At-Tafsirul Mu’asir (Code: 201202) – ২০২০ প্রশ্ন ও উত্তর
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২০ এর আল-কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের التفسير المعاصر (আত-তাফসীরুল মু’আসীর) বিষয়ের সম্পূর্ণ উত্তরমালা।
বিঃদ্রঃ পরীক্ষার্থীদের সুবিধার্থে মূল প্রশ্নপত্রের আরবি প্রশ্নসহ ক-বিভাগ এবং খ-বিভাগের সবগুলো প্রশ্নের ১০০% নির্ভুল উত্তর দেওয়া হলো।
مجموعة ( أ ) [ক-বিভাগ]
أجب عن خمسة من الأسئلة [যে কোনো পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দাও]
[আয়াতে কারীমা এর অনুবাদ কর এবং সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দাও]
আয়াতসমূহের অনুবাদ:
“আর যখনই তাদের কাছে তাদের রবের নিদর্শনসমূহ থেকে কোনো নিদর্শন আসে, তখনই তারা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। বস্তুত যখন তাদের কাছে সত্য (কুরআন) এল, তখন তারা তা অস্বীকার করল। সুতরাং অচিরেই তাদের কাছে ওই বিষয়ের সংবাদ এসে পড়বে, যা নিয়ে তারা উপহাস করত।” (সূরা আল-আনআম: ৪-৫)
[ক. اية এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ কী? বর্ণনা কর।]
آية (আয়াত) এর অর্থ:
আভিধানিক অর্থ: আয়াত শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো নিদর্শন, চিহ্ন, মুজিযা, বা শিক্ষা।
পারিভাষিক অর্থ: শরিয়তের পরিভাষায়, পবিত্র কুরআনের একটি পূর্ণাঙ্গ ও অর্থবোধক বাক্য বা বাক্যাংশ, যা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী অংশ থেকে একটি সুনির্দিষ্ট চিহ্ন দ্বারা পৃথক করা থাকে, তাকে আয়াত বলা হয়। এটি আল্লাহ তাআলার অসীম কুদরতের একেকটি নিদর্শন।
[খ. استهزاء অর্থ কী? কাফেররা কীভাবে استهزاء করত?]
الاستهزاء (ইস্তিহযা) এর অর্থ:
ইস্তিহযা শব্দের অর্থ হলো উপহাস করা, ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা বা কোনো কিছুকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা।
কাফেররা কীভাবে ইস্তিহযা করত:
মক্কার কাফেররা রাসূলুল্লাহ (সা.), পবিত্র কুরআন এবং ইসলামের শিক্ষাকে নিয়ে চরমভাবে উপহাস করত। যখন রাসূল (সা.) তাদেরকে আখেরাত এবং জাহান্নামের আজাবের ভয় দেখাতেন, তখন তারা অহংকারবশত বলত, “যদি আজাব সত্যই হয়ে থাকে, তবে তা এখনই আমাদের ওপর নাজিল করছ না কেন?” তারা কুরআনের আয়াতকে জাদুকরের কথা বা প্রাচীন উপকথা বলে উড়িয়ে দিত এবং নবীর শিক্ষাকে তুচ্ছজ্ঞান করে হাসি-ঠাট্টা করত।
[আয়াতে কারীমা এর অনুবাদ কর এবং সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দাও]
আয়াতসমূহের অনুবাদ:
“আর তারা বলে, ‘তার (নবীর) কাছে কোনো ফেরেশতা কেন নাজিল করা হলো না?’ যদি আমি ফেরেশতা নাজিল করতাম, তবে তো চূড়ান্ত ফয়সালাই হয়ে যেত; এরপর তাদেরকে কোনো অবকাশ দেওয়া হতো না। আর যদি আমি তাকে (নবীকে) ফেরেশতা বানাতাম, তবে তাকে মানুষের রূপেই বানাতাম এবং তারা যে সন্দেহ ও গোলমাল করছে, আমি তাকে সেই সন্দেহের মধ্যেই ফেলে দিতাম।” (সূরা আল-আনআম: ৮-৯)
[ক. وللبسنا عليهم ما يلبسون এর মর্মার্থ বর্ণনা কর।]
وللبسنا عليهم ما يلبسون এর মর্মার্থ:
এর অর্থ হলো “তারা যে সন্দেহ করছে, আমি তাকে সেই সন্দেহের মধ্যেই ফেলে দিতাম।”
মক্কার কাফেররা দাবি করত যে, আমাদের কাছে মানুষের পরিবর্তে কোনো ফেরেশতা কেন নবী হিসেবে এল না। এর উত্তরে আল্লাহ তাআলা জানাচ্ছেন যে, যদি সত্যিই মানুষের হিদায়াতের জন্য কোনো ফেরেশতা পাঠানো হতো, তবে তাকে মানুষের রূপ ধরেই আসতে হতো, কারণ মানুষ তার স্বরূপে কোনো ফেরেশতাকে দেখে সহ্য করতে পারত না। আর যখন ফেরেশতা মানুষের রূপ ধরে আসত, তখন কাফেররা আবারও সন্দেহে পতিত হতো এবং বলত, “এ তো আমাদের মতোই একজন সাধারণ মানুষ।” ফলে তারা যে সন্দেহ ও গোলমাল সৃষ্টি করত, সেই গোলমালের মধ্যেই তারা আবার আটকে যেত।
[খ. নিম্নের শব্দাবলির তাহকীক কর : لقضى – لا ينظرون – لجعلنا – للبسنا]
শব্দাবলির তাহকীক:
- لَقُضِيَ (লাকুযিয়া): সীগাহ: ওয়াহেদ মুযাক্কার গায়েব। বাহস: ইছবাত ফি’লে মাজি মুতলাক মাজহুল। বাবে: যরাবা (يضرب – ضرب)। মাদ্দাহ: ق – ض – ى। জিনস: নাকেস ইয়ায়ি। অর্থ: ফয়সালা করা হতো। (শুরুতে লাম-তাকিদ যুক্ত)।
- لَا يُنْظَرُوْنَ (লা-ইউনযারুন): সীগাহ: জমা মুযাক্কার গায়েব। বাহস: নাফি ফি’লে মুযারে মাজহুল। বাবে: ইফ’আল (إفعال)। মাদ্দাহ: ن – ظ – ر। জিনস: সহিহ। অর্থ: তাদেরকে অবকাশ দেওয়া হতো না।
- لَجَعَلْنَا (লা-জা’আলনা): সীগাহ: জমা মুতাকাল্লিম। বাহস: ইছবাত ফি’লে মাজি মুতলাক মারুফ। বাবে: ফাতাহা (يفتح – فتح)। মাদ্দাহ: ج – ع – ل। জিনস: সহিহ। অর্থ: অবশ্যই আমি বানাতাম। (শুরুতে লাম-তাকিদ যুক্ত)।
- لَلَبَسْنَا (লা-লাবাসনা): সীগাহ: জমা মুতাকাল্লিম। বাহস: ইছবাত ফি’লে মাজি মুতলাক মারুফ। বাবে: যরাবা (يضرب – ضرب)। মাদ্দাহ: ل – ب – س। জিনস: সহিহ। অর্থ: অবশ্যই আমি গোলমালে/সন্দেহে ফেলে দিতাম। (শুরুতে লাম-তাকিদ যুক্ত)।
[আয়াতে কারীমা এর অনুবাদ কর এবং সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দাও]
আয়াতসমূহের অনুবাদ:
“আর কত জনপদ আমি ধ্বংস করেছি! রাতে অথবা দুপুরে বিশ্রামের সময় তাদের কাছে আমার আজাব এসে পৌঁছেছিল। অতঃপর তাদের কাছে যখন আমার আজাব এসে পৌঁছাল, তখন তাদের আর্তনাদ এ ছাড়া আর কিছুই ছিল না যে, ‘নিশ্চয় আমরা জালেম ছিলাম’।” (সূরা আল-আ’রাফ: ৪-৫)
[ক. আয়াতের সংশ্লিষ্ট ঘটনা বর্ণনা কর।]
সংশ্লিষ্ট ঘটনা:
এই আয়াতে পূর্ববর্তী অবাধ্য জাতিসমূহের করুন পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। হযরত নূহ, হুদ, লুত এবং শুআইব (আ.) এর সম্প্রদায় চরম সীমালঙ্ঘন ও নবীদের অস্বীকার করেছিল। তারা দুনিয়ার ভোগ-বিলাসে মত্ত ছিল। এমন সময় সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে তাদের ওপর আল্লাহর গজব নাজিল হয়। যেমন, কওমে লুতের ওপর আজাব এসেছিল রাতের গভীর অন্ধকারে, যখন তারা ঘুমে বিভোর ছিল। আবার কওমে শুআইবের ওপর আজাব এসেছিল দুপুরে বিশ্রামের সময় (ক্বাইলুলাহ)। আজাব আসার পর তারা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে আর্তনাদ করেছিল, কিন্তু তখন আর তওবা করার সময় ছিল না। মক্কার কুরাইশদের এই ঘটনা স্মরণ করিয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
[খ. هم قائلون এর তারকীবে কী হয়েছে? বর্ণনা কর।]
هم قائلون এর তারকীব (ব্যাকরণগত বিশ্লেষণ):
هم (হুম): এটি যমীরে মুনফাসিল (সর্বনাম)। এটি রফআ’ (رفع) এর স্থানে অবস্থিত এবং বাক্যের ‘মুবতাদা’ (مبتدأ) হয়েছে।
قائلون (ক্বাইলূন): এটি ইসমে ফায়েল এর সীগাহ, বহুবচন। এটি মুবতাদার ‘খবর’ (خبر)। ওয়াও (و) দ্বারা এর রফআ’ হয়েছে।
মুবতাদা ও খবর মিলে ‘জুমলাহ ইসমিয়্যাহ’ (جملة اسمية) গঠিত হয়েছে। এই পুরো বাক্যটি পূর্ববর্তী শব্দ بَيَاتًا (যাহা হাল বা অবস্থা নির্দেশক) এর ওপর ‘মা’তুফ’ বা আত্বফ (معطوف) হয়েছে। অর্থাৎ আজাব আসার দুটি অবস্থার কথা বলা হয়েছে—এক. গভীর রাতে, অথবা দুই. দুপুরে বিশ্রামের সময় (ক্বাইলুলাহ)।
[আয়াতে কারীমা এর অনুবাদ কর এবং সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দাও]
আয়াতসমূহের অনুবাদ:
“প্রকৃত মুমিন তো তারাই, যাদের সামনে আল্লাহর স্মরণ করা হলে তাদের অন্তর কেঁপে ওঠে এবং যখন তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করা হয়, তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে এবং তারা কেবল তাদের রবের ওপরই ভরসা করে। যারা সালাত কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যে রিজিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে।” (সূরা আল-আনফাল: ২-৩)
[ক. القراءة خلف الامام সম্পর্কে মতভেদ বর্ণনা কর।]
القراءة خلف الامام (ইমামের পেছনে ক্বিরাআত পড়া) সম্পর্কে মতভেদ:
নামাজে ইমামের পেছনে মুক্তাদি সূরা ফাতিহা বা অন্য ক্বিরাআত পড়বে কি না, এ বিষয়ে ইমামদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে:
১. ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মত: ইমামের পেছনে মুক্তাদির জন্য ক্বিরাআত পড়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, নামাজ সশব্দে হোক বা নিঃশব্দে। কারণ, কুরআনে বলা হয়েছে, “যখন কুরআন পড়া হয়, তখন তোমরা চুপ থেকে তা মনোযোগ দিয়ে শোনো।” ইমামের ক্বিরাআতই মুক্তাদির ক্বিরাআত হিসেবে গণ্য হবে।
২. ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর মত: সশব্দে ও নিঃশব্দে সকল নামাজেই ইমামের পেছনে মুক্তাদির জন্য সূরা ফাতিহা পড়া ফরজ।
৩. ইমাম মালেক ও আহমাদ (রহ.)-এর মত: যে নামাজে ইমাম সশব্দে ক্বিরাআত পড়েন, সেখানে মুক্তাদি চুপ করে শুনবে। আর যে নামাজে ইমাম নিঃশব্দে ক্বিরাআত পড়েন (যোহর, আসর), সেখানে মুক্তাদি সূরা ফাতিহা পড়বে।
[খ. ومما رزقنا هم ينفقون এর মর্মার্থ বর্ণনা কর।]
ومما رزقنا هم ينفقون এর মর্মার্থ:
এর অর্থ হলো, “এবং আমি তাদেরকে যে রিজিক দিয়েছি, তা থেকে তারা ব্যয় করে।”
মর্মার্থ হলো, প্রকৃত মুমিনরা তাদের সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখে না। তারা বিশ্বাস করে যে, তাদের ধন-সম্পদ, মেধা, সময়—সবকিছুই আল্লাহর দেওয়া রিজিক। তাই তারা আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী এই সম্পদ তাঁরই রাস্তায় ব্যয় করে। এর মধ্যে বাধ্যতামূলক ব্যয় যেমন- জাকাত, ফিতরা, পরিবারের ভরণপোষণ অন্তর্ভুক্ত, তেমনি নফল দান-সাদাকাহ এবং জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করাও অন্তর্ভুক্ত।
[আয়াতে কারীমা এর অনুবাদ কর এবং সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দাও]
আয়াতসমূহের অনুবাদ:
“স্মরণ কর, যখন তিনি (আল্লাহ) তাঁর পক্ষ থেকে প্রশান্তিস্বরূপ তোমাদের ওপর তন্দ্রা আচ্ছন্ন করে দেন এবং আকাশ থেকে তোমাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষণ করেন, যেন তা দিয়ে তোমাদের পবিত্র করতে পারেন এবং তোমাদের থেকে শয়তানের কুমন্ত্রণা দূর করতে পারেন, আর তোমাদের অন্তরসমূহকে দৃঢ় করতে এবং এর মাধ্যমে তোমাদের পা স্থির রাখতে পারেন।” (সূরা আল-আনফাল: ১১)
[ক. আয়াতের সংশ্লিষ্ট ঘটনা বর্ণনা কর।]
সংশ্লিষ্ট ঘটনা:
এই আয়াতটি বদর যুদ্ধের একটি বিশেষ ঘটনাকে কেন্দ্র করে অবতীর্ণ হয়েছে। বদরের প্রান্তরে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩১৩ জন, অন্যদিকে কাফেরদের সংখ্যা ছিল এক হাজারেরও বেশি। মুসলমানদের অবস্থান ছিল বালুকাময় শুষ্ক এলাকায়, যেখানে হাঁটা কষ্টকর ছিল এবং পানির অভাবে অনেকেই অপবিত্র অবস্থায় ছিলেন। শয়তান মুসলমানদের মনে ভয় ও কুমন্ত্রণা দিতে শুরু করল। এমন সংকটময় মুহূর্তে আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের ওপর এক শান্তির তন্দ্রা (হালকা ঘুম) চাপিয়ে দিলেন, যাতে তাদের ক্লান্তি দূর হয়ে গেল। এরপর আল্লাহ রহমতের বৃষ্টি নাজিল করলেন। এই বৃষ্টির পানিতে মুসলমানরা পবিত্র হলেন এবং বালুকাময় মাটি শক্ত হয়ে গেল, ফলে তাদের পা স্থির রাখা সহজ হলো। অন্যদিকে কাফেরদের অংশে কাদা সৃষ্টি হওয়ায় তাদের হাঁটাচলা কঠিন হয়ে গেল।
[খ. نوم ও سنة, نعاس এর মাঝে কী পার্থক্য? বর্ণনা কর।]
النعاس (নুআ’স), السنة (সিন্নাহ) এবং النوم (নাউম)-এর মধ্যে পার্থক্য:
১. النعاس (তন্দ্রা): এটি হলো ঘুমের একদম প্রাথমিক স্তর। এ অবস্থায় চোখ ভারী হয়ে আসে, কিন্তু জ্ঞান সম্পূর্ণ লোপ পায় না; চারপাশের কিছু কিছু আওয়াজ শোনা যায়। বদর যুদ্ধে মুসলমানদের এই النعاس হয়েছিল।
২. السنة (ঝিমুনি/অর্ধনিদ্রা): এটি النعاس এবং النوم এর মাঝামাঝি অবস্থা। এ সময় তন্দ্রা আরও ভারী হয় এবং মাথা ঢুলতে থাকে।
৩. النوم (গভীর ঘুম): এটি হলো ঘুমের চূড়ান্ত অবস্থা। এ অবস্থায় মানুষের জ্ঞান বা চেতনা বাহ্যিক জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং সে গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়।
[আয়াতে কারীমা এর অনুবাদ কর এবং সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দাও]
আয়াতসমূহের অনুবাদ:
“নিশ্চয় তারাই তো আল্লাহর মসজিদসমূহ আবাদ করবে, যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান আনে, সালাত কায়েম করে, জাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করে না। অতএব আশা করা যায়, তারাই হবে হিদায়াতপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত।” (সূরা আত-তাওবাহ: ১৮)
[ক. إقامة الصلوة ও اداء الصلوة এর মাঝে পার্থক্য বর্ণনা কর।]
পার্থক্য:
اداء الصلوة (নামাজ আদায় করা): এর অর্থ হলো কেবল বাহ্যিকভাবে নামাজের রোকন বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো পালন করে নামাজ পড়া। এতে পূর্ণ মনোযোগ (খুশু-খুযু) নাও থাকতে পারে।
إقامة الصلوة (নামাজ কায়েম করা): এটি অনেক গভীর ও ব্যাপক। এর অর্থ হলো নামাজের সকল শর্ত, ওয়াজিব ও সুন্নাতগুলো নিখুঁতভাবে পালন করে, পূর্ণ একাগ্রতা (খুশু-খুযু) ও বিনয়ের সাথে, সঠিক সময়ে এবং জামাআতের সাথে নামাজ প্রতিষ্ঠা করা। কুরআনে শুধু আদায় করা নয়, বরং নামাজ কায়েম করার (ইকামত) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
[খ. ইসলামি সমাজে মসজিদের গুরুত্ব বর্ণনা কর।]
ইসলামি সমাজে মসজিদের গুরুত্ব:
মসজিদ হলো ইসলামি সমাজ ও সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু বা হার্ট। রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরত করার পর প্রথমেই মসজিদে নববী নির্মাণ করেছিলেন। এর গুরুত্ব অপরিসীম:
১. ইবাদতের স্থান: এটি আল্লাহর ঘর এবং মুমিনদের দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত ও জুমার নামাজ জামাআতের সাথে আদায় করার স্থান, যা মুসলিম ঐক্যের প্রতীক।
২. শিক্ষাকেন্দ্র: মসজিদ হলো ইসলামি শিক্ষার প্রধান পাঠশালা (মাদরাসা)। সাহাবায়ে কেরাম মসজিদে নববীতে (সুফফা) বসেই রাসূল (সা.)-এর কাছ থেকে দীনের জ্ঞান অর্জন করতেন।
৩. সামাজিক বন্ধন: মসজিদে ধনী-গরিব, সাদা-কালো ভেদাভেদ ভুলে একই কাতারে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাজ আদায় করে। এতে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় হয়।
৪. প্রশাসনিক কেন্দ্র: রাসূল (সা.) ও খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগে মসজিদ থেকেই রাষ্ট্র পরিচালনা, বিচারকার্য সম্পাদন এবং জিহাদের রণনীতি গ্রহণ করা হতো।
[আয়াতে কারীমা এর অনুবাদ কর এবং সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দাও]
আয়াতসমূহের অনুবাদ:
“নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তাদের রব তাদের ঈমানের কারণে তাদেরকে পথ দেখাবেন; নিআমতপূর্ণ জান্নাতসমূহে তাদের নিচ দিয়ে ঝরনাধারা প্রবাহিত হবে। সেখানে তাদের ধ্বনি হবে ‘সুবহানাকাল্লাহুম্মা’ (হে আল্লাহ, আপনি পবিত্র), সেখানে তাদের অভিবাদন হবে ‘সালাম’ (শান্তি), আর তাদের শেষ ধ্বনি হবে ‘আল-হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন’ (যাবতীয় প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য)।” (সূরা ইউনুস: ৯-১০)
[ক. জান্নাতের অর্থ কী? উহা কয়টি ও কী কী বর্ণনা কর।]
الجنة (জান্নাত) এর অর্থ:
জান্নাত শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো এমন বাগান যা ঘন গাছে আচ্ছাদিত বা ঢাকা থাকে। শরিয়তের পরিভাষায়, আল্লাহ তাআলা তাঁর অনুগত মুমিন বান্দাদের জন্য পরকালে যে চিরস্থায়ী সুখ-শান্তি ও নিয়ামতে ভরপুর বাসস্থান তৈরি করে রেখেছেন, তাকে জান্নাত বলে।
জান্নাতের সংখ্যা ও নাম:
কুরআন ও হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী জান্নাত মূলত ৮টি। এগুলো হলো:
১. জান্নাতুল ফিরদাউস (সবচেয়ে উত্তম জান্নাত)
২. জান্নাতুল আদন
৩. জান্নাতুন নাঈম
৪. জান্নাতুল মা’ওয়া
৫. দারুল খুলদ
৬. দারুস সালাম
৭. দারুল জালাল
৮. দারুল কারার।
[খ. اخر دعواهم ان الحمد لله رب العالمين এর ব্যাখ্যা কর।]
ব্যাখ্যা:
এর অর্থ হলো, “তাদের সর্বশেষ ধ্বনি হবে—যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি বিশ্বজগতের পালনকর্তা।”
জান্নাতিরা যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং আল্লাহর অগণিত ও কল্পনাতীত নিয়ামত ভোগ করবে, তখন তাদের হৃদয় আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠবে। জান্নাতে কোনো নামাজ, রোজা বা কষ্টকর ইবাদত থাকবে না। কিন্তু জান্নাতিরা পরম তৃপ্তি, প্রশান্তি ও ভালোবাসার কারণে আপন মনেই আল্লাহ তাআলার প্রশংসায় মশগুল থাকবে। আল্লাহর প্রশংসা করা তখন তাদের জন্য কোনো দায়িত্ব বা বোঝা হবে না, বরং এটাই হবে তাদের সবচেয়ে বড় আনন্দ ও বিনোদন।
[আয়াতে কারীমা এর অনুবাদ কর এবং সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দাও]
আয়াতসমূহের অনুবাদ:
“আর তারা বলে, ‘তার রবের পক্ষ থেকে তার কাছে কোনো নিদর্শন (মুজিযা) কেন অবতীর্ণ করা হলো না?’ সুতরাং আপনি বলুন, ‘গাইব (অদৃশ্য) তো কেবল আল্লাহরই জন্য। অতএব তোমরা অপেক্ষা কর; নিশ্চয় আমিও তোমাদের সাথে অপেক্ষমাণদের অন্তর্ভুক্ত’।” (সূরা ইউনুস: ২০)
[ক. আয়াত সংশ্লিষ্ট ঘটনা বর্ণনা কর।]
সংশ্লিষ্ট ঘটনা:
মক্কার মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নবুওয়াতকে অস্বীকার করত এবং তারা বাহানাস্বরূপ বিভিন্ন জাগতিক ও দৃশ্যমান মুজিযা বা নিদর্শন দাবি করত। তারা বলত, “সাফা পাহাড়কে সোনায় পরিণত করে দেখাও” অথবা “মৃতকে জীবিত করে দেখাও।” যদিও পবিত্র কুরআন নিজেই সবচেয়ে বড় মুজিযা ছিল, কিন্তু তারা তা মানতে নারাজ ছিল। আল্লাহ তাআলা রাসূল (সা.)-কে নির্দেশ দিলেন যে, আপনি তাদের জানিয়ে দিন—মুজিযা নাজিল করা বা না করার বিষয়টি সম্পূর্ণ ‘গাইব’ বা অদৃশ্যের অন্তর্ভুক্ত এবং এর পূর্ণ নিয়ন্ত্রক একমাত্র আল্লাহ। নবীর কাজ শুধু সতর্ক করা। সুতরাং আল্লাহ কখন আজাব বা মুজিযা পাঠাবেন, তার জন্য তোমরাও অপেক্ষা কর, আমিও অপেক্ষা করছি।
[খ. غيب এর অর্থ কী? আল্লাহ ছাড়া অন্য কেহ غيب জানে কি না বর্ণনা কর।]
الغيب (গাইব) এর অর্থ:
গাইব শব্দের অর্থ হলো অদৃশ্য, যা মানুষের পঞ্চইন্দ্রিয় (চোখ, কান ইত্যাদি) এবং জ্ঞান বা বুদ্ধির সম্পূর্ণ অগোচরে থাকে। যেমন- কিয়ামত কবে হবে, মাতৃগর্ভের সন্তানের পরিণতি কী, কিংবা কাল কী ঘটবে ইত্যাদি।
আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ গাইব জানে কি না:
পরিপূর্ণ ও স্বাধীনভাবে গাইবের জ্ঞান একমাত্র মহান আল্লাহ তাআলা ছাড়া আর কেউ জানে না; কোনো নবী, রাসূল বা ফেরেশতাও নয়। তবে আল্লাহ তাআলা তাঁর মনোনীত রাসূলদেরকে ওহির (প্রত্যাদেশ) মাধ্যমে গাইবের কিছু সংবাদ বা জ্ঞান জানিয়ে দেন। নবীরা ততটুকুই গাইব সম্পর্কে জানতে পারেন, যতটুকু আল্লাহ তাঁদেরকে জানান। সুতরাং নিজস্ব শক্তিতে বা স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও পক্ষে গাইব জানা অসম্ভব।
مجموعة ( ب ) [খ-বিভাগ]
[যে কোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও]
[ ৯। মুহাম্মদ আলী আস-সাবুনিীর জীবনী ও তার صفوة التفاسير এর বৈশিষ্ট্যসমূহ লেখ। ]
মুহাম্মদ আলী আস-সাবুনীর সংক্ষিপ্ত জীবনী:
আল্লামা মুহাম্মদ আলী আস-সাবুনী (رحمه الله) ছিলেন আধুনিক যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সিরিয়ান মুফাসসির ও ইসলামি চিন্তাবিদ। তিনি ১৯৩০ সালে সিরিয়ার ঐতিহাসিক ‘আলেপ্পো’ (হালাব) শহরে এক সম্ভ্রান্ত আলেম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় পিতার কাছে। এরপর তিনি মিসরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি দীর্ঘকাল মক্কার উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন এবং বহু মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেন, যার মধ্যে “সাফওয়াতুত তাফাসির” এবং “মুখতাসার তাফসির ইবনে কাসির” সর্বাধিক জনপ্রিয়। তিনি ২০২১ সালে ইন্তেকাল করেন।
صفوة التفاسير (সাফওয়াতুত তাফাসির) এর বৈশিষ্ট্যসমূহ:
‘সাফওয়াতুত তাফাসির’ শব্দের অর্থ হলো ‘তাফসিরগুলোর নির্যাস বা সেরা অংশ’। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
১. নির্যাস উপস্থাপন: এটি প্রাচীন ও বিখ্যাত তাফসির গ্রন্থগুলোর (যেমন- তাবারী, কুরতুবী, ইবনে কাসির, আল-কাশশাফ ও রুহুল মাআনী) একটি চমৎকার সারসংক্ষেপ বা নির্যাস।
২. সহজ ভাষা: তাফসিরটি অত্যন্ত সাবলীল, প্রাঞ্জল ও সহজ আধুনিক আরবি ভাষায় রচিত, যা সাধারণ শিক্ষিত মানুষের জন্যও বোঝা খুব সহজ।
৩. শব্দার্থ বিশ্লেষণ: আয়াতের তাফসির শুরু করার আগেই কঠিন ও অপরিচিত শব্দগুলোর (لغة) অর্থ এবং ভাষাগত বিশ্লেষণ দেওয়া হয়েছে।
৪. শানে নুযুল ও যোগসূত্র: আয়াতের শানে নুযুল (অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট) এবং পূর্ববর্তী আয়াতের সাথে যোগসূত্র (মুনাসাবাত) খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
৫. বালালাহ ও হিদায়াত: আয়াতে ব্যবহৃত অলংকার শাস্ত্র (ইলমুল বালালাহ) এবং আয়াত থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা বা হিদায়াত আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
[ ১০। আধুনিক তাফসির এবং প্রাচীন তাফসিরের বৈশিষ্ট্যসমূহ বর্ণনা কর। ]
প্রাচীন তাফসির (التفسير القديم)-এর বৈশিষ্ট্যসমূহ:
প্রাথমিক যুগ থেকে শুরু করে মধ্যযুগ পর্যন্ত রচিত তাফসিরগুলোকে প্রাচীন তাফসির বলা হয়। এর বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
১. সনদ নির্ভরতা: প্রাচীন তাফসিরগুলো মূলত ‘সনদ’ (বর্ণনাকারীদের ধারাবাহিক সূত্র) নির্ভর ছিল। রাসূল (সা.) এবং সাহাবাদের উক্তিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হতো। (যেমন- তাফসিরুত তাবারী)।
২. বিস্তারিত ব্যাকরণ: আরবি ব্যাকরণ (নাহু-সরফ) এবং শব্দের ই’রাব নিয়ে অত্যন্ত দীর্ঘ ও জটিল আলোচনা করা হতো।
৩. ফিকহি বিতর্ক: বিভিন্ন মাজহাবের ফিকহি ও আকিদাগত মতভেদগুলোর খুব সূক্ষ্ম ও বিস্তারিত আলোচনা করা হতো, ফলে তাফসিরগুলো হতো বিশাল খণ্ডের।
৪. ভাষা: এগুলোর ভাষা অত্যন্ত উচ্চাঙ্গের ও শাস্ত্রীয় ছিল, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা কঠিন।
আধুনিক তাফসির (التفسير الجديد)-এর বৈশিষ্ট্যসমূহ:
বর্তমান যুগে রচিত তাফসিরগুলোকে আধুনিক তাফসির বলা হয়। এর বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
১. সারসংক্ষেপ ও সহজবোধ্যতা: দীর্ঘ সনদ ও মতভেদ এড়িয়ে গিয়ে আয়াতের মূল নির্যাস ও শিক্ষণীয় বিষয়গুলোকে সহজ ও সাবলীল ভাষায় উপস্থাপন করা হয়। (যেমন- সাফওয়াতুত তাফাসির)।
২. বিজ্ঞান ও আধুনিক সমস্যা: আধুনিক বিজ্ঞানের নতুন আবিষ্কারের সাথে কুরআনের আয়াতের সমন্বয় করা হয় এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান কুরআন থেকে খোঁজা হয়।
৩. দাওয়াতি দৃষ্টিভঙ্গি: আধুনিক তাফসিরের মূল উদ্দেশ্য থাকে সাধারণ মানুষের অন্তরে ঈমান জাগ্রত করা এবং তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া।
৪. সংক্ষিপ্ততা: অপ্রয়োজনীয় লম্বা আলোচনা বাদ দিয়ে তাফসিরগুলোকে তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত ও পাঠকের জন্য আকর্ষণীয় করা হয়েছে।






