Bangladesh Studies (Code: 201107) – ২০২২ প্রশ্ন ও উত্তর
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২২ এর আল-কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের বাংলাদেশ স্টাডিজ (الدراسات البنغلاديشية) বিষয়ের সম্পূর্ণ উত্তরমালা।
বিঃদ্রঃ পরীক্ষার্থীদের সুবিধার্থে মূল প্রশ্নপত্রের ক-বিভাগ (রচনামূলক) এবং খ-বিভাগ (সংক্ষিপ্ত) এর সবগুলো প্রশ্নের ১০০% নির্ভুল উত্তর দেওয়া হলো।
مجموعة (الف) / ক অংশ — রচনামূলক প্রশ্ন (মান—১৫x৪=৬০)
[ أجب عن أربعة من الأسئلة التالية / নিম্নের যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও ]
১। বাংলাদেশের স্বাধীনতার রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পটভূমি আলোচনা কর।
উত্তর: ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ যে চূড়ান্ত স্বাধীনতা লাভ করে, তা এক দিনে অর্জিত হয়নি। দীর্ঘ ২৪ বছরের শোষণ, বঞ্চনা ও ত্যাগের ফসল হলো এই স্বাধীনতা। নিচে এর রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পটভূমি সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
- রাজনৈতিক পটভূমি: ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তান রাজনৈতিকভাবে নিগৃহীত হতে থাকে। ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয়লাভের পরও ক্ষমতা না দেওয়া, ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি, ১৯৬৬ সালের ৬-দফা দাবি এবং ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান বাঙালিদের রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তোলে। সর্বশেষ ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ক্ষমতা হস্তান্তরে পশ্চিম পাকিস্তানিদের টালবাহানা স্বাধীনতাসংগ্রামকে অনিবার্য করে তোলে।
- অর্থনৈতিক পটভূমি: পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তানের পাট, চা ও চামড়া রপ্তানি করে অর্জিত বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে ব্যয় করা হতো। দেশের মোট বাজেটের সিংহভাগ পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ থাকত। পূর্ব পাকিস্তানে কোনো ভারী শিল্প বা উন্নত কলকারখানা গড়ে তোলা হয়নি। এই চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য বাঙালিদের স্বাধীনতার দিকে ধাবিত করে।
- সামাজিক পটভূমি: সামাজিক ক্ষেত্রেও বাঙালিরা চরম বৈষম্যের শিকার হয়। সামরিক ও বেসামরিক উচ্চপদগুলোতে পূর্ব পাকিস্তানিদের নিয়োগ দেওয়া হতো না। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালিদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে গণ্য করত এবং কথায় কথায় অবজ্ঞা করত। এই সামাজিক অসমতা বাঙালিদের ক্ষুব্ধ করে।
- সাংস্কৃতিক পটভূমি: স্বাধীনতার বীজ মূলত বপন করা হয়েছিল সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধেই। উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল প্রথম বিদ্রোহ। এরপর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান নিষিদ্ধ করা এবং বাঙালি সাহিত্য ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানা বাঙালিদের বুঝিয়ে দেয় যে, নিজস্ব ভূখণ্ড ছাড়া নিজেদের সংস্কৃতি ও ভাষার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
২। বাংলাদেশের স্বাধীনতায় ভাষা আন্দোলনের ভূমিকা আলোচনা কর।
উত্তর: ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলন ছিল বাঙালি জাতির স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতায় পৌঁছানোর প্রথম সোপান। বাংলাদেশের স্বাধীনতায় ভাষা আন্দোলনের ভূমিকা নিচে আলোচনা করা হলো:
- বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ: ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমেই পূর্ব বাংলার মানুষের মধ্যে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে ভাষাকেন্দ্রিক অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটে। বাঙালিরা বুঝতে পারে যে, ধর্মের চেয়েও ভাষা ও সংস্কৃতির বন্ধন অনেক বেশি শক্তিশালী।
- ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের প্রেরণা: ভাষা আন্দোলনে ছাত্র, জনতা, কৃষক, শ্রমিক সকলে ঐক্যবদ্ধভাবে রাজপথে নেমে আসে। এই ঐক্যবদ্ধ শক্তির মহড়াই পরবর্তীতে অন্যান্য আন্দোলনগুলোতে প্রেরণা হিসেবে কাজ করে।
- পাকিস্তানি মোহভঙ্গ: ১৯৪৭ সালে যারা স্বপ্ন দেখেছিল যে পাকিস্তান একটি আদর্শ মুসলিম রাষ্ট্র হবে, বায়ান্নর রক্তক্ষয়ী ঘটনা তাদের সেই মোহ ভেঙে দেয়। তারা উপলব্ধি করে যে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাদের শোষক ছাড়া আর কিছুই নয়।
- পরবর্তী আন্দোলনের ভিত্তি: ভাষা আন্দোলনে বিজয়ের ফলেই বাঙালিরা আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। এই আন্দোলনের চেতনার ওপর ভিত্তি করেই ১৯৫৪ সালের নির্বাচন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬-দফা দাবি, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়।
- স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতার চেতনা: ভাষা আন্দোলন প্রথমে ছিল কেবল মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। কিন্তু এই সংগ্রাম ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিক স্বাধিকার এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে রূপ নেয়।
৩। “বঙ্গবন্ধু ও তার ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ” শীর্ষক একটি প্রবন্ধ লিখ।
ভূমিকা: হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ বাঙালি জাতির মুক্তিসংগ্রামের এক মহাকাব্য। মাত্র ১৮ মিনিটের এই অলিখিত ভাষণটি ঘুমন্ত বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিল এবং সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেছিল।
ভাষণের প্রেক্ষাপট: ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী গণতান্ত্রিক নিয়মে ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে। তারা ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন হঠাৎ স্থগিত ঘোষণা করে। এর প্রতিবাদে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান বিক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। এমন উত্তাল পরিস্থিতিতেই ৭ই মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ১০ লক্ষাধিক জনতার সামনে বঙ্গবন্ধু এই ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন।
ভাষণের মূল বিষয়বস্তু: বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে বর্তমান পরিস্থিতির সঠিক মূল্যায়ন করেন এবং ৪টি সুস্পষ্ট শর্ত আরোপ করেন:
১. সামরিক আইন (মার্শাল ল’) প্রত্যাহার করতে হবে।
২. সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে।
৩. সাধারণ মানুষের ওপর যে হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে তার বিচার করতে হবে।
৪. নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।
তিনি বাংলার মানুষকে যার যা কিছু আছে তা নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেন।
স্বাধীনতার ডাক: এই ভাষণের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ ছিল এর শেষ বাক্যটি, যেখানে বঙ্গবন্ধু বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম!” এই একটি বাক্যই ছিল মূলত বাংলাদেশের স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক প্রচ্ছন্ন ঘোষণা।
উপসংহার ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল না, এটি ছিল একটি জাতির মুক্তির সনদ। এই ভাষণ শুনেই বাঙালি জাতি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ২০১৭ সালে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা (UNESCO) এই ঐতিহাসিক ভাষণটিকে ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ (World Documentary Heritage) হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে একে আন্তর্জাতিক মর্যাদায় ভূষিত করেছে।
৪। সংবিধানের সংজ্ঞা দাও। বাংলাদেশের সংবিধানে উল্লিখিত মৌলিক অধিকারসমূহ বর্ণনা কর।
সংবিধানের সংজ্ঞা:
সংবিধান (Constitution) হলো একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। যে সমস্ত মৌলিক আইন, বিধিবিধান ও নিয়মনীতির সমষ্টির ওপর ভিত্তি করে একটি রাষ্ট্র পরিচালিত হয়, সরকারের বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষমতা ও কার্যাবলি নির্ধারিত হয় এবং নাগরিকের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়, তাকে সংবিধান বলে।
বাংলাদেশের সংবিধানে উল্লিখিত মৌলিক অধিকারসমূহ:
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে (ভাগ ৩, অনুচ্ছেদ ২৬-৪৭) নাগরিকদের জন্য কতগুলো মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অধিকারসমূহ নিচে বর্ণনা করা হলো:
- আইনের দৃষ্টিতে সমতা (অনুচ্ছেদ ২৭): রাষ্ট্রের সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং সকলেই আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।
- বৈষম্যহীনতা (অনুচ্ছেদ ২৮): ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদে রাষ্ট্র কোনো নাগরিকের প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করবে না।
- সরকারি নিয়োগলাভে সমতা (অনুচ্ছেদ ২৯): প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদলাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের সমান সুযোগ থাকবে।
- ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার (অনুচ্ছেদ ৩২): আইনানুযায়ী ব্যতীত কোনো ব্যক্তিকে জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে বস্তি হবে না।
- চলাফেরার স্বাধীনতা (অনুচ্ছেদ ৩৬): জনস্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের বাংলাদেশের যেকোনো স্থানে অবাধে চলাফেরার অধিকার রয়েছে।
- সমাবেশের স্বাধীনতা (অনুচ্ছেদ ৩৭): শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্রভাবে সমবেত হওয়ার অধিকার সকল নাগরিকের রয়েছে।
- সংগঠনের স্বাধীনতা (অনুচ্ছেদ ৩৮): শর্তসাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের সমিতি, সংগঠন বা ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করার অধিকার রয়েছে।
- চিন্তা, বিবেক ও বাক-স্বাধীনতা (অনুচ্ছেদ ৩৯): প্রত্যেক নাগরিকের চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্র ও জনস্বার্থ বিরোধী না হলে মতপ্রকাশ ও সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতা থাকবে।
- পেশা বা বৃত্তির স্বাধীনতা (অনুচ্ছেদ ৪০): যেকোনো আইনসঙ্গত পেশা গ্রহণ করার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের রয়েছে।
- ধর্মীয় স্বাধীনতা (অনুচ্ছেদ ৪১): প্রত্যেক নাগরিকের স্ব-স্ব ধর্ম অবলম্বন, পালন ও প্রচার করার অধিকার রয়েছে।
- সম্পত্তির অধিকার (অনুচ্ছেদ ৪২): আইন সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের সম্পত্তি অর্জন, ধারণ, হস্তান্তর করার অধিকার রয়েছে।
৫। বাংলাদেশে ইসলামি শিক্ষার প্রচার প্রসারে কতিপয় প্রসিদ্ধ আলেমের অবদান সম্পর্কে আলোচনা কর।
উত্তর: এই অঞ্চলে ইসলাম সামরিক শক্তির দ্বারা নয়, বরং সূফি-সাধক এবং প্রসিদ্ধ আলেমদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে প্রসার লাভ করেছে। বাংলাদেশে ইসলামি শিক্ষার প্রচার ও প্রসারে যেসব আলেম অনন্য অবদান রেখেছেন তাদের কয়েকজনের আলোচনা নিচে দেওয়া হলো:
- হযরত শাহজালাল (রহ.): চতুর্দশ শতাব্দীতে তিনি তাঁর ৩৬০ জন সঙ্গী নিয়ে সিলেটে আগমন করেন। তাঁর আধ্যাত্মিক প্রভাব ও চরিত্রমাধুর্যে মুগ্ধ হয়ে দলে দলে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে। তিনি সিলেটে বহু মসজিদ ও খানকা প্রতিষ্ঠা করে ইসলামি শিক্ষার প্রসার ঘটান।
- হযরত খান জাহান আলী (রহ.): পঞ্চদশ শতাব্দীতে তিনি বাগেরহাট ও দক্ষিণাঞ্চলে ইসলাম প্রচার করেন। তিনি বিখ্যাত ষাট গম্বুজ মসজিদসহ অনেক মসজিদ-মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন, যা সে যুগে ইসলামি শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
- হাজী শরীয়তুল্লাহ ও দুদু মিয়া: উনিশ শতকের শুরুতে যখন মুসলিম সমাজ নানা কুসংস্কার, শিরক ও বিদআতে নিমজ্জিত, তখন হাজী শরীয়তুল্লাহ ‘ফরায়েজি আন্দোলন’ শুরু করেন। তাঁর পুত্র পীর মুহসিনউদ্দীন (দুদু মিয়া) এই আন্দোলনকে গ্রামপর্যায়ে ছড়িয়ে দেন। তারা কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক শিক্ষা মুসলমানদের মাঝে প্রচার করেন।
- মাওলানা কারামত আলী জৌনপুরী (রহ.): তিনি সারা বাংলা ঘুরে ঘুরে মুসলমানদের শিরক, বিদআত ও কুসংস্কার থেকে মুক্ত করার আন্দোলন চালান। তাঁর রচিত পুস্তকগুলো তৎকালীন মুসলমানদের ইসলামি জ্ঞান অর্জনে বিশাল ভূমিকা রাখে।
- দাদা হুজুর পীর কেবলা (ফুরফুরা শরীফ): বিংশ শতাব্দীতে ফুরফুরা শরীফের পীর আবু বকর সিদ্দিক (রহ.) বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অগণিত মাদরাসা ও মক্তব প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর খলিফাগণ বাংলাদেশে ইসলামি শিক্ষা বিস্তারে অভাবনীয় অবদান রাখেন।
- অন্যান্য আলেমগণ: পরবর্তীতে দেওবন্দ ও আলিয়া মাদ্রাসার অনেক সুযোগ্য আলেম, যেমন- মুফতি আমীমুল ইহসান, আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী, চরমোনাই ও ছারছিনা দরবারের পীর সাহেবগণ বাংলাদেশে হাজার হাজার কওমি ও আলিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে ইসলামি শিক্ষার ভিত মজবুত করেছেন।
৬। বাংলাদেশের বেকার সমস্যার কারণ ও তার সমাধানের উপায়সমূহ লিখ।
বেকার সমস্যার কারণ:
- অতিরিক্ত জনসংখ্যা: বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কর্মসংস্থান সৃষ্টির হারের চেয়ে অনেক বেশি। ফলে প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ বেকার হচ্ছে।
- ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা: আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা মূলত সাধারণ ও তাত্ত্বিক জ্ঞাননির্ভর, যা কর্মমুখী নয়। ফলে উচ্চশিক্ষিত বেকারদের সংখ্যা বাড়ছে।
- শিল্পায়নের অভাব: পর্যাপ্ত পুঁজির অভাব ও বিনিয়োগের পরিবেশ না থাকায় দেশে ভারী ও বৃহৎ শিল্পকারখানা গড়ে ওঠেনি, যা বিশাল বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান করতে পারে।
- কৃষির ওপর অত্যধিক নির্ভরতা: দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী কৃষির ওপর নির্ভরশীল, যেখানে ছদ্মবেশী বেকারত্ব (Disguised unemployment) বিরাজ করে এবং বছরের নির্দিষ্ট সময়ে কাজ থাকে না।
- কারিগরি শিক্ষার অভাব: হাতেকলমে কারিগরি বা ভোকেশনাল শিক্ষার প্রতি অনীহা থাকায় দক্ষ জনশক্তি তৈরি হচ্ছে না।
সমাধানের উপায়সমূহ:
- কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষা: প্রচলিত সাধারণ শিক্ষার পরিবর্তে কর্মমুখী ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা শেষ করে নিজেরাই কাজ খুঁজে নিতে বা শুরু করতে পারে।
- শিল্পায়ন ও কুটির শিল্পের বিকাশ: দেশে ব্যাপকহারে ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ ঘটাতে হবে। সরকার ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের নতুন নতুন কারখানা স্থাপন করতে হবে।
- আত্মকর্মসংস্থানে উৎসাহ প্রদান: বেকার যুবকদের বিনা জামানতে ও স্বল্প সুদে ঋণ দিয়ে আত্মকর্মসংস্থানে (Self-employment) উৎসাহিত করতে হবে।
- জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ: জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি কঠোরভাবে প্রয়োগ করে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমিয়ে আনতে হবে।
- দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি: বেকার যুবকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করে বিদেশে রপ্তানি করতে পারলে বেকার সমস্যা অনেকটাই হ্রাস পাবে।
৭। বাংলাদেশের সংবিধানের সংশোধনী ও অধ্যাদেশসমূহ বর্ণনা কর।
সংবিধানের সংশোধনী:
সংবিধান কোনো অপরিবর্তনীয় বিষয় নয়। দেশের মানুষের প্রয়োজন ও যুগের চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে সংবিধান পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা সংশোধন করা যায়। বাংলাদেশের সংবিধানে এ পর্যন্ত ১৭টি সংশোধনী আনা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সংশোধনী হলো:
- ১ম সংশোধনী (১৯৭৩): যুদ্ধাপরাধী এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্ত ব্যক্তিদের বিচারের বিধান রাখা হয়।
- ৪র্থ সংশোধনী (১৯৭৫): সংসদীয় পদ্ধতির সরকার বাতিল করে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন এবং বহুদলীয় রাজনীতির পরিবর্তে একদলীয় ব্যবস্থা (বাকশাল) চালু করা হয়।
- ৫ম সংশোধনী (১৯৭৯): বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরায় চালু করা হয় এবং ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম’ যুক্ত করা হয়।
- ৮ম সংশোধনী (১৯৮৮): ‘ইসলাম’কে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
- ১২শ সংশোধনী (১৯৯১): রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থার পরিবর্তে পুনরায় সংসদীয় সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়।
- ১৫শ সংশোধনী (২০১১): নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিধান করা হয় এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
- ১৭শ সংশোধনী (২০১৮): সংসদে মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত ৫০টি আসনের মেয়াদ আরও ২৫ বছর বৃদ্ধি করা হয়।
অধ্যাদেশ (Ordinance):
জাতীয় সংসদের অধিবেশন যখন বন্ধ থাকে বা সংসদ যখন ভেঙে দেওয়া হয়, তখন রাষ্ট্রের জরুরি প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতি যে আইন জারি করেন, তাকে অধ্যাদেশ বলে। একটি অধ্যাদেশের ক্ষমতা সংসদের পাস করা আইনের মতোই শক্তিশালী। তবে সংসদের পরবর্তী অধিবেশন বসার ৩০ দিনের মধ্যে অধ্যাদেশটি সংসদে উপস্থাপন করে অনুমোদন করিয়ে নিতে হয়, অন্যথায় তা বাতিল হয়ে যায়।
৮। প্রাকৃতিক দুর্যোগ দ্বারা কী উদ্দেশ্য? তোমার মতে, বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণ ও উত্তরণের পদ্ধতিসমূহ লিখ।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ:
প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলতে প্রকৃতির এমন আকস্মিক ও ধ্বংসাত্মক পরিবর্তনকে বোঝায় যা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনকে বিপর্যস্ত করে এবং জীবন ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। বাংলাদেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, খরা, নদীভাঙন ও ভূমিকম্প উল্লেখযোগ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ।
বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণ:
- ভৌগোলিক অবস্থান: বাংলাদেশের উত্তরে হিমালয় পর্বতমালা এবং দক্ষিণে ফানেল আকৃতির বঙ্গোপসাগর অবস্থিত। এই ভৌগোলিক কাঠামোর কারণে এখানে প্রবল বর্ষণ ও প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়।
- জলবায়ু পরিবর্তন ও গ্লোবাল ওয়ার্মিং: বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ঋতুচক্রের পরিবর্তন ঘটছে, যার ফলে অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি ও বন্যা হচ্ছে।
- নদীর নাব্যতা হ্রাস: উজান থেকে নেমে আসা পলি জমার কারণে বাংলাদেশের নদ-নদীগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ফলে বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি ধারণ করতে না পেরে দুকূল ছাপিয়ে বন্যা ও নদীভাঙন সৃষ্টি করে।
- নির্বিচারে বৃক্ষনিধন: বনাঞ্চল কেটে ফেলার ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং খরা ও সাইক্লোনের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
উত্তরণের পদ্ধতিসমূহ:
- ব্যাপক বৃক্ষরোপণ: দুর্যোগ মোকাবিলায় উপকূলীয় অঞ্চলে সবুজ বেষ্টনী (Green belt) তৈরি করতে বায়ুপ্রবাহ রোধে দেশজুড়ে প্রচুর গাছ লাগাতে হবে।
- নদী খনন ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ: ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদ-নদীগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে হবে এবং নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাস ঠেকাতে উপকূল ও নদীর পাড়ে শক্ত বাঁধ নির্মাণ করতে হবে।
- পূর্বাভাস ও সাইক্লোন শেল্টার: আবহাওয়া পূর্বাভাসের প্রযুক্তি আরও আধুনিক করতে হবে এবং দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় পর্যাপ্ত সাইক্লোন শেল্টার (আশ্রয়কেন্দ্র) নির্মাণ করতে হবে।
- জনসচেতনতা বৃদ্ধি: দুর্যোগ মোকাবিলায় সাধারণ মানুষের করণীয় সম্পর্কে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
مجموعة (ب) / খ অংশ — সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্ন (মান—৫x৪=২০)
[ أجب عن أربعة من الأسئلة التالية باختصار / সংক্ষেপে নিম্নের যে কোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও ]
৯। বাংলাদেশে জনসংখ্যার ঘনত্ব সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত অনুচ্ছেদ লিখ।
উত্তর: আয়তনের তুলনায় বিশাল জনসংখ্যার দেশ হলো বাংলাদেশ। দেশের মোট আয়তন ১,৪৭,৫৭০ বর্গ কিলোমিটার এবং বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটিরও বেশি। সে হিসাবে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে গড়ে প্রায় ১১১৫ জন মানুষ বাস করে, যা বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ জনসংখ্যার ঘনত্ব। পৃথিবীর খুব কম দেশেই এত ঘনবসতি দেখা যায়। এই অতিরিক্ত জনসংখ্যার ঘনত্বের কারণে দেশে দারিদ্র্য, বেকারত্ব, খাদ্যাভাব, বাসস্থান সমস্যা এবং পরিবেশ দূষণের মাত্রা মারাত্মক আকার ধারণ করছে। কৃষি জমি কমে যাচ্ছে এবং শহরগুলোতে বস্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য এই বিশাল জনসংখ্যাকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা এখন সময়ের দাবি।
১০। বাংলাদেশের উপজাতি ও আদিবাসী সম্পর্কে ধারণা দাও।
উত্তর: বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার একটি ক্ষুদ্র অংশ হলো উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠী। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল (রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান), বৃহত্তর সিলেট, ময়মনসিংহ এবং রাজশাহী অঞ্চলে এই উপজাতিরা বসবাস করে। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো, খাসিয়া, সাঁওতাল, রাখাইন প্রভৃতি হলো বাংলাদেশের প্রধান উপজাতি। তাদের প্রত্যেকের রয়েছে আলাদা ভাষা, নিজস্ব সমাজব্যবস্থা, উৎসব, পোশাক ও খাদ্যাভ্যাস। যেমন- গারো ও খাসিয়া সমাজ মাতৃতান্ত্রিক। নববর্ষ উপলক্ষে তারা বৈসাবি, বিজু, সাংগ্রাই ইত্যাদি রঙিন উৎসব উদ্যাপন করে। তারা বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতিকে আরও বৈচিত্র্যময় ও বর্ণিল করে তুলেছে।
১১। স্থলভাগের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ আলোচনা কর।
উত্তর: উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা একটি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। বাংলাদেশ সরকার স্থলভাগের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করতে বৈপ্লবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অর্জন হলো সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে প্রমত্তা পদ্মার বুকে ৬.১৫ কিমি দীর্ঘ ‘পদ্মা বহুমুখী সেতু’ নির্মাণ, যা ২১টি জেলার যোগাযোগকে সহজ করেছে। এছাড়া রাজধানীতে যানজট নিরসনে ‘মেট্রোরেল’ ও ‘এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে’ চালু করা হয়েছে। চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম সুড়ঙ্গপথ ‘বঙ্গবন্ধু টানেল’। ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ৪ লেনে উন্নীত করা হয়েছে এবং রেল যোগাযোগ আধুনিকায়নেও ব্যাপক প্রকল্প চলমান রয়েছে।
১২। ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান সম্পর্কে একটি অনুচ্ছেদ লিখ।
উত্তর: পাকিস্তানের তৎকালীন স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের অত্যাচার, সীমাহীন বৈষম্য এবং ঐতিহাসিক আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ফাঁসি দেওয়ার চক্রান্তের বিরুদ্ধে ১৯৬৯ সালে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র ও আপামর জনতা যে তীব্র ও দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলে, তা-ই ইতিহাসে ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান’ নামে পরিচিত। পুলিশের গুলিতে আসাদ, ড. জোহা, মতিউর ও সার্জেন্ট জহুরুল হক শহীদ হলে এই আন্দোলন অগ্নিস্ফুলিঙ্গের রূপ নেয়। তীব্র গণদাবির মুখে স্বৈরাচারী আইয়ুব খান বাধ্য হয়ে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেন এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। এই গণঅভ্যুত্থানই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিল।
১৩। “পদ্মা বহুমুখী সেতু বাংলাদেশের গৌরব” শীর্ষক একটি রচনা লিখ।
উত্তর: পদ্মা সেতু কেবল ইট, সিমেন্ট আর রডের তৈরি কোনো সাধারণ সেতু নয়; এটি বাঙালি জাতির আত্মমর্যাদা, সক্ষমতা এবং সাহসের এক বিশাল প্রতীক। বিশ্বব্যাংক যখন দুর্নীতির মিথ্যা অপবাদ দিয়ে এই প্রকল্পের অর্থায়ন বন্ধ করে দিয়েছিল, তখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসিকতায় সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই দ্বিতল (উপরে সড়ক, নিচে রেল) সেতুটি নির্মিত হয়। ২০২২ সালের ২৫শে জুন উদ্বোধনের মাধ্যমে এর ওপর দিয়ে যান চলাচল শুরু হয়। এই সেতু দেশের দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার সাথে রাজধানীর সরাসরি ও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ স্থাপন করেছে। এটি দেশের জিডিপি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য বিমোচনে যুগান্তকারী অবদান রাখছে। তাই পদ্মা সেতু সত্যিই বাংলাদেশের এক অবিস্মরণীয় গৌরব।
১৪। বাংলাদেশের পাহাড়সমূহ সম্পর্কে আলোচনা কর।
উত্তর: বাংলাদেশ মূলত একটি বিশাল বদ্বীপ সমতল ভূমি হলেও এর পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে পাহাড়ি অঞ্চল রয়েছে। এই পাহাড়গুলো টারশিয়ারি যুগের। বাংলাদেশের পাহাড়গুলোকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়: ১. দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পাহাড় এবং ২. উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়।
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়গুলো রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলায় অবস্থিত। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ ‘তাজিংডং’ (বিজয়) বান্দরবান জেলায় অবস্থিত। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়গুলো সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলায় অবস্থিত, যা স্থানীয়ভাবে ‘টিলা’ নামে পরিচিত। এই পাহাড়গুলো চা বাগান, মূল্যবান বনজ সম্পদ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর, যা দেশের পর্যটন শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১৫। বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সম্পর্কে যা জান লিখ।
উত্তর: বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হলেও এখানে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ স্মরণকাল থেকে সম্প্রীতির সাথে বসবাস করে আসছে, যাদেরকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বলা হয়। বাংলাদেশের সংবিধানে সকল ধর্ম ও বর্ণের মানুষের সমান অধিকার, স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। তারা স্বাধীনভাবে তাদের দুর্গাপূজা, বুদ্ধ পূর্ণিমা, বড়দিনসহ নানা ধর্মীয় উৎসব পালন করে। জাতীয় অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা, চিকিৎসা ও সংস্কৃতিতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো বাংলাদেশ।
১৬। বাংলাদেশে প্রাকৃতিক মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সম্ভাব্য পদক্ষেপসমূহ লিখ।
উত্তর: ‘মাছে ভাতে বাঙালি’ প্রবাদটি টিকিয়ে রাখতে হলে দেশে প্রাকৃতিক মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। এর জন্য নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে:
১. দূষণ রোধ: নদী-নালা, হাওর-বাঁওড় এবং খাল-বিলের পানি শিল্পকারখানার বর্জ্য ও কৃষিকাজে ব্যবহৃত রাসায়নিকের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে।
২. অভয়াশ্রম সৃষ্টি: মাছের নিরাপদ প্রজননের জন্য দেশের বিভিন্ন নদীতে স্থায়ী মৎস্য অভয়াশ্রম তৈরি করতে হবে।
৩. প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা: ইলিশসহ অন্যান্য মাছের প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে এবং মা মাছ ও পোনা মাছ নিধন বন্ধ করতে হবে।
৪. অবৈধ জাল ব্যবহার বন্ধ করা: কারেন্ট জাল ও বেহুন্দি জালের মতো ধ্বংসাত্মক জালের ব্যবহার ও উৎপাদন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে।






