At-Tafsir Al-Mu’asir (আত-তাফসীর আল-মু’আসির) 201202 – Fazil Hons Al Quran 2nd Year 2022 QnA

Join Our Telegram Channel
দ্রুত নতুন বই পেতে যুক্ত থাকুন
Join Now
admin
at tafsir al muasir 201202 fazil hons al quran 2nd year 2022 qna
Join Our WhatsApp Channel
দ্রুত নতুন বই পেতে যুক্ত থাকুন
Join Now
📋 সূচিপত্র (Table of Contents)

At-Tafsir Al-Mu’asir (Code: 201202) – ২০২২ প্রশ্ন ও উত্তর

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২২ এর আল-কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের التفسير المعاصر (আত-তাফসীর আল-মু’আসির) বিষয়ের সম্পূর্ণ উত্তরমালা।

বিঃদ্রঃ পরীক্ষার্থীদের আগামী পরীক্ষার সর্বোচ্চ প্রস্তুতির সুবিধার্থে মূল প্রশ্নপত্রের ক ও খ উভয় বিভাগের বিকল্প সবগুলোর (অথবা) প্রশ্নের ১০০% নির্ভুল ও তথ্যবহুল উত্তর বিস্তারিতভাবে নিচে দেওয়া হলো।

مجموعة (أ) [ক-বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্ন]

١- الحمد لله الذى خلق السموات والارض وجعل الظلمات والنور ثم الذين كفروا بربهم يعدلون-
(الف) ما معنى الحمد؟ وما الفرق بين ‘خلق’ و ‘جعل’؟ بين مختصرا-
(ب) ما المراد بالظلمات والنور؟

[(ক) الحمد এর অর্থ কী? ‘خلق’ ও ‘جعل’ এর পার্থক্য সংক্ষেপে বর্ণনা কর।
(খ) النور ও الظلمات দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে?]

আয়াতের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসির:
অনুবাদ: “যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং অন্ধকার ও আলো সৃষ্টি করেছেন। তা সত্ত্বেও কাফিররা (অন্যদেরকে) তাদের রবের সমকক্ষ সাব্যস্ত করে।”
তাফসির: সুরা আনআমের এই আয়াতে আল্লাহর একত্ববাদের প্রমাণ দেওয়া হয়েছে। যিনি এত বিশাল সৃষ্টিজগত সৃষ্টি করেছেন, প্রশংসা একমাত্র তাঁরই প্রাপ্য। কিন্তু কাফিররা এত বড় প্রমাণ দেখার পরও শিরকে লিপ্ত হয়।


(ক) الحمد এর অর্থ এবং ‘خلق’ ও ‘جعل’ এর পার্থক্য:
* الحمد এর অর্থ: আভিধানিক অর্থ হলো প্রশংসা করা, গুণগান গাওয়া। ইসলামি পরিভাষায়, ঐচ্ছিক ও ইচ্ছাকৃত কোনো সুন্দর গুণ বা অনুগ্রহের কারণে কারো মৌখিক প্রশংসা করাকে হামদ বলে। সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ তায়ালার জন্যই নির্দিষ্ট।
* ‘خلق’ (খালাক্বা) ও ‘جعل’ (জাআলা) এর পার্থক্য:
‘خلق’ অর্থ হলো কোনো কিছুকে পূর্বের কোনো অস্তিত্ব, নমুনা বা নকশা ছাড়াই একেবারে শূন্য থেকে নতুন করে সৃষ্টি করা। (যেমন আয়াতে আকাশ ও পৃথিবী শূন্য থেকে সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে ‘خلق’ ব্যবহৃত হয়েছে)। অন্যদিকে, ‘جعل’ অর্থ হলো পূর্বে সৃষ্টি করা কোনো বস্তুকে নতুন কোনো রূপ বা অবস্থায় পরিবর্তন করা বা স্থায়িত্ব দেওয়া। (যেমন আলো ও অন্ধকার শূন্য থেকে সৃষ্টি নয়, বরং এটি বিদ্যমান অবস্থার পরিবর্তন, তাই এর ক্ষেত্রে ‘جعل’ ব্যবহৃত হয়েছে)।

(খ) بالظلمات والنور (অন্ধকার ও আলো) দ্বারা উদ্দেশ্য (المراد):
আয়াতে ‘ظلمات’ (অন্ধকার) শব্দটি বহুবচন এবং ‘نور’ (আলো) শব্দটি একবচনে ব্যবহৃত হয়েছে। এর বাহ্যিক উদ্দেশ্য হলো রাতের অন্ধকার এবং দিনের আলো।
তবে মুফাসসিরদের মতে এর রূপক উদ্দেশ্য হলো- ‘ظلمات’ (অন্ধকার) দ্বারা কুফর, শিরক, বিদয়াত, অজ্ঞতা ও সকল প্রকার ভ্রষ্টতাকে বোঝানো হয়েছে। যেহেতু গোমরাহির বহু রূপ ও পথ রয়েছে, তাই এটি বহুবচনে এসেছে। আর ‘نور’ (আলো) দ্বারা ইমান, হেদায়েত ও সত্য ধর্ম ইসলামকে বোঝানো হয়েছে। যেহেতু হকের পথ বা সিরাতুল মুস্তাকিম কেবল একটিই, তাই এটি একবচনে এসেছে।

٢- قل إنى أخاف إن عصيت ربى عذاب يوم عظيم- من يصرف عنه يومئذ فقد رحمه وذلك الفوز المبين- وإن يمسسك الله بضر فلا كاشف له إلا هو وإن يمسسك بخير فهو على كل شىء قدير- وهو القاهر فوق عباده وهو الحكيم الخبير-
(الف) اعرب قوله تعالى : وهو القاهر فوق عباده-
(ب) اكتب أراء علماء المتكلمين بعصمة الأنبياء عليهم السلام مفصلا-

[(ক) আল্লাহ তায়ালার বাণী— وهو القاهر فوق عباده এর তারকীব কর।
(খ) নবিগণের নিষ্পাপ হওয়ার বিষয়ে তর্কশাস্ত্রবিদদের মতামত লেখ।]

আয়াতের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসির:
অনুবাদ: “বলুন, ‘আমি যদি আমার রবের অবাধ্য হই, তবে আমি এক ভয়ংকর দিনের শাস্তির ভয় করি।’ সেদিন যার থেকে তা (শাস্তি) সরিয়ে নেওয়া হবে, তার ওপর আল্লাহ সত্যিই রহম করেছেন। আর এটাই সুস্পষ্ট সাফল্য। আর আল্লাহ যদি তোমাকে কোনো কষ্টে ফেলেন, তবে তিনি ছাড়া তা দূর করার কেউ নেই। আর যদি তিনি তোমার কোনো কল্যাণ করেন, তবে তিনি তো সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান। আর তিনিই তাঁর বান্দাদের ওপর পূর্ণ পরাক্রমশালী এবং তিনিই প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ।”
তাফসির: এই আয়াতগুলোতে একত্ববাদের ওপর দৃঢ় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দুনিয়ায় ভালো-মন্দ, উপকার-ক্ষতি সবকিছু একমাত্র আল্লাহর হাতে, তাই ভয় ও আশা কেবল তাঁরই কাছে করতে হবে।


(ক) وهو القاهر فوق عباده এর তারকীব (الإعراب):
* وَ (ওয়াও): আতিফাহ (সংযোজক অব্যয়) অথবা ইস্তিনাফিয়াহ (নতুন বাক্য আরম্ভকারী)।
* هُوَ (হুয়া): যমীর মুনফাসিল (পৃথক সর্বনাম), মুবতাদা (উদ্দেশ্য)।
* الْقَاهِرُ (আল-ক্বাহির): ইসম ফায়েল, এটি মুবতাদার খবর (বিধেয়)।
* فَوْقَ (ফাওকা): জরফে মাকান (স্থানবাচক অব্যয়), যা মুযাফ হয়েছে।
* عِبَادِ (ইবাদি): মুযাফ ইলাইহি, আবার এটি নিজেও মুযাফ হয়েছে।
* هِ (হি): যমীর মুত্তাসিল (সংযুক্ত সর্বনাম), মুযাফ ইলাইহি।
(عِبَادِ মুযাফ তার هِ মুযাফ ইলাইহি মিলে فَوْقَ এর মুযাফ ইলাইহি হয়েছে। فَوْقَ عباده মিলে الْقَاهِرُ এর সাথে মুতাআল্লিক হয়েছে। অবশেষে মুবতাদা ও খবর মিলে জুমলায়ে ইসমিয়্যাহ খবরিয়্যাহ হয়েছে)।

(খ) নবীগণের নিষ্পাপ হওয়ার (عصمة الأنبياء) বিষয়ে মুতাকাল্লিমীনদের মতামত:
সকল ইসলামি দল ও তর্কশাস্ত্রবিদরা (علماء المتكلمين) এ বিষয়ে একমত যে, সকল নবী-রাসুলগণ নিষ্পাপ (মাসুম)। তবে গুনাহের ধরন অনুযায়ী বিস্তারিত মতামত নিম্নরূপ:
১. কুফর ও শিরক: নবুওয়াত প্রাপ্তির আগে এবং পরে, শিশু বা পূর্ণবয়স্ক সর্বাবস্থায় নবীরা কুফর ও শিরক থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও নিষ্পাপ।
২. কাবিরা গুনাহ (বড় পাপ): নবুওয়াতের আগে বা পরে তাঁরা ইচ্ছাকৃত বা ভুলবশত কোনো কাবিরা গুনাহ করতে পারেন না। এ ব্যাপারেও উম্মতের ইজমা রয়েছে।
৩. সগিরা গুনাহ (ছোট পাপ): ইচ্ছাকৃতভাবে সগিরা গুনাহ করা থেকেও তাঁরা সম্পূর্ণরূপে মাসুম। তবে ভুলবশত বা মানবিক কারণে কোনো ছোটখাটো ত্রুটি (زلّة বা পদস্খলন) হতে পারে, তবে আল্লাহ তায়ালা ওহির মাধ্যমে সাথে সাথে তাঁদের সতর্ক করে তা শুধরে দেন। সুতরাং তাঁরা সব ধরনের গুনাহ থেকে মাসুম ও পবিত্র।

٣- المص- كتاب أنزل اليك فلا يكن فى صدرك حرج منه لتنذر به وذكرى للمؤمنين- اتبعوا ما أنزل إليكم ولا تتبعوا من دونه أولياء قليلا ما تذكرون-
(الف) ما المراد بقوله تعالى : ‘ذكرى للمؤمنين’ فصل-
(ب) فسر قوله تعالى : ولا تتبعوا من دونه أولياء-

[(ক) ذكرى للمؤمنين দ্বারা উদ্দেশ্য কী? বর্ণনা কর।
(খ) ولا تتبعوا من دونه أولياء আয়াতাংশের তাফসির কর।]

আয়াতের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসির:
অনুবাদ: “আলিফ-লাম-মীম-সোয়াদ। এই কিতাব আপনার প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে, অতএব এটি দিয়ে সতর্ক করার ক্ষেত্রে আপনার অন্তরে যেন কোনো দ্বিধা-সংকোচ না থাকে এবং এটি মুমিনদের জন্য উপদেশস্বরূপ। তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তোমরা তার অনুসরণ করো এবং তাঁকে ছাড়া অন্য কোনো অভিভাবকদের অনুসরণ কোরো না। তোমরা খুব অল্পই উপদেশ গ্রহণ করে থাকো।”
তাফসির: সুরা আরাফের শুরুতে পবিত্র কুরআনের গুরুত্ব এবং এর অনুসরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাসুলকে (সা.) নির্ভয়ে আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


(ক) ‘ذكرى للمؤمنين’ (মুমিনদের জন্য উপদেশ) এর উদ্দেশ্য:
“যাতে এর মাধ্যমে আপনি সতর্ক করতে পারেন এবং এটি মুমিনদের জন্য উপদেশ হতে পারে।” এই আয়াতাংশে ‘ذكرى’ (উপদেশ) দ্বারা পবিত্র কুরআনকে বোঝানো হয়েছে। কুরআন সমগ্র মানবজাতির জন্য অবতীর্ণ হলেও এখানে বিশেষভাবে ‘মুমিনদের’ (للمؤمنين) কথা বলা হয়েছে। এর কারণ হলো, কাফির বা অহংকারীরা কুরআনের সতর্কবাণীতে কান দেয় না এবং তা থেকে কোনো শিক্ষা গ্রহণ করে না। কিন্তু কেবল মুমিনরাই কুরআন তিলাওয়াত করে, এর আয়াতগুলো নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করে, এর নির্দেশগুলো মেনে চলে এবং তা থেকে উপদেশ গ্রহণ করে নিজেদের জীবন পরিচালনা করে। তাই প্রকৃত অর্থে মুমিনরাই এর দ্বারা উপকৃত হয়।

(খ) ‘ولا تتبعوا من دونه أولياء’ আয়াতাংশের তাফসির:
“আর তোমরা তাঁকে (আল্লাহকে) ছাড়া অন্য কোনো অভিভাবক বা উপাস্যের অনুসরণ কোরো না।” এই আয়াতাংশে আল্লাহ তায়ালা মানবজাতিকে শিরক থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। এর তাফসির হলো, ইবাদত, আইন-কানুন এবং জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে একমাত্র আল্লাহর নাযিলকৃত বিধানের (অর্থাৎ আল-কুরআনের) অনুসরণ করতে হবে। আল্লাহকে বাদ দিয়ে কোনো পীর, দরবেশ, রাজনৈতিক নেতা বা দেব-দেবীকে এমন অভিভাবক বা মাবুদ হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না, যাদের নির্দেশ আল্লাহর নির্দেশের পরিপন্থি হয়। হালাল-হারাম নির্ধারণের একমাত্র মালিক আল্লাহ।

٤- ولقد مكناكم فى الارض وجعلناكم فيها معايش ، قليلا ما تشكرون- ولقد خلقنا كم ثم صورناكم ثم قلنا للملائكة اسجدوا لآدم فسجدوا إلا إبليس لم يكن من الساجدين-
(الف) ما محل إعراب قوله تعالى : ‘ما تشكرون’؟ بين-
(ب) ماذا تفهم عن ‘معايش’؟ بين-

[(ক) আল্লাহর বাণী ما تشكرون এর محل إعراب কী হয়েছে? বর্ণনা কর।
(খ) معايش দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে? বর্ণনা কর।]

আয়াতের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসির:
অনুবাদ: “আর আমি তোমাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করেছি এবং তাতে তোমাদের জন্য জীবনোপকরণ (জীবিকা) সৃষ্টি করেছি। তোমরা খুব অল্পই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। আর আমিই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, অতঃপর তোমাদের রূপ দান করেছি। তারপর আমি ফেরেশতাদের বললাম, ‘আদমকে সিজদা করো।’ তখন ইবলিস ছাড়া সবাই সিজদা করল; সে সিজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হলো না।”
তাফসির: এখানে মানুষকে দুনিয়ায় আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের কথা স্মরণ করানো হয়েছে। অতঃপর মানুষের আদি পিতা আদম (আ.) এর সৃষ্টি এবং ফেরেশতাদের সিজদা ও ইবলিসের অহংকারের ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে।


(ক) ‘ما تشكرون’ এর ই’রাবের অবস্থান (محل إعراب):
“قليلا ما تشكرون” (তোমরা খুব অল্পই শোকর আদায় করো)।
এখানে ‘قليلا’ শব্দটি মফউলে মুতলাক হিসেবে নসব (যবর) প্রাপ্ত। আর ‘ما’ (মা) শব্দটি জায়িদা (অতিরিক্ত) হিসেবে তাকীদ বা বাক্যে জোর প্রদান করার জন্য এসেছে। ‘تشكرون’ (তাশকরুন) হলো ফিয়েল মুযারে (বর্তমান/ভবিষ্যৎ কাল), যার মধ্যে ‘و’ (ওয়াও) যমীর ফায়েল (কর্তা) লুক্কায়িত রয়েছে। এই সম্পূর্ণ বাক্যটির ই’রাবগত অবস্থান হলো, এটি পূর্ববর্তী বাক্যের অবস্থার (হাল) বর্ণনা দিচ্ছে। অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদের পৃথিবীতে এত নিয়ামত দিয়েছেন, অথচ তোমাদের শোকর আদায় করার অবস্থা খুবই নগণ্য।

(খ) ‘معايش’ দ্বারা যা বোঝানো হয়েছে:
‘معايش’ (মা’আয়িশ) শব্দটি ‘معيشة’ (মা’ঈশাত) এর বহুবচন, যার অর্থ হলো জীবনোপকরণ, জীবিকার মাধ্যম বা বেঁচে থাকার সামগ্রী। আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলছেন যে, তিনি পৃথিবীতে মানুষের বেঁচে থাকার জন্য যাবতীয় উপকরণ সৃষ্টি করেছেন। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- কৃষিকাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য, ফলমূল, শস্য, পানীয় জল, খনিজ সম্পদ এবং পশুপাখি। আল্লাহ এই সবকিছুকে মানুষের আয়ত্তাধীন করে দিয়েছেন, যাতে মানুষ পৃথিবীতে সুস্থ ও সুন্দরভাবে জীবনযাপন করতে পারে এবং স্বাচ্ছন্দ্যে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে।

٥- انما المؤمنون الذين اذا ذكر الله وجلت قلوبهم ، واذا تليت عليهم اياته زادتهم ايمانا وعلى ربهم يتوكلون- الذين يقيمون الصلوة ومما رزقنا هم ينفقون-
(الف) ما الاختلاف فى القراءة خلف الامام؟ بين-
(ب) بين معنى قوله تعالى : ومما رزقنا هم ينفقون-

[(ক) ইমামের পিছনে কিরাআত পড়ার মতভেদ বর্ণনা কর।
(খ) ومما رزقنا هم ينفقون এর মর্মার্থ বর্ণনা কর।]

আয়াতের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসির:
অনুবাদ: “প্রকৃত মুমিন তো তারাই, যাদের সামনে আল্লাহর স্মরণ করা হলে তাদের অন্তর কেঁপে ওঠে, আর যখন তাদের সামনে তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করা হয়, তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে এবং তারা কেবল তাদের রবের ওপরই ভরসা করে। যারা নামাজ কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যে রিজিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে।”
তাফসির: সুরা আনফালের এই আয়াতগুলোতে প্রকৃত ও খাঁটি মুমিনদের মৌলিক গুণাবলি বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহর ভয়, ঈমানের দৃঢ়তা, তাওয়াক্কুল, নামাজ ও দানশীলতা হলো প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য।


(ক) ইমামের পেছনে কিরাত পড়ার বিষয়ে মতভেদ (الاختلاف فى القراءة خلف الامام):
জামায়াতে নামাজ পড়ার সময় ইমামের পেছনে মুক্তাদিরা সূরা ফাতিহা বা কিরাত পড়বে কি না, এ নিয়ে মুজতাহিদ ইমামদের মধ্যে তিনটি প্রধান মতভেদ রয়েছে:
১. ইমাম আবু হানিফা (রহ.): তাঁর মতে, জেহরি (সশব্দে) এবং সিররি (নিঃশব্দে) কোনো নামাজেই ইমামের পেছনে মুক্তাদির কিরাত পড়া জায়েজ নেই। ইমামের কিরাতই মুক্তাদির কিরাত হিসেবে গণ্য হবে। (এটি হানাফি মাজহাব)।
২. ইমাম শাফেয়ী (রহ.): তাঁর মতে, জেহরি এবং সিররি উভয় নামাজেই ইমামের পেছনে মুক্তাদিকে অবশ্যই সূরা ফাতিহা পড়তে হবে, অন্যথায় নামাজ হবে না।
৩. ইমাম মালেক ও ইমাম আহমদ (রহ.): তাঁদের মতে, জেহরি নামাজে (ফজর, মাগরিব, ইশা) মুক্তাদি কিরাত পড়বে না, চুপ করে শুনবে। তবে সিররি নামাজে (জোহর, আসর) মুক্তাদি কিরাত পড়বে।

(খ) “ومما رزقنا هم ينفقون” এর মর্মার্থ:
“আর আমি তাদের যে রিজিক দিয়েছি, তা থেকে তারা ব্যয় করে।” এটি হলো খাঁটি মুমিনদের একটি অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য। এর অর্থ হলো, মুমিন ব্যক্তি কৃপণ হয় না এবং আল্লাহর দেওয়া সম্পদ কেবল একাই ভোগ করে না। বরং আল্লাহ তাকে যে হালাল সম্পদ, জ্ঞান বা ক্ষমতা দিয়েছেন, তা থেকে সে আল্লাহর রাস্তায় (যাকাত, সদকা, জিহাদ) এবং গরিব-দুঃখী ও আত্মীয়-স্বজনদের সাহায্যে অকাতরে ব্যয় করে।

٦- يا ايها الذين امنوا اطيعوا الله ورسوله ولا تولوا عنه وانتم تسمعون- ولا تكونوا كالذين قالوا سمعنا وهم لا يسمعون- إن شر الدواب عند الله الصم البكم الذين لا يعقلون-
(الف) بين حكم اطاعة الله ورسوله وكيفيته-
(ب) حلل الألفاظ التالية : اطيعوا ، لا تولوا ، تسمعون-

[(ক) আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্যতার হুকুম ও পদ্ধতি বর্ণনা কর।
(খ) নিচের শব্দগুলোর বিশ্লেষণ কর: اطيعوا ، لا تولوا ، تسمعون]

আয়াতের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসির:
অনুবাদ: “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করো এবং শোনার পর তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না। আর তোমরা তাদের (মুনাফিকদের) মতো হয়ো না, যারা বলে ‘আমরা শুনেছি’, অথচ বাস্তবে তারা শোনে না (মান্য করে না)। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে নিকৃষ্টতম প্রাণী হলো সেইসব বধির ও বোবা, যারা কিছু বোঝে না (সত্য উপলব্ধি করে না)।”
তাফসির: এখানে মুমিনদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পরিপূর্ণ আনুগত্যের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যারা সত্য কথা শোনে না এবং মানে না, তাদেরকে পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট বলা হয়েছে।


(ক) আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্যের হুকুম ও পদ্ধতি:
* হুকুম: আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল (সা.) এর সম্পূর্ণ আনুগত্য (طاعة) করা প্রত্যেক মুমিনের ওপর ফরজ (অপরিহার্য)। এটি ইমানের মূল দাবি এবং জান্নাতে যাওয়ার চাবিকাঠি।
* পদ্ধতি (كيفيته): আল্লাহর আনুগত্যের পদ্ধতি হলো- পবিত্র কুরআনে আল্লাহ যা আদেশ করেছেন তা বিনা দ্বিধায় পালন করা এবং যা নিষেধ করেছেন তা সম্পূর্ণ বর্জন করা। আর রাসুলের আনুগত্যের পদ্ধতি হলো- তাঁর সুন্নাহ, হাদিস এবং জীবনাদর্শকে নিজের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মেনে নেওয়া। রাসুলের আনুগত্য ছাড়া আল্লাহর আনুগত্য কখনোই সম্ভব নয় এবং গ্রহণযোগ্যও নয়।

(খ) শব্দ বিশ্লেষণ (تحليل الألفاظ):
* اطيعوا (আতীউ): সিগাহ (বচন ও পুরুষ)- জমা মুজাক্কার হাযির, বহছ- আমরে হাযির মারুফ, বাব- افعال (ইফআল), মাদা (মূলক্ষর)- ط و ع (তোয়া-ওয়াও-আইন), অর্থ- তোমরা আনুগত্য করো।
* لا تولوا (লা-তাওয়াল্লাও): সিগাহ- জমা মুজাক্কার হাযির, বহছ- নহি হাযির মারুফ, বাব- تفعّل (তাফাউল), মাদা- و ل ى (ওয়াও-লাম-ইয়া), অর্থ- তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না।
* تسمعون (তাসমাউন): সিগাহ- জমা মুজাক্কার হাযির, বহছ- ইসবাত ফিয়েলে মুযারে মারুফ, বাব- سمع (সামিয়া), মাদা- س م ع (সিন-মীম-আইন), অর্থ- তোমরা শুনছ।

٧- كيف يكون للمشركين عهد عند الله وعند رسوله الا الذين عاهدتم عند المسجد الحرام فما استقاموا لكم فاستقيموا لهم ، ان الله يحب المتقين-
(الف) اكتب القصة المتعلقة بهذه الآية الكريمة-
(ب) من هم المشركون؟ ومن هم المتقون؟ بين-

[(ক) আয়াত সংশ্লিষ্ট ঘটনা বর্ণনা কর।
(খ) মুশরিক কারা এবং মুত্তাকি কারা? বর্ণনা কর।]

আয়াতের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসির:
অনুবাদ: “মুশরিকদের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের কাছে কোনো চুক্তি কীভাবে বলবৎ থাকতে পারে? তবে যাদের সাথে তোমরা মসজিদুল হারামের কাছে চুক্তি করেছিলে, যতক্ষণ তারা তোমাদের চুক্তির ওপর অটল থাকে, তোমরাও তাদের চুক্তির ওপর অটল থাকো। নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকিদের ভালোবাসেন।”
তাফসির: সুরা তাওবার এই আয়াতে বিশ্বাসঘাতক মুশরিকদের সাথে চুক্তি বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। তবে যারা চুক্তির মর্যাদা রক্ষা করেছে, মুসলমানদেরকেও তাদের সাথে চুক্তি রক্ষা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


(ক) আয়াত সংশ্লিষ্ট ঘটনা (القصة المتعلقة بالآية):
সুরা তাওবার এই আয়াতটি মক্কা বিজয়ের কিছুকাল পর নাজিল হয়। আরবের মুশরিকরা মুসলমানদের সাথে বারবার শান্তিচুক্তি (যেমন- হুদাইবিয়ার সন্ধি) করত এবং সুযোগ পেলেই তা ভঙ্গ করে মুসলমানদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করত। আল্লাহ তায়ালা এই আয়াতে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, যেসব মুশরিক চুক্তির মর্যাদা দেয় না, তাদের সাথে মুসলমানদের কোনো স্থায়ী চুক্তি থাকতে পারে না। তবে ব্যতিক্রম হলো, “মাসজিদুল হারামের কাছে” অর্থাৎ হুদাইবিয়াতে যেসব গোত্রের (যেমন- বনু কিনানা, বনু যামরা) সাথে চুক্তি হয়েছিল এবং যারা চুক্তির ওপর অটল থেকেছে ও বিশ্বাসঘাতকতা করেনি, মুসলমানদেরও নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে তাদের সাথে চুক্তির মেয়াদের শেষ দিন পর্যন্ত অটল থাকতে হবে।

(খ) মুশরিক ও মুত্তাকি কারা:
* المشركون (মুশরিক): যারা এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর সাথে অন্য কোনো ব্যক্তি, বস্তু, প্রতিমা বা দেব-দেবীকে ইবাদত, ক্ষমতা বা গুণের ক্ষেত্রে শরিক বা অংশীদার সাব্যস্ত করে, তাদেরকে মুশরিক বলা হয়। আয়াতে মক্কার মূর্তি পূজারীদের এবং বিশ্বাসঘাতকদের বোঝানো হয়েছে।
* المتقون (মুত্তাকি): যারা অন্তরে সর্বদা আল্লাহর ভয় রেখে যাবতীয় কুফর, শিরক ও গুনাহের কাজ থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখে এবং ওয়াদা বা চুক্তি কঠোরভাবে রক্ষা করে চলে, তাদেরকে মুত্তাকি বা পরহেজগার বলা হয়। আল্লাহ মুত্তাকিদের ভালোবাসেন।

٨- انما يعمر مساجد الله من أمن بالله واليوم الأخر واقام الصلوة وأتى الزكوة ولم يخش الا الله ، فعسى اولئك ان يكونوا من المهتدين-
(الف) بين أهمية المسجد فى الاجتماع الاسلامى-
(ب) ما معنى الزكوة؟ اكتب مصارفها مدللا-

[(ক) ইসলামি সমাজে মসজিদের গুরুত্ব বর্ণনা কর।
(খ) الزكوة অর্থ কী? এর খাতসমূহ দলিলসহ লেখ।]

আয়াতের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসির:
অনুবাদ: “নিশ্চয়ই কেবল তারাই আল্লাহর মসজিদসমূহ আবাদ করবে, যারা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান আনে, নামাজ কায়েম করে, যাকাত আদায় করে এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করে না। আশা করা যায়, তারাই হিদায়াতপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।”
তাফসির: এই আয়াতে মসজিদ আবাদকারী ও রক্ষণাবেক্ষণকারীদের পরিচয় এবং গুণাবলি বর্ণনা করা হয়েছে। মসজিদ কেবল ঈমানদার ও সৎকর্মশীলরাই আবাদ করে।


(ক) ইসলামি সমাজে মসজিদের গুরুত্ব:
ইসলামি সমাজে মসজিদ কেবল ইবাদত বা নামাজ পড়ার জায়গাই নয়, বরং এটি মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের প্রতীক ও সামাজিক কেন্দ্রবিন্দু। মহানবী (সা.) মদিনায় হিজরত করে প্রথমেই মসজিদে নববী নির্মাণ করেছিলেন। মসজিদ হলো মুসলিমদের শিক্ষাকেন্দ্র, সামাজিক সমস্যা সমাধানের আদালত, পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ ও সমতা সৃষ্টির স্থান (যেখানে রাজা-প্রজা, ধনী-গরিব এক কাতারে দাঁড়ায়) এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের মজলিস। মসজিদের আবাদকারী তারাই, যারা ইমানদার।

(খ) যাকাতের অর্থ এবং এর খাতসমূহ (مصارف الزكوة):
* الزكوة (যাকাত) এর অর্থ: আভিধানিক অর্থ পবিত্র হওয়া, বৃদ্ধি পাওয়া। পরিভাষায়: নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়ার পর এক বছর অতিবাহিত হলে, সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ (আড়াই শতাংশ) আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য গরিব-মিসকিনদের প্রদান করাকে যাকাত বলে।
* مصارف الزكوة (যাকাতের খাতসমূহ): পবিত্র কুরআনের সুরা তাওবার ৬০ নং আয়াতে যাকাত ব্যয়ের ৮টি সুনির্দিষ্ট খাত (مصارف) উল্লেখ করা হয়েছে।
দলিল: “إنما الصدقات للفقراء والمساكين والعاملين عليها والمؤلفة قلوبهم وفي الرقاب والغارمين وفي سبيل الله وابن السبيل”
অর্থাৎ, যাকাত হলো ১. ফকির (যার কিছুই নেই), ২. মিসকিন (যার আয় প্রয়োজনের তুলনায় কম), ৩. যাকাত আদায়কারী কর্মচারী, ۴. যাদের চিত্ত আকর্ষণ করা প্রয়োজন (নওমুসলিম), ৫. দাসমুক্তির জন্য, ৬. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি, ৭. আল্লাহর রাস্তায় (জিহাদ বা দ্বীনের কাজে) এবং ৮. মুসাফিরদের (বিপদে পড়া পথিক) জন্য।

٩- الر- تلك أيات الكتاب الحكيم- اكان للناس عجبا ان اوحينا الى رجل منهم ان انذر الناس وبشر الذين امنوا ان لهم قدم صدق عند ربهم ، قال الكافرون ان هذا لسحر مبين-
(الف) اين ومتى نزلت سورة ‘يونس’؟ بين وجه تسميتها-
(ب) ‘أوحينا الى رجل منهم’ اوضح هذه القطعة-

[(ক) কখন এবং কোথায় সুরা ইউনুস নাযিল হয়? এ নামে নামকরণের কারণ বর্ণনা কর।
(খ) ‘أوحينا الى رجل منهم’ আয়াতাংশটির ব্যাখ্যা কর।]

আয়াতের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসির:
অনুবাদ: “আলিফ-লাম-রা। এগুলো প্রজ্ঞাময় কিতাবের আয়াত। মানুষের কাছে কি এটা আশ্চর্যজনক মনে হয় যে, আমি তাদেরই মধ্য থেকে একজনের কাছে ওহি পাঠিয়েছি এই মর্মে যে, ‘আপনি মানুষকে সতর্ক করুন এবং যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে সুসংবাদ দিন যে, তাদের রবের কাছে তাদের জন্য উচ্চ মর্যাদা রয়েছে’? কাফিররা বলে, ‘নিশ্চয়ই এ ব্যক্তি এক প্রকাশ্য জাদুকর’।”
তাফসির: সুরা ইউনুসের শুরুতে মক্কার কাফিরদের একটি ভুল ধারণার খণ্ডন করা হয়েছে। তারা একজন সাধারণ মানুষের নবী হওয়াকে আশ্চর্য মনে করত এবং তাঁকে জাদুকর বলত।


(ক) সুরা ইউনুস নাজিলের স্থান, সময় ও নামকরণের কারণ:
* নাজিলের স্থান ও সময়: সুরা ইউনুস একটি মাক্কি সুরা। এটি হিজরতের পূর্বে মক্কি জীবনের শেষ ভাগে পবিত্র মক্কা নগরীতে নাজিল হয়। সে সময় মুসলমানদের ওপর কুরাইশদের অত্যাচার চরম সীমায় পৌঁছেছিল।
* وجه تسميتها (নামকরণের কারণ): এই সুরার ৯৮ নং আয়াতে হযরত ইউনুস (আ.) এবং তাঁর সম্প্রদায়ের ঘটনা অত্যন্ত চমৎকারভাবে বর্ণিত হয়েছে। ইউনুস (আ.) এর সম্প্রদায় আল্লাহর আজাব স্বচক্ষে দেখার পর ইমান এনেছিল এবং আল্লাহ তাদের ক্ষমা করেছিলেন, যা মানব ইতিহাসে বিরল। এই বিশেষ ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করেই সুরাটির নামকরণ করা হয়েছে ‘সুরা ইউনুস’।

(খ) “أوحينا الى رجل منهم” এর ব্যাখ্যা:
(অর্থ: তাদেরই মধ্য থেকে এক ব্যক্তির কাছে আমি ওহি পাঠিয়েছি)।
মক্কার কাফিররা অত্যন্ত আশ্চর্যবোধ করত যে, আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতা না পাঠিয়ে মক্কারই একজন সাধারণ মানুষ হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর ওপর কীভাবে ওহি নাজিল করতে পারেন! আল্লাহ তায়ালা তাদের এই ধারণার খণ্ডন করে বলছেন যে, এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। আল্লাহ যুগে যুগে মানুষের হিদায়াতের জন্য আসমান থেকে ফেরেশতা পাঠান না, বরং মানুষের মধ্য থেকেই (رجل منهم) একজনকে নবী হিসেবে মনোনীত করেন। কারণ একজন মানুষই মানুষের ভাষা বোঝেন এবং সাধারণ মানুষ নবীর জীবনের বাস্তব আদর্শ দেখে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।

١٠- ويقولون لولا أنزل عليه اية من ربه فقل انما الغيب لله فانتظروا انى معكم من المنتظرين-
(الف) اذكر القصة المتعلقة بالآية الكريمة-
(ب) ما معنى الغيب؟ هل يعلمه احد الا الله؟ بين-

[(ক) আয়াতে কারীমার সংশ্লিষ্ট কিচ্ছা বর্ণনা কর।
(খ) الغيب অর্থ কী? আল্লাহ ছাড়া অন্য কেহ উহা জানে কি? বর্ণনা কর।]

আয়াতের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসির:
অনুবাদ: “আর তারা বলে, ‘তার রবের পক্ষ থেকে তার কাছে কোনো (আমাদের চাহিদামতো) নিদর্শন নাজিল করা হলো না কেন?’ অতএব আপনি বলুন, ‘গায়েবের (অদৃশ্যের) জ্ঞান কেবল আল্লাহরই। সুতরাং তোমরা প্রতীক্ষা করো, আমিও তোমাদের সাথে প্রতীক্ষাকারীদের অন্তর্ভুক্ত রইলাম’।”
তাফসির: কাফিরদের অবান্তর মুজিজা দাবির উত্তরে আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন যে, মুজিজা ও অদৃশ্যের চাবিকাঠি একমাত্র আল্লাহর হাতে। আল্লাহ চাইলে আজাব দিতে পারেন।


(ক) আয়াত সংশ্লিষ্ট ঘটনা (القصة):
মক্কার কাফিররা মহানবী (সা.) এর কাছে ইমান আনার শর্ত হিসেবে বিভিন্ন অবান্তর ও অযৌক্তিক মুজিজা বা অলৌকিক নিদর্শন দাবি করত। তারা বলত, “যদি তিনি সত্য নবী হন, তবে কেন তাঁর রবের পক্ষ থেকে তাঁর ওপর সরাসরি ফেরেশতা নাজিল হচ্ছে না, বা তিনি কেন মক্কার পাহাড়কে সোনায় পরিণত করছেন না?” আল্লাহ তায়ালা তাদের এই হঠকারী দাবির উত্তরে রাসুলকে (সা.) বলতে নির্দেশ দিলেন যে, মুজিজা দেখানো বা অদৃশ্যের চাবিকাঠি একমাত্র আল্লাহর হাতে। আল্লাহ চাইলে মুজিজা দেখাতে পারেন, আর না চাইলে নয়। তোমরা যদি ইমান না এনে আল্লাহর আজাবের অপেক্ষা করো, তবে আমিও তোমাদের পরিণামের অপেক্ষায় রইলাম।

(খ) الغيب (গায়েব) এর অর্থ এবং এর জ্ঞান:
* معنى الغيب (গায়েবের অর্থ): গায়েব অর্থ হলো অদৃশ্য, গুপ্ত বা এমন বিষয় যা মানুষের পঞ্চ ইন্দ্রিয় (চোখ, কান ইত্যাদি) দ্বারা উপলব্ধি করা যায় না এবং মানুষের সাধারণ জ্ঞানের অতীত। যেমন- কিয়ামত কবে হবে, মাতৃগর্ভে কী আছে, মানুষ আগামীকাল কী খাবে ইত্যাদি।
* গায়েবের জ্ঞান কি আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে?: ইসলামি আকিদা অনুযায়ী, ইলমে গায়েব বা অদৃশ্যের সম্পূর্ণ ও স্বাধীন জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তায়ালারই রয়েছে। আল্লাহ ছাড়া কোনো ফেরেশতা, জিন, নবী বা অলি স্বাধীনভাবে গায়েব জানেন না। তবে আল্লাহ তায়ালা তাঁর ওহির মাধ্যমে তাঁর মনোনীত রাসুলদেরকে যতটুকু গায়েবের সংবাদ জানান, তাঁরা ঠিক ততটুকুই জানতে পারেন। (দলিল: “তিনি তাঁর অদৃশ্যের জ্ঞান কারো কাছে প্রকাশ করেন না, তবে তাঁর মনোনীত রাসুল ছাড়া”- সুরা জিন: ২৬-২৭)।

مجموعة (ب) [খ-বিভাগ: সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন]

١١- اكتب نبذة عن حياة محمد على الصابونى وخصائص تفسيره ‘صفوة التفاسير’-

[১১. মুহাম্মদ আলী আস-সাবুনীর জীবনী ও তার صفوة التفاسير এর বৈশিষ্ট্যসমূহ লেখ।]

শাইখ মুহাম্মদ আলী আস-সাবুনীর জীবনী:
শাইখ মুহাম্মদ আলী আস-সাবুনী (রহ.) ছিলেন বর্তমান যুগের (বিংশ শতাব্দীর) অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুফাসসির, ইসলামিক স্কলার ও সিরিয়ার বিখ্যাত আলেম। তিনি ১৯৩০ সালে সিরিয়ার আলেপ্পো (হালাব) শহরে এক সম্ভ্রান্ত ও ইলমি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছোটবেলাতেই পবিত্র কুরআন মুখস্থ করেন এবং তাঁর পিতা শাইখ জামিল আস-সাবুনীর কাছে আরবি ও শরিয়তের প্রাথমিক জ্ঞান লাভ করেন। এরপর তিনি মিশরের বিখ্যাত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শরিয়াহ অনুষদে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি দীর্ঘ প্রায় ২৮ বছর পবিত্র মক্কা নগরীর ‘উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে’ তাফসীর ও উলূমুল কুরআন বিষয়ে অধ্যাপনা করেন। মুসলিম বিশ্বের এই মহান পণ্ডিত ২০২১ সালে ইন্তেকাল করেন।

‘সাফওয়াতুত তাফাসীর’ (صفوة التفاسير) এর বৈশিষ্ট্যসমূহ:
তাঁর রচিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘সাফওয়াতুত তাফাসীর’ সর্বাধিক জনপ্রিয়। এর বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
১. এটি পূর্ববর্তী বিখ্যাত তাফসীরগুলোর (যেমন- তাফসিরে তাবারী, ইবনে কাসির, কুরতুবী ও আলুসী) একটি চমৎকার ও নির্ভরযোগ্য নির্যাস বা সারসংক্ষেপ।
২. এর ভাষা অত্যন্ত সহজ, সাবলীল এবং আধুনিক, যা সাধারণ পাঠক থেকে শুরু করে আলেম সবার জন্যই সুখপাঠ্য।
৩. এতে প্রতিটি সুরার শুরুতে সুরার মূল প্রতিপাদ্য বিষয়, নামকরণের কারণ এবং আয়াতগুলোর মধ্যে যোগসূত্র সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছে।
৪. কঠিন শব্দগুলোর চমৎকার শাব্দিক বিশ্লেষণ এবং আয়াতের শানে নুযূল উল্লেখ করা হয়েছে।
৫. এতে বাতিল ও বিভ্রান্তিকর মতবাদগুলো বর্জন করে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের সঠিক আকিদা তুলে ধরা হয়েছে।

١٢- عرف التفسير والتأويل ثم بين خصائص التفسير المعاصر والتفسير القديم بالتفصيل-

[১২. التفسير এবং التأويل এর সংজ্ঞা দাও। অতঃপর আধুনিক তাফসির ও প্রাচীন তাফসির এর বৈশিষ্ট্যসমূহ বর্ণনা কর।]

তাফসির (التفسير) এবং তাবিল (التأويل) এর সংজ্ঞা:
* التفسير (তাফসির): তাফসির শব্দের আভিধানিক অর্থ- উন্মুক্ত করা, প্রকাশ করা, ব্যাখ্যা করা। পরিভাষায়- যে শাস্ত্রের মাধ্যমে পবিত্র কুরআন নাজিলের প্রেক্ষাপট, আয়াতের শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ, শানে নুযূল এবং এর অন্তর্নিহিত হুকুম-আহকাম ও বিধিবিধানগুলো সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হয়, তাকে ইলমুত তাফসির বলে। এটি মূলত স্পষ্ট ও সরাসরি ব্যাখ্যা।
* التأويل (তাবিল): তাবিল শব্দের আভিধানিক অর্থ- প্রত্যাবর্তিত হওয়া, শেষ পরিণতি বা রূপক অর্থ। পরিভাষায়- কোনো আয়াতের বাহ্যিক অর্থের বাইরে গিয়ে, আয়াতের মূল উদ্দেশ্য ও গভীর অর্থের দিকে ইঙ্গিত করাকে তাবিল বলে। এটি মূলত রূপক বা ইশারাভিত্তিক ব্যাখ্যা।

প্রাচীন তাফসির (التفسير القديم) এর বৈশিষ্ট্যসমূহ:
১. প্রাচীন তাফসিরগুলো (যেমন- তাফসিরে তাবারী) মূলত ‘তাফসির বিল মাছুর’ বা বর্ণনাভিত্তিক ছিল, যেখানে আয়াতের ব্যাখ্যায় প্রচুর হাদিস ও সাহাবিদের উক্তি উদ্ধৃত করা হতো।
২. এতে বর্ণনাকারীদের দীর্ঘ সনদ বা সূত্র উল্লেখ করা হতো।
৩. ইসরাইলি রেওয়ায়াত বা ইহুদি-খ্রিস্টানদের বিভিন্ন কল্পকাহিনির অনুপ্রবেশ বেশি ঘটেছিল।
৪. এতে আরবি ব্যাকরণ (নাহু-সরফ) এবং বিভিন্ন কিরাতের ওপর অত্যধিক জোর দেওয়া হতো।

আধুনিক তাফসির (التفسير المعاصر) এর বৈশিষ্ট্যসমূহ:
১. আধুনিক যুগের তাফসিরগুলোতে (যেমন- তাফসিরে ফি জিলালিল কুরআন) দীর্ঘ সনদ বর্জন করে সরাসরি মূল ব্যাখ্যার ওপর ফোকাস করা হয়েছে, যাতে পাঠকের সময় বাঁচে।
২. ইসরাইলি রেওয়ায়াতগুলোকে কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করে বর্জন করা হয়েছে।
৩. আধুনিক বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আবিষ্কারের আলোকে কুরআনের আয়াতগুলোর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা (التفسير العلمي) দেওয়া হয়েছে।
৪. সমসাময়িক রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোর বাস্তবভিত্তিক সমাধান কুরআনের আলোকে তুলে ধরা হয়েছে।

Follow Our Facebook Page
দ্রুত নতুন বই পেতে যুক্ত থাকুন
Follow Now