As-Sirah An-Nabawiyyah (আস-সীরাহ আন-নাববীয়্যাহ) 201204 – Fazil Hons Al Quran 2nd Year 2022 QnA

Join Our Telegram Channel
দ্রুত নতুন বই পেতে যুক্ত থাকুন
Join Now
admin
as sirah an nabawiyyah 201204 fazil hons al quran 2nd year 2022 qna
Join Our WhatsApp Channel
দ্রুত নতুন বই পেতে যুক্ত থাকুন
Join Now
📋 সূচিপত্র (Table of Contents)

As-Sirah An-Nabawiyyah (Code: 201204) – ২০২২ প্রশ্ন ও উত্তর

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২২ এর আল-কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের السيرة النبوية (আস-সীরাহ আন-নাববীয়্যাহ) বিষয়ের সম্পূর্ণ উত্তরমালা।

বিঃদ্রঃ পরীক্ষার্থীদের আগামী পরীক্ষার সর্বোচ্চ প্রস্তুতির সুবিধার্থে মূল প্রশ্নপত্রের ক-বিভাগ এবং খ-বিভাগের সবগুলো প্রশ্নের ১০০% নির্ভুল উত্তর বিস্তারিতভাবে নিচে দেওয়া হলো।

مجموعة (الف) – ক-বিভাগ [যেকোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও]

١- عرف السيرة- وما المراد بالسيرة النبوية؟ وما مكانتها؟ ولم مست الحاجة إلى دراستها؟ بين-

[السيرة এর সংজ্ঞা দাও। السيرة النبوية বলতে কী বোঝায়? এর মর্যাদা কী ও তা পাঠের প্রয়োজনীয়তা কী? বর্ণনা কর।]

১. السيرة (সীরাহ) এর সংজ্ঞা:
السيرة শব্দটি আরবি ‘سار’ ক্রিয়ামূল থেকে নির্গত, যার অর্থ হলো পথ চলা, পদ্ধতি, জীবন-চরিত বা জীবনী। আভিধানিক অর্থে যেকোনো মানুষের জীবনপ্রণালী বা কর্মপদ্ধতিকেই সীরাহ বলা যায়।

২. السيرة النبوية বলতে কী বোঝায়:
পারিভাষিক অর্থে, সীরাতুন্নবী (السيرة النبوية) বলতে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবি হজরত মুহাম্মদ (صلى الله عليه وسلم) এর জন্ম থেকে শুরু করে ইন্তেকাল পর্যন্ত তাঁর গোটা জীবনের ঘটনাবলি, আচার-আচরণ, চরিত্র, যুদ্ধ-বিগ্রহ, দাওয়াত ও ইসলাম প্রচারের সামগ্রিক বিবরণকে বোঝায়।

৩. সীরাতুন্নবীর মর্যাদা (مكانتها):
সীরাতুন্নবী (সা.) এর মর্যাদা অপরিসীম। এটি ইসলামের দ্বিতীয় মূল উৎস সুন্নাহ বা হাদিসের বাস্তব রূপ। স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা কুরআনে ঘোষণা করেছেন, “অবশ্যই তোমাদের জন্য রাসুলের জীবনে রয়েছে উত্তম আদর্শ” (সূরা আহযাব: ২১)। সীরাত অধ্যয়ন ব্যতীত ইসলামি শরিয়তের পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান অর্জন সম্ভব নয়, কারণ কুরআন বোঝার জন্য সীরাতের প্রেক্ষাপট অপরিহার্য।

৪. সীরাত পাঠের প্রয়োজনীয়তা (الحاجة إلى دراستها):
* রাসুল (সা.) কে ভালোবাসা: সীরাত অধ্যয়নের মাধ্যমে তাঁর মহান চরিত্র সম্পর্কে জানা যায়, যা তাঁর প্রতি মুমিনের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা বৃদ্ধি করে।
* আদর্শ অনুসরণ: মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে—ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে—রাসুল (সা.) এর আদর্শ অনুসরণ করার জন্য সীরাত পাঠ বাধ্যতামূলক।
* কুরআন অনুধাবন: পবিত্র কুরআনের অনেক আয়াত নাযিলের প্রেক্ষাপট (শানে নুযূল) সীরাত ছাড়া বোঝা যায় না।
* ঈমান দৃঢ় করা: ইসলামের প্রাথমিক যুগে রাসুল (সা.) ও সাহাবিদের ত্যাগ-তিতিক্ষা ও ধৈর্য্যের ইতিহাস পাঠ করলে ঈমান মজবুত হয় এবং যেকোনো সংকট মোকাবিলায় অনুপ্রেরণা পাওয়া যায়।

٢- اكتب الحالات الدينية والاجتماعية والثقافية قبل مبعث النبي صلى الله عليه وسلم في العرب-

[আরবে নবি (সা.) প্রেরিত হওয়ার পূর্বের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থা লিপিবদ্ধ কর।]

নবি (সা.) প্রেরিত হওয়ার পূর্বে আরবের অবস্থা (আইয়ামে জাহেলিয়াত):

১. ধর্মীয় অবস্থা:
ইসলাম আগমনের পূর্বে আরবের ধর্মীয় অবস্থা ছিল চরম অবক্ষয়ের শিকার। অধিকাংশ মানুষ ছিল মূর্তিপূজক। পবিত্র কাবা ঘরে ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করা হয়েছিল, যার মধ্যে ‘হুবাল’, ‘লাত’, ‘মানাত’ ও ‘উযযা’ ছিল প্রধান। এছাড়া কিছু মানুষ চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্র এবং গাছপালার পূজা করত। তারা পরকাল, হাশর-নশর ও পুনরুত্থানে বিশ্বাস করত না। হাতেগোনা কয়েকজন ‘হানিফ’ (ইবরাহিম আ. এর অনুসারী একত্ববাদী) ছাড়া গোটা আরব শিরক ও কুসংস্কারে নিমজ্জিত ছিল।

২. সামাজিক অবস্থা:
তৎকালীন আরব সমাজের অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয় ও বর্বর। গোত্রপ্রীতি ছিল চরম পর্যায়ে। সামান্য অজুহাতে এক গোত্র অন্য গোত্রের সাথে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হতো, যা যুগ যুগ ধরে চলত (যেমন- বুয়াস ও ফিজারের যুদ্ধ)। সমাজে নারীর কোনো মর্যাদা ছিল না; তাদের পণ্য বা ভোগ্যবস্তু মনে করা হতো। কন্যাসন্তান জন্ম নেওয়াকে চরম অপমানজনক মনে করে অনেক পিতা জীবন্ত কন্যাসন্তানকে কবর দিত। মদ, জুয়া, ব্যভিচার ও লুটতরাজ সমাজের সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছিল।

৩. সাংস্কৃতিক অবস্থা:
সামাজিক ও ধর্মীয় অবক্ষয় থাকলেও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে আরবরা বেশ অগ্রসর ছিল। বিশেষ করে কাব্যচর্চা ও বাগ্মিতায় তারা বিশ্বসেরা ছিল। তাদের স্মৃতিশক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর। উকাজের মেলায় প্রতি বছর কবিদের মধ্যে কাব্য প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো এবং সেরা কবিতাগুলো (‘মুয়াল্লাকাত’) কাবা ঘরের দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা হতো। ইমরুল কায়েস, ত্বরফা, যুহাইর প্রমুখ ছিলেন সে যুগের বিখ্যাত কবি। তবে তাদের কবিতার মূল বিষয়বস্তু ছিল গোত্রের শৌর্যবীর্য, নারী, মদ ও যুদ্ধের প্রশংসা।

٣- لم اختارت خديجة النبي صلى الله عليه وسلم لتجارتها؟ تحدث عن زواجها معه-

[হযরত খাদীজা (রা) নবি (সা.)-কে কেন ব্যবসার জন্য নির্বাচন করলেন? তাঁর সাথে তাঁর বিয়ে সম্পর্কে আলোচনা কর।]

হযরত খাদিজা (রা.) কর্তৃক রাসুল (সা.)-কে ব্যবসার জন্য নির্বাচনের কারণ:
হযরত খাদিজা (রা.) ছিলেন মক্কার একজন অত্যন্ত বুদ্ধিমতী, অভিজাত ও ধনাঢ্য বিধবা নারী। তিনি তাঁর ব্যবসার জন্য বিশ্বস্ত লোক খুঁজতেন, যাদের মাধ্যমে তিনি সিরিয়ায় বাণিজ্য কাফেলা পাঠাতেন। রাসুল (সা.) এর বয়স যখন ২৫ বছর, তখন মক্কায় তাঁর সত্যবাদিতা, আমানতদারি ও সততার সুনাম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং তিনি ‘আল-আমিন’ (বিশ্বস্ত) ও ‘আস-সাদিক’ (সত্যবাদী) উপাধিতে ভূষিত হন। এই অসামান্য সততা ও সুমহান চরিত্রের কথা শুনে হযরত খাদিজা (রা.) আকৃষ্ট হন এবং রাসুল (সা.)-কে তাঁর বাণিজ্য কাফেলার দায়িত্ব দিয়ে সিরিয়ায় পাঠানোর প্রস্তাব দেন।

রাসুল (সা.) এর সাথে খাদিজা (রা.) এর বিবাহ:
রাসুল (সা.) হযরত খাদিজা (রা.) এর প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং তাঁর বিশ্বস্ত ভৃত্য ‘মায়সারা’-কে সাথে নিয়ে সিরিয়ায় বাণিজ্যে যান। এই সফরে রাসুল (সা.) এর বিচক্ষণতা ও সততার কারণে ব্যবসায় অভূতপূর্ব লাভ হয়। মায়সারা ফিরে এসে খাদিজা (রা.) এর কাছে রাসুল (সা.) এর সততা, মহৎ চরিত্র এবং সফরে সংঘটিত কিছু অলৌকিক ঘটনার কথা বর্ণনা করেন।

এসব শুনে খাদিজা (রা.) অত্যন্ত মুগ্ধ হন এবং তাঁর বান্ধবী নাফিসা বিনতে মুনাইয়্যার মাধ্যমে রাসুল (সা.) এর নিকট বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। রাসুল (সা.) তাঁর চাচা আবু তালিব ও অন্যান্য মুরুব্বিদের সাথে পরামর্শ করে এই প্রস্তাবে সম্মতি জ্ঞাপন করেন। এরপর আবু তালিব বিয়ের খুতবা পাঠ করেন এবং ৫০০ দেরহাম মোহরানা ধার্য করে রাসুল (সা.) এর সাথে খাদিজা (রা.) এর বিবাহ সম্পন্ন হয়। বিয়ের সময় রাসুল (সা.) এর বয়স ছিল ২৫ বছর এবং হযরত খাদিজা (রা.) এর বয়স ছিল ৪০ বছর।

٤- كيف كان بداية الوحى على رسول الله صلى الله عليه وسلم؟ وما أسلوب الدعوة إلى العرب بعده؟ بين مفصلا-

[রাসুল (সা.) এর প্রতি অহির সূচনা কীভাবে হয়েছিল? অতঃপর আরবদের নিকট দাওয়াতের পদ্ধতি কী ছিল? সবিস্তার বর্ণনা কর।]

অহির সূচনা (بداية الوحي):
রাসুল (সা.) এর বয়স যখন ৪০ বছরের কাছাকাছি, তখন তিনি নির্জনতা পছন্দ করতেন। তিনি মক্কার অদূরে হেরা গুহায় দিনের পর দিন ইবাদত ও ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। এই অবস্থায় তাঁর প্রতি অহির প্রাথমিক সূচনা হয় সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে; তিনি স্বপ্নে যা দেখতেন তা ভোরের আলোর মতো সত্য হয়ে প্রকাশ পেত।
অবশেষে ৪০ বছর বয়সে, হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন থাকা অবস্থায় জিবরাইল (আ.) তাঁর কাছে আসেন এবং বলেন “ইকরা” (পড়ুন)। রাসুল (সা.) বললেন “আমি পড়তে জানি না”। জিবরাইল (আ.) তাঁকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ছেড়ে দিলেন এবং তৃতীয়বার পুনরায় “ইকরা” বললেন। এরপর তিনি সূরা আলাকের প্রথম ৫টি আয়াত (اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ…) পাঠ করলেন এবং রাসুল (সা.) ও তা মুখস্থ করে নিলেন। এটিই ছিল ইসলামের প্রথম অহি নাযিল।

অহি নাযিলের পর দাওয়াতের পদ্ধতি (أسلوب الدعوة):
নবুওয়াত প্রাপ্তির পর রাসুল (সা.) আরবদের কাছে ইসলাম প্রচার শুরু করেন, যা প্রধানত তিনটি স্তরে বিভক্ত ছিল:

১. গোপনে দাওয়াত (৩ বছর): প্রথম তিন বছর তিনি অত্যন্ত গোপনে শুধুমাত্র নিজ পরিবার ও বিশ্বস্ত বন্ধুদের কাছে ইসলামের দাওয়াত দেন। এই পর্যায়ে হযরত খাদিজা, আলী, আবু বকর, যায়েদ ইবনে হারিসা প্রমুখ ইসলাম গ্রহণ করেন।

২. আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে প্রকাশ্য দাওয়াত: এরপর আল্লাহর নির্দেশ (وأنذر عشيرتك الأقربين) অবতীর্ণ হলে রাসুল (সা.) সাফা পাহাড়ে উঠে কুরাইশদের সকল গোত্রকে ডেকে প্রকাশ্যে একত্ববাদ ও পরকালের দাওয়াত দেন। কিন্তু তাঁর আপন চাচা আবু লাহাব এর তীব্র বিরোধিতা করে।

৩. সর্বসাধারণের মাঝে প্রকাশ্য দাওয়াত: এরপর (فاصدع بما تؤمر) আয়াত নাযিল হলে রাসুল (সা.) মক্কার সর্বত্র, কাবা চত্বরে এবং হজের মৌসুমে আগত বিভিন্ন গোত্রের মানুষের কাছে প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করেন। এ পর্যায়ে মক্কার মুশরিকদের পক্ষ থেকে সীমাহীন অত্যাচার, নির্যাতন ও বয়কটের শিকার হলেও তিনি তাঁর মিশনে অটল থাকেন।

٥- تحدث عن خلفية الهجرة إلى الحبشة- وما كان عددهم؟ بين بالإيضاح-

[হাবশায় হিজরতের প্রেক্ষাপট আলোচনা কর। তাদের সংখ্যা কতজন ছিল? বিশদভাবে বর্ণনা কর।]

হাবশায় হিজরতের প্রেক্ষাপট (خلفية الهجرة إلى الحبشة):
মক্কায় ইসলাম প্রচার প্রকাশ্যে শুরু হওয়ার পর কুরাইশদের বিরোধিতা চরমে পৌঁছায়। তারা নব্য মুসলিমদের, বিশেষ করে দাস-দাসী ও দুর্বল সাহাবিদের ওপর অমানবিক নির্যাতন শুরু করে। উত্তপ্ত বালুতে শুইয়ে রাখা, পাথর চাপা দেওয়া এবং চাবুক পেটা করার মতো লোমহর্ষক নির্যাতন চলতে থাকে।
এমতাবস্থায়, নবুওয়াতের পঞ্চম বছরে রাসুল (صلى الله عليه وسلم) যখন দেখলেন যে সাহাবিরা নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করতে পারছেন না এবং কুরাইশদের অত্যাচার সহ্যসীমা অতিক্রম করছে, তখন তিনি সাহাবিদের হাবশায় (বর্তমান ইথিওপিয়া) হিজরত করার পরামর্শ দেন। রাসুল (সা.) জানতেন যে হাবশার সম্রাট নাজ্জাশি ছিলেন একজন ন্যায়পরায়ণ ও দয়ালু খ্রিষ্টান শাসক, যার রাজ্যে কেউ জুলুমের শিকার হতো না। তাই সাহাবিদের দ্বীন ও জীবনের নিরাপত্তার স্বার্থে এই হিজরতের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়।

হিজরতকারীদের সংখ্যা (عددهم):
হাবশায় হিজরত দুটি পর্যায়ে সম্পন্ন হয়েছিল:
* প্রথম হিজরত: নবুওয়াতের পঞ্চম বছরের রজব মাসে প্রথম কাফেলাটি হাবশার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। এই কাফেলায় ছিলেন ১২ জন পুরুষ এবং ৪ জন নারী। হযরত উসমান (রা.) এবং তাঁর স্ত্রী, রাসুল (সা.) এর কন্যা হযরত রুকাইয়া (রা.) এই কাফেলার অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
* দ্বিতীয় হিজরত: প্রথম কাফেলার হিজরতের কিছুদিন পর মক্কায় কুরাইশদের ইসলাম গ্রহণের একটি মিথ্যা গুজব ছড়ালে তারা মক্কায় ফিরে আসেন, কিন্তু সত্যতা জেনে আবার হাবশায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এবার অনেক বড় একটি কাফেলা হাবশায় হিজরত করে। দ্বিতীয় কাফেলায় হিজরতকারীদের সংখ্যা ছিল ৮৩ জন পুরুষ এবং ১৮ জন নারী। এদের নেতৃত্বে ছিলেন হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব (রা.)।

٦- عرف الاسراء والمعراج؟ أثبت بالدلائل أنهما وقعا فى اليقظة لا فى الرؤيا-

[الاسراء ও المعراج এর সংজ্ঞা দাও। দলিলাদি দ্বারা প্রমাণ কর যে, ইসরা ও মিরাজ স্বপ্নযোগে নয়, বরং জাগ্রত অবস্থায় সম্পন্ন হয়েছে।]

الإسراء ও المعراج (ইসরা ও মিরাজ) এর সংজ্ঞা:
* الإسراء: এর আভিধানিক অর্থ রাতে ভ্রমণ করা। শরিয়তের পরিভাষায়, নবুওয়াতের দ্বাদশ বা ত্রয়োদশ বছরে এক রাতে জিবরাইল (আ.) এর সাথে বোরাকে চড়ে রাসুল (সা.) এর মক্কার মসজিদে হারাম থেকে ফিলিস্তিনের মসজিদে আকসা পর্যন্ত যে ঐশ্বরিক রাত্রিকালীন ভ্রমণ সংঘটিত হয়েছিল, তাকে ‘ইসরা’ বলা হয়।
* المعراج: এর আভিধানিক অর্থ ঊর্ধ্বারোহণের সিঁড়ি অথবা মাধ্যম। পরিভাষায়, মসজিদে আকসা থেকে রাসুল (সা.) এর সাত আসমান ভেদ করে সিদরাতুল মুনতাহা হয়ে আল্লাহর আরশ পর্যন্ত আরোহণ এবং আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের পর পুনরায় মক্কায় ফিরে আসার অলৌকিক ঘটনাকে ‘মিরাজ’ বলা হয়।

ইসরা ও মিরাজ সশরীরে ও জাগ্রত অবস্থায় হওয়ার প্রমাণ (بالأدلة):
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের সর্বসম্মত আকিদা হলো, ইসরা ও মিরাজ উভয় ঘটনাই সশরীরে, সজ্ঞানে এবং জাগ্রত অবস্থায় (فى اليقظة) ঘটেছিল, স্বপ্নযোগে (فى الرؤيا) নয়। এর প্রমাণসমূহ হলো:
১. কুরআনের দলিল: আল্লাহ তায়ালা সূরা বনি ইসরাইলে বলেছেন: “سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَىٰ بِعَبْدِهِ لَيْلًا…” (পবিত্র সেই সত্তা যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে ভ্রমণ করিয়েছেন)। এখানে ‘عَبْد’ (বান্দা) শব্দটি আত্মা ও শরীর উভয়ের সমাহারকে বোঝায়, শুধু আত্মাকে নয়।
২. অলৌকিকত্বের প্রমাণ: যদি এটি শুধু স্বপ্ন হতো, তবে এর মধ্যে কোনো অলৌকিকত্ব (معجزة) থাকত না। মানুষ স্বপ্নে অনেক কিছুই দেখে, তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। কিন্তু মক্কার কাফিররা এই ঘটনা শুনে তীব্র অবিশ্বাস ও ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেছিল, যা প্রমাণ করে এটি একটি বাস্তব ও সশরীরে ঘটা ঘটনা ছিল, যা তাদের কাছে অসম্ভব মনে হয়েছিল।
৩. হাদিসের প্রমাণ: বোখারি ও মুসলিম শরিফের দীর্ঘ হাদিসে বোরাক আনা, রাসুল (সা.) এর তাতে আরোহণ করা, বায়তুল মুকাদ্দাসে নবিদের ইমামতি করা এবং আসমানে বিভিন্ন নবিদের সাথে সাক্ষাৎ করে সালাম ও কথোপকথনের যে বিস্তারিত বিবরণ এসেছে, তা কেবল জাগ্রত ও সশরীরে উপস্থিতির প্রমাণ বহন করে।
৪. চোখের সাক্ষ্য: আল্লাহ কুরআনে বলেছেন “مَا زَاغَ الْبَصَرُ وَمَا طَغَى” (তাঁর দৃষ্টি বিভ্রম হয়নি এবং লক্ষ্যচ্যুতও হয়নি)। ‘بَصَر’ (চোখ) শারীরিক অঙ্গ। সুতরাং, এটি স্পষ্ট যে তিনি চর্মচক্ষুতেই সবকিছু অবলোকন করেছিলেন।

٧- ما معنى الغزوة لغة واصطلاحا؟ ثم تحدث عن غزوة تبوك ونتيجتها-

[الغزوة শব্দের শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ কী? অতঃপর تبوك غزوة ও এর ফলাফল আলোচনা কর।]

الغزوة (গাযওয়া) এর শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ:
* শাব্দিক অর্থ: যুদ্ধ, আক্রমণ, সশস্ত্র অভিযান।
* পারিভাষিক অর্থ: ইসলামি পরিভাষায়, ইসলামের যুগে যেসব যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) স্বয়ং সশরীরে অংশগ্রহণ করেছেন, সেসব যুদ্ধকে গাযওয়া (الغزوة) বলা হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, রাসুল (সা.) মোট ২৭টি গাযওয়ায় অংশগ্রহণ করেছিলেন।

غزوة تبوك (তাবুক যুদ্ধ) এর আলোচনা:
নবম হিজরির রজব মাসে গাযওয়ায়ে তাবুক সংঘটিত হয়। এটি ছিল রাসুল (সা.) এর জীবনের সর্বশেষ গাযওয়া।
প্রেক্ষাপট: রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াস মদিনা আক্রমণের জন্য সিরিয়া সীমান্তে এক বিশাল সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করছে—এমন খবর মদিনায় পৌঁছালে রাসুল (সা.) মুসলিমদের সুরক্ষার জন্য একটি বড় বাহিনী গঠন করার নির্দেশ দেন। সময়টা ছিল গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহ, খরা এবং ফসলের মৌসুম। এই কঠিন সময়ে ত্রিশ হাজার মুজাহিদের এক বিশাল বাহিনী প্রস্তুত করা হয়। মুসলমানরা এই যুদ্ধে মুক্তহস্তে দান করেন (যার মধ্যে আবু বকর রা. তাঁর সর্বস্ব এবং উসমান রা. বিপুল অর্থ ও রসদ দান করেন)।
রাসুল (সা.) এই বিশাল বাহিনী নিয়ে মদিনা থেকে বহুদূরে সিরিয়া সীমান্তের ‘তাবুক’ নামক স্থানে গিয়ে শিবির স্থাপন করেন।

তাবুক যুদ্ধের ফলাফল (نتيجتها):
১. রোমান বাহিনী মুসলমানদের এই বিশাল প্রস্তুতি ও আগমনের খবর পেয়ে মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ভয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্রসর না হয়ে সিরিয়ার অভ্যন্তরে পালিয়ে যায়। ফলে কোনো রক্তপাত ছাড়াই মুসলমানরা কৌশলগত বিজয় লাভ করে。
২. রাসুল (সা.) তাবুকে প্রায় ২০ দিন অবস্থান করেন এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের খ্রিষ্টান ও ইহুদি গোত্রপ্রধানদের (مثل আইলার অধিপতি ইয়োহান্না) সাথে সন্ধি ও জিজিয়া কর নির্ধারণ করে তাদের ইসলামি রাষ্ট্রের বশ্যতা স্বীকার করান।
৩. আরব উপদ্বীপের উত্তর সীমান্তে রোমানদের প্রভাব ক্ষুণ্ন হয় এবং সমগ্র আরবে মুসলমানদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি ও আধিপত্য সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।

٨- تحدث عن فتح مكة بالتفصيل-

[মক্কা বিজয় সম্পর্কে বিস্তারিত লেখ।]

মক্কা বিজয় (فتح مكة):
মক্কা বিজয় ইসলামি ইতিহাসের সবচেয়ে যুগান্তকারী ও রক্তপাতহীন বিজয়, যা ৮ম হিজরির ২০শে রমজান সংঘটিত হয়।

প্রেক্ষাপট: ৬ষ্ঠ হিজরিতে মুসলমানদের সাথে কুরাইশদের ‘হুদাইবিয়ার সন্ধি’ স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু এর দু’বছর পর কুরাইশদের মিত্র গোত্র বনু বকর মুসলমানদের মিত্র গোত্র বনু খুজাআর ওপর অতর্কিত আক্রমণ করে, যা ছিল সন্ধির সরাসরি লঙ্ঘন। রাসুল (সা.) কুরাইশদের তিনটি শর্ত দিয়ে এর সমাধানের প্রস্তাব দেন, কিন্তু তারা তা প্রত্যাখ্যান করে। ফলে হুদাইবিয়ার সন্ধি বাতিল হয়ে যায়।

অভিযান ও বিজয়: রাসুল (সা.) অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে ১০ হাজার সাহাবির এক বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হন এবং মক্কার অদূরে ‘মাররুজ জাহরান’ নামক স্থানে পৌঁছান। এই বিশাল বাহিনীর ক্যাম্পফায়ার (অগ্নিকুণ্ড) দেখে মক্কার নেতা আবু সুফিয়ান ভীত হয়ে পড়েন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন।
এরপর রাসুল (সা.) তাঁর বাহিনীকে চারটি ভাগে বিভক্ত করে চার দিক থেকে মক্কায় প্রবেশের নির্দেশ দেন এবং কঠোরভাবে নির্দেশ দেন যে, কেউ অস্ত্র ধারণ না করলে তার ওপর আক্রমণ করা যাবে না। খালিদ বিন ওয়ালিদের বাহিনীর অংশে সামান্য প্রতিরোধ ছাড়া মক্কার বাকি অংশে বিনাযুদ্ধে, বিনা রক্তপাতে মুসলমানরা প্রবেশ করেন। রাসুল (সা.) উটের পিঠে মাথা ঝুঁকিয়ে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে মক্কায় প্রবেশ করেন।

ক্ষমা প্রদর্শন ও কাবা ঘর পবিত্রকরণ: মক্কায় প্রবেশ করে রাসুল (সা.) কাবা ঘরে প্রবেশ করেন এবং এর ভেতরে ও বাইরে থাকা ৩৬০টি মূর্তি নিজ হাতে ভেঙে কাবাকে শিরকমুক্ত করেন। এরপর তিনি মক্কার সেইসব অত্যাচারী কুরাইশদের, যারা একসময় মুসলমানদের নির্মম নির্যাতন করেছিল, তাদের উদ্দেশ্য করে এক ঐতিহাসিক সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দিয়ে বলেন: “لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ فَاذْهَبُوا فَأَنْتُمُ الطُّلَقَاءُ” (আজ তোমাদের ওপর কোনো অভিযোগ নেই, যাও তোমরা সবাই মুক্ত ও স্বাধীন)। এই মহানুভবতা দেখে দলে দলে মক্কাবাসী ইসলাম গ্রহণ করে।

مجموعة (ب) – খ-বিভাগ [যেকোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও]

٩- تحدث عن تبليغ الدعوة بالخفية-

[গোপনে ইসলাম প্রচার সম্পর্কে আলোচনা কর।]

গোপনে ইসলাম প্রচার (تبليغ الدعوة بالخفية):
নবুওয়াত প্রাপ্তির পর মক্কার চরম বৈরী পরিবেশে মূর্তিপূজক কুরাইশদের বিরোধিতার আশঙ্কা থাকায়, রাসুল (صلى الله عليه وسلم) আল্লাহর নির্দেশে অত্যন্ত গোপনে ও সতর্কতার সাথে ইসলামের দাওয়াত প্রচার শুরু করেন। এই গোপন দাওয়াতের স্তরটি নবুওয়াতের প্রথম তিন বছর পর্যন্ত স্থায়ী ছিল।

এই পর্যায়ে রাসুল (সা.) শুধুমাত্র তাঁর পরিবারের সদস্য, নিকটাত্মীয় এবং অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের কাছে ইসলামের বাণী তুলে ধরেন। ফলে সর্বপ্রথম নারীদের মধ্যে তাঁর স্ত্রী হযরত খাদিজা (রা.), পুরুষদের মধ্যে হযরত আবু বকর (রা.), শিশুদের মধ্যে হযরত আলী (রা.) এবং দাসদের মধ্যে হযরত যায়েদ ইবনে হারিসা (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন।
আবু বকর (রা.) এর ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় উসমান গনি, যুবাইর ইবনুল আওয়াম, আবদুর রহমান ইবনে আউফ এবং সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসের মতো মক্কার অনেক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেন। এ সময় মুসলমানরা সাফা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত ‘دار الأرقم’ (দারুল আরকাম)-এ গোপনে একত্রিত হয়ে নামাজ আদায় ও কুরআনের শিক্ষা গ্রহণ করতেন। তিন বছর পর المسلمون এর সংখ্যা ৪০ জনের কাছাকাছি পৌঁছালে প্রকাশ্যে দাওয়াতের নির্দেশ আসে।

١٠- ما المراد ببيعة الرضوان ولم سميت بها؟

[بيعة الرضوان দ্বারা উদ্দেশ্য কী? بيعة الرضوان কে এ নামে কেন নামকরণ করা হলো?]

بيعة الرضوان (বাইয়াতুর রিদওয়ান) দ্বারা উদ্দেশ্য:
৬ষ্ঠ হিজরিতে রাসুল (صلى الله عليه وسلم) ১৪০০ সাহাবি নিয়ে ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কায় রওনা হন। কিন্তু কুরাইশরা হুদাইবিয়া নামক স্থানে তাঁদের বাধা দেয়। তখন রাসুল (সা.) আলোচনার জন্য হযরত উসমান (রা.)-কে দূত হিসেবে মক্কায় পাঠান। কিন্তু মক্কায় গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, কুরাইশরা উসমান (রা.)-কে শহীদ করে ফেলেছে। এই মর্মান্তিক সংবাদ শুনে রাসুল (সা.) একটি বাবলা (গাছের) নিচে বসে উপস্থিত সকল সাহাবির কাছ থেকে কুরাইশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও উসমান হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত দৃঢ় থাকার শপথ গ্রহণ করেন। এই ঐতিহাসিক শপথ বা বাইয়াতকেই بيعة الرضوان বা ‘বাইয়াতুশ শাজারাহ’ বলা হয়।

এই নামে নামকরণের কারণ (لم سميت بها):
এই শপথের নাম ‘বাইয়াতুর রিদওয়ান’ (সন্তুষ্টির বাইয়াত) রাখা হয়েছে, কারণ আল্লাহ তায়ালা এই শপথে অংশগ্রহণকারী মুমিনদের ওপর তাঁর অশেষ সন্তুষ্টির কথা পবিত্র কুরআনে সরাসরি ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ বলেন: “لَّقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ” (অবশ্যই আল্লাহ মুমিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন, যখন তারা গাছের নিচে আপনার কাছে বাইয়াত গ্রহণ করছিল) – সূরা ফাতহ: ১৮। যেহেতু আল্লাহ মুমিনদের ওপর ‘রিদওয়ান’ বা সন্তুষ্ট হয়েছেন, তাই এর নাম হয়েছে বাইয়াতুর রিদওয়ান।

١١- اكتب خلفية بناء المسجد النبوى-

[মসজিদে নববী নির্মাণের প্রেক্ষাপট লেখ।]

মসজিদে নববী নির্মাণের প্রেক্ষাপট (خلفية بناء المسجد النبوى):
রাসুল (صلى الله عليه وسلم) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করে আসার পর মদিনার প্রতিটি মুসলমান তাঁকে আতিথেয়তা প্রদান করতে ও নিজ গৃহে অবস্থান করাতে উদগ্রীব ছিলেন। তখন রাসুল (সা.) তাঁর উটনী ‘কাসওয়া’র লাগাম ছেড়ে দিয়ে বলেন, “তাকে তার নিজের ইচ্ছায় চলতে দাও, আল্লাহর পক্ষ থেকে আদিষ্ট”। উটনি চলতে চলতে আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) এর বাড়ির সামনে বনু নাজ্জার গোত্রের দুই এতিম বালক, সাহল ও সুহাইল এর মালিকানাধীন একটি পতিত জমিতে গিয়ে বসে পড়ে।
রাসুল (সা.) বুঝতে পারলেন, এখানেই মসজিদ নির্মাণ করতে হবে। তিনি এতিম বালকদের কাছ থেকে জমির ন্যায্য মূল্য পরিশোধ করে তা ক্রয় করেন। এরপর রাসুল (সা.) নিজে মাটি বহন করে এবং আনসার ও মুহাজির সাহাবিদের সম্মিলিত পরিশ্রমে কাঁচা ইট, খেজুর গাছের কাণ্ড ও পাতা দিয়ে অত্যন্ত সাদামাটাভাবে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। এটাই মসজিদে নববী। এই মসজিদটি কেবল ইবাদতের স্থানই ছিল না, বরং এটি মদিনা রাষ্ট্রের প্রথম সংসদ, বিচারালয় এবং শিক্ষাকেন্দ্র (সুফফা) হিসেবেও ব্যবহৃত হতো।

١٢- ما المراد باهل البيت؟ ومن هم؟ بين-

[اهل البيت বলতে কাদের উদ্দেশ্য করা হয়? তাঁরা কারা? বর্ণনা কর।]

أهل البيت (আহলে বাইত) এর অর্থ ও উদ্দেশ্য:
‘আহলে বাইত’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ঘরের মানুষ অথবা পরিবারবর্গ। ইসলামি পরিভাষায়, ‘আহলে বাইত’ বলতে বিশেষভাবে প্রিয়নবি হযরত محمد (صلى الله عليه وسلم) এর সম্মানিত পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও বংশধরদের বোঝায়। আল্লাহ তায়ালা তাঁদেরকে বিশেষ পবিত্রতা ও মর্যাদা দান করেছেন (সূরা আহযাব: ৩৩)।

আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিবর্গ (ومن هم):
আহলে বাইতের সুনির্দিষ্ট অন্তর্ভুক্ত কারা, এ বিষয়ে ইসলামি স্কলারদের মতামত রয়েছে, তবে সর্বসম্মতভাবে আহলে বাইত বলতে নিম্নোক্ত ব্যক্তিবর্গকে বোঝায়:
১. রাসুল (সা.) এর পবিত্র স্ত্রীগণ (উম্মাহাতুল মুমিনিন): সূরা আহযাবের আয়াতের পূর্বাপর السياق অনুযায়ী, নবিজির স্ত্রীগণ (যেমন- খাদিজা, আয়েশা, হাফসা রা. প্রমুখ) সরাসরি আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত।
২. হযরত ফাতেমা, আলী, হাসান ও হুসাইন (রা.): একটি সহিহ হাদিসে রাসুল (সা.) তাঁর চাদরের নিচে ফাতেমা, আলী, হাসান ও হুসাইনকে নিয়ে বলেছিলেন, “হে আল্লাহ! এরা আমার আহলে বাইত”। এটি আহলে বাইতের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ও সুনির্দিষ্ট পরিচয়।
৩. রাসুল (সা.) এর বংশধর ও নিষিদ্ধ সাদকা গ্রহীতাগণ: হযরত আব্বাস (রা.)، হযরত আকিল (রা.)، হযরত জাফর (রা.) এবং বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিব গোত্রের যারা ইসলামের ওপর ইমান এনেছেন, তারাও ব্যাপকভাবে আহলে বাইতের অংশ মনে করা হয়।

١٣- تحدث عن اخلاق النبى صلى الله عليه وسلم مختصرا-

[সংক্ষেপে রাসুল (সা.) এর চরিত্র সম্পর্কে আলোচনা কর।]

রাসুল (صلى الله عليه وسلم) এর চরিত্র (اخلاق النبى):
রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব এবং সমগ্র মানবজাতির জন্য উত্তম আদর্শ (উসওয়াতুন হাসানাহ)। তাঁর চরিত্রের সার্টিফিকেট স্বয়ং আল্লাহ দিয়েছেন: “وإنك لعلى خلق عظيم” (এবং নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের ওপর অধিষ্ঠিত) – [কলাম: ৪]।
হযরত আয়েশা (রা.)-কে তাঁর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেছিলেন, “তাঁর চরিত্র ছিল আল-কুরআন”। অর্থাৎ, কুরআনের সমস্ত আদেশ ও নিষেধের বাস্তব প্রতিচ্ছবি ছিলেন তিনি।
তাঁর চরিত্রের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি দিক হলো:
* সততা ও আমানতদারি: নবুওয়াতের পূর্বেও তাঁর সত্যবাদিতার কারণে চরম শত্রুরাও তাঁকে ‘আল-আমিন’ অথবা বিশ্বস্ত বলে ডাকত।
* ক্ষমা ও দয়া: তিনি ছিলেন رحمة للعالمين (সমগ্র সৃষ্টির জন্য রহমত)। মক্কাবাসীরা তাঁর ওপর সীমাহীন অত্যাচার করলেও মক্কা বিজয়ের দিন তিনি সবাইকে নিঃশর্ত ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। তায়ফের ময়দানে পাথর খেয়ে রক্তাক্ত হয়েও তিনি কারো জন্য বদদোয়া করেননি।
* নম্রতা ও ন্যায়পরায়ণতা: তিনি গরিব, অসহায় ও দাসদের সাথে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে মিশতেন। বিচারে তিনি ছিলেন চরম ন্যায়নিষ্ঠ, নিজের প্রিয় মেয়ে ফাতেমার ব্যাপারেও তিনি আইনের ক্ষেত্রে আপস করেননি।

١٤- ما معنى الجهاد وما حكمه؟ بين-

[الجهاد অর্থ কী? এর হুকুম কী? বর্ণনা কর।]

الجهاد (জিহাদ) এর অর্থ:
* আভিধানিক অর্থ: الجهاد শব্দটি জুহদ থেকে নির্গত, যার অর্থ হলো, চেষ্টা করা, সাধনা করা, কষ্ট সহ্য করা বা চরম প্রচেষ্টা ব্যয় করা।
* পারিভাষিক অর্থ: শরিয়তের পরিভাষায়, আল্লাহর দ্বীনকে সমুন্নত করার জন্য, ইসলাম ও মুসলমানদের জান-মাল ও ভূখণ্ড রক্ষার জন্য, নিজের নফস, শয়তান বা ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে জান, মাল ও ভাষার মাধ্যমে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম করাকে জিহাদ বলা হয়।

الجهاد এর হুকুম (حكمه):
ইসলামে জিহাদের হুকুম বা বিধান অবস্থা ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে প্রধানত ২ প্রকার:
১. ফরজে কেফায়া: সাধারণ অবস্থায় জিহাদ করা ফরজে কেফায়া। অর্থাৎ, মুসলমানদের মধ্য থেকে একটি দল অথবা রাষ্ট্রীয় বাহিনী যদি সীমান্ত রক্ষা ও শত্রুর মোকাবেলা এর দায়িত্ব পালন করে, তবে বাকি মুসলমানদের ওপর থেকে তা মওকুফ হয়ে যায়।
২. ফরজে আইন: তিনটি বিশেষ অবস্থায় জিহাদ প্রত্যেক সক্ষম মুসলিমের ওপর ফরজে আইন বা বাধ্যতামূলক হয়ে যায়: (ক) যখন কাফিররা মুসলিম রাষ্ট্রে আক্রমণ করে বসে। (খ) যখন মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধান যুদ্ধের জন্য সাধারণ ডাক (নফিরে আম) দেন। (গ) যখন দুই বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে মুখোমুখি হয় (তখন পিঠ প্রদর্শন করা হারাম)।
(বিঃদ্রঃ নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করা সর্বদাই প্রত্যেক মুমিনের ওপর ফরজে আইন)।

١٥- ما معنى السرية؟ وما الفرق بينها وبين الغزوة؟-

[السرية অর্থ কী? السرية ও الغزوة এর মধ্যে পার্থক্য কী?]

السرية (সারিয়্যা) এর অর্থ:
‘সারিয়্যা’ বলতে ইসলামি ইতিহাসের সেই ক্ষুদ্র সামরিক অভিযান বা গুপ্তচর বাহিনীকেই বোঝায়, যেসব অভিযানে রাসুলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) নিজে সশরীরে অংশগ্রহণ করেননি, বরং তাঁর কোনো সাহাবির নেতৃত্বে সৈন্যদের একটি ছোট দল বা বাহিনীকে প্রেরণ করেছিলেন। সীরাত বিশারদদের মতে, সারিয়্যার সংখ্যা ৪৭ থেকে ৭৩টি পর্যন্ত ছিল।

السرية ও الغزوة এর মধ্যে পার্থক্য (الفرق بينهما):
উভয়টিই ইসলামের প্রাথমিক যুগের সামরিক অভিযান, তবে এদের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান:
১. উপস্থিতি: গাযওয়া (الغزوة) হলো সেই যুদ্ধ, যেখানে রাসুল (সা.) নিজে সশরীরে উপস্থিত থেকে সেনাপতিত্ব করেছেন। অন্যদিকে, সারিয়্যা (السرية) হলো সেই অভিযান, যেখানে রাসুল (সা.) নিজে উপস্থিত থাকেননি, বরং কোনো সাহাবিকে সেনাপতি করে পাঠিয়েছেন।
২. সৈন্যসংখ্যা: গাযওয়ায় সৈন্যসংখ্যা সাধারণত অনেক বেশি থাকতো এবং তা ছিল বড় ধরনের যুদ্ধ। আর সারিয়্যায় সৈন্যসংখ্যা সাধারণত কম হতো (৫ জন থেকে ৪০০ জনের মতো)، এবং এগুলো মূলত টহল অথবা গোয়েন্দা নজরদারির জন্য পাঠানো হতো।
৩. সংখ্যা: গাযওয়ার সংখ্যা ছিল নির্দিষ্ট (২৭টি)। কিন্তু সারিয়্যার সংখ্যা গাযওয়ার তুলনায় অনেক বেশি ছিল।

١٦- اكتب خطبة حجة الوداع مختصرا-

[সংক্ষেপে বিদায় হজের ভাষণ লেখ।]

বিদায় হজের ভাষণ (خطبة حجة الوداع):
১০ম হিজরির ৯ই জিলহজ আরাফাতের ময়দানে জাবালে রহমতের পাদদেশে লক্ষাধিক সাহাবির উদ্দেশ্যে রাসুল (صلى الله عليه وسلم) তাঁর জীবনের সর্বশেষ যে ঐতিহাসিক ও দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ প্রদান করেন, তাকে বিদায় হজের ভাষণ বলা হয়। এটাই হলো মানবাধিকারের সর্বশ্রেষ্ঠ ও প্রথম সনদ। এর উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো:
১. জান-মালের নিরাপত্তা: আজকের এই পবিত্র দিন ও পবিত্র মাসের মতো তোমাদের জীবন, রক্ত ও সম্পদ একে অপরের জন্য চিরস্থায়ীভাবে পবিত্র ও হারাম।
২. জাহেলী কুসংস্কার বাতিল: আজ থেকে জাহেলিয়াতের যাবতীয় কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ও রক্তের দাবি আমার পায়ের নিচে পিষ্ট হলো।
৩. নারীর অধিকার: নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। তাদের ওপর তোমাদের যেমন অধিকার আছে, তোমাদের ওপরও তাদের অধিকার আছে। তাদের প্রতি সদয় আচরণ করবে।
৪. সুদ প্রথা বাতিল: জাহেলিয়াতের যুগের সমস্ত সুদ বাতিল করা হলো। আমি সর্বপ্রথম আমার চাচা আব্বাস বিন عبد মুত্তালিবের সুদ বাতিল করলাম।
৫. সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব: সকল مسلمان ভাই ভাই। অনারবের ওপর আরবের অথবা কালোর ওপর সাদার কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই, শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হলো ‘তাকওয়া’ (আল্লাহভীতি)।
৬. কুরআন ও সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা: আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসুলের সুন্নাহ। এ দুটি যতদিন আঁকড়ে ধরবে, ততদিন তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না।
পরিশেষে তিনি বলেন, “আমি কি আমার দ্বায়িত্ব পৌঁছে দিয়েছি?” সাহাবিরা সমস্বরে বললেন, “হ্যাঁ”। তখন তিনি আসমানের দিকে আঙুল তুলে বলেন, “হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থেকো”।

Follow Our Facebook Page
দ্রুত নতুন বই পেতে যুক্ত থাকুন
Follow Now