Ulumul Quran (Code: 201205) – ২০২১ প্রশ্ন ও উত্তর
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২১ এর আল-কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের علوم القرآن (উলূমুল কুরআন) বিষয়ের সম্পূর্ণ উত্তরমালা।
বিঃদ্রঃ পরীক্ষার্থীদের আগামী পরীক্ষার সর্বোচ্চ প্রস্তুতির সুবিধার্থে মূল প্রশ্নপত্রের ক ও খ উভয় বিভাগের বিকল্প সবগুলোর (অথবা) প্রশ্নের ১০০% নির্ভুল ও তথ্যবহুল উত্তর বিস্তারিতভাবে নিচে দেওয়া হলো।
مجموعة (أ) [ক-বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্ন]
[১. علوم القرآن এর সংজ্ঞা দাও। এ বিষয় রচনার ইতিহাস সবিস্তারে বর্ণনা কর।]
علوم القرآن (উলূমুল কুরআন) এর পরিচয়:
‘উলূম’ (علوم) শব্দটি ‘ইলম’ (علم) এর বহুবচন, যার অর্থ জ্ঞান বা শাস্ত্রসমূহ। আর ‘কুরআন’ হলো আল্লাহর পবিত্র কালাম।
পরিভাষায়: উলূমুল কুরআন হলো এমন কিছু জ্ঞান বা শাস্ত্রের সমষ্টি, যা পবিত্র কুরআন বুঝতে, এর সঠিক তাফসির করতে এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়াবলি জানতে সাহায্য করে। এর আলোচ্য বিষয়ের মধ্যে রয়েছে- ওহী নাজিলের পদ্ধতি, শানে নুযূল, মাক্কি ও মাদানি আয়াত, নাসিখ ও মানসুখ, মুহকাম ও মুতাশাবিহ, ইলমুল কিরাত, এবং কোরআনের মুজিজা ইত্যাদি।
تاريخ التدوين (উলূমুল কুরআন রচনার ইতিহাস):
উলূমুল কুরআন শাস্ত্রটি একদিনে রচিত হয়নি, বরং এটি পর্যায়ক্রমে বিকশিত হয়েছে:
- রাসুল (সা.) ও সাহাবিদের যুগ:
এই যুগে কোরআন লেখায় এবং মুখস্থ করায় বেশি জোর দেওয়া হতো। ইলমে তাফসির বা উলূমুল কুরআনের মূল ভিত্তি এই যুগেই রচিত হয়। সাহাবিদের মধ্যে হযরত ইবনে আব্বাস (রা.), ইবনে মাসউদ (রা.), উবাই ইবনে কাব (রা.) এবং আলী (রা.) ছিলেন এই শাস্ত্রের অগ্রপথিক। তাঁরা আয়াতের প্রেক্ষাপট ও অর্থ সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো জানতেন। - তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িদের যুগ:
এই যুগে সাহাবিদের ছাত্রগণ তথা তাবেয়িগণ (যেমন- মুজাহিদ, কাতাদাহ, সাঈদ ইবনে জুবাইর প্রমুখ) সাহাবিদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তাফসির ও কোরআনের বিভিন্ন জ্ঞান একত্রিত করতে শুরু করেন। - গ্রন্থ রচনার যুগ (التدوين):
হিজরি ২য় ও ৩য় শতকে উলূমুল কুরআনের নির্দিষ্ট শাখাগুলোর ওপর আলাদা বই লেখা শুরু হয়। যেমন- ইমাম শাফেয়ি ‘আহকামুল কুরআন’ লেখেন, আবু উবাইদ ‘নাসিখ-মানসুখ’ এবং ‘কিরাত’ এর ওপর বই লেখেন।
তবে ‘উলূমুল কুরআন’ কে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বতন্ত্র শাস্ত্র হিসেবে একত্র করে সর্বপ্রথম গ্রন্থ রচনা করেন আলী ইবনুল মারযুবান (মৃত্যু: ৩০৯ হি:)। তাঁর বইয়ের নাম ছিল ‘الْحَاوِي فِي عُلُومِ الْقُرْآن’ (আল-হাউয়ি ফি উলূমুল কুরআন)।
পরবর্তীতে আল্লামা বদরুদ্দীন যারকাশি ‘البرهان في علوم القرآن’ (আল-বুরহান) এবং আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী ‘الإتقان في علوم القرآن’ (আল-ইতকান) নামক বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ রচনা করে এই শাস্ত্রকে চূড়ান্ত ও সমৃদ্ধ রূপ দান করেন।
[২. سبب النزول এর সংজ্ঞা দাও। সাবাবুন নুযূল সম্পর্কে জানার উপকারিতা ও উপায়সমূহ বিশদভাবে বর্ণনা কর।]
سبب النزول (সাবাবুন নুযূল) এর পরিচয়:
‘সাবাব’ অর্থ কারণ বা প্রেক্ষাপট, আর ‘নুযূল’ অর্থ অবতীর্ণ হওয়া।
পরিভাষায়: ‘সাবাবুন নুযূল’ বা ‘শানে নুযূল’ বলতে সেই বিশেষ ঘটনা, পরিস্থিতি বা সাহাবিদের করা কোনো প্রশ্নকে বোঝায়, যার প্রেক্ষাপটে বা যার উত্তর দিতে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের কোনো নির্দিষ্ট আয়াত বা সুরা নাজিল করেছেন।
فوائده (সাবাবুন নুযূল জানার উপকারিতা):
শানে নুযূল জানার বহু উপকারিতা রয়েছে। যেমন:
১. সঠিক অর্থ অনুধাবন: আয়াতের সঠিক অর্থ ও আল্লাহর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য বুঝতে সাহায্য করে। প্রেক্ষাপট জানা না থাকলে আয়াতের ভুল অর্থ করার সম্ভাবনা থাকে।
২. বিধানের হিকমত জানা: কোনো আইন বা বিধান (যেমন- মদের নিষেধাজ্ঞা, পর্দার বিধান) কেন এবং কী কারণে নাজিল হয়েছে, তার রহস্য ও হিকমত জানা যায়।
৩. সন্দেহ নিরসন: অনেক সময় আয়াতের বাহ্যিক অর্থ পড়ে পাঠকের মনে সন্দেহ তৈরি হতে পারে, শানে নুযূল জানা থাকলে সেই সন্দেহ দূর হয়ে যায়।
৪. বিধান প্রয়োগের ক্ষেত্র: কুরআনের হুকুম বা আইন প্রয়োগের ক্ষেত্র সুনির্দিষ্ট করা সহজ হয় এবং কে বা কারা এর অন্তর্ভুক্ত, তা নিশ্চিত হওয়া যায়।
طرق معرفته (সাবাবুন নুযূল জানার উপায়সমূহ):
শানে নুযূল জানার একমাত্র উপায় হলো صحابة (সাহাবিদের) বিশুদ্ধ বর্ণনা (رواية صحيحة) বা নির্ভরযোগ্য মুহাদ্দিসদের হাদিস। কারণ, সাহাবিরাই ওহী নাজিলের সময় উপস্থিত ছিলেন এবং ঘটনাগুলো নিজ চোখে দেখেছেন ও সরাসরি নবীজির (সা.) কাছ থেকে শুনেছেন।
এক্ষেত্রে আকল, যুক্তি, বুদ্ধি বা অনুমান (الرأي والاجتهاد) এর কোনো স্থান নেই। যদি কোনো তাবেয়ি শানে নুযূল বর্ণনা করেন এবং কোনো সাহাবির নাম উল্লেখ না করেন, তবে তা মুরসাল হাদিস হিসেবে গণ্য হয়। তাই বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থই (যেমন- বুখারি, মুসলিম, আসবাবে নুযূল গ্রন্থাবলি) হলো শানে নুযূল জানার প্রধান উপায়।
[৩. قرآن على سبعة أحرف (সাত হরফে) নাযিল হওয়ার মর্মার্থ কী? এভাবে নাযিল হওয়ার হিকমত কী? বিস্তারিতভাবে বর্ণনা কর।]
সাত হরফে নাজিল হওয়ার মর্মার্থ (المراد):
রাসুল (সা.) বলেছেন, “কুরআন সাতটি হরফে নাজিল হয়েছে, তোমাদের কাছে যেটা সহজ মনে হয়, সেভাবেই পড়ো।”
আলেমদের মতে, এখানে ‘سبعة أحرف’ (সাত হরফ) দ্বারা সাতটি অক্ষর বোঝানো হয়নি, বরং আরবি ভাষার সাতটি প্রধান গোত্রের ভাষাগত উচ্চারণভঙ্গি বা পাঠরীতি (لهجات العرب) বোঝানো হয়েছে। তৎকালীন আরবে বিভিন্ন গোত্রের উচ্চারণে, শব্দ চয়নে এবং প্রকাশভঙ্গিতে কিছুটা ভিন্নতা ছিল। তাই আল্লাহ তায়ালা মানুষের সুবিধার্থে প্রধান সাতটি আরব গোত্রের উচ্চারণে কুরআন পড়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। এই সাতটি গোত্র হলো- কুরাইশ, হুজাইল, সাকিফ, হাওয়াযিন, কিনানা, তামিম এবং ইয়েমেন গোত্র।
এভাবে নাজিল হওয়ার হিকমত বা উদ্দেশ্য (حكمته):
কুরআন সাত হরফে বা ভিন্ন ভিন্ন উচ্চারণে নাজিল হওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি গভীর হিকমত রয়েছে:
১. তিলাওয়াত সহজ করা (التيسير): আরবদের বিভিন্ন গোত্রের উচ্চারণভঙ্গি ভিন্ন হওয়ায় সব গোত্রের বৃদ্ধ, শিশু ও মহিলাদের পক্ষে কুরাইশদের নির্দিষ্ট ভাষায় ও উচ্চারণে কুরআন পড়া অত্যন্ত কঠিন ছিল। তাই তাদের কষ্ট দূর করার জন্য আল্লাহ এই সুবিধা দিয়েছেন।
২. ইসলামের দ্রুত প্রসার: ভিন্ন ভিন্ন গোত্রের মানুষের জন্য তাদের নিজেদের মাতৃভাষায় বা অভ্যস্ত উচ্চারণে কুরআন বুঝতে, মুখস্থ করতে এবং অপরের কাছে পৌঁছাতে অনেক সুবিধা হয়েছে, যা ইসলাম প্রচারে বিশাল ভূমিকা রেখেছে।
৩. কুরআনের মুজিজা প্রমাণ (إعجاز القرآن): বিভিন্ন উচ্চারণে এবং ভিন্ন শব্দে পড়া সত্ত্বেও কুরআনের মূল অর্থের কোনো বিকৃতি বা বৈপরীত্য না ঘটা, এটি আল্লাহ তায়ালার এক বিশাল অলৌকিকত্ব।
৪. আইন বা বিধানের প্রশস্ততা: বিভিন্ন কিরাতের কারণে মুজতাহিদ ফকিহগণ একই আয়াত থেকে বিভিন্ন আইনি ফয়সালা (আহকাম) বের করতে পেরেছেন, যা ইসলামি আইনকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
[৪. جدل القرآن অর্থ কী? جدل القرآن এর প্রকারসমূহ আয়াত উল্লেখপূর্বক বিস্তারিতভাবে বর্ণনা কর।]
جدل القرآن (জাদালুল কুরআন) এর অর্থ:
‘জাদাল’ বা ‘মুনাজারা’ শব্দের অর্থ হলো তর্ক করা, বিতর্ক করা বা যুক্তির মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা।
পরিভাষায়: ‘জাদালুল কুরআন’ বলতে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত সেই অকাট্য যুক্তি, প্রমাণ ও পদ্ধতিসমূহকে বোঝায়, যার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা কাফির, মুশরিক, নাস্তিক ও বাতিল پন্থীদের ভ্রান্ত আকিদা খণ্ডন করেছেন এবং সত্য দ্বীনকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন।
أنواع جدل القرآن (জাদালুল কুরআনের প্রকারসমূহ ও উদাহরণ):
কুরআন মানুষের মন ও মস্তিষ্কে নাড়া দেওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের যুক্তি ব্যবহার করেছে। প্রধান প্রকারগুলো হলো:
- قياس الشمول (সার্বিক বা ব্যাপক যুক্তি):
এটি এমন এক যুক্তি, যা অস্বীকার করার কোনো উপায় মানুষের থাকে না। যেমন, আল্লাহ অস্তিত্বহীনতার দাবিদারদের খণ্ডন করে বলেন:
﴿أَمْ خُلِقُوا مِنْ غَيْرِ شَيْءٍ أَمْ هُمُ الْخَالِقُونَ﴾
“তারা কি স্রষ্টা ছাড়াই সৃষ্টি হয়েছে, নাকি তারা নিজেরাই নিজেদের স্রষ্টা?” (সুরা তূর: ৩৫)। এই যুক্তির উত্তর দেওয়া কাফিরদের পক্ষে অসম্ভব। - قياس الخلف (বিপরীত যুক্তি দ্বারা খণ্ডন):
প্রতিপক্ষের দাবি মেনে নিলে কী বিপর্যয় ঘটত, তা দেখিয়ে তাদের দাবি বাতিল করা। যেমন, মক্কার মুশরিকরা বলত আল্লাহর অনেক শরিক বা উপাস্য আছে। আল্লাহ তাদের দাবি খণ্ডন করে বলেন:
﴿لَوْ كَانَ فِيهِمَا آلِهَةٌ إِلَّا اللَّهُ لَفَسَدَتَا﴾
“যদি আসমান ও জমিনে আল্লাহ ছাড়া অন্য উপাস্য থাকত, তবে উভয়ই ধ্বংস হয়ে যেত।” (সুরা আম্বিয়া: ২২)। অর্থাৎ, দুই খোদা থাকলে তাদের মধ্যে মতানৈক্য হতো এবং দুনিয়ার শৃঙ্খলা নষ্ট হতো। - إثبات الشيء ببيان نظيره (দৃষ্টান্তের মাধ্যমে প্রমাণ):
অবিশ্বাসীদের কাছে কোনো কিছু প্রমাণ করার জন্য পরিচিত কোনো ঘটনার দৃষ্টান্ত দেওয়া। যেমন, পরকালে পুনরুত্থানকে অবিশ্বাসীদের কাছে প্রমাণ করতে গিয়ে আল্লাহ বলেন:
﴿وَهُوَ الَّذِي يَبْدَأُ الْخَلْقَ ثُمَّ يُعِيدُهُ وَهُوَ أَهْوَنُ عَلَيْهِ﴾
“যيني প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, তিনি পুনরায় সৃষ্টি করবেন, আর এটা তো তাঁর জন্য অধিকতর সহজ।” (সুরা রূম: ২৭)। - الاستدلال بالآيات الكونية (সৃষ্টিজগতের নিদর্শনের মাধ্যমে যুক্তি):
সূর্য, চাঁদ, পাহাড়-পর্বত ও নিজের সৃষ্টির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে আল্লাহর অস্তিত্ব ও একত্ববাদ প্রমাণ করা।
[৫. المنطوق والمفهوم এর অর্থ কী? المنطوق এর প্রকারগুলো উদাহরণসহ সবিস্তারে বর্ণনা কর।]
المنطوق والمفهوم (মানতূক ও মাফহূম) এর অর্থ:
* المنطوق (মানতূক): ‘মানতূক’ শব্দের অর্থ হলো উচ্চারিত বা কথিত বিষয়। উসূলুল ফিকহ ও উলূমুল কুরআনের পরিভাষায়, উচ্চারিত শব্দ বা বাক্যটি বাহ্যিকভাবে যে সরাসরি অর্থ বা বিধান প্রদান করে, তাকে ‘মানতূক’ বলে।
* المفهوم (মাফহূম): ‘মাফহূম’ শব্দের অর্থ হলো বোধগম্য বা অনুধাবিত বিষয়। পরিভাষায়, উচ্চারিত শব্দ থেকে সরাসরি না হলেও এর অন্তর্নিহিত মর্ম, ইশারা বা ইঙ্গিত থেকে যে অর্থ বোঝা যায়, তাকে ‘মাফহূম’ বলে। (যেমন- পিতা-মাতাকে ‘উফ’ বলতে নিষেধ করা হয়েছে, এর মাফহূম হলো তাদের প্রহার করা বা গালি দেওয়া আরও বড় হারাম)।
أقسام المنطوق (মানতূকের প্রকারভেদ ও উদাহরণ):
المنطوق (মানতূক) বা উচ্চারিত অর্থ প্রধানত ২ প্রকার:
- النص (নাস / সুস্পষ্ট অর্থবোধক):
যে উচ্চারিত শব্দের কেবল একটিই অর্থ হয়, অন্য কোনো অর্থের ন্যূনতম সম্ভাবনা থাকে না, তাকে ‘নাস’ বলে।
উদাহরণ: কাফফারার রোজার বিষয়ে আল্লাহ বলেন, ﴿فَصِيَامُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ﴾ (তাহলে তিন দিন রোজা রাখবে)। এখানে ‘তিন’ শব্দটি সম্পূর্ণ সুস্পষ্ট, এখানে চার বা দুই হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। - الظاهر (যাহির / দৃশ্যত স্পষ্ট):
যে উচ্চারিত শব্দের একাধিক অর্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তবে এর মধ্যে একটি অর্থ বেশি স্পষ্ট, প্রবল ও ব্যবহারিক হয় (অন্যটি অপ্রবল), তখন সেই প্রবল অর্থটিকে ‘যাহির’ বলে।
উদাহরণ: আরবিতে ‘الأسد’ (সিংহ) বলতে মূলত বা প্রবলভাবে হিংস্র পশুকেই বোঝায়। তবে এটি রূপক অর্থে (অপ্রবল অর্থ) কোনো বীর পুরুষকেও বোঝাতে পারে। যখন বলা হবে “আমি একটি সিংহ দেখেছি”, তখন এর দৃশ্যত (যাহির) অর্থ হবে পশু।
[৬. مجاز এর সংজ্ঞা দাও। কুরআনে কি মাজায আছে? আলেমদের মতামত দলিলসহ বর্ণনা কর।]
تعريف المجاز (মাজায এর সংজ্ঞা):
‘মাজায’ শব্দের আভিধানিক অর্থ অতিক্রম করা। পরিভাষায়: যখন কোনো শব্দ তার আসল বা আভিধানিক অর্থে (হাকিকি অর্থে) ব্যবহৃত না হয়ে, এর সাথে সম্পর্কযুক্ত অন্য কোনো অর্থে (রূপক বা আলংকারিক অর্থে) ব্যবহৃত হয়, তখন তাকে المجاز (মাজায) বলে।
যেমন- ‘আমি একটি সিংহকে তলোয়ার চালাতে দেখলাম’। এখানে ‘সিংহ’ শব্দটি পশু অর্থে ব্যবহৃত না হয়ে মাজায হিসেবে বীর পুরুষ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
কুরআনে মাজায আছে কি না? (آراء العلماء بالأدلة):
পবিত্র কুরআনে মাজায বা রূপক শব্দের ব্যবহার আছে কি না, এ বিষয়ে ইসলামি স্কলারদের দুটি মত রয়েছে:
- জমহুর (অধিকাংশ) আলেম ও মুফাসসিরদের মত (الجمهور):
তাঁদের মতে, পবিত্র কুরআনে প্রচুর মাজায বা রূপক শব্দের ব্যবহার রয়েছে। বরং মাজায হলো আরবি ভাষার এক বিশাল অলংকার ও সৌন্দর্য, যা ছাড়া কোরআনের সাহিত্যিক মুজিজা অসম্পূর্ণ থেকে যেত।
দলিল: আল্লাহ তায়ালা কাফিরদের অবস্থা বর্ণনা করে বলেন, ﴿يَجْعَلُونَ أَصَابِعَهُمْ فِي آذَانِهِمْ﴾ “তারা তাদের আঙুলগুলো কানে ঢুকিয়ে দেয়” (সুরা বাকারা: ১৯)। এখানে ‘আঙুল’ বলা হলেও বাস্তবে পুরো আঙুল কানে ঢোকানো অসম্ভব; বরং তারা ‘আঙুলের ডগা’ কানে ঢোকাত। এখানে সমগ্র আঙুল বলে এর একটি অংশ বোঝানো হয়েছে, যা একটি উৎকৃষ্ট মাজায (مجاز مرسل)। - ইমাম দাউদ যাহেরি ও কিছু আলেমের মত (المانعون):
তাঁদের মতে, কুরআনে কোনো মাজায নেই, কুরআনের প্রতিটি শব্দই এর হাকিকি (প্রকৃত) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তাঁদের যুক্তি হলো- মাজায মানে হলো শব্দের আসল অর্থকে অস্বীকার করা বা মিথ্যা সাব্যস্ত করা। আর কুরআনের কোনো শব্দ মিথ্যা হতে পারে না।
পর্যালোচনা: জমহুর আলেমদের মতই সর্বাধিক বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য। কারণ, মাজায কোনো মিথ্যা নয়, বরং এটি ভাষা ও সাহিত্যের একটি স্বীকৃত শৈলী।
مجموعة (ب) [খ-বিভাগ: সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন]
[৭. العبرة بعموم اللفظ لا بخصوص السبب কথাটি ব্যাখ্যা কর।]
কথাটির ব্যাখ্যা (شرح العبارة):
উসূলুল ফিকহ ও উলূমুল কুরআনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই মূলনীতিটির অর্থ হলো: “ধর্তব্য বা বিচার্য বিষয় হবে শব্দের ব্যাপকতার ওপর, শানে নুযূল বা প্রেক্ষাপটের নির্দিষ্টতার ওপর নয়।”
এর সহজ ব্যাখ্যা হলো- পবিত্র কুরআনের কোনো আয়াত যদি নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট কোনো ঘটনার প্রেক্ষাপটে নাজিল হয়, কিন্তু আয়াতের শব্দগুলো যদি ব্যাপক (عام) হয়, তবে সেই আয়াতের হুকুম বা বিধান শুধু ওই নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্যই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং কিয়ামত পর্যন্ত সকল মানুষের জন্য ব্যাপকভাবে প্রযোজ্য হবে।
উদাহরণ: চুরির শাস্তির আয়াতটি নির্দিষ্ট একজন চোরের চুরির ঘটনায় নাজিল হয়েছিল। কিন্তু আয়াতে বলা হয়েছে- ‘وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ’ (যে পুরুষ বা নারী চুরি করে)। এখানে শব্দগুলো ব্যাপক হওয়ার কারণে কিয়ামত পর্যন্ত সকল চোরের জন্যই এই বিধান প্রযোজ্য হবে, শুধু ওই প্রথম চোরের জন্য নয়।
[৮. রসুমে উসমানীর দশটি বৈশিষ্ট্য লেখ।]
রসুমে উসমানী বা উসমানি লিপির ১০টি বৈশিষ্ট্য (مميزات الرسم العثماني):
খলিফা হযরত উসমান (রা.) এর যুগে কোরআন সংরক্ষণের জন্য যে বিশেষ লিখন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল, তাকে রসুমে উসমানী বলা হয়। এর বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
১. এই লিপিতে কোনো নুকতা (نقطة) বা হারাকাত (যবর, যের, পেশ) ছিল না।
২. এই লিপি এমনভাবে তৈরি হয়েছিল যাতে রাসুল (সা.) থেকে প্রমাণিত সব ধরনের পঠনপদ্ধতি (কিরাত) পড়ার সুযোগ ছিল।
৩. এতে অনেক স্থানে আলিফ, ওয়াও বা ইয়া বিলুপ্ত (الحذف) করে লেখা হয়েছে। (যেমন- مٰلِكِ লেখা হয়েছে مَالِكِ এর পরিবর্তে)।
৪. কিছু স্থানে অতিরিক্ত হরফ যুক্ত (الزيادة) করা হয়েছে। (যেমন- لأذبحنه এর জায়গায় لأأذبحنه লেখা হয়েছে)।
৫. এতে হামযাকে কখনো ওয়াও বা ইয়া দ্বারা পরিবর্তন (البدل) করে লেখা হয়েছে। (যেমন- صلوة লেখা হয়েছে صلاة এর পরিবর্তে)।
৬. এটি সম্পূর্ণ সাহাবিদের ইজমা (ঐকমত্য) দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটি পবিত্র লিপি।
৭. এই লিপি পরিবর্তন করা শরিয়তে নিষিদ্ধ (তাওকীফি) বলে জমহুর আলেমগণ মত দিয়েছেন।
৮. এটি কুরআনের সাহিত্যিক ও ভাষাগত মুজিজা রক্ষা করে।
৯. এর মাধ্যমে মুসলমানদের মাঝে কিরাত নিয়ে যে মতবিরোধ ছিল, তা দূর হয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
১০. এটি কিয়ামত পর্যন্ত বিশ্বের সকল স্থানে অপরিবর্তিত থাকবে।
[৯. أمثال القرآن এর উপকারিতাসমূহ লেখ।]
أمثال القرآن (কুরআনের উপমা) এর উপকারিতা:
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে বোঝানোর জন্য বিভিন্ন উপমা বা দৃষ্টান্ত (أمثال) ব্যবহার করেছেন। এর প্রধান উপকারিতাগুলো হলো:
১. অদেখা, বিমূর্ত বা জটিল বিষয়কে দৃশ্যমান ও পরিচিত উপমার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে সহজে বোধগম্য করা।
২. মানুষের অন্তরে ও মস্তিষ্কে গভীর প্রভাব সৃষ্টি করা, যা সাধারণ কথার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকরী।
৩. মানুষকে অতীত ইতিহাস বা প্রকৃতি থেকে উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণ করতে উৎসাহিত করা।
৪. নেক ও ভালো কাজের প্রতি মানুষের আগ্রহ ও আকর্ষণ বাড়ানো এবং অন্যায় ও মন্দ কাজ থেকে ভয় দেখিয়ে বিরত রাখা।
৫. যুক্তিতর্কে প্রতিপক্ষকে বা অবিশ্বাসীদের নিশ্চুপ বা লাজবাব করে দেওয়া।
[১০. قَصَصُ القرآن (ক্বাসাসুল কুরআন) এর প্রকারসমূহ লেখ।]
قَصَصُ القرآن (কুরআনের ঘটনাবলি) এর প্রকারসমূহ:
পবিত্র কুরআনে বর্ণিত কিসসা বা ঐতিহাসিক ঘটনাবলিকে বিষয়বস্তুর দিক থেকে প্রধানত ৩ ভাগে ভাগ করা যায়:
১. পূর্ববর্তী নবী-রাসুলদের ঘটনাবলি (قصص الأنبياء): আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে প্রেরিত নবী-রাসুল এবং তাঁদের উম্মতদের প্রতি তাঁদের দাওয়াত, মুজিজা ও কাফিরদের বিরুদ্ধাচরণের কাহিনী বর্ণনা করেছেন। (যেমন- হযরত মুসা, ঈসা, নূহ আ. এর ঘটনা)।
২. অতীত যুগের বিশেষ ব্যক্তি বা গোত্রের ঘটনাবলি (قصص غابرة): এটি এমন সব ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ের ঘটনা, যারা নবী ছিলেন না, কিন্তু তাদের জীবনে শিক্ষণীয় অনেক কিছু রয়েছে। (যেমন- আসহাবুল কাহাফ, লোকমান হেকিম, কারুন, জুলকারনাইন, মারিয়াম আ. এর ঘটনা)।
৩. নবীজির (সা.) সমসাময়িক ঘটনাবলি (قصص تتعلق بحوادث وقعت في عهد النبي): রাসুল (সা.) এর জীবনে সংঘটিত বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনা, যা কুরআনে নাজিল হয়েছে। (যেমন- গাযওয়ায়ে বদর, উহুদ, খন্দক, হিজরতের ঘটনা এবং বনী নাযিরের ঘটনা)।
[১১. الكناية (কিনায়া) বিদ্যমান আছে এমন পাঁচটি আয়াত লেখ।]
الكناية (কিনায়া): কিনায়া হলো এমন শব্দ যার অর্থ সরাসরি প্রকাশ না করে, শালীনতা বা আলংকারিক কারণে ইঙ্গিতে বা ইশারায় বোঝানো হয়। নিচে কিনায়া বিদ্যমান এমন ৫টি আয়াত দেওয়া হলো:
১. ﴿أَوْ لَامَسْتُمُ النِّسَاءَ﴾ “অথবা তোমরা নারীদের স্পর্শ করো।” (এখানে ‘স্পর্শ’ শব্দটি স্বামী-স্ত্রীর মিলনের কিনায়া হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যা অত্যন্ত শালীন)।
২. ﴿وَأُحِيطَ بِثَمَرِهِ فَأَصْبَحَ يُقَلِّبُ كَفَّيْهِ﴾ “আর সে তার দুই হাতের তালু উল্টাতে লাগল।” (এখানে হাতের তালু উল্টানো দ্বারা তীব্র আক্ষেপ ও আফসোস করাকে বোঝানো হয়েছে)।
৩. ﴿وَلَا تُصَعِّرْ خَدَّكَ لِلنَّاسِ﴾ “মানুষের দিক থেকে তোমার গাল ফিরিয়ে নিয়ো না।” (এখানে গাল ফেরানো দ্বারা অহংকার প্রকাশ করাকে বোঝানো হয়েছে)।
৪. ﴿كَانَا يَأْكُلَانِ الطَّعَامَ﴾ “তারা দুজন (ঈসা আ. ও তাঁর মাতা) খাবার খেতেন।” (খাবার খাওয়া মানুষের প্রাকৃতিক দুর্বলতার কিনায়া, অর্থাৎ তারা ইলাহ হতে পারেন না)।
৫. ﴿تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ﴾ “যার তলদেশ দিয়ে নদী প্রবাহিত।” (এটি জান্নাতের অবিরাম প্রশান্তি ও সৌন্দর্যের কিনায়া)।
[১২. উদাহরণসহ محكم ও متشابه এর সংজ্ঞা দাও।]
المحكم (মুহকাম) এর সংজ্ঞা ও উদাহরণ:
‘মুহকাম’ অর্থ সুদৃঢ় বা সুস্পষ্ট। পরিভাষায়, কুরআনের যে আয়াতগুলোর অর্থ একেবারে সুস্পষ্ট, যার উদ্দেশ্য বুঝতে কোনো ব্যাখ্যা বা অন্য আয়াতের সাহায্য নেওয়ার প্রয়োজন হয় না, তাকে ‘মুহকাম’ বলে। শরিয়তের যাবতীয় হালাল-হারাম, আদেশ-নিষেধ এবং মূল বিধিবিধান এই আয়াতগুলোর অন্তর্ভুক্ত।
উদাহরণ: ﴿وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ﴾ (তোমরা নামাজ কায়েম করো), অথবা ﴿أَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا﴾ (আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন)।
المتشابه (মুতাশাবিহ) এর সংজ্ঞা ও উদাহরণ:
‘মুতাশাবিহ’ অর্থ সাদৃশ্যপূর্ণ বা অস্পষ্ট। পরিভাষায়, কুরআনের যে আয়াতগুলোর একাধিক অর্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে বা যার প্রকৃত অর্থ মানুষের জ্ঞানের অগম্য এবং তা কেবল আল্লাহই ভালো জানেন, তাকে ‘মুতাশাবিহ’ বলে।
উদাহরণ: কুরআনের সুরাগুলোর শুরুতে ব্যবহৃত ‘হুরুফে মুকাত্তাআত’ (যেমন- الم, يس, حم)। অথবা আল্লাহ তায়ালার গুণাবলি সংক্রান্ত আয়াত, যেমন- ﴿يَدُ اللَّهِ فَوْقَ أَيْدِيهِمْ﴾ (তাদের হাতের ওপর আল্লাহর হাত রয়েছে)। এর প্রকৃত অর্থ কেবল আল্লাহই জানেন।






