Economics (Code: 201106) – ২০২২ প্রশ্ন ও উত্তর
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২২ এর আল-কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অর্থনীতি ও ইসলামি অর্থনীতি (Economics and Islamic Economics) বিষয়ের সম্পূর্ণ উত্তরমালা।
বিঃদ্রঃ পরীক্ষার্থীদের সুবিধার্থে মূল প্রশ্নপত্রের ক-বিভাগ (রচনামূলক) এবং খ-বিভাগ (সংক্ষিপ্ত) এর সবগুলো প্রশ্নের ১০০% নির্ভুল উত্তর দেওয়া হলো।
ক বিভাগ — রচনামূলক প্রশ্ন (মান—১৫x৪=৬০)
[ যে কোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে ]
১। ইসলামি অর্থনীতির সংজ্ঞা দাও। ইসলামি অর্থনীতির বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনা কর।
ইসলামি অর্থনীতির সংজ্ঞা:
যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর মৌলিক নীতিমালার আলোকে মানুষের অর্থনৈতিক কার্যাবলি পরিচালনা করে এবং হালাল-হারামের বিধান মেনে উৎপাদন, ভোগ ও বণ্টন নিশ্চিত করে, তাকে ইসলামি অর্থনীতি বলে। এটি এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে মানুষের পার্থিব কল্যাণের পাশাপাশি পরকালীন মুক্তির লক্ষ্যও নিহিত থাকে।
ইসলামি অর্থনীতির বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- সম্পদের মালিকানা আল্লাহর: ইসলামি অর্থনীতিতে আসমান ও জমিনের সকল সম্পদের নিরঙ্কুশ মালিকানা একমাত্র মহান আল্লাহর। মানুষ কেবল তার ট্রাস্টি বা আমানতদার হিসেবে সম্পদ ভোগ ও ব্যবহার করার অধিকার রাখে।
- হালাল-হারামের বিধান: এ ব্যবস্থায় হালাল পন্থায় উপার্জন এবং হালাল পথে ব্যয় বাধ্যতামূলক। মদ, জুয়া, ঘুষ, পতিতাবৃত্তি ও অন্যান্য অবৈধ পন্থায় উপার্জন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
- সুদমুক্ত অর্থনীতি: ইসলামি অর্থনীতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি সম্পূর্ণ সুদমুক্ত। সুদ (রিবা)-কে ইসলামে চরম হারাম করা হয়েছে এবং এর বিকল্প হিসেবে মুনাফাভিত্তিক অংশীদারি কারবার (মুদারাবা ও মুশারাকা) চালু করা হয়েছে।
- যাকাত ব্যবস্থা: সম্পদের সুষম বণ্টনের জন্য ইসলামি অর্থনীতিতে যাকাত ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ধনীদের সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ সমাজের অভাবী ও দরিদ্রদের মাঝে বণ্টন করা হয়।
- সম্পদের সুষম বণ্টন: ইসলাম এমন কোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সমর্থন করে না যেখানে সম্পদ কেবল গুটিকয়েক ধনীর হাতে কুক্ষিগত থাকে। তাই উত্তরাধিকার আইন (ফারায়েজ) ও সাদাকাহর মাধ্যমে সম্পদ বণ্টন নিশ্চিত করা হয়।
- নৈতিকতার সাথে সমন্বয়: ইসলামি অর্থনীতি কেবল বস্তুতান্ত্রিক বিষয় নয়, বরং এটি নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এখানে মজুতদারি (ইহতিকার), কালোবাজারি এবং ওজনে কম দেওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
২। ইসলামি ভোক্তা কাকে বলে? একজন ইসলামি ভোক্তা ও সাধারণ ভোক্তার মধ্যে পার্থক্য আলোচনা কর।
ইসলামি ভোক্তা:
যে ভোক্তা তার দৈনন্দিন ভোগ ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর বিধিবিধান এবং হালাল-হারামের সীমারেখা কঠোরভাবে মেনে চলে, তাকে ইসলামি ভোক্তা বলে। একজন ইসলামি ভোক্তা কেবল নিজের তৃপ্তির জন্যই ভোগ করে না, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চিন্তাও তার মাঝে বিরাজ করে।
ইসলামি ভোক্তা ও সাধারণ ভোক্তার মধ্যে পার্থক্য:
| সাধারণ ভোক্তা | ইসলামি ভোক্তা |
|---|---|
| ১. সাধারণ ভোক্তার ভোগের প্রধান উদ্দেশ্য হলো নিজের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত তৃপ্তি ও উপযোগ লাভ। | ১. ইসলামি ভোক্তার ভোগের উদ্দেশ্য হলো নিজের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। |
| ২. সাধারণ ভোক্তা ভোগ করার সময় পণ্যটি হালাল নাকি হারাম, তা খুব একটা বিবেচনা করে না। | ২. ইসলামি ভোক্তা কেবল হালাল বস্তু ভোগ করে এবং হারাম ও সন্দেহযুক্ত বস্তু থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকে। |
| ৩. সাধারণ ভোক্তা তার ইচ্ছামতো অতিরিক্ত ভোগ বা অপচয় করতে পারে, আবার কৃপণতাও দেখাতে পারে। | ৩. ইসলামি ভোক্তা অপচয় (ইসরাফ) করে না, আবার কৃপণতাও করে না, বরং উভয়ের মাঝে মধ্যপন্থা অবলম্বন করে। |
| ৪. সাধারণ ভোক্তার ভোগের ক্ষেত্রে সমাজের অন্য মানুষের প্রতি সাধারণত কোনো দায়বদ্ধতা থাকে না। | ৪. ইসলামি ভোক্তা তার সম্পদের ওপর অভাবীদের অধিকার (যাকাত ও সাদাকাহ) স্বীকার করে এবং তা প্রদান করে। |
| ৫. সাধারণ ভোক্তা কেবল ইহকালীন চিন্তায় মগ্ন থাকে। তার কোনো পরকালীন জবাবদিহিতার ভয় থাকে না। | ৫. ইসলামি ভোক্তা তার প্রতিটি বৈধ ও অবৈধ ব্যয়ের জন্য পরকালে আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার অনুভূতি রাখে। |
৩। চাহিদা সূচি ও চাহিদা রেখার পার্থক্য নির্ণয় কর। একটি কাল্পনিক চাহিদা সূচি থেকে চাহিদা রেখা অঙ্কন কর।
চাহিদা সূচি ও চাহিদা রেখার পার্থক্য:
- সংজ্ঞা: অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে বিভিন্ন দামে একজন ভোক্তা কোনো দ্রব্যের যে পরিমাণ ক্রয় করতে ইচ্ছুক থাকে, তা যখন ছকের বা তালিকার মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়, তখন তাকে চাহিদা সূচি (Demand Schedule) বলে। আর চাহিদা সূচির জ্যামিতিক বা লৈখিক প্রকাশকে চাহিদা রেখা (Demand Curve) বলে।
- প্রকাশ মাধ্যম: চাহিদা সূচি হলো গাণিতিক বা সংখ্যাগত প্রকাশ। অন্যদিকে চাহিদা রেখা হলো রেখাচিত্রের মাধ্যমে জ্যামিতিক প্রকাশ।
- বোধগম্যতা: চাহিদা সূচি থেকে দ্রব্যের দাম ও চাহিদার পরিমাণ স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। কিন্তু চাহিদা রেখা দ্বারা দাম ও চাহিদার বিপরীতমুখী সম্পর্কটি আরও আকর্ষণীয়ভাবে চোখের সামনে ফুটে ওঠে।
- নির্ভরতা: চাহিদা রেখা অঙ্কনের জন্য চাহিদা সূচির ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু চাহিদা সূচি তৈরি করার জন্য চাহিদা রেখার কোনো প্রয়োজন হয় না।
কাল্পনিক চাহিদা সূচি থেকে চাহিদা রেখা অঙ্কন:
নিম্নে একটি কাল্পনিক চাহিদা সূচি দেওয়া হলো:
| দ্রব্যের দাম (টাকায়) | চাহিদার পরিমাণ (একক) |
|---|---|
| ১০ | ২০ |
| ৮ | ৩০ |
| ৬ | ৪০ |
| ৪ | ৫০ |
অঙ্কন পদ্ধতি: ছক কাগজে (Graph paper) ভূমি (X) অক্ষে চাহিদার পরিমাণ এবং লম্ব (Y) অক্ষে দ্রব্যের দাম নির্দেশ করতে হবে। সূচি অনুযায়ী, দাম যখন ১০ টাকা তখন চাহিদা ২০ একক। এ দুটি মানের সমন্বয়ে একটি বিন্দু পাওয়া যাবে। এভাবে দাম কমে ৮, ৬ ও ৪ টাকা হলে চাহিদা বেড়ে যথাক্রমে ৩০, ৪০ ও ৫০ একক হয়, যার ফলে আরও কয়েকটি বিন্দু পাওয়া যাবে। এই বিন্দুগুলো যোগ করলে বাম থেকে ডানদিকে নিম্নগামী যে রেখাটি পাওয়া যায়, তা-ই হলো নির্ণেয় চাহিদা রেখা। (পরীক্ষার খাতায় পেন্সিল দিয়ে একটি ডানদিকে নিম্নগামী সরলরেখা এঁকে দেখাতে হবে)।
৪। ইসলামি ব্যাংক ও গতানুগতিক ব্যাংকের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ কর। সংক্ষেপে ইসলামি ব্যাংক উদ্ভাবনের ক্রম-ইতিহাস বর্ণনা কর।
ইসলামি ব্যাংক ও গতানুগতিক ব্যাংকের মধ্যে পার্থক্য:
| গতানুগতিক ব্যাংক (Conventional Bank) | ইসলামি ব্যাংক (Islamic Bank) |
|---|---|
| ১. গতানুগতিক ব্যাংক সম্পূর্ণ সুদভিত্তিক ব্যবস্থার ওপর পরিচালিত হয়। | ১. ইসলামি ব্যাংক ইসলামি শরিয়তের নীতিমালা এবং সুদমুক্ত ব্যবস্থার ওপর পরিচালিত হয়। |
| ২. এটি নির্দিষ্ট সুদের হারে আমানত গ্রহণ করে। | ২. এটি আল-ওয়াদিয়াহ বা মুদারাবা নীতির ভিত্তিতে আমানত গ্রহণ করে এবং মুনাফার অংশ প্রদান করে। |
| ৩. গতানুগতিক ব্যাংক মূলত ঋণ প্রদান করে এবং তার ওপর সুদ আদায় করে। | ৩. ইসলামি ব্যাংক মুদারাবা, মুশারাকা, মুরাবাহা, ইজারা ইত্যাদি অংশীদারি পদ্ধতিতে বিনিয়োগ করে। |
| ৪. এতে আমানতকারী লোকসানের ঝুঁকি বহন করে না, ব্যাংক নির্দিষ্ট সুদ দিতে বাধ্য থাকে। | ৪. এতে লাভ-লোকসান উভয়েরই ঝুঁকি আমানতকারী ও ব্যাংক যৌথভাবে বহন করে। |
ইসলামি ব্যাংক উদ্ভাবনের ক্রম-ইতিহাস:
প্রাচীনকাল থেকেই মুসলমানদের মাঝে সুদমুক্ত লেনদেনের প্রচলন থাকলেও আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে অনেক পরে। আধুনিক যুগে সুদমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থার ধারণা প্রথম বাস্তবে রূপ নেয় ১৯৬৩ সালে মিসরের ‘মিত গামার লোকাল সেভিংস ব্যাংক’ (Mit Ghamr Local Savings Bank) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. আহমাদ আল-নাজ্জার ছিলেন এর মূল রূপকার। এটি বিশাল সাফল্য লাভ করে।
এরপর ১৯৭৫ সালে দুবাইয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘দুবাই ইসলামিক ব্যাংক’, যা ছিল বিশ্বের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক ইসলামি ব্যাংক। একই বছর ১৯৭৫ সালে ওআইসি (OIC)-এর উদ্যোগে জেদ্দায় ‘ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ (IDB) প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক রূপ দেয় এবং মুসলিম দেশগুলোতে এর প্রসারে ভূমিকা রাখে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে প্রথম সুদমুক্ত ব্যাংক হিসেবে ১৯৮৩ সালের ৩০ মার্চ ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড’ (IBBL) প্রতিষ্ঠিত হয়, যা বর্তমানে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকে পরিণত হয়েছে।
৫। মূল্য নিয়ন্ত্রণে ইসলামি সরকারের ভূমিকা আলোচনা কর।
উত্তর: ইসলামি অর্থনীতি মূলত একটি মুক্তবাজার অর্থনীতি সমর্থন করে, যেখানে পণ্যের দাম সাধারণত বাজারে ক্রেতার চাহিদা ও বিক্রেতার যোগানের ভিত্তিতে স্বাভাবিক নিয়মে নির্ধারিত হয়। তবে বাজারে যদি অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে জনজীবন বিপর্যস্ত করে, তখন ইসলামি সরকার চুপ করে বসে থাকে না। মূল্য নিয়ন্ত্রণে ইসলামি সরকারের নিম্নলিখিত ভূমিকা রয়েছে:
- মজুতদারি ও কালোবাজারি রোধ: কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অধিক মুনাফার আশায় পণ্য মজুত (যাকে ইসলামে ‘ইহতিকার’ বলা হয়) করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে দেয়। ইসলামি সরকার এসব অবৈধ কার্যক্রম কঠোর হস্তে দমন করে এবং গুদাম থেকে পণ্য বাজারে আনতে বাধ্য করে।
- সিন্ডিকেট ভাঙা: বাজারে গুটিকয়েক লোক যাতে সিন্ডিকেট করে নিজেদের ইচ্ছেমতো দাম নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, সেজন্য সরকার বাজারে পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করে।
- সরবরাহ নিশ্চিত করা: প্রকৃতপক্ষেই যদি কোনো পণ্যের সংকট দেখা দেয়, তবে সরকার বিদেশ থেকে পণ্য আমদানি করে বা সরকারি গুদাম থেকে বাজারে সরবরাহ বাড়িয়ে দাম স্বাভাবিক রাখার উদ্যোগ নেয়।
- সরাসরি মূল্য নির্ধারণ (তাসঈর): স্বাভাবিক অবস্থায় ইসলামি সরকার সরাসরি মূল্য নির্ধারণ করে দেয় না। কারণ এটি বিক্রেতার প্রতি অবিচার হতে পারে। তবে ব্যবসায়ীরা যদি চরম জুলুম শুরু করে এবং জনগণের ভোগান্তি চরমে পৌঁছায়, তবে জনস্বার্থে সরকার হস্তক্ষেপ করে একটি ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ (Price Fixation) করে দিতে পারে।
- নৈতিকতার তদারকি: ‘হিসবাহ’ বা বাজার তদারকি ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকার বাজারে ওজনে কম দেওয়া, প্রতারণা, মিথ্যা শপথ ও ধোঁকাবাজি প্রতিরোধ করে একটি সুস্থ বাজার ব্যবস্থা নিশ্চিত করে, যা পরোক্ষভাবে মূল্য স্থিতিশীল রাখে।
৬। পূর্ণ-প্রতিযোগিতামূলক বাজার বলতে কী বুঝ? ইসলামে কেন পূর্ণ-প্রতিযোগিতামূলক বাজার পছন্দ করা হয়? আলোচনা কর।
পূর্ণ-প্রতিযোগিতামূলক বাজার:
যে বাজারে অসংখ্য ক্রেতা ও অসংখ্য বিক্রেতা থাকে, তারা সমজাতীয় পণ্য ক্রয়-বিক্রয় করে এবং কোনো একক ক্রেতা বা একক বিক্রেতা বাজারের দামকে প্রভাবিত করতে পারে না, তাকে পূর্ণ-প্রতিযোগিতামূলক বাজার বলে। এই বাজারে দাম নির্ধারিত হয় ক্রেতা ও বিক্রেতার দরকষাকষির মাধ্যমে।
ইসলামে কেন পূর্ণ-প্রতিযোগিতামূলক বাজার পছন্দ করা হয়:
ইসলাম সবসময় সাম্য, ইনসাফ ও জুলুমমুক্ত অর্থনীতির কথা বলে। এ কারণে ইসলাম একচেটিয়া বাজারের চেয়ে পূর্ণ-প্রতিযোগিতামূলক বাজারকে বেশি পছন্দ করে। এর কারণগুলো হলো:
- জুলুমমুক্ত ব্যবস্থা: এই বাজারে দাম নির্ধারিত হয় স্বাভাবিক চাহিদা ও যোগানের ভিত্তিতে। ফলে কোনো বিক্রেতা একচেটিয়া প্রভাব খাটিয়ে ইচ্ছেমতো দাম বাড়িয়ে ক্রেতার ওপর জুলুম করতে পারে না।
- ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ: বাজারে অসংখ্য প্রতিযোগী বিক্রেতা থাকায় কেউ অতিরিক্ত দাম হাঁকতে পারে না। ফলে সাধারণ মানুষ সর্বদা ন্যায্যমূল্যে পণ্য লাভ করে, যা ইসলামি নীতির পরিপূরক।
- শোষণের অনুপস্থিতি: এই বাজারে একচেটিয়া কারবার বা সিন্ডিকেটের মতো কোনো শোষণ থাকে না। ইসলাম সব ধরনের অর্থনৈতিক শোষণ ও ধোঁকাবাজিকে হারাম ঘোষণা করেছে।
- সম্পদের সুষম বণ্টন: একচেটিয়া বাজারে মুনাফা ও সম্পদ গুটিকয়েক লোকের হাতে জমা হয়। কিন্তু পূর্ণ-প্রতিযোগিতামূলক বাজারে অসংখ্য বিক্রেতা থাকায় মুনাফা সমাজের অনেক মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, যা ইসলামের সম্পদ বণ্টনের নীতির সম্পূর্ণ অনুকূল।
৭। ইসলামি বিমা কী? ইসলামি বিমার গুরুত্ব আলোচনা কর।
ইসলামি বিমা (তাকাফুল):
ইসলামি বিমা বা ‘তাকাফুল’ হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে শরিয়তসম্মত উপায়ে একদল লোক পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে একটি যৌথ তহবিলে চাঁদা প্রদান করে এবং তাদের মধ্যে কেউ কোনো আকস্মিক আর্থিক বা শারীরিক ক্ষতির সম্মুখীন হলে ওই তহবিল থেকে তাকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। এটি সম্পূর্ণ সুদ ও জুয়ামুক্ত একটি ব্যবস্থা।
ইসলামি বিমার গুরুত্ব:
- পারস্পরিক সহযোগিতা: ইসলামি বিমা মূলত ইসলামী ভ্রাতৃত্ববোধ ও পারস্পরিক সহযোগিতার (তাকাফুল) ওপর প্রতিষ্ঠিত। বিপদে একে অপরের পাশে দাঁড়ানো ইসলামে অত্যন্ত সওয়াবের কাজ হিসেবে উৎসাহিত করা হয়েছে।
- সুদমুক্ত আর্থিক নিরাপত্তা: প্রচলিত গতানুগতিক বিমা ব্যবস্থায় সুদের লেনদেন থাকে, যা ইসলামে হারাম। ইসলামি বিমা মানুষকে সুদমুক্ত উপায়ে যেকোনো দুর্ঘটনার আর্থিক নিরাপত্তা প্রদান করে।
- হালাল বিনিয়োগ: ইসলামি বিমা কোম্পানিগুলো তাদের তহবিলের অর্থ মদ, জুয়া বা হারামের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায় বিনিয়োগ করে না। তারা হালাল মুদারাবা ও মুশারাকা পদ্ধতিতে বিনিয়োগ করে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে।
- মানসিক প্রশান্তি: ভবিষ্যৎ জীবনের আকস্মিক বিপদের ক্ষেত্রে তাকাফুল একজন মানুষকে মানসিক দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত রাখে। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যুতে এটি পরিবারকে আর্থিক নিরাপত্তা দেয়।
৮। মুদ্রাস্ফীতি কাকে বলে? মুদ্রাস্ফীতির ফলাফল বর্ণনা কর।
মুদ্রাস্ফীতি:
যখন দেশের অর্থনীতিতে অর্থের সরবরাহ বৃদ্ধি পায় এবং দ্রব্যমূল্য ক্রমাগত বাড়ে, অর্থাৎ অর্থের ক্রয়ক্ষমতা বা মান কমে যায়, তখন সেই অর্থনৈতিক অবস্থাকে মুদ্রাস্ফীতি (Inflation) বলে। সহজ কথায়, যখন অনেক বেশি পরিমাণ অর্থ দিয়ে খুব সামান্য পরিমাণ পণ্য কিনতে হয়, তাকে মুদ্রাস্ফীতি বলে।
মুদ্রাস্ফীতির ফলাফল:
- স্থির আয়ের মানুষের কষ্ট: মুদ্রাস্ফীতির ফলে জিনিসপত্রের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে যায়, কিন্তু চাকরিজীবী বা স্থির আয়ের মানুষদের বেতন সে অনুপাতে বাড়ে না। ফলে তাদের জীবনযাত্রার মান মারাত্মকভাবে নিচে নেমে যায়।
- ধনিক শ্রেণির লাভ: উৎপাদক ও ব্যবসায়ীরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের দাম বাড়িয়ে অধিক মুনাফা লাভ করে। এতে সমাজে ধনী আরও ধনী হয় এবং গরিব আরও গরিব হয়, যা বৈষম্য সৃষ্টি করে।
- সঞ্চয় হ্রাস: দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাওয়ায় মানুষের আয়ের বড় অংশ দৈনন্দিন ভোগের পেছনেই ব্যয় হয়ে যায়, ফলে মানুষের সঞ্চয় করার ক্ষমতা কমে যায়।
- বিনিয়োগে প্রভাব: মুদ্রাস্ফীতির হার অতিরিক্ত হলে অর্থনীতিতে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হয় এবং কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হয়।
- ঋণগ্রহীতা ও ঋণদাতার ওপর প্রভাব: মুদ্রাস্ফীতির ফলে অর্থের মান কমে যাওয়ায় ঋণগ্রহীতারা লাভবান হয় (কারণ তারা কম দামের অর্থ ফেরত দেয়) এবং ঋণদাতারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
খ বিভাগ — সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্ন (মান—৫x৪=২০)
[ যে কোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে ]
৯। ইসলামি অর্থনীতিতে সম্পদ বণ্টনের মূলনীতিগুলো লেখ।
উত্তর: ইসলামি অর্থনীতিতে সম্পদ বণ্টনের প্রধান মূলনীতিগুলো হলো:
১. সকল সম্পদের নিরঙ্কুশ মালিকানা কেবল আল্লাহর, মানুষ কেবল ট্রাস্টি হিসেবে তা ভোগ করবে।
২. সম্পদ যাতে সমাজের কেবল ধনীদের হাতেই আবর্তিত না হয়, তার সুব্যবস্থা করা।
৩. যাকাত, ফিতরা, ও সাদাকাহ প্রদানের মাধ্যমে ধনীদের সম্পদে গরিবদের অধিকার নিশ্চিত করা।
৪. মিরাস বা ফারায়েজ (উত্তরাধিকার) আইনের মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির সম্পদ তার আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে সুষমভাবে বণ্টন করা।
১০। ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধিটি ব্যাখ্যা কর।
উত্তর: যখন কোনো ভোক্তা একটি নির্দিষ্ট সময়ে একই দ্রব্য ক্রমাগতভাবে ভোগ করতে থাকে, তখন ওই দ্রব্যের মোট উপযোগ বাড়লেও প্রান্তিক উপযোগ (অতিরিক্ত একক থেকে প্রাপ্ত তৃপ্তি) ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে। এ নিয়মকেই অর্থনীতিতে ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধি বলে। উদাহরণস্বরূপ: প্রচণ্ড তৃষ্ণার্ত অবস্থায় প্রথম গ্লাস পানি পান করলে যে তৃপ্তি পাওয়া যায়, দ্বিতীয় গ্লাস পান করলে তার চেয়ে কম তৃপ্তি পাওয়া যায় এবং এভাবে একসময় পানি পানের তৃপ্তি শূন্য বা ঋণাত্মক হয়ে যায়।
১১। অর্থের কার্যাবলি আলোচনা কর।
উত্তর: অর্থনীতিতে অর্থের প্রধান কার্যাবলি হলো:
১. বিনিময়ের মাধ্যম: অর্থ যেকোনো পণ্য ক্রয়-বিক্রয় ও লেনদেনের সবচেয়ে সহজ ও সর্বজনগ্রাহ্য মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
২. মূল্যের পরিমাপক: যেকোনো দ্রব্য বা সেবার মূল্য অর্থের মাধ্যমেই নির্ধারণ ও প্রকাশ করা হয়।
৩. সঞ্চয়ের বাহন: দ্রব্যসামগ্রী পচে বা নষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু অর্থ সহজে ও দীর্ঘদিন সঞ্চয় করে রাখা যায়।
৪. স্থগিত লেনদেনের মান: ভবিষ্যৎ দেনা-পাওনা মেটানোর ক্ষেত্রে অর্থই প্রধান মানদণ্ড হিসেবে কাজ করে।
১২। যাকাতের ব্যয়ের খাতসমূহ আলোচনা কর।
উত্তর: পবিত্র কুরআন মজিদের সূরা আত-তাওবার ৬০ নং আয়াতে যাকাত ব্যয়ের ৮টি সুনির্দিষ্ট খাত (মাসারিফ) উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো হলো:
১. ফকির (নিঃস্ব বা গরিব)।
২. মিসকিন (অভাবী, যে কারো কাছে হাত পাতে না)।
৩. যাকাত আদায়কারী ও বন্টনকারী কর্মচারী।
৪. নব মুসলিমদের চিত্ত আকর্ষণের জন্য (মুআল্লাফাতুল কুলুব)।
৫. দাস মুক্তির জন্য।
৬. ঋণগ্রস্তদের ঋণ পরিশোধের জন্য।
৭. আল্লাহর রাস্তায় (ফি সাবিলিল্লাহ) বা দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজে।
৮. মুসাফির বা বিপদগ্রস্ত পথচারীদের জন্য।
১৩। মুনাফা ও সুদের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ কর।
উত্তর:
১. উৎস: মুনাফা অর্জিত হয় ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে, যা ইসলামে হালাল। অপরদিকে সুদ অর্জিত হয় ঋণের মাধ্যমে, যা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম।
২. ঝুঁকি: মুনাফার ক্ষেত্রে লাভ এবং লোকসান উভয়েরই ঝুঁকি থাকে। কিন্তু সুদের ক্ষেত্রে ঋণদাতার কোনো ঝুঁকি থাকে না, সে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ লাভ করেই থাকে।
৩. অর্থনৈতিক প্রভাব: হালাল মুনাফা উৎপাদন ও অর্থনীতির প্রসার ঘটায়। অন্যদিকে সুদ সম্পদকে সমাজের গুটিকয়েক লোকের হাতে পুঞ্জীভূত করে এবং বৈষম্য বাড়ায়।
১৪। ইসলামি ব্যাংকের কাজসমূহ লেখ।
উত্তর: ইসলামি ব্যাংকের প্রধান কাজসমূহ হলো:
১. আল-ওয়াদিয়াহ (আমানত) ও মুদারাবা (লাভ-লোকসানের অংশীদারি) পদ্ধতিতে জনগণের কাছ থেকে সুদমুক্ত আমানত সংগ্রহ করা।
২. মুরাবাহা, বাই-মুয়াজ্জাল, মুশারাকা, ইজারা ইত্যাদি ইসলামি পদ্ধতিতে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা।
৩. দেশের অভ্যন্তরে ও বিদেশে টাকা স্থানান্তর (Remittance) এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে সহায়তা করা।
৪. জনকল্যাণমূলক কাজে (যেমন শিক্ষা, চিকিৎসায়) যাকাত ও সাদাকাহ তহবিল গঠন করে অর্থ ব্যয় করা।
১৫। মুশারাকা ধারণাটি ব্যাখ্যা কর।
উত্তর: ‘মুশারাকা’ হলো ইসলামি অর্থনীতিতে একটি জনপ্রিয় অংশীদারি ব্যবসায় পদ্ধতি। এতে দুই বা ততোধিক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান মূলধন সরবরাহ করে এবং যৌথভাবে ব্যবসা পরিচালনা করে। চুক্তি অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট অনুপাতে তারা ব্যবসায়ের অর্জিত মুনাফা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। তবে ব্যবসায় যদি কোনো লোকসান হয়, তবে প্রত্যেকে তাদের বিনিয়োগকৃত মূলধনের আনুপাতিক হারে সেই লোকসান বহন করতে বাধ্য থাকে। ইসলামি ব্যাংকগুলো বড় বড় প্রকল্পে এই পদ্ধতিতে বিনিয়োগ করে থাকে।
১৬। ইসলামে শ্রমনীতির ব্যাখ্যা কর।
উত্তর: ইসলামি শ্রমনীতি অত্যন্ত মানবিক ও ইনসাফভিত্তিক। এর মূল বিষয়গুলো হলো:
১. শ্রমের মর্যাদা: ইসলাম শ্রমকে ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে এবং হালাল উপার্জনকারী শ্রমিককে আল্লাহর বন্ধু বলা হয়েছে।
২. উপযুক্ত মজুরি: শ্রমিকের কাজের পরিমাণ, যোগ্যতা ও ধরন অনুযায়ী তার ন্যায্য মজুরি নির্ধারণ করতে হবে।
৩. দ্রুত পরিশোধ: রাসূল (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, “শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি দিয়ে দাও।”
৪. মানবিক আচরণ: শ্রমিকের ওপর এমন কোনো কাজ চাপিয়ে দেওয়া যাবে না, যা তার সাধ্যের বাইরে। শ্রমিককে অধীনস্ত নয়, বরং ভাইয়ের চোখে দেখতে বলা হয়েছে।






