দাখিল পরীক্ষা, ২০২৬
আকাইদ ও ফিকহ
[নিয়মিত]
বিষয় কোড: ১৩৩ | সময়—৩ ঘণ্টা | পূর্ণমান—১০০
ক বিভাগ—বহুনির্বাচনি অভীক্ষা (মান—১x৪০=৪০)
১। সঠিক উত্তরটি খাতায় লিখ :
রচনামূলক ব্যাখ্যা: ‘ইসলাম’ শব্দটি আরবি ‘সিলমুন’ বা ‘সালামুন’ মূলধাতু থেকে এসেছে। আভিধানিক অর্থে এর মানে হলো আত্মসমর্পণ করা, আনুগত্য করা ও শান্তিতে প্রবেশ করা। ইসলামি পরিভাষায়, মহান আল্লাহ তায়ালার যাবতীয় আদেশ-নিষেধ বিনা দ্বিধায় মেনে নিয়ে তাঁর নিকট পূর্ণ আত্মসমর্পণ করাকেই ইসলাম বলে।
রচনামূলক ব্যাখ্যা: পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নিসা এর ১৪৫ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, “নিশ্চয়ই মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে অবস্থান করবে।” কারণ তারা বাইরে ইসলাম প্রকাশ করলেও অন্তরে কুফরি লুকিয়ে রাখে, যা প্রকাশ্য শত্রুর চেয়েও ইসলামের জন্য বেশি ক্ষতিকর।
রচনামূলক ব্যাখ্যা: ‘ঈমান’ শব্দটি আরবি ‘আমনুন’ বা ‘আমানাতুন’ মূলধাতু থেকে উৎপন্ন। এর মূল অক্ষর বা মাদা হলো أ – م – ن (হামজা, মিম, নুন)। আভিধানিক অর্থে এর মানে হলো স্বীকৃতি দেওয়া, বিশ্বাস স্থাপন করা বা নিরাপত্তা দেওয়া।
রচনামূলক ব্যাখ্যা: ইসলামি পরিভাষায় ‘তাযকিয়া’ বা ‘তাযকিয়াতুন নাফস’ বলতে আত্মার বা হৃদয়ের পবিত্রতাকে বোঝায়। হিংসা, অহংকার, রিয়া (লৌকিকতা) ইত্যাদি আধ্যাত্মিক ব্যাধি থেকে নিজের অন্তরকে মুক্ত করে আল্লাহর প্রেমে হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করার নামই তাযকিয়া।
রচনামূলক ব্যাখ্যা: তাওহীদের মূল দাবি হলো একমাত্র আল্লাহ তায়ালাকেই সকল ইবাদতের যোগ্য বলে বিশ্বাস করা। সূরা আল-ফাতিহাতে আমরা পড়ি “ইয়্যাকা নাবুদু” অর্থাৎ “আমরা একমাত্র আপনারই ইবাদত করি।” ইবাদতে অন্য কাউকে শরিক করা শিরক।
রচনামূলক ব্যাখ্যা: পবিত্র কুরআনের আয়াতুল কুরসিতে আল্লাহ নিজেকে ‘আল-হাইয়্যু’ (চিরঞ্জীব) ও ‘আল-কাইয়্যুম’ (সবকিছুর ধারক) হিসেবে ঘোষণা করেছেন। সব সৃষ্টির মৃত্যু আছে, কিন্তু আল্লাহ তায়ালা অনাদি ও অনন্ত, তাঁর কোনো শুরু বা শেষ নেই।
রচনামূলক ব্যাখ্যা: আল-কুরআন হলো আল্লাহ তায়ালার প্রেরিত সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানি কিতাব, যা সর্বশেষ নবি হযরত মুহাম্মদ (স.) এর ওপর নাযিল হয়েছে। এরপর কিয়ামত পর্যন্ত আর কোনো নবিও আসবেন না এবং নতুন কোনো আসমানি কিতাবও অবতীর্ণ হবে না।
রচনামূলক ব্যাখ্যা: ‘খাতাম’ অর্থ মোহর বা সমাপ্তি। ‘খাতামুন নাবিয়্যিন’ অর্থ নবিদের সিলমোহর বা সর্বশেষ নবি। সূরা আল-আহযাবের ৪০ নং আয়াতে হযরত মুহাম্মদ (স.)-কে খাতামুন নাবিয়্যিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, যার মাধ্যমে নবুয়তের ধারার চিরসমাপ্তি ঘটেছে।
রচনামূলক ব্যাখ্যা: ইসলামে আমল কবুল হওয়ার পূর্বশর্ত হলো আকিদা বা বিশ্বাস বিশুদ্ধ হওয়া। যদি কারো আকিদায় শিরক বা কুফর থাকে, তবে তার পাহাড় সমতুল্য নেক আমলও আল্লাহর দরবারে বাতিল বলে গণ্য হবে। তাই আকিদা বিশুদ্ধ হলে তবেই ইবাদত বা আমল কবুল হয়।
রচনামূলক ব্যাখ্যা: ‘তাকদির’ শব্দটি আরবি বাবে তাফঈল এর মাসদার, এর মূল ধাতু হলো ق-د-ر (ক্বাফ-দাল-রা)। এর অর্থ হলো পরিমাণ নির্ধারণ করা, পরিমাপ করা বা ভাগ্য। আল্লাহ তায়ালা পূর্ব থেকেই সৃষ্টির সকল কিছুর যে রূপরেখা ও পরিমাণ নির্ধারণ করে রেখেছেন তাকেই তাকদির বলে।
রচনামূলক ব্যাখ্যা: পবিত্র কুরআন মানবজাতির জন্য একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা বা গাইডলাইন। এটি মানুষকে অন্ধকারে আলোর পথ বা হেদায়েত দেখায়, দুনিয়াতে সঠিক নীতি অবলম্বনের মাধ্যমে উন্নতি ও সমৃদ্ধি প্রদান করে এবং পরকালীন জীবনে চিরস্থায়ী সফলতার পথ নির্দেশ করে।
রচনামূলক ব্যাখ্যা: ‘ফিকহ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো গভীরভাবে অনুধাবন করা, জ্ঞান লাভ করা বা বুঝা। ইসলামি পরিভাষায়, কুরআন ও সুন্নাহর বিস্তারিত দলিল থেকে গবেষণা করে শরিয়তের বাস্তব আমলযোগ্য বিধানাবলি জানার নামই হলো ফিকহ বা ইলমুল ফিকহ।
রচনামূলক ব্যাখ্যা: শ্রেষ্ঠ ফকিহ ও হানাফি মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম আজম আবু হানিফা (রহ.) ৮০ হিজরি সনে (৬৯৯ খ্রিষ্টাব্দ) ইরাকের কুফা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৫০ হিজরিতে তিনি ইন্তেকাল করেন।
রচনামূলক ব্যাখ্যা: জুমার দিন পরিচ্ছন্নতার উদ্দেশ্যে গোসল করা রাসুল (স.) এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি জুমার দিন সুন্দরভাবে গোসল করে, উত্তম পোশাক ও সুগন্ধি মেখে মসজিদে যায়, তার পূর্ববর্তী সপ্তাহের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।
রচনামূলক ব্যাখ্যা: তায়াম্মুমের ফরজ তিনটি: ১. পবিত্রতার নিয়ত করা, ২. পবিত্র মাটিতে হাত মেরে সম্পূর্ণ মুখমণ্ডল একবার মাসেহ করা, ৩. পুনরায় মাটিতে হাত মেরে উভয় হাত কনুই পর্যন্ত মাসেহ করা।
রচনামূলক ব্যাখ্যা: মাগরিবের নামাজের সময়সীমার ক্ষেত্রে ‘শাফাক’ এর সংজ্ঞায় ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী শাফাক বলতে পশ্চিম আকাশে লাল আভা দূর হওয়ার পর যে সাদা আভা (ব্যায়াজ) অবশিষ্ট থাকে, তাকে বোঝানো হয়েছে। এই সাদা আভা দূর হলেই এশার ওয়াক্ত শুরু হয়।
রচনামূলক ব্যাখ্যা: জামাতের সাথে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের জন্য আজান দেওয়া সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ আলাল কিফায়াহ (অর্থাৎ মহল্লার কেউ আজান দিলে সবার পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যাবে)। আজান ইসলামের অন্যতম বড় শিয়ার বা নিদর্শন।
রচনামূলক ব্যাখ্যা: হাদিস শরিফে তিন সময়ে যেকোনো নামাজ পড়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে: ১. ঠিক সূর্যোদয়ের মুহূর্তে, ২. ঠিক দ্বিপ্রহরে (যাওয়ালের সময়) সূর্য যখন মাথার ওপরে থাকে এবং ৩. সূর্যাস্তের ঠিক আগ মুহূর্তে।
রচনামূলক ব্যাখ্যা: অযুর ক্ষেত্রে নিয়ত করা সুন্নত হলেও তায়াম্মুমের ক্ষেত্রে নিয়ত করা ফরজ। পবিত্র হওয়ার বা নামাজ আদায়ের সুনির্দিষ্ট নিয়ত ছাড়া শুধু মাটিতে হাত মেরে মুখে বা হাতে ঘষলে তায়াম্মুম শুদ্ধ হবে না।
রচনামূলক ব্যাখ্যা: হজ্জ বা উমরার ইহরাম বাঁধার পর (মুহরিম অবস্থায়) পুরুষদের জন্য সেলাইযুক্ত কাপড় পরা, সুগন্ধি লাগানো, চুল বা হাত-পায়ের নখ কাটা, শিকার করা ইত্যাদি কাজ শরীয়তের বিধানে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
রচনামূলক ব্যাখ্যা: হজ্জ তিন প্রকার—ইফরাদ, কিরান এবং তামাত্তু। হানাফি মাজহাবের মতে হজ্জে কিরান (অর্থাৎ উমরা এবং হজ্জের জন্য একই সাথে ইহরাম বেঁধে উভয় কাজ সম্পন্ন করা) সর্বাধিক উত্তম ও মর্যাদাপূর্ণ।
রচনামূলক ব্যাখ্যা: ‘বাতনে মুহাসসার’ হলো মুজদালিফা ও মিনার মধ্যবর্তী একটি ময়দান বা উপত্যকা। এই স্থানে আবরাহা বাদশাহর হস্তীবাহিনীর ওপর আল্লাহর আজাব অবতীর্ণ হয়েছিল। তাই হজ্জযাত্রীদের জন্য এই স্থানটি দ্রুত অতিক্রম করা সুন্নাত।
রচনামূলক ব্যাখ্যা: জিলহজ্জ মাসের ৮ তারিখকে ‘ইয়াওমুত তারবিয়া’ বলা হয়। ‘তারবিয়া’ অর্থ পানি পান করানো বা তৃষ্ণা নিবারণ। প্রাচীনকালে হাজীরা এই দিনে মক্কা থেকে পানি সংগ্রহ করে মিনায় রওনা হতেন, তাই একে ইয়াওমুত তারবিয়া বলা হয়।
রচনামূলক ব্যাখ্যা: ‘হুসন’ মানে সুন্দর বা উত্তম আর ‘মুআমালাহ’ মানে আচরণ বা লেনদেন। ইসলামে মানুষের প্রতি মানুষের সুন্দর ও উত্তম আচরণ, পারস্পরিক লেনদেনে সততা এবং সদ্ব্যবহারকে ‘হুসনুল মুআমালাহ’ বলা হয়। এটি উত্তম চরিত্রের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ।
রচনামূলক ব্যাখ্যা: একটি প্রসিদ্ধ হাদিসে রাসুল (স.) বলেছেন, “তোমরা কৃপণতা থেকে বেঁচে থাকো, কারণ কৃপণতা বা লোভই তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলোকে ধ্বংস করেছে। এই লোভই তাদের রক্তপাত ঘটাতে এবং হারামকে হালাল বানাতে প্ররোচিত করেছিল।”
রচনামূলক ব্যাখ্যা: সহিহ মুসলিমের হাদিস অনুযায়ী এক মুসলমানের ওপর অপর মুসলমানের ৬টি হক রয়েছে। যথা: ১. সালাম দিলে জবাব দেওয়া, ২. দাওয়াত দিলে কবুল করা, ৩. উপদেশ চাইলে সৎ পরামর্শ দেওয়া, ৪. হাঁচি দিয়ে আলহামদুলিল্লাহ বললে ইয়ারহামুকাল্লাহ বলা, ৫. অসুস্থ হলে দেখতে যাওয়া এবং ৬. মারা গেলে জানাজায় অংশগ্রহণ করা।
রচনামূলক ব্যাখ্যা: ‘নফল’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো অতিরিক্ত, বৃদ্ধি বা উপরি। ইসলামি শরিয়তে ফরজ ও ওয়াজিব ইবাদতের বাইরে অতিরিক্ত যেসব ইবাদত পালন করলে সওয়াব পাওয়া যায় কিন্তু ছেড়ে দিলে গুনাহ হয় না, তাকে নফল বলা হয়।
রচনামূলক ব্যাখ্যা: ‘তওবা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ফিরে আসা বা প্রত্যাবর্তন করা। ইসলামি শরিয়তে গুনাহ বা পাপের কাজ ছেড়ে দিয়ে লজ্জিত হয়ে আল্লাহর আনুগত্যের দিকে বিশুদ্ধ চিত্তে ফিরে আসাকে তওবা বলা হয়।
রচনামূলক ব্যাখ্যা: যিকির প্রধানত ৩ ভাবে হয়ে থাকে: ১. ক্বলবি বা অন্তরের মাধ্যমে আল্লাহর স্মরণ, ২. লিসানি বা জিহ্বার মাধ্যমে আল্লাহর প্রশংসা, এবং ৩. আমলি বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ পালন করে যিকির।
রচনামূলক ব্যাখ্যা: হাদিস শরিফে এসেছে, “আলহামদুলিল্লাহ” মিজানের পাল্লাকে পূর্ণ করে দেয় এবং “সুবহানাল্লাহ ওয়াল হামদুলিল্লাহ” (তসবিহ ও তাহমিদ) আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থানগুলোকে সওয়াব বা নূর দ্বারা পূর্ণ করে দেয়।
রচনামূলক ব্যাখ্যা: তিরমিজি শরিফের হাদিসে রাসুল (স.) বলেছেন, “তোমাদের রব অত্যন্ত লজ্জাশীল ও দাতা। যখন কোনো বান্দা তাঁর দিকে দুহাত তুলে দোয়া করে, তখন তিনি তা খালি হাতে বা শূন্য অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে লজ্জাবোধ করেন।”
রচনামূলক ব্যাখ্যা: ইসলামি শরিয়তের বা উসূলে ফিকহের প্রধান এবং সর্বসম্মত উৎস হলো ৪টি। এগুলো হলো: ১. আল-কুরআন, ২. আস-সুন্নাহ (হাদিস), ৩. ইজমা (ঐকমত্য) এবং ৪. কিয়াস (যুক্তিভিত্তিক তুলনা)।
রচনামূলক ব্যাখ্যা: উসূলে ফিকহ অধ্যয়নের মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী শরীয়তের বিধানগুলো দলিলসহ বুঝতে পারে, নতুন উদ্ভূত সমস্যার মাসয়ালা ইস্তিম্বাত বা উদ্ভাবন করার নিয়মকানুন শিখতে পারে। আর ইসলামের এই গভীর জ্ঞান অর্জনের চূড়ান্ত লক্ষ্যই হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা।
রচনামূলক ব্যাখ্যা: উসূলে ফিকহ এবং ইলমুল বালাঘাতের পরিভাষায় ‘হাকিকত’ বলা হয় এমন শব্দকে, যা তার মূল বা প্রকৃত অর্থের জন্যই ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ কোনো শব্দকে প্রথম যে অর্থে তৈরি করা হয়েছে, ঠিক সেই অর্থেই ব্যবহার করা হলে তাকে হাকিকত বলে।
রচনামূলক ব্যাখ্যা: ‘মাজাজ’ হলো হাকিকতের বিপরীত। যখন কোনো শব্দ তার নিজস্ব বা প্রকৃত অর্থে ব্যবহৃত না হয়ে, কোনো সম্পর্ক বা ইঙ্গিতের কারণে অন্য কোনো রূপক বা অপ্রকৃত অর্থে ব্যবহৃত হয়, তখন তাকে মাজাজ বলা হয়। যেমন: বীর পুরুষ বোঝাতে ‘সিংহ’ শব্দ ব্যবহার করা।
রচনামূলক ব্যাখ্যা: উসূলে ফিকহ এর কিতাবসমূহে ‘আম’ বা ব্যাপক অর্থবোধক শব্দকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে: ১. আম্মুল লাযি উরিদা বিহিল উমুম (যে আম দ্বারা ব্যাপক অর্থই উদ্দেশ্য), ২. আম্মুল লাযি উরিদা বিহিল খুসুস (যে আম দ্বারা নির্দিষ্ট অর্থ উদ্দেশ্য), ৩. আম্মুল মাখসুস মিনহুল বাদ (যাকে খাস করা হয়েছে)।
রচনামূলক ব্যাখ্যা: ‘খাস’ বলা হয় এমন শব্দকে যা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি, বস্তু বা শ্রেণিকে বোঝায়। উসূলে শাশী ও নূরুল আনোয়ারের মতে খাস প্রধানত তিন প্রকার: ১. খাসুশ শাখছ (ব্যক্তিবাচক খাস, যেমন: জায়েদ), ২. খাসুন নাউ (প্রজাতিবাচক খাস, যেমন: মানুষ), ৩. খাসুল জিন্স (জাতিবাচক খাস)।
রচনামূলক ব্যাখ্যা: ইসলামি শরিয়তের দলিলের ক্রমবিন্যাস অনুযায়ী প্রথমে কুরআন, এরপর সুন্নাহ (হাদিস)। কুরআন ও সুন্নাহর ঠিক পরেই তৃতীয় অকাট্য দলিল হলো ‘ইজমা’ (উম্মতের মুজতাহিদদের ঐকমত্য)। ইজমার পরে আসে কিয়াসের স্থান। তাই “পরেই” শব্দটি দ্বারা সরাসরি ইজমাকে বোঝানো হয়েছে।
রচনামূলক ব্যাখ্যা: রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, “আদ-দুআউ সিলাহুল মুমিন” অর্থাৎ দোয়া হলো মুমিনের হাতিয়ার বা সম্বল। বিপদে-আপদে, সুখে-দুঃখে মুমিন সর্বদা আল্লাহর কাছে দোয়ার মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করে, এটিই তার সবচেয়ে বড় শক্তি।
খ বিভাগ—আকাইদ
(যে কোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও) মান—১০x১=১০
মুনাফিকের পরিচয়: ‘মুনাফিক’ শব্দটি ‘নিফাক’ থেকে নির্গত। এর অর্থ হলো কপটতা, ভণ্ডামি বা দ্বিমুখী নীতি। ইসলামি পরিভাষায়, মুখে ঈমানের দাবি করে অন্তরে কুফরি বা অবিশ্বাস লুকিয়ে রাখাকে নিফাক বলে, আর যে ব্যক্তি এই কাজ করে তাকে মুনাফিক বলে।
কুরআন-হাদিসের আলোকে মুনাফিকের আলামতসমূহ:
হাদিস শরিফে মুনাফিকের প্রধান কয়েকটি আলামত স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। বুখারি ও মুসলিম শরিফের হাদিস অনুযায়ী মুনাফিকের আলামত ৩টি (অন্য বর্ণনায় ৪টি):
১. মিথ্যা কথা বলা: যখন সে কথা বলে, মিথ্যা বলে।
২. ওয়াদা ভঙ্গ করা: যখন সে কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়, তা ভঙ্গ করে।
৩. আমানতের খিয়ানত করা: তার কাছে কোনো কিছু আমানত রাখা হলে, সে তা আত্মসাৎ বা খিয়ানত করে।
৪. গালিগালাজ করা: যখন সে কারও সাথে বিবাদে লিপ্ত হয়, তখন অশ্লীল বাক্য ব্যবহার করে বা গালি দেয়।
মুনাফিকের পরিণাম:
মুনাফিকদের পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ। এরা প্রকাশ্য কাফেরের চেয়েও ইসলামের বেশি ক্ষতি করে। তাই আল্লাহ তায়ালা তাদের জন্য জাহান্নামের সবচেয়ে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা রেখেছেন। পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নিসার ১৪৫ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন:
إِنَّ الْمُنَافِقِينَ فِي الدَّرْكِ الْأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ وَلَن تَجِدَ لَهُمْ نَصِيرًا
অর্থ: “নিশ্চয়ই মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে অবস্থান করবে এবং তুমি তাদের জন্য কোনো সাহায্যকারী পাবে না।”
মিরাজের পরিচয়: ‘মিরাজ’ (معراج) শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো ঊর্ধ্বগমন করার যন্ত্র বা সিঁড়ি। ইসলামি পরিভাষায়, নবুয়তের একাদশ সনে রজব মাসের ২৭ তারিখ রাতে হযরত মুহাম্মদ (স.) জিবরাইল (আ.)-এর সাথে বোরাক নামক বাহনে চড়ে মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে জেরুজালেমের মসজিদুল আকসায় গমন (যাকে ইসরা বলে) এবং সেখান থেকে সাত আসমান পেরিয়ে সিদরাতুল মুনতাহা হয়ে আরশে আজিমে আল্লাহর দিদার লাভ করার বিস্ময়কর ও অলৌকিক ঘটনাকেই মিরাজ বলা হয়।
কুরআন-সুন্নাহর আলোকে মিরাজের ঘটনা:
মিরাজের ঘটনাটি পবিত্র কুরআন (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত ১) এবং অসংখ্য সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
১. ইসরা (রাত্রিকালীন ভ্রমণ): নবীজি (স.) রাতে উম্মে হানির ঘরে ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন। জিবরাইল (আ.) এসে তাঁর বক্ষ বিদীর্ণ করে জমজম পানি দিয়ে অন্তর ধৌত করেন। এরপর ‘বোরাক’ নামক বিদ্যুতের চেয়েও দ্রুতগামী বাহনে করে তাঁকে মসজিদুল আকসায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নবীজি সকল নবি-রাসুলদের নিয়ে জামাতে ইমামতি করেন।
২. ঊর্ধ্বগমন (মিরাজ): আকসা থেকে তিনি প্রথম আসমানে পৌঁছান, সেখানে হজরত আদম (আ.) এর সাথে সাক্ষাৎ হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে দ্বিতীয় আসমানে ঈসা ও ইয়াহিয়া (আ.), তৃতীয়তে ইউসুফ (আ.), চতুর্থতে ইদ্রিস (আ.), পঞ্চমে হারুন (আ.), ষষ্ঠে মুসা (আ.) এবং সপ্তম আসমানে ইব্রাহিম (আ.) এর সাথে সাক্ষাৎ করেন।
৩. সিদরাতুল মুনতাহা ও আল্লাহর দিদার: সপ্তম আসমানের পর জিবরাইল (আ.) সিদরাতুল মুনতাহা নামক বরই গাছের কাছে থেমে যান, কারণ এর সীমানা পার হওয়ার ক্ষমতা তাঁর ছিল না। নবীজি (স.) ‘রফরফ’ নামক বাহনে করে আরশে আজিমে পৌঁছান এবং মহান আল্লাহর সাথে সরাসরি কথোপকথন ও দিদার লাভ করেন।
৪. উপহার লাভ ও প্রত্যাবর্তন: মিরাজ থেকে উম্মতের জন্য শ্রেষ্ঠ উপহার হিসেবে ‘পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ’, সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত এবং শিরক না করলে ক্ষমার সুসংবাদ নিয়ে নবীজি (স.) রাতেই মক্কায় প্রত্যাবর্তন করেন।
গ বিভাগ—ফিকহ
(যে কোনো দুটি প্রশ্নের উত্তর দাও) মান—১০x২=২০
গোসল ফরজ হওয়ার কারণসমূহ:
শরিয়তের বিধান অনুযায়ী প্রধানত তিনটি কারণে নারী-পুরুষের ওপর গোসল করা ফরজ হয়:
১. জানাবাত (অপবিত্রতা): স্বামী-স্ত্রীর মিলনের ফলে, অথবা স্বপ্নদোষ বা অন্য কোনো উত্তেজনার কারণে বীর্যপাত হলে গোসল ফরজ হয়।
২. হায়েজ (ঋতুস্রাব): মহিলাদের মাসিক ঋতুস্রাব বন্ধ হওয়ার পর পবিত্রতার জন্য গোসল ফরজ।
৩. নিফাস (প্রসবজনিত স্রাব): সন্তান প্রসবের পর মহিলাদের যে রক্তস্রাব হয়, তা বন্ধ হওয়ার পর গোসল করা ফরজ।
(এছাড়া কোনো বিধর্মী ইসলাম গ্রহণ করলে এবং কোনো মুসলমান মারা গেলে তাকে গোসল করানো জীবিতদের ওপর ফরজে কিফায়া)।
যে পানি দ্বারা পবিত্রতা (তাহারাত) অর্জন করা জায়েজ:
১. বৃষ্টির পানি, ২. কুয়া বা কূপের পানি, ৩. ঝরনার পানি, ৪. নদী বা খালের পানি, ৫. সমুদ্রের পানি (লবণাক্ত হলেও), ৬. বরফ বা শিলা গলার পানি, এবং ৭. বড় পুকুর বা জলাশয়ের স্থির পানি।
যে পানি দ্বারা পবিত্রতা অর্জন করা জায়েজ নয়:
১. ফলমূল বা গাছ নিংড়ানো রস বা পানি। ২. যে পানিতে নাপাকি বা অপবিত্র কিছু পড়ার কারণে পানির রং, স্বাদ বা গন্ধ পরিবর্তন হয়ে গেছে। ৩. মায়ে মুস্তামাল বা ব্যবহৃত পানি (যা দ্বারা অযু বা গোসল একবার করা হয়েছে)। ৪. যে পানিতে এমন কোনো পবিত্র বস্তু মিশ্রিত হয়েছে যা পানির তারল্য নষ্ট করে তাকে ঘন বা শরবত বানিয়ে ফেলেছে।
ইসলামে নির্দিষ্ট সময়ে নামাজ আদায় করা ফরজ। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময়সীমা নিচে দেওয়া হলো:
১. ফজর: সুবহে সাদিক (ভোর রাতে পূর্ব আকাশে লম্বালম্বিভাবে যে সাদা রেখা দেখা যায়) থেকে শুরু হয়ে সূর্যোদয়ের আগ পর্যন্ত ফজরের ওয়াক্ত থাকে। সূর্যোদয় শুরু হয়ে গেলে ফজরের ওয়াক্ত শেষ হয়ে যায়।
২. যোহর: দুপুরের সূর্য ঠিক মাথার ওপর থেকে একটু পশ্চিম দিকে হেলে পড়লে (যাওয়াল) যোহরের ওয়াক্ত শুরু হয়। আর কোনো বস্তুর আসল ছায়া বাদে তার ছায়া দ্বিগুণ হওয়া পর্যন্ত এই ওয়াক্ত থাকে (হানাফি মাজহাব মতে)।
৩. আসর: যোহরের ওয়াক্ত শেষ হওয়ার সাথে সাথেই আসরের ওয়াক্ত শুরু হয় এবং সূর্যাস্ত পর্যন্ত এই ওয়াক্ত থাকে। তবে সূর্যের রং হলুদ হয়ে যাওয়ার পর আসর পড়া মাকরুহ।
৪. মাগরিব: সূর্য পুরোপুরি অস্ত যাওয়ার পর মাগরিবের ওয়াক্ত শুরু হয় এবং পশ্চিম আকাশে যতক্ষণ পর্যন্ত ‘শাফাক’ বা সাদা আভা অবশিষ্ট থাকে, ততক্ষণ মাগরিব পড়া যায়।
৫. এশা: মাগরিবের ওয়াক্ত শেষ হওয়ার পর (অর্থাৎ পশ্চিম আকাশের সাদা আভা দূর হওয়ার পর) এশার ওয়াক্ত শুরু হয় এবং তা সুবহে সাদিকের আগ পর্যন্ত থাকে। তবে মধ্যরাতের আগে এশা পড়া মুস্তাহাব।
জুমার নামাজ শুদ্ধ হওয়ার শর্তসমূহ (শুরুতে ওয়াজিব হওয়ার শর্ত নয়, বরং শুদ্ধ হওয়ার শর্ত):
জুমার নামাজ সহিহ বা শুদ্ধ হওয়ার জন্য হানাফি মাজহাব মতে ৬টি শর্ত রয়েছে:
১. শহর বা মিসর হওয়া: জুমা এমন স্থানে অনুষ্ঠিত হতে হবে যা শহর বা শহরের শহরতলি। ছোট অজপাড়া গাঁয়ে জুমা ফরজ হয় না।
২. শাসক বা তার প্রতিনিধি: নামাজ পরিচালনার জন্য ইসলামি রাষ্ট্রের শাসক, বিচারক অথবা তাদের নিয়োজিত ইমাম থাকতে হবে (তবে বর্তমান যুগে মুসলিমরা যাকে ইমাম বানাবে তিনিই পড়াতে পারবেন)।
৩. যোহরের ওয়াক্ত: জুমার নামাজ অবশ্যই যোহরের ওয়াক্তের মধ্যে আদায় করতে হবে।
৪. খুতবা: নামাজের পূর্বে জুমার খুতবা প্রদান করা শর্ত। খুতবা ছাড়া জুমা হবে না।
৫. জামায়াত: ইমাম ছাড়া কমপক্ষে তিনজন (বা মতান্তরে ৪০ জন) প্রাপ্তবয়স্ক মুমিন পুরুষ মুক্তাদি থাকতে হবে।
৬. ইজনে আম (সর্বসাধারণের প্রবেশাধিকার): মসজিদ বা জুমার স্থান এমন হতে হবে যেখানে যেকোনো মুসলিম বিনা বাধায় প্রবেশ করে নামাজ পড়তে পারে।
যাদের ওপর জুমার নামাজ ওয়াজিব:
নিচের গুণাবলি সম্পন্ন ব্যক্তির ওপর জুমার নামাজ পড়া ওয়াজিব বা ফরজ:
১. মুসলমান হওয়া। ২. পুরুষ হওয়া (মহিলাদের ওপর জুমা ফরজ নয়)। ৩. স্বাধীন হওয়া (ক্রীতদাস নয়)। ৪. প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্ক সম্পন্ন হওয়া। ৫. মুকিম হওয়া (মুসাফির বা ভ্রমণকারীর ওপর জুমা ফরজ নয়)। ৬. সুস্থ হওয়া (অসুস্থ বা পঙ্গু ব্যক্তির ওপর ফরজ নয়)। ৭. দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন হওয়া (অন্ধের ওপর ফরজ নয়)।
ঘ বিভাগ—উসুলুল ফিকহ
(যে কোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও) মান—১০x১=১০
খাস-এর পরিচয়: ‘খাস’ একটি আরবি শব্দ, এর আভিধানিক অর্থ হলো নির্দিষ্ট করা, স্বতন্ত্র করা। উসূলে ফিকহের পরিভাষায়— যে শব্দ গঠনগতভাবে একক এবং একটি মাত্র নির্দিষ্ট অর্থ বোঝানোর জন্য তৈরি করা হয়েছে, তাকে ‘খাস’ বলে। অর্থাৎ এটি ব্যাপক কোনো অর্থ দেয় না, বরং নির্দিষ্ট ব্যক্তি, বস্তু বা সীমানাকে নির্দেশ করে।
খাস-এর প্রকারভেদ ও উদাহরণ:
উসূলে শাশী এবং অন্যান্য উসূল গ্রন্থ অনুযায়ী ‘খাস’ প্রধানত ৩ প্রকার। যথা:
১. খাসুশ শাখছ (ব্যক্তিবাচক নির্দিষ্ট): যে শব্দ দ্বারা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে বোঝায়।
উদাহরণ: ‘যাইদ’, ‘বকর’, ‘ঢাকা’ ইত্যাদি শব্দ। এগুলো শুনলে নির্দিষ্ট একজন মানুষ বা নির্দিষ্ট একটি জায়গাকেই বোঝায়।
২. খাসুন নাউ (প্রজাতিবাচক নির্দিষ্ট): যে শব্দ দ্বারা একটি নির্দিষ্ট প্রজাতিকে বোঝায়, যা অন্য প্রজাতি থেকে আলাদা।
উদাহরণ: ‘রাজুল’ (পুরুষ), ‘ইমরাআহ’ (নারী)। ‘পুরুষ’ শব্দটি খাস, কারণ এটি নারী বা অন্য প্রাণীকে অন্তর্ভুক্ত করে না।
৩. খাসুল জিন্স (জাতিবাচক নির্দিষ্ট): যে শব্দ দ্বারা একটি নির্দিষ্ট জাতিকে বোঝায়।
উদাহরণ: ‘ইনসান’ (মানুষ)। এটি দ্বারা শুধু মানবজাতিকে নির্দিষ্ট করা হয়েছে, ফেরেশতা বা জ্বীনকে নয়।
(এছাড়াও সংখ্যাবাচক খাস রয়েছে, যেমন- ৩, ১০, ১০০। এগুলো সুনির্দিষ্ট সংখ্যা বোঝায়)।
হাকিকত-এর সংজ্ঞা: হাকিকত অর্থ মূল বা প্রকৃত। উসূলে ফিকহের পরিভাষায়, কোনো শব্দকে প্রথম যে অর্থের জন্য তৈরি করা হয়েছে, সেটিকে হুবহু ওই প্রকৃত অর্থেই ব্যবহার করা হলে তাকে হাকিকত বলে।
মাজাজ-এর সংজ্ঞা: মাজাজ অর্থ রূপক বা অপ্রকৃত। যখন কোনো শব্দ তার প্রকৃত অর্থে ব্যবহৃত না হয়ে, অন্য কোনো রূপক বা ধার করা অর্থে ব্যবহৃত হয়, তখন তাকে মাজাজ বলে। (অবশ্যই প্রকৃত ও অপ্রকৃত অর্থের মধ্যে কোনো যোগসূত্র বা কারিনাহ থাকতে হবে)।
হাকিকতের প্রকারভেদ: হাকিকত প্রধানত ৩ প্রকার:
১. হাকিকতে লুগাবিয়া (আভিধানিক হাকিকত): আভিধানিক অর্থে ব্যবহার। যেমন- ‘সালাত’ শব্দের অর্থ দোয়া করা।
২. হাকিকতে শরইয়্যাহ (শরিয়তের হাকিকত): ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় ব্যবহার। যেমন- ‘সালাত’ বলতে রুকু-সিজদাহ বিশিষ্ট ইবাদত (নামাজ) বোঝানো।
৩. হাকিকতে উরফিয়্যাহ (প্রচলিত হাকিকত): সাধারণ মানুষের প্রচলন অনুযায়ী ব্যবহার। যেমন- ‘দাব্বাহ’ অর্থ বিচরণশীল প্রাণী, কিন্তু মানুষ তা দ্বারা চার পেয়ে জন্তু বোঝে।
মাজাজ-এর প্রকারভেদ: মাজাজ ব্যবহারের দিক থেকে বিভিন্ন প্রকার হয়, উল্লেখযোগ্য হলো:
১. মাজাজে মুরসাল: যেখানে প্রকৃত ও রূপক অর্থের মধ্যে সাদৃশ্য বা উপমা থাকে না, অন্য কোনো সম্পর্ক থাকে। যেমন- ‘আঙুল’ বলা হয়েছে কিন্তু উদ্দেশ্য ‘আঙুলের ডগা’।
২. মাজাজে ইস্তিয়ারা: যেখানে উপমা বা সাদৃশ্যের সম্পর্ক থাকে। যেমন- কোনো সাহসী যোদ্ধাকে দেখে বলা, “আমি একটি সিংহকে যুদ্ধ করতে দেখলাম।” এখানে সিংহ হলো মাজাজ, যার উদ্দেশ্য হলো সাহসী পুরুষ।
ঙ বিভাগ—আখলাক
(যে কোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও) মান—১০x১=১০
হুসনুল মুআমালাহ-এর পরিচয়: ‘হুসন’ অর্থ সুন্দর বা উত্তম, এবং ‘মুআমালাহ’ অর্থ লেনদেন, আচরণ, পারস্পরিক সম্পর্ক বা ব্যবহার। ইসলামি পরিভাষায়, নিজ পরিবার, সমাজ, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী এবং আপামর মানুষের সাথে সততা, নম্রতা, বিশ্বস্ততা ও ন্যায়ের ভিত্তিতে যে সুন্দর ও উত্তম আচরণ করা হয়, তাকেই ‘হুসনুল মুআমালাহ’ বা সদ্ব্যবহার বলে।
হুসনুল মুআমালাহ এর গুরুত্ব:
ইসলামে ইবাদতের মতোই পারস্পরিক সদ্ব্যবহার বা হুসনুল মুআমালাহ এর ওপর চরম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর গুরুত্ব নিম্নরূপ:
১. ঈমানের পূর্ণতা: রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, “মুমিনদের মধ্যে সেই ব্যক্তির ঈমান সবচেয়ে বেশি পূর্ণাঙ্গ, যার চরিত্র বা ব্যবহার সবচেয়ে সুন্দর।”
২. আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন: মানুষের সাথে সদ্ব্যবহার করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন। আল্লাহ বলেন, “তোমরা মানুষের সাথে উত্তম কথা বলবে এবং সদ্ব্যবহার করবে।”
৩. জান্নাত লাভের উপায়: সুন্দর ব্যবহারের কারণে মানুষ জান্নাতে প্রবেশ করবে। নবীজিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল কোন জিনিস মানুষকে বেশি জান্নাতে নেবে? তিনি বলেছিলেন, “আল্লাহভীতি এবং উত্তম চরিত্র বা সদ্ব্যবহার।”
৪. মিজানের পাল্লা ভারি হওয়া: কিয়ামতের দিন মিজানের পাল্লায় বান্দার আমল মাপা হবে। হাদিসে এসেছে, কিয়ামতের দিন মুমিনের আমলনামায় ‘হুসনুল খুলুক’ বা সুন্দর আচরণের চেয়ে বেশি ভারি আর কোনো জিনিস হবে না।
৫. সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠা: সমাজে পারস্পরিক সদ্ব্যবহার থাকলে হিংসা, হানাহানি, মামলা-মোকদ্দমা কমে যায় এবং একটি শান্তিপূর্ণ আদর্শ সমাজ গঠিত হয়।
দোয়ার পরিচয়: ‘দোয়া’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো ডাকা, প্রার্থনা করা বা সাহায্য চাওয়া। ইসলামি পরিভাষায়, বান্দা তার নিজের অভাব, অভিযোগ, অক্ষমতা ও দুর্বলতার কথা স্বীকার করে মহান আল্লাহর দরবারে সাহায্য, রহমত ও ক্ষমা প্রার্থনা করাকেই দোয়া বলা হয়।
কুরআন-হাদিসের আলোকে দোয়ার ফজিলত:
দোয়া হলো ইবাদতের মূল নির্যাস। এর ফজিলত অপরিসীম:
১. দোয়া নিজেই একটি ইবাদত: হাদিসে বলা হয়েছে, “আদ-দুআউ হুওয়াল ইবাদাহ” অর্থাৎ দোয়া নিজেই ইবাদত। যে আল্লাহ কাছে চায় না, আল্লাহ তার ওপর রাগান্বিত হন।
২. কুরআনের নির্দেশ: আল্লাহ তায়ালা সূরা আল-গাফিরের ৬০ নং আয়াতে বলেছেন, “তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিব।” এটি আল্লাহর সরাসরি প্রতিশ্রুতি।
৩. মুমিনের হাতিয়ার: রাসুল (স.) বলেছেন, “দোয়া হলো মুমিনের হাতিয়ার, দ্বীনের স্তম্ভ এবং আসমান ও জমিনের জ্যোতি।” বিপদে-আপদে মুমিন দোয়ার মাধ্যমেই আল্লাহর সাহায্য লাভ করে।
৪. আল্লাহর নৈকট্য লাভ: আল্লাহ সূরা বাকারার ১৮৬ নং আয়াতে বলেছেন, “আমি খুব নিকটেই থাকি, যখন কোনো প্রার্থনাকারী আমাকে ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই।”
৫. তাকদির পরিবর্তন: হাদিস শরিফে এসেছে, “দোয়া ছাড়া অন্য কোনো কিছুই ভাগ্য বা তাকদির পরিবর্তন করতে পারে না।” খালেস নিয়তে দোয়া করলে বিপদ দূর হয় এবং রহমত অবতীর্ণ হয়।
চ বিভাগ—ইলমুল ফিকহ ও উসুলুল ফিকহের ইতিহাস
(যে কোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও) মান—১০x১=১০
উসুলুল ফিকহের সংজ্ঞা: ‘উসুল’ অর্থ মূলনীতি এবং ‘ফিকহ’ অর্থ শরিয়তের বিধান বোঝা। ইসলামি পরিভাষায়, যে জ্ঞান বা শাস্ত্র অধ্যয়ন করলে কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস থেকে ইসলামি শরিয়তের বাস্তব আমলযোগ্য বিধানাবলি (মাসয়ালা) বের করার নিয়মকানুন ও পদ্ধতি জানা যায়, তাকে ‘উসুলুল ফিকহ’ বলা হয়।
আলোচ্য বিষয় (মাউজু):
উসুলুল ফিকহের প্রধান আলোচ্য বিষয় দুটি:
১. আল-আদিল্লাহ আশ-শরইয়্যাহ: শরিয়তের দলিলসমূহ। অর্থাৎ কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস নিয়ে আলোচনা।
২. আল-আহকাম আশ-শরইয়্যাহ: শরিয়তের বিধানসমূহ। অর্থাৎ ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত, হালাল, হারাম, মাকরুহ ইত্যাদির অবস্থা ও প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা।
প্রয়োজনীয়তা:
১. কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক অর্থ ও উদ্দেশ্য বুঝতে উসুলুল ফিকহ অপরিহার্য।
২. শরিয়তের বিধানগুলো কীভাবে এবং কোন যুক্তিতে দলিল থেকে সাব্যস্ত হলো তা জানার জন্য।
৩. আধুনিক যুগের নতুন নতুন উদ্ভূত সমস্যার (যেমন: ক্লোনিং, ব্যাংকিং ব্যবস্থা) ইসলামি সমাধান বা ইজতিহাদ করার জন্য মুজতাহিদের জন্য এই শাস্ত্র জানা ফরজ।
৪. মনগড়া ফতোয়া দেওয়া থেকে সমাজকে রক্ষা করা এবং ইসলামি আইনের বিশুদ্ধতা বজায় রাখার জন্য এর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
ইসলামি জীবনব্যবস্থায় ইলমুল ফিকহ একদিনে তৈরি হয়নি, বরং এটি যুগের পর যুগ ধরে উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের মধ্য দিয়ে আজকের সমৃদ্ধ রূপ লাভ করেছে। এই ইতিহাসকে প্রধানত কয়েকটি যুগে ভাগ করা যায়:
১. নবীজি (স.) এর যুগ (উৎপত্তি যুগ): ফিকহের উৎপত্তি মূলত রাসুলুল্লাহ (স.) এর যুগে। এই যুগে ফিকহের একমাত্র উৎস ছিল ওহী (কুরআন ও সুন্নাহ)। সাহাবিদের কোনো সমস্যা হলে তারা সরাসরি নবীজির কাছে যেতেন এবং ওহীর মাধ্যমে তাৎক্ষণিক মাসয়ালার সমাধান পেয়ে যেতেন।
২. সাহাবায়ে কেরামের যুগ: নবীজির ইন্তেকালের পর ইসলামি সাম্রাজ্য মক্কা-মদিনার বাইরে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে নতুন নতুন সমস্যার সৃষ্টি হয়। তখন খুলাফায়ে রাশেদীন এবং বড় বড় সাহাবিরা কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে এবং প্রয়োজনে নিজেদের মধ্যে ইজমা ও ইজতিহাদের মাধ্যমে ফিকহের বিধান তৈরি করেন।
৩. তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িদের যুগ (সংকলন ও বিকাশের যুগ): এই যুগে সাহাবিদের ফতোয়া ও ইজতিহাদগুলো সংগৃহীত হতে থাকে। এ সময়েই হানাফি, শাফেয়ি, মালেকি ও হাম্বলি মাজহাবের ইমামগণের জন্ম হয়। তারা ফিকহের মূলনীতি তৈরি করেন এবং লক্ষ লক্ষ মাসয়ালা অধ্যায় ও পরিচ্ছেদ অনুসারে সুবিন্যস্ত আকারে সংকলন করেন। এটি ছিল ফিকহের স্বর্ণযুগ।
৪. তাকলিদের যুগ: চার মাজহাব সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পরবর্তী যুগের আলেমরা নতুন করে ইজতিহাদ না করে এই চার মাজহাবের ইমামদের নীতির অনুসরণ বা তাকলিদ শুরু করেন এবং তাদের গ্রন্থগুলোর ব্যাখ্যা বা শরাহ লেখেন।
৫. আধুনিক যুগ: বর্তমান যুগে ফিকহ আধুনিক রূপ লাভ করেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফিকহ একাডেমি গঠিত হয়েছে, যারা চিকিৎসা, অর্থনীতি, বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ের আধুনিক সমস্যাগুলোর ইসলামি সমাধান ফতোয়ার মাধ্যমে প্রদান করছে। এভাবেই ফিকহ তার ক্রমবিকাশ অব্যাহত রেখেছে।






