At-Tafsir Bidunis Sanad (আত-তাফসীর বিদূনিস সানাদ) 201201 – Fazil Hons Al Quran 2nd Year 2022 QnA

Join Our Telegram Channel
দ্রুত নতুন বই পেতে যুক্ত থাকুন
Join Now
admin
at tafsir bidunis sanad 201201 fazil hons al quran 2nd year 2022 qna
Join Our WhatsApp Channel
দ্রুত নতুন বই পেতে যুক্ত থাকুন
Join Now
📋 সূচিপত্র (Table of Contents)

At-Tafsir Bidunis Sanad (Code: 201201) – ২০২২ প্রশ্ন ও উত্তর

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২২ এর আল-কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের التفسير بدون السند (আত-তাফসীর বিদূনিস সানাদ) বিষয়ের সম্পূর্ণ উত্তরমালা।

বিঃদ্রঃ পরীক্ষার্থীদের আগামী পরীক্ষার সর্বোচ্চ প্রস্তুতির সুবিধার্থে মূল প্রশ্নপত্রের ক ও খ উভয় বিভাগের বিকল্প সবগুলোর (অথবা) প্রশ্নের ১০০% নির্ভুল ও তথ্যবহুল উত্তর বিস্তারিতভাবে নিচে দেওয়া হলো।

مجموعة (أ) [ক-বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্ন]

١- قال الله تبارك تعالى : الحمد لله رب العالمين- الرحمن الرحيم- مالك يوم الدين- اياك نعبد واياك نستعين-
(الف) ما معنى الرحمن والرحيم؟ وما الفرق بينهما؟
(ب) كم قراءة فى قول : مالك يوم الدين؟ بين-

[(ক) الرحمن এবং الرحيم এর অর্থ কী? এ দুটির মধ্যে পার্থক্য কী?
(খ) مالك يوم الدين এর মধ্যে কয়টি قراءة (কিরাত) রয়েছে? বর্ণনা কর।]

আয়াতের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসির:
অনুবাদ: “যাবতীয় প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। যিনি অনন্ত করুণাময়, পরম দয়ালু। যিনি বিচার দিনের মালিক। আমরা একমাত্র আপনারই ইবাদত করি এবং শুধুমাত্র আপনারই সাহায্য প্রার্থনা করি।”
তাফসির: সুরা ফাতিহার এই আয়াতগুলোতে আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদ, তাঁর অসীম রহমত এবং কিয়ামতের দিনের একচ্ছত্র আধিপত্যের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। বান্দা এখানে স্বীকার করে যে, সে কেবল আল্লাহর ইবাদত করে এবং সকল প্রয়োজনে কেবল তাঁরই কাছে সাহায্য চায়।


(ক) الرحمن ও الرحيم এর অর্থ এবং পার্থক্য:
‘الرحمن’ (আর-রহমান) এবং ‘الرحيم’ (আর-রহীম) উভয় শব্দই আরবি ‘رحمة’ (রহমত বা দয়া) মূলধাতু থেকে নির্গত মুবালাগার সিগাহ (অধিক্যবাচক শব্দ)।
পার্থক্য:
* الرحمن (আর-রহমান): এর অর্থ হলো পরম দয়াময়। আল্লাহর এই রহমত বা দয়া অত্যন্ত ব্যাপক। এর দ্বারা দুনিয়াতে মুমিন, কাফির, পশুপাখি নির্বিশেষে সকল সৃষ্টির প্রতি আল্লাহর অসীম দয়াকে বোঝায়।
* الرحيم (আর-রহীম): এর অর্থ হলো অতি দয়ালু। আল্লাহর এই রহমত বা দয়া হলো নির্দিষ্ট। এর দ্বারা পরকালে (আখিরাতে) কেবল মুমিন বা ইমানদারদের প্রতি আল্লাহর বিশেষ দয়া ও অনুগ্রহকে বোঝায়।

(খ) ‘مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ’ এর قراءة (কিরাত):
এই আয়াতাংশের ‘مالك’ শব্দটিতে দুটি বিশুদ্ধ ও বিখ্যাত কিরাত বা পঠনপদ্ধতি রয়েছে:
১. ‘مَالِكِ’ (মালিক): মীম অক্ষরে আলিফ যোগে পড়া। এটি আসিম ও কিসায়ি (রহ.) এর কিরাত। এর অর্থ হলো- মালিক বা স্বত্বাধিকারী।
২. ‘مَلِكِ’ (মালিক): মীম অক্ষরে আলিফ ছাড়া পড়া। এটি অন্যান্য অধিকাংশ কারিদের কিরাত। এর অর্থ হলো- বাদশাহ বা অধিপতি।
উভয় কিরাতই সহিহ এবং এর দ্বারা বোঝায় যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালাই একমাত্র মালিক ও একচ্ছত্র অধিপতি হবেন।

٢- قال الله تعالى : ومن الناس من يقول أمنا بالله وباليوم الاخر وماهم بمؤمنين- يخادعون الله والذين أمنوا وما يخدعون الا انفسهم وما يشعرون- فى قلوبهم مرض فزاد هم الله مرضا ولهم عذاب اليم بما كانوا يكذبون-
(الف) من هم المنافقون؟ بين-
(ب) ما معنى الخداع لغة وشرعا؟

[(ক) মুনাফিক কারা? বর্ণনা কর।
(খ) الخداع এর শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ কী?]

আয়াতের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসির:
অনুবাদ: “আর মানুষের মধ্যে কিছু লোক এমন আছে যারা বলে, ‘আমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান এনেছি’, অথচ তারা মোটেও ঈমানদার নয়। তারা আল্লাহকে এবং মুমিনদেরকে ধোঁকা দিতে চায়। কিন্তু বাস্তবে তারা নিজেদের ছাড়া অন্য কাউকেই ধোঁকা দিচ্ছে না, অথচ তারা তা উপলব্ধি করতে পারছে না। তাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে, অতঃপর আল্লাহ তাদের সেই ব্যাধি আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন। আর তাদের মিথ্যাচারের কারণে তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।”
তাফসির: এই আয়াতগুলোতে মদিনার মুনাফিকদের চরিত্র উন্মোচন করা হয়েছে। তারা মুখে ঈমানের দাবি করলেও অন্তরে কুফর লালন করত। তারা মনে করত এভাবে আল্লাহ ও মুমিনদের ধোঁকা দেওয়া যাবে, কিন্তু এতে তাদের নিজেদেরই ক্ষতি হচ্ছে।


(ক) المنافقون (মুনাফিক) কারা:
‘মুনাফিক’ শব্দটি ‘নিফাক’ থেকে এসেছে, যার অর্থ দ্বিমুখী আচরণ বা কপটতা। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়, ওই সমস্ত লোককে মুনাফিক বলা হয়, যারা মুখে বা প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণের দাবি করে এবং নিজেদের মুমিন বলে পরিচয় দেয়, কিন্তু তাদের অন্তরে কুফর, শিরক বা অবিশ্বাস লুকিয়ে রাখে। মদিনায় হিজরতের পর এদের আত্মপ্রকাশ ঘটে এবং আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ছিল এই মুনাফিকদের সর্দার। তারা মূলত মুসলিমদের ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করত এবং ইসলামের ক্ষতি সাধনে লিপ্ত ছিল।

(খ) الخداع (খিদায়া) এর অর্থ:
* শাব্দিক অর্থ (لغة): الخداع শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো প্রতারণা করা, ধোঁকা দেওয়া, ছলনা করা বা চাতুরী করা।
* পারিভাষিক অর্থ (شرعاً): শরিয়তের পরিভাষায়, الخداع হলো কারো সামনে এমন কোনো ভালো বা সুন্দর জিনিস প্রকাশ করা কিংবা এমন সাধু আচরণ করা, যা তার অন্তরের আসল খারাপ উদ্দেশ্য বা অবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীত; যাতে অপর ব্যক্তি বিভ্রান্ত হয় বা ধোঁকায় পড়ে। মুনাফিকরা মুখে ইমানের দাবি করে আল্লাহ ও মুমিনদের সাথে এ ধরনের প্রতারণাই করতে চেয়েছিল।

٣- واذا قيل لهم لا تفسدوا فى الارض قالوا انما نحن مصلحون- الا انهم هم المفسدون ولكن لا يشعرون- واذا قيل لهم أمنوا كما امن الناس قالوا انؤمن كما امن السفهاء ، الا انهم هم السفهاء ولكن لا يعلمون-
(الف) ما معنى الايمان لغة وشرعا؟ بين مفصلا-
(ب) ما معنى المفسدون وما المراد بالمفسدون-

[(ক) الايمان এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ কী? বিস্তারিত বর্ণনা কর।
(খ) المفسدون অর্থ কী? المفسدون দ্বারা উদ্দেশ্য কী?]

আয়াতের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসির:
অনুবাদ: “আর যখন তাদেরকে বলা হয়, ‘তোমরা পৃথিবীতে ফাসাদ (বিপর্যয়) সৃষ্টি কোরো না’, তখন তারা বলে, ‘আমরা তো কেবল শান্তিস্থাপনকারী।’ সাবধান! নিশ্চয়ই তারাই ফাসাদ সৃষ্টিকারী, কিন্তু তারা তা উপলব্ধি করতে পারে না। আর যখন তাদেরকে বলা হয়, ‘অন্যান্য মানুষের (সাহাবিদের) মতো তোমরাও ঈমান আনো’, তখন তারা বলে, ‘আমরা কি নির্বোধদের মতো ঈমান আনব?’ সাবধান! নিশ্চয়ই তারাই হলো নির্বোধ, কিন্তু তারা তা জানে না।”
তাফসির: এখানে মুনাফিকদের অহংকার ও আত্মপ্রবঞ্চনার কথা বলা হয়েছে। তারা নিজেদের চক্রান্তকে ভালো কাজ বলে দাবি করত এবং সাহাবিদেরকে বোকা মনে করত। আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন যে তারাই প্রকৃত ফাসাদকারী এবং নির্বোধ।


(ক) الايمان (ইমান) এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ:
* আভিধানিক অর্থ (لغة): ইমান শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো বিশ্বাস স্থাপন করা, স্বীকৃতি দেওয়া, নিরাপত্তা দেওয়া বা ভয় থেকে মুক্ত করা।
* পারিভাষিক অর্থ (شرعاً): আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের মতে, ইমান হলো তিনটি বিষয়ের সমন্বয়: ১. অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা (التصديق بالقلب), ২. মুখে তা স্বীকার করা (الإقرار باللسان) এবং ৩. অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে সে অনুযায়ী আমল করা (العمل بالأركان)। অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা, তাঁর ফেরেশতাগণ, আসমানি কিতাবসমূহ, নবী-রাসুলগণ, পরকাল এবং তাকদীরের ভালো-মন্দের ওপর নিঃসংশয়ে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করাই হলো ইমান।

(খ) المفسدون এর অর্থ ও উদ্দেশ্য:
* অর্থ: المفسدون শব্দটি মিম-ফা-সিন-দাল মূলক্ষর থেকে গঠিত, যার অর্থ হলো ফাসাদ বা বিপর্যয় সৃষ্টিকারী, বিশৃঙ্খলাকারী বা অশান্তি রচনাকারী।
* উদ্দেশ্য (المراد): উল্লেখিত আয়াতে ‘المفسدون’ দ্বারা মদিনার মুনাফিকদের বোঝানো হয়েছে। কারণ তারা প্রকাশ্যে মুসলিম সেজে এবং গোপনে কাফির ও ইহুদিদের সাথে বন্ধুত্ব করে সমাজে অশান্তি ও ফিতনা সৃষ্টি করত। তারা নিজেদের এই ধ্বংসাত্মক কাজকে সংস্কার বা ভালো কাজ (مصلحون) বলে দাবি করত, কিন্তু আল্লাহ তাদের আসল চেহারা উন্মোচন করে জানিয়ে দিয়েছেন যে তারাই প্রকৃত ফাসাদ সৃষ্টিকারী।

٤- قوله تعالى : الم- الله لا اله الا هو الحى القيوم- نزل عليك الكتاب بالحق مصدقا لما بين يديه وانزل التوراة والانجيل-
(الف) ما الفرق بين نزل وأنزل؟ بين-
(ب) ما معنى الاسم الأعظم؟ وما هو؟ فصل-

[(ক) نزل ও أنزل এর মধ্যে পার্থক্য কী? বর্ণনা কর।
(খ) الإسم الأعظم অর্থ কী? সেটা কী? বর্ণনা কর।]

আয়াতের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসির:
অনুবাদ: “আলিফ-লাম-মীম। আল্লাহ, তিনি ব্যতীত অন্য কোনো (সত্য) উপাস্য নেই; তিনি চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারক। তিনি আপনার প্রতি সত্যসহ এই কিতাব (কুরআন) অবতীর্ণ করেছেন, যা পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সত্যায়নকারী এবং তিনিই তাওরাত ও ইঞ্জিল অবতীর্ণ করেছিলেন।”
তাফসির: সুরা আলে ইমরানের এই আয়াতগুলোতে আল্লাহর তাওহিদ বা একত্ববাদের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, কুরআন হলো সত্য কিতাব যা আগের আসমানি কিতাবগুলোকে সত্যায়ন করে।


(ক) نزل (নাযযালা) এবং أنزل (আনযালা) এর মধ্যে পার্থক্য:
আরবি ব্যাকরণ অনুযায়ী উভয় শব্দের মূল অর্থ ‘অবতীর্ণ করা’ হলেও এদের প্রয়োগে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে:
* نَزَّلَ (নাযযালা): এটি বাবে ‘তাফয়ীল’ এর সিগাহ। এটি ব্যবহৃত হয় কোনো কিছু ধীরে ধীরে, ধাপে ধাপে বা পর্যায়ক্রমে নাজিল হওয়ার ক্ষেত্রে। আয়াতে আল-কুরআনের ক্ষেত্রে ‘نزل’ ব্যবহৃত হয়েছে, কারণ কুরআন একবারে নাজিল হয়নি, বরং সুদীর্ঘ ২৩ বছর ধরে প্রয়োজন অনুযায়ী ধাপে ধাপে নাজিল হয়েছে।
* أَنْزَلَ (আনযালা): এটি বাবে ‘ইফআল’ এর সিগাহ। এটি ব্যবহৃত হয় কোনো কিছু একবারে বা পূর্ণাঙ্গরূপে অবতীর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে। আয়াতে তাওরাত ও ইঞ্জিলের ক্ষেত্রে ‘أنزل’ ব্যবহৃত হয়েছে, কারণ পূর্ববর্তী এই কিতাবগুলো নবীগণের ওপর একবারে বা একসাথে নাজিল হয়েছিল।

(খ) الاسم الأعظم (ইসমে আজম) এর অর্থ ও পরিচয়:
* অর্থ: ‘ইসম’ অর্থ নাম, আর ‘আজম’ অর্থ সর্বশ্রেষ্ঠ। সুতরাং ইসমে আজম অর্থ হলো আল্লাহ তায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ নাম।
* সেটা কী: হাদিস শরিফে এসেছে, আল্লাহ তায়ালার এমন কিছু বিশেষ ও সুমহান নাম রয়েছে, যে নাম ধরে ডাকলে বা দোয়া করলে আল্লাহ তায়ালা তা অবশ্যই কবুল করেন এবং চাওয়া পূর্ণ করেন। নির্দিষ্ট করে ইসমে আজম কোনটি তা নিয়ে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে অধিকাংশ মুফাসসির ও হাদিস বিশারদদের মতে, ‘اللَّهُ’ (আল্লাহ), ‘الْحَيُّ الْقَيُّومُ’ (আল-হাইয়্যুল কাইয়্যুম), এবং ‘الرَّحْمٰنُ الرَّحِيمُ’ (আর-রহমানুর রহীম) নামগুলোই হলো ইসমে আজম। (উল্লেখিত আয়াতেও ‘আল-হাইয়্যুল কাইয়্যুম’ রয়েছে)।

٥- قد كان لكم اية فى فئتين التقتا ، فئة تقاتل فى سبيل الله واخرى كافرة يرونهم مثليهم رأى العين ، والله يؤيد بنصره من يشاء ، ان فى ذلك لعبرة لاولى الأبصار-
(الف) ما المراد بقوله تعالى: “قد كان لكم آية فى فئتين”-
(ب) اكتب قصة غزوة بدر-

[(ক) “قد كان لكم آية فى فئتين” আয়াতাংশের মর্মার্থ কী?
(খ) বদর যুদ্ধের ঘটনাটি লেখ।]

আয়াতের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসির:
অনুবাদ: “নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য পরস্পর সম্মুখীন হওয়া দুটি দলের মধ্যে নিদর্শন ছিল। একটি দল যুদ্ধ করছিল আল্লাহর পথে, আর অপর দলটি ছিল কাফির। কাফিররা মুমিনদেরকে (তাদের নিজেদের সংখ্যার) দ্বিগুণ দেখছিল। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা স্বীয় সাহায্য দ্বারা শক্তিশালী করেন। নিশ্চয়ই এর মধ্যে দৃষ্টিসম্পন্নদের জন্য একটি বড় শিক্ষা রয়েছে।”
তাফসির: এই আয়াতে বদর যুদ্ধের ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে, যেখানে মুমিনদের সংখ্যা অনেক কম থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর সাহায্যে কাফিরদের বিরুদ্ধে তারা বিজয় লাভ করেছিল।


(ক) আয়াতাংশের মর্মার্থ (المراد):
“নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য দুটি দলের মুখোমুখি হওয়ার মধ্যে সুস্পষ্ট নিদর্শন রয়েছে”- এই আয়াতাংশে ‘দুটি দল’ (فئتين) বলতে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুমিনদের দল এবং কাফির কুরাইশদের দলকে বোঝানো হয়েছে। আর ‘নিদর্শন’ (আয়া) হলো- মাত্র ৩১৩ জনের একটি ছোট ও প্রায় নিরস্ত্র মুসলিম দল কীভাবে আল্লাহর সাহায্যে ১০০০ জনের বিশাল ও সুসজ্জিত কাফির বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেছিল। এটি মক্কার ইহুদি ও কাফিরদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা ছিল যে, সত্যের বিজয় সুনিশ্চিত।

(খ) গাযওয়ায়ে বদরের ঘটনা (قصة غزوة بدر):
২য় হিজরির ১৭ রমজান মদিনার অদূরে ‘বদর’ নামক প্রান্তরে সত্য ও মিথ্যার এই ঐতিহাসিক যুদ্ধটি সংঘটিত হয়। সিরিয়া থেকে আগত আবু সুফিয়ানের বাণিজ্য কাফেলা রক্ষার অজুহাতে মক্কার কুরাইশরা আবু জাহলের নেতৃত্বে ১০০০ সুসজ্জিত সৈন্য নিয়ে মদিনা আক্রমণ করতে আসে। সংবাদ পেয়ে মহানবী (সা.) মাত্র ৩১৩ জন (মতান্তরে ৩১৪ জন) সাহাবি এবং অতি সামান্য অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বদর প্রান্তরে তাদের মোকাবিলা করেন।
যুদ্ধ শুরু হলে আল্লাহর বিশেষ সাহায্যে আসমান থেকে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয়ে মুসলিমদের পক্ষে যুদ্ধ করেন। ফলে কাফির বাহিনী চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। এই যুদ্ধে আবু জাহল, উতবা, শায়বাসহ মক্কার শীর্ষ ৭০ জন কাফির নেতা নিহত হয় এবং ৭০ জন বন্দি হয়। অন্যদিকে মাত্র ১৪ জন মুসলিম সাহাবি শহীদ হন। বদরের এই বিজয় আরবে মুসলিমদের রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে।

٦- يوصيكم الله فى اولادكم للذكر مثل حظ الانثيين ، فان كن نساء فوق اثنتين فلهن ثلثا ما ترك ، وان كانت واحدة فلها النصف ، ولابويه لكل واحد منهما السدس مما ترك ان كان له ولد فان لم يكن له ولد وورثه ابواه فلامه الثلث فان كان له اخوة فلامه السدس من بعد وصية يوصى بها او دين ، اباؤكم وابناؤكم ، لا تدرون ايهم اقرب لكم نفعا ، فريضة من الله ، ان الله كان عليما حكيما-
(الف) بين ميراث الوالدين-
(ب) ماذا نصيب البنات؟ بين-

[(ক) পিতামাতার মিরাস সম্পর্কে বর্ণনা কর।
(খ) কন্যাদের অংশ কী? বর্ণনা কর।]

আয়াতের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসির:
অনুবাদ: “আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের (উত্তরাধিকারের) ব্যাপারে নির্দেশ দিচ্ছেন: এক পুত্রের অংশ দুই কন্যার অংশের সমান। কিন্তু কন্যারা যদি দুজন বা তার বেশি হয়, তবে তারা মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ পাবে; আর যদি কেবল একজন কন্যা হয়, তবে সে অর্ধেক পাবে। আর মৃত ব্যক্তির যদি কোনো সন্তান থাকে, তবে তার পিতা-মাতা উভয়ের প্রত্যেকে এক-ষষ্ঠাংশ পাবে। আর যদি তার কোনো সন্তান না থাকে এবং কেবল পিতা-মাতা উত্তরাধিকারী হয়, তবে তার মাতা পাবে এক-তৃতীয়াংশ। কিন্তু যদি তার একাধিক ভাই-বোন থাকে, তবে তার মাতা পাবে এক-ষষ্ঠাংশ। (এই বণ্টন কার্যকর হবে) মৃত ব্যক্তির করা ওসিয়ত পূরণ অথবা ঋণ পরিশোধের পর। তোমাদের পিতা ও পুত্রদের মধ্যে কে তোমাদের বেশি উপকারে আসবে তা তোমরা জানো না। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত বিধান। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।”
তাফসির: সুরা নিসার এই আয়াতে ইসলামি শরিয়তের ফরায়েজ বা উত্তরাধিকার সম্পত্তি বণ্টনের মৌলিক ও বিস্তারিত আইন বর্ণনা করা হয়েছে।


(ক) পিতা-মাতার মিরাস বা উত্তরাধিকার (ميراث الوالدين):
সুরা নিসার উল্লেখিত আয়াত অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির সম্পত্তিতে পিতা-মাতার মিরাস তিনটি অবস্থার ওপর নির্ভরশীল:
১. মৃত ব্যক্তির যদি কোনো সন্তান (পুত্র বা কন্যা) বা পুত্রের সন্তান থাকে, তবে পিতা এবং মাতা প্রত্যেকেই মোট সম্পত্তির এক-ষষ্ঠাংশ (১/৬) করে পাবে।
২. মৃত ব্যক্তির যদি কোনো সন্তান না থাকে এবং কোনো ভাই-বোনও না থাকে, তবে মাতা পাবে এক-তৃতীয়াংশ (১/৩), আর পিতা ‘আসাবা’ (অবশিষ্টাংশভোগী) হিসেবে বাকি সম্পূর্ণ অংশ পাবে।
৩. মৃত ব্যক্তির যদি কোনো সন্তান না থাকে, কিন্তু একাধিক ভাই বা বোন থাকে (चाहे আপন, সৎ বা বৈমাত্রেয়), তবে মাতা পাবে এক-ষষ্ঠাংশ (১/৬), আর পিতা বাকি অংশ পাবে (ভাই-বোনেরা পিতার কারণে বঞ্চিত হবে)।

(খ) কন্যাদের অংশ (نصيب البنات):
কন্যাদের মিরাসও আয়াতে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এটি তিনটি অবস্থার ওপর নির্ভরশীল:
১. যদি মৃত ব্যক্তির একাধিক (দুই বা ততোধিক) কন্যা থাকে এবং কোনো পুত্র না থাকে, তবে কন্যারা সবাই মিলে মোট সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩) পাবে এবং তা নিজেদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে নেবে।
২. যদি মৃত ব্যক্তির কেবল একজন কন্যা থাকে এবং কোনো পুত্র না থাকে, তবে সে মোট সম্পত্তির ঠিক অর্ধেক (১/২) অংশ পাবে।
৩. আর যদি মৃত ব্যক্তির কন্যাদের সাথে পুত্রও থাকে, তবে কন্যারা আর নির্দিষ্ট অংশ পাবে না, বরং “পুত্রের অংশ দুই কন্যার অংশের সমান” (للذكر مثل حظ الأنثيين) এই নীতিতে আসাবা হিসেবে পুত্র ও কন্যারা অবশিষ্ট সম্পদ ভাগ করে নেবে।

٧- حرمت عليكم الميتة والدم ولحم الخنزير وما اهل لغير الله به والمنخنقة والموقوذة والمتردية والنطيحة وما اكل السبع الا ما ذكيتم ، وما ذبح على النصب وان تستقسموا بالازلام ، ذالكم فسق ، اليوم يئس الذين كفروا من دينكم فلا تخشوهم واخشون ، اليوم اكملت لكم دينكم واتممت عليكم نعمتى ورضيت لكم الاسلام دينا ، فمن اضطر فى مخمصة غير متجانف لاثم ، فان الله غفور رحيم-
(الف) ما المراد بقوله تعالى : اليوم اكملت لكم دينكم؟
(ب) ما هو الطعام الذى حرم فى الآية المذكورة؟

[(ক) “اليوم اكملت لكم دينكم” আয়াতাংশটির মর্মার্থ কী?
(খ) উল্লেখিত আয়াতে যে সব খাদ্য হারাম সেগুলো কী কী?]

আয়াতের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসির:
অনুবাদ: “তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে জবাই করা প্রাণী, গলা টিপে মারা প্রাণী, আঘাতের ফলে মৃত প্রাণী, ওপর থেকে পড়ে মৃত প্রাণী, শিংয়ের আঘাতে মৃত প্রাণী এবং হিংস্র প্রাণীতে খাওয়া প্রাণী—তবে তোমরা যা জবাই করে পবিত্র করেছ তা ব্যতীত; আর পূজার বেদিতে বলিদিকৃত প্রাণী এবং তীরের সাহায্যে ভাগ্য নির্ণয় করাও হারাম। এসবই পাপ কাজ। আজ কাফিররা তোমাদের দ্বীনের (ক্ষতি করার) ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেছে; সুতরাং তোমরা তাদেরকে ভয় কোরো না, বরং আমাকে ভয় করো। আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম। তবে যদি কেউ চরম ক্ষুধায় বাধ্য হয়, কিন্তু পাপের প্রতি তার কোনো আকর্ষণ না থাকে, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু।”
তাফসির: সুরা মায়িদার এই আয়াতে হালাল-হারাম খাদ্যের তালিকা দেওয়া হয়েছে এবং ইসলাম ধর্মের পূর্ণাঙ্গতা ঘোষণা করা হয়েছে।


(ক) আয়াতাংশের মর্মার্থ (المراد):
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে (ধর্মকে) পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম”- এই ঐতিহাসিক আয়াতাংশটি ১০ম হিজরিতে বিদায় হজে আরাফার ময়দানে জুমার দিন নাজিল হয়। এর মর্মার্থ হলো, আল্লাহ তায়ালা ইসলাম ধর্মের সকল হালাল-হারাম, বিধিবিধান এবং শরিয়তের কানুন সম্পূর্ণভাবে নাজিল করেছেন। এতে কিয়ামত পর্যন্ত আর কোনো নতুন বিধান সংযোজন বা বিয়োজনের প্রয়োজন নেই। ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও নিখুঁত জীবনব্যবস্থা।

(খ) আয়াতে নিষিদ্ধ বা হারামকৃত খাদ্যসমূহ:
উল্লেখিত আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মোট ১০টি জিনিসকে মুসলমানদের জন্য হারাম বা নিষিদ্ধ করেছেন:
১. মৃত প্রাণী (الميتة): স্বাভাবিকভাবে বা রোগাক্রান্ত হয়ে মরে যাওয়া হালাল প্রাণী।
২. প্রবাহিত রক্ত (الدم): জবাই করার সময় যে রক্ত প্রবাহিত হয়।
৩. শূকরের মাংস (لحم الخنزير): শূকরের মাংস এবং এর দেহের সকল অংশ।
৪. আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গকৃত প্রাণী: যে প্রাণী জবাই করার সময় আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো দেব-দেবী বা পীরের নাম নেওয়া হয়।
৫. গলা টিপে মারা প্রাণী (المنخنقة): শ্বাসরোধ করে মারা প্রাণী।
৬. আঘাতের ফলে মৃত প্রাণী (الموقوذة): লাঠি বা পাথরের আঘাতে মৃত প্রাণী।
৭. ওপর থেকে পড়ে মৃত প্রাণী (المتردية): পাহাড় বা উঁচু স্থান থেকে পড়ে মারা যাওয়া প্রাণী।
৮. শিংয়ের আঘাতে মৃত প্রাণী (النطيحة): অন্য পশুর শিংয়ের আঘাতে মৃত প্রাণী।
৯. হিংস্র প্রাণীর খাওয়া অবশিষ্টাংশ (وما اكل السبع): বাঘ-ভাল্লুক ইত্যাদির শিকার করা প্রাণীর উচ্ছিষ্ট।
১০. পূজার বেদিতে জবাই করা প্রাণী (وما ذبح على النصب): প্রতিমার বেদিতে বা মূর্তির সামনে বলিদানের উদ্দেশ্যে জবাই করা প্রাণী।

٨- انما التوبة على الله للذين يعملون السوء بجهالة ثم يتوبون من قريب فاولئك يتوب الله عليهم ، وكان الله عليما حكيما- وليست التوبة للذين يعملون السيأت حتى اذا حضر احدهم الموت قال إنى تبت الئن ولا الذين يموتون وهم كفار ، اولئك اعتدنا لهم عذابا اليما-
(الف) تحدث عن شروط قبول التوبة موضحا-
(ب) ما معنى الجهالة؟

[(ক) তওবা কবুল হওয়ার শর্তগুলো বিশদভাবে বর্ণনা কর।
(খ) الجهالة কাকে বলে?]

আয়াতের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসির:
অনুবাদ: “নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তওবা কবুল হওয়ার অধিকার কেবল তাদেরই, যারা অজ্ঞতাবশত কোনো পাপ কাজ করে ফেলে, অতঃপর দ্রুত তওবা করে। আল্লাহ এদের তওবাই কবুল করেন। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। তবে তাদের তওবা কবুল হয় না, যারা আজীবন পাপ কাজ করতেই থাকে, পরিশেষে যখন তাদের কারো মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন সে বলে, ‘আমি এখন তওবা করছি’; আর তাদের তওবাও কবুল হয় না, যারা কাফির অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। এদের জন্য আমি যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছি।”
তাফসির: এই আয়াতে তওবা কবুল হওয়ার শর্ত এবং মৃত্যুর সময় বা কাফির অবস্থায় তওবা যে অগ্রহণযোগ্য তা স্পষ্ট করা হয়েছে।


(ক) তওবা কবুল হওয়ার শর্তসমূহ (شروط قبول التوبة):
ওলামায়ে কেরামের মতে, খাঁটি তওবা (তওবাতুন নাসুহা) আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়ার জন্য প্রধানত ৩টি অপরিহার্য শর্ত রয়েছে:
১. الإقلاع عن الذنب (গুনাহ বর্জন করা): যে গুনাহটির জন্য তওবা করা হচ্ছে, তৎক্ষণাৎ সেই গুনাহের কাজটি সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দেওয়া।
২. الندم (অনুতপ্ত হওয়া): কৃত গুনাহের জন্য অন্তরে গভীরভাবে লজ্জিত, অনুতপ্ত এবং মর্মাহত হওয়া।
৩. العزم على عدم العودة (পুনরায় না করার সংকল্প): ভবিষ্যতে আর কখনো সেই গুনাহের দিকে ফিরে না যাওয়ার জন্য দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হওয়া।
(বিঃদ্রঃ তবে গুনাহটি যদি বান্দার হকের বা মানুষের অধিকারের সাথে জড়িত হয়, যেমন- কারো সম্পদ আত্মসাৎ করা বা গালি দেওয়া, তবে চতুর্থ শর্ত হলো- পাওনাদারকে তার হক বা সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া অথবা তার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া)।

(খ) الجهالة (জাহালাত) এর অর্থ:
‘জাহালাত’ শব্দের আভিধানিক অর্থ মূর্খতা বা অজ্ঞতা। তবে আয়াতে ‘بجهالة’ বলতে উদ্দেশ্য হলো- গুনাহের ভয়াবহতা বা আখেরাতের পরিণাম সম্পর্কে সাময়িক অসচেতন থাকা, অথবা প্রবৃত্তির তাড়নায় ও আবেগের বশবর্তী হয়ে (ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে) গুনাহে লিপ্ত হওয়া। এর অর্থ এই নয় যে, সে কাজটি যে হারাম তা সে জানেই না। সাহাবিদের মতে, “যে ব্যক্তি আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়, সে ওই মুহূর্তে জাহেল বা মূর্খ হিসেবেই গণ্য হয়।”

٩- يايها الذين أمنوا كونوا قوامين لله شهداء بالقسط ولا يجرمنكم شنأن قوم على الا تعدلوا ، اعدلوا ، هو اقرب للتقوى ، واتقوا الله ، ان الله خبير بما تعملون-
(الف) ما معنى التقوى والعدل؟ بين-
(ب) ما المراد بقوله تعالى : قوامين لله شهداء بالقسط؟

[(ক) التقوى ও العدل এর অর্থ কী? বর্ণনা কর।
(খ) قوامين لله شهداء بالقسط এর উদ্দেশ্য কী?]

আয়াতের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসির:
অনুবাদ: “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্য দানে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাকো। আর কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদেরকে সুবিচার না করতে প্ররোচিত না করে। তোমরা সুবিচার করো, এটি তাকওয়ার বেশি নিকটবর্তী। আর আল্লাহকে ভয় করো; তোমরা যা কিছু করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবগত।”
তাফসির: এই আয়াতে ইসলামে ন্যায়বিচারের গুরুত্ব বর্ণনা করা হয়েছে এবং শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সবার প্রতি ইনসাফ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


(ক) التقوى (তাকওয়া) ও العدل (আদল) এর অর্থ:
* التقوى (তাকওয়া): আভিধানিক অর্থ বেঁচে থাকা, পরহেজ করা, ভয় করা। শরিয়তের পরিভাষায়: আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করে এবং তাঁর জবাবদিহিতার কথা স্মরণ করে সকল প্রকার গুনাহ ও হারাম কাজ থেকে নিজেকে সযত্নে বাঁচিয়ে রাখা এবং আল্লাহর আদেশসমূহ পরিপূর্ণভাবে পালন করাকে তাকওয়া বলে।
* العدل (আদল): অর্থ ন্যায়বিচার, সুবিচার, ইনসাফ। পরিভাষায়: কারো প্রতি সামান্যতম পক্ষপাতিত্ব বা জুলুম না করে সবার প্রাপ্য অধিকার সমানভাবে বুঝিয়ে দেওয়া এবং আইনের দৃষ্টিতে ধনী-দরিদ্র সবাইকে সমান চোখে দেখাকে আদল বলে।

(খ) আয়াতাংশের উদ্দেশ্য (المراد):
“তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়সাক্ষ্য দানে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাকো”- এই আয়াতাংশের উদ্দেশ্য হলো মুমিনদের এই নির্দেশ দেওয়া যে, তারা যেন ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে সর্বদা ন্যায়বিচারের ওপর শক্তভাবে অটল থাকে। আদালতে বা অন্য কোথাও সাক্ষ্য দেওয়ার সময় তা যেন শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই হয় এবং তাতে যেন আপনজন, ধনী ব্যক্তি বা শত্রুর প্রতি কোনো পক্ষপাতিত্ব না থাকে। এমনকি কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা বা ঘৃণাও যেন কোনো মুমিনকে ন্যায়বিচার থেকে এক বিন্দুও বিচ্যুত করতে না পারে।

١٠- واذ قال موسى لقومه يقوم اذكروا نعمة الله عليكم اذ جعل فيكم انبياء وجعلكم ملوكا واتكم ما لم يؤت احدا من العلمين-
(الف) اذكر الواقعة المتعلقة بالآية-
(ب) ما هى النعمة التى اعطى الله بنى اسرائيل؟

[(ক) আয়াত সংশ্লিষ্ট ঘটনাটি উল্লেখ কর।
(খ) আল্লাহ বনি ইসরাইলকে যে সকল নিয়ামত দিয়েছিলেন তা কী কী?]

আয়াতের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসির:
অনুবাদ: “আর স্মরণ করো, যখন মুসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিল: ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা তোমাদের ওপর আল্লাহর সেই নিয়ামতের কথা স্মরণ করো, যখন তিনি তোমাদের মধ্য থেকে অনেক নবী সৃষ্টি করেছেন, তোমাদেরকে রাজত্বের অধিকারী করেছেন এবং বিশ্বজগতের অন্য কাউকে যা দেননি, তা তোমাদেরকে দিয়েছেন’।”
তাফসির: এই আয়াতে হযরত মুসা (আ.) বনী ইসরাইল জাতিকে আল্লাহর দেওয়া তিনটি বিশাল নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, যাতে তারা কৃতজ্ঞ হয়।


(ক) আয়াত সংশ্লিষ্ট ঘটনা (الواقعة):
হযরত মুসা (আ.) যখন তাঁর সম্প্রদায় বনী ইসরাইলকে নিয়ে ফেরাউনের ভয়াবহ অত্যাচার ও দাসত্ব থেকে রক্ষা পেয়ে মিসর থেকে বের হয়ে এলেন এবং সিনাই উপত্যকায় পৌঁছলেন, তখন তিনি তাঁর জাতিকে আল্লাহর দেওয়া অসংখ্য নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিলেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল, তারা যেন কৃতজ্ঞ হয় এবং আল্লাহর নির্দেশ পালন করে আমালিকা বা জাব্বারীন সম্প্রদায়ের হাত থেকে পবিত্র ভূমি ‘বায়তুল মুকাদ্দাস’ জয়ের জন্য জিহাদে অবতীর্ণ হয়। এটিই এই আয়াতের মূল প্রেক্ষাপট।

(খ) বনী ইসরাইলকে প্রদত্ত নিয়ামতসমূহ (النعمة):
উল্লেখিত আয়াতে হযরত মুসা (আ.) বনী ইসরাইলকে আল্লাহর দেওয়া ৩টি বিশেষ নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়েছেন:
১. جعل فيكم انبياء (নবীদের প্রেরণ): তাদের বংশে আল্লাহ অসংখ্য নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন (যেমন- হযরত দাউদ, সুলাইমান, ইয়াকুব, মুসা আ.) যা অন্য কোনো জাতির ক্ষেত্রে হয়নি।
২. جعلكم ملوكا (রাজত্ব দান): ফেরাউনের দীর্ঘদিনের অমানবিক দাসত্ব থেকে মুক্ত করে তাদেরকে স্বাধীন, স্বাবলম্বী এবং নিজেদের বাড়িঘর, নারী-পরিজন ও রাজত্বের অধিকারী করেছেন।
৩. واتكم ما لم يؤت احدا (অনন্য নিয়ামত দান): সমসাময়িক বিশ্বের অন্য কোনো জাতিকেই আল্লাহ এমন অলৌকিক নিয়ামত দান করেননি, যা তাদের দিয়েছিলেন (যেমন- আসমান থেকে মান্না ও সালওয়া নামক খাবার পাঠানো, মরুভূমিতে মেঘের ছায়া দেওয়া, লোহিত সাগর দ্বিখণ্ডিত করে রাস্তা তৈরি করা ইত্যাদি)।

مجموعة (ب) [খ-বিভাগ: সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন]

١١- ما معنى التفسير بدون السند؟ ثم بين نشأته وتطوره مفصلا-

[১১. التفسير بدون السند এর অর্থ কী? উহার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ বর্ণনা কর।]

التفسير بدون السند (আত-তাফসীর বিদূনিস সানাদ) এর অর্থ:
‘তাফসীর’ অর্থ কোরআনের ব্যাখ্যা করা, ‘বিদূনি’ অর্থ ব্যতীত বা ছাড়া, এবং ‘সানাদ’ অর্থ সূত্র বা বর্ণনাকারীদের পরম্পরা।
পরিভাষায়: যে তাফসীর গ্রন্থে মুফাসসিরগণ কোরআনের আয়াতের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে কোনো হাদিস বা সাহাবিদের উক্তি উল্লেখ করার সময় বর্ণনাকারীদের পূর্ণাঙ্গ সূত্র (সনদ) উল্লেখ না করে সরাসরি মূল কথা বা ব্যাখ্যাটি (মতন) উপস্থাপন করেন, তাকে ‘আত-তাফসীর বিদূনিস সানাদ’ বা সনদবিহীন তাফসীর বলা হয়। এর ফলে তাফসীর গ্রন্থের আকার ছোট হয় এবং সাধারণ পাঠকের জন্য পড়া ও বোঝা সহজ হয়। (যেমন- তাফসিরে বায়জাবি, তাফসিরে জালালাইন)।

এর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ (نشأته وتطوره):
সনদবিহীন তাফসীরের ধারাটি একদিনে তৈরি হয়নি, বরং এটি পর্যায়ক্রমে বিকশিত হয়েছে:

  1. রাসুল (সা.) ও সাহাবিদের যুগ:
    এ যুগে তাফসীর মূলত মৌখিক বর্ণনা ও মুখস্থ করার ওপর নির্ভরশীল ছিল। তখন সনদের প্রয়োজন কম ছিল, কারণ সাহাবিরা সরাসরি রাসুল (সা.) থেকে শুনতেন এবং তাবেয়িরা সরাসরি সাহাবিদের কাছ থেকে শিখতেন।
  2. তাবেয়ি ও পরবর্তী যুগ (সনদসহ তাফসীর):
    এই যুগে তাফসীর গ্রন্থায়নের কাজ শুরু হয়। তখন বাতিল ও মিথ্যা বর্ণনা রোধ করার জন্য প্রতিটি ব্যাখ্যার সাথে বর্ণনাকারীদের দীর্ঘ সূত্র বা সনদ উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক ছিল (যাকে তাফসীর বিল মাছুর বলা হয়)। যেমন- ইমাম ইবনে জারির আত-তাবারির বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ। এখানে সনদের ওপর খুব কড়াকড়ি ছিল।
  3. সনদ বিলুপ্তির যুগ (সনদবিহীন তাফসীর):
    হিজরি তৃতীয় ও চতুর্থ শতকের পর যখন হাদিস ও তাফসীরের মূল গ্রন্থগুলো সংকলিত হয়ে যায় এবং সনদগুলো সুপ্রতিষ্ঠিত ও যাচাইকৃত হয়ে যায়, তখন পরবর্তী যুগের মুফাসসিরগণ দেখলেন যে দীর্ঘ সনদ পড়ার কারণে সাধারণ পাঠকরা ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে এবং গ্রন্থের কলেবরও অনেক বড় হয়ে যাচ্ছে। তখন তাঁরা পাঠকের সুবিধার্থে এবং সংক্ষেপণের জন্য সনদগুলো বাদ দিয়ে শুধু মূল তাফসীর বা হাদিসের মতন (মূল পাঠ) উল্লেখ করতে শুরু করেন।
    এভাবেই ‘তাফসীর বিদূনিস সানাদ’ বা সনদবিহীন তাফসীর ধারার উৎপত্তি ঘটে। আল্লামা বায়জাবি (রহ.) রচিত ‘আনোয়ারুত তানজিল’ এবং আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী ও মাহাল্লী (রহ.) রচিত ‘তাফসিরে জালালাইন’ এই ধারার সবচেয়ে বিখ্যাত ও সফল গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত।

١٢- بين سبب نزول سورة النساء مع ذكر وجه تسميتها-

[১২. সুরা নিসা’র নামকরণের কারণসহ শানে নুযূল বর্ণনা কর।]

নামকরণের কারণ (وجه تسميتها):
‘নিসা’ (النساء) শব্দের অর্থ হলো নারী বা মহিলা সমাজ। পবিত্র কুরআনের এই সুরাটিতে অন্যান্য যেকোনো সুরার তুলনায় নারীদের অধিকার, তাদের বিবাহ, মোহরানা, তালাক, ইদ্দত এবং বিশেষ করে উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে তাদের অংশের বিধান সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি ও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। নারীদের প্রতি ইসলাম যে অভূতপূর্ব সম্মান ও আইনি অধিকার দিয়েছে, তার এক বিশাল দলিল হলো এই সুরা। যেহেতু সুরার মূল আলোচ্য বিষয় নারী অধিকার, তাই এর নাম রাখা হয়েছে ‘সুরা আন-নিসা’।

শানে নুযূল (سبب نزولها):
সুরা আন-নিসা একটি মাদানি সুরা, যা হিজরতের পর মদিনায় অবতীর্ণ হয়। এই সুরা নাজিলের প্রধান প্রেক্ষাপট ছিল উহুদ যুদ্ধ। উহুদ যুদ্ধে মদিনার সমাজে ৭০ জন শ্রেষ্ঠ সাহাবি শহীদ হওয়ায় অসংখ্য নারী বিধবা এবং শিশু এতিম হয়ে পড়েছিল। তৎকালীন আরবে এতিম ও বিধবাদের কোনো সামাজিক মর্যাদা বা সম্পত্তির অধিকার ছিল না। অভিভাবকরা এতিমদের দুর্বলতার সুযোগে তাদের সম্পত্তি আত্মসাৎ করত। এই নাজুক পরিস্থিতিতে এতিমদের সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করা, বিধবাদের পুনর্বাসনের জন্য বহুবিবাহের অনুমতি, উত্তরাধিকারের সুনির্দিষ্ট বণ্টন এবং নারীদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আল্লাহ তায়ালা এই সুরার আয়াতগুলো ধাপে ধাপে নাজিল করেন।

Follow Our Facebook Page
দ্রুত নতুন বই পেতে যুক্ত থাকুন
Follow Now