اختبار الكامل الماجستير (مدة سنة واحدة) ، لعام ٢٠٢٤
[কামিল মাস্টার্স (১ বছর মেয়াদি) পরীক্ষা, ২০২৪]
الحديث والدراسات الإسلامية
[আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
علوم الحديث
[উলুমুল হাদীস]
বিষয় কোড: ৫ ০ ২ ১ ০ ৩
الوقت — ٤ ساعات [সময়—৪ ঘণ্টা]
الدرجة الكاملة — ١٠٠ [পূর্ণমান—১০০]
الملاحظة: أجب عن ثلاثة من مجموعة (أ) وعن ثلاثة من مجموعة (ب) وعن اثنين من مجموعة (ج).
الدرجة — ١٥×٣=٤٥
ইসনাদ (إسناد) এর পরিচয়: আভিধানিক অর্থে ‘ইসনাদ’ অর্থ কোনো কিছুর দিকে সম্পৃক্ত করা বা নির্ভর করা। মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায়, হাদিসের মূল পাঠ বা ‘মতন’ পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য রাবীদের (বর্ণনাকারীদের) যে পরম্পরা বা চেইন উল্লেখ করা হয়, তাকে ইসনাদ বলে।
নবিজির সুন্নাহ সংরক্ষণে ইসনাদের গুরুত্ব: ইসলামি শরিয়তে ইসনাদ বা সনদ হলো হাদিস যাচাই-বাছাইয়ের মূল মাপকাঠি। ইসনাদ না থাকলে যে কেউ নিজের মনগড়া কথাকে নবিজির (সা.) হাদিস বলে চালিয়ে দিতে পারতো। রাবীদের পরিচয়, তাদের স্মৃতিশক্তি, সততা এবং সমসাময়িকতা যাচাই করার মাধ্যমেই মুহাদ্দিসগণ সহিহ হাদিসকে জাল ও দুর্বল হাদিস থেকে পৃথক করেছেন। এটি মুসলিম উম্মাহর এক অনন্য বৈশিষ্ট্য যা অন্য কোনো ধর্মে নেই।
“الإسناد من الدين” কথার অর্থ: প্রখ্যাত তাবে-তাবেয়ী আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক (রহ.) বলেছিলেন, “ইসনাদ হলো দীনের অংশ। যদি ইসনাদ না থাকতো, তবে যার যা ইচ্ছা সে তা-ই বলতো।” এই উক্তির অর্থ হলো, ধর্মীয় বিধিবিধান প্রমাণের জন্য সনদ অপরিহার্য। সনদ ছাড়া কোনো হাদিস বা ধর্মীয় জ্ঞান গ্রহণযোগ্য নয়। এর মাধ্যমেই দীনের বিশুদ্ধতা রক্ষিত হয়েছে এবং জালিয়াতির পথ রুদ্ধ হয়েছে।
খতীব আল-বাগদাদীর সংক্ষিপ্ত জীবনী: তাঁর মূল নাম আবু বকর আহমাদ ইবনে আলী ইবনে সাবিত, যিনি ইতিহাসে ‘খতীব আল-বাগদাদী’ নামে সুপরিচিত। তিনি ৩৯২ হিজরিতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৪৬৩ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ছিলেন একাধারে প্রখ্যাত মুহাদ্দিস, ঐতিহাসিক এবং ফকিহ। উলুমুল হাদিস ও রিজাল শাস্ত্রে তাঁর অবদান এতই ব্যাপক যে, পরবর্তীকালের মুহাদ্দিসগণ তাঁর গ্রন্থের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।
‘তারিখু বাগদাদ’ গ্রন্থের অবদান: খতীব আল-বাগদাদীর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো ‘তারিখু বাগদাদ’ (تاريخ بغداد)। এটি শুধু একটি সাধারণ ইতিহাস গ্রন্থ নয়, বরং এটি একটি বিশাল বিশ্বকোষ যা হাদিস ও রিজাল শাস্ত্রকে গভীরভাবে সমৃদ্ধ করেছে।
১. রাবীদের জীবনী: এতে প্রায় ৮০০০ এর বেশি রাবী, আলেম ও মনীষীর জীবনী রয়েছে যারা বাগদাদে জন্মেছেন বা সেখানে ভ্রমণ করেছেন।
২. জারহ ও তাদিল: এই গ্রন্থে তিনি রাবীদের সততা, স্মৃতিশক্তি এবং হাদিস বর্ণনার যোগ্যতা সম্পর্কে মুহাদ্দিসদের মতামত (জারহ ও তাদিল) বিশদভাবে তুলে ধরেছেন।
৩. হাদিসের বিশুদ্ধতা নিরূপণ: ইলমে রিজালের একটি আকর গ্রন্থ হিসেবে এটি পরবর্তী মুহাদ্দিসদের জন্য রাবী যাচাইয়ের এক নির্ভরযোগ্য মানদণ্ড হিসেবে কাজ করেছে।
علم طبقات الرجال এর পরিচয়: ‘طبقات’ শব্দটি ‘طبقة’ (তবকা) এর বহুবচন, যার অর্থ সমসাময়িক বা সমবয়সী দল। পরিভাষায়, যে শাস্ত্রে হাদিস বর্ণনাকারীদেরকে তাদের সমসাময়িকতা, বয়স এবং শায়খদের (শিক্ষক) থেকে হাদিস শোনার ভিত্তিতে বিভিন্ন স্তরে বা জেনারেশনে ভাগ করে আলোচনা করা হয়, তাকে ‘ইলমে তাবাকাতুর রিজাল’ বলে (যেমন- সাহাবি স্তর, তাবেয়ি স্তর)।
গুরুত্ব, উপকারিতা ও ভিত্তি: এর ভিত্তি হলো রাবীদের সময়কাল ও যুগ। এর প্রধান উপকারিতা হলো: এর মাধ্যমে রাবীদের পারস্পরিক সাক্ষাৎ প্রমাণিত হয়। কে কার থেকে হাদিস শুনেছেন তা নিশ্চিত হওয়া যায়। এটি তাদলীস (সনদ গোপন করা) এবং ইরসাল (সনদ ছিন্ন হওয়া) ধরতে ব্যাপকভাবে সাহায্য করে।
علم طبقات الرجال এবং علم الرجال এর মধ্যে পার্থক্য:
১. ইলমে রিজাল: এটি একটি ব্যাপক শাস্ত্র, যেখানে যেকোনো রাবীর জীবনী, নাম, পরিচয়, এবং তাঁর বিশ্বস্ততা (জারহ ও তাদিল) নিয়ে সামগ্রিক আলোচনা করা হয়।
২. ইলমে তাবাকাতুর রিজাল: এটি ইলমে রিজালের একটি বিশেষ শাখা। এখানে রাবীদের ব্যক্তিগত পরিচয়ের পাশাপাশি তাদেরকে নির্দিষ্ট যুগ, সমসাময়িকতা ও স্তরের ভিত্তিতে বিন্যস্ত করা হয়, যাতে সনদের ধারাবাহিকতা যাচাই করা সহজ হয়।
মুকসিরুন, মুতাওয়াসসিতুন ও মুকিললুন এর পরিচয়:
১. المكثرون (মুকসিরুন): যে সকল সাহাবি ১০০০ (এক হাজার) বা তার অধিক হাদিস বর্ণনা করেছেন, তাদেরকে মুকসিরুন বলা হয় (যেমন- আবু হুরায়রা, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা.)।
২. المتوسطون (মুতাওয়াসসিতুন): যারা ১০০ থেকে ১০০০ এর মাঝামাঝি সংখ্যক হাদিস বর্ণনা করেছেন।
৩. المقلون (মুকিললুন): যারা ১০০ এর কম হাদিস বর্ণনা করেছেন।
আবু বকর (রা)-এর জীবনী ও হাদিস বর্ণনায় তাঁর স্তর:
সংক্ষিপ্ত জীবনী: তাঁর নাম আব্দুল্লাহ ইবনে উসমান (আবু কুহাফা)। তিনি পুরুষদের মধ্যে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হিজরতের সাথী এবং ইসলামের প্রথম খলিফা।
তাঁর স্তর (ত্ববকা): তিনি সাহাবিদের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরের এবং মর্যাদাপূর্ণ ত্ববকার অন্তর্ভুক্ত।
বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা ও কারণ: তিনি সর্বদা রাসুল (সা.)-এর সাথে থাকা সত্ত্বেও তিনি ‘মুকিললুন’ (অল্প হাদিস বর্ণনাকারী) এর অন্তর্ভুক্ত। তাঁর থেকে বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা মাত্র ১৪২ টি। এর মূল কারণ হলো রাসুল (সা.) এর ইন্তেকালের পরপরই খিলাফতের গুরুদায়িত্ব পালন এবং মাত্র আড়াই বছর পর তাঁর ইন্তেকাল। হাদিস সংকলন ও প্রচারের পরিবেশ তৈরি হওয়ার পূর্বেই তিনি ইন্তেকাল করেন।
ইবনু সাদ এর পরিচয়: তাঁর পুরো নাম আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে সাদ। তিনি ‘কাতিবুল ওয়াকিদী’ (ওয়াকিদীর লেখক) নামেও পরিচিত। তিনি ১৬৮ হিজরিতে বসরায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ২৩০ হিজরিতে বাগদাদে ইন্তেকাল করেন। তিনি ইলমে তাবাকাত ও ইতিহাসের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইমাম।
‘আত-তাবাকাতুল কুবরা’ গ্রন্থের বিষয়বস্তু ও গুরুত্ব: তাঁর রচিত “الطبقات الكبرى” (আত-তাবাকাতুল কুবরা) ইলমে তাবাকাত শাস্ত্রের অন্যতম প্রাচীন ও নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ। এর বিষয়বস্তু হলো রাসুল (সা.)-এর সীরাত, সাহাবায়ে কেরাম এবং তাবেয়িদের যুগভিত্তিক ও অঞ্চলভিত্তিক জীবনী। তিনি রাবীদেরকে তাদের ইসলাম গ্রহণের সময়কাল, যুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং বসবাসের শহর (যেমন- মক্কা, মদিনা, কুফা, বসরা) অনুযায়ী বিন্যস্ত করেছেন।
জীবনী গবেষণায় অবদান: সাহাবি ও তাবেয়িদের জীবনী গবেষণায় এই গ্রন্থের অবদান অপরিসীম। এটি পরবর্তীকালের প্রায় সকল ঐতিহাসিকের জন্য ‘মাদার বুক’ বা মূল সূত্র হিসেবে কাজ করেছে। কোনো রাবী কোন স্তরের, তিনি কার ছাত্র, এবং তিনি কোন অঞ্চলে বসবাস করতেন—এসব সূক্ষ্ম তথ্য নিখুঁতভাবে এই গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে, যা হাদিসের সনদ যাচাইয়ে অসামান্য অবদান রেখেছে।
الدرجة — ١٥×٣=٤٥
জারহ ও তাদিল (الجرح والتعديل) কাকে বলে: ‘জারহ’ অর্থ দোষারোপ করা বা খণ্ডিত করা। পরিভাষায় রাবীদের স্মৃতিশক্তি বা দ্বীনদারিতে ত্রুটি প্রমাণ করাকে জারহ বলে। ‘তাদিল’ অর্থ ন্যায়পরায়ণতা প্রমাণ করা। পরিভাষায় রাবীদের বিশ্বস্ততা ও যোগ্যতা স্বীকার করে তাদের প্রশংসামূলক মূল্যায়ন করাকে তাদিল বলে।
জারহ গ্রহণযোগ্য হওয়ার শর্ত:
১. জারহকারীকে অবশ্যই মুত্তাকী, বিশ্বস্ত এবং জারহ ও তাদিলের নিয়মকানুন সম্পর্কে গভীর জ্ঞানী হতে হবে।
২. জারহের কারণ সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে (মুফাসসার হতে হবে)।
৩. কোনো বিদ্বেষ বা শত্রুতার বশবর্তী হয়ে জারহ করা যাবে না।
তাদিলের নীতিমালা: তাদিলের ক্ষেত্রে রাবীর বাহ্যিক আমল, তাকওয়া এবং হাদিস বর্ণনায় সতর্কতা লক্ষ্য করা হয়। একজন যোগ্য ও বিশ্বস্ত মুহাদ্দিস যদি কোনো রাবীকে ‘আদিল’ (ন্যায়পরায়ণ) বলে ঘোষণা করেন, তবে তা গ্রহণযোগ্য হয়।
জারহ ও তাদিলের স্তর (মারাতিব):
তাদিলের স্তর: সর্বোচ্চ স্তর হলো “أمير المؤمنين في الحديث” (হাদিস শাস্ত্রে আমিরুল মুমিনিন), এরপর পর্যায়ক্রমে وثيق (বিশ্বস্ত), صدوق (সত্যবাদী) ইত্যাদি।
জারহের স্তর: সবচেয়ে নিম্ন স্তর হলো “أكذب الناس” (সবচেয়ে বড় মিথ্যুক) বা “كذاب” (মিথ্যুক), এরপর পর্যায়ক্রমে ضعيف جدا (খুবই দুর্বল), لين الحديث (হাদিসের ক্ষেত্রে দুর্বল) ইত্যাদি।
علم الجرح والتعديل প্রচলনের কারণ:
প্রথমত, ইসলামি খিলাফতে রাজনৈতিক ও আকিদাগত মতবিরোধ (ফিতনা) সৃষ্টির পর বিভিন্ন ভ্রান্ত দল (যেমন- শিয়া, খারেজি) নিজেদের পক্ষে জাল হাদিস তৈরি করতে শুরু করে। দ্বিতীয়ত, কিছু অযোগ্য ও দুর্বল স্মৃতিশক্তির রাবী ভুলবশত ভুল হাদিস বর্ণনা করতো। এই জালিয়াতি ও ভুল থেকে নবিজির (সা.) খাঁটি সুন্নাহকে রক্ষা করার জন্যই মুহাদ্দিসগণ রাবীদের পরিচয় ও বিশ্বস্ততা যাচাই শুরু করেন, যা থেকেই ‘জারহ ও তাদিল’ শাস্ত্রের উৎপত্তি ঘটে।
উমাইয়া ও আব্বাসি যুগের মুহাদ্দিসগণের ভূমিকা:
উমাইয়া যুগে মুহাদ্দিসগণ সনদ জিজ্ঞাসা করা বাধ্যতামূলক করেন। ইবনে সিরীন (রহ.) বলেন, “তারা প্রথমে সনদ জিজ্ঞাসা করতেন না, কিন্তু যখন ফিতনা শুরু হলো, তখন তারা বলতে লাগলেন, তোমাদের রাবীদের নাম বলো।”
আব্বাসি যুগে এই শাস্ত্র চরম উৎকর্ষ লাভ করে। ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল-কাত্তান, আব্দুর রহমান ইবনে মাহদী এবং পরবর্তীতে ইমাম বুখারি, মুসলিম, ও আবু হাতিম আর-রাযী (রহ.) প্রমুখ মুহাদ্দিসগণ শহর থেকে শহরে ভ্রমণ (রিহলা) করে রাবীদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন। তাঁরা রাবীদের মূল্যায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করেন এবং স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁদের এই অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলেই হাদিস শাস্ত্র জালিয়াতির হাত থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত হয়েছে।
العدالة (আদালাহ) এর অর্থ: ‘আদালাহ’ অর্থ ন্যায়পরায়ণতা, সততা বা সুবিচার। উলুমুল হাদিসের পরিভাষায়, আদালাহ বলতে এমন একটি স্থায়ী মানসিক ও আত্মিক গুণকে বোঝায়, যা মানুষকে সর্বদা তাকওয়া (আল্লাহভীতি) ও সদাচারণ বজায় রাখতে উদ্বুদ্ধ করে, এবং কবিরা গুনাহ, ক্রমাগত সগিরা গুনাহ ও মানহানিকর কাজ (মুরুয়্যাহ পরিপন্থী কাজ) থেকে বিরত রাখে।
‘আদালাহ’ বুঝার উপায়: কোনো রাবীর আদালাহ মূলত দুটি উপায়ে প্রমাণিত হয়:
১. তাজকিয়া (التزكية): কোনো প্রসিদ্ধ ও বিশ্বস্ত ইমাম বা মুহাদ্দিস যদি উক্ত রাবীর ন্যায়পরায়ণতা সম্পর্কে সরাসরি সাক্ষ্য প্রদান করেন।
২. ইশতিহার (الاشتهار): রাবীর ইলম, তাকওয়া ও সততার খ্যাতি সমাজে এতই ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে, তাঁর আদালাহ প্রমাণের জন্য আলাদা কোনো সাক্ষ্যের প্রয়োজন হয় না (যেমন- চার ইমাম বা ইমাম বুখারির আদালাহ)।
عدالة الصحابة (সাহাবিদের আদালাহ) এর মর্ম: আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সর্বসম্মত আকিদা হলো “الصحابة كلهم عدول” অর্থাৎ সকল সাহাবিই আদিল বা ন্যায়পরায়ণ। সাহাবিদের আদালাহ যাচাই করার জন্য সাধারণ রাবীদের মতো কোনো জারহ-তাদিলের প্রয়োজন নেই। কারণ, স্বয়ং আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে এবং রাসুল (সা.) হাদিসে তাদের সততা ও ন্যায়পরায়ণতার সাক্ষ্য দিয়েছেন। তারা কখনো মিথ্যা হাদিস বর্ণনা করতে পারেন না।
নিশ্চিত হওয়া (তাসহাব্বুত) ও সমালোচনার বিষয়ে কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা:
ইসলাম যেকোনো সংবাদ বা তথ্য যাচাই-বাছাই ছাড়া গ্রহণ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। উলুমুল হাদিস ও জারহ-তাদিলের মূল ভিত্তিই হলো এই যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া।
কুরআনের নির্দেশনা: আল্লাহ তাআলা সুরা হুজুরাতের ৬ নম্বর আয়াতে বলেছেন: “হে মুমিনগণ! যদি কোনো পাপাচারী (ফাসিক) তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে দেখ (ফাতাবাইয়্যানু)…।” এই আয়াতটি রাবীর অবস্থা যাচাই করা এবং অন্ধভাবে সংবাদ গ্রহণ না করার একটি মূলনীতি।
সুন্নাহর নির্দেশনা: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “একজন ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে তা-ই (যাচাই ছাড়া) বর্ণনা করে” (সহিহ মুসলিম)। অন্য হাদিসে তিনি তাঁর নামে মিথ্যা হাদিস বর্ণনাকারীদের জাহান্নামের ভয়াবহ আজাবের সতর্কবাণী দিয়েছেন।
সুতরাং কুরআন ও সুন্নাহর এই সুস্পষ্ট নির্দেশনার আলোকেই মুহাদ্দিসগণ সংবাদ ও বর্ণনাকারীদের সমালোচনার (নাকদ) জন্য এক অভূতপূর্ব বিজ্ঞান তৈরি করেছেন।
গ্রন্থের লেখকের সংক্ষিপ্ত জীবনী: এই প্রসিদ্ধ গ্রন্থের রচয়িতা হলেন হাফেজ শামসুদ্দিন আয-যাহাবী (রহ.)। তাঁর পুরো নাম মুহাম্মদ ইবনে আহমাদ ইবনে উসমান আল-যাহাবী। তিনি ৬৭৩ হিজরিতে দামেস্কে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৭৪৮ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন। তিনি ছিলেন ইলমে রিজাল, ইতিহাস ও হাদিস শাস্ত্রের অপ্রতিদ্বন্দ্বী ইমাম।
“ميزان الاعتدال في نقد الرجال” (মিযানুল ইতিদাল) এর বৈশিষ্ট্য:
১. নির্দিষ্ট আলোচনা: এটি কেবল দুর্বল, প্রত্যাখ্যাত, জালিয়াত এবং যাদের উপর কোনো না কোনোভাবে জারহ (সমালোচনা) করা হয়েছে, তাদের জীবনী নিয়ে রচিত এক অনন্য বিশ্বকোষ।
২. ভারসাম্যপূর্ণ পর্যালোচনা: ইমাম যাহাবী চরমপন্থী বা খামখেয়ালী সমালোচনা পরিহার করে অত্যন্ত ইনসাফ ও ভারসাম্যের (اعتدال) সাথে রাবীদের মূল্যায়ন করেছেন।
৩. ব্যাপকতা: এতে শুধু দুর্বল রাবীই নয়, বরং যেসব নির্ভরযোগ্য রাবীর ওপর ভুলবশত সমালোচনা করা হয়েছে, তিনি উপযুক্ত প্রমাণসহ তাদের প্রতিরক্ষাও করেছেন। ইলমে জারহ ও তাদিলের ক্ষেত্রে এই গ্রন্থটি পরবর্তী সকল গবেষকের অপরিহার্য দলিলে পরিণত হয়েছে।
الدرجة — ٥×٢=١٠
(أ) أسباب التعارض؛
(ب) الإصابة في تمييز الصحابة؛
(ج) الطبقات الكبرى لابن سعد؛
(د) معرفة الأسماء والكنى.
(أ) أسباب التعارض (পরস্পর বিরোধিতার কারণ): হাদিসের মধ্যে বাহ্যিক বিরোধ দেখা দিলে তাকে ‘তাদরুজ’ বা ‘তাআ’রুজ’ বলে। এর মূল কারণগুলো হলো— একটি হাদিস রহিত (মানসুখ) এবং অপরটি রহিতকারী (নাসিখ) হওয়া, হাদিসের প্রেক্ষাপট ভিন্ন হওয়া, অথবা কোনো রাবীর ভুল হওয়া। মুহাদ্দিসগণ ‘মুখতালিফুল হাদিস’ শাস্ত্রের মাধ্যমে এগুলোর সমন্বয় বা সমাধান করে থাকেন।
(ب) الإصابة في تمييز الصحابة (আল-ইসাবাহ ফি তাময়ীযিস সাহাবাহ): এটি হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) রচিত সাহাবিদের জীবনী বিষয়ক একটি সর্বশ্রেষ্ঠ ও প্রামাণ্য বিশ্বকোষ। এতে সাহাবি, মুখাদরাম (যারা নবীজির যুগে ইসলাম গ্রহণ করেছেন কিন্তু তাঁকে দেখেননি) এবং ভুলবশত যাদের সাহাবি মনে করা হয়, তাদের সুস্পষ্ট শ্রেণিবিভাগ ও পরিচয় লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।
(ج) الطبقات الكبرى لابن سعد (ইবনু সাদের আত-তাবাকাতুল কুবরা): মুহাম্মদ ইবনে সাদ রচিত এটি ইলমে তাবাকাতের আদি ও অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ। এখানে সাহাবি ও তাবেয়িদেরকে তাদের প্রজন্ম ও ভৌগোলিক অবস্থানের ভিত্তিতে বিভিন্ন স্তরে (ত্ববকা) বিভক্ত করে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্য ও জীবনী সংকলন করা হয়েছে।
(د) معرفة الأسماء والكنى (নাম ও উপনামের পরিচয়): ইলমে রিজালের এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। অনেক রাবী তাঁদের মূল নামের চেয়ে কুনিয়াত (যেমন- আবু হুরায়রা) বা উপনামে বেশি পরিচিত। আবার একই নামের বা কুনিয়াতের একাধিক রাবী থাকতে পারেন। এই শাস্ত্রের মাধ্যমে রাবীদের প্রকৃত পরিচয় সুনিশ্চিত করা হয়, যাতে রাবীদের মধ্যে মিশ্রণ (তালবিস) না ঘটে।



