধারাসমূহ):
১. মুসলমানরা এ বছর উমরাহ না করেই মদীনায় ফিরে যাবেন এবং আগামী বছর এসে মাত্র ৩ দিন মক্কায় অবস্থান করে উমরাহ পালন করবেন।
২. আগামী ১০ বছর উভয় পক্ষের মধ্যে কোনো প্রকার যুদ্ধবিগ্রহ হবে না এবং একে অপরের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
৩. আরবের যেকোনো গোত্র স্বাধীনভাবে মুসলমান বা কুরাইশদের সাথে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারবে।
৪. মক্কার কোনো লোক (মুসলমান হলেও) তার অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া মদীনায় গেলে তাকে কুরাইশদের কাছে ফেরত দিতে হবে, কিন্তু মদীনার কোনো লোক মক্কায় গেলে কুরাইশরা তাকে ফেরত দিতে বাধ্য থাকবে না।
৫. মক্কায় অবস্থানকালে মুসলমানদের সাথে কোনো প্রকার দুর্ব্যবহার করা যাবে না।
এই চুক্তির কিছু ধারা দৃশ্যত মুসলমানদের জন্য চরম অসম্মানজনক ও একতরফা মনে হলেও আল্লাহ তায়ালা কুরআনে একে ‘ফাতহুম মুবীন’ বা সুস্পষ্ট বিজয় বলে আখ্যায়িত করেন। কারণ এই সন্ধির ফলেই ইসলাম দ্রুত প্রসারের সুযোগ পায় এবং মাত্র ২ বছরের মাথায় বিনাযুদ্ধে মক্কা বিজয় সম্ভব হয়।
[৬. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শারীরিক গঠন সবিস্তারে আলোচনা কর।]
الشمائل الخلقية (শারীরিক গঠন):
রাসূল (সা.)-এর দৈহিক গঠন ছিল অত্যন্ত নিখুঁত, মোহনীয় ও আকর্ষণীয়। মানবজাতির মধ্যে তিনি ছিলেন সবচেয়ে সুন্দরতম অবয়বের অধিকারী। সাহাবায়ে কেরামের বর্ণনা অনুযায়ী তাঁর শারীরিক বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
- উচ্চতা ও গড়ন: তিনি অতি লম্বাও ছিলেন না, আবার বেঁটেও ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন মাঝারি গড়নের ও সুঠাম দেহের অধিকারী। তবে কোনো দীর্ঘকায় ব্যক্তির সাথে হাঁটলে তাঁকেই সবচেয়ে বেশি মানানসই ও দীর্ঘ মনে হতো। তাঁর কাঁধ ছিল প্রশস্ত।
- গায়ের রঙ: তাঁর গায়ের রঙ ছিল অত্যন্ত উজ্জ্বল, যা একেবারে ধবধবে সাদাও ছিল না এবং শ্যামলাও ছিল না, বরং তা ছিল লালচে সাদা ও দীপ্তিময়।
- চেহারা মুবারক: তাঁর চেহারা ছিল পূর্ণিমার চাঁদের মতো উজ্জ্বল ও গোলাকার। তিনি যখন আনন্দিত হতেন, তখন তাঁর চেহারা থেকে যেন আলো ঠিকরে পড়ত। হযরত হাসান বিন সাবিত (রা.) বলেন, “আপনার চেয়ে সুন্দর কোনো মানুষ আমার চোখ কখনো দেখেনি।”
- চোখ ও ভ্রু: তাঁর চোখগুলো ছিল বড় বড় ও আকর্ষণীয়। চোখের মণি ছিল কালচে এবং সাদা অংশ ছিল অত্যন্ত সাদা (তাতে হালকা লাল আভা ছিল)। চোখের পাতা ছিল ঘন ও দীর্ঘ। তাঁর ভ্রু দুটি ছিল ধনুকাকৃতির, দীর্ঘ ও ঘন, তবে তা মাঝখানে মিলিত ছিল না।
- নাক ও মুখ: তাঁর নাক ছিল উন্নত ও খাড়া। মুখগহ্বর ছিল প্রশস্ত এবং দাঁতগুলো ছিল অত্যন্ত সুন্দর, যা হাসির সময় মুক্তার মতো ঝকঝক করত।
- চুল ও দাড়ি: তাঁর চুল ও দাড়ি ছিল অত্যন্ত ঘন। চুলগুলো সামান্য কোঁকড়ানো ছিল এবং তা কানের লতি বা কাঁধ পর্যন্ত ঝুলানো থাকত। তাঁর দাড়িতে খুব সামান্যই (প্রায় ১৭-২০টি) সাদা চুল ছিল।
- ঘাম মুবারক: তাঁর ঘাম মুবারক ছিল মৃগনাভীর (কস্তুরী) চেয়েও সুগন্ধযুক্ত। সাহাবীরা তাঁর ঘাম আতর হিসেবে ব্যবহার করতেন।
مجموعة (ب) [খ-বিভাগ: সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন]
[৭. প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার সম্পর্কে আলোচনা কর।]
নবুওয়াত প্রাপ্তির প্রথম ৩ বছর রাসূল (সা.) গোপনে কেবল তাঁর নিকটাত্মীয় ও বন্ধুদের মাঝে ইসলামের দাওয়াত দেন। এরপর আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে সূরা শুআরার আয়াত “وَأَنذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ” (আপনি আপনার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করুন) এবং সূরা হিজরের “فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ” (আপনাকে যা আদিষ্ট করা হয়েছে, তা প্রকাশ্যে প্রচার করুন) অবতীর্ণ হলে তিনি প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের আদেশ পান।
রাসূল (সা.) সাফা পাহাড়ে আরোহণ করে মক্কার বিভিন্ন গোত্রকে ডাক দেন এবং তাওহীদের দাওয়াত পেশ করেন। তিনি বলেন, “আমি যদি বলি এই পাহাড়ের পেছনে একদল অশ্বারোহী বাহিনী তোমাদের আক্রমণ করতে প্রস্তুত, তোমরা কি বিশ্বাস করবে?” সবাই বলল, “হ্যাঁ, কারণ আপনি আল-আমীন।” তখন তিনি বললেন, “আমি তোমাদের জন্য এক কঠিন শাস্তির সতর্ককারী হিসেবে প্রেরিত হয়েছি।” তাঁর চাচা আবু লাহাব এর তীব্র বিরোধিতা করে এবং তাঁকে অভিশাপ দেয়। প্রকাশ্যে দাওয়াত শুরু হওয়ার পর থেকেই কুরাইশদের পক্ষ থেকে রাসূল (সা.) ও নবদীক্ষিত মুসলমানদের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন শুরু হয়, যা ইসলামের ইতিহাসে চরম আত্মত্যাগের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
[৮. হিজরতের সংজ্ঞা দাও। আবিসিনিয়ার হিজরত সংক্ষেপে আলোচনা কর।]
الهجرة (হিজরতের সংজ্ঞা):
হিজরত শব্দের আভিধানিক অর্থ দেশত্যাগ করা বা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গমন করা। ইসলামি পরিভাষায়, দীনের সুরক্ষার্থে এবং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কুফরের দেশ (দারুল হারব) ত্যাগ করে ইসলামের দেশে (দারুল ইসলাম) বা অপেক্ষাকৃত নিরাপদ কোনো স্থানে গমন করাকে হিজরত বলে।
الهجرة إلى الحبشة (আবিসিনিয়ার হিজরত):
মক্কায় কুরাইশদের অত্যাচার ও নির্যাতন যখন চরমে পৌঁছায় এবং মুসলমানদের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে, তখন নবুওয়াতের ৫ম সনে রাসূল (সা.) মজলুম সাহাবীদের আবিসিনিয়ায় (বর্তমান ইথিওপিয়া) হিজরত করার নির্দেশ দেন। কারণ সেখানকার খ্রিষ্টান রাজা নাজ্জাশি ছিলেন অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ শাসক। প্রথম দফায় ১১ জন পুরুষ ও ৪ জন নারী হিজরত করেন, যার নেতৃত্বে ছিলেন হযরত উসমান (রা.) ও তাঁর স্ত্রী (রাসূল সা.-এর কন্যা) রুকাইয়া (রা.)। পরে দ্বিতীয় দফায় হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব (রা.)-এর নেতৃত্বে আরও প্রায় ৮৩ জন পুরুষ ও ১৮ জন নারী সেখানে হিজরত করেন। কুরাইশরা তাদের ফিরিয়ে আনতে দূত পাঠালেও রাজা নাজ্জাশি মুসলমানদের আশ্রয় দেন এবং তারা সেখানে দীর্ঘকাল নিরাপদে অবস্থান করেন।
[৯. আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টির বর্ণনা দাও।]
রাসূল (সা.) মদীনায় হিজরত করার পর মুহাজিররা (মক্কা থেকে আগত মুসলমানরা) সম্পূর্ণ নিঃস্ব ও আশ্রয়হীন ছিলেন। তারা দীনের জন্য নিজেদের সমস্ত সহায়-সম্পত্তি মক্কায় ফেলে এসেছিলেন। তাদের অর্থনৈতিক পুনর্বাসন এবং মানসিক প্রশান্তির জন্য রাসূল (সা.) আনসার (মদীনার স্থানীয় সাহায্যকারী মুসলমান) ও মুহাজিরদের মধ্যে এক অনন্য ‘ভ্রাতৃত্বের বন্ধন’ (المؤاخاة) স্থাপন করেন।
রাসূল (সা.) আনসারদের এক এক জনকে মুহাজিরদের এক এক জনের ‘ভাই’ বানিয়ে দেন। আনসাররা এই ভ্রাতৃত্বকে এমনভাবে গ্রহণ করেন যে, তাঁরা আনন্দের সাথে নিজেদের ঘরবাড়ি, জমিজমা ও ব্যবসার অর্ধেক অংশ মুহাজির ভাইদের দিয়ে দেন। এই ভ্রাতৃত্ব এতই মজবুত ছিল যে, প্রথমদিকে তারা একে অপরের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী পর্যন্ত হতেন (পরে কুরআনের আয়াতে রক্তসম্পর্কীয় উত্তরাধিকার প্রবর্তিত হলে তা রহিত করা হয়)। এটি ইসলামি সমাজের সাম্য, মহানুভবতা, ত্যাগ ও ভালোবাসার এক বিরল দৃষ্টান্ত, যা মানব ইতিহাসে অদ্বিতীয়।
[১০. বানু কুরাইযার চুক্তি ভঙ্গকরণ সম্পর্কে আলোচনা কর।]
মদীনায় ইহুদিদের তিনটি প্রধান গোত্রের মধ্যে বানু কুরাইযা ছিল অন্যতম। মদীনার ঐতিহাসিক সনদ অনুযায়ী তারা মুসলমানদের সাথে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ ছিল এবং বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে মদীনাকে সম্মিলিতভাবে রক্ষা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল।
কিন্তু পঞ্চম হিজরীতে খন্দক (আহযাব) যুদ্ধের চরম সংকটময় মুহূর্তে, যখন দশ হাজার বিশাল কুরাইশ ও মিত্র বাহিনী মদীনা অবরোধ করে, তখন বানু কুরাইযা মদীনার অভ্যন্তর থেকে চুক্তি ভঙ্গ করে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করে। তারা শত্রুদের সাথে হাত মেলায় এবং মুসলমানদের পিঠে ছুরি মারার ষড়যন্ত্র করে। আল্লাহ মুসলমানদের রক্ষা করেন এবং খন্দক যুদ্ধ শেষে রাসূল (সা.) তাদের দুর্গ অবরোধ করেন। অবশেষে তারা তাদেরই মনোনীত বিচারক হযরত সাদ ইবনে মুআজ (রা.)-এর রায় মেনে নিতে বাধ্য হয়। বিচারে মদীনার নিরাপত্তায় এই ক্ষমার অযোগ্য বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি হিসেবে তাদের যুদ্ধক্ষম পুরুষদের হত্যা করা হয় এবং নারী ও শিশুদের বন্দী করা হয়।
[১১. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্ত্রীগণের নাম লেখ।]
রাসূল (সা.)-এর পবিত্র স্ত্রীগণকে কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী ‘উম্মাহাতুল মুমিনীন’ বা মুমিনদের মাতা বলা হয়। তাঁরা হলেন মোট ১১ জন:
- খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ (রা.)
- সাওদা বিনতে যামআহ (রা.)
- আয়েশা বিনতে আবু বকর (রা.)
- হাফসা বিনতে উমর (রা.)
- যয়নব বিনতে খুযায়মা (রা.)
- উম্মে সালামা (হিন্দ বিনতে আবু উমাইয়া) (রা.)
- যয়নব বিনতে জাহশ (রা.)
- জুওয়াইরিয়া বিনতে হারিস (রা.)
- উম্মে হাবীবা (রামলা বিনতে আবু সুফিয়ান) (রা.)
- সাফিয়্যা বিনতে হুয়াই (রা.)
- মায়মুনা বিনতে হারিস (রা.)
[১২. তায়েফের ঘটনা সংক্ষেপে লেখ।]
আবু তালিব ও খাদিজা (রা.)-এর ইন্তেকালের পর মক্কায় কুরাইশদের নির্যাতন বহুগুণ বেড়ে যায়। তখন রাসূল (সা.) নবুওয়াতের ১০ম সনে ইসলাম প্রচারের নতুন ক্ষেত্র তৈরির আশায় যায়েদ ইবনে হারিসাকে (রা.) সাথে নিয়ে পায়ে হেঁটে তায়েফ গমন করেন। তিনি তায়েফের সর্দারদের কাছে টানা ১০ দিন তাওহীদের দাওয়াত দেন।
কিন্তু তারা দাওয়াত তো গ্রহণ করেইনি, বরং চরম দুর্ব্যবহার করে এবং তাঁর পেছনে শহরের বখাটে ছেলেদের লেলিয়ে দেয়। তারা রাসূল (সা.)-কে পাথর মেরে রক্তাক্ত করে দেয়, এমনকি তাঁর জুতা মুবারক রক্তে জমাট বেঁধে যায়। বেহুঁশ অবস্থায় তিনি একটি আঙুর বাগানে আশ্রয় নেন এবং আল্লাহর দরবারে অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ভাষায় দোয়া করেন। আল্লাহ পাহাড়ের ফেরেশতা পাঠিয়ে তায়েফবাসীকে ধ্বংস করার প্রস্তাব দিলে, দয়ার নবী (সা.) তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং তাদের হেদায়েতের দোয়া করেন। তায়েফের এই ঘটনা রাসূল (সা.)-এর জীবনের অন্যতম কঠিন ও মর্মান্তিক মুহূর্ত ছিল।






